Showing posts with label সুজাতা ব্যানার্জি. Show all posts
Showing posts with label সুজাতা ব্যানার্জি. Show all posts

গল্পের ম্যাজিক:: জীবন থেকে শেখা - জয়তী অধিকারী


জীবন থেকে শেখা
জয়তী অধিকারী

রোজকার মতোই আজও একদম ভোরবেলাতেই লামার চোখ খুলে গেল। তাড়াতাড়ি পাশে তাকিয়ে দেখে নিল সে বড়োভাই বিরজু উঠে পড়েছে নাকি এখনও ঘুমোচ্ছে। তখনও ওঠেনি দেখে লামা একটু নিশ্চিন্ত হল। যাক বাবা, আজ তাহলে বিরজু আর ওকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে না। না হলে রোজ পাহাড় থেকে সন্ধেবেলা ফিরে এসে বলে, “লামা, তুই এখনও ছোটো আছিস। আর একটু বড়ো হয়ে যা। আমি তোকে আমার সঙ্গে পাহাড়ে নিয়ে যাব।”
লামারা দুই ভাই তাদের বাবা, মা আর কাকার সঙ্গে উত্তরাখন্ডের এই পাহাড়ীতেই থাকে। জন্ম থেকেই সে দেখে এসেছে পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট পাথরের ঘরে তাদের বাস। তার সামনে একফালি জমিতে ভুট্টার চাষ আর গোটা দশেক ছাগল-ভেড়া নিয়ে তাদের সংসার। বাবা মাঝে মাঝেই ট্যুরিস্টদের নিয়ে আরও অনেক উঁচু পাহাড়ে চলে যায়। এক-দু’মাস পরে আবার ফিরে আসে। তখন তাদের বাড়িতে যেন উৎসব লেগে যায়। বাবা কত জিনিস আনে তাদের জন্যে। রাতে লামা তখন ওর বাবার কাছে গিয়ে গা ঘেঁষে শোয়। বাবাও তখন সেই বরফ পাহাড়ের গল্প শোনায় তাদের। লামার খুব ভালো লাগে শুনতে। সে শোনে আর ভাবে কবে সে বাবার মতো বড়ো হবে আর ওই উঁচু পাহাড়ে যাবে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লামা স্বপ্ন দেখে সে আর বিরজু অনেক উঁচু পাহাড়ে গেছে। সেখানে সূর্য আরও অনেক উজ্জ্বল, আর বরফে মোড়া রাস্তায় কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। লামা আর বিরজু তখন আর এই ভেড়ার চামড়ার গরম জামা পরবে না, বাবার মতো ওই মোটকা জ্যাকেট পরে যাবে।
“কী হল লামা? আজ স্কুলে যাবি না?” বিরজুর কথায় লামা যেন তার স্বপ্নের রাজ্য থেকে বাস্তবে ফিরে এল।
“না দাদা, আজ আমি তোমার সঙ্গেই যাব।”
“আমার সঙ্গে কোথায় যাবি? আমি তো ছাগল আর ভেড়া চরাতে যাব।”
“আমিও যাব দাদা। তোমাকে ভেড়া গুনে আনতে সাহায্য করব। আমি এখন পঞ্চাশ পর্যন্ত গুনতেও পারি। মাস্টারজি বলেছে আমি নাকি ক্লাসে সবথেকে ভালো গুনতে শিখেছি।”
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিরজু ওর মাকে জিজ্ঞাসা করল যে সে লামাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে কিনা। মাকেও লামা এতবার বলেছে যে আজ তিনিও ‘না’ বলতে পারলেন না।
“আচ্ছা, যাক তাহলে। কিন্তু লামা, খবরদার খাদের দিকে যাবে না কিন্তু। আর দাদাকে বিরক্ত করবে না।”
লামা তার মাকে ঘিরে দু’পাক নেচে নিল। কাল স্কুলে গিয়েই ভীমাকে গল্প করতে হবে আজ সারাদিন সে ‘ভেড়-বকরী’ চরিয়েছে পাহাড়ে, একদম বড়োদের মতো। ভীমাকে সব কথা না বললে তার খাবার হজমই হয় না। ভীমা যে তার একমাত্র কাছের বন্ধু।

পাহাড়ে ভোরের আলো ফুটলেই দিনের কাজ শুরু হয়ে যায়। যদিও কোনো ব্যস্ততা চোখে পড়ে না, কিন্তু সূর্যের সঙ্গেই তাদের সমস্ত কাজের নিয়ম বাঁধা। সন্ধে হওয়ার আগেই বাড়ি না ফিরতে পারলে সমূহ বিপদ।
দুই ভাইকেই খাইয়ে দুপুরের খাবার টিফিনবাক্সে ভরে দিয়ে দিল ওদের মা। আর সঙ্গে জলও। তাদের এগিয়ে যেতে দেখে কপালে একবার হাত ঠেকিয়ে মনে মনে বলল, ‘রক্ষা কোরো ঠাকুর।’
“চল লামা, এই গাছের ডালটা নে। কোনো ভেড়া বা ছাগল পাহাড়ের পথে এদিক ওদিক চলে গেলে তাড়িয়ে নিয়ে আসবি। কেমন?”
“আচ্ছা দাদা,” আজ তো লামা দাদার কথায় উঠছে আর বসছে। না হলে অন্যদিন এতক্ষণে দু’বার মারপিটও হয়ে যেত হয়তো। কিন্তু আজ লামা ঠিক করেই নিয়েছে কোনো অবস্থাতেই দাদার অবাধ্য হবে না আর দাদার সঙ্গে ঝগড়া-মারপিটও করবে না।
এতদিন লামা ভাবত তাকেই কষ্ট করে স্কুলে যেতে হয়, পড়াশোনা করতে হয়। আর দাদা খুব মজা করে ‘ভেড়-বকরী’ চরাতে যায়। সারাদিন ওরা ওদের মতো চরে বেড়ায়, দাদা পাহাড়ের গায়ে শুয়ে ঘুমোয় আর বিকেল হলেই আবার ওদের নিয়ে বাড়ি চলে আসে। কিন্তু আসলে যে কাজটা এতটা কঠিন ওর তো কল্পনাতেও ছিল না। একটা এদিকে যায় তো অন্যটা উলটোদিকে খাদে নেমে যেতে চায়, আর লামা যখন ওগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে রাস্তায় নিয়ে আসে ততক্ষণে হয়তো আর একটা বকরী মানে ছাগল ওকে বেকুব বানিয়ে পাকদণ্ডি বেয়ে উঠতে শুরু করেছে।
“কী কান্ড! আরে পড়ে যাবি তো! নেমে আয়, নেমে আয় বলছি!” লামার আস্ফালন শুনে বিরজু ওর দিকে তাকিয়ে মুচকে মুচকে হাসতে থাকে।
“আরে আরে বুদ্ধু, ওদের ছেড়ে দে। ওরা এরকম ভাবেই ঘাস খেয়ে ঠিক সময়মতো নেমে আসবে। তুই ভাবিস না। শুধু চোখে চোখে রাখিস, কোনো শেয়াল যেন না এসে পড়ে।”
“শেয়াল??!!” লামার চোখদুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। “আমাকে ভয় দেখালে বাড়ি গিয়ে মাকে বলে দেব কিন্তু,” এবার একটু রেগে গিয়ে লামা বলল দাদাকে।
“আরে সত্যিই, আমি একদিন দেখেছি। ওইইইই দূরের পাহাড়টায়। সেই থেকে আমি আর ওদিকে যাই না তো, এই পাহাড়েই থাকি।”
এবারে লামার যেন মনে হল, কী জানি! হতেও পারে। তাও একবার আড়চোখে বিরজুর দিকে তাকিয়ে নিল। কিন্তু বিরজুর চোখেমুখে তো কোনোরকম দুষ্টুমির ছাপ নেই। তার মানে ঠিকই বলছে। এবার লামা একটু ভয় পেল। শেয়াল মানেই ধূর্ত একটা প্রাণী, আর তারা ছাগল-ভেড়ার যম... এটা তো পাহাড়ের বাচ্চাও জানে।

কিছুক্ষণ এদিক ওদিক থেকে ঘুরে এসে লামা দেখল বিরজু একটা গাছের ছায়ায় গামছা পেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছাগল চরানোর কাজটা যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, এখন আর ততটা লাগছে না। একা একা বসে কী করবে ভাবতে ভাবতে লামার চোখ পড়ল ওই দূরের পাহাড়ে। ওখানেই তো শেয়াল এসেছিল বলল বিরজুদাদা। একবার গিয়ে দেখবে? যদি শেয়াল দেখা যায়?
পায়ে পায়ে লামা এগিয়ে চলল ওই দূর পাহাড়ের দিকে। ভেড়া-পালকদের পায়ে চলা পথের রেখা ধরে এগিয়ে চলল সে। কিন্তু বেশিদূর যেতেও ভয় লাগছে, দাদা যদি রেগে যায়? যদি চিন্তা করে? কছাকাছি একটা বড়ো পাথর দেখে তার উপরে উঠে বসল লামা। এখান থেকে দূরের পাহাড়টা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কিছু যেন নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে মনে হচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখল কয়েকটা ছাগল, কিন্তু মাথায় বড়ো ভেড়ার মতো শিং আছে, চরে বেড়াচ্ছে। লামা আর একটু ভালো করে দেখার জন্য আরও একটু এগিয়ে বসল। এবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চারটে বড়ো ছাগল আর একটা ছোটো বাচ্চা ঘুরে ঘুরে ঘাস খাচ্ছে। কী অদ্ভুত! খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে চরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু পড়ে যাচ্ছে না!
হঠাৎ লামার চোখে পড়ল দূরে একটা মোটা ল্যাজওয়ালা কুকুর গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে ছাগলগুলোর দিকে। লামার কী রকম অস্বস্তি হতে লাগল। হঠাৎ ও উঠে দাঁড়িয়ে ছুটতে শুরু করল।
“দাদা, দাদা, বিরজু দাদা,” ছুটতে ছুটতেই চেঁচাতে লাগল লামা।
লামার গলা শুনে বিরজুও ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।
“কী হয়েছে? ছাগল-ভেড়া সব ঠিক আছে তো?”
“দাদা, সব ঠিক আছে। কিন্তু ওই পাহাড়ে মনে হয় শেয়াল,” হাঁফাতে হাঁফাতে লামা কোনোরকমে বলেই আঙুল দিয়ে ইশারায় দেখাল বিরজুকে। দুই ভাই মিলে ছুটতে ছুটতে সেই জায়গাটায় গেল, যেখান থেকে লামা দেখতে পেয়েছিল শেয়ালটাকে।
“এগুলো বোরাল,” বিরজু বলল লামাকে, “এখানে চুপ করে দাঁড়া, শব্দ করবি না একদম।”
লামা শব্দ করবে কী, ভয়ে আর উত্তেজনায় ওর তো গলাই শুকিয়ে গেছে। ওই পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে তখন বোরালগুলো নিচে নামার চেষ্টা করছে। এখানে হাওয়ার খুব দাপট। তাই পাহাড়ের গা ক্ষয়ে ক্ষয়ে এবড়ো-খেবড়ো, মাথার দিকে ক্রমশ সরু হয়ে ছুঁচলো হয়ে গেছে। কয়েকটা জায়গায় শুধু পাথরের মাথাগুলো দু-তিন আঙুল মতো চওড়া। তার উপরে পা রেখে রেখে সার দিয়ে নেমে আসছে বোরালগুলো। ওরা এখনও জানে না, ওদের পেছনে যমদূত দাঁড়িয়ে। হঠাৎ একটা পাথর গড়িয়ে আসার শব্দে কয়েকটা বোরাল ঊপরে তাকিয়ে শেয়ালটাকে দেখতে পেল। প্রাণভয়ে তারা লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগল পাহাড়ের গা বেয়ে। লামার গলা দিয়ে একটা আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এল, “দাদা, ওই বাচ্চাটা...”
বিরজুও ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একটা বোরালের বাচ্চা বেশ পিছিয়ে পড়েছে। বড়োদের মতো সে অত তাড়াতাড়ি নামতেও পারছে না, আর ব্যালেন্স রাখতে গিয়ে সরসর করে নেমে আসছে ঢাল বেয়ে। কিন্তু এভাবে নামতে থাকলে ও তো খাদের মধ্যে পড়ে যাবে!
“কী হবে দাদা?” লামার উদ্বেগ বিরজুর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা বেশি, তাই ভয়ের প্রকাশ কম।
“আরে বেওকুফ, কুছ নাহি হোগা।”
দু’জনেরই চোখ বোরালের বাচ্চাটার উপর। শেয়ালটাও ওকেই টার্গেট করে নিয়েছে। অনেকটা নেমে এসেছে ঢাল বেয়ে। এদিকে বাচ্চাটাও পাহাড়ের গায়ে একটা খাঁজে দাঁড়িয়ে পড়েছে। জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সে। কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছে না বেচারা। তার মা এবং বাকি সঙ্গীসাথীরা অনেকটাই নিচে নেমে গেছে। ওরা সকলেই নিরাপদ জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শেয়ালটাও এদিক দিয়ে নামতে গিয়ে বিপদ বুঝে আবার খানিকটা উঠে গেল। অন্য দিক দিয়ে ঘুরে আবার আসছে বাচ্চাটার দিকে। বাচ্চাটা আর শেয়ালটার মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে। লামা আর বিরজু দু’জনেই স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। বাচ্চাটা ছটফট করছে। কিন্তু খাদের দিকে নামতে ভয় পাচ্ছে।
আচমকাই বিরজু মুখের সামনে দুটো হাতের পাতা রেখে গলায় অদ্ভুত একটা শব্দ করে উঠল। অনেকটা যেন কুকুরের ডাকের মতো। সেই আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল এই পাহাড় থেকে ওই পাহাড়ে। কিন্তু মাঝে হাওয়ার দাপটে তার রেশ হয়তো গিয়ে পৌঁছাল না ওইদিকের পাহাড়ে। তাতে শেয়াল বা বোরালছানা, কারুরই কোনো হেলদোল দেখা গেল না। বিরজু আবার একইভাবে শব্দ করল, এবার আরও জোরে। এবারে আওয়াজটা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে ফিরতে লাগল। শেয়ালটা একটু কান খাড়া করে এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু ফিরে গেল না। তার নজর সেই বোরালছানার দিকেই। কিন্তু বোরালছানাটা সেই অপরিচিত শব্দে ভয় পেয়ে তড়বড় করে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগল। কখনও পাথরের মাথায়, কখনও বা খাঁজে পা রেখে রেখে সে নেমে গেল অনেকটা নিচে... শেয়ালটার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আর একটু নেমে গেলেই সে তার দলের কাছে, তার মায়ের কাছে পৌঁছে যাবে। এভাবেই জীবন প্রত্যেককে আত্মরক্ষার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। সেদিকেই তাকিয়ে রইল বিরজু। লামা ডানদিকে তাকিয়ে দেখল শেয়ালটা আস্তে আস্তে পেছন ফিরে চলে যাচ্ছে। শিকার ফসকে যাওয়ার দুঃখ তার হাঁটাচলায় ফুটে বেরোচ্ছে।
“ওই দেখ লামা,” বিরজুর গলায় যেন জয়ের আনন্দ, একটা প্রাণ বাঁচানোর খুশি ঝরে ঝরে পড়ছে।
লামা তাকিয়ে দেখল, বোরালছানাটা তার মাকে দেখতে পেয়েই হয়তো তিড়িং তিড়িং করে লাফিয়ে ছুটেছে তার দলের দিকে। দলটা ওর জন্যেই অপেক্ষা করছিল নিরাপদ জায়গায়। ছানাটা দলের সবথেকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বোরালটার পেটের কাছে গিয়ে ঢুকে পড়ল।
“ওটা নিশ্চয় ওর মা, তাই না বিরজুদাদা?”
“হ্যাঁ, ওর মা ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল, দেখলি না?” বিরজুর গলাতেও খুশির ছোঁয়া।
“চল দাদা, মা আমাদের জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করছে হয়তো,” বলেই লামা লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে লাগল পাথরের গা বেয়ে। তার হাতে ধরা গাছের ডাল দিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে আসতে লাগল ছাগল-ভেড়াগুলোকে। ওদিকে বিরজু তখন পেছন থেকে শব্দ করছে, “হোইইই, হুর্‌র্‌র্‌র্‌, চল্‌ চল্‌।”
_____
ছবিঃ সুজাতা ব্যানার্জী

গল্পের ম্যাজিক:: ভুট্টা - দীপাঞ্জনা দাস


ভুট্টা
দীপাঞ্জনা দাস

মনখারাপ করে বিলের ধারে বসে ছিল পিকু। অঙ্কের ক্লাস টেস্টে চার পেয়েছে সে পঞ্চাশে। অঙ্কের স্যার ব্রজনন্দবাবু খাতার উপর বড়ো বড়ো করে লিখে দিয়েছেন, ‘বাঁদর’।
এ পর্যন্তও ঠিক ছিল। কিন্তু যখন তিনি পিকুর কানটাকে রেডিওর নবের মতো ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন খাতা বাবাকে দিয়ে সই করিয়ে আনতে, তখন আর তার দুঃখের সীমা রইল না। তাই স্কুল ছুটির পর সে চলে এসেছে এই কলমি বিলের ধারে। এখানে সে আগে কখনও আসেনি। মানে আসতে দেওয়া হয়নি। কাউকেই দেওয়া হয় না। লোকে বলে এই বিলের ধারে নাকি পেতনি থাকে। তা থাকুক। পিকুর এখন একটা নিরিবিলি জায়গা প্রয়োজন।
পিকুদের গ্রামটা ছোটো। লোকজন বড়ো একটা কম নেই। তাই শান্তিমতো ফাঁকায় দু’দণ্ড বসা মুশকিল। বসার সম্ভাব্য সকল জায়গাই এলাকার বয়স্কদের হুকোঁ-কলকের আসর হয়, আর না হয় অমুক কাকিমা তমুক জেঠিমার সংসারচর্চার স্থান হয়ে ওঠে। তাই নিরুপায় পিকু পেতনির আস্তানায় এসে উপস্থিত হয়েছে।
জায়গাটা মোটেই ভূতুড়ে নয়। বরং বেশ সুন্দর। বিলটায় অল্প কিছু কলমি লতা ভেসে রয়েছে। বাকি অংশে স্থির কালো জলের উপর দু-তিনটে জলফড়িং নেচে বেড়াচ্ছে। সবুজ ঘাস হাঁটু ছুঁতে চায়। বিলের ধারে বড়ো পাকুড়গাছটা নুয়ে পড়েছে একদিকে। বিকেলের শান্ত শীতল বাতাসে তার পাতাগুলো দুলে দুলে উঠছে। ওর পাতার আড়াল থেকেই কী একটা পাখি ডাকছে চিরিক চিরিক করে, দেখা যাচ্ছে না।
এসব দেখতে দেখতেই হঠাৎ পিকুর মনে পড়ল বাবার রাগী মুখখানা। মনে হতেই তার কানটা আবার টনটন করে উঠল। কানে হাত দিল পিকু। উহ্‌! কষে মলে দিয়েছে। এখনও গরম ঠেকছে। তার মন আবার উদাস হয়ে যায়। বাড়ি ফিরলে রাম ঠ্যাঙানি আছে কপালে! দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিকু।
“ধুর! চলেই যাব।”
“কোথায় যাবে?” হঠাৎ কে যেন বলে ওঠে পাশ থেকে।
কে? কে কথা বলল? বিলের পেতনি? পেতনিরা কথা বলে? সে চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “অ্যাই কে রে?”
হঠাৎ পাকুড়গাছের পিছন থেকে একটা নেড়া মাথা ছেলে হাসি হাসি মুখ নিয়ে টুক করে বেরিয়ে এল। বলল, “এই যে, আমি।”
ছেলেটাকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগল পিকুর। গোল মুখ, মাথায় একটাও চুল নেই, বয়স্কদের মতো চকচকে টাক। গোল গোল চোখ, চ্যাপটা নাক আর পাতলা ঠোঁটে হাসির ঝিলিক দিচ্ছে। গায়ের রঙ ধবধবে ফরসা। সাহেব নাকি? না, দিব্যি পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছে যে। সাহেব হবে কী করে? ছেলেটাকে আগে কখনও এ তল্লাটে দেখেনি সে। পিকু প্রশ্ন করল, “তুমি কে?”
ছেলেটা একটু ভেবে নিয়ে বলল, “আমার নাম? উম্‌... ভুট্টা।”
“ভুট্টা? এ আবার কেমন নাম? ভুট্টা কারও নাম হয় নাকি?”
“কেন হবে না? নাড়ু যদি নাম হয়, পটল যদি নাম হয়, তবে ভুট্টা কী দোষ করল?”
পিকু ভেবে দেখল, কথাটা সত্যি। নাড়ুও খাবার জিনিস, পটলও খাওয়া হয়, আবার ভুট্টাও খাবার জিনিস এবং বেশ ভালো খেতে। সুতরাং ভুট্টা নাম হতেই পারে। ক্ষতি নেই। ছেলেটা আরও কাছে এগিয়ে এল। পিকু বলল, “তুমি কোথায় থাকো? আগে তো কোনওদিন দেখিনি তোমায়।”
“দেখবে কী করে? আজই তো প্রথম এলুম এখানে। ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এমন সময় দেখি তুমি বসে আছ। তাই কথা কইতে এলুম।”
পিকু একটা ঢিপির মতো জায়গায় একটা পাথরের উপর বসে ছিল। ছেলেটা ঢিপির নিচে দাড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। পিকু তাকে হাতের ইশারায় তার পাশে বসতে বলল। সে খুশি হয়ে এগিয়ে এসে স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে বসে পড়ল তার পাশে।
“বাপ রে! এক লাফে এতটা উঠে পড়লে?”
“এখানকার গ্র্যাভিটি আমার উপর খুব একটা কাজ করে না।”
“মানে? কী কাজ করে না?”
“ও তুমি বুঝবে না। যাক সে কথা, কোথায় একটা যাবার কথা বলছিলে তখন?”
“কোথাও যাবার কথা বলিনি তো। তবে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।”
“কোথায় যাবে সেটাই তো জানতে চাইছি।”
“দূরে কোথাও। অনেক দূরে। এস্কিমোদের কাছে চলে যাব। বরফের বাড়ি বানিয়ে থাকব আর মাছ ভাজা খাব।”
“আইডিয়াটা মন্দ নয়। তবে ওখানে শীতে বড়ো কষ্ট।”
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমার কাছে অত সোয়েটার নেই। আর সোয়েটার আনতে গেলেও তো বাড়ি যেতে হবে।”
“তো যাচ্ছ না কেন?”
পিকু জোর গলায় বলে উঠল, “না! আমি বাড়ি যাব না।”
“আমিও যাব না।”
পিকু অবাক হয়ে তাকায় ভুট্টার দিকে। “কেন? তুমিও বাড়ি থেকে চলে এসেছ?”
“হ্যাঁ। রাগ হয়েছে।”
এ যে তারই মতো! যাক, একটা বন্ধু পেলে মন্দ হয় না। তার মনের কৌতূহলটা সে আর চেপে রাখতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, “তোমার মাথায় চুল নেই কেন?”
ভুট্টা মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “সে অনেক দুঃখের কথা। শুনবে?”
“হ্যাঁ শুনব। আমারও আজ অনেক দুঃখ হচ্ছে।”
“বেশ, তবে বলি শোনো। সেবারও আমি বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছিলুম। এদেশে নয়, অন্য দেশে। এসে উপস্থিত হলাম এক বৈজ্ঞানিকের বাড়িতে। তিনি বাড়ি ছিলেন না। আমি গিয়ে ঢুকলাম তাঁর ল্যাবরেটরিতে। চারদিকে ঘুরে ঘুরে বিভিন্নরকম যন্ত্রপাতি আর রংবেরঙের তরল ভরা কাচের শিশি দেখছি, এমন সময় চোখে পড়ল একটা বড়ো জারে খয়েরি মতো কী যেন আছে। দেখে খুব লোভ হল। ঢাকনা খুলে চোঁ চোঁ করে অর্ধেক মেরে দিলুম। তারপরই আমার সব চুল ঝরঝর করে পড়ে গেল।”
ভুট্টা ঠোঁট উলটে তার টাকে হাত বোলাতে লাগল আবার। পিকু জিজ্ঞেস করল, “কেন? কী ছিল ওতে?”
“ওতে কী একটা অ্যাসিড ছিল। আমি ভেবেছিলুম ভেলি গুড়।” বলে ভুট্টা দাঁত বের করে হাসতে লাগল।
আচ্ছা বোকা তো ছেলেটা! ভেলি গুড় ভেবে অ্যাসিড খেয়ে নিল? পিকু আবার বলল, “অ্যাসিড খেলে তুমি বেঁচে আছ কেমন করে?”
“আমরা অত সহজে মরি না। অ্যাসিড খেলে আমাদের এমন কিছু ক্ষতি হয় না।”
“বাব্বা! তুমি কোথাকার লোক হে?”
“সে তুমি চিনবে না। আচ্ছা, তোমার কীসের দুঃখ বলছিলে?”
পিকু একটুক্ষণ চুপ করে অঙ্ক খাতাটা বের করে ভুট্টার হাতে দিল। ভুট্টা দেখে বলল, “তোমায় বাঁদর বলেছে? না, এ ভারি অন্যায় কথা। এক প্রাণীকে অন্য প্রাণীর নামে ডাকা যায় না। তুমি মনখারাপ কোরো না। তোমায় বাঁদর বললেই তো তুমি সত্যি বাঁদর হয়ে যাচ্ছ না। ওই যে দেখছ দূরে মাঠে গরুটা ঘাস খাচ্ছে, ওটাকে যদি আমি ডায়নোসর বলি, গরুটা কি ডায়নোসর হয়ে যাবে? যাবে না। তেমনি তুমিও বাঁদর হলে না।”
পিকু মনে একটু জোর পায়। কিন্তু আবার মনে একটা কথা আসে। বলে, “কিন্তু নম্বরটা? আমি তো সত্যিই চার পেয়েছি। এটা বাবা দেখলে আর রক্ষে নেই। কানদুটো বোধহয় আর থাকবেই না।”
“তা বটে। তবে এ যদি আমাদের দেশ হত, তাহলে কিন্তু তোমার ভয় ছিল না। বরঞ্চ তুমি তারিফ পেতে।”
“সে কেমন? অঙ্কে চার পেলে কেউ তারিফ করে?”
“হুম, আমাদের দেশে করে। ওখানে হিসেব সবই উলটো এখানের থেকে। কম নম্বর পেলেই সেটা লোকে ভালো বলে। বেশি নম্বর পেলেই লোকে নিন্দে করে। আমিই তো কতবার বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য পিটুনি খেয়েছি।”
পিকু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এ কোন দেশ রে বাবা?
“তোমার দেশটা কোথায় বলো তো।”
“সেটা ঠিক বোঝানো যাবে না। অনেক দূরে, আবার খুব কাছে। মানে দুটো একসঙ্গেই চলছে, কিন্তু উলটো দিকে। সমান্তরালভাবে। মাঝখানের দূরত্বটা টপকে আসাই ঝকমারি।”
পিকু মাথা চুলকে বলল, “নাহ্‌, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
“যাক গে, বুঝে কাজ নেই। ওসব অনেক জটিল ব্যাপার।”
“আচ্ছা তোমায় কী বলে ডাকব?”
ভুট্টা খানিক ভেবে বলল, “সেটাও একটা সমস্যা। আমাদের হিসেবে দেখলে তোমার থেকে আমি মাত্র তিন বছরের বড়ো। কিন্তু তোমাদের হিসেবে দেখতে গেলে আমি তোমার চেয়ে আটচল্লিশ বছরের বড়ো।”
বলে কী ছেলেটা? খ্যাপা নাকি? এই ছোটো ছেলেটা তার থেকে আটচল্লিশ বছরের বড়ো? হতে পারে ওর মাথায় দাদুদের মতো টাক, কথাও বলে বড়োদের মতো, তবুও এত বয়স হওয়া অসম্ভব। পিকু বলে, “ধুর! কী যে বলো কিছুই বুঝি না।”
“বোঝানোটা একটু কঠিন বটে, তবে এখন না বললেও হবে না।”
“কেন?”
“কারণ, যদি আমি তোমার একটু বড়ো হবার জন্য অপেক্ষা করি, তবে ততদিনে আমি সব ভুলে যাব। ছোটো হয়ে যাব কিনা।”
পিকু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটার মাথায় নির্ঘাত ছিট আছে। ছোটো হয়ে যাবে? এ কেমন কথা? কেউ কখনও ছোটো হয়ে যায়?
ছেলেটা নিজেই বলল আবার, “কী, বুঝলে না তো? দাঁড়াও, বুঝিয়ে বলি তোমায়।” এই বলে ভুট্টা গুছিয়ে বসল আর দুলে দুলে বলতে শুরু করল। “আগেই বলেছি আমাদের ওখানে সবকিছুই এখানকার থেকে উলটো। ওখানে সবার জন্ম হয় একেবারে বড়ো অবস্থায়। মানে কেউ জন্মায় ষাট বছর বয়সে, কারও আশি, আবার কেউ বেশ ছোটো হয়ে জন্মায়, মানে পাঁচ, দশ, পনেরো, সতেরো এইরকম।
“জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায় সে কতদিন বাঁচবে। সেভাবে বয়স ছোটে উলটোদিকে। অর্থাৎ যেমন ধরো আমি। আমার জন্ম হয়েছিল ষাট বছর বয়সে। কিন্তু তারপর আর একষট্টি বাষট্টি হয়নি। ঊনষাট আটান্ন করে পিছিয়ে গেছে। মানে বয়স কমেছে। বয়স কমার সঙ্গে সঙ্গে দেহের আকার আয়তনটাও ক্রমশ ছোটো হয়ে গেছে। পাকা চুল কালো হয়ে গেছে, ফোকলা মাড়িতে দাঁত গজিয়েছে, এইসব আর কী।
“আবার, এখানে যেমন মানুষ পরিচয়হীন হয়ে জন্মায়, ওখানে কিন্তু তা নয়। মানুষ জন্মায় নাম নিয়ে, পরিচয় এবং পেশা নিয়ে। আস্তে আস্তে বয়স কমার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো লোপ পেতে থাকে। একেবারে ছোটো বয়সে তার আর নাম থাকে না। ঠিক সেইরকমভাবেই যখন সে জন্মায়, আগে থেকেই তার মাথায় অনেক জ্ঞান-ট্যান থাকে, তারপর কমতি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সে ভুলতে থাকে। এখানে যেমন মানুষ বড়ো হবার সঙ্গে সঙ্গে শিখতে থাকে।
“এখানে প্রতিযোগিতা কে কত শিখতে পারে, জানতে পারে। ওখানে তেমনি কে কত ভুলতে পারে। তাই তখন বলছিলুম, আমাদের দেশে তোমার মতো অঙ্কে কেউ চার পেলে তাকে মেধাবী বলে গণ্য করা হত।”
পিকুর বিস্ময়ের শেষ নেই। ছেলেটা কি সত্যি কথা বলছে? না বানিয়ে?
“আচ্ছা, ওখানে বুড়ো হয়ে গেলে, সরি, বাচ্চা হয়ে গেলে শেষে কী হয়? মরে যায়?”
“নাহ্‌, ওখানে মৃত্যু হয় না কারও। ওখানে জন্ম হয় মৃত মানুষের। আর পরের জন্মের জন্য প্রস্তুত হয়।”
পিকু একটু ইতস্তত করে বলল, “ইয়ে, একটু সহজ করে বলো না।”
ভুট্টা মিটমিট করে হেসে তাকায় পিকুর দিকে। বলে, “সিক্রেটটা তোমায় বলেই দিই। তোমায় বলতে ক্ষতি দেখছি না।”
“কী সিক্রেট?”
“এখানে মানুষ মারা গেলে তার সেই অবস্থাতে, সেই বয়সে, সেই বুদ্ধি নিয়ে, সেই পরিচয় নিয়েই জন্ম হয় আমাদের পৃথিবীতে। তারপর সেখানে চলে তার ছোটো হবার পালা। তাকে সবকিছু ভুলে যেতে হয়। এক্কেবারে ছোটো হয়ে গেলে, মানে তার যত আয়ু ছিল সেটা ফুরিয়ে গেলে তার আবার জন্ম হয় তোমাদের পৃথিবীতে। শিশু হিসেবে। আবার সে বড়ো হয়, নতুন পরিচয় পায়, নতুন অনেক কিছু শেখে, নতুনভাবে বাঁচে। তারপর মারা গেলে আবার চলে আসে আমাদের পৃথিবীতে। এভাবেই চলতে থাকে।”
পিকু ভাবল, তাহলে তো সে খারাপ নম্বর পায়নি। এই পৃথিবীতে না হোক, ভুট্টাদের পৃথিবীতে সেটা ভালো নিঃসন্দেহে। আর ভুট্টার কথা যদি সত্যি হয়, তবে সেও তো একদিন ওখানেই ছিল। সেও সেখান থেকেই এসেছে। তবে সেদিক থেকে দেখতে গেলে সে বেশ মেধাবী ছাত্র। মনখারাপের ভাবটা একেবারে কেটে যায় তার। নাহ্‌, কোথাও গিয়ে কাজ নেই। এখানেই থাকবে সে।
“এবার বাড়ি যাও। সন্ধে হয়ে এল। মা চিন্তা করছেন তোমার জন্য।” ভুট্টা তার কাঁধে হাত রাখে।
“আর তুমি?”
“আমিও ফিরে যাব আমার পৃথিবীতে।”
ওরা দু’জনেই ঢিপি থেকে নেমে দাঁড়ায়। হঠাৎ একটা প্রশ্ন আসে পিকুর মনে। বলে, “আচ্ছা, তোমার যখন জন্ম হয়েছিল, তখন কি তোমার নাম ভুট্টা ছিল?”
“না, অন্য নাম ছিল,” হেসে উত্তর দেয় ভুট্টা।
“তবে কী নাম?”
“দর্পনারায়ণ চৌধুরী।”
“বাপ রে, কী কঠিন নাম! এর চেয়ে ভুট্টাই ভালো।”
“হা, হা, হা। তার জন্যই ওটা বললুম। যাও এবার বাড়ি যাও।”
“আচ্ছা, আসি।”
পিকু বাড়ির দিকে পা বাড়াল। কয়েক পা হাঁটতে তার মনে হল, দর্পনারায়ণ চৌধুরী নামটা সে কোথায় যেন শুনেছে। বড্ড চেনা। সেকথা বলতেই সে পিছন ঘুরল। কিন্তু কেউ নেই, একদম ফাঁকা। ভুট্টা চলে গেছে।

বাড়ি ফিরতেই মা তাকে বলল, “এত দেরি করলি কেন? কোথায় গিয়েছিলি? নিশ্চয়ই মাঠে খেলতে গিয়েছিলি? তোকে নিয়ে আর পারি না। যা, হাতমুখ ধুয়ে আয়।”
সে ভিতরে গিয়ে দেখল খাটের উপর একটা চিঠি। স্কুলের চিঠি। তার উপরে বাবার নাম লেখা। এই রে! তার অঙ্কে চার পাওয়ার ঘটনাটা কি চিঠি লিখে জানাল বাবাকে? কী সর্বনাশ! তার কানটা আবার টনটন করে ওঠে। আর নিস্তার নেই। তাও সে মাকে সাহস করে জিজ্ঞেস করে চিঠিটার কথা। মা বলল, “তোদের স্কুলের প্রাক্তন হেড মাস্টারমশায়ের সোমবার মৃত্যুবার্ষিকী। তাই স্কুলে অনুষ্ঠান আছে। তোর বাবাকে যেতে বলেছে।”
পিকুর বাবা এই গ্রামের একমাত্র ডাক্তার। সৎ, ভালো মানুষ। সবাই খুব মান্যি করে। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান হয়। যাক! নিশ্চিন্ত। পিকু চিঠিটা খুলল। উপরে বড়ো বড়ো করে লেখা - ‘দর্পনারায়ণ চৌধুরী স্মৃতি পুরষ্কার বিতরণী’।
পিকুর ধাঁ করে মনে পড়ে গেল। আরে! এজন্যই নামটা এত চেনা লাগছিল তার। দর্পনারায়ণ চৌধুরী তাদের স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। তাঁকে পিকু কখনও চোখে দেখেনি। কারণ, তার জন্মের অনেক আগেই তিনি মারা গিয়েছেন। তবে প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে স্কুলে অনুষ্ঠান হয়। প্রত্যেক ক্লাসের ফার্স্ট বয়দের পুরষ্কার দেওয়া হয়। এবছর তাঁর তেরোতম মৃত্যুবার্ষিকী। চিঠি থেকে মুখ তুলল পিকু। ভুট্টার বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল তাঁর — “আমাদের হিসেবে দেখলে তোমার থেকে আমি মাত্র তিন বছরের বড়ো।”
তার থেকে তিন বছরের বড়ো মানে তেরো বছর। মানে তাদের স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক দর্পনারায়ণ চৌধুরী ভুট্টা নাম নিয়ে এসে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে খোশগল্প করে গেলেন? তার মানে ভুট্টা, ইয়ে, স্যার যা বলেছেন সব সত্যি?  হেডমাস্টারমশায় কোনওদিন মিথ্যে বলতেই পারেন না।
স্কুলের লাইব্রেরিতে টাঙানো তাঁর ছবিটা মনে পড়ে পিকুর। গোল মুখ, ফরসা রঙ, মাথায় টাক, চ্যাপটা নাকের উপর বসানো মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, পাতলা ঠোঁটে হাসির ঝিলিক দিচ্ছে। পিকু শুনতে পায় তিনি যেন ছবির ভিতর থেকেই বলছেন, “আমার নাম? উম্‌... ভুট্টা।”
_____
ছবিঃ সুজাতা ব্যানার্জী

গল্পের ম্যাজিক:: টু্ম্বার স্পেশাল প্রাইজ - জলি নন্দী ঘোষ


টু্ম্বার স্পেশাল প্রাইজ
জলি নন্দী ঘোষ

দারুণ দেখতে দাবার বোর্ডটা জন্মদিনে গিফট পেয়েছিল টুম্বা। দাবা খেলা মোটেও জানত না তখন ও। চকচকে সাদা আর কালো গুটিগুলো নিয়ে খেলত শুধু। তা দেখে ওর দাদু একদিন বলল, “এই খেলা এমনভাবে খেলতে হয় না দাদুভাই। বোর্ডের ওপরে নিয়ম মেনে গুটি সাজাতে হয় আগে। দুই দিকে দুই পক্ষ। মাঝখানে যুদ্ধক্ষেত্র।”
“যুদ্ধক্ষেত্র? তার মানে এটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা?” চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করে টুম্বা।
“হুম, খানিকটা ধরো তাই।”
“তারপর? যুদ্ধ কে আগে শুরু করবে?”
“সাদা সৈন্যদল মানে সাদা গুটির পক্ষ। এই যুদ্ধে আছেন রাজামশাই। আছেন মন্ত্রীমশাই। আছে সৈন্য। আর আছে হাতি, ঘোড়া, নৌকা এরা সব।”
“কী মজার! শেখাও আামাকে প্লিজ,” বায়না করে টুম্বা।
দাদু ওকে একটু একটু করে শেখায় দাবা খেলার কায়দা, কৌশল, নিয়মকানুন। দাদু আরও বলে, দাবা এমন একটি খেলা যা নিয়মিত অভ্যাসে ধৈর্য্য বাড়ে, মনসংযোগ বাড়ে, স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি ক্ষুরধার হয়।
সেই থেকে রোজ সন্ধেবেলা পড়াশোনা শেষ করে, দাদুর খাটের ওপর দাবার বোর্ড সাজিয়ে দাদুকে ডাকে টুম্বা, “দাদু কাম, লেট স্প্লে চেস্”। দাদু নাতি মিলে, জমিয়ে দাবা খেলে দু-তিন বোর্ড।
টুম্বার ভালো নাম মানে স্কুলের নাম হল ঐশিক। ঐশিক রায়। কলকাতার একটি নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে ও। টুম্বাকে যারা চেনে সব্বাই বলে টুম্বার মতো গুড বয় আর দুটি হয় না। এই বয়সেই এমন সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারে! ওর মিষ্টি গলার গান শুনলে যে কারোর মন ভালো হয়ে যায় নিমেষে। খুব ভালো ছবিও আঁকতে পারে ও। আবার লেখাপড়াতেও ভালো টুম্বা। প্রায় সব সাবজেক্টেই নাইন্টি পারসেন্ট মার্কস পায় ও। এই ছেলেকে সবাই গুড বয় বলবে না তো কি ও পাড়ার ভুলোকে বলবে?
কিন্তু সব সাবজেক্টে ভালো করলেও ম্যাথস টুম্বার একেবারেই ভালো লাগে না। অঙ্ক করতে বসলেই ওর মাথার মধ্যে গোলমাল হয়ে যায়। মায়ের সামনে যে অঙ্কটা এইমাত্র পুরো ঠিকঠাক করল, পরমুহূর্তেই সেটা ভুল করে ফেলে। এ নিয়ে তার মায়ের চিন্তার শেষ নেই। পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে চোখে জল চলে আসে টুম্বার মায়ের। ম্যাথসে ওনলি থার্টি সেভেন। ওর প্রত্যেকটা বন্ধু ওর থেকে বেশি পেয়েছে অঙ্কে। লজ্জায় মায়ের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। স্কুল থেকে ফিরে এসে অবধি মুখ ভার। টুম্বার বাবা খুবই পজিটিভ আর মজার মানুষ। রিপোর্ট কার্ড দেখে বকার বদলে আদর করে টুম্বাকে বলে, “ডোন্ট ওরি টুম্বা। শোন, তোর বয়সে একবার অঙ্কে আমি নয় পেয়েছিলাম একশোতে। সবাইকে যে অঙ্কে একশোয় একশো পেতে হবে তার মানে আছে? এই যে তুই অন্য সাবজেক্টে ভালো করেছিস, তা কিছু নয়? কত্ত সুন্দর গান গাইতে পারিস, ভালো আঁকতে পারিস, তার বেলা?” বাবার কথায় মুখে হাসি ফোটে টুম্বার। সত্যিই তো, ও তো অনেক কিছুই ভালো পারে। কই মা তো সেগুলো নিয়ে একটা কথাও বলে না। একবারও গুড বয় বলে না ওকে। সারাক্ষণ শুধু ম্যাথসে ভালো না করার জন্য বকেই যায়।
মায়ের চিন্তা বাড়তে থাকে। সেইসঙ্গে মনখারাপও। আর কিছুদিন পরেই টুম্বাদের স্কুলে অ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ডে। ওর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই প্রাইজ পাবে সেদিন। লাস্ট ইয়ারেও ফার্স্ট ফাইভ র‍্যাঙ্কে এসেছিল টুম্বা। প্রাইজ পেয়েছিল। কিন্তু এ বছর ম্যাথস-এর খারাপ মার্কস-এর জন্য ওর র‍্যাঙ্ক নেমে গেছে অনেক নিচে। কোনো প্রাইজই পাবে না ও। চোখ ফেটে জল আসে টুম্বার মায়ের। খুব কষ্ট হয় মনে। এ নিয়ে অবশ্য টুম্বার কোনো হেলদোল নেই। দিব্যি আছে ও। ভাবছে আর বলছেও, বন্ধুদের সঙ্গে সে প্রাইজ পাবে এবারও। লাস্ট ইয়ারের মানে ক্লাস থ্রি-এর আ্যানুয়ালে ক্লাস টিচার সুজাতা ম্যাম-এর হাত থেকে প্রাইজ নেওয়ার ছবিটা ল্যামিনেট করে ড্রয়িংরুমের শেলফে রাখা আছে। প্রাইজটাও। সেটা দেখিয়ে টুম্বা ওর মাকে বলে, “এবারের প্রাইজটাও কি এর পাশেই রাখবে মা? দুটো প্রাইজ একসঙ্গে। ইট উইল বি জাস্ট গ্রেট। না মা?”
আ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ডে-তে আ্যাকাডেমিক, স্পোর্টস, এক্সট্রা কারিকুলার, স্পেশাল প্রাইজ দেওয়ার পাশাপাশি নানান রকম প্রোগ্রামও হয়ে থাকে টুম্বাদের স্কুলে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয় নিশ্চয়’ গানটা কোরাসে গাইবে টুম্বা। মিউজিক টিচার ক্লাস ফোর থেকে একমাত্র টুম্বাকেই সিলেক্ট করেছেন। স্কুলে রিহার্সাল চলছে পুরোদমে। ওর বাবা অফিস যাবার পথে ওকে স্কুলে ড্রপ করে দেয়। তিন ঘণ্টা পর ওর মা গিয়ে নিয়ে আসে ওকে। বাড়িতেও দাদুর কাছে প্র্যাকটিস করছে টুম্বা। দাদু একটা নিউজপেপার রোল করে টুম্বার মুখের সামনে ধরে আর বলে, “এবার আপনাদের সামনে গান গেয়ে শোনাচ্ছেন ফেমাস সিঙ্গার শ্রীমান ঐশিক রা...য়।” মাথা নেড়ে নেড়ে, ছোট্ট নাকটা ফুলিয়ে, হাসি হাসি মুখে গান গায় বিখ্যাত গায়ক টুম্বা। ওর মিষ্টি সুর ছড়িয়ে পড়ে বাড়ির প্রতিটি কোনায়, ভেসে বেড়ায় বাতাসে। টুম্বাদের বাড়ির গেটের বাঁ দিকে বসে থাকা অন্ধ ভিখিরিটা ঘাড় উঁচিয়ে শোনে টুম্বার গান। শুকনো মুখে হাসি ফোটে ওর। ব্যালকনিতে রাখা টবের গাছগুলোও মাথা দোলায় গানের তালে। ভালো লাগা জানায়।
পরদিন প্রোগ্রাম। ইনভিটেশন কার্ডের নিয়ম অনুযায়ী বাবা মা আর দাদু স্কুলে যাবে টুম্বার সঙ্গে। গান গাওয়ার জন্য স্পেশাল ড্রেস পরবে টুম্বা। সাদা পাঞ্জাবি, সাদা চুড়িদার আর জমকালো নকশাদার জ্যাকেট। কেনা হয়েছে সব কিছু। সবই হচ্ছে, শুধু টুম্বার মায়ের মন থেকে কষ্টটা কিছুতেই যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার টুম্বার কয়েকজন বন্ধুর মা ফোন করে বা হোয়াটসআ্যাপে মেসেজ করে জানতে চেয়েছে টুম্বা এবার প্রাইজ পাচ্ছে কিনা। কেউ আবার জিজ্ঞেস করেছে, কেন এবার টুম্বা প্রাইজ পেল না। কেউ সিমপ্যাথি দেখিয়ে বলেছে, টুম্বা প্রাইজ না পাওয়ায় তাদের খুউব খারাপ লাগছে। কেউ আবার সাজেশন দিয়েছে... কী করলে, কোন টিচারের কাছে ম্যাথসের টিউশন নিলে টুম্বা নেক্সট ক্লাসে ঠিকই আবার ভালো মার্কস পাবে ম্যাথস-এ।
সেন্ট মারলিন স্কুলের অডিটোরিয়াম উপচে পড়ছে স্টুডেন্ট আর গার্জিয়ানদের ভিড়ে। উদ্বোধনী সংগীত শেষ হয়েছে সবে। এবার প্রিন্সিপাল ম্যামের স্পিচ। মন দিয়ে শুনছে সবাই। আাশপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো কথা কানে আসে টুম্বার মায়ের... ‘আরে, ওই যে দেখছ না, ওরাই তো ঐশিকের বাবা-মা। ইশ্, বেচারা! কী লজ্জা বলো তো ওদের? হি হ্যাজ গট সো..ও পুওর মার্কস ইন ম্যাথস! নো র‍্যাঙ্ক, নো প্রাইজ। ও মাই গুডনেস!’
একে একে সব বিভাগের প্রাইজ দেওয়া শেষ হল। বাকি শুধু আর একটি মাত্র বিভাগ। স্পেশাল প্রাইজ বিভাগ। পড়াশোনা, খেলাধুলো, গানবাজনা, আাঁকাজোকা, ক্রাফট এসব ছাড়াও বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে যারা অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তাদেরকেই দেওয়া হয় এই বিশেষ প্রাইজ। সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে, কারা এই প্রাইজ পেল তা জানার জন্য। প্রিন্সিপাল ম্যাম নিজে বিশেষ পুরস্কার প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেন আর তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চিফ গেস্ট স্বয়ং। এবারের চিফ গেস্ট খুবই বিখ্যাত মানুষ। ইন্ডিয়ান চেস গ্র্যান্ডমাস্টার অর্ক গাঙ্গুলি। টুম্বাদের স্কুলে নতুন চেস আ্যাকাডেমি খুলতে চলেছে কিছুদিনের মধ্যেই। সেখানে চিফ ট্রেনার হিসেবে জয়েন করবেন উনি।
প্রিন্সিপাল ম্যাম নাম ঘোষণা করছেন। এইবারে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে মাত্র একজন স্টুডেন্ট। সে হল ক্লাস ফোর-এর ঐশিক রায়। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না টুম্বার মায়ের। সে কি ভুল শুনছে? টুম্বা এতক্ষণ গম্ভীর মুখে বসেছিল চুপচাপ, বাবা-মায়ের মাঝখানে। প্রিন্সিপাল ম্যামের মুখে নিজের নাম শুনে ও ঝটপট উঠে পড়েছে সিট ছেড়ে আর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেছে স্টেজের দিকে। স্কুলের একজন আন্টি ওকে হাত ধরে স্টেজে তুলে দেয়। এগিয়ে আসেন প্রিন্সিপাল ম্যাম। বুকে জড়িয়ে ধরেন টুম্বাকে। বলেন, “উই আর প্রাউড অফ ইউ মাই চাইল্ড। গড ব্লেস ইউ।” গ্র্যান্ডমাস্টার অর্ক গাঙ্গুলি আদর করে প্রাইজ আর সার্টিফিকেট তুলে দেন টুম্বার হাতে। ছোট্ট দুই হাতে সেগুলো বুকে চেপে ধরে টুম্বা। চোখে মুখে খুশি উপচে পড়ে ওর। তারপর প্রিন্সিপাল ম্যাম সংক্ষেপে বলেন কী কারণে ঐশিককে এই বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হল।
কোনো একদিন টুম্বার মা জ্যামে আটকে পড়ে ওকে নিতে স্কুলে পৌঁছোয় বেশ দেরি করে। টুম্বাকে রিসেপশনে বসিয়ে রাখা হয়। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও মা না পৌঁছানোয় অধৈর্য্য হয়ে টুম্বা বাইরে বেরিয়ে আসে। বেশিরভাগ স্টুডেন্ট বাড়ি চলে যাওয়ায় স্কুল প্রায় ফাঁকা তখন। সবার নজর এড়িয়ে কী করে টুম্বা মেইন গেটের কাছাকাছি চলে যায়। দরোয়ান অবশ্য গেটেই ছিল, আর গেটে তালাও লাগানো ছিল। সে সময় হঠাৎ করে একজন ছেঁড়াখোঁড়া শাড়ি পরা, ভিখারির মতো চেহারার মহিলা গেটের সামনে আসে। তার কোলে রোগা-সোগা ছোটো একটা বাচ্চা। কড়া রোদ্দুরেও বাচ্চাটার গায়ে কোনো জামা ছিল না, আর দেখে মনে হচ্ছিল ও খুব অসুস্থ। দরোয়ান ওকে দেখতে পেয়েই ‘কী চাই এখানে?’ করে ছুটে যায়। মহিলা করুণ মুখে বলে, ওর বাচ্চার খুব অসুখ, আর খিদেও পেয়েছে। কিছু টাকা পেলে ওর চিকিৎসা করাতে পারে, খাবারও কিনতে পারে। হাই মাই করে দরোয়ান বলে, এটা স্কুল। পড়ালেখা করার জায়গা। ভিক্ষা করার জায়গা নয়। এমন সময়ে হঠাৎ দরোয়ানের ফোনটা বেজে ওঠে। কথা বলতে একপাশে সরে যায় ও। দূর থেকে এই ঘটনা দেখছিল টুম্বা। দরোয়ান সরে যেতেই গেটের একেবারে সামনে চলে আসে টুম্বা। মহিলাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার কী চাই?” “কিচু নয় বাবা,” বলে চলে যেতে চায় সে। টুম্বা ওকে ডাকে। বলে, “আমি জানি, তোমার বাচ্চার খুব অসুখ। তোমার টাকা চাই, খাবার চাই। কিন্তু আমার তো টাকা নেই। এগুলোই আছে শুধু। তুমি এগুলো নাও।” নিজের ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করে ওর না খাওয়া কেক, বিস্কুট, আপেল সব দিয়ে দেয় গরিব মহিলাকে। জলের বোতলটাও দিয়ে দেয়। ওর সুইমিং স্যুট, স্পেয়ার জামা-প্যান্টটা অবধি ব্যাগ থেকে বের করে ওর হাতে দেয়। মহিলা প্রথমটায় নিতে রাজি হয় না। টুম্বা খুব জোর করলে শেষমেষ হাত পেতে জিনিসগুলো নেয়। প্রাণভরে আাশির্বাদ করে টুম্বাকে। তারপর চলে যায়।
পুরো ব্যাপারটাই দারোয়ান দেখতে পায়। ছোটো একটা বাচ্চার মনে মানুষের প্রতি এমন দয়ামায়া দেখে খুবই অবাক হয় সে, সমস্ত ঘটনা ভাইস প্রিন্সিপালকে জানায়। তারপরই স্কুল কর্তৃপক্ষ টুম্বাকে স্পেশাল প্রাইজের জন্য সিলেক্ট করে।
চিফ গেস্ট অর্ক গাঙ্গুলি টুম্বার কচি হাতটা তুলে ধরেছেন। স্টুডেন্টদের উদ্দেশে বলছেন, “ডিয়ার চিলড্রেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো মার্কস পাওয়াটাই সব নয়। সবার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে তোমাদের। ঐশিকের কাছে শেখা উচিত আমাদের সব্বার। হি হ্যাজ মেড আস অল প্রাউড।”
বুকটা ভরে যাচ্ছিল টুম্বার মায়ের। ম্যাথসে খারাপ নাম্বার পাওয়ার কষ্টটা ধুয়েমুছে যাচ্ছিল তার মন থেকে। মনে পড়ে যাচ্ছিল তার... টিফিন বক্স, সুইমিং স্যুট, স্পেয়ার জামা হারানোর জন্য সেদিন খুব বকেছিলেন টুম্বাকে। মেরেওছিলেন। চুপচাপ মার খেয়েছিল ও। একটা কথাও বলেনি।
স্টেজ থেকে নেমে আসে টুম্বা। ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে টুম্বার মা। আর টুম্বা? উজ্জ্বল হাসিতে ভরে ওঠে ওর মিষ্টি মুখখানা। সেই হাসির আলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ঝলমল করে ওঠে ওর বাবা, মা, দাদু সব্বার মন।
_____
ছবিঃ সুজাতা ব্যানার্জী