Showing posts with label জলি নন্দীঘোষ. Show all posts
Showing posts with label জলি নন্দীঘোষ. Show all posts

ছড়া-কবিতা:: একলা মেয়ে ফসল কাটে - উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ; অনুবাদঃ জলি নন্দীঘোষ


একলা মেয়ে ফসল কাটে
উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ
অনুবাদঃ জলি নন্দীঘোষ

ওই যে দেখ একলা মেয়ে...
ফসল কাটে শস্য খেতে।
কাটছে ফসল, গাইছে গান,
মন কেমনের বিধুর তান...
একটু থামো, নয় চলে যাও
মৃদু পায়েশোনো, শুনতে কি পাও?
ওই পাহাড়ি মেয়ের সুর ভেসে যায়...
দূর... দূর... কোন্ সুদূরের বিস্তীর্ণ উপত্যকায়
কোনো নাইটিঙ্গেল পাখি গেয়েছিল কোনোদিন...
এমন মন ছোঁয়া ঘরে ফেরার গান?
শুনেছিল কোনো ক্লান্ত যাযাবর, আরব বেদুইন?
এমন মাতাল করা সুর-তান...
বসন্তদিনেও গায়নি কখনও কোকিল পাখিটি,
উতলা এমন হয়নি কখনও প্রাণ
ঘুম-সমুদ্রে নীরবতা ভাঙে, কোলাহল জেগে ওঠে,
সুদূরের দ্বীপে সুরের প্লাবন, ঢেউগুলি ভাঙে তটে...
জানো যদি বলো দেখি
কী গান গাইছে পাখি?
বিষাদের স্মৃতি নাকি কোনো যুদ্ধের গান?
নাকি অতি সাধারণ দিনযাপনের ছন্দ-লয়-তান?
এমনকি হতে পারে, ও গাইছে... জাগতিক কোনো স্মৃতি-গল্প-কথা?
যা ছিল, যা হবে এ-দুইয়ের মিলমিশে গাঁথা?
কুমারী মেয়ে, কী গান তুমি গাইলে?
যা কিছু হোক না বিষয়...
তোমার শস্য তোলার অশেষ গীত
ছেয়ে গেল ধরাতলে
ফিরতি পথে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়াই,
নিশ্চুপ মন, মুগ্ধ হৃদয়ে, শুনি শুধু শুনে যাই...
পাহাড়ের ঢাল পেরিয়ে এসেছি,
গান হয়ে গেছে শেষ...
বুকে তবু বাজে সুর-মুর্ছনা
রয়ে গেছে ছন্দ-মেদুর রেশ...!
--------
মূল ইংরেজি কবিতাঃ ‘Solitary Reaper’ - William Wordsworth
ছবিঃ আন্তর্জাল

গল্পের ম্যাজিক:: টু্ম্বার স্পেশাল প্রাইজ - জলি নন্দী ঘোষ


টু্ম্বার স্পেশাল প্রাইজ
জলি নন্দী ঘোষ

দারুণ দেখতে দাবার বোর্ডটা জন্মদিনে গিফট পেয়েছিল টুম্বাদাবা খেলা মোটেও জানত না তখন ওচকচকে সাদা আর কালো গুটিগুলো নিয়ে খেলত শুধুতা দেখে ওর দাদু একদিন বলল, “এই খেলা এমনভাবে খেলতে হয় না দাদুভাইবোর্ডের ওপরে নিয়ম মেনে গুটি সাজাতে হয় আগেদুই দিকে দুই পক্ষমাঝখানে যুদ্ধক্ষেত্র।
যুদ্ধক্ষেত্র? তার মানে এটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা?” চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করে টুম্বা
হুম, খানিকটা ধরো তাই
তারপর? যুদ্ধ কে আগে শুরু করবে?”
সাদা সৈন্যদল মানে সাদা গুটির পক্ষ এই যুদ্ধে আছেন রাজামশাই আছেন মন্ত্রীমশাই আছে সৈন্য আর আছে হাতি, ঘোড়া, নৌকা এরা সব
কী মজার! শেখাও আামাকে প্লিজ, বায়না করে টুম্বা
দাদু ওকে একটু একটু করে শেখায় দাবা খেলার কায়দা, কৌশল, নিয়মকানুন দাদু আরও বলে, দাবা এমন একটি খেলা যা নিয়মিত অভ্যাসে ধৈর্য্য বাড়ে, মনসংযোগ বাড়ে, স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি ক্ষুরধার হয়
সেই থেকে রোজ সন্ধেবেলা পড়াশোনা শেষ করে, দাদুর খাটের ওপর দাবার বোর্ড সাজিয়ে দাদুকে ডাকে টুম্বা, “দাদু কাম, লেট স্প্লে চেস্ দাদু নাতি মিলে, জমিয়ে দাবা খেলে দু-তিন বোর্ড
টুম্বার ভালো নাম মানে স্কুলের নাম হল ঐশিকঐশিক রায় কলকাতার একটি নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে ও টুম্বাকে যারা চেনে সব্বাই বলে টুম্বার মতো গুড বয় আর দুটি হয় না এই বয়সেই এমন সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারে! ওর মিষ্টি গলার গান শুনলে যে কারোর মন ভালো হয়ে যায় নিমেষেখুব ভালো ছবিও আঁকতে পারে ও আবার লেখাপড়াতেও ভালো টুম্বা প্রায় সব সাবজেক্টেই নাইন্টি পারসেন্ট মার্কস পায় ও এই ছেলেকে সবাই গুড বয় বলবে না তো কি ও পাড়ার ভুলোকে বলবে?
কিন্তু সব সাবজেক্টে ভালো করলেও ম্যাথস টুম্বার একেবারেই ভালো লাগে না অঙ্ক করতে বসলেই ওর মাথার মধ্যে গোলমাল হয়ে যায় মায়ের সামনে যে অঙ্কটা এইমাত্র পুরো ঠিকঠাক করল, পরমুহূর্তেই সেটা ভুল করে ফেলে এ নিয়ে তার মায়ের চিন্তার শেষ নেইপরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে চোখে জল চলে আসে টুম্বার মায়েরম্যাথসে ওনলি থার্টি সেভেন ওর প্রত্যেকটা বন্ধু ওর থেকে বেশি পেয়েছে অঙ্কে লজ্জায় মায়ের মাথা হেঁট হয়ে গেছে স্কুল থেকে ফিরে এসে অবধি মুখ ভারটুম্বার বাবা খুবই পজিটিভ আর মজার মানুষরিপোর্ট কার্ড দেখে বকার বদলে আদর করে টুম্বাকে বলে, “ডোন্ট ওরি টুম্বা শোন, তোর বয়সে একবার অঙ্কে আমি নয় পেয়েছিলাম একশোতে সবাইকে যে অঙ্কে একশোয় একশো পেতে হবে তার মানে আছে? এই যে তুই অন্য সাবজেক্টে ভালো করেছিস, তা কিছু নয়? কত্ত সুন্দর গান গাইতে পারিস, ভালো আঁকতে পারিস, তার বেলা?” বাবার কথায় মুখে হাসি ফোটে টুম্বার সত্যিই তো, ও তো অনেক কিছুই ভালো পারে কই মা তো সেগুলো নিয়ে একটা কথাও বলে না একবারও গুড বয় বলে না ওকে সারাক্ষণ শুধু ম্যাথসে ভালো না করার জন্য বকেই যায়
মায়ের চিন্তা বাড়তে থাকে সেইসঙ্গে মনখারাপও আর কিছুদিন পরেই টুম্বাদের স্কুলে অ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ডে ওর বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই প্রাইজ পাবে সেদিনলাস্ট ইয়ারেও ফার্স্ট ফাইভ র‍্যাঙ্কে এসেছিল টুম্বা প্রাইজ পেয়েছিল কিন্তু এ বছর ম্যাথস-এর খারাপ মার্কস-এর জন্য ওর র‍্যাঙ্ক নেমে গেছে অনেক নিচে কোনো প্রাইজই পাবে না ও চোখ ফেটে জল আসে টুম্বার মায়ের খুব কষ্ট হয় মনে এ নিয়ে অবশ্য টুম্বার কোনো হেলদোল নেইদিব্যি আছে ও ভাবছে আর বলছেও, বন্ধুদের সঙ্গে সে প্রাইজ পাবে এবারও লাস্ট ইয়ারের মানে ক্লাস থ্রি-এর আ্যানুয়ালে ক্লাস টিচার সুজাতা ম্যাম-এর হাত থেকে প্রাইজ নেওয়ার ছবিটা ল্যামিনেট করে ড্রয়িংরুমের শেলফে রাখা আছে প্রাইজটাওসেটা দেখিয়ে টুম্বা ওর মাকে বলে,এবারের প্রাইজটাও কি এর পাশেই রাখবে মা? দুটো প্রাইজ একসঙ্গে ইট উইল বি জাস্ট গ্রেট না মা?”
আ্যানুয়াল প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন ডে-তে আ্যাকাডেমিক, স্পোর্টস, এক্সট্রা কারিকুলার, স্পেশাল প্রাইজ দেওয়ার পাশাপাশি নানান রকম প্রোগ্রামও হয়ে থাকে টুম্বাদের স্কুলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয় নিশ্চয়’ গানটা কোরাসে গাইবে টুম্বা মিউজিক টিচার ক্লাস ফোর থেকে একমাত্র টুম্বাকেই সিলেক্ট করেছেন স্কুলে রিহার্সাল চলছে পুরোদমে ওর বাবা অফিস যাবার পথে ওকে স্কুলে ড্রপ করে দেয় তিন ঘণ্টা পর ওর মা গিয়ে নিয়ে আসে ওকে বাড়িতেও দাদুর কাছে প্র্যাকটিস করছে টুম্বা দাদু একটা নিউজপেপার রোল করে টুম্বার মুখের সামনে ধরে আর বলে, এবার আপনাদের সামনে গান গেয়ে শোনাচ্ছেন ফেমাস সিঙ্গার শ্রীমান ঐশিক রা... মাথা নেড়ে নেড়ে, ছোট্ট নাকটা ফুলিয়ে, হাসি হাসি মুখে গান গায় বিখ্যাত গায়ক টুম্বা ওর মিষ্টি সুর ছড়িয়ে পড়ে বাড়ির প্রতিটি কোনায়, ভেসে বেড়ায় বাতাসে টুম্বাদের বাড়ির গেটের বাঁ দিকে বসে থাকা অন্ধ ভিখিরিটা ঘাড় উঁচিয়ে শোনে টুম্বার গানশুকনো মুখে হাসি ফোটে ওর ব্যালকনিতে রাখা টবের গাছগুলোও মাথা দোলায় গানের তালে ভালো লাগা জানায়
পরদিন প্রোগ্রাম ইনভিটেশন কার্ডের নিয়ম অনুযায়ী বাবা মা আর দাদু স্কুলে যাবে টুম্বার সঙ্গে গান গাওয়ার জন্য স্পেশাল ড্রেস পরবে টুম্বাসাদা পাঞ্জাবি, সাদা চুড়িদার আর জমকালো নকশাদার জ্যাকেট কেনা হয়েছে সব কিছু সবই হচ্ছে, শুধু টুম্বার মায়ের মন থেকে কষ্টটা কিছুতেই যাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার টুম্বার কয়েকজন বন্ধুর মা ফোন করে বা হোয়াটসআ্যাপে মেসেজ করে জানতে চেয়েছে টুম্বা এবার প্রাইজ পাচ্ছে কিনা কেউ আবার জিজ্ঞেস করেছে, কেন এবার টুম্বা প্রাইজ পেল না কেউ সিমপ্যাথি দেখিয়ে বলেছে, টুম্বা প্রাইজ না পাওয়ায় তাদের খুউব খারাপ লাগছেকেউ আবার সাজেশন দিয়েছে... কী করলে, কোন টিচারের কাছে ম্যাথসের টিউশন নিলে টুম্বা নেক্সট ক্লাসে ঠিকই আবার ভালো মার্কস পাবে ম্যাথস-এ
সেন্ট মারলিন স্কুলের অডিটোরিয়াম উপচে পড়ছে স্টুডেন্ট আর গার্জিয়ানদের ভিড়ে উদ্বোধনী সংগীত শেষ হয়েছে সবে এবার প্রিন্সিপাল ম্যামের স্পিচমন দিয়ে শুনছে সবাইআাশপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো কথা কানে আসে টুম্বার মায়ের... ‘আরে, ওই যে দেখছ না, ওরাই তো ঐশিকের বাবা-মা ইশ্, বেচারা! কী লজ্জা বলো তো ওদের? হি হ্যাজ গট সো..ও পুওর মার্কস ইন ম্যাথস! নো র‍্যাঙ্ক, নো প্রাইজও মাই গুডনেস!’
একে একে সব বিভাগের প্রাইজ দেওয়া শেষ হল বাকি শুধু আর একটি মাত্র বিভাগস্পেশাল প্রাইজ বিভাগ পড়াশোনা, খেলাধুলো, গানবাজনা, আাঁকাজোকা, ক্রাফট এসব ছাড়াও বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে যারা অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তাদেরকেই দেওয়া হয় এই বিশেষ প্রাইজ সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে, কারা এই প্রাইজ পেল তা জানার জন্যপ্রিন্সিপাল ম্যাম নিজে বিশেষ পুরস্কার প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেন আর তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চিফ গেস্ট স্বয়ংএবারের চিফ গেস্ট খুবই বিখ্যাত মানুষইন্ডিয়ান চেস গ্র্যান্ডমাস্টার অর্ক গাঙ্গুলি টুম্বাদের স্কুলে নতুন চেস আ্যাকাডেমি খুলতে চলেছে কিছুদিনের মধ্যেইসেখানে চিফ ট্রেনার হিসেবে জয়েন করবেন উনি
প্রিন্সিপাল ম্যাম নাম ঘোষণা করছেন এইবারে বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে মাত্র একজন স্টুডেন্টসে হল ক্লাস ফোর-এর ঐশিক রায় নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না টুম্বার মায়ের সে কি ভুল শুনছে? টুম্বা এতক্ষণ গম্ভীর মুখে বসেছিল চুপচাপ, বাবা-মায়ের মাঝখানে প্রিন্সিপাল ম্যামের মুখে নিজের নাম শুনে ও ঝটপট উঠে পড়েছে সিট ছেড়ে আর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেছে স্টেজের দিকেস্কুলের একজন আন্টি ওকে হাত ধরে স্টেজে তুলে দেয়এগিয়ে আসেন প্রিন্সিপাল ম্যাম বুকে জড়িয়ে ধরেন টুম্বাকে বলেন,উই আর প্রাউড অফ ইউ মাই চাইল্ড গড ব্লেস ইউ।গ্র্যান্ডমাস্টার অর্ক গাঙ্গুলি আদর করে প্রাইজ আর সার্টিফিকেট তুলে দেন টুম্বার হাতে ছোট্ট দুই হাতে সেগুলো বুকে চেপে ধরে টুম্বাচোখে মুখে খুশি উপচে পড়ে ওর তারপর প্রিন্সিপাল ম্যাম সংক্ষেপে বলেন কী কারণে ঐশিককে এই বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হল
কোনো একদিন টুম্বার মা জ্যামে আটকে পড়ে ওকে নিতে স্কুলে পৌঁছোয় বেশ দেরি করে টুম্বাকে রিসেপশনে বসিয়ে রাখা হয় অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও মা না পৌঁছানোয় অধৈর্য্য হয়ে টুম্বা বাইরে বেরিয়ে আসে বেশিরভাগ স্টুডেন্ট বাড়ি চলে যাওয়ায় স্কুল প্রায় ফাঁকা তখন সবার নজর এড়িয়ে কী করে টুম্বা মেইন গেটের কাছাকাছি চলে যায় দরোয়ান অবশ্য গেটেই ছিল, আর গেটে তালাও লাগানো ছিল সে সময় হঠাৎ করে একজন ছেঁড়াখোঁড়া শাড়ি পরা, ভিখারির মতো চেহারার মহিলা গেটের সামনে আসে তার কোলে রোগা-সোগা ছোটো একটা বাচ্চা কড়া রোদ্দুরেও বাচ্চাটার গায়ে কোনো জামা ছিল না, আর দেখে মনে হচ্ছিল ও খুব অসুস্থদরোয়ান ওকে দেখতে পেয়েই ‘কী চাই এখানে?’ করে ছুটে যায় মহিলা করুণ মুখে বলে, ওর বাচ্চার খুব অসুখ, আর খিদেও পেয়েছে কিছু টাকা পেলে ওর চিকিৎসা করাতে পারে, খাবারও কিনতে পারে হাই মাই করে দরোয়ান বলে, এটা স্কুলপড়ালেখা করার জায়গাভিক্ষা করার জায়গা নয় এমন সময়ে হঠাৎ দরোয়ানের ফোনটা বেজে ওঠেকথা বলতে একপাশে সরে যায় ও দূর থেকে এই ঘটনা দেখছিল টুম্বাদরোয়ান সরে যেতেই গেটের একেবারে সামনে চলে আসে টুম্বামহিলাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার কী চাই?” “কিচু নয় বাবা,বলে চলে যেতে চায় সে টুম্বা ওকে ডাকে বলে, আমি জানি, তোমার বাচ্চার খুব অসুখতোমার টাকা চাই, খাবার চাই কিন্তু আমার তো টাকা নেই এগুলোই আছে শুধুতুমি এগুলো নাও। নিজের ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করে ওর না খাওয়া কেক, বিস্কুট, আপেল সব দিয়ে দেয় গরিব মহিলাকে জলের বোতলটাও দিয়ে দেয় ওর সুইমিং স্যুট, স্পেয়ার জামা-প্যান্টটা অবধি ব্যাগ থেকে বের করে ওর হাতে দেয় মহিলা প্রথমটায় নিতে রাজি হয় না টুম্বা খুব জোর করলে শেষমেষ হাত পেতে জিনিসগুলো নেয়প্রাণভরে আাশির্বাদ করে টুম্বাকেতারপর চলে যায়
পুরো ব্যাপারটাই দারোয়ান দেখতে পায়ছোটো একটা বাচ্চার মনে মানুষের প্রতি এমন দয়ামায়া দেখে খুবই অবাক হয় সে, সমস্ত ঘটনা ভাইস প্রিন্সিপালকে জানায় তারপরই স্কুল কর্তৃপক্ষ টুম্বাকে স্পেশাল প্রাইজের জন্য সিলেক্ট করে
চিফ গেস্ট অর্ক গাঙ্গুলি টুম্বার কচি হাতটা তুলে ধরেছেন স্টুডেন্টদের উদ্দেশে বলছেন,ডিয়ার চিলড্রেন, শুধু পরীক্ষায় ভালো মার্কস পাওয়াটাই সব নয় সবার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে তোমাদেরঐশিকের কাছে শেখা উচিত আমাদের সব্বার হি হ্যাজ মেড আস অল প্রাউড
বুকটা ভরে যাচ্ছিল টুম্বার মায়েরম্যাথসে খারাপ নাম্বার পাওয়ার কষ্টটা ধুয়েমুছে যাচ্ছিল তার মন থেকেমনে পড়ে যাচ্ছিল তার... টিফিন বক্স, সুইমিং স্যুট, স্পেয়ার জামা হারানোর জন্য সেদিন খুব বকেছিলেন টুম্বাকে মেরেওছিলেনচুপচাপ মার খেয়েছিল ও একটা কথাও বলেনি
স্টেজ থেকে নেমে আসে টুম্বা ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে টুম্বার মা আর টুম্বা? উজ্জ্বল হাসিতে ভরে ওঠে ওর মিষ্টি মুখখানা সেই হাসির আলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকেঝলমল করে ওঠে ওর বাবা, মা, দাদু সব্বার মন
_____
ছবিঃ সুজাতা ব্যানার্জী

আমার ছোটোবেলা:: সোনালি সেই দিনের কথা - জলি নন্দী ঘোষ


সোনালি সেই দিনের কথা
জলি নন্দী ঘোষ

ছোটোবেলা মানেই পড়ায় ফাঁকি,
সিলেবাস ভুলে অঙ্ক খাতায়
আকাশ-পাহাড়-ঝর্ণা আঁকি;
সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেয়েছি
সেই কথাটি লুকিয়ে রাখি -
ছোটোবেলা মানে একটা পপিন্স লজেন্সের জন্য
ভাইয়ের সাথে খুনসুটি,
ঝগড়া আর চিমটি কাটাকাটি...

ছোটোবেলার স্মৃতির ভাঁড়ার ঘরে উঁকি দিলে, এরকম কত যে মজার স্মৃতি তিড়িং-বিড়িং করে ভিড় জমায় মনের দোরগোড়ায়! কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি! তারই মধ্যে মজার কিছু ঘটনার সোনাঝরা স্মৃতি ভাগ করে নিলাম প্রিয় ম্যাজিক ল্যাম্পের সঙ্গে
আমার বড়ো হয়ে ওঠা যৌথ পরিবারে দাদু, বাবা-মা, দুই কাকু, দুই কাকিমা, আমরা দু’ভাই-বোন আর চার খুড়তুতো ভাইবোন একসঙ্গেখুব আদর পাওয়া, আনন্দ, মজা, হই-হুল্লোড় যেমন ছিল, বজ্র আঁটুনি টাইপ শাসনও ছিল তেমনই পান থেকে চুন খসলেই পেতে হত শাস্তি শাস্তি দেওয়ার খুব কমন একটা পদ্ধতি ছিল যেটা বাবা ও দুই কাকু প্রয়োগ করত আমাদের ছ’জনের ওপর বাইরের রোয়াকে নিয়ে গিয়ে বাড়িভর্তি লোক, তিন-চারজন কাজের লোক, বাড়িতে আাসা বাইরের লোক... সব্বার সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিত আর মুখে বার বার বলতে হত -এই কাজ জীবনে আর করব নাআমরা স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম কান ধরে আর ওই কথাটা বিড় বিড় করতে করতে, চোখ পিট পিট করে দেখতাম কে কে দেখছে আমাদের
সন্ধেবেলায় এক খাটে ছ’জন একসঙ্গে পড়তে বসতাম বাবা পড়াতেন আমাদের সামনে একখানা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে পড়া শুরু হত অঙ্ক দিয়েসব্বাইকে দশটা করে অঙ্ক করতে দিয়ে বাবা মুখের সামনে পেপার খুলে বসতেন পেপারের আড়ালে বাবার মুখ ঢাকা পড়ে যাওয়ামাত্র আমরা এ ওর হাঁটু ঠেলাঠেলি শুরু করে দিতামপ্রত্যেকের অভিযোগ, অন্যজন তার চাইতে বেশি জায়গা নিয়েছে বসতে টেরও পেতাম না, পেপারের দেওয়ালের ও প্রান্ত থেকে বাবা সব শুনছেন চুপটি করে যখন টের পেতাম, ততক্ষণে যারা একেবারে সামনের দিকে বসেছে তারা খান দুই স্কেলপেটা খেয়ে ফেলেছে স্যাঁট স্যাঁট করে তারপর, বলাই বাহুল্য... যারা পেটানি খেল তাদের চাপা কান্নার ফ্যাঁচ-ফোঁচ, আর যারা পেটানি খেল না তাদের মাপা হাসির খুক খুক সুরের মিলিত ধারায় বইত অঙ্ক ক্লাসের বাকি সময়টুকু
ভাইবোনদের মধ্যে আমি ছিলাম সবার থেকে বড়ো তারপর ভাইএইটে ওঠার পর আর সবার সঙ্গে নয় ভাই আর আমি একটা আলাদা ঘরে পড়তাম দোতলায় সেও এক মজার অভিজ্ঞতা! দু’জনকে নতুন খাতা দিয়ে বাবা বলতেন, কম্পিটিশন হোক যে আগে খাতা শেষ করতে পারবে সে পাবে দারুণ একটা উইলসন ফাউন্টেন পেন ভাই ছিল অঙ্কের জাহাজ ঝড়ের গতিতে অঙ্ক করে খাতা ভরিয়ে তুলত ও আমি একটু চালাকি করতামমাঝে মাঝে পাতা ছিঁড়ে দিতাম খাতার তারপর ভায়ের আগেই খাতা শেষ করে ফেলতাম বাবা খুশি হয়ে প্রাইজ তুলে দিতেন আমার হাতে সারা বাড়ি ঘুরে বাহবা কুড়িয়ে যেতাম আমি আমার তিলে বিচ্ছু ভাই তক্কে তক্কে থাকত কখন শেষ হওয়া খাতাখানা হাতে পায় শেষমেশ ও ঠিক ধরে ফেলত আমার কারসাজি আর আমার প্রাইজ কেড়ে নেওয়া হত তখন, সে বিষম লজ্জার কাণ্ড হত
ক্লাস টেন-এ উঠতে বাবা বললেন, আমি নাকি বড়ো ক্লাসে উঠে গিয়েছিএবার থেকে ভাইয়ের সঙ্গে এক ঘরে নয়, আমাকে পড়াশোনা করতে হবে একলা ঘরেসুতরাং আমার জন্য বরাদ্দ হল নিচ তলার একটি ঘরপ্রথমটা একটু মন খারাপ হলেও যখন শুনলাম, পড়াশোনা করতে হবে ভেতর থেকে দরজায় খিল এঁটে, পাছে কেউ না জ্বালাতন করে... তখন আনন্দের সীমা রইল না! বন্ধ সে ঘরের জানালার ফ্রেমে বন্দি মস্ত এক আকাশ পেলামজানালার বাইরে নীল আকাশ, সবুজ খেত... খেত পেরিয়ে নদী, নদীর পারে ওই...ই দূরে রাস্তা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতসামনে বই খুলে রেখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম ঘন্টার পর ঘন্টা
এমনই এক ছুটির দুপুরে ছবি আঁকার নেশায় পেল আমাকেঅ্যানুয়াল পরীক্ষার মাত্র দু’দিন বাকি তখনরং, তুলি, পেনসিল ছড়িয়ে আর্ট পেপারে মনের সুখে আঁকা শুরু হলজানালার ঠিক বাইরে ছিল কুমড়ো গাছের মাচাবড়ো বড়ো - ঘন সবুজ নকশাদার কুমড়ো পাতা আর হলুদ ফুলে ভরে উঠছিল আমার আঁকার পাতাদ্রুত হাতে আঁকা চলছিলওপর থেকে বাবার ডাক আসার আগেই আঁকা শেষ করে, ফুঁ দিয়ে রং শুকিয়ে ছবিখানা চালান করে দিতে হবে বইয়ের তাকের সবচাইতে নিচের বইয়ের তলায়
আঁকা যখন প্রায় শেষ, হঠাৎ একটা ফিঙে শিস দিয়ে উঠল মাচার ওপরওর ডাক শুনতে শুনতে... মিঠে হাওয়ার আদরে কখন চোখের পাতায় জড়িয়ে এসেছে ঘুমহঠাৎ চটক ভাঙল হেঁড়ে গলার স্বরে... “অ্যাই... কী রে?” চমকে উঠে সামনে তাকাতেই দেখি জানালার ফ্রেমের দৃশ্য বদল ঘটেছেনীল আকাশ গায়েব সামনে আমার তিলে বিচ্ছু ভাইয়ের বড়ো বড়ো গোল গোল চোখ আর দাঁত চেপা হাসিযেন হাতে-নাতে চোর পাকড়াও করেছেমুহূর্তে সে ছুটল বাবাকে ডাকতে
আমার বুকের মধ্যে ধক ধক! পরীক্ষার পড়া রিভিশন দেওয়ার সত্যিই অনেক বাকি তখনএ সময় লুকিয়ে ছবি এঁকে ধরা পড়লে বাবার কাছে ভয়ানক শাস্তি জুটবে তা নিশ্চিত
হঠাৎ বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়টুলটাকে খাটের ওপর তুলে, তার ওপর দাঁড়িয়ে সদ্য আঁকা ছবিটাকে নিমেষে লুকিয়ে ফেললাম কড়ি-বরগার চওড়া কাঠের ওপরেরং তুলি-টুলিও ঝটপট লুকিয়ে পড়ল যথাস্থানেবালিশের ওপর বই রেখে গলা ছেড়ে পড়তে শুরু করলাম... “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য... উচ্চ যেথা...!
দরজায় আওয়াজ, সঙ্গে বাবার রাগী স্বর, “দরজা খোলো দুরু দুরু বুকে দরজা খুলে সরে দাঁড়িয়েছি, ভাই সুরুত করে ঢুকে গেল ঘরে পেছনে বাবাআমি তখন মনে মনে ঠাকুরকে ডাকছিভেতরে পা দিয়ে বাবা প্রথমে কটমট চোখে তাকালেন আমার দিকে, তারপর খোলা বইয়ের দিকেতারপর ঘরের চারদিকে তাকিয়ে হয়তো তাঁর মনে হল ভাই তাঁকে ভুল খবর দিয়েছে
বাবা সবে পেছন ফিরেছেন আর আমি ভাবছি, এ যাত্রা বেঁচে গেলাম! হঠাৎ চটাস করে আওয়াজ! ওপরে কড়ি-বরগার খোপে ছিল এক চড়ুই-এর বাসাতার বাড়ির উঠোনে উটকো জিনিস দেখে সে খুব বিরক্ত হয়ে ছবিটাকে ঠেলে দিয়েছে বোধহয়, আর সেটা এসে পড়েছে নিচে, মেঝের ওপরআমার তো দম আটকে যাবার দশাবাবা ঘুরে গেছেনমেঝের দিকে তাঁর চোখমুহূর্তে আসল ব্যাপার তাঁর কাছে পরিস্কার হয়ে গিয়েছেআমার বদমাশ ভাই টুক করে নিচু হয়ে ছবিটা তুলে বাবার হাতে দিলওর মুখে বদমায়েশি মেশানো হাসি যেন কী একখানা বড়োসড়ো যুদ্ধ জয় করেছে ভাবখানা... “কেমন দিলাম”?
তারপর আমার যে কী দশা হয়েছিল সেদিন... থাক, সে কথা আর নাই বা বললাম! পাঠকেরা আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়ই
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল