গল্পের ম্যাজিক:: অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি - দেবব্রত দাশ


অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি
দেবব্রত দাশ

।।  এক ।।

অবন্তী ঘোষাল এমন দুর্বিষহ অবস্থায় এর আগে কখনও পড়েছে কিনা মনে করতে পারে না। অফিস থেকে ফিরে চা আর হালকা স্ন্যাকস খেয়ে সে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকেছিল রোজকার মতন। বন্ধুদের একটা দুটো পোস্ট ফেসবুকে দেখে মেইল চেক করেছিল এবং তারপর থেকেই আবার অস্বস্তির শুরু... আসলে, হচ্ছেটা কী --- গল্পের ভূত চেপে বসেছে অবন্তীর মাথায়। প্লটের খুঁট ধরে টান দিতে না দিতেই এক লহমায় উঠে আসছে সবটুকুনি, এসে জট পাকিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। দিনভর অফিসে এমনটাই চলেছে। এখন অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে, মানে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বসে টাইপ করতে গেলেই খেই হারিয়ে দিশেহারা সে। বিগত পনেরো মিনিটেরও বেশি সময় ধরে অবন্তী একটা লাইনও টাইপ করতে পারেনি। অথচ, এতেই সে অভ্যস্ত। ‘ওয়ার্ড ফাইল’-এ ঢুকে সরাসরি সে লেখে গল্পছড়াকবিতা। উপন্যাসের ক্ষেত্রে অবশ্য প্রথমে কাগজে খসড়া লিখে নিয়ে তারপর টাইপ করবার সময় পরিমার্জন করে। তার পরেও ঘষামাজা করতে গেলে ‘ওয়ার্ড ফাইল’-ই সুবিধেজনক। কেননা, কাটাকুটি করতে হয় না - স্রেফ এডিটিং, ব্যস।
কৈশোরে স্কুলের ছাপানো ম্যাগাজিনে অবন্তীর ছড়া-কবিতা প্রকাশিত হলেও, সাহিত্য-চর্চার শুরু কলেজ-জীবনের প্রথম বছর থেকে। লিটল ম্যাগাজিনেই শুধু নয়, বাজারের দু-চারটে নামী বাণিজ্যিক পত্রিকাতেও সে সময় তার কিছু ছোটোগল্প এবং কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তারপর যখন সবচেয়ে নামী পাক্ষিক ‘ময়ূখমালা’-য় অবন্তীর অনেকগুলো ছোটোগল্প বেরোল পরপর এবং একটি সামাজিক উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে বিদগ্ধ পাঠক-মহলে সাড়া ফেলে দিল, তার পর থেকে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অবন্তী ঘোষাল এখন বাংলা সাহিত্যজগতে অতি পরিচিত একটি নাম।
যেহেতু প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি, তাই ছুটির দিন বাদ দিয়ে সপ্তাহের পাঁচটা দিন দিনভর প্রচণ্ড কাজের চাপ সামলে তার লেখার ফুরসত মেলে কেবলমাত্র রাতে ডিনারের পর। কিন্তু আজ একটা অন্যরকম দিন। তাই ডিনার শেষ করে নয়, আগেই সে ল্যাপটপ বের করে বসে গেছে। কেউ যেন তাকে ভেতর থেকে খোঁচাচ্ছে, মানে তাগাদা দিয়ে চলেছে সমানে --- লেখো মেয়ে লেখো... কলমটা ধরোই না একবার, দেখবে... প্লট তো তুমি ভেবেই নিয়েছ... শব্দের জোগান? কোনো চিন্তা নেই তোমার অবন্তী, কিচ্ছুটি করতে হবে না তোমায়। তরতরিয়ে কলম ছুটবে আপনাআপনি, তুমি শুধু দু’আঙুলের মাঝে ধরে রাখো, ব্যস, বাকিটা...
ল্যাপটপ নামিয়ে রেখে অবন্তী অগত্যা কাগজ-কলম বের করল এবং কী আশ্চর্য! লেখা শুরু করতেই কেউ যেন ভর করল তার ওপর! এমন সহজস্বচ্ছন্দ গতিতে কবে যে কলম ছুটিয়েছে, মনে করতে পারে না সে! জোয়ারের জলের মতো চিন্তাস্রোত অক্ষর হয়ে ফুটে উঠতে থাকে সাদা কাগজের পাতায়।
কত কত সময় যে পার হয়ে যায়, খেয়ালই থাকে না অবন্তীর, সংবিৎ ফেরে মায়ের ডাকে, “অবন্তী, কী হয়েছে রে তোর আজ, এখনও শুয়ে পড়ে আছিস যে!
শুয়ে পড়ে নেই মা, লিখছি,” লিখতে লিখতে গলা চড়িয়ে জবাব দেয় সে।
ড্রয়িং-কাম-ডাইনিংরুম থেকে ভেসে আসে অবন্তীর বাবার কণ্ঠস্বর, “অনেক রাত হয়ে গেছে রে মা, ডিনার সেরে তারপর লেখ। তুই খাসনি বলে তোর মা বসে আছে না খেয়ে।”
মাকে বলো বাপি, আমার খাবার বেড়ে ঢেকে রেখে দিতে। লেখা শেষ করে আমি খাব,” কলম না থামিয়ে বলল অবন্তী।
সে রাতে যখন সে একটা ছোটোগল্প লিখে শেষ করল, তখন দেয়াল-ঘড়ির দুটো কাঁটা প্রায় এক লাইনে এসে গেছে। তারপর, সামান্য কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়তে না পড়তেই ঘুমের গহিন সায়রে তলিয়ে গেল অবন্তী।
পরের দিন অফিসে অবন্তীর সারাক্ষণ কাটল এমন এক অভিনব উৎকণ্ঠা নিয়ে, যার কারণ খুঁজতে গিয়ে বুঝল, আর একটা গল্পের প্লট আগেরটার মতোই তার নিয়ন্ত্রণে না থেকেও অক্ষরের বুনোটে কাগজের পাতায় ফুটে ওঠার অপেক্ষায় অদৃশ্য থেকে হন্ট করে চলেছে তাকে। অবন্তীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার সুচরিতা-আন্টির মুখ। বাংলা সাহিত্যজগতের সেলেব্রিটি সাহিত্যিক সুচরিতা সান্যালের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে অবন্তী এসেছে বছর পাঁচেকেরও বেশি সময় আগে। দুই প্রজন্মের দু’জন। অবন্তী তখন বাইশ আর সুচরিতা সান্যাল আটান্ন। ভীষণ ভালোবাসতেন... স্নেহ করতেন সুচরিতা তাকে, একেবারে নিজের মেয়ের মতন। অত বড়ো মাপের একজন মানুষ হয়েও আচার-আচরণে মাটির কাছাকাছি। মিতভাষী... অমায়িক। তাঁর অভিজাত অথচ স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্ব মুহূর্তে সবাইকে আপন করে নিত। অবন্তীর মতো নবাগতা একজনকে নিরন্তর উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, তার লেখা গল্প পড়ে ভুলত্রুটি ধরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের হাতে পরিমার্জন করে দিতেন এবং ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দিয়েছেন ক্ষেত্রবিশেষে। বলতে গেলে সুচরিতা সান্যালই হাতে ধরে অবন্তীকে সাহিত্যের আঙিনায় ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ শুরু করিয়েছেন। অবন্তী ওঁর অবদান যেমন ভুলতে পারবে না কোনোদিন, তেমনই ভুলতে পারবে না সেই ভয়ঙ্কর রাত্রির কথা। কত রাত তখন? দেয়াল-ঘড়িতে এগারোটার ঘণ্টা শোনার পর শোয়ার আগে সেলফোনের সুইচ অফ করতে যাচ্ছিল সে, ঠিক তখনই হঠাৎ প্রদ্যুম্ন-আঙ্কলের ফোন, “অবন্তী, তুমি কি এখনই একবার আসতে পারবে আমাদের ফ্ল্যাটে? তোমার আন্টির যে কী হয়েছে, বুঝতে পারছি না!
মানে?”
এত ডাকছি, সাড়া দিচ্ছে না!
আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পৌঁছে যাচ্ছি আঙ্কল... আপনি চিন্তা করবেন না একদম, আন্টি হয়তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। আপনি এক্ষুনি কল দিন হাউস-ফিজিশিয়ানকে।”
সল্টলেকের এক আবাসনের যে ব্লকে থাকেন সুচরিতা-প্রদ্যুম্ন, তার ঠিক পাশের ব্লকেই থাকে অবন্তী। সে যখন গিয়ে পৌঁছোল দোতলার ফ্ল্যাটে, ততক্ষণে চারতলা থেকে নিচে নেমে এসেছেন ডক্টর দত্তরায়, সুচরিতা সান্যালের বুকে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে পরীক্ষা শুরু করেই হতাশ ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “না মিস্টার সান্যাল, আমাদের আর কিছু করার নেই !
সত্যিই কিছু আর করার ছিল না। সুচরিতার ডায়াবেটিস ছিল। সকাল-সন্ধেয় ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন ইঞ্জেকশনও নিতে হত। খুব মেপে চলতেন সুচরিতা। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে পরিমিতি-বোধ এবং সময়ানুবর্তিতা তাঁকে স্থিতিশীল অবস্থায় রেখেছিল বছরের পর বছর। প্রদ্যুম্ন সান্যাল দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী হিসেবে ব্যস্ত সাহিত্যিকের যোগ্য দোসর ছিলেন। নিয়ম করে নিত্যদিন সঠিক সময়ে হাতে ধরিয়ে দিতেন নির্দিষ্ট ওষুধ। চাপ বেড়েছিল আরও, যখন মাস তিনেক আগে টয়লেট থেকে বেরোনোর সময়ে পা পিছলে পড়ে গিয়ে ডান হাতের কবজিতে জোরালো চোট পেয়েছিলেন সুচরিতা, চিড় ধরেছিল হাড়ে। ফলস্বরূপ প্লাস্টার, লেখা বন্ধ, আরও অনেক ওষুধ... এবং অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় খাওয়ার ইচ্ছে কমে যাওয়ার দরুন হয়তো বা সে রাতে স্বল্প আহার... অথচ, প্রয়োগ করা হয়েছিল ফুল ডোজ ইনসুলিন। ফলে, সুচরিতা আক্রান্ত হয়েছিলেন ‘হাইপো গ্লাইসেমিয়া’-, এমনটাই মনে করেন প্রদ্যুম্ন... তাঁর আফসোস, সুচরিতার পাশে শুয়ে থেকেও কেন তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝলেন না --- চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিতে চলেছেন তাঁর জীবন-সঙ্গিনী!
প্রায় বছর ঘুরতে চলল, অবন্তীর মনে হয় --- এই তো সেদিন... বাংলা নববর্ষ সবে পার হয়েছে তখন, তার সুচরিতা-আন্টির হাতে বহু পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যার জন্যে গল্প-উপন্যাসের ফরমায়েশ। সব লিখে শেষ করতে পারেননি। ভাঙা হাত নিয়েও কাজ চালাচ্ছিলেন অন্য হাত দিয়ে টাইপ করে। আধুনিক প্রযুক্তির যে অত্যাশ্চর্য যন্ত্রটি নবীন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কোলে কোলে ঘোরে, সেই ল্যাপটপও ব্যবহার করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন শেষমেশ।
এত তাড়াতাড়ি যে তার মাথার ওপর থেকে সুচরিতা-আন্টির ভরসা-জোগানো হাত সরে যাবে, সে কথা কি ভাবতে পেরেছিল অবন্তী কোনোদিন? কত কিছুই তো অপূর্ণ রয়ে গেল তার আন্টির... কত কল্পনা আর ভাবনা!

অবন্তী যখন অফিস থেকে বেরিয়ে মেট্রো ধরার জন্যে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছে, তখন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে সেই অনুভূতি, যা কিনা অফিসের নির্ধারিত কাজকর্মের ফাঁকে বারবার উঁকি দিয়েছে আজ সারাটা দিন।
‘গিরিশ পার্ক’ স্টেশনে নেমে বাইরে বেরিয়ে অটো না ধরে তাড়াতাড়ি বাড়িতে পৌঁছোনোর উদ্দেশ্যে ট্যাক্সিতে উঠল সে, তারপর... গতকালের অ্যাকশন রিপ্লে যেন!
কিছুই করতে হল না তাকে, কলম ধরতেই তরতরিয়ে বেরিয়ে এল লেখা... সে নয়, কেউ যেন অন্তরালে থেকে কথার পর কথা সাজিয়ে সাদা কাগজের পাতায় ছবি এঁকে দিল। দু’রাতে দুদুটো ছোটোগল্প! মাস্টারপিস!

।।  দুই ।।

বাজারের সবচেয়ে নামী পাক্ষিক ‘ময়ূখমালা’, যাতে সুচরিতা সান্যাল নিয়মিত লিখতেন, সেই পত্রিকার সম্পাদক তন্ময় মুখোপাধ্যায় বিস্ময় গোপন করতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এই গল্প দুটো কোথায় পেলে অবন্তী?”
জবাবে, সত্যের সঙ্গে সাদা মিথ্যে মিশিয়ে অবন্তী বলল, “গল্প দুটো ছিল আমার কাছে। আসলে, কী জানেন তন্ময়দা, ওঁর জীবনের শেষ বছরের প্রায় পুরোটা জুড়েই আমি সেক্রেটারির ভূমিকা পালন করেছি, মানে না করে উপায় ছিল না। সুচরিতা-আন্টির গল্প-উপন্যাসগুলোর পাণ্ডুলিপি সযত্নে ফাইল-বন্দি করেছি শুধু নয়, যখন পড়ে গিয়ে হাতে চোট পেলেন আন্টি, তখন অবস্থা এতটাই প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল যে, উনি মুখে বলে গেছেন, আর আমি সে ডিকটেশন লিপিবদ্ধ করেছি...
কিন্তু একটা কথা অবন্তী,” কথার মাঝে প্রশ্ন করলেন তন্ময়, “উনি তো আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন... তা প্রায় এক বছর হতে চলল, কিন্তু তুমি আমার হাতে দিতে এত দেরি করলে কেন অবন্তী?”
একদম সঠিক প্রশ্ন করেছেন আপনি,” সপ্রতিভ জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে অবন্তী, “আমি আমার নিজের লেখালিখি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম খুবই। ইন ফ্যাক্ট, ‘ময়ূখমালা’ ছাড়াও অন্য অনেকগুলো পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় লেখার আমন্ত্রণ পেয়ে জড়িয়ে গিয়েছিলাম এতটাই যে... তারপর গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই আন্টির ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে...বাক্য শেষ না করে অবন্তী কাঁচুমাচু মুখ করে চেয়ে থাকে সম্পাদকের মুখের দিকে।
ওয়েল, দেরিতে হলেও ‘ময়ূখমালা’-কে... তাই বা বলছি কেন! নক্ষত্র কথাশিল্পী সুচরিতা সান্যালের অগণিত পাঠকবৃন্দকে যে উপহার দিলে তুমি অবন্তী, তার জন্যে কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।”
অস্বস্তিতে গুটিয়ে যেতে থাকে অবন্তী।
আবেগ স্তিমিত হলে সম্পাদক ধীরে ধীরে উচ্চারণ করেন, “পর পর দুটো সংখ্যায় বের করব সুচরিতা সান্যালের এই দুটো অপ্রকাশিত ছোটোগল্প এবং তার আগের সংখ্যাগুলোয় থাকবে পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন।”
তাহলে এবার চলি তন্ময়দা,” বলে অবন্তী উঠবার উপক্রম করতেই সম্পাদক ‘রে রে’ করে ওঠেন।
চলি মানে? এমন দুষ্প্রাপ্য সম্পদ আহরণ করে এনে দিলে ‘ময়ূখমালা’-র জন্যে আর শুধু মুখে উঠে পড়বে তুমি অবন্তী, সেটা কি হতে দেওয়া যায়! না কি আমি দেব? সম্পাদকীয় দফতরের সবার জন্যে আজ আমার তরফে স্পেশাল ট্রিট। আশা করি, তোমার জরুরি কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই এখন।”
তেতোগেলা মুখ করে বসে থাকে অবন্তী।

ছোটোগল্প দুটি প্রকাশিত হওয়ার পর প্রত্যাশা-অনুযায়ী পাঠক-মহলে দুটি সংখ্যারই চাহিদা উঠল তুঙ্গে। অসময়ে মাত্র তেষট্টি বছর বয়সেই যদি এই সেলেব্রিটি-সাহিত্যিক জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় না নিতেন, তাহলে বাংলা-সাহিত্যের ভাণ্ডারে আরও কত মণিমাণিক্য যে জমা হতে পারত, সে কথা ভেবে ভক্তকুল হাহুতাশ করল বিস্তর এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় সুনামির মতো আছড়ে পড়ল তাদের শতসহস্র মন্তব্য। ইহজগতের বাইরে থেকে সুচরিতা যেন পরির মতো ডানা মেলে নেমে এলেন তাঁর লক্ষ লক্ষ ফ্যান-ফলোয়ারের মাঝে।

।।  তিন ।।

তন্ময় হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলেন যে, অবন্তী গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। সুচরিতা সান্যালের গল্প দুটো প্রকাশিত হওয়ার পর ফোনে যোগাযোগ করেছিল একবার... ব্যস, ওই পর্যন্তই, তারপর আর কোনো খবর নেই... আশ্চর্য! তন্ময় তাঁর সেলফোনে অবন্তীর নাম্বার পুট করে ধরলেন তাকে, “কী--- ব্যাপার কী তোমার অবন্তী! তুমি ‘ময়ূখমালা’-র সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিলে নাকি?”
আপনি ভাবলেন কেমন করে তন্ময়দা!অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে অবন্তীর অভিমানী কণ্ঠস্বর, “আমি কি এতটাই অকৃতজ্ঞ? আজ সাহিত্যের আঙিনায় ঢুকে যে হামাগুড়ি দিতে পারছি, সে তো ‘ময়ূখমালা’-র জন্যেই... আমাকে ফার্স্ট ব্রেক দিয়েছেন আপনিই, না হলে...
ঠিক আছে অবন্তী, সে কথা থাক। তোমাকে হার্ট করার উদ্দেশ্য নিয়ে কিন্তু প্রশ্নটা করিনি আমি, তুমি আঘাত পেয়ে থাকলে আমি দুঃখিত,” অবন্তীকে থামিয়ে দিয়ে প্রফেশনাল কণ্ঠে তন্ময় জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি একেবারে ভুলেই গিয়েছ যে, শারদীয়ার জন্যে যাদের কাছ থেকে আমন্ত্রণমূলক লেখা চেয়েছিলাম, তাদের মধ্যে তুমিও একজন? আর এ কথাও কি ভুলে গিয়েছ যে, সময়সীমা পার হয়ে গিয়েছে দিন পনেরো আগেই?”
ভুলিনি কিছুই,” কাঁচুমাচু কণ্ঠস্বর অবন্তীর, “কিন্তু...
কিন্তু কী? ওহ্! তোমার আরও ক’দিন সময় চাই, তাই তো?” আবারও তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে নিজেই জবাব দেন তন্ময়, “বেশ, দিলাম সময়, আরও পনেরো দিন।”
সময়ের ব্যাপারই নয় তন্ময়দা,” বলে ওঠে অবন্তী, তার কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ-উত্তেজনা, “আমি গিয়ে সামনাসামনি বলব আপনাকে। আজই যেতে পারি, আপনি কি সময় দিতে পারবেন আজ? মানে, কখন গেলে...
ওয়েল, নো প্রবলেম,” খুশি হয়ে বললেন তন্ময়, “সন্ধে ছ’টা থেকে সাতটা পর্যন্ত একটা মিটিং আছে আমার, তারপর... সাড়ে সাতটায় চলে এসো তাহলে।”

মিটিং শেষ করে নিজের চেম্বারে ঢুকে সবে চেয়ারে বসেছেন তন্ময়, ভারী দরজার পাল্লা ঠেলে মুখ বাড়াল অবন্তী।
আরে এসো এসো,” তন্ময়ের চোখেমুখে কৌতূহল, “বোসো, কফি বলি?” উত্তরের অপেক্ষা না করেই বেল টিপে বেয়ারাকে ডেকে অর্ডার দিলেন, “বলো এবার, সামনাসামনি কী বলতে চাও তুমি।”
ভিতরের উত্তেজনা সামলে সহজ হওয়ার চেষ্টা করে অবন্তী, “অনেক আগেই আপনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ করা উচিত ছিল, আপনি আমায় ক্ষমা করবেন তন্ময়দা।”
ডোন্ট বি ইমোশনাল অবন্তী, আমি কিচ্ছু মনে করিনি,” তন্ময় অবন্তীর চোখে চোখ রাখেন, “নিঃসঙ্কোচে বলে ফ্যালো।”
অবন্তী তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের ভেতর থেকে মোটা একটা প্যাকেট বের করে সম্পাদকের টেবিলের ওপর রাখল।
কী এটা?”
এটা একটা উপন্যাস। ছেচল্লিশ হাজার শব্দের সম্পূর্ণ উপন্যাস।”
গল্প না লিখে উপন্যাস লিখেছ? বেশ তো... খুব ভালো, মেঘ না চাইতেই জল যাকে বলে! পুজোসংখ্যায় গল্পের চেয়ে উপন্যাসের চাহিদাই বেশি। আর তোমার লেখা যখন, আমি নিশ্চিত, হতাশ হতে হবে না।” সম্পাদকের মুখচোখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নিজেই প্যাকেটের ভেতর থেকে বের করেন পাণ্ডুলিপি। তারপর, প্রথম পৃষ্ঠায় উপন্যাসের নামের দিকে তাকিয়ে হাই ভোল্টেজ শক খান যেন, “এ উপন্যাস তো গত বছরের ‘শারদীয়া ময়ূখমালা’-য় অসম্পূর্ণ অবস্থায় প্রকাশিত হয়েছিল! ‘শেষ বিকেলের আলো’। তোমার অজানা নয় নিশ্চয়ই অবন্তী! এই উপন্যাসের দুটো পরিচ্ছেদ লিখে বাকিটা আর শেষ করতে পারেননি সুচরিতা সান্যাল, তার আগেই তো এক রাত্তিরে...
হ্যাঁ তন্ময়দা, পাশের ব্লকে থেকে জানব না আমি?”
তাহলে! সুচরিতা সান্যালের হাজব্যান্ডের কাছ থেকে আমি নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছিলাম ওই অসম্পূর্ণ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি এবং...
উপন্যাসটা সে সময় অসম্পূর্ণ ছিল... বলছি তো!হঠাৎ অবন্তীর গলার স্বর বদলে গেল। তন্ময় স্পষ্ট শুনলেন সুচরিতার কণ্ঠস্বর, “এখন তোমার হাতে দুটো পরিচ্ছেদ নয়, বাকি বারোটা পরিচ্ছেদ-সহ সম্পূর্ণ উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের আলো’। এবার তো তোমার আর কোনো অসুবিধে নেই তন্ময়, ‘ময়ূখমালা’-র শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশ করে আমার অগণিত ফ্যান-ফলোয়ারের হতাশা দূর করো।”
ঘোরলাগা চোখে তন্ময় দেখেন, সুচরিতা সান্যাল বসে আছেন। যেমন ভঙ্গিতে বসতেন তিনি, ঠিক সেভাবেই বসে আছেন সামনের চেয়ারে এবং তাঁর দু’চোখের দৃষ্টিতে আকুতি এক রাশ।
কী হল তন্ময়দা! আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? ডাকব কাউকে?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে অবন্তী।
ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক দৃষ্টি মেলে ধরেন তন্ময়, “আমি ঠিকই আছি অবন্তী, কিন্তু...
কোনো কিন্তু নয় আর,” উৎসাহে-উত্তেজনায় ফুটতে থাকে অবন্তী, “সুচরিতা-আন্টির লেখা ‘শেষ বিকেলের আলো’-র এই পাণ্ডুলিপি আপনি চোখ বুজে পাঠিয়ে দিতে পারেন ছাপাখানায়।”
বাকরুদ্ধ সম্পাদক অপার বিস্ময়ে চেয়ে থাকেন তাঁর সামনে বসে থাকা নবীন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় কথাশিল্পীর উৎসুক চোখের দিকে।
[এই গল্পের সব চরিত্রগুলিই কাল্পনিক।]
_____
ছবিঃ সুকান্ত মন্ডল

No comments:

Post a Comment