নাটক:: সেই বোকা নেকড়েটা - ঋতা বসু


সেই বোকা নেকড়েটা
ঋতা বসু

আমরা সবাই জানি, রেড রাইডিং হুড, সাতটি ছাগলছানা ও তিনটে শুয়োরছানার গল্পে দুষ্টু নেকড়ে কীভাবে বারবার হেরে গিয়েছে। কিন্তু যেটা আমরা জানি না তা হল সেই দুষ্টু নেকড়ে মনে মনে একটা ফন্দি এঁটেছেতাকে মানুষ অন্যায় করে হারিয়ে তা নিয়ে গল্প লিখেছে। এবার সেই গল্পগুলোই সে নতুন করে লিখবে। সমস্তটা এক রেখে শুধু শেষ পাতাটা বদলে দিলেই তার জিৎ। এবার দেখা যাক নেকড়ের নতুন গল্পটা। সে জিতল না হারল।

নেকড়ে।। খুব অন্যায়, খুব অন্যায়
দেখ তোরা, গল্প লিখে মানুষ কেমন বোকা বানায়।
একবার নয়, দুবার নয়, বারবার তিনবার
কী স্পর্ধা ফন্দি আঁটে আমাকে মারবার!
তারা কারা? নাদা পেটা। শুয়োর আর ছাগল মাথা মোটা
তার সঙ্গে সর্দিঝরা সেদিনের সেই মেয়েটা
লালি হল ইংরিজিতে রেড রাইডিং হুড
খতম এদের করব এবার একেবারে ফর গুড।
গান আর সিনেমাতে রিমেক যতই দেখি
ইচ্ছে হল আমার গল্প নতুন করে লিখি
শুধু আমার মনের মতো বদলাবে শেষটা
কচি মাংস খেয়ে আমি মেটাব তেষ্টা।

বনের ধারে লালিদের ঘরের মধ্যে মা, বাবা ও লালি কথা বলছে।

মা।। এদিক ওদিক না ঘুরে সোজা যাবে দিদিমার বাড়ি।
একটুও কথা শোন না তুমি কিন্তু দুষ্টু ভারি।
লালি।। কী হবে মা যাই যদি ঘুরে ফিরে?
বাবা।। ও বাবা, দুষ্টু নেকড়ে!
লালি।। সে কী করে?
বাবা।। যদি কর দেরি, তোমার আগে পৌঁছবে সে দিদিমার বাড়ি। দিদিমা বুড়ো মানুষ, তাকে কব্জা করে সে লাফ দেবে তোমার ওপরে।
লালি।। ভারি দুষ্টু তো!
মা।। সেই ভয়েই তো আমরা থাকি সাবধানে। তুমি যেন যেও না আর কোনওখানে।
[বাবা ততক্ষণে লাঠি, ব্যাগ ইত্যাদি নিয়ে বেরোবার জন্য প্রস্তুত হয়]
বাবা।। আমার একটু দেরি হবে। একটা কাজ সেরে তবে যেতে হবে। দিদিকে বোলো, তুমি আমার সঙ্গেই ফিরে সবে।
লালি।। ঠিক আছে, ঠিক আছে, যা যা বললে সব মনে আছে।
[লালি ঘর থেকে বেরিয়ে বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে থাকে। নেকড়ে লালিকে লক্ষ করে।]
নেকড়ে।। এখনও ভাবলে কান্না পায়
সবকিছু ঠিক ছিল শেষটায়
মেকআপটায় থেকে গেল ফাঁক
গতবার যা হয়েছে সে যাক
এবার আর নয় কোন বোকামি
দস্তানা আর মুখোশে দিদিমা হব আমি।
[নেকড়ে দস্তানা আর মুখোশ নিয়ে লালিকে অনুসরণ করে।]
লালি।। কী সুন্দর ফুল! তুলি গিয়ে? এর মধ্যে
লালগুলো নিয়ে সাজাব বসার ঘরে
আর হলুদগুলো টেবিলের পরে
কী সুন্দর দেখাবে! একটু দেরি হলে কী আর হবে।
নেকড়ে (মনে মনে)।। ভালো, ভালো, আরও দেরি কর
এখানেই মুখে পোরা যেত
নাহ্‌, সেরকম কথা নেই তো
গল্পটা যেমন আছে তেমনই থাকবে
শেষটা শুধু অন্যরকম হবে।
[নেকড়ে দস্তানা আর মানুষের মুখোশ পরে ঘরের মধ্যে এসে যায়।]
নেকড়ে।। বাবাটাও এসে পড়ল বলে
তার আগেই মেয়েটা যাবে গলে
এক্কেবারে মুখের ভেতর।
এবার ধ-অরব আর মুখে ফে-এলব
চেঁচাবার সময়ই পাবে না।
লালি।। ও বাবা, কত দেরি হয়ে গেল! সন্ধে যে নেমে এল!
ওই যে বাবাও আসছেন এদিকে। আমি বাবা আর কোনদিকে না তাকিয়ে ঢুকে পড়ি তাড়াতাড়ি
ইচ্ছে নয় হাতেনাতে ধরা পড়ি।
[লালি ফুল হাতে এগিয়ে যায়। পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা দিদিমা ভেবে নেকড়েকে জড়িয়ে ধরে। ফুলের সঙ্গে লম্বা লম্বা পাতাগুলো নেকড়ের নাকে ঢুকে সুড়সুড়ি দেয় আর নেকড়ে বেদম হাঁচতে থাকে। মানুষের মুখোশ খুলে তার মুখ বেরিয়ে পড়ে।]
লালি।। বাঁচাও, বাঁচাও!
বাবা, বাবা,সো জলদি
নেকড়ে আছে, নেই তো দিদি।
[লালির বাবা লাঠি হাতে দৌড়ে এসে নেকড়েকে তাড়া করে। নেকড়ে পালিয়ে গিয়ে বনের মধ্যে একটা পাথরের ওপর বিমর্ষ হয়ে বসে বলল- ]
নেকড়ে।। কী বোকামিটাই না হল। কীভাবে পাতাগুলো
সোজা নাকে ঢুকে সুড়সুড়ি দিল?
আর আমারও হয়েছে এক হাঁচি রোগ
কত বছর ধরে প্রতিশোধ নেব বলে
মানুষের যত ভোগ
কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না
মাঝখান থেকে বদরোগগুলো সারছে না।
(হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে) নাহ্‌, এইবার আমি প্রস্তুত
হতে পারি আমি কতটা কিম্ভুত
দেখবে এবার।


নেকড়ে এল সাতটা ছাগলছানার বাড়ি। ঘরের মধ্যে সাতটা ছাগলছানা লাফালাফি করছে। তাদের মা চটি পরছে, ব্যাগ নিচ্ছে।
নেকড়ে।। ওই যে বোকা ছাগলগুলোর মা শহরে যাচ্ছে।
এইবার আমার খেলা শুরু হচ্ছে।
মা ছাগল।। আমি যাচ্ছি শহরে
আশেপাশেই আছে দুষ্টু নেকড়ে।
খবরদার, দরজা একদম খুলবে না,
বাড়ির বাইরে যাবে না।
সুর করে সোনাদের ডাকব যখন
দরজা খুলবে তখন।
১ম ছাগলছানা।। এতক্ষণ কী করব আমরা?
মা।। কেন, কত খেলা আছে ছোটো থেকে বুড়ো দামড়া যাতে খেলতে পারে, ব্যবস্থা তো থরে থরে বিথরে।
২য় ছাগলছানা।। চারজন ক্যারম খেলবে, বাকি তিনজন কী করবে?
মা ছাগল।। (একটু ভেবে) তাহলে মিলজুল করে সবাই
খেল অন্ত্যাক্ষরী গানের লড়াই।
কেউ কারোকে কোরো না জখম
মনে রেখ, দরজা খুললেই খেল খতম।
[মা চলে যায়]
১ম ছাগল ছানা।। আমি বড়ো, আমি শুরু করব। [সুর করে]
কচি সবুজ ঘাস, তোরা কি দেখতে পাস?
আমার ডাইনে বাঁয়ে চোখ—
[তাকে থামিয়ে ৪র্থ ছাগল]
৪র্থ ছাগলছানা।। ইস্, তোর গলায় একটুও সুর নাই। আমি শুরু করব কারণ, আমি সব থেকে ভালো গাই।
(শুরু করে দেয়) আমার গলার ব্যা...হে, ব্যা...হে ডাকে
[তাকে থামিয়ে ৫ম হেসে ওঠে]
৫ম ছাগল ছানা।। ওটা কবে থেকে হল আবার গাই?
দিবি নাকি যত সের দুধ চাই?
[সবাই হেসে ওঠে। ৪র্থ ছাগলছানা রেগে মারতে যায়। সেই সময় নেকড়ে এসে দাঁড়াল দরজার সামনে।]
নেকড়ে।। এই সুযোগ এবার ঢুকে পড়ি।
[গলা মিহি করে সুর করে ডাকে।]
সুনু মুনু চুনু গেনু কানু ভানু আর
আমার ছোট্ট সোনা গুন্টুগুনু—দরজা খোলো এবার
তোমাদের মা এনেছে কত বাজার।
সকলে।। মা এসেছে, মা এসেছে।
১ম ছাগলছানা।। আমার ভিডিও গেমস দুমদাম
২য় ছাগলছানা।। আমার রক এন রোল ঝমাঝম
৩য় ছাগলছানা।। আমার জুতো ইয়া ছাপ্পামারা
৪র্থ ছাগলছানা।। আমার জিনসও ভয়ানক নাম করা
৫ম ছাগলছানা।। আমার জন্যও আসবে নিশ্চয়
৬ষ্ঠ ছাগলছানা।। আমার চকলেট সই
৭ম ছাগলছানা।। আমার গল্পের বই
নেকড়ে আবার সুর করে ডাকে। ১ম দরজা খুলতে যায়।
৭ম ছাগলছানা।। মা এত তাড়াতাড়ি ফিরবে না
আগে থেকে দরজা খুলো না।
২য় ছাগলছানা।। তোর যত বুড়োটেপানা
এখন রকেট বাসে সময় মোটে লাগে না।
[দরজা খুলতেই বস্তা হাতে নেকড়ে ঢুকে পড়ে। সবকটা ছাগলছানা এদিক ওদিক লুকোয়। নেকড়ে এক এক করে ছটা ছাগলছানাকেই বস্তায় ভরে ফেলে। তারপর অট্টহাস্য করে বলে--]
নেকড়ে।। সাত নম্বরটা বেশি মাতব্বর
চালাকিতে যাবে আমার ওপর
গতবার টার জন্যই পেট কেটে
ভরে দিয়েছিল চুনাপাথর।
[উনুনের আড়ালে ৭ম ছাগলছানা ভয়ে কাঁদছে আর চোখের জল মুছছে। নেকড়ে সেদিকে আড়ে আড়ে চায়। মুচকি হাসে আর গান ধরে।]
নেকড়ে।। (গান) ছাগলছানা ছাগলছানা পশম আছে কি?
আছে আছে দুটি ছালা ভর্তি রেখেছি
একটা ছালা কর্তাবাবুর একটা গিন্নিমার
ছিঁচকাঁদুনে ছেলের তরে মায়া নেই আমার।
[গান শেষ করে নেকড়ে উনুনের দিকে এগোয়। ৭ম ছাগলছানা হাত দিয়ে নেকড়ের মুখে উনুনের ছাই ছিটিয়ে দেয়। নেকড়ে বেদম হাঁচতে হাঁচতে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে এই ফাঁকে ৭ম ছাগলছানা পালিয়ে যায়খবর পেয়ে সবাই নেকড়েকে মারতে আসে। নেকড়ে ভয় পেয়ে পালায়। বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে আবার ফন্দি আঁটে।]
নেকড়ে।। বারবার দুবার ঘটল যা নয় ঘটবার
মানুষের ছানা ছাগলের ছানার হাতে এত হেনস্থা।
[বিমর্ষভাব ঝেড়ে ফেলে থাবাটা তুলে দেখে।]
আমার এই ধারালো দাঁত আর থাবাটাও তো সত্যি
তা সত্ত্বেও ওই একরত্তি
প্রাণীগুলোর নাচনা গানা আনন্দ
এইটা আমার বেজায় অপছন্দ
তাছাড়া আমাকে বুদ্ধু বানিয়ে গল্প
তার দামও তো নয় অল্প
মানুষগুলো বছরের পর বছর সেগুলোই গিলছে
তারও একটা উচি জবাব দিতে হচ্ছে।
এইবার—শেষবার।


[নেকড়ে এল খড়ের বাড়ি, কাঠের বাড়ি ও ইটের বাড়ির সামনে। তিনটে বাড়ির ভেতর তিনটে শূকরছানা। নেকড়ে খড়ের বাড়ির কাছে যায়।]
নেকড়ে।। ঢুকতে দিবি কি না বল।
১ম শূকরছানা।। না না, যতক্ষণ দেহে আছে বল।
নেকড়ে।। এমনিও মরবি, অমনিও মরবি।
১ম শূকরছানা।। তুই কর না, কী করবি।
[নেকড়ে থাবা দিয়ে খড়ের বাড়ি ভেঙে দেয়। ১ম শূকরছানা দৌড়ে গিয়ে কাঠের বাড়িতে লুকোয়।]
১ম শূকরছানা।। নেকড়ে আসছে, নেকড়ে আসছে।
২য় শূকরছানা।। অমন কত আসছে যাচ্ছে।
১ম শূকরছানা।। না রে, এটা ভয়ংকর
২য় শূকরছানা।। ও সবই ওপর ওপর
আমার এমন কাঠের বাড়ি
এখানে খাটবে না জারিজুরি।
[নেকড়ে কাঠের বাড়ির সামনে গিয়ে বলে--]
নেকড়ে।। ঢুকতে দিবি কি না বল।
১ম ও ২য় শূকরছানা।। না না, যতক্ষণ দেহে আছে বল।
নেকড়ে।। এমনিও মরবি, ওমনিও মরবি।
১ম ও ২য় শূকরছানা।। তুই কর না, কী করবি।
[নেকড়ে খ্যা খ্যা করে হেসে থাবা দিয়ে কাঠের বাড়ি ভেঙে দেয়। ১ম ও ২য় শূকরছানা দৌড়ে গিয়ে ইটের বাড়িতে লুকোয়। নেকড়ে ইটের বাড়ি সাইনবোর্ডের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। ঘরের এদিক ওদিক হাত বোলায়।]
নেকড়ে।। এত বছরেও একটুও টসকায়নি
ঢোকার পথ শুধু ওই চিমনি
আমি জানি, জানি
ওর নিচে আছে গরম জল ফুটন্ত
আমাকে মারার প্ল্যান জলজ্যান্ত
এবার আর সেটি হচ্ছে না
চিমনি দিয়েই ঢুকছি না।
[নেকড়ে ধারালো নখে মাটি কেটে শরীর বাঁকিয়ে চুরিয়ে গর্ত করে ঘরের যেখানে টেবিল ছিল সেখানে চলে এল।]
নেকড়ে।। কামড়ে টুঁটি ভাঙব ঘাড়
খাব মাংস থাকবে হাড় – হাঃ হাঃ হাঃ
দরজা দিয়ে পালাতে না পারে
সেইটাই দেখব আমি এবারে।
[সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাচে।]
নেকড়ে।। আহা, পালাবার পথ বন্ধ
চাদ্দিকে পিকনিক পিকনিক গন্ধ
ওই যে গরম জলের হাঁড়ি
ব্যবস্থা তো সুন্দর ভারি
কখনও খাইনি সেদ্ধ শূয়োর
মনে হয় টেস্টটা হবে না পুয়োর।
[নেকড়ে টেবিলের কৌটো শিশিগুলো নাড়েচাড়ে।]
নেকড়ে।। এই তো সঙ্গে রয়েছে মশলা
জলে ফেলি তাই খাবলা খাবলা
হ্‌, খেতে যা হবে ভাবছি আমি
এখনই বানাব সসেজ সালামি।
[তারপর গোলমরিচের কৌটো খুলে যেই না গন্ধ শুঁকেছে অমনি শুরু হয়ে গেল হাঁচি। হাঁচতে হাঁচতে নেকড়ে নাকের জলে চোখের জলে হয়ে দরজা ছেড়ে সরে যায় আর তিনটে শূকরছানা সঙ্গে সঙ্গে আড়াল থেকে বেরিয়ে দৌড়। হেরে গিয়েছে বুঝতে পেরে নেকড়ে অন্ধকার বনের দিকে পালিয়ে যায়। তখন তিনটে দল হাত ধরাধরি করে নাচ আর গান গায়।]
সকলে।। পরের ক্ষতি করে যে নিজের জ্বালায় মরে সে
আগেও বোকা পরেও বোকা, দোসর নেই থাকো একা
জিততে তুমি পারবে না, তোমার ভালো হবে না।
[বনের পথে নেকড়ে লেংচে লেংচে হাঁচি দিতে দিতে মিলিয়ে যায়।]
_____
অলঙ্করণঃ ঋতম মুখার্জী

No comments:

Post a comment