উপন্যাস:: মানিকচৌরির ভূত-বাংলোঃ ১ম অংশ - কৃষ্ণেন্দু দেব


মানিকচৌরির ভূত-বাংলো
কৃষ্ণেন্দু দেব

।। এক।।

সঞ্জু আর আমি হরিহর আত্মা আমরা এক পাড়াতেই থাকি লোকে আমাদের মাণিকজোড় বলে ডাকে সঞ্জুর ভালো নাম সঞ্জনকান্তি ওর দাদা অঞ্জনকান্তি এখন খড়গপুর আই.আই.টি.-তে রিসার্চ করছে শুধু সঞ্জুর দাদা নয়, ওদের বাড়ির সবাই খুব মেধাবী আর উচ্চশিক্ষিত
সঞ্জুদের বাড়িতে গেলে মনে হয় ঠিক যেন কোনও কলেজে ঢুকে পড়েছি বাড়িতে অধ্যাপকের ছড়াছড়ি সঞ্জুর বাবা বিমলকান্তি বঙ্গবাসী কলেজে কেমিস্ট্রি পড়ান আর এক কাকা কমলকান্তি ইতিহাস পড়ান পর্ণশ্রী কলেজে ওদিকে ঠাকুরদা দুর্লভকান্তি এবং তাঁর দাদা দুর্জয়কান্তি, দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দুর্জয়দাদু তো আবার রিটায়ার করেছেন সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে শুধু সঞ্জুর ছোটকাকা অমলকান্তি অধ্যাপনার রাস্তায় হাঁটেননি যদিও লেখাপড়ায় উনি কারোর থেকে কম যান না - ম্যাথমেটিক্সে ডক্টরেট এখন যাদবপুরের কালটিভেশন অফ সায়েন্সের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট সঞ্জুর মাথাও খুব ভালো সেই ক্লাস ফাইভ থেকে তো আমরা একসাথে পড়ছি আমার ধারণা, বংশের ধারা মেনে - একদিন কেউকেটা হবে
সঞ্জুদের বাড়িতে ওর পড়ার ঘরে বসে আমরা দুজন প্রায়ই একসাথে পড়াশোনা করি ঠিকঠাক বললে সঞ্জু আমাকে পড়ায় বিশেষত মাধ্যমিক পাশ করার পর যখন সায়েন্স নিলাম, তখন থেকে - আমার গাইড কীভাবে কেমিস্ট্রির ইয়া বড়ো বড়ো ইকোয়েশনগুলো মনে রাখতে হবে কিংবা ফিজিক্সের প্রবলেমগুলো সলভ্করতে হবে, সেসব আমাকে দেখিয়ে দেয় আর যখন ওর কিছু আটকায়, তখন বাবা-কাকার শরণাপন্ন হয় তবে আমাদের দুজনের কাছেই সবচেয়ে প্রিয় সঞ্জুর ছোটকা অর্থাৎ অমলকাকু
অমলকাকু একজন অঙ্ক-পাগল লোক অঙ্কই ওঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান বছর পাঁচেক আগে কাকুর যখন ছেলে হল, উনি ঠিক করলেন তার নাম রাখবেন পিথাগোরাস ব্যস, বাড়িময় শোরগোল পড়ে গেল কাকিমা তো অসুস্থ শরীরেও নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিলেন সঞ্জুদের বাড়ির সবাই কাকুকে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন নামটা পাল্টানোর জন্য কিন্তু কাকু নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন
এমতবস্থায় দুর্জয়কান্তি মানে অমলকাকুর জ্যাঠামশাই আসরে নামলেন গোটা পাড়ার লোক দুর্জয়দাদুকে শ্রদ্ধা করে অমলকাকুও কোনওদিন ওঁর কথা অমান্য করেননি সেই ভরসাতেই দুর্জয়দাদু ভাইপোকে বোঝাতে উদ্যত হলেন বললেন, “বাবা অমু, পিথাগোরাসের মতো গণিতজ্ঞ সারা পৃথিবীতে যে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু তাঁর নাম স্মরণীয় করে রাখতে যদি একটা বনেদি বাঙালি পরিবারের ছেলের নাম হয় পিথাগোরাস চট্টোপাধ্যায়, তাহলে কেমন শোনায় বল দেখি লোকে তো হাসবে আমি বলি কি, ভারতেও তো অনেক নামকরা গণিতবিদ জন্মেছেন তাঁদের কারোর নাম যদি...”
দুর্জয়দাদুর কথা শেষ হল না অমলকাকু বললেন, “ঠিক আছে তুমি যখন এতো করে বলছ, পিথাগোরাস নামটা তাহলে বাদই দিলাম ছেলের নাম হোক তবে বরাহমিহির
নামটা শুনে দুর্জয়দাদু আরেকটু হলে ভিরমি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলেন কোনওমতে নিজেকে সামলালেন মনে মনে ভাবলেন, এর থেকে পিথাগোরাসই ছিল ভালো কিন্তু হাল ছেড়ে দিলে চলবে না তিনি অমলকাকুকে বললেন, “নামটা তুই ভালই বেছেচিস কিন্তু তোর ছেলেকে তো বড়ো হয়ে মনুষ্য সমাজে মেলামেশা করতে হবে তখন নামের প্রথম অংশটুকু ওকে বড়োই বিড়ম্বনায় ফেলবে তাই বলছিলাম কী, তোর পছন্দের নামের সাথে দুটো শব্দ একটু যোগ বিয়োগ করে নে না বাবা
অঙ্কের প্রসঙ্গ এলেই অমলকাকুর মনটা প্রসন্ন হয়ে যায় তিনি জ্যাঠার কাছে কোন দুটো শব্দ যোগ বিয়োগের কথা হচ্ছে, তা জানতে চাইলেন জবাবে দুর্জয়দাদু বললেন, “আমাদের বংশের সমস্ত ছেলের নামের সাথে ‘কান্তি’ যুক্ত করার একটা রীতি আছে তাই তুই তোর পছন্দের নামের সাথে কান্তিটা যোগ করে প্রথমের ‘বরাহ’টা বিয়োগ করে দে তাহলেই আর কোনও সমস্যা থাকবে না
অমলকাকু সেদিন আর জ্যাঠামশাইয়ের কথা ফেলতে পারেননি যোগ বিয়োগ করে ছেলের নাম মিহিরকান্তি রাখাই সাব্যস্ত করেছিলেন আর সিদ্ধান্তে সেদিন গোটা চ্যাটার্জি পরিবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল কাকিমাও অনশন ভঙ্গ করেছিলেন
এহেন অমলকাকু একদিন সঞ্জু আর আমাকে একটা বেড়ানোর প্রস্তাব দিলেন আমরা দুজন তখন সবে ক্লাস টুয়েলভে উঠেছি মে মাসের প্রথম সপ্তাহ গরমটা বেশ ভালোই পড়েছে এক রবিবারের দুপুরে আমরা দুজনে সঞ্জুর পড়ার ঘরে অঙ্ক করছিলাম একটা ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস সঞ্জু কিছুতেই বাগে আনতে পারছিল না আমাকে বলল, “, ছোটকার কাছে যাই
ওঁর ঘরে যাওয়া মাত্র অমলকাকু অবজ্ঞাভরে একবার সঞ্জুর দিকে তাকিয়ে, নিমেষে অঙ্কটা কষে দিলেন তারপর আমাদের দুজনের উদ্দেশেই বললেন, “ মাসের শেষে দিন পাঁচেকের ছুটি পাচ্ছি ঠিক করেছি একটা দারুণ জায়গায় দুটো দিন কাটিয়ে আসব ছেলেটা ছোটো বলে তোদের কাকিমা অত দূরে যেতে রাজি হচ্ছে না তাই ভাবছি একাই যাব তবে সময়ে তো সামার ভেকেশন তাই চাইলে তোরাও আমার সাথে যেতে পারিস
বেড়ানোর প্রস্তাবে তো আমরা একপায়ে খাড়া সঞ্জু জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় যাবে গো ছোটকা?”
অমলকাকু জবাবে বললেন, “মানিকচৌরি ছত্তিশগড়ের একটা ছোট্ট জায়গা সেখানে পাহাড়, জঙ্গল, ঝর্ণা, গুহা সব একসাথে আছে আর থাকার জন্য পাবি একটা চমৎকার বাংলো, একদম নিখরচায়
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “খরচা লাগবে না কেন? বাংলোটা আপনার পরিচিত কারোর নাকি?”
ঠিকই বলেছিস বাংলোটা আমার কলেজের এক বন্ধু সাত্যকির আসলে সাত্যকি ওর এক নিঃসন্তান জ্যাঠার কাছ থেকে বাংলোটা পেয়েছে জ্যাঠা ব্যাবসার কাজে মধ্যপ্রদেশে থাকতেন যাই হোক, বাংলোটা এখন খালিই পড়ে আছে মাঝে মধ্যে দু’একজন টুরিস্ট ওটা ভাড়া নেয় স্থানীয় একটা লোক বাংলোটা দেখাশোনা করে
এবার সঞ্জু জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করেছ? উনি থাকেন কোথায়?”
সাত্যকি থাকে ল্যান্সডাউনে ফোনে ওর সাথে আমার কথা হয়েছে আজ বিকালেই আসছে আমার কাছে তোরা যদি যেতে রাজি থাকিস, তাহলে সাত্যকি এলে আমার ঘরে চলে আসিস সবাই মিলে ট্যুর প্ল্যানটা ঠিক করে নেওয়া যাবে
সেদিন বিকাল পাঁচটা নাগাদ কাকুর বন্ধু এসে হাজির হলেন আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “মানিকচৌরি জায়গাটা খুব সুন্দর তবে ওখানে যাওয়াটা একটু ঝামেলা ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে যাওয়ার তো অনেক ট্রেন আছে সমস্যাটা হয় এর পরে তোমাদের প্রথমে রায়পুর থেকে গাড়ি নিয়ে অভনপুর জংশন যেতে হবে সেখান থেকে ন্যারোগেজ লাইনে ট্রেনে চেপে পৌঁছতে হবে মানিকচৌরি দিনে মাত্র একজোড়া ট্রেন একটা সকালে আর একটা বিকেলে আগে লাইনে প্রায়শই ডাকাতি হত ডাকাতরা যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে-কুড়ে নিত আর কারোর কাছে কিছু না পেলে তাকে খুব মারধোর করত এখন অবস্থার খানিক উন্নতি হয়েছে
ডাকাতির ব্যাপারটা শুনে অমলকাকু একদম মুষড়ে পড়লেন আসলে উনি খুব ভীতু প্রকৃতির মানুষ আর একবার ভয় পেলে দেখেছি, ওঁর বিচার বুদ্ধিও এক্কেবারে লোপ পেয়ে যায় উনি সাত্যকিকাকুকে বললেন, “তাহলে তো ওখানে যাওয়া মুশকিল হয়ে গেল আমি একা গেলে কোনও ব্যাপার ছিল না কিন্তু সঙ্গে যে বাচ্চা ছেলেদুটোও থাকবে ওদের নিয়ে আমি কীভাবে রিস্ক নিই বল?”
সাত্যকিকাকু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই সঞ্জু মন্তব্য করে বসল, “ডাকাত-ফাকাতে আমাদের কোনও ভয় নেই তুমি যদি নিজে যেতে ভয় পাও, সেটা আলাদা ব্যাপার
সঞ্জুকে নিয়ে এই এক সমস্যা যা ঠিক মনে করে তাই মুখের ওপর বলে দেয়, ছোটো-বড়ো জ্ঞান করে না তবে একথাও ঠিক যে সঞ্জুর মধ্যে ভয়-ডর বিশেষ একটা নেই সাপখোপ, পোকামাকড়, চোর-ডাকাত - কোনও কিছুকেই বড়ো একটা কেয়ার করে না একদিকে সাপুড়েদের কাছ থেকে নেওয়া ইয়াব্বড়ো জ্যান্ত সাপ গলায় পেঁচিয়ে ‘শিবঠাকুর’ সাজতে পারে আবার মাঝরাত্তিরে খুটখাট শব্দ শুনে একাই লাঠি হাতে বাইরে বের হতেও ওর বুক কাঁপে না এছাড়া ওর উপস্থিত বুদ্ধিও খুব
অমলকাকুও সঞ্জুর স্বভাব ভালোই জানেন তাই উনি আর কথা বাড়ালেন না বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ওদের দু’জনের যখন কোনও আপত্তি নেই, তখন আর সমস্যা কোথায়? এখন মানিকচৌরি নেমে কীভাবে তোর বাংলোয় পৌঁছব, সেটা একটু বলে দে
সাত্যকিকাকু তাঁর বাংলো পৌঁছনোর রাস্তা ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, “দ্যাখ অমল, আমি শেষবার মানিকচৌরি গিয়েছিলাম বছর দুয়েক আগে তবে রামদয়াল মাঝেমধ্যে আমাকে ফোন করে ওখানকার খবরাখবর জানায় বাংলোটার বুকিং হলে সে খবরও দেয় এজন্য অবশ্য আমি ওকে পারিশ্রমিকও দিই আসলে - সারাবছর বাংলোটা দেখাশোনা করে এমাসে এখনও আমাকে ফোন করেনি করলেই আমি তোদের যাওয়ার খবরটা ওকে দিয়ে দেব
আর বাইচান্স ফোন যদি না করে?”
আরে, সেক্ষেত্রে ক’টা দিন দেখে আমিই ওর সাথে যোগাযোগ করব ওর নিজের ফোন নেই বটে, তবে ওদের বাড়ির পাশেই একটা পাবলিক বুথ আছে কোনও জরুরি দরকার থাকলে আমি ওখানেই ফোন করি রামদয়াল সাথে সাথে খবর পেয়ে যায় তুই ওসব নিয়ে চিন্তা করিস না
একথা শুনে অমলকাকু স্মার্টলি জবাব দিলেন, “না না, চিন্তার কী আছে তুই রামদয়ালের সাথে যোগাযোগ করতে না পারলেও ক্ষতি কিছু নেই আসলে কাউকে কিছু না জানিয়ে একটা অচেনা অজানা জায়গায় গিয়ে পড়ার মজাটাই আলাদা

।। দুই।।

মে-এর শেষে, নির্দিষ্ট দিনে আমরা বেরিয়ে পড়লাম মানিকচৌরির উদ্দেশ্যে অভনপুর জংশন অব্দি যেতে কোনও সমস্যা হল না আমরা ওখানে বেলা দু’টো নাগাদ পৌঁছলাম ওদিকে মানিকচৌরি যাওয়ার ট্রেন বিকাল সাড়ে চারটেয় স্টেশনটা মোটেই ছোটো নয় তবে লোকজন খুব একটা নেই ট্রেনের জন্য প্রায় আড়াই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে তাই আমরা টিকিট কেটে প্লাটফর্মের একপ্রান্তে থাকা একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম লাগেজ আমাদের বেশি হয়নি প্রত্যেকেই একটা করে ন্যাপ-স্যাক নিয়েছি তাই চলাফেরায় কোনও অসুবিধা হচ্ছে না
অভনপুরে পৌঁছনোর পর থেকেই সাত্যকিকাকুর মুখ থেকে শোনা ট্রেন ডাকাতির ব্যাপারটা আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল তবে টিকিট কাউন্টারের পাশে একটা জি.আর.পি. বুথ দেখে আমাদের মনে বেশ সাহস এল অমলকাকু বললেন, “বুঝলি, ট্রেনেও বোধহয় পুলিশ থাকবে তাই টেনশনের কিছু নেই
সঞ্জু সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমাদের মোটেই টেনশন হচ্ছে নাতারপর আমার হাতটা টেনে বলল, “ দীপু, ছোটকা এখানে একা বসে খানিক টেনশন করুক আমরা বরং প্লাটফর্মের ওদিকটা একটু ঘুরে আসি
হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে এলাম প্লাটফর্মের একেবারে অন্যপ্রান্তে দেখি সামনেই একটা ফাঁকা জায়গা সেখানে একটা ছোট্ট মেলার মতো বসেছে মাটিতে পলিথিন বিছিয়ে নানারকম জিনিস বিক্রি হচ্ছে বাচ্চাদের খেলনা-বেলুন, মেয়েদের চুড়ি-হার-কানের দুল যেমন আছে, তেমনই চপ-সামোসা-জিলিপিও পাওয়া যাচ্ছে আমি আর সঞ্জু মেলাটা একচক্কর ঘুরে নিলাম এক জায়গায় একটা বাচ্চা ছেলে রঙ-বেরঙের পাথর-বসানো আংটি বিক্রি করছিল প্রতিটার মূল্য দশ টাকা আর একজন বয়স্ক মহিলা বেশকিছু ঠাকুরের ছবি নিয়ে বসেছিলেন
ওখান থেকে দূরে একটা ছোট্ট পাহাড় দেখা যাচ্ছিল বিকালের পড়ন্ত আলোয় বেশ সুন্দর লাগছিল চারপাশটা আমি সেদিকে তাকিয়ে বেশ বিভোর হয়ে গেলাম সঞ্জুর ডাকে আমার সম্বিৎ ফিরল আমরা দু’জন আবার প্লাটফর্মে উঠে এলাম একটা লোক ওখানে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা বিক্রি করছিল আমরা দু’জনে তাই কিনে খেতে শুরু করলাম একটু বাদেই চোখে পড়ল, অমলকাকু হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছেন ওঁর চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ আমাদের সামনে এসে প্রথমে তো কিছু বলতেই পারলেন না তারপর দু’ঢোঁক জল খেয়ে যা বললেন তার সারাংশ হল, আমরা চলে আসার পর অমলকাকু একটা ম্যাগাজিন খুলে পড়ছিলেন এমন সময়ে একটা বিকট-দর্শন ডাকাত হঠাৎই এসে ওঁর হাতঘড়িটা কেড়ে নিয়েছে কাকু কোনওমতে পালিয়ে এসেছেন
কাকুর মুখে ডাকাতির গল্প শুনে আমরা তো তবে চারদিকে তাকিয়ে কোনও ডাকাতের দেখা মিলল না এই সময়ে সঞ্জু খপ করে অমলকাকুর হাতটা ধরে বলল, “দিনেদুপুরে প্রকাশ্য রেল স্টেশনে ঘড়ি ছিনতাই! এর একটা বিহিত হওয়া দরকার চলো তো জি.আর.পি. বুথটাতেএই বলে একরকম টানতে টানতে অমলকাকুকে নিয়ে যেতে লাগল
বুথে ঢুকে দেখি একজন অফিসার চেয়ারে বসে আছেন সঞ্জু অফিসারকে বেশ উত্তেজিত স্বরে বলল, “মেরা আঙ্কেল কা এক রিস্টওয়াচ...”
কিন্তু ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই অফিসার ভদ্রলোক ড্রয়ার থেকে একটা হাতঘড়ি বের করে বললেন, “ইয়ে ক্যায়া?”
আরে, এটাই তো অমলকাকুর সেই খোয়া যাওয়া রিস্টওয়াচ! আমরা সবাই তো একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম অভনপুরের জি.আর.পি-দের কী অভাবনীয় দক্ষতা ছিনতাই হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে চুরি যাওয়া মাল উদ্ধার করে ফেলেছে!
কিন্তু একটু বাদেই আসল ব্যাপারটা জানা গেল অফিসার আমাদের বললেন যে একটু আগে একজন স্থানীয় মানুষ এসে ওঁকে ঘড়িটা জমা দিয়ে গেছে সে অফিসারকে বলেছে যে প্লাটফর্মের বেঞ্চে বসে থাকা এক চশমাপরা যাত্রীকে সে টাইম জিজ্ঞাসা করেছিল তখন যাত্রীটি তড়িঘড়ি তার ঘড়িটা খুলে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেছে
জি.আর.পি. অফিসারের মুখে অমলকাকুর ঘড়ি ছিনতাইয়ের এ হেন গল্প শুনে আমার তো ভীষণ হাসি পেয়ে গেল আর অমলকাকু পড়লেন এক অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে কী করবেন, কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না শেষটায় আমতা আমতা করে আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “আসলে লোকটা গম্ভীর মুখে ওর নিজস্ব ভাষায় আমার ঘড়িটার দিকে আঙুল দেখিয়ে টাইম জানতে চেয়েছিল আমি তাই ভাবলাম...”
সঞ্জু আর কাকুকে কথাটা শেষ করতে দিল না একটু তাচ্ছিল্যের সুরেই বলল, “ছিঃ ছোটকা! তুমি যে এতটা ভীতু তা তো আগে জানতাম না একজন সাদামাটা সৎ দেহাতি মানুষকে বেমালুম ডাকাত বানিয়ে দিলে?”
অমলকাকু তখন মুখটা নামিয়ে মিনমিন করে বললেন, “বড়ো ভুল হয়ে গেছে এই ব্যাপারটা আবার বাড়িতে ফিরে তোর কাকিমাকে বলিস না প্লিজ


।। তিন।।

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আমরা মানিকচৌরি পৌঁছলাম তারপর টাঙ্গায় চড়ে দুর্গাচক ওখানে সাত্যকিকাকুর বাংলোটা খুঁজে পেতে একটুও অসুবিধা হল না তালাবন্ধ বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম বাংলোটা নেহাত ছোটো নয়, চারপাশে অনেকটা জায়গাও আছে আর গোটা এলাকাটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা গেট দিয়ে যতটা দেখা যায় তাতে বোঝা গেল ভিতরে অনেক গাছপালাও আছে
দুর্গাচক মোড়ে বেশ কিছু দোকানপাট আছে একটা হোটেল দেখে অমলকাকু বললেন, “সাড়ে সাতটা বেজে গেছে এসব এলাকায় আবার দোকানপাট তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায় চ, আমরা আগে হোটেলটায় ঢুকে রাতের খাওয়াটা সেরে নিই তারপর রামদয়ালের খোঁজ করা যাবে
হোটেলে ঢোকার আগে অবশ্য আমরা একটা ফোন বুথ থেকে আমাদের মানিকচৌরি পৌঁছানর সংবাদটা বাড়িতে দিয়ে দিলাম আসলে অমলকাকুর মোবাইলে কোনও টাওয়ার ছিল না ওখানে নাকি বি.এস.এন.এল. ছাড়া কোনও ফোনেরই টাওয়ার বিশেষ পাওয়া যায় না যাই হোক, হোটেলে রুটি-তড়কা খেতে খেতেই রামদয়ালের বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেল হোটেল মালিক রামদয়ালকে ভালোই চেনে আর ওর বাড়িটাও খুব কাছে সে একটা ছেলেকে রামদয়ালের কাছে পাঠাল আমাদের আসার খবর দিতে আমাদের খাওয়া শেষ হতে না হতেই দেখি রামদয়াল হাজির হয়েছে
সে বলল যে গত পরশু সাত্যকিকাকু তাকে আমাদের আসার খবর জানিয়েছে আমরা ততক্ষণে কলকাতা থেকে রওনা হয়ে গিয়েছিলাম না হলে রামদয়াল নাকি মানিকচৌরি আসতে আমাদের বারণ করে দিত কারণ, মাসখানেক হল বাংলোটায় একটা ভূত আস্তানা গেড়েছে তার উপদ্রবে রামদয়াল নাকি আজকাল আর বাংলোতে ঢুকতে সাহস করে না এবং আমরাও যেন ওখানে ঢোকার চেষ্টা না করি রামদয়াল তার বাড়িতেই আমাদের তিনজনের থাকার ব্যবস্থা করেছে
কেন জানি না, ভূতের গল্পটা আমাদের কারোরই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হল না তাই আমরা তিনজনেই বেঁকে বসলাম রামদয়ালকে জানালাম, বাংলোতেই আমরা রাত কাটাব দেখি ভূত আমাদের কী করে! কিন্তু রামদয়ালও নাছোড়বান্দা কিছুতেই আমাদের বাংলোয় যেতে দেবে না যাই হোক, অনেক পীড়াপীড়ির পর তার কাছ থেকে বাংলোর চাবিটা পাওয়া গেল তখন আবার লোড শেডিং হয়ে গেছে এমনটা নাকি হামেশাই হয় কখন কারেন্ট আসবে তার ঠিকঠিকানা নেই তাই রামদয়ালের কাছ থেকে একটা হ্যাজাকও চেয়ে নিতে হল কিন্তু আমাদের সাথে বাংলোয় রাত কাটাতে রামদয়াল কিছুতেই রাজি হল না
অতঃপর রামদয়ালের দেওয়া জ্বলন্ত হ্যাজাকটা সঙ্গে নিয়ে আমরা লোহার গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়লাম নুড়ি বিছানো সরু একটা রাস্তা কিছুটা এগিয়ে একটা পরিত্যক্ত ফোয়ারার সামনে দু’ভাগ হয়ে গেছে এবং দু’টো রাস্তাই আলাদা আলাদাভাবে শেষ হয়েছে দু’টো ছোটো সিঁড়ির সামনে সিঁড়ি দু’টো দিয়েই বাংলোর সামনের বিশাল বারান্দাটায় ওঠা যায়
যে ফোয়ারাটার কথা বললাম সেটাও বেশ বড়ো মাপের, পাথর বসানো ঠিক যেন একটা চায়ের প্লেট, যার মধ্যিখানে একটা লম্বা লোহার নল দাঁড়িয়ে আছে নলটার গায়ে লতা-পাতা-ফুল-ফলের কারুকার্য আমার খালি মনে হচ্ছিল, ফোয়ারাটা দিয়ে যদি জল বের হত তাহলে খুব সুন্দর লাগত
আমরা তিনজনই বারান্দায় উঠলাম সেখানে বড়োই অন্ধকার হ্যাজাকের আলোয় দেখলাম বাংলোর ভিতরে ঢোকার একটাই বড়ো দরজা এবং সেটা তালাবন্ধ সঞ্জু তালাটা খুলতে যাবে, এমন সময়ে অমলকাকু বললেন, “রামদয়াল তো বলছিল যে বাংলোর ভিতরে মাসখানেক ঢোকেনি তাই ভিতরটায় নিশ্চয়ই খুব ধুলো আর ঝুল জমে আছে সাপখোপও বাসা করতে পারে তাই আমি ভেবে দেখলাম, আজ রাতে ভিতরে ঢোকাটা আমাদের উচিত হবে না আজ বরং আমরা রামদয়ালের বাড়িতেই থেকে যাই কাল সকালে না হয়...”
এটুকু শুনেই সঞ্জু বলে উঠল, “ওসব ধুলো সাপ কিচ্ছু নয়, তুমি আসলে ভূতের ভয়ে ভিতরে যেতে চাইছ না সত্যি ছোটকা, তোমার মতো এত হাইলি এডুকেটেড ভীতু মানুষ পৃথিবীতে আর একটিও নেই! বাড়ি ফিরে তোমার এই ভীরুতার কাহিনি আমি অবশ্যই কাকিমার কাছে ফাঁস করে দেব আর হ্যাঁ, ঘড়ি ছিনতাইয়ের ব্যাপারটাও গোপন থাকবে না
অমলকাকু তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমাকে ব্ল্যাকমেল করছিস? কী আর করা যাবে ঢোক ভিতরে
ততক্ষণে সঞ্জু তালা খুলে ফেলেছে একটা হালকা ধাক্কা দিতেই দরজাটাও খুলে গেল কিন্তু ভিতরে এতটুকু ধুলো বা ঝুলের দেখা মিলল না মনে হল কেউ যেন নিয়মিত বাড়িটা ঝাড়পোঁছ করে আমি অবাক হয়ে বললাম, “রামদয়াল কি আমাদের মিথ্যা বলল নাকি বল তো! যে বাড়িতে একমাস কেউ ঢোকেনি, সে বাড়ি কখনও এত পরিষ্কার হতে পারে?”
সঞ্জু বলল, “তুই একদম ঠিক বলেছিস যে কোনও কারণেই হোক চাইছিল না যে আমরা বাংলোটার ভিতরে ঢুকি তাই আমাদের মিথ্যা ভূতের গল্প বলেছে
আই কন্ট্রাডিক্ট রামদয়াল হ্যাজ টোল্ড ইউ দ্য ট্রুথ
কণ্ঠস্বরটা আমাদের কারোর নয় প্রথমটা আমরা সকলেই বেশ চমকে গেলাম তারপর হ্যাজাকের আলোয় দেখলাম, দোতলা থেকে একটা লম্বা লোক, পরনে ফুল প্যান্ট হাফ শার্ট, সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নিচে নেমে আসছে আমাদের মধ্যে সঞ্জুই প্রথম মুখে ভাষা খুঁজে পেল জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে? বাড়িটা তো বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল তাহলে আপনি ভিতরে ঢুকলেন কী করে?”
লোকটা উত্তরে বলল, “আই অ্যাম অনিরুদ্ধ গোমস অ্যান্ড ইউ শুড নো দ্যাট ঘোস্ট ক্যান ইনট্রুড ইভেন থ্রু ক্লোজড ডোর
তার মানে রামদয়াল যে ভূতের কথা বলেছিল, তা সত্যি! এবং আমরা এখন অনিরুদ্ধ গোমস নামক এক ভূতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি! একথা ভেবেই আমার হাত পা অবশ হয়ে এল অমলকাকুরও মুখচোখ দেখলাম শুকিয়ে গেছে কেবল সঞ্জুর মধ্যে খুব একটা ভাবান্তর চোখে পড়ল না অনিরুদ্ধকে বলল, “বাংলাটা তো আপনি ভালোই বোঝেন দেখছি আর অনিরুদ্ধও তো বাঙালি নাম তাহলে খামোকা ইংরাজিতে কথা বলছেন কেন? ভিনরাজ্যে এসে একজন বাঙালির সাথে ইংরাজিতে কথা বলতে কারো ভাল লাগে?”
একথা শুনে ভূতটা একটু ধাক্কা খেয়েছে মনে হল সে এবার বাংলাতেই বলল, “তুমি ঠিকই ধরেছ আমি বাঙালিই বটে আমার বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা সবই কলকাতায়, শ্যামবাজারে আমার মাও পুরোদস্তুর বাঙালি, তবে আমার বাবার শরীরে কিন্তু ব্রিটিশ রক্ত বাবার ঠাকুরদা রিচার্ড গোমস প্রথম আয়ারল্যান্ড থেকে এদেশে এসেছিলেন তিনিও বিয়ে করেছিলেন এক বাঙালি মহিলাকে তারপর আর দেশে ফিরে যাননি তখন থেকে আমরা কলকাতায়, মানে আমাকে নিয়ে চারটে জেনারেশন
একটু থেমে গোমস আবার বলতে শুরু করল, “আমি ছোটো বেলাতেই বাবাকে হারিয়েছি মা- বাবার ব্যাবসাটা একা সামলে আমাকে বড়ো করেছেন তারপর ম্যানেজমেন্ট পড়তে মা আমাকে লন্ডনে পাঠান ওখানেই মাস দুয়েক আগে একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে আমার মৃত্যু হয় একে গায়ে ব্রিটিশ রক্ত বইছে, তার ওপর আবার ইংল্যান্ডের মাটিতে কফিনবন্দি হয়েছি, তাই আমার কথার মধ্যে ইংরাজিটা নরম্যালি চলে আসে আর কি
একথা শুনে সঞ্জু সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এই হচ্ছে আপনাদের সমস্যা বাংলায় বড়ো হলেন, লেখাপড়া শিখলেন, তারপর ক’দিনের জন্য ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংরেজ বনে গেলেন এসব আমি একদম সহ্য করতে পারি না আর ব্রিটিশ রক্তের কথা একদম বলবেন না যাঁর বাবার ঠাকুরদা বাঙালি মেয়ে বিয়ে করেছিলেন তাঁর শরীরে এখনও ব্রিটিশ রক্ত অবশিষ্ট আছে বলে আমি মনে করি না
এই কথার প্রেক্ষিতে গোমস প্রথমটা কী বলবে ভেবে পেল না তারপর একটু সিরিয়াস হয়ে বলল, “ওকে, আমি বাংলাতেই বলছি, তোমরা এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাও আমি এই বাংলোতে কোনও মানুষের উপস্থিতি টলারেট মানে বরদাস্ত করব না আর আমার কথা যদি না শোনো তাহলে তোমরা কেউই আর মানুষ থাকবে না, এই বলে দিলাম
এবার অমলকাকু ক্ষীণ স্বরে বললেন, “তাহলে আপনি বলতে চাইছেন যে আপনি মানুষ নন, মানে আপনি ভূত!”
একজ্যাক্টলি, মানে আপনি ঠিকই ধরেছেন,গোমস গম্ভীর স্বরে জবাব দিল
সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জু জিজ্ঞাসা করল, “কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন?”
সঞ্জুটার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? একটা ভূতের কাছে তার ভূত হওয়ার প্রমাণ চাইছে! আমি ভাবলাম সঞ্জুর কথায় গোমস ভীষণ রেগে যাবে আর ওর গলা টিপে ধরবে কিন্তু তেমনটা হল না গোমস আরও গম্ভীর হয়ে বলল, “কী প্রমাণ চাও বলো?”
সঞ্জু বলল, “ভূতেরা শুনেছি হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে আপনি সেটা করে দেখান
গোমস তখন একটু হতাশার সুরেই বলল, “আই কান্ট ডু দ্যাট কারণ, মাত্র দু’মাস হল আমি ভূত হয়েছি ভূত হওয়ার একবছর বাদে কারোর মধ্যে অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা জন্মায় আমি বরং তোমাকে অন্য প্রমাণ দিচ্ছিএই বলে গোমস যা করল, তাতে তো আমার ভিরমি খেয়ে যাওয়ার অবস্থা হঠাৎই নিজের বাঁ হাতটা খুলে সেটা ডান হাতে ধরে বাঁই বাঁই করে ঘোরাতে লাগল তারপর খোলা হাতটা দিয়েই নিজের পিঠটা খানিক চুলকে নিয়ে সেটা আবার আগের জায়গায় বসিয়ে দিল
আমরা তো বটেই, সঞ্জুও দেখলাম এই দৃশ্য দেখে বেশ ঘাবড়ে গেছে কিন্তু নিমেষে নিজেকে সামলে নিল গোমসকে ক্যাজুয়েলি বলল, “আমাদের পাড়ার পাঁচুর ঠাকুমাও শুনেছি ভূত হওয়ার পর নিজের মুন্ডুটা হাতে নিয়ে উকুন বাছত তবে ভূত হওয়া সত্ত্বেও সে গিরগিটি দেখলে খুব ভয় পেত কোনও গিরগিটি দেখলে তার ত্রিসীমানায় থাকত না
আমি আর সঞ্জু একপাড়াতেই থাকি আমাদের পাড়ায় কোনওকালে পাঁচু নামে কোনও ছেলে ছিল না স্বভাবতই তার ঠাকুমারও কোনও অস্তিত্ব নেই আর ঠাকুমাই যদি না থাকে তাহলে তার ভূতই বা থাকবে কীভাবে! তাই সঞ্জুর বক্তব্যের মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না ওদিকে সঞ্জুর মুখে গিরগিটির কথা শুনে গোমস মন্তব্য করল, “আমিও একটা জিনিসে ভীষণ ভয় পাই তবে সেটা গিরগিটি নয় ককরোচ, মানে আরশোলা সেজন্য এই বাংলোর দক্ষিণের গুদাম ঘরটাতে আমি কখনও ঢুকি না ওখানে প্রচুর ককরোচ আছে
এরপর হঠাৎ বেশ গম্ভীর হয়ে গোমস বলল, “যাই হোক, আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই তোমরা এখনই এই বাংলো ছেড়ে চলে যাও না হলে আমার কাজে বাধা পড়বে সেটা আমি মোটেই বরদাস্ত করব না
আমি ভেবেছিলাম সঞ্জু বুঝি গোমসের কথার প্রতিবাদ করবে কিন্তু তা করল না উল্টে বলল, “ঠিক আছে, আমরা এক্ষুনি চলে যাব তার আগে আমি একটু বাইরে গিয়ে রামদয়ালের খোঁজটা করে আসি আজ রাত্তিরটা তো ওর বাড়িই থাকতে হবেএই বলে আমাদের কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আমার তো তখন ভয়ে মূর্চ্ছা যাওয়ার অবস্থা অমলকাকুর মুখটাও ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ঐরকম একটা ভয়ানক পরিস্থিতিতে আবার গোমস আমাদের কাছ থেকে নানাকিছু জানতে চাইছিল আমাদের পরিচয়, বাসস্থান, পেশা এইসব আর কি! আর একরকম কাঁপতে কাঁপতে আমরা অ্যাংলো ভূতটার ঐসব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলাম
পাঁচ মিনিটের মধ্যে সঞ্জু হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল পিঠের স্যাকটা নামিয়ে রেখে হঠাৎই এগিয়ে গেল গোমসের দিকে তারপর যা করল তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না নিজের হাতটা তুলে ধরল গোমসের মুখের সামনে আমরা হ্যাজাকের আলোয় দেখলাম সঞ্জু একটা জ্যান্ত আরশোলার শুঁড় ধরে আছে আর পোকাটা অবস্থায় ফড়ফড় করছে পোকাটাকে নাচাতে নাচাতে বলল, “কোন মতলবে এখানে এসেছ সেটা এক্ষুনি বলে ফেল চাঁদু না হলে আরশোলাটা তোমার গায়ে ছেড়ে দেব তখন মজা বুঝবে
আরশোলাটাকে দেখামাত্র গোমসের চোখমুখ বদলে গেল বুঝলাম ভীষণ ভয় পেয়েছে আমি এই প্রথম কোনও ভূতকে ভয় পেতে দেখলাম আর অমলকাকু এই দৃশ্য দেখে আমাকে ফিসফিস করে বললেন, “হতভাগা সঞ্জুটার কাণ্ড দেখেছিস! এই ঘরে ঢোকার জন্য একটু আগে আমাকে ব্ল্যাকমেল করছিল আর এখন ঘরে থাকার জন্য অ্যাংলো ভূতটাকে করছে
গোমস ইতিমধ্যে ভয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠার চেষ্টা করছিল কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কয়েক ধাপ উঠেই পড়ে গেল হুমড়ি খেয়ে আর সঙ্গে সঙ্গে ওর বাঁ হাতটা খুলে গিয়ে লাট খেতে খেতে এসে পড়ল একেবারে সঞ্জুর পায়ের কাছে সঞ্জু সেটা হাতে তুলে নিয়ে বলল, “বাঃ, চমৎকার জিনিস যা ফিনিশিং তাতে এদেশের নয় বলেই মনে হচ্ছে আর কি, এটা যথাস্থানে লাগিয়ে নাও হাতকাটা গোমসকে দেখতে মোটেই ভাল লাগছে না তারপর কেন ভূত সাজার প্রয়োজন হল, সেটা বলে ফেল
সঞ্জুর বাঁ হাতে তখনও আরশোলাটা ঝুলছে সেটাকে দেখিয়ে গোমস বলল, “আগে ডেঞ্জারাস ক্রিয়েচারটাকে বিদায় কর না হলে আমার পক্ষে কিছু বলা বা করা সম্ভব নয়
সঞ্জু এবার আমাকে একটা প্লাস্টিক প্যাকেট বের করতে বলল সেটার মধ্যে আরশোলাটাকে ভরে প্যাকেটের মুখটা গিঁট বাঁধতে বাঁধতে বলল, “আশা করি এই ডেঞ্জারাস ক্রিয়েচারটাকে আর বের করার দরকার হবে না নাও, এবার সত্যি কথাটা বলে ফেল দেখি

।। চার।।

গোমস অগত্যা বলতে শুরু করল, “আমি একটু আগে নিজের সম্পর্কে যা যা বলেছি তা সবই সত্যি, শুধু মৃত্যুর ব্যাপারটা বাদ দিয়ে ইংল্যান্ডে আমার অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু আমি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম তবে বাঁ হাতটা অ্যামপুট করতে হয়েছিল মাস ছয়েক বাদে ওখানেই এই আর্টিফিসিয়াল লিম্বটা লাগিয়ে নিই তারপর দেশে ফিরে আসি
সে নয় বুঝলাম, কিন্তু সেই শ্যামবাজার থেকে এই মানিকচৌরি এসেছ কী উদ্দেশ্যে?” সঞ্জু আবার জিজ্ঞাসা করল
আমার অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে
মানে?”
আসলে আমি এই বাংলোয় এসেছি একটা আংটির সন্ধানে ওটা আমি আমার মুমূর্ষু মায়ের হাতে তুলে দিতে চাই সেটাই মায়ের শেষ ইচ্ছা একটা ধাঁধায় বলা আছে আংটিটা এই বাংলোর ঠিক কোথায় রাখা আছে ধাঁধাটার আবার গোটাটাই অঙ্ক আমি চিরকালই অঙ্কে বড্ড কাঁচা তাই গত একমাস ধরে অনেক চেষ্টা করেও ধাঁধাটার মানে উদ্ধার করতে পারছি না তাই বাধ্য হয়েই এখানে পড়ে থাকতে হচ্ছে
সঞ্জু সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ও, এই ব্যাপার! তা তুমি ধাঁধাটা আমার ছোটকাকে বল উনি ম্যাথমেটিক্সে ডক্টরেট তোমার সমস্যা মিটে যাবে
আগেই বলেছি, অঙ্কের কথা শুনলেই অমলকাকুর মন ভালো হয়ে যায় এক্ষেত্রেও তেমনটাই হল সব ভয় জড়তা দূরে সরিয়ে রেখে কাকু বেশ কৌতূহলী হয়ে গোমসকে বললেন, “কই, বল তো ধাঁধাটা দেখি সলভ্করতে পারি কি না
সঙ্গে সঙ্গে গোমস ওর পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে কাকুর হাতে দিল তাতে লেখা আছে -
পশ্চিমে মেপে     তিন গজে চেপে
সাত গুণে যাই
গুণ করে পাই
ভাগ করি তাই,     ঠিক একাদশটাই
                      
ভাগফল শেষে     যেখানেই মেশে
এক মহাকবি পাই,
অর্ধে মোদের ঠাঁই
সাথে পাঁচ-পা যুক্ত,     হাতখানা অতিরিক্ত

ওই দুটোর বর্গ     কষে দেয় দৈর্ঘ্য
সেখানেই আছে
ফলখানা গাছে,
ধরে তার বোঁটাটি     চাপ দিলেই আংটি

ধাঁধাটা অমলকাকু আমাদের সকলকে পড়ে শোনালেন গোমস বলল যে ধাঁধার তিন গজ মানে যে আসলে পাথরে খোদাই করা তিনটে হাতি, এই ব্যাপারটা ছাড়া গত একমাসে সে আর কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি তারপর সে আমাদের দোতলার সিঁড়িটা যেখান থেকে উঠেছে, তার সামনের দেওয়ালটার কাছে নিয়ে গেল দেখি দেওয়ালে একটা সাদা পাথরখণ্ড আটকানো আছে আর তাতে খোদাই করা আছে তিনটি হাতি
আমি এতক্ষণে মনে একটু বল পেয়েছি গোমসকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, আংটিটা এই বাংলোয় এল কী করে? আর ধাঁধাটাই বা তুমি পেলে কোথা থেকে?”
গোমস জবাবে যা বলল তা সংক্ষেপে এইরকম - আংটিটা আসলে গোমসের মায়ের এক দূর সম্পর্কের দাদা শচীন্দ্রনাথ চৌধুরীর উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি তো বিশাল ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেনই, তাছাড়া ব্যবসা করেও নাকি প্রচুর টাকা রোজগার করেছিলেন এসব সত্ত্বেও ভদ্রলোক ছিলেন একটু খামখেয়ালি প্রকৃতির ধাঁধা আর অঙ্কের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল আজ থেকে বিশ বছর আগে তাঁর একমাত্র ছেলে বৌ-বাচ্চা নিয়ে সিকিম বেড়াতে গিয়েছিল সেখানেই এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ওদের গাড়িটা দু’শো ফুট নিচে খাদে পড়ে যায়
এই ঘটনার পরেই শচীনবাবুর মানসিক সুস্থিতি কিছুটা নষ্ট হয়ে যায় উনি ব্যবসা-ট্যাবসা সব ছেড়ে দেন তারপর প্রায় জলের দরে নিজের নানা সম্পত্তি বেচে দিতে শুরু করেন আমাদের সাত্যকিকাকুর জ্যাঠামশাই এই সময়েই শচীনবাবুর কাছ থেকে মানিকচৌরির এই বাংলোটা কিনেছিলেন
যাই হোক, মানসিক বিকার দেখা দিলেও শচীনবাবুর খামখেয়ালিপনা বা ধাঁধার প্রতি আসক্তি এই সময়ে কমেনি বই বেড়েছে তিনি এইসময়ে প্রায়শই তাঁর বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে হাজির হতেন এবং একটা করে অঙ্কের ধাঁধা দিয়ে আসতেন এইভাবেই মৃত্যুর কিছুকাল আগে তিনি শ্যামবাজারে গোমসের মায়ের কাছে উপস্থিত হন এই ছড়াটা দিয়ে বলেন, সাধ্যে কুলোলে গোমসের মা যেন মানিকচৌরির বাংলোয় এসে মহামূল্যবান আংটিটা উদ্ধার করে নিয়ে যান এটা বছর কুড়ি আগেকার ঘটনা গোমস তখন ছোটো গোমসের মা ধাঁধাটাকে দাদার নিছক মস্তিষ্কবিকার ভেবে আর মানিকচৌরি আসার কথা ভাবেননি
কিন্তু এই ঘটনার প্রায় বিশ বছর বাদে, গোমস তখন ইংল্যান্ডে ম্যানেজমেন্ট পড়তে গেছে। ভদ্রমহিলা জানতে পারেন যে তাঁর আরেক বোন শচীনবাবুর দেওয়া ধাঁধা সমাধান করে মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরের কোনও একটা কটেজ থেকে একটা মহার্ঘ্য সোনার হার উদ্ধার করেছে ব্যস, একথা জানার পরেই ভদ্রমহিলার মন ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে তিনি ছেলে কবে বিলেত থেকে ফিরবে সেজন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন কারণ, ইতিমধ্যে তিনি পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন অসুস্থ শরীরে তাঁর পক্ষে কলকাতা থেকে মাণিকচৌরি আসা সম্ভব ছিল না ওদিকে অ্যাক্সিডেন্টটা হওয়ার জন্য গোমসের বাড়ি ফেরা প্রায় ছ’মাস পিছিয়ে যায় এই সময়ে ওর মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন ক্যানসারের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল কিন্তু ছেলেকে বিলেতে পড়াতে গিয়ে তাঁর হাত তখন একেবারে খালি
বাড়ি ফিরে গোমস মায়ের অবস্থা দেখে খুবই ভেঙে পড়ে বুঝতে পারে মাকে এই পৃথিবীতে আরও ক’বছর টিকিয়ে রাখতে গেলে ভালো ট্রিটমেন্ট একান্ত জরুরি এবং তার জন্য দরকার কয়েক লাখ টাকা এই সময়েই মায়ের কাছ থেকে শচীনবাবুর ধাঁধাটা পায় গোমস আর দেরি করেনি পাশের বাড়ির একজনকে মায়ের দেখাশোনার ভার দিয়ে মানিকচৌরি চলে এসেছে রামদয়াল ওকে প্রথমে বাংলোয় ঢুকতে দেয়নি শেষটায় টাকার লোভ দেখিয়ে গোমস কোনওভাবে ওকে ম্যানেজ করেছে
গোমস ভেবেছিল খুব বেশি হলে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ধাঁধাটার সমাধান করে ফেলতে পারবে কিন্তু শচীনবাবু এতো অঙ্ক ঢুকিয়ে ওর আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন ফলে গোমসের বাড়ি ফেরা হচ্ছে না মায়ের চিকিৎসার ব্যাপারটাও পিছিয়ে যাচ্ছে
পুরো গল্পটা শুনে গোমস যে তার মাকে খুব ভালোবাসে সেটা বেশ বোঝা গেল বুঝলাম এই বাংলোয় যাতে বাইরের কোনও লোক হুট করে ঢুকে পড়তে না পারে তার জন্য ওকে বাধ্য হয়েই ভূত সাজতে হয়েছে আর গরিব রামদয়াল টাকার লোভে ওর সাথ দিয়েছে তবে আংটির গল্পটা রামদয়াল জানে না
গোমসের মুখে সবটা শুনে সঞ্জু ওকে বলল, “আমার বিশ্বাস ছোটকা দু’একদিনের মধ্যেই এই ধাঁধাটা সলভ করে ফেলবে যাই হোক, এখন আর ওসব ভালো লাগছে না, খুব টায়ার্ড লাগছে তুমি আমাদের শোওয়ার ঘরটা দেখিয়ে দাও
এই সময়েই কারেন্ট এসে গেল গোমস আমাদের তিনজনকে গোটা বাংলোটা একবার ভালো করে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল দোতলার একটা ঘরে ঘরের খাটটা বিশাল আমরা তিনজনেই অনায়াসে এঁটে যাব ঘরটায় চেয়ার টেবিলও পাতা আছে গোমস একটা জলের জাগও দিয়ে দিল অমলকাকু ওকে বললেন, “ভাই গোমস, আমাদের কারোরই আজ আর ধাঁধাটা নিয়ে মাথা ঘামানোর অবস্থা নেই আমরা ভীষণ ক্লান্ত তবে কাল সকাল থেকেই আমরা কাজ শুরু করে দেব ছড়াটা পড়ে মনে হল আংটিটা খুঁজে বের করতে অনেক মাপজোখ করতে হবে তাই একটা মেজারিং টেপ হলে বড়ো ভালো হত
গোমস সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ওটা আমি আগেই জোগাড় করেছি কিন্তু জিনিসটা আমার কোনও কাজে লাগেনিবলেই পকেট থেকে একটা ফিতে বের করে কাকুর হাতে ধরিয়ে দিল
_____
ছবিঃ পুষ্পেন মন্ডল

No comments:

Post a comment