Showing posts with label হরর ফাইলস. Show all posts
Showing posts with label হরর ফাইলস. Show all posts

হরর ফাইলস:: পোর্ট ট্যালবটের ভূতুড়ে ক্যাসলে - অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী


পোর্ট ট্যালবটের ভূতুড়ে ক্যাসলে
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

প্রথমেই জানাই, ভূতের গল্প যারা লেখেন, তাদের কাছে ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাওয়া একদমই ঠিক কথা নয়। এ যেন গয়লার কাছে দুধে জল আছে কিনা জানতে চাওয়া। তাও তোমাদের পত্রিকার সদস্য সংখ্যার কথা মাথায় রেখে লিখছি, এটা ভেবে যে একথা পাঁচকান হবে না।
আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। ভূত কেন, ওই নামের কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না। আমার কাছে ভূতো বলে একজন ড্রাইভার এসেছিল, তাকে কাজে রাখিনি। ‘অদ্ভুত’ আমার খুব প্রিয় শব্দের তালিকায় পড়ে। মাঝে মধ্যেই বলি অদ্ভুত সুন্দর, অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। এক ধরণের ভূত বিরোধিতাই বলতে পারো।
তা এবার আসল কথায় আসা যাক। একরকম অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। তাকে ভৌতিক বলব নাকি বলব না, সে বিচার তোমাদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।
সাধারণত লেখার সময় একটা ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করি। পর্দা অকারণে নড়ে, ছায়ামূর্তি ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে, টেবিলের নিচ থেকে হঠাৎ করে কারুর হাত বেরিয়ে আসে। সব মিলিয়ে পাঠকরা বলে পড়ার সময় গা ছমছম করছিল।
এক্ষেত্রে সেটা ইচ্ছে করেই করব না। ঠিক যেরকম হয়েছিল, কমা, ফুলস্টপ বাদ দিয়ে ঠিক সেভাবেই প্রকাশ করছি।
এটা বেশ কয়েকমাস আগের কথা। শীতের শেষ দিক। ঠাণ্ডা তখন বেশ ভালোই। ওয়েলসে মারগাম ন্যাশনাল পার্কে এক পুরনো ক্যাসলে গিয়েছিলাম। ক্যাসল বলতে আমরা যা ভাবি এটা ঠিক সেরকম নয়, বলা যায় ওই আদলে তৈরি ১৮০০ সালের একটা বিশাল প্যালেস যিনি তৈরি করেছিলেন সেই ট্যালবট-এর নামেই পরে শহরের নাম হয় পোর্ট ট্যালবট।
ব্রিটেনের স্টিল ইন্ডাস্ট্রির কেন্দ্রে ওয়েলেসের এই শহর। আর তাই টাটা গ্রুপ টাটা স্টিল বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আশংকা করা হচ্ছে যে এই শহরের ৯৯ শতাংশ লোক কাজ হারাবেতাদের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই স্টিল ইন্ডাস্ট্রির উপরেই নির্ভর করেআর তাই এ নিয়ে রোজ এ শহরের নাম ইংল্যান্ডের কাগজে উঠে আসছে।
ক্যাসলটা শহরের খানিকটা বাইরে। একটা হাজার একরের বন জঙ্গল ঘেরা জায়গার মধ্যে এই বিশাল প্যালেসআমি যেদিন গিয়েছিলাম সেদিন কেন জানি না লোকের ভিড় একেবারেই ছিল না।
সকাল দশটা নাগাদ বিশাল গোথিক আর্কিটেকচারের ওই ক্যাসলের মধ্যে যখন ঢুকলাম, তখন আমি ছাড়া ওখানে আর কেউ ছিল না। কাঠের বিশাল দরজা পেরিয়ে মূল বিল্ডিং-এর মধ্যে ঢুকে পড়লাম। কিছুটা এগোতে দেখলাম একটা চওড়া মার্বেলের সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। তাতে লাল কার্পেট পাতা। কিন্তু কার জন্য এ কার্পেট পাতা কে জানে? কারণ সিঁড়ির মুখে দড়ি দিয়ে পথ বন্ধ করে লেখা আছে – ‘নো পাবলিক অ্যাকসেস’অর্থাৎ উপরে যাওয়া সাধারণের জন্য বারণ।
তা যাই হোক, নিচ থেকে বাড়ির স্থাপত্য দেখলে মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না। মাথার উপরে টিউডর স্টাইলের আর্চ। বিশাল মারবেল পাথরের ফায়ারপ্লেস। পায়ের নিচে মেঝে সাদা কালো মার্বেলের। উপরের দিকে বিশাল ওরিয়াল উইনডো। নিচের তলায় বেশ কয়েকটা সুন্দর পাথরের মূর্তি, ছবি।


তা নিচে দাঁড়িয়ে এসব দেখছি আর ভাবছি, এ বাড়ি নিয়ে ভূতের গল্প লিখলে খারাপ হত না। বাড়ির মধ্যে আলো ছায়াতে মেশানো বেশ একটা ভূতুড়ে পরিবেশ, যেটা খুব কম জায়গাতেই পাওয়া যায় ভূত বলে যদি কোন কিছুর অস্তিত্ব থেকে থাকে তো এখানেই থাকবে। এ বাড়ি নিয়ে বেশ একটা ভয় - শিহরণের অনুভূতি সহজেই তৈরি করা যায়।
শারদীয়াতে বেশ কয়েকটা পত্রিকায় ভূতের গল্প লিখব কথা দিয়েছিকিন্তু মাথায় প্রায় কিছুই আসেনি। একদিন রাতে কবরখানা গিয়ে খানিকক্ষণ কাটিয়ে এসেছি। সেদিন টিপটিপ করে বৃষ্টিও হচ্ছিল। ভূতুড়ে কোন অভিজ্ঞতাই হয়নি। ঠাণ্ডা যাতে না লাগে, তাই মাথায় টুপি টেনে কবরখানার নিচু দেওয়াল পেরিয়ে বেরোচ্ছি, হঠাৎ কোত্থেকে একটা লোক মুখোমুখি এসে পড়লসৌজন্যমূলক ভাবে ‘হ্যালো’ বলতেই লোকটা দেখি হাউমাউ করে শুনশান রাস্তা ধরে ছুটে পালাল। যেটুকু প্লটের দেখা মিলেছিল, মুহূর্তে উধাও।
তা এরকম আরও কয়েকটা জায়গায় গেছি। কিন্তু ভূতের দেখা বা প্লটের দেখা পাইনি।
তা সেদিন ওই বাড়ির একটা অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে একটা ভূতের গল্পের প্লটের কথা ভাবছি, হঠাৎ দেখি আমার পাশে আরেকটা লোক দাঁড়িয়ে আছেবেশ শক্তসমর্থ চেহারা। বয়স হয়েছে। সত্তর কি আশি হবে।
ওয়েলেস অ্যাকসেন্টে বলে উঠল - ভারতীয়?
- হ্যাঁ,
বলতে লোকটা আমার পরিচয় জানতে চাইল। কথায় কথায় জানলাম লোকটার নাম রবার্ট। ভারতীয়দের বিশেষ করে ওর খুব পছন্দ। তার কারণ ভারতের মতো শান্তির দেশ নাকি আর হয় না। ওর এখানেই জন্ম, এখানেই সারাজীবন কাটিয়েছে ওর নাতিরাও সবাই পোর্ট ট্যালবটের স্টিল প্লান্টে কাজ করে
আমি আমার পরিচয় দিলাম।
আমার পরিচয় পেয়ে লোকটা বলে উঠল - শুধু আমার ছেলে নয়, এখানে আমি যাদেরকে চিনি, সবার ভবিষ্যৎ - এখন তোমাদেরই হাতে। অনুরোধ করছি, দেখো যাতে এই প্ল্যান্ট বন্ধ না হয়।
জানালাম – সে চেষ্টাই করছি। তবে যে ভাবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, তাতে কোনও সংস্থাই এ ধরণের ব্যবসায় থাকতে চাইবে না।
লোকটা জানি না কেন – হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে উঠল - এ বাড়ির উপরতলায় যেতে চাও?
-      হ্যাঁ, যেতে তো চাই, কিন্তু উপরে ওঠা তো বারণ।
লোকটা হেসে উঠে জামায় লাগানো একটা ব্যাজ দেখিয়ে বলে উঠল - আমি ‘ফ্রেনডস অফ মারগাম পার্ক’-এর সদস্য। আমরা স্বেচ্ছায়, কোনও ধরণের পারিশ্রমিক ছাড়াই এই বাড়ি তোমাদের মতো টুরিস্টদের দেখাই আর এখানকার ইতিহাস শোনাইআমার কাছে এ বাড়ির সব বন্ধ নিষিদ্ধ ঘরগুলোর চাবি আছে।
- তা এ ঘরে যাওয়া নিষিদ্ধ কেন?
- সে কি! আসার আগে খবর নাওনি? এই ক্যাসলকে ব্রিটেনের সব থেকে বিপজ্জনক ভূতুড়ে বাড়ি বলা হয়। সারা পৃথিবী থেকে ঘোস্ট হান্টাররা এখানে আসে। ‘মোস্ট হণ্টেড হাউস’-এর উপরে যে ক’টা অনুষ্ঠান হয়, তার সবেতেই একদম উপরের দিকে এর স্থান। নানান ধরণের প্যারানরমাল আকটিভিটি এখানে হয়।
- তা আপনার কী মনে হয়? আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন?
- ধুর, আমি ও সবে বিশ্বাস করি না।
- তাহলে উপরে ওঠা নিষিদ্ধ কেন তাহলে?
- এমনিতে ওর বাইরে আরেকটা কারণও আছে। এ সব ঘরগুলোতে অনেক বিরল প্রজাতির বাদুড় আছে। লোকজনের চলাচল হলে ওদের থাকার অসুবিধে হবে, সেইজন্য এরকম ব্যবস্থা তা চল, তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি।
লোকটা এবারে সিঁড়ির পথে আটকানো দড়ি সরিয়ে আমাকে উপরে নিয়ে এল। তালা খুলে একটা ঘরে ঢুকলাম ঘরগুলো যে খুব অন্ধকার তা নয়। ধার দিয়ে কাঁচের আয়তাকার ওরিয়াল স্টাইলের জানলা। নীল রঙের দেওয়াল। তাতে কাঠের ফ্রেমে কিছু বিশাল বিশাল ছবি টাঙ্গানো। ঘরের কিছু জায়গায় পাইন কাঠের ফ্লোরিং। কয়েকটা ঘরে ঝাড় লন্ঠন আছে। আসবাব নেই বললেই চলে। গা ছমছমে পরিবেশ। একটা ঘরের মধ্যে দিয়ে আরেকটা ঘরে যাওয়া যাচ্ছে। মাঝে আর্চ শেপের দরজা। ঘরের কোনও কোনও জায়গা বেশ অন্ধকার।
একটা ঘরের মধ্যে এসে লোকটা বলে উঠল – এই ঘরটাতে অনেকবার বাচ্চাদের কান্নার গলা শুনতে পাওয়া গেছে। দিনেরাতে হঠাৎ করে বাচ্চাদের ছোটাছুটির আওয়াজ পাওয়া যায়। কয়েকমাস আগে একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা লুকিয়ে উপরে উঠে এসেছিল। পরে নেমে বলেছিল যে সে নাকি আরেকটা বাচ্চার সঙ্গে উপরে খেলছিল।
-      তাই? বাচ্চারা তো আর মিথ্যে কথা বলে না। তা আপনি নিজে কখনও শুনেছেন?
লোকটার ঠোঁটের কোণে শুধু হাসি ফুটে উঠল। বলে উঠল - বয়স হলে অনেক কিছু শোনা যায়। কোনটা কার বোঝা যায় না। তবে ওই বাচ্চার ভূতের থেকে অনেক বেশি দুর্নাম রবার্ট স্কটের ভূতের
- সে কে?
- দেড়শ বছর আগে ট্যালবটরা যখন এখানে থাকত, তখন রবার্ট স্কট এখানকার গেমকীপার ছিল। অর্থাৎ স্কটের দায়িত্ব ছিল আশেপাশের জঙ্গল ও তার পশুপাখির খেয়াল রাখা যাতে অন্য কেউ অন্যায় ভাবে ঢুকে পশুপাখি শিকার না করেএকবার এক চোরা পাচারকারীকে সে ধরে ফেলে। কিন্তু ওই পাচারকারীর গুলিতেই স্কট মারা যায়। সেই থেকেই স্কটের অতৃপ্ত আত্মা এখানে থাকে। অনেক সময় তাকে দেখা গেছে। সে নাকি খুব রেগে থাকে। তেড়ে তেড়ে আসে। পাথর ছোঁড়ে। তবে গত দশ বছরে সব ধরণের সতর্কতা নেওয়ার পরে আর সেরকম ঘটনা বেশি ঘটেনি। উপরে তো আর কাউকে আসতে দেওয়া হয় না। তবে তা সত্ত্বেও অনেক সময় দোতলার ভেতরের বারান্দায় ছায়ার মধ্যে কাউকে যেন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
আমি লোকটার কথা শুনছিলাম আর ঘুরে ঘুরে ঘরের চারদিক দেখছিলাম। ঘরের অন্ধকার কোণগুলো ভালো করে না দেখা গেলেও ঘরের ছাদের কিছু কোণে যে বাঁদুড়ের দল আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল।
সব ঘর দেখানোর পর লোকটা বলে উঠল - তুমি খুব ভাগ্যবান। যে ঘরগুলো দেখলে তা দেখার জন্য বহু লোক বহু বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকে। তোমার উপরে আমার এই শহর, আমার বংশধরেরা আজ নির্ভর করে আছে। তাই দেখালাম। আজকে এই বাড়ির যে অবস্থা, কালকে আমাদের এই শহরের সে অবস্থা হতে চলেছে স্টিল প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে গেলে ঘোস্ট টাউন। তুমি দেখো যদি কিছু করা যায়
-      অবশ্যই সবরকম চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী হয়! আচ্ছা, আপনার সঙ্গে একটা ছবি নিতে পারি?
বলে ফোন বার করলাম।
লোকটা বলে উঠল - না, না, আমার ছবি তোলা উচিত হবে না। এসব জায়গা আমার দেখানোর কথা নয়। একেবারে নিষিদ্ধ। ছবি তোলার রিস্ক আমি নিতে চাই না।
কী আর করা যাবে! লোকটার সঙ্গে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম।
নিচে তখনও কেউ নেই।
ধন্যবাদ জানিয়ে বেরনোর আগে ফের বলে উঠলাম - এর দায়িত্বে থেকেও আপনি যে বলতে পারেন, আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন না, তা বলার জন্য সত্যিই অনেক সাহস লাগে।
লোকটা হেসে বলে উঠল - মানুষ দু’ধরনের হয় জানো তো? হয় সে ভূতে বিশ্বাস করে, না হলে সে নিজেই ভূত হয় আসি।
-      মানে?
লোকটা উত্তর না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর আবার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল।
আমি আর দাঁড়ালাম না। কখন আবার মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে দেখে কে জানে! ঘরগুলো ভালো করে দেখতে গিয়ে লোকটার মুখের দিকে খেয়াল করে তাকানোই হয়নি।
দ্রুতপায়ে ক্যাসেল থেকে বেরিয়ে এলাম। লোকটার নাম যেন কী বলেছিল? রবার্ট? পুরোটা কি তাহলে রবার্ট স্কট?

_______
ফোটোঃ লেখক

হরর ফাইলস:: ভূতুড়ে কান্ডকারখানা - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


ভূতুড়ে কান্ডকারখানা
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

ম্যাজিক ল্যাম্পের জিনি আমাকে কিছু কাজ দিয়েছে। তোমাদের কয়েকটা সত্যিকারের ভূতের গল্প শোনাতে হবে। সত্যিকারের আবার ভূত হয় নাকি? ভূত মানেই তো বানানো কথা, যত সব গাঁজাখুরি গল্প। আজ্ঞে না, ভূত অনেকেই দেখেছে। একদম নিজের চোখে দেখা, মোটেই বানানো গপ্প নয়। কেউ আবার অনুভব করেছে, চোখে দেখেনি। সব গল্প তো তোমাদের শোনাতে পারব না। বেছে বেছে কয়েকটা শোনাচ্ছি। প্রতক্ষ্যদর্শীর বিবরণ।
শুরুটা আমার মাকে দিয়েই করিআমার মা দু’বার ভূতের পাল্লায় পড়েছিল। একবার দক্ষিণেশ্বরে মায়ের শ্বশুরবাড়িতে। আমি তখন খুব ছোটো। মা আমাকে নিয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। গভীর রাতে মায়ের মনে হল বুকের ওপর ভারি কিছু একটা বসে আছে। চোখ মেলতেই দেখতে পেল একজন মহিলা যার গোটা শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা, এমনকি মাথাটাও ঘোমটায় ঢাকা। মায়ের বুকে বসে গলা টেপার চেষ্টা করছে। মা ঠাকুরের নাম করতেই সেই মূর্তি ভ্যানিশ হয়ে গেল। মা কিন্তু আর ঘরে থাকার সাহস পেল না। আমাকে ফেলে রেখেই আমার আম্মাকে ডাকতে চলে গেল। আম্মা পরে বলেছিল ওই প্রেত মূর্তি আম্মার সেজো জায়ের। সে মারা গিয়েছিল কোনও এক অসুখে ভুগে। বেঁচে থাকতে সে সবার সাথে খারাপ ব্যাবহার করত, ঝগড়া করত। আমার সেজোমা অর্থাৎ সেজো জেঠিমাও এই প্রেতমূর্তি একবার দেখেছিল। সেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। সেজোমা একা ছিল। সন্ধেবেলা সব ঘরে ঘরে ধূপ দেখাচ্ছিল। হঠাৎ একটা ঘরের বাইরে থেকে একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে যায় সেজোমার। একটা চেয়ারে বসে বসে কেউ পা দোলাচ্ছে। পর্দার ফাঁক দিয়ে সেজোমা দেখেই তো ভির্মি খাবার জোগাড়। ঘরে তো কেউ নেই। তাহলে এই পা কার? সেজোমা আর ঘরে ঢোকেনি। বাইরে গেটের সামনে চলে গেল। বাড়ির বাচ্চারা সব খেলতে গেছিল। সেজোমা গেটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। একা বাড়িতে ফিরে যাবার আর সাহস পেল না। এই সাদা প্রেতমূর্তিকে বহুবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোকে দেখেছে। অনেক পুজো-আচ্চা, যাগ-যজ্ঞ করা হয়েছিল এই আত্মাকে তাড়ানোর জন্য।
এবার আসি রাঙ্গা জেঠুর কথায়। একবার ছাদে বসে রাঙ্গা জেঠু রাঙ্গামার সাথে গল্প করছে। রাঙ্গামা কোনও উত্তর দিচ্ছে না, শুধু মাথা নেড়ে যাচ্ছে। রাঙ্গা জেঠু ছাদ থেকে নিচে নেমে এসে দেখল রাঙ্গামা রান্নাঘরে। তাহলে ছাদে কে ছিল বল?
আরেক বার মাঝরাতে রাঙ্গাজেঠু ভূত দেখেছিল।  রাঙ্গাজেঠুর একটা দোকান ছিল। মাদার ডেয়ারির দুধের দোকান। অনেক রাত অবধি দোকান খোলা রাখতে হত। কারণ মাঝ রাতেই গাড়ি করে দুধ আসত। সকাল হলেই অনেকে দুধ নিতে আসত। রাঙ্গা জেঠু তখন পৈতে পড়ত না। একদিন বেশ রাত হয়ে গেছে। কোনও একটা কারণে রাঙ্গা জেঠু বাইরে গেছে। দোকানে বসে ছিল সেজোজেঠু। হঠাৎ দরজা ঠেলে রাঙ্গাজেঠু ঢুকে পড়ল । চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। দোকানে অনেক কোল্ডড্রিঙ্কস ছিল, রাঙ্গাজেঠু পর পর আট দশ বোতল খেয়ে ফেলল। সেজোজেঠু বার বার করে জিজ্ঞাসা করল কী হয়েছে?
রাঙ্গাজেঠু বলল, রাতে দোকান ছেড়ে একটু বাইরে গেছিলাম। দেখি একটা লোক হঠাৎ গাছ থেকে নেমে এলোকাছে আসতেই দেখলাম লোকটার মাথাটা নেই একেবারে কবন্ধ। কিছুটা হনুমানের মত চার পেয়ে জীব।
সেই ঘটনার পর থেকে রাঙ্গাজেঠু আবার পইতে পরা শুরু করল। তবে রাঙ্গা জেঠুর ভূত দেখার আরও একটা গল্প আছে। এর মধ্যে একটা হল বেঁশো ভূতের গল্প। গল্প নয় সত্যি ঘটনা। একবার রাঙ্গা জেঠু শ্রীরামপুরের মধ্যে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে ফিরছে। গভীর রাত তখন। হঠাৎ রাঙ্গা জেঠু দেখতে পেল সামনে একটা বাঁশ পড়ে আছে। তখন ওই সব দিকে প্রচুর বাঁশ ঝাড় ছিল। রাঙ্গা জেঠু বাঁশটা ডিঙ্গিয়ে যাবার রিস্ক নিল না। দুবার হাততালি দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাঁশটা শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। বেঁশো ভূতগুলো ভারী দুষ্টু। রাস্তার ওপর বাঁশ ফেলে রাখে। সেই বাঁশ কেউ ডিঙ্গিয়ে পার হতে গেলেই তাকে বাঁশ সুদ্ধু গাছের ওপর তুলে দেয়। তারপর তাকে ভয় দেখায়।
এবার সেজোজেঠুর গল্প শোনা যাক আবার। সেজোজেঠু অনেক গল্প জানে। অনেক ধাঁধা জানে। মাঝে মাঝে একটু বকে। আমি আবার খালি বকাই খাই। তোমাদের মত শান্ত শিষ্ট নই তো তাই। সেজোজেঠুর ভূত দেখার গল্প শোনো। অনেক বছর আগের কথা। সেজোজেঠুর তখন কম বয়স অনেক। দুর্গাপুরে আমার বড়মার বাড়ি যাচ্ছে। ট্রেন যখন স্টেশানে নামিয়ে দিয়ে গেল তখন রাত ন’টা। খুব ঘন অন্ধকার। সেজোজেঠু রিক্সা পেল না, তাই হাঁটতে শুরু করে দিল। আমার বড়মার বাড়ি যেতে গেলে অনেকটা হাঁটতে হবে।
সেজোজেঠু তারামায়ের নাম করতে করতে এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পর সেজো জেঠুর মনে হল পাশে একটা লণ্ঠন আপনা আপনি চলছে। লন্ঠনের আলোয় বেশ পথ দেখা যাচ্ছে। সেদিন ছিল অমাবস্যা। বড়মার বাড়ির সামনে গিয়ে সেই আলো ভ্যানিশ হল। সেজো জেঠুর মতে লন্ঠন বাহক মা কালী ছিল, কিন্তু আমি মনে করি মা কালী নয়, মা কালীর কোনও অনুচর ছিল। আর সে ভূত ছাড়া আর কিছু নয়। আমাকে ওরকম লন্ঠন দেখালে আমি তো মরেই যাব। কেউ কোথাও নেই শুধু একটা লন্ঠন আপনা আপনি চলছে ! উফ ভাবতে পারো!


আমার দাদামশাই এর বাড়ি ছিল হাওড়া জেলার বসন্তপুর গ্রামে। সেখানে দাদুদের মা কালীর মন্দির এখনও আছেএই গ্রামে প্রচুর ভূত ছিল এক সময়। কালী মন্দিরকে সবাই কালীঘর বলত। তার পাশে শিব মন্দির ছিল। আর দামোদরের মন্দির। দামোদর হল নারায়ণ। আমি অনেক বার গেছি। অনেক পুরানো আমোলের মন্দির বাড়িঘর সব। কালীঘরের পাশে ছিল বিশাল একটা চাঁপা গাছ। সেই গাছে ব্রহ্মদত্যি থাকত। তাকে দেখেছিল আমার দাদুর মা। আমার বড়মা হত সম্পর্কে। বড়মা বলেছিল একবারই আমি তাঁকে দেখেছিলাম। শিবরাত্রির দিন রাত জেগে ছিলাম আমরা ক’জন। জেগে জেগে তাস খেলছিলাম। প্রহরে প্রহরে শিবের মাথায় জল দিতে হয়। রাত তখন কত জানিনা, একজন খুব লম্বামত লোক সাদা ধুতি, উনি গায়ে দিয়ে খড়ম পরে শিব মন্দিরে ঢুকে পড়ল।
তা ই ভদ্রলোকই যে ব্রহ্মদত্যি তা কী করে বুঝলে? অন্য কেউ তো হতেই পারে! 
না ব্রহ্মদত্যি ছাড়া আর কেউ নয়। দেখেই বোঝা যায়। চোখ দুটো লাল। ঘণ্টা নেড়ে নেড়ে অনেক মন্ত্র বলে পুজো করল, আমরা ভয়ে কাঠ হয়ে ছিলাম। আবার পুজো শেষ হতেই সে চলে গেল আমাদের দিকে ফিরেও তাকাল না।
সেই ব্রহ্মদত্যির অস্তিত্ব সবাই বিশ্বাস করত। আর একটা পুকুর ছিল, খের পুকুর। এখানে নাকি কে কাকে খ দিয়েছিল। খ কী জিনিস না যদি জেনে থাকো তাহলে রবীন্দ্রনাথের সম্পত্তি সমর্পণ গল্পটা পড়ে ফেলো। আগেকার দিনে বড়োলোকেরা তাদের সম্পত্তি মাটির নিচে একটা ঘরে রেখে দিত। আর সেই সম্পত্তি আগলাবার জন্য একটা ছোটো ছেলেকে সেই ঘরে আটকে রাখত। ছেলেটি অক্সিজেনের অভাবে খাদ্যের অভাবে মারা পড়ত। পড়ে থাকত কঙ্কালটা। এরাই খ হতো। কত ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলা হয়েছে! এই সব নিষ্ঠুর বড়োমানুষদের ধারণা ছিল খ তাদের সম্পত্তি পাহারা দেবে। তাদের বংশের লোক ছাড়া আর কেউ এই সম্পদে হাত দিলেই মৃত্যু অনিবার্য।
আমার দিদার আর ছোড়দিদার বাপের বাড়ি ছিল গুজুরপুরে। এই খানে যে কে মানুষ আর কে ভূত ছিল তা বোঝা যেত না। এই গুজুরপুরে আমার দিদার বাবা একবার একজন আত্মার অস্তিত্ব অনুভব করেছিল। দিদারা কলকাতায় থাকত পরেশনাথের মন্দির যেখানে। গুজুরপুরে কালে ভদ্রে যেত। গুজুরপুরে মাখন মামা ভূত হয়ে দিদার দিদাকে ধরেছিল। এই গল্প অনেকবার দিদার মুখে শুনেছি। মাখন সম্পর্কে দিদার মামা হত। অনেকেই তাকে মামা বলতো। তার একটা দুষ্টুমি ছিল খাট সমেত ঘরের ছাদে উঠিয়ে দিত আবার নামিয়ে দিত। দিদার দিদাকে যখন ধরেছিল রীতিমত ওঝা ডেকে ঝাড়াতে হয়েছিল। আগেকার দিনে ভূতে ধরা বা হাওয়া-বাতাস লাগা খুব সাধারণ ঘটনা ছিল।
দিদাদের কলকাতার বাড়িতে ভূত হয়েছিল দিদার বড়মা। অর্থাৎ জেঠাইমা। সে নিজের মেয়ের বিয়ের সময় দেখতে এসেছিল তাকে দেখতে পেয়েছিল দিদার দাদা। সেই বাড়িতে কারোর মৃত্যু হলে আগে থাকতে বোঝা যেত। গভীর রাতে ছাদে কারা দৌড়ে বেড়াত। তিন চার দিন এরকম চলার পর বাড়ির কোনও একজন কেউ মারা যেত। আমার দিদার মেজোভাই গোবিন্দ মারা যাবার দিন কয়েক আগে এই রকম ছাদে পায়ের শব্দ পাওয়া গেছিল।
আমার মাকে দিয়ে শুরু করেছিলাম। মায়ের ভূত দেখার গল্প এখনও একটু বাকি রয়ে গেছে। মা আমি একবার রাজস্থান বেড়াতে গেছিলাম। বিশাল একটা টুর পার্টির সংগে। মাউন্ট আবুতে পৌঁছাবার পর থেকে শরীরটা আমার খারাপ হয়। হোটেলের রুমে ঢোকার পর থেকে ঘুমে চোখ জড়িয়ে যাচ্ছিল। সেই রাতেই মায়ের মনে হয়েছিল ঘরে কেউ আছে। যাকে ঠিক দেখা যায় না। সে কিছু বলতে চাইছে। আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি, খুবই ঘুমিয়েছি। দ্বিতীয় দিন সকালে আমরা দিলোয়ারা মন্দির দেখতে গেছিলাম। দুপুরে ফেরার পর আমার খুব ঘুম পেয়ে গেল। লাঞ্চ না সেরে আমি ঘুমিয়েই পড়লাম। বিকেলে সবাই নাক্কি লেক দেখতে গেলআমি পড়ে পড়ে ঘুমোলাম। মা বেরিয়েছিল একটু। কিছু কেনাকাটা করে ফিরল। সন্ধেবেলা আমার ঘুম ভাঙল। একটু কিছু খেয়েই আবার শুয়ে পড়লাম। শুয়ে পড়ার সাথে সাথেই ঘুম। রাত্তিরে ঘুম ভাঙল মায়ের ধাক্কায়। বলল, এই ঘরে আর শোয়া যাবে না, আমরা পাশের ঘরে যাব।
ব্যাপারটা যে কী হয়েছে বুঝতে পারলাম না। কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারলাম না। ভীষণ ঘুমে চোখ খুলতেই পারছিলাম না। কষ্ট করে উঠে পাশের রুমে গেলাম। টুর ম্যানেজার আমাদের ঘরে চলে এসেছেন আর ওনার ঘরটা আমাদের থাকতে দিলেন। পরের দিন মাউন্ট আবু ছেড়ে আমরা পাড়ি দিলাম যোধপুরের উদ্দেশে। হোটেল ছাড়তেই আমার সেই ঘুম ঘুম ভাব চলে গেল। দিব্যি শরীর ঠিক হয়ে গেল। টুর ম্যানেজার বললেন, ওই রুমটা ভাল নয় শুনলাম। বহু বছর আগে এই ঘরটায় একজন ভদ্রমহিলা খুন হয়েছিলেন। তারপর থেকে এই ঘরে মাঝে মাঝে একটু সমস্যা হয়।
মা বলল, রাত্তিরে মনে হচ্ছিল কেউ আমার গলা টিপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। পর পর দুরাত্রি একই অবস্থা।
বাসের সবাই হাঁ করে মায়ের অভিজ্ঞতার কথা শুনতে লাগল।
রাজস্থানে আমার এক পরিচিত দিদি গেছিল ট্রাভেল এজেন্সির সাথে। ওরা যোধপুরে খুব ভয় পেয়েছিল। এমন একটা হোটেলে উঠেছিল যেটা অভিশপ্ত ছিল। তবে মহিলারা ভয় পায়নি। শুধু পুরুষ সদস্যরা সবাই খুব ভয় পেয়েছিল। ঘুমোলেই মনে হচ্ছিল চোখের সামনে একটা খুন হচ্ছে। এক সাথে সমস্ত পুরুষ সদস্যরা একই দৃশ্য দেখল কী ভাবে? সত্যি সত্যি ওই হোটেলের একজন স্টাফকে কারা যেন নৃশংস ভাবে খুন করেছিল।
আমার বোনের খুব প্রিয় বন্ধু সারদা। সারদার বাড়িতে আমরা একবার বেড়াতে গেছিলাম। আমি আর বোন। ওদের বাড়িটা খুব নির্জন জায়গায়। শহর থেকে বেশ দূরে। আশপাশে কয়েকটা বড় বাড়ি।  চারদিকে বড় বড় গাছ।  নাম না জানা অনেক অচেনা পাখী ডাকছে। বেশ গা ছমছমে পরিবেশ। সারদার মা একটা অদ্ভুত গল্প বলেছিল। আমি কাকিমার জবানীতেই বলছি।
তখন সারদা খুব ছোটো। ওর বাবা মানে তোমাদের কাকা সেদিন বাড়ি ছিল না। আমি আর সারদা। সামনের একটা বাড়িতে একজন ভদ্রমহিলা মারা গেছেন কিছুদিন আগে। তার বেশ বয়স হয়েছিল। একদিন রাতে হঠাৎ করেই কারেন্ট চলে গেলসারা রাত এল না। অন্ধকার ঘরে আমি আর সারদা শুয়ে আছি। বেশ গরমও লাগছে। হঠাৎ একটা কান্নার আওয়াজ দূর থেকে কাছে এল। আমার খুব ভয় করছিল যে এত রাতে কে অমন করে কাঁদছে। জানলা দিয়ে যে উঠে দেখব সে সাহসও পাচ্ছি না। কান্নাটা আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে পেছন দিকে বাগানের দিকে চলে গেল। পরের দিন শুনলাম আশপাশের সব বাড়ির লোকেরাই কান্না শুনতে পেয়েছে। তবে সাহস করে কেউ দেখেনি যে ওটা আসলে কী ধরনের জীব ছিল।   একটা বাড়ির বাথরুমের জানলা দিয়ে ঢোকার চেষ্টাও করেছে কিন্তু পারেনি। জানলায় সাবান, শ্যাম্পু রাখা ছিল সব কিছু মেঝেতে পড়ে গেছিল।
এই গল্প শুনে আমার আর বোনের গলা শুকিয়ে গেছিল। কাকিমা বলল, এটা গল্প নয় সত্যি ঘটনা।
আমার এক দিদা ছিল সম্পর্কে মায়ের বড়মামিমা। তার বাড়ি ছিল অম্বিকা কালনায়। সেই বাড়িতে প্রচুর ভূত ছিল। তারা জিনিস লুকিয়ে ফেলতে ভালবাসত। দুধের গ্লাসে চামচ নাড়তে নাড়তে হঠাৎ দেখলে চামচ নেই। চামচ ভ্যানিশ। আবার সাত দিন পর সেই চামচ খুঁজে পেলে তোমার পড়ার টেবিলে।


আমাদের কাঁচরাপাড়াতেও অনেক ভূতের বাড়ি আছে। একসময় যে সব ব্রিটিশদের কোয়ার্টার ছিল সে সব এখন ভেঙেচুরে হানাবাড়িতে পরিণত হয়েছে। অনেক বাড়ি বেশ ভয়ানক। এখনও আত্মাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। সব বলে শেষ করতে পারব না। একটা জায়গার কথা বলে আজকের আড্ডা শেষ করব। ডাকাতে কালীর মন্দির আছে কাঁচরাপাড়া রেল কোয়ার্টার-এর কাছে। এই মন্দির বেশ পুরানো। রঘু ডাকাতের কালী ছিল একসময় এখানে, নরবলিও দেওয়া হত। মাঝ রাত্তিরে নাকি এখানে অশরীরীরা আনাগোনা করে। বিশেষ করে যারা ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে। গভীর রাতে যারা বাড়ি ফেরে তাদের অনেকেই দেখতে পেয়েছে অশরীরীদের। বিশ্বাস না হলে তোমরাও গিয়ে একবার দেখতে পারো।  কাঁচরাপাড়ার বেশ কিছু রেল কোয়ার্টারে ভূত আছে। অনেকে সেখানে বাস করতে পারেনি। সেই সব বড় বড় বাড়িগুলো আজ পরিত্যক্ত। বড় বড় গাছ গজিয়ে গেছে ভেতর থেকে।
একটা বিশাল জামগাছ ছিল বেল ইন্সটিউটে। সেই গাছটা নাকি অভিশপ্ত ছিল। বড় বড় জাম ফলে থাকত। মানুষজনকে লোভ দেখাত। সেই গাছে উঠলে ফল অবধারিত ছিল মৃত্যু। ওই গাছ থেকে পড়ে অনেকেই মারা গেছিল, তাই পরে ওই গাছে আর কেউ উঠত না।
আমাদের মিলননগর বটতলাতে আছে একটা ঝাঁকড়া বট গাছ। এই গাছে নাকি বাস করে দুটো ভূত। তাদের আবার মাথা নেইঅনেক রাত্তিরে নাকি তাদের দেখা যায়। এই গাছের তলা দিয়ে সন্ধেবেলা গেলে বাচ্চাদের অসুখ করে বলে অনেকে মনে করে।
ভূত আছে কী নেই তর্কের ব্যাপার। তবে যারা দেখেছে তারা সত্যি বলেই মানে। আর একটা গল্প বলে আমার গল্পের ঝাঁপি এবার বন্ধ করব। তোমাদের জন্য এই লেখাটা নিয়ে চিন্তা করছি। কাল খুব রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেল, মনে হল ঘরে কারা যেন খুব কথা বলছে। ফ্যাঁস ফেঁসে গলা। কী যে বলছে তাও ছাই কিছু বুঝলাম না। মনে হল আমাকে নিয়েই বলছে। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। মাকে জড়িয়ে ধরলাম আর মনে মনে ঠাকুরের নাম করতে লাগলাম। আস্তে আস্তে ফ্যাঁস ফেঁসে গলাগুলো থেমে গেল আর আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম।

______
ছবি - আন্তর্জাল

হরর ফাইলস:: আমবাগানের ভূত - অভিজিৎ দাস


আমবাগানের ভূত
অভিজিৎ দাস

ম্যাজিক ল্যাম্পে নিজে ভয় পাওয়ার ঘটনা লেখার খবর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে জানতে পারলাম অনেকে বলবেন ভয় মানে আজকাল আর ভূত হয় নাকিন্তু এই ভূতের ভয় দিয়েই বোধ মানবজাতির ভয়যাত্রা শুরু হয় আমারও শুরু হয়েছিল এই ঘটনা অনেককেই বলেছি কেউ হেসে উড়িয়েছে, কেউ পুরোটা শোনার পর বলেছে মনের অস্বস্তির স্বীকার হয়ে ওসব দেখেছি সবাই কি তার পুরো জীবনে সবকিছু দেখে যেতে পারে? সব অভিজ্ঞতা হয় কি তার? আমি লেখক নই তবুও যেহেতু সবার পড়ার জন্য দিচ্ছি তাই কিছু গল্প আকারেই বলব ভু হলে মাফ করে দেবেন
ঘটনা ২০ বছর আগে এত দিনের আগের ঘটনা হলেও আমার মন ঘটনাটাকে ঠিক যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছে তবে ঘটনাকালের কিছু এমন অণু ঘটনা যা আমার তখনও মনে ছিল না - এখনও নয় জটিল না করে বলি কী হয়েছিল
আট বছর হবে আমার বাড়িতে বাবা, মা, ঠাকমা, আর দাদু মাঝে মাঝেই দাদু ঠাকমার ঝগড়া হত বেশি ঝগড়া হলে ঠাকমা ঘরে খিল দিয়ে সারাদিন থাকত আমি ঝগড়া বুঝতাম না মনে হত ঠাকমার বুঝি শরীর খারাপ যাই হোক এক শনিবার সকাল ১১টা বাবা কাজে, মা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্তঠাকমা বড়ি দিচ্ছিল আমাদের বড় উঠানে ঠাকমার বড়ি দেওয়া একটা নেশাবড়ি দেওয়ার সময় ঠাকমা কোনও কথা বলত না চারিদিক রোদ ঝলমলে আমি বারান্দায় বসেছি সবে স্কুল থেকে এসে স্কুলের সাদা জামা আর হা নীল প্যান্ট খুলিনি দাদু আমাদের গ্রামের বড়ো পুকুর থেকে ছিপ দিয়ে একটা মাছ ঝোলাতে ঝোলাতে এসে বাড়ি ঢুকল আর আমি দৌড়ে গিয়ে দেখতে গিয়ে ছিপে ধাক্কা লেগে মাছ গিয়ে পড়ল বড়ির পাত্রে ব্যস, ঠাকমা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলঅবশ্য আমার উপর নয় দাদুর উপরদাদুও ছাড়ার লোক নয় শুরু হল ভয়ংকর যুদ্ধসেই যুদ্ধের লে ঠাকমা বড়ির পাত্র নিয়ে দাদুর মুখে ছুড়ে মারলআর ঠাকমা বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে মা আমাকে বলল ঠাকমাকে আটকাতে পিছু নিলামরাস্তা তখন এখনকার মতো নয় পুরো ফাঁকাআর আমাদের বাড়ি পাড়ার প্রায় শেষের তিন মাথার কাছেএকটা রাস্তা মুসলিম গ্রামের দিকে গেছে আর একটা গেছে সর্দার পাড়া। আর এই দুই রাস্তার মাঝে বিশাল ঘন আমবাগানআর মূল রাস্তা চলে গেছে বড়ো রাস্তার দিকে তিনটে রাস্তাই কাঁচা মাটির বেরিয়ে বুঝতে পারলাম না কোন দিকে গেছে ঠাকমা সর্দার পাড়ার রাস্তার দিকে এগোতেই দেখলাম ঠাকমার মতোই কে বাগানে ওইতো ঠাকমা ডাকলাম দুবারউফ্ ঠাকমা যা রেগে আছে তাতে সাড়া দেবেই না। এমন বাড়ির থেকে কেন বেরিয়ে গেল? বাগানে ঢুকলাম ঠাকমা কিন্তু কোনও দিকে না তাকিয়ে হন হন করে চলে যাচ্ছে যেন ছুটছে আমি পিছন থেকে ডেকেই চলেছি “ও ঠাকমা, ঠাকমা।” কোনও সাড়া নেই২০ মিনিট হেঁটেও ধরতে পারলাম না আমার ছোট ছোট পায়েকোথায় গেল ঠাকমা?  বসে পড়লাম এবার ভয় করতে লাগল ওই জঙ্গলে একা ঠাকমাকেও আর দেখা যাচ্ছে না ভর দুপুর হলেও ভিতরটা কী অন্ধকার লাগছিল! ওটা আমের সময়ও না না হলেও কেউ বাগানে থাকত পাহারা দিতেএখন কী করি? কোন দিক থেকে এলাম? এত দূর কোনোদিন আসিনি

কী করব তখন ভেবেই পেলাম নাজানি না কত সময় এমন ভাবে কাটালাম কোন দিকে যাব এই ভেবে তখন অন্য একটা ঠাকমা দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে ডেকে বলল, “ও খোকা কোথায় যাবে?” আমার ভয়টা কাটল বললাম, “আমার ঠাকমা  হারিয়ে গেছে। সে পাশের একটা গাছ দেখিয়ে বলল যে ওখানে আছে আমার ঠাকমাআমি পাশে ওই গাছে তাকিয়ে দেখি আর একটা বুড়ি ওই গাছের ডালে দোল খাচ্ছেআর হাসছে শুধু সে নয় পাশে আরও একটা গাছে আর একজন প্রত্যেকটা গাছে এক একজন বুড়ি প্রত্যেকেই দোল খাচ্ছে আর হাসছে আর সবাই সাদা থান পরা হাসি ক্রমশঃ বেড়ে কানে ঝালাপালা ধরে গেল চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম চোখ খুলে দেখি সবাই আমাকে ঘিরে ঠাকমাও আছে। ঠাকমা নাকি বাড়ির পিছনেই গিয়েছিল ঝগড়ার পর আমাদের শোবার ঘরেই শুয়ে আছি আমাদের পাড়ার মন্টুধোপা মুসলিম পাড়ায় কাপড় দিয়ে ফেরার পথে আমাকে ডোবার ধারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তখুনি বাড়ি নিয়ে আসে ঘাড়ে করেসারা শরীরে আমার ব্যথা তিন দিন ছিল পরে সবাইকে বলেছিলাম কী হয়েছিল শুনে দাদুই আমাকে এক জায়গা থেকে ওঝা দিয়ে ঝাড়িয়ে এনেছিল আর ঠাকমা বলেছিল, “আমি আর কখনও ঝগড়া করব না।” সত্যি তারপর থেকে বাড়িটা শান্ত থাকত কিন্তু ওই আমবাগানে কী করে এসব হল তা আমাকে কেউ কখনও লেনি। আজ সেই আমবাগান নেই


______
ছবি - আন্তর্জাল