রকমারি আড্ডা:: কলাবতীর সঙ্গে কিছুক্ষণ - সহেলী চট্টোপাধ্যায়


কলাবতীর সঙ্গে কিছুক্ষণ
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

তোমরা জান যে এই বিভাগে আমরা কিছু কাল্পনিক চরিত্রকে মুখোমুখি বসিয়ে আড্ডা দেওয়াই। এবার থাকছে মতি নন্দীর কলাবতীর সাথে কিছু গল্প। আমাদের ফেলুদা এবার কলাবতীর বাড়িতে। চল দেখি দুজনে কী রকম আড্ডা দিচ্ছে।

কলাবতী - কী সৌভাগ্য যে ফেলুকাকু এসেছে! কাকা, দাদু দেখবে এস কে এসেছে?
ফেলুদা - প্লিজ আমাকে কাকুর পর্যায়ে ফেল না কালু। আমি তোমাদের সবার দাদা। যদিও পঞ্চাশ পার করে ফেলেছি। আজকে তোমার সম্পর্কে কিছু জানতে এবং জানাতে এসেছি আমাদের ম্যাজিক ল্যাম্পের পাঠক বন্ধুদের জন্য। আগে নিজের একটা পরিচয় দাও। তারপর বাড়ির সবার ছোট্ট করে একটা পরিচয় দেবে।
কলাবতী খিল খিল করে হেসে উঠলমুখের কাছে একটা পুরানো পত্রিকাকে মাইক্রোফোনের মত পাকিয়ে বলতে শুরু করল।
আমি কলাবতী সিংহ। কাঁকুড়গাছি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিক্রিকেট খেলতে,  আর লিখতে ভালবাসি। আমাদের স্কুলের প্লাটিনাম জয়ন্তীতে আমি রাবণের শক্তিশেল নামে একটা নাটক লিখেছিলাম। তাতে আমার স্কুলের মেয়েরাই অভিনয় করেছিল। বিশাল এক কাণ্ড হয়েছিল সেবার (কলাবতীর শক্তিশেল) স্পোর্টস জার্নালিজমও করেছি কিছুদিন (কলাবতীর দেখাশোনা)। তবে সবচেয়ে পছন্দ হল ক্রিকেট। মেয়েদের ক্রিকেট টিমে বাংলার হয়ে খেলেছিক্রিকেট নিয়ে যে উপন্যাসটা আছে আমার সেটা হল কলাবতী ও মিলেনিয়াম ম্যাচ। তোমরা হয়ত অনেকেই পড়েছ। পুজোসংখ্যা আনন্দমেলায় কলাবতীকে নিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছিলেন মতি নন্দী।
ফেলুদা আর এইখানেই তোমার সঙ্গে আমার মিল। ক্রিকেট খেলতাম একসময়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়।
কলাবতী – সে তো জানি। আপনার সব লেখাই আমি পড়েছি।
ফেলুদা - হাহা। আমার নয়, সব আমার কাজিন তপসের লেখা। যাই হোক এবার তোমার বাড়ির প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত একটা পরিচিতি দাও।
কলাবতী – বেশ বেশ। সত্যশেখর সিংহ আমার কাকা। নামকরা ব্যারিস্টার। আমার বাবা মা নেই। এই খানেও আপনার সাথে আমার মিল আছে। কাকাই আমাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে। বয়স চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। নিজের আর বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। আমার সে একাধারে বাবা এবং প্রিয় বন্ধু। কাকার দুর্বলতা একটাই জায়গায়। সেটা হল খাওয়া শুধু খাওয়া। (হেসে ফেলে কলাবতী।) তবে খেতে আমিও ভালবাসি। সিংহি বাড়ির মেয়ে বলে কথা!
রাজশেখর সিংহ - আটঘরার প্রাক্তন জমিদার। সত্তরের বেশি বয়স। বিপত্নীক। ক্রিকেট খেলতে ভালবাসেন। আটঘরা আর বকদিঘি এই দুই গ্রামের মধ্যে খুব রেষারেষি। বকদিঘির মুখুজ্যেরা সিংহিদের চিরশত্রু। সেই কথায় পড়ে আসছি।
অপুর মা - আমাদের বাড়ি রান্না করে। আসল নাম করুণাময়ী। আমি পিসি বলে ডাকি। আমাকে খুব ভালবাসে। নিত্য নতুন রান্না করতে ভালবাসে। রান্নার হাতটি বড় চমৎকার। একবার গুলতি দিয়ে ডাকাত তাড়িয়েছিল। খুবই ডাকাবুকো স্বভাবের। (কলাবতী, অপুর মা ও পঞ্চু)
আর আছে মুরারি। সাদা দাড়ি কামায় না। খুব নিরীহ স্বভাবের। অপুর মাকে মানে পিসিকে যমের মত ভয় পায়।
ফেলুদা - আমার বাবা জয়কৃষ্ণ মিত্র ছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের একাধারে অঙ্ক এবং সংস্কৃত’র শিক্ষক। তোমার মত খুব ছোটোবেলায় বাবা মা দুজনেই মারা যায়।
কলাবতী - আচ্ছা। তবে সত্যজিৎ রায়ই হলেন আসল বাবা। আমার যেমন মতি নন্দী। আমরা হলাম ওঁদের মানস কন্যা এবং মানস পুত্র।
ফেলুদা - খানিকটা ঠিকই বলেছতোমার বন্ধুবান্ধবদের কথা বল। এবং হেড মিস্ট্রেস মলয়াদির কথাও বল।
কলাবতী - আমার দুই বন্ধু হল সুশি এবং ধূপছায়া যাকে আমি ধুপু বলে ডাকি। সুশির ভাল নাম সুস্মিতা। এছাড়া আমার আর তেমন বন্ধু নেই। একবার সুশির দেশের বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম। সেখানে একজনের বাড়ি ডাকাতি করেছিলাম। করতে হয়েছিল সেই বাড়িরই একজন সদস্যের জন্য। (ভূতের বাসায় কলাবতী)
ফেলুদা - বল কী! আমি তাহলে একজন ডাকাতের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছি!
কলাবতী - হাহা! তোমরা অবশ্যই পড় ভূতের বাসায় কলাবতী। এটা খুব মজার একটা উপন্যাস। দাদা আপনিও পড়বেন।
ফেলুদা - নিশ্চয়! কলাবতীর প্রতিটা উপন্যাস বা অ্যাডভেঞ্চারই কিন্তু বেশ মজার।
কলাবতী - ‘কলাবতীর দেখাশোনা’ উপন্যাসকে বাদ দিলে দেখবেন বেশির ভাগ উপন্যাসই বেশ মজার
কলাবতী – জনপ্রিয়তায় আপনাকে আমি ছুঁতে পারব না। মতি নন্দীর আরও কিছু উপন্যাস লেখা উচিৎ ছিল আমাকে নিয়ে। অ্যাডভেঞ্চার ক’টাই বা করলাম আমি! একটাই আছে কলাবতী সমগ্র। অর্জুন আর কাকাবাবু অনেক বেশি আছে আমার চেয়ে। আমাকে নিয়ে এখনও পর্যন্ত একটা সিনেমাও হয়নি। আমার চেয়ে কোনি অনেক বেশি বিখ্যাত হয়েছে। তোমরা কোনি অবশ্যই পড়বে।
কলাবতী একটু চুপ করে যায়।
ফেলুদা - তুমি পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলে, তাই আর বেশি অ্যাডভেঞ্চার করাননি তোমাকে দিয়ে। তবে যা আছে যেটুকু আছে অনেক ভাল আছে। পাঠকদের প্রিয় চরিত্র। অনেকেই ছিলেন যারা পুজোসংখ্যায় কলাবতী না থাকলে মন খারাপ করতেন। সিনেমা হওয়াটাই বড় কথা নয়। এবার বড়দির কথা বল। তোমার স্কুলের হেড মিস্ট্রেস মলয়া মুখার্জি।
কলাবতী - কথায় কথায় একদম ভুলে গেছি। বড়দি অর্থাৎ মলয়া মুখার্জি হলেন বকদিঘির প্রাক্তন জমিদার হরিশঙ্কর মুখার্জির মেয়ে। বকদিঘির এই মুখার্জিদের সঙ্গে আমাদের আটঘরার সিংহিদের খুবই আকচা আকচি। এখনও একে পরকে খোঁচা না মেরে থাকতে পারে না। হরিশঙ্কর মুখার্জির সঙ্গে দাদুর আর বড়দির সাথে আমার কাকার সাপে নেউলে সম্পর্ক হলেও উভয়ের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্কও আছে। বড়দি আমাকে খুবই স্নেহ করেন।
ফেলুদা - বেশ। সত্যশেখর তো মাখা সন্দেশ খেতে খুব ভালবাসে। আমার সাথে এখানে একটা মিল আছে। সত্যজিৎ রায় একবার কলাবতীর অলংকরণ করেছিলেন। কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং।
কলাবতী - কাকা ভালবাসে না এমন কিছু ভূ ভারতে আছে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ আমার অত্যন্ত সৌভাগ্য যে মাণিক আঙ্কল আমার অলংকরণ করেছিলেন একবার। উপন্যাসটা শারদীয়া সন্দেশে বেরিয়েছিল।
ফেলুদা - তাহলে কলাবতীর সমস্ত উপন্যাস গুলোর একটা তালিকা বানিয়ে দিলাম আমরা। তোমরা পড়ে জানিও আমাদের কেমন লাগল।
কলাবতী - হ্যাঁ তোমরা ততক্ষণ তালিকার দিকে চোখ রাখো, আমি আর ফেলুদা এই বেলা পিসির বানানো ঘুগনির আনন্দ নিই।
কলাবতী - ১৯৮৩ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতীদের ডায়েট চার্ট - ১৯৮৪ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতীর ময়দান রিপোর্টিং - ১৯৮৬ শারদীয়া সন্দেশ
কলাবতীর দেখাশোনা – ১৯৯৩ শারদীয়া আনন্দমেলা
ভূতের বাসায় কলাবতী - ১৯৯৭ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতী ও খয়েরি - ১৯৯৮ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতী, অপুর মা ও পঞ্চু – ২০০১ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতী ও মিলেনিয়াম ম্যাচ – ২০০২ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতীর শক্তিশেল - ২০০৪ শারদীয়া আনন্দমেলা
কলাবতী - তবে এখানেই শেষ নয়। মতি নন্দীর অন্যান্য উপন্যাসগুলোও তোমরা  অবশ্যই পড়ে দেখ। কোনি, স্টপার, স্ট্রাইকার, তুলসী, জীবন-অনন্ত, ফেরারি,  মিনু-চিনুর ট্রফি, অলৌকিক দিলু, বুড়ো ঘোড়া, ননীদা, অপরাজিত আনন্দ, দলবলের আগে, শিবার ফিরে আসা, কুড়োন, ধানকুড়ির কিংকং এই সমস্ত উপন্যাস ছোটোদের জন্য লিখেছিলেনবাংলা কিশোর সাহিত্যের মধ্যে স্পোর্টস-কে নিয়ে এসেছিলেনআর এটা মোটেই সহজ ছিল না। লেখার হাত এত সহজ আর সুন্দর, যারা খেলা ভালবাসে না তাদেরও ভালো লাগবে। তোমরা অবশ্যই পড়ে ফেলো বইগুলো।  পড়ে কেমন লাগল তোমাদের প্রিয় ম্যাজিক ল্যাম্পকে জানাতে ভুলো না।
ফেলুদা - আমাদের আড্ডা আজ এখানেই শেষ করছি। তোমরা সবাই খুব ভাল থেকো। কলাবতীর সাথে খুব সুন্দর সময় কেটে গেল। একজন ঝকঝকে ইনটেলিজেন্ট ট্যালেন্টেড কিশোরী। ওর মাঝে মাঝে মনে হয় ওকে নিয়ে একটা সিনেমা থাকলে ভাল হয়। আপনারা অবশ্যই এ ব্যাপারে একটু ভেবে দেখবেন।
কলাবতী হেসে ফেলল। ফেলুদাও।
__________
ছবি - সুতীর্থ দাস

No comments:

Post a Comment