Showing posts with label সৌরভ চাকী. Show all posts
Showing posts with label সৌরভ চাকী. Show all posts

ছড়া-কবিতা:: রুখতে হামলা ঠুকল মামলা - সৌরভ চাকী


রুখতে হামলা ঠুকল মামলা
সৌরভ চাকী

বর্ষা কেটেও আশ্বিনেতে
থামছে নাকো বৃষ্টি
বলো দেখি নিয়ম ভেঙে
এ কী অনাসৃষ্টি?

খুব রেগে তাই শরৎ ঋতু
বললে আমায় ডেকে
দেখো কেমন কালো মেঘে
দিচ্ছে আমায় ঢেকে!

ছেলে পুলে পুজোর আমেজ
নেবে কেমন করে?
বৃষ্টি যদি পুজোর ক’দিন
নামে এমন তোড়ে?

উপায়টা কী বলো না ভাই
রুখতে বর্ষা হামলা?
বুদ্ধি দিলাম আদালতে
ঠোকো একটা মামলা।

কোর্টে এবার কেস উঠেছে
বর্ষা ঋতুর নামে
আষাঢ়, শ্রাবণ কেটে গেলেই
বৃষ্টি যেন থামে।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গল্প:: রাসুর পরীক্ষা - সৌরভ চাকী


রাসুর পরীক্ষা
সৌরভ চাকী

।। ১।।

রাসুর খুব টেনশন হচ্ছে। টেনশনে রাত্তিরের ঘুমটাও উড়ে গেছে ক’দিন হল। কাল প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা। দু-বছর ধরে ডিগ্রিটা পাওয়ার চেষ্টা করে গেছে ও। থিয়োরি, মৌখিকে একশোয় একশো কিন্তু প্র্যাকটিকালে কিছুতেই উতরোতে পারছে না। কাল থার্ড টাইম, এইবারে পাশ না করতে পারলে ডিগ্রিটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে। সেন্টারের নিয়ম বড়ো কড়া। তিনবারের মধ্যে পাশ করতে হবে, তবেই চূড়ান্ত ডিগ্রি মিলবে, নইলে আবার দশ বছরের বিরতি। চুল পাকবে, অভিজ্ঞতা বাড়বে তবে আবার পরীক্ষায় বসতে পারবে।
এ পর্যন্ত পড়ে ভাবছ চুলপাকা, অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সঙ্গে পরীক্ষায় বসার কী সম্পর্ক? ডিগ্রিটাই বা কী? কোথাকার ইনস্টিটিউটই বা দেয়?
তবে একটু খুলেই বলি। রাসুকে চেনে না এহেন লোক এ তল্লাটে খুব কমই আছে। এ তল্লাট মানে নারায়ণগঞ্জ, গোপালপুর, রতনচক-সহ আশেপাশের দশ-বিশটা গাঁ-গঞ্জকে বোঝাচ্ছি। রাসু এ অঞ্চলের নামকরা চোর। হাসতে হাসতে তোমার পাশ থেকে চুরি করে নিয়ে যাবে, তুমি টেরই পাবে না। বহুরূপী সাজতেও তার মতো ওস্তাদ কেউ নেই। তুমি আমি তাকে হয়তো বহুবার দেখেছি কিন্তু চিনতে পারিনি। হয়তো যে ভিখিরিকে দু-টাকা ভিক্ষা দিলে সেই রাসু অথবা যাকে রাস্তায় চলতে চলতে গোপালখুড়োর বাড়িটা দেখিয়ে দিলে সেই হয়তো রাসু। সারা তল্লাট তাই রাসুর চৌর্যবৃত্তির ভয়ে তটস্থ থাকে, এই বুঝি মালকড়ি হাতিয়ে নিল।
সেদিন তো এমন হয়েছে সাধনবাবু নদীতে নাইতে গেছেন, তো গামছা মালকোঁচা মেরে পরে জামাকাপড় ঘাটে খুলে রেখে নদীতে ডুব দিতে নেমেছেন। উঠে দেখেন জামাকাপড়, চটি সব লোপাট।
আবার সেদিন দেখো অবনীজেঠু ভোরবেলা নদীর ধারে প্রাতঃকৃত্য সারতে গেছেন সুদৃশ্য পিতলের গাড়ু নিয়ে, এটা ওনার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ওনার ঝাঁ চকচকে বাড়িতে ইস্টার্ন, ওয়েস্টার্ন টয়লেট বেশ কয়েকটা আছে। তা সত্ত্বেও ছেলে, বউমাদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে ভোরবেলা নদীর ধারে প্রাতঃকৃত্য না করলে সারাদিন নাকি আইঢাই করে। কিছু বললে বলেন, “তোমরা কি আমাকে মারতে চাও, ক্লিয়ার না হলে তো পেট ফুলে মরে যাব, তাই চাও?”
এসব শুনে আর কেউ কিছু বলতে ভরসা পায় না, যতই হোক বুড়োমানুষ, সেন্টিমেন্টের ব্যাপার। তা সেদিনও অভ্যাসমতো প্রাতঃকৃত্য সেরে পিছন পানে হাত বাড়িয়েছেন গাড়ুটা নেবেন বলে, দেখেন হাওয়া। বোঝো তাঁর অবস্থা।
তা সেই রাসু চোর পঞ্চানন্দ চৌর্যবৃত্তি ট্রেনিং স্কুলের সিনিয়র ছাত্র। এটাই এ অঞ্চলের বিখ্যাত একমাত্র স্কুল যেখানে চৌর্যবৃত্তিতে হাতে-কলমে ট্রেনিং দেওয়া হয় এবং শিক্ষান্তে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলে ডিগ্রি দেওয়া হয়। রাসু তার বাবা বিখ্যাত চোর দাসুর হাত ধরে সেই ছেলেবেলায় এই স্কুলে ভরতি হয়েছিল। তখন থেকেই এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কাম মহাগুরু পঞ্চানন্দ ওরফে পাঁচু তার আদর্শ। লোকে বলে পাঁচুর বয়সের গাছপাথর নেই। কত যে বাঘা বাঘা চোর তার হাত থেকে বেরিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। খবরের কাগজে এই সব বিখ্যাত চোরদের কথা হামেশাই শোনা যায়।
রাসুর হাত ধরে বাবা পাঁচুকে বলে গেছিল, “গুরুদেব রাসুকে আপনার কাছে দিয়ে গেলাম। জানি আপনার মতো দিকপাল হবে না, তবে একটু মানুষ করে দেবেন, যাতে চুরিবিদ্যায় নাম করে অন্তত করে-কম্মে খেতে পারে।”
তা সেই মানুষ হওয়া বোধহয় রাসুর আর হল না। চিরকাল বোধহয় অমানুষ হয়েই থাকতে হবে ঐ গাড়ুটা, বাটি-ঘটিটা, জামাকাপড় চুরি করে। ছ্যা, ছ্যা জীবনের ওপর ঘেন্না ধরে গেল। সেই কবে পাঁচুগুরুর কাছে প্রাইমারির পাঠ চুকেছে, তারপর আরও দু-তিন বছর ছোটোখাটো চুরি-চামারি করে প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় পাশ করে চুরিরত্ন সার্টিফিকেট পেয়েছে, এতে ছোটোখাটো চুরি-চামারি করার ছাড়পত্র আছে কিন্তু শেষ ডিগ্রি চুরিমহারত্ন উপাধিটা না পেলে কেরিয়ারে আর এগোনোই সম্ভব নয়। এটা ভেবেই রাসু মুষড়ে পড়ে। প্র্যাকটিকালে সে দু-বছর ফেল। এবছর প্র্যাকটিকালে তাকে দেওয়া হয়েছে নারায়ণগঞ্জের আড়তদার মহাকিপটে আর সদাসতর্ক রজনি ঘোষের শোবার ঘর থেকে ক্যাশবাক্স খুলে টাকা চুরি করে আনার কাজ। কাজটা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভবই বটে। তার ওপর পাঁচুগুরুর দুই নন্দি-ভৃঙ্গি চ্যালা হরেন আর নরেন হচ্ছে ওই কী বলে যেন অবজারভার। তাদের অদৃশ্য চোখ সর্বদা পরীক্ষার্থীদের লক্ষ করে যায়। চুরি করতে গিয়ে একটু অসদুপায় নিয়েছে কি সঙ্গে সঙ্গে খবর চলে যাবে, ব্যস তখনই স্কুল থেকে বিতাড়ন। রাসু জানে যবে থেকে তাকে প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার বিষয় দেওয়া হয়েছে তবে থেকে হরেন আর নরেনের অদৃশ্য চোখ তার উপরে সিসি টিভির মতো নজর রাখছে।
এই তো গতবার চুরিমহারত্নের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় গোপালপুরের বিখ্যাত চোর কানুকে দেওয়া হয়েছিল ইন্দিরা ঠাকরুনের সাধের অষ্টধাতুর নাড়ুগোপাল চুরির কাজ। নাড়ুগোপাল ইন্দিরা ঠাকরুনের প্রাণ। ওটা সঙ্গে নিয়েই উনি ঘুমোন, খেতে বসেন আবার পাড়া ঘুরতেও বেরোন। তা কানু দু-দুবার ওটা হাতানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে ইন্দিরা ঠাকরুনের ছিটে-বেড়ার ঘরে গিয়ে তার সঙ্গে ভাব জমায়। তারপর বুড়িকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে অনেক পটিয়ে বলে, “তা ঠাকুমা তোমার গোপাল কেন আর পুরোনো বেশে থাকবে বলো? দাও আমি তাকে সোনার করে দিচ্ছি। সেই যেবার হিমালয়ে গেছিলাম সেখানের এক সাধুবাবা আমাকে এক পরশপাথর দিয়েছে, তা দিয়ে কোনো মূর্তিতে ছোঁয়ালেই তা সোনার হয়ে যাবে। দাও তোমার নাড়ুগোপালকে সোনার করে দিচ্ছি।”
বুড়ি খানিকটা নিমরজি হয়েও নাড়ুগোপালকে কানুর হাতে তুলে দিল। কানুও মন্ত্র-তন্ত্র পড়ে হাতসাফাই করে ঝোলা থেকে আনা সোনালি একটা নাড়ুগোপাল বের করে ইন্দিরা ঠাকরুনকে দিল। ওটা আসলে নিখাদ একটা পিতলের মূর্তি। ইন্দিরা ঠাকরুও চোখে কম দেখে, তাই সোনার মূর্তি ভেবে খুব আনন্দিত হয়ে কানুকে দুটো নাড়ুই খাইয়ে দিল। কিন্তু হরেনদের মারফত খবর চলে গেল মহাগুরুর কাছে যে কানু এইরকমভাবে অসদুপায়ে লোক ঠকিয়ে পরীক্ষায় পাশ করতে চাইছে। সঙ্গে সঙ্গে গুরুর নির্দেশে তিন বছরের জন্য স্কুল থেকে সাসপেন্ড। সে বেচারা এখন সাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে চুনোমাছ বিক্রি করে।
রাসু কয়েকদিন রজনি ঘোষের আড়ত, বাড়ির চারপাশ ঘুরে মায় ছদ্মবেশে ওনার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে রেইকি করে এসেছে। গুরু বলে, “যে যত বেশি সূক্ষ্মভাবে এই রেইকির কাজটা করতে পারবে সে তত সফল হবে।”
গুরুর কথা রাসুর কাছে বেদবাক্য, তাই সে গুরুর সমস্ত উপদেশ চুরির সময় যথাসাধ্য মেনে চলার চেষ্টা করে। রজনিবাবুর বাড়ির চৌহদ্দিতে গিয়ে রাসু দেখেছে দুটো তাগড়াই কুকুর ঘুরে বেড়ায়। লোক দেখলেই ভৌ ভৌ করে তেড়ে আসে। তবে তেজ থাকলে কী হবে, জাতে তো নেড়ি কুত্তার কোনো পেডিগ্রি নেই। তাই একটু তু তু করলেই লেজ নাড়ে। এ ক’দিনে আড়ালে বাতাসা, বিস্কুট খাইয়ে রাসু ওদের হাত করে ফেলেছে যাতে পরীক্ষার দিন রাতে ওকে দেখে কুকুর দুটো না চেঁচায়। তারপর খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত।
যে ঘরে রজনিবাবু থাকেন সেটা দেখেও রাসু উৎফুল্ল কারণ ঘরটা একটু পিছনের দিকে আর তার পিছনে জলা-জঙ্গল, ফলে লোকজন সেদিকটায় নেই। নিশ্চিন্তে সিঁধ কেটে ঢোকা যাবে। কিন্তু লোকটা ক্যাশবাক্সটাকে নাকি পাশবালিশ বানিয়ে শোয়, সেটাই একটা সমস্যা। আরেকটা সমস্যা রজনিবাবুর মাথার পাশে নাকি একটা গাদা বন্দুক রাখা থাকে। রজনিবাবু সেটা তার দাদুর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। তার দাদু ছিলেন এ অঞ্চলের জমিদার। দেদার পাখি শিকার করেছেন ওই বন্দুক দিয়ে। অবশ্য এসব গল্প রাসুর ছেলেবেলা থেকে শোনা বাবার কাছে। কিন্তু রাসুর বন্দুকে বড়ো ভয়। গুলি কোনোরকমে বেরোলেই দুম-ফটাস, ব্যস সব শেষ। কিন্তু কী আর করা, পরীক্ষার দায়, কেরিয়ারের দায়, বড়ো দায়। তবে রজনিবাবু যতই কিপটে হোন, ওনার একটা গুণ বাবা বিশ্বনাথের পুজোয় কোনো কার্পণ্য করেন না, ধুমধাম সহযোগে করেন। বাবার বড়ো ভক্ত কিনা! অন্য সময় ভিখারিরা বাড়ির ত্রিসীমানায় ঢুকতে পারে না। বাড়িতে লোক এলে আপ্যায়নে জোটে দুধ-চিনি ছাড়া এক কাপ লিকার চা আর লেড়ো বিস্কুট। বলেন, “এটাই শরীরের পক্ষে উপকারী ওষুধ।” ঐ বিদঘুটে চা খাওয়ার ভয়ে প্রতিবেশীরা ওনার বাড়িতে আসা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছে। এ ক’দিনে ওই সমস্ত খবরই টুকটুক করে রাসু জোগাড় করে নিয়েছে। এবার পরীক্ষায় বসার পালা। রাসু যেখানে যত মহান চোরেরা তাদের চৌর্যবৃত্তিতে বিখ্যাত হয়েছেন তাঁদের স্মরণ করে আশীর্বাদ চেয়ে কোনোরকমে রাতে ঘুমোতে গেল, তাও মনে টেনশন, কালকের পরীক্ষায় কী হয়!

।। ২।।

রাত তখন দেড়টা কি দুটো হবে, রাসু চুপিসারে বাগদি পাড়ার পাশ দিয়ে রাধাকান্ত খুড়োর আমবাগানের ভিতর দিয়ে শর্টকাট করে এগিয়ে গেল রজনি ঘোষের বাড়ির দিকে। অমাবস্যা হওয়াতে চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বসন্তকাল যদিও পড়ে গেছে তবুও হালকা ঠান্ডার রেশটা রয়েই গেছে। অন্ধকার গ্রামের পথে জনমানুষ তো দূরের কথা কুকুরেরা কোথায় যে সেঁধিয়েছে ভগবান জানে। রাসুর তাতে সুবিধাই হয়েছে। এই রাস্তার কুকুরগুলোই উটকো ঝামেলা বাঁধায়। রাসুর পরনে খালি মালকোঁচা মারা খাটো ধুতি, সারা গা তেল জবজবে। এই তেল বাড়িতেই বানিয়ে দেয় রাসুর বউ। বংশপরম্পরায় এর তৈরির পদ্ধতি রাসুরা জেনে এসেছে। তেলটার বিশেষত্ব হচ্ছে এর কোনো গন্ধ নেই ফলে কেউ টেরই পাবে না কিন্তু হাত দিয়ে ধরতে গেলেই পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যাবে। আত্মরক্ষার এক মোক্ষম দাওয়াই। রাসু সিঁধকাঠিটা হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে চলে এল রজনি ঘোষের বাড়ির কাছে। আজকে ত্রিশূলাকৃতি সিঁধকাঠিটা নিয়েছে কারণ রজনীবাবুর পাকাপোক্ত বাড়ির সিঁধ কাটতে ওটাই দরকার।
রাসুকে দেখে বাড়ির কুকুর দুটো লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে এল। সহজেই ঘুমপাড়ানি ওষুধ মেশানো লাড্ডু খাইয়ে ওদের ঘুম পাড়িয়ে দিল রাসু। তারপর চুপি চুপি পিছন দিকে গিয়ে রজনিবাবুর ঘরের দেয়ালে সিঁধ কাটতে শুরু করল। যতটা সহজ হবে ভেবেছিল রাসু ততটা নয়। বেশ শক্তপোক্ত গাঁথনি। প্রায় ঘন্টাখানেক লেগে গেল সিঁধ কাটতে। ঘর্মাক্ত কলেবরে রাসু প্রবেশ করল রজনিবাবুর ঘরে।
ঘরের হালকা মৃদু আলোয় চোখ সয়ে গিয়ে রাসু দেখতে পেল খাটের উপর ঘুমন্ত রজনিবাবুকে। তবে ঘুম যে ওনার গাঢ় নয় রাসু বুঝতে পারল। “ফোরৎ ফোঁ, ফোরৎ ফোঁ...” করে গম্ভীর নাক ডাকার তালে ভুঁড়িটা উঠছে আর নামছে। মাঝে মাঝে নাক ডাকা থেমে যাচ্ছে আর তখন রজনিবাবু এপাশ-ওপাশ ফিরছেন। ক্যাশবাক্সটা কোলবালিশের মতো পাশেই রাখা। রাসু উৎফুল্ল হয়ে উঠল, ক্যাশবাক্স থেকে টাকা হাতানোর এখানে দরকার নেই, পুরো ক্যাশবাক্সটাই গর্ত দিয়ে গলিয়ে দেবে, তারপরে আর দেখে কে - বাক্স নিয়ে পগার পার। পাঁচুগুরুর কাছে গিয়ে শুধু বাক্স ভেঙে টাকা তুলে দেওয়ার অপেক্ষা, ব্যস হাতে হাতে ডিগ্রি। উফ্, ভেবেই রাসু উৎফুল্ল হয়ে গেল। “হে মা কালী, কাজ হয়ে গেলে তোমাকে জোড়া পাঁঠা, না না বেশি হয়ে গেল, জোড়া মুরগি, না না মুরগি কেউ দেয় না কি, তোমাকে আমি জোড়া চালকুমড়ো উপহার দেব। হেই মা দেখো ডিগ্রিটা যেন পাই।”
উত্তেজনায় কোঁচড় থেকে ঘুমপাড়ানি মলমের শিশিটা বের করতে গিয়ে হাত ফসকে গেল পড়ে। ঠক করে আওয়াজটা মৃদুই হয়েছিল, কিন্তু তাতেই ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন রজনিবাবু। রজনিবাবু রাসুকে ঘরে দেখেই সবিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেলেন, গাদা বন্দুকটা হাতে নিয়ে অস্ফুটে বলে উঠলেন, “কে? কে ওখানে?”
রাসুর তখন তীরে এসে তরি ডোবার অবস্থা। বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে হবে। গুরুর নাম জপতে জপতে মাথায় বুদ্ধিটা ঝিলিক দিয়ে গেল। বলে উঠল, “আমাকে চিনতে পারলি না? রোজ সকাল সন্ধ্যায় আমাকে ডাকিস আর আজ বলছিস কে?”
“কে আপনি প্রভু?” রজনিবাবু গদগদ কণ্ঠে বলে উঠলেন।
“ওরে তোর ডাকে এই করোনার মাঝেও সেই কৈলাস থেকে ছুটে এলাম শুধুমাত্র ত্রিশূলখানা সম্বল করে। সবাই চিনলে তো কাড়াকাড়ি করবে তাই মানুষের বেশেই এলাম। মর্ত্যের যা হাল করেছিস।”
“হে দেবাদিদেব আপনি স্বয়ং এই গরিবের কুটিরে,” এই বলে আনন্দের আতিশয্যে রজনিবাবু রাসুর পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেন।
রাসু তিন পা পিছিয়ে এল, “করিস কী! এখন ছোঁয়া-ছুঁয়ি সব বারণ না? যা করবি দূর থেকে,” এই বলে রাসু দূর থেকে আশীর্বাদ করল।
“বলুন প্রভু আপনার কী সেবা করতে পারি? আমার পরম সৌভাগ্য যে আজ আপনি আমার ঘরে পদধূলি দিয়েছেন। আমার সর্বস্ব আপনার চরণে দান করতে প্রস্তুত। আপনি আদেশ করুন প্রভু।”
“দ্যাখ, আমার আর কী দরকার? চালচুলো তো কিছুই নেই, এখানে ওখানে পড়ে থাকি। তবে এবার একবস্ত্রেই চলে এসেছি তোদের মা’র সঙ্গে ঝগড়া করে। তোর ঐ কাঠের বাক্সটা দে আমার জিনিসপত্র যাতে রাখতে পারি। মর্ত্যে ঘুরতে সুবিধা হবে, ক’দিন থাকব তো।”
“তা প্রভু অন্য ভালো বাক্স আছে, এনে দিচ্ছি। ভিআইপি, সাফারির ভালো ট্রলি আছে। নাকি পিঠের স্যাক দেব?”
“না না, ওগুলো কি আমার ড্রেসের সঙ্গে যায়? আমাকে ওটাই দে। তবে তোর যদি আপত্তি থাকে তো দিস না, অন্য কোথাও পেয়ে যাব,” এই বলে রাসু চলে যেতে উদ্যত হল।
রজনিবাবু তৎক্ষণাৎ বাক্সটা তুলে দিলেন রাসুর হাতে, “না প্রভু আমার সবকিছু তো আপনারই, এই নিন।”
“তোর মঙ্গল হোক, তবে ভাবিস না কৈলাসে ফেরার সময় তোকে এটা ফেরত দিয়ে যাব। নে এবার তুই চোখ বন্ধ কর। দেবতাদের প্রস্থান দেখতে নেই, তাতে অমঙ্গল হয়।”
“হ্যাঁ প্রভু, এই আমি চোখ বন্ধ করলাম।”
রজনিবাবু চোখ বন্ধ করতেই ফুড়ুৎ করে বাক্স নিয়ে সিঁধ কাটা গর্ত দিয়ে রাসু গলে গেল। মনটা ভীষণ উৎফুল্ল। আনন্দে হালকা সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ভুবনডাঙার মাঠটাও পেরিয়ে গেল।
দূর থেকে হরেন আর নরেনের ছায়া দেখতে পেল রাসু। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হল, “দ্যাখ নন্দি-ভৃঙ্গি, আমার চুরিমহারত্ন ডিগ্রিটা এবারে কে আটকায়। পুবের আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। লম্বা লম্বা পায়ে রাসু পৌঁছে গেল পাঁচুগুরুর ট্রেনিং স্কুলের ডেরায়। পাঁচু আরও দুই চ্যালাকে নিয়ে রাসুর অপেক্ষাতেই বসে ছিল। রাসু গিয়ে ঠক করে বাক্সটা পাঁচুর পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল। পঞ্চানন্দ ওরফে পাঁচু রাসুর কেরামতিতে বলে উঠল, “সাবাশ ব্যাটা, ডিগ্রিটা মনে হচ্ছে পেয়েই গেলি, আমার নাম রাখলি এতদিনে। নে বাক্সটা খুলে এবার মালকড়ি বের কর দেখি।”
রাসু কোঁচড় থেকে ছোট্ট একটা তারের মতো যন্ত্র বের করল। তারপর পাকা হাতে দু-তিনবারের চেষ্টায় চাপ দিতেই খুলে গেল ক্যাশবাক্স। রাসু হাত বাড়াল ভেতরে। কিন্তু এ কী! ভেতর ফাঁকা কেন? বাক্সটা পুরো খুলতেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল, তাই তো! পুরো ফাঁকা। রাসু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। না বাক্সের মধ্যে একটা চিরকুট রয়েছে। খুলতেই দেখা গেল লেখা আছে,

প্রিয় চোর মহাশয়,
খুবই খারাপ লাগছে আপনার হাতে কিছু তুলে দিতে না পেরে। কত পরিশ্রম, কত বিনিদ্র রাত কাটিয়ে আজ আপনি আমার ক্ষুদ্র কুটিরে দক্ষতার সঙ্গে পদার্পণ করেছেন, কিন্তু আপনার এই কৃতিত্বকে পুরস্কৃত করার মতো একটা কানাকড়িও আমার কাছে নেই। চুপি চুপি বলছি সব আমার ওই গিন্নির হেফাজতে। কোথায় যে লুকিয়ে রাখে তার হদিস আমার কাছেও নেই। তাই আপনার প্রতীক্ষাতেই এতদিন ছিলাম। ঐ লুকানো সম্পত্তি উদ্ধার করে তার কিছু অংশ যদি এ গরিবকে কমিশন হিসেবে দান করেন তবে বাধিত হব। আপনার সাফল্য কামনা করি।
পুনশ্চ: গিন্নির শাড়ির আঁচলে একগোছা চাবি থাকে যা উনি কখনোই কাছছাড়া করেন না, তার মধ্যেই হয়তো রয়েছে গুপ্তধনের হদিস।
- অভাগা রজনি ঘোষ
----------
ছবি - লাবণি চ্যাটার্জি

ভ্রমণ:: মেঘ পিয়নের দেশে - সৌরভ চাকী


মেঘ পিয়নের দেশে
সৌরভ চাকী

আশীষের গাড়ি এসে হর্ণ দিতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। নির্জন পাহাড়ি গ্রাম দাওয়াইপানির দু’দিনের মায়া কাটিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম লেপচাজগতের দিকে। মাঝে বাঁ-হাতি পথে কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত মংপু ঘুরে নিলাম। জোড়বাংলো থেকে ঘুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে ধরলাম বামহাতি পথ। ডানদিকের রাস্তা চলে গেছে ঘুম স্টেশনের পাশ দিয়ে দার্জিলিংয়ের দিকে।
'ঘুম' নামটার মধ্যেই কেমন যেন একটা নস্টালজিয়া আছে। বহুদিন আগে যখন পাহাড়ের ছোটোখাটো অফবিট জায়গাগুলো জনপ্রিয় হয়নি, হয়নি পর্যটনের প্রসার, তখন থেকেই ঘুম, দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং ইত্যাদি ট্র্যাডিশনাল নামগুলো ভ্রমণপ্রিয় বাঙালিকে টানে। ঘুম মানেই যেন মেঘ কুয়াশায় ঘেরা ছোট্ট রেল স্টেশন। যেখানে টয় ট্রেনের কু-ঝিকঝিক্ পাহাড়তলিতে ধাক্কা খেয়ে বার বার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ঘুম মানেই যেন সূর্যদেবের নো এন্ট্রি। মেঘের পিছুপিছু ঝিরিঝিরি বৃষ্টির হাতছানি। এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ঘুমের ঘিঞ্জি জনপদ ছাড়িয়ে আবার মসৃণ পাহাড়ি রাস্তায় এসে পড়েছি। দু’দিকের পাইন, জুনিফার গাছেরা যেন অভিবাদন জানাতে লাগল আমাদের। ঘুম থেকে লেপচাজগৎ মাত্রই ৮ কিলোমিটার পথ, মিনিট কুড়ি মতো সময় লাগে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দূরত্ব মিরিক হয়ে ৭৫ কিলোমিটার। ৬৯৬৫ ফুট উচ্চতার নির্জন নিরিবিলি গ্রাম লেপচাজগৎ আজ ভ্রমণ পিপাসু বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে তার অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য। রাস্তায় কিছুটা সূর্যের মুখ দেখতে পেলেও লেপচাজগৎ ঢুকতেই মেঘ কুয়াশার দল যেন আমাদের চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলল। শুনেছিলাম লেপচাজগৎ নাকি মেঘ কুয়াশারই আবাসস্থল। এখন মনে হচ্ছে একদমই খাঁটি কথা। গ্রামের শুরুতেই বাঁ দিকে সলাখা হোম-স্টে, তার ঠিক পাশেই আমাদের কাঞ্চনকন্যা হোম-স্টে। অবস্থানের দিক দিয়ে এক কথায় অনবদ্য। আশীষ আমাদের নামিয়ে দিয়ে ফিরে গেল দার্জিলিং। আগামীকাল আবার সকালে আসবে। আমাদের সাইট-সিয়িং করাতে করাতে নামিয়ে দেবে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। নিচের রিসেপশন থেকে হোম-স্টের মালিক পাসাংজির কন্যা আরও কয়েকজনকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন আমাদের দেখে। তারপর কয়েকজনকে ডেকে আমাদের দুটো ফ্যামিলির লাগেজগুলো তুলে দিলেন তিনতলার ছাদ সংলগ্ন দুটো ঘরে। আমরাও খাতায় বুকিং সংক্রান্ত সইসাবুদ সেরে উঠে এলাম উপরে। পুরো হোম-স্টের এই দুটোই বেস্ট ঘর। পুরো হোম-স্টে কেন, সমস্ত লেপচাজগতের মধ্যেই এই দুটো বেস্ট ঘর বললেও অত্যুক্তি হবে না। দারুণ সুন্দর ডেকরেশন, কার্পেট, গিজার, টিভি - কী নেই কাঠের অপূর্ব কাজ করা ঘর দুটোতে। আর সবথেকে যেটা প্লাস পয়েন্ট সেটা হল সামনেই খোলা ছাদ যেন আমাদের ডেক। সেখানে দাঁড়ালেই চারিদিকে শুধুই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়ে। কোনোরকমে ব্যাগপত্র ঘরে রেখে ক্যামেরা হাতে খোলা ছাদে এসে দাঁড়ালাম। যেদিকে চোখ যায় শুধুই ধাপে ধাপে দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধভাবে পাইন, গুরাস গাছ। মেঘের দল উড়ে উড়ে চুমু খেয়ে যাচ্ছে তাদের মাথা। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপটে দাঁত কপাটি লাগবার জোগাড়। খিদে তেষ্টা ভুলে সবাই মিলে শুধু প্রকৃতিকে লেন্স বন্দি করছি। বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়শ্রেণি হুড়মুড় করে ঝাঁপ দিয়েছে অতলস্পর্শী খাদে। সেইদিকেই নাকি ওয়েদার পরিষ্কার থাকলে সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘার ১৮০° ভিউ পাওয়া যায় যা দেখতে পেলে নাকি জন্ম জন্মান্তরেও ভোলা যাবে না। মেঘ আর হাওয়ার দাপট ক্রমশ বাড়ছে। সত্যিই মেঘ যেন গাভীর মতো চরতে বেরিয়েছে। দলে দলে মেঘ উড়ে আসছে কোথা থেকে কে জানে! দূরের পাইন গাছ, পাহাড়শ্রেণি তো দূরের কথা, সামনে পিছনের হোম-স্টেগুলো পর্যন্ত ঢেকে গেছে মেঘে। সবুজে মোড়া লেপচাজগৎ এক কথায় প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। সামনেই দার্জিলিং পাহাড়। ওয়েদার ক্লিয়ার থাকলে রাতের আলো ঝলমল দার্জিলিংয়ের রূপ এখান থেকে মনোমুগ্ধকর। আরও বাঁয়ে সিকিমও দৃশ্যমান। পাসাংজির কন্যা জানিয়ে গেল লাঞ্চ রেডি। বেলা দুটো বাজে। খিদেও খুব পেয়েছে। নিচের ডাইনিংয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি বসলাম। গরমাগরম খানা চলে এল বড়ো বড়ো বোলে। ধোঁয়া ওঠা রাইস, ভেজ ডাল, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফুলকপি, ডিমের কারি, চাটনি, পাঁপড় খিদের মুখে এককথায় অমৃত। রান্নাও দারুণ। খাওয়া সেরে যখন ওপরে উঠে এলাম তখন চারিদিক মেঘ কুয়াশায় মাখামাখি। ঠান্ডাও তেমনি। একহাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল, ফ্যামিলি নিয়ে এসেছেন, যাবেন সান্দাকফু। আসলে অনেকেই এই লেপচাজগৎকে সান্দাকফুর গেটওয়ে হিসেবে ব্যবহার করেন। কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে বিকেলে একটু বেরোলাম আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করতে। তবে দিন, বিকেল না রাত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
একাই নিচে নেমে যে পথে এসেছিলাম তার উলটোপথে হাঁটা শুরু করলাম। দু’দিকেই শুধু সারি সারি হোম-স্টে। কয়েকটি বেশ ভালোই। সামনে ছোটোখাটো কয়েকটি দোকান। আমাদের হোম-স্টের সামনেই একটা উঁচু চত্বর আছে, সেটা মোটর স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হাঁটতে হাঁটতে অভ্যাসমতো বেশ কিছু ভালো হোম-স্টের ফোন নম্বর সামনে দেওয়া বোর্ড থেকে টুকে নিলাম।
মিনিট পাঁচেক মেঘের মধ্যে দিয়ে রাস্তায় হাঁটার পরই লেপচাজগৎ শেষ হয়ে গেল। আসলে খুবই ছোট্ট জনপদ, তাও এখন পর্যটনের প্রসারে বেশ কিছু হোম-স্টে গজিয়ে উঠেছে। খান তিরিশেক তো হবেই। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। পাশ দিয়ে হুস হুস করে গাড়িগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে। কুয়াশা মেঘে এক হাত দূরেরও কিছু দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার হয়ে আসছে। নির্জন রাস্তার চারিদিকে পাইনের জঙ্গল। বন্যপ্রাণী থাকাও বিচিত্র নয়। ডান দিকে একটা পাকদণ্ডি পথ পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে পাইনবনের মধ্য দিয়ে। শেষে রয়েছে দারুণ সুন্দর এক ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। আগামীকাল ভোরে এখানেই সানরাইজ দেখতে আসব বলে ঠিক করলাম। বৃষ্টির ফোঁটা বড়ো হতে শুরু করেছে। পা চালিয়ে চলে এলাম হোম-স্টেতে। ঘরে এসে বসতেই বেশ ভালোই বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়ে গেল। থাকব একদিন, তার মধ্যে যদি এরকম পরিস্থিতি হয় তা হতাশা এনে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। সন্ধ্যাবেলা দুটো ফ্যামিলি আড্ডায় বসলাম বন্ধ ঘরে। সঙ্গে চলে এল গরম গরম চা আর মোমো। আহা অমৃত! রাত বাড়ছে, ঝোড়ো হাওয়া, বৃষ্টি বাড়ছে, বাড়ছে ঠান্ডাও। নিচে গিয়ে দুর্দান্ত দেশি চিকেনসহ রাতের ডিনার সেরে এসে সোজা দুটো করে মোটা কম্বলের তলায়। তাতেও ঠকঠকানি বিন্দুমাত্র কমছে না। এদিকে বাইরে তখন হাওয়ার দাপটে কান পাতা দায়। সারাক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ আর হোম-স্টের কাঠের বাড়িতে দড়াম দড়াম ধাক্কা। ঝন ঝন্ করে কোথায় যেন কাচ ভেঙে পড়ল। মাঝে মাঝেই এটা ওটা খুলে উড়ে যাবার শব্দ। বৃষ্টি আর ঝড়ের দাপটে দিশেহারা হয়ে মনে মনে ইষ্ট নাম জপ করতে করতে কম্বলের ওমে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তার ঠিক নেই।


ঘুম ভাঙল ভোরেই। সানরাইজ দেখার আশায় বিছানায় শুয়েই কাচের জানলার পর্দা সরিয়ে দিলাম। মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। গত রাতের ঝঞ্ঝার চিহ্নমাত্র নেই বাইরে। যদিও আকাশ একেবারই সাফসুতরো নয় তবুও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় সোয়েটার, চাদর জড়িয়ে দরজা খুলে আমাদের ছাদের গ্যালারিতে চলে এলাম। একরাশ ঠান্ডা হাওয়া ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। অদূরের পাইনের সারিগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পুবের আকাশ বেশ ফরসা, তবে নিচের দিকে হালকা মেঘ আছে। আরও কয়েকজন বোর্ডার সানরাইজ দেখার জন্য উঠে এসেছেন ছাদে। আমাদের ওঠাউঠির কোনো ঝামেলাই নেই। ঘর সংলগ্ন ছাদটা যেন আমাদেরই সম্পত্তি। হোম-স্টের একটি অল্পবয়স্ক মেয়ে ছাদ ঝাঁট দিয়ে গতকালের ঝড়ের দাপটে ভেঙে ইতঃস্তত ছড়িয়ে থাকা কাচ পরিষ্কার করছে। সূর্যের লাল আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে পুব আকাশে। কিন্তু তিনি কোথায়? ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। সেটা মেঘ না বরফশৃঙ্গ তাও ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। বাইনোকুলার লাগিয়েও কাজ হল না। শৃঙ্গ না মেঘ তাই নিয়ে তর্কটা চলতেই থাকল। অগত্যা হতাশ হয়ে পাসাং কন্যার দিয়ে যাওয়া ধোঁয়া ওঠা বেড-টিতে চুমুক দিলাম। শরীর মন চাঙ্গা হতেই আমি আর বন্ধু অনুপম ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়লাম ভিউ পয়েন্টের দিকে। সেই আগের দিনের রাস্তা ধরে পাইন বনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বেশ ঠান্ডা নির্জন, নিরিবিলি পরিবেশে। পাকা রাস্তা ছেড়ে বনের পাকদণ্ডি পথ বেয়ে উঠে এলাম ভিউ পয়েন্টে। এটাই লেপচাজগতের সব থেকে উঁচু স্থান। নির্জন নিরিবিলি পরিবেশ আর বেশ কিছু নাম না জানা পাখির ডাককে নস্যাৎ করে দিয়ে কানে আসছে বেশ কিছু পর্যটকের কলরব। সবাই দেখি ক্যামেরা তাক করে আকাশের ফটো তুলছে। ভালো করে তাকাতেই ঠাহর হল ওই তো সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘার হালকা অবয়ব। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে পটাপট শাটার টিপে গেলাম, কিন্তু ডিসপ্লেতে মেঘ ছাড়া কিছুই ধরা পড়ল না। বুঝলাম ওনাকে ফ্রেমে ধরা DSLR-এর সাধারণ লেন্সের কম্মো নয়, টেলি-লেন্স দরকার। অগত্যা ক্যামেরা ছেড়ে মনের টেলি-লেন্সে তুলতে লাগলাম তার ফটো। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে লজে ফিরে এলাম। আজ যে ফেরার দিন। আমরা ফিরে যাচ্ছি বলে বোধহয় প্রকৃতির আজ খুব আনন্দ। তাই সকাল থেকেই রোদ ঝলমলে। পাইনের জঙ্গল, মেঘ কুয়াশার খুনসুটি উপভোগ করছি ছাদে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ জঙ্গলের কাছে বিদ্যুতগতিতে একটা বিশাল কালো লোমশ প্রাণী লাফিয়ে রাস্তা ক্রস করে অন্য ধারে চলে গেল। পাসাংজিকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ওটা একটা ব্ল্যাক প্যান্থার। এ জঙ্গলে ওর ডেরা আছে। শুনে প্রাণটা ভয়ে কেঁপে উঠল।
মালপত্র বাঁধাছাঁদা শেষ করে ব্রেকফাস্ট করতে না করতেই আশীষের গাড়ির হর্ন শুনতে পেলাম। লেপচাজগৎকে বিষণ্ণ মনে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম।


আজকের প্রথম গন্তব্য জোড়পোখরি। লেপচাজগৎ ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে সুখিয়াপোখরি বাজার থেকে গাড়ি বাঁ-হাতি উঁচু পথ ধরল। দু’দিকে উঁচু উঁচু সরলবর্গীয় বৃক্ষের মাঝখান দিয়ে নির্জন ঝিঁঝিঁ ডাকা রাস্তা। লেপচা থেকে দূরত্ব মাত্রই ৫ কিলোমিটার। জোড়পোখরি আসলে এক জোড়া ছোট্ট দারুণ সুন্দর হ্রদ। পোখরি মানে জলাশয়। লেকের জলে রাজহাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিঃস্তব্ধ, নির্জন চারপাশ। এখনও পর্যটকের ভিড় একে গ্রাস করেনি। লেকদুটোকে এখন কংক্রিট দিয়ে সরকার থেকে বাঁধিয়ে দিয়েছে আর পাশে বেঞ্চে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা। বিশাল একটা সাপের ফণা তোলা মডেল রয়েছে জলের মধ্যে, আর আছে ফোয়ারা। ভাগ্য ভালো থাকলে লুপ্তপ্রায় হিমালয়ান স্যালামান্ডার এই লেকে দেখতে পাওয়া যায়। লেকের পিছন দিকে ধূপি আর পাইন গাছের জঙ্গল। আসলে জায়গাটি সেঞ্চল অরণ্যের অন্তর্গত। ওয়েদার পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। আর অন্যদিকে দেখা যায় দার্জিলিং আর কার্শিয়াংয়ের ল্যান্ডস্কেপ।


একরাশ মুগ্ধতা ফেলে রেখে আবার এগিয়ে চলা। সুখিয়াপোখরি থেকে পাহাড়ি রাস্তায় কিছুটা এগোতেই এসে পড়লাম সীমানা ভিউ পয়েন্টে। সার দিয়ে রাস্তার ধারে পর্যটকদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আর পর্যটকরা ক্যামেরায় প্রকৃতিকে ফ্রেম বন্দি করছে। এ এক অদ্ভুত জায়গা। রাস্তার বাঁ-দিকে ভারত আর ডাইনে নেপাল। রাস্তাই তার সীমারেখা। নেই কোনো কাঁটাতারের বেড়া, নেই কোনো সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারি, চোখ রাঙানি। ভারত আর নেপাল এখানে হাত ধরাধরি করে অবস্থান করছে। বেশ কিছু অস্থায়ী দোকান খুলে নেপালিরা বিক্রি করছে স্যুভেনির, মোমো, চা, কফি ইত্যাদি। একটু চায়ে গলা ভেজানো হল, সঙ্গে কিছু কেনাকাটাও। সামনেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে ভ্যালি, তাতে বেশ কিছু নেপালি আর ভারতীয় গ্রাম দৃশ্যমান। তার পিছনেই পাহাড়ের প্রাচীর। এক দোকানি অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখালেন মানেভঞ্জন, টংলু, চিত্রে সহ সান্দাকফুর যাত্রাপথ। এই ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করতে করতে নেপাল আর ভারতের বেশ কিছুটা দেখা যায়। আর ওয়েদার ক্লিয়ার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার অসামান্য রূপ। এবার সত্যি সত্যি নেপালে ঢুকব বলে কিছুটা এগিয়েই দাঁড়ালাম বর্ডারে। চেকপোস্টে আই কার্ড দেখিয়ে হেঁটে ওপারে নেপালের পশুপতিনগরে প্রবেশ করলাম। এটা নেপালের ইলম ডিস্ট্রিক্টে পড়ে। সার দিয়ে মারুতি ওমনি দাঁড়িয়ে আছে। ৪০০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া-আসা করায় ৪ কিলোমিটার দূরের মন্দির আর মার্কেট দেখানোর জন্য। যদিও এমন কিছু আহামরি দ্রষ্টব্য নয়, তবে পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের এমন সহজ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নাকি! অন্য দেশের মাটিতে ঘোরাঘুরি, কেনাকাটা আর পশুপতিনাথের মন্দির দর্শন করতে বেশ রোমাঞ্চই লাগছিল। বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার ফিরে এলাম দেশের মাটিতে।


এরপর মিরিকের উদ্দেশে যাত্রা। মাঝে অসাধারণ সুন্দর গোপালধারা টি এস্টেটে যাত্রা বিরতি। বাগান থেকে চা খেয়ে ফ্রেশ চা কেনা হল। আবার মিরিকের পথে। দু’ধারে এখন শুধু মাইলের পর মাইল ঢেউ খেলানো চা বাগান। এই রাস্তাটার সৌন্দর্য বর্ণনা করা কোনও কলমের সাধ্য নয়। বার বার আসা যায় শুধু এই রাস্তার টানে। তবে মিরিককে আর ভালো লাগল না। ২৫ বছর আগেকার প্রথম দেখা সেই সুন্দরী মিরিক আজ সৌন্দর্যায়নের ফাঁদে পড়ে তার নিজের সৌন্দর্য হারিয়েছে। সেই নির্জন মিরিক লেক আজ জনারণ্যের ভিড় আর কোলাহলে যেন কলকাতার ইকোপার্ক। লেক সংলগ্ন পার্কেও সেই কৃত্রিমতার ছোঁয়া। অদূরেই হোটেল, লজ আর রেস্তোরাঁর ভিড়ে দম যেন বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। কোনোরকমে লাঞ্চ সেরে রওনা দিলাম শিলিগুড়ির দিকে। মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঙচুয়ারির ভিতরের পথ ধরে আশীষ যখন এনজেপি স্টেশনে নামিয়ে দিল তখন সন্ধে প্রায় হব হব। এ ক’দিনের সাথী আশীষকে বিদায় জানাতে গিয়ে চোখটা ছলছল করে উঠল। গাড়ি ঘুরিয়ে আশীষ ফিরে যাওয়ার পথ ধরল। ফিরে যাবে ওই যে দূরের আকাশের বুকে ছেড়ে আসা সেই মেঘ পিয়নের দেশে, যেখানে আমাদের মনটা ফেলে রেখে এসেছি।
বিদায় বন্ধু, আবার দেখা হবে হারিয়ে যাওয়া সেই মন খুঁজতে গিয়ে না হয় কোনো একদিন।

----------
ফোটো - লেখক