রকমারি আড্ডা - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

রকমারি আড্ডা

নতুন বছরে শুরু হচ্ছে কিছু নতুন বিভাগ। রকমারি আড্ডাতে প্রতিবার আমরা বইয়ে পড়া কিছু কাল্পনিক চরিত্রদের মুখোমুখি বসাব, আড্ডা দেওয়াব। এখানে ফেলুদা এবং ব্যোমকেশ বকসির কাল্পনিক একটি আড্ডা চলছে। দেখা যাক ওঁরা কী নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন।
-      সহেলী চট্টোপাধ্যায়

ব্যোমকেশ আর ফেলুদা একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। বহুদিন পর দুজনে এক হয়েছেন। আড্ডার স্থান ব্যোমকেশের কেয়াতলার বাড়ি।
ফেলুদা - বহুদিন পর আপনাকে দেখে বেশ ভালো লাগছে মিস্টার বকশি। অজিত বাবু কে তো দেখছি না।
ব্যোমকেশ – অজিত এখানে থাকে না। মাঝে মাঝে এসে ঘুরে যায়। তারপর অবসর জীবন কেমন লাগছে ফেলুবাবু?
“আর বলবেন না। ভীষণ খারাপ লাগছে। আপনার কথা কিছু বলুন
“আমার অবস্থা আপনার চেয়েও খারাপ। বছর বছর খালি ব্যোমকেশের বদল হচ্ছে। হিন্দি ছায়া ছবিতে ব্যোমকেশ বক্সীকে দেখে খুব কষ্ট হল। আমাকে শেষে নাচতেও হল! সে আর কী বলি! আপনাকে তো তবু আগলাবার কেউ একজন আছে। আপনাকে নিয়ে পরিচালকরা যা খুশি তাই করতে পারবে না
“তা আছে। দুটো নতুন বন্ধু করারও উপায় নেই,” বলে খুব একচোট হাসল ফেলুদা।
ব্যোমকেশ হেসে ফেললেন ফেলুদার কথা শুনে। খানিক পরে হাসি থামিয়ে ব্যোমকেশ জিজ্ঞাসা করলেন, “লালমোহন বাবু কেমন আছেন? আর আপনার ভাই তপেশ?”
“জটায়ু এমনিতে ভালই আছে তবে ইদানীং একটু মুষড়ে পড়েছে। তোপসে কানাডায় আছে। রোজ  একবার করে বলবে তোমরা এখানে এসে ঘুরে যাও। সিধু জ্যাঠার কাছেও বহুদিন যাওয়া হয় না। এখন তো গুগুলেই সব কিছু পেয়ে যাই,” এই পর্যন্ত বলে ফেলুদা একটু হাসল, মন খারাপের হাসি ছিল সেটা।
“আর আপনার সেই বৈজ্ঞানিক দাদার খবর কী? (প্রফেসর শঙ্কু) আর একজন ছিলেন... কী যেন নাম... মনে পড়েছে তারিণী খুড়ো। খুব ভালো গল্প বলতেন খুড়ো। অনেকটা বরদার মত (শরদিন্দু   বন্দ্যোপাধ্যায় এর অপর বিখ্যাত চরিত্র)
“শঙ্কুদা দিব্ব্যি আছে! নিত্য নতুন আবিস্কার করে চলেছেন। তবে সেগুলো নিয়ে লেখার কেউ নেই। আর তারিণী খুড়ো মাঝে মাঝে এসে গল্প করে যান, এখনও সেরকমই গল্প বলেন, শোনার সময় নেই  এখনকার ছেলে মেয়েদের, তাই আমাকেই শুনিয়ে আনন্দ পান। খুড়োর সবই ভালো এক ওই বিড়ি খাওয়া অভ্যাসটা ছাড়া। আমাকে তো বাবা চারমিনার ধরিয়ে গেছেন কিন্তু খুড়োকে বিড়ি কেন ধরালেন? এই খটকাটা এখনও গেল না। খুড়োর পয়সারও অভাব নেইকিনে দিয়েছিলাম কয়েকবার তবু বিড়ি ছাড়তে পারলেন না
ব্যোমকেশ হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “আমার বাবাও আমাকে সিগারেট ধরিয়ে গেছেন। জানেন একবার দেশলাই ধরাতে গিয়ে প্রায় মরতেই বসেছিলেম!  ভিড় বাসে উঠেছিলাম কেউ আমার থেকে দেশলাই চাইল, আমি পকেট থেকে বার করে তাকে দেশলাই দিলাম। লোকটা আমাকে দেশলাইটা ফিরিয়েও দিল। আমি ভাল করে না দেখেই পকেটে ঢুকিয়েছি। তারপর বাড়ি এসে সিগারেট ধরাতে গিয়ে দেখি আমার দেশলাই বদলে গেছে। বাসের ভিড়ের সুযোগে বদমাশ লোকটা আমাকে বিষাক্ত কাঠির দেশলাই ধরিয়ে দিয়েছে। আমার চোখ খুব ভাল ছিল বলেই বুঝতে পেরেছিলাম ব্যাপারটা। দেশলাই বাক্স’র সিম্বলটা বদলে গেছিল। অথচ পরিচালকগুলো আমার চোখে মোটা একখানা চশমা দিয়ে রাখে সব সময়! আমার চোখে চশমা ছিল এটা কোথাও বাবা লিখে যাননি
ফেলুদা হেসে ফেলল এবার, “আপনি পারেনও বটে। কী দরকার ছিল ভিড় বাসের মধ্যে লোকটাকে দেশলাই দেবার? বাসের মধ্যে কেউ ধূমপান তো করে না। আপনার জায়গায় আমি থাকলে লোকটাকে তখনই ধরে ফেলতাম। দরকার হলে চলন্ত বাস থেকে নেমে দৌড়তাম
“আপনি তো মশাই চির জীবন জিন্স পরেই কাটিয়ে দিলেন, তাই আপনার পক্ষে চলন্ত বাস থেকে নেমে দৌড় লাগানো খুবই সাধারণ ব্যাপার। আমার অবস্থাটা ভাবুন তো একবার! ধুতি সামলে কি ওভাবে দৌড়ানো যায়? তবু দৌড়েছি এক এক সময়। আপনার বাবা আমার বাবার খুব বড় ফ্যান ছিলেন
“তা আর জানিনা! বাবা চিড়িয়াখানা বানিয়েছিলেন মহানায়ককে ব্যোমকেশ করে। তা ছাড়া আপনার চিত্রচোর গল্পটা বাবার এত ভালো লেগেছিল যে উনি আমার গল্প দার্জিলিং জমজমাট-এ একটা ছবি নিয়ে রহস্য রেখেছিলেন
“তাই নাকি! চিত্রচোর গল্পে আমি, সত্যবতী, অজিত সবাই মিলে সাঁওতাল পরগণায় গেছিলাম। আমার খুব অসুখ করেছিল তাই চেঞ্জে যেতে বলেছিল ডাক্তার বাবু। ওখানে গিয়ে ছবি চুরির রহস্যে ফেঁসে যাই । তারপর একজন খুনও হয়ে যায়বিনা পারিশ্রমিকে কেসটা সমাধান করি। তার জন্য তোমার সত্য বউঠান কম কথা শোনায়নি আমাকে......মানিক কাকু আমার অবস্থাটা জানতেন খুব ভালো করে তাই আর তোমার বিয়ে দেননি। আর এই জন্যই তুমি আরও বেশি খ্যাতি পেয়েছ
“সে যাই হোক, আসলে রহস্য সমাধান করেই আমাদের আনন্দ। টাকা রোজগারের চেয়েও অনেক বড় ব্যাপার। অনেক সময়ই দেখেছি আমার মক্কেল নিজেই দোষী। সেক্ষেত্রে আমার একটা পয়সাও জোটেনি। মাঝে মাঝে খুব কঠিন রহস্যের সমাধান করতে পারলে মস্তিস্কেরও ব্যায়াম হয়ে যায়, হয় কি না?”
“তা খাঁটি কথা বলেছ ভায়া। এই যা মনের ভুলে তোমায় তুমি বলে ফেললাম
ফেলুদা হেসে ফেলল।
“তা ভালই করেছেন, সারাক্ষ আপনি আজ্ঞে আপনার মুখ থেকে শুনতে ভাল লাগে না
“কী করব! তোমরা একেলে ছেলে, হয়ত কিছু মনে করতে পারো এই ভেবে তুমি বলার সাহস পাচ্ছিলাম না
“আমার বয়স ৫০ হয়ে গেছে দাদা! একেলে ছেলে কাকে বলছেন!”
“তাও তুমি চির নবীন মিস্টার প্রদোষ চন্দ্র মিটার। এখন পঞ্চাশ আবার একটা বয়স নাকি!”
দুজনেই খুব হেসে ওঠে।
“আচ্ছা দাদা, একটা অনধিকার চর্চা করছি। জানেন তো গোয়েন্দাদের কৌতূহল সব ব্যাপারেই একটু বেশি হয়। সত্যবউদি কি ঝগড়াঝাঁটি খুব বেশি করেন? ওই যে বললেন তখন বাবা আমার বিয়ে না দিয়ে ভালই করেছেন
“তা করেন না। আর করলেও তার জন্য আমারই দোষ বেশি থাকে। আসলে কী বল তো, সারা দিন জটিল জটিল রহস্যের সমাধান করতে গেলে অন্য কিছুতে আর মন দেওয়া যায় না। এই বাজার-দোকান, সংসারের সাতসতের এসব কি আর ভালো লাগে? খুব জটিল কোনও কেস আসলে তোমার বউদি কে তার দাদার বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়- এই যা
এই সময় বাইরে একটা গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। ব্যোমকেশ বললেন, “ওই যে ফিরলেন মনে হচ্ছে। পুঁটিরাম দরজাটা খুলে দাও
“আমি আজ উঠি তাহলে। আবার একদিন জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে
“আরে ভয় নেই। তোমার বউদিদি এত খারাপ মানুষ নয়। (প্রায় অট্টহাস্যে ) উনি তোমার জন্য স্পেশাল রাবড়ি , মাখা সন্দেশ এর ব্যবস্থা করেছেএকটু মিষ্টিমুখ করে যেও। আর কলিমুদ্দিনের দোকানের ডালমুট তো আছেই চায়ের সাথে। তুমি তো আবার মাখা সন্দেশ আর রাবড়ি এই দুটো জিনিস খুব ভালোবাসোনাকি এখন সব ছেড়ে দিয়েছ?”
“এখন সুগারের ভয়ে অনেক কম খাই। তবে আজ খাবো
“আচ্ছা তোমার সেই মগনলাল মেঘরাজ এখন কেমন আছে?”
“দিব্যি আছে দাদা! আমাদের এখন গভীর বন্ধুত্ব। একদম বদলে গেছে এখন। মাঝে মাঝে ওর বেনারসের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন করে কাটিয়ে আসি। আর লালমোহন বাবুর সাথেও খুব ভাব হয়ে গেছে
“নাহ! তোমার সাহস আছে স্বীকার করতেই হবে। আমি আর অজিত যাব একবার বেনারসে। তোমার সাথেই যাব
“নিশ্চয়। বেশ ভালো কাটবে। একটা জিনিস হলে খুব ভালো হত। আমাদের অসম্পূর্ণ গল্পগুলো যদি কেউ শেষ করার ভার নিতে পারত!
“তা সত্যি! বাংলা সাহিত্যে তো এখন শক্তিশালী লেখকের অভাব নেই। আমারও একটা গল্প অসমাপ্ত পড়ে রয়েছে। হবে হয়ত কোনও দিন
“আমাদের শেষ ইচ্ছে কি কোনও দিন পূর্ণ হবে? যদি হত তাহলে শেষ বারের মত অ্যাডভেঞ্চারে পাড়ি দিতে পারতাম। বই-এর পাতায় অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে থাকতে আর ভাল লাগছে না
“আমি ভাবছি মাঝে মাঝে দু জনে মিলে ছদ্মবেশে কলকাতা শহরটার আশে পাশে একটু ঘুরে দেখব। এখনকার ছেলেমেয়েরা আমাদের চেনে কি না সেটা তো দেখতে হবে। বেশ নতুন একটা অ্যাডভেঞ্চার হবে
ফেলুদা আবার হেসে ফেলল, “ওরা আমাদের চেনে, সিনেমায় দেখেছে। তবে মন থেকে ভালবাসে বলে মনে হয় না। সবগুলো পড়েছে কি না কে জানে! সবার এত সময়ই বা কোথায়? আমাদের সময় এত পড়াশোনার চাপ ছিল না। খেলার মাঠ ছিল, অলস দুপুর ছিল, চিলেকোঠার নির্জন ঘর ছিল, বৃষ্টি ভেজা রাত ছিল, কল্পনার জন্য সময় ছিল
ফেলুদার কপালে আবার সেই বিখ্যাত ভাঁজ।
ব্যোমকেশ আর কিছু বললেন না। এর মধ্যে পুঁটিরাম আর সত্যবতী চা জলখাবারের ট্রে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে ফেলেছে।
------------
ছবি – তন্ময় বিশ্বাস

No comments:

Post a comment