ভ্রমণ:: সবুজ পাহাড়ে সূর্যাস্ত - তপশ্রী চক্রবর্তী ভৌমিক

সবুজ পাহাড়ে সূর্যাস্ত
তপশ্রী চক্রবর্তী ভৌমিক

তখন আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। গ্রীষ্মের ছুটিতে সিমলা-কুলু-মানালি যাওয়া হতে পারে, এই আশায় ব্যাকুল হয়ে দিন গুনছি, কারণ সমুদ্র-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বেশ কয়েকবার হলেও সেইভাবে তখনও পাহাড়-ভ্রমণ হয়ে ওঠেনি বন্ধুদের জানানোও হয়ে গেছে আমার সেই আকুল আশার কথা।
যথা সময়ে আমায় আশাহত করে বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন – সেবার আমরা সিমলা - কুলু নয়, দিল্লী হয়ে হরিদ্বার, হৃষীকেশ ও কনখল যাব। মনের দুঃখে কথাটা বন্ধুদের কাছে বেমালুম চেপে গেলাম, শুনলে বন্ধুরা নির্ঘাত হাসাহাসি করবে। অতএব মনের দুঃখ মনেই চেপে রেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিলাম।
নির্দিষ্ট দিনে আমরা গাড়ি করে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছলাম। রাতের ট্রেনে সোজা দিল্লী, সেখানে দু’দিন থাকার পর সেখান থেকে বাসে করে গেলাম হরিদ্বার। হরিদ্বার পৌঁছেই একটু একটু করে আমার মন খারাপ দূর হতে থাকল। কে জানে, হয়তো বা একেই বলে স্থান মাহাত্ম্য।
‘হর-কী-পৌড়ি’-তে গঙ্গারতি
সন্ধ্যাবেলায় ‘হর-কী-পৌড়ি’-তে গঙ্গারতি দেখে ও শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পরদিন সকালে বড় ট্যুরিস্ট বাসে করে হৃষীকেশ কনখল-এর পথে রওনা হলাম। খুবই আরামদায়ক বাস – শ্রীকৃষ্ণ, মাতারানির ভজন চলছিল অবিরাম। বাস উঠছে নামছে গাড়োয়াল হিমালয়ের কোল ঘেঁষে পাহাড়ি পথ বেয়ে, অবিরাম সবুজের সমারোহে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে – সে এক স্বপ্নিল অনুভূতি। এইভাবে আধো জেগে আধো ঘুমে সফর করতে করতে একে একে দেখে ফেললাম পাহাড়ের মন্দিরগুলি। বিকেলের দিকে একটু বেশি সময় হাতে নিয়ে নামলাম ‘পবন ধাম’-এ পবনপুত্র হনুমান মন্দির দর্শনে – বিশালাকার প্রায় ত্রিশ ফুট উচ্চ হনুমানজিকে দেখে বিমোহিত হলাম। মন্দিরের ভিতরে চতুর্দিকে অপূর্ব কাচের কারুকার্য।
পবন ধাম ও হনুমানজি
কিছুক্ষণ পরে মন্দির থেকে বেরিয়ে সামনের বিশ্রাম কেদারায় গা এলিয়ে দিলাম, দেখলাম সকলে চা-জলযোগ পর্ব সারতে ব্যস্ত। এই সুযোগে আমিও চোখের ও মনের ক্ষুধা মেটাতে লাগলাম। দেখলাম, আমার সামনেই অদূরে ধাপে ধাপে গাড়োয়াল পাহাড় উঠে গেছে, পাহাড়ের কোলে সবুজ শ্যামলিমার বিস্তার কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ, খুঁজেই পাওয়া যায় না তার শুরু ও শেষ, মনে কেবল থেকে যায় তার রেশ। দূরে পাহাড়ের উপর নীলাকাশ অনেকখানি কমলারঙ মেখেছে, সূর্যঠাকুর অস্তাচলে প্রায় ঢলে পড়েছেন। পাহাড়ের উপরে প্রকৃতির এমন অপূর্ব রূপ এভাবে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ আগে কখনও হয়নি। সমুদ্রে সূর্যোদয় – সূর্যাস্ত দুইই দেখেছি একাধিক বার, পাহাড়ের সবুজ কোলে আগুনরঙা সূর্যাস্ত দেখলাম সেই প্রথমবার। দু’চোখ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না – সে কি স্বপ্ন, নাকি সত্যি!! সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে শোনা গেল মন্দিরের শঙ্খধ্বনি – ঘণ্টাধ্বনি। যেখানে সূর্যদেব ক্রমশ অস্তমিত হচ্ছিলেন, সেখান থেকে সারি সারি সাধুবাবা দলবদ্ধ হয়ে নেমে এলেন। আমাদের সামনে দিয়ে যখন চলে যাচ্ছেন, তখন হঠাৎ আমার সম্বিত ফিরল মায়ের ডাকে – এবার তো ফিরে যেতে হবে, সবাই বাসে উঠে পড়েছে যে। প্রকৃতির অকৃপণ দান মানুষের প্রতি – দেখে এবার ফিরে চলার পালা।

বরফ ঢাকা পাহাড় দেখার শখ হয়েছিল, কখনও হয়তো নিশ্চয়ই পূরণ হবে আমার সেই শখ, তবে প্রথমবার পাহাড় দেখার এমন ঐশ্বরিক উপলব্ধি হয়তো আর কখনওই হবে না, ভাবলে সত্যিই এখনও মনে হয় একটাই কথা –


‘ঈশ্বর স্বয়ং নিশ্চয়ই কোথাও আছেন,
কোনও না কোনও খানে –
আমাদের খুব কাছে
প্রকৃতির মাঝখানে।’
--------
ছবি - লেখক

No comments:

Post a comment