গল্পের ম্যাজিক:: মেজদাদার টুথব্রাশ কাণ্ড - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

মেজদাদার টুথব্রাশ কাণ্ড
সহেলী চট্টোপাধ্যায়

আমার দুই দাদা বড়দা আর মেজদাকে দেখলে আমার জগাই আর মাধাইয়ের কথা মনে পড়ে। না না ওরা মোটেই খারাপ নয় বরং বেশ ভালোই। জগাই মাধাই-ই বা এমন কি খারাপ ছিল? বেশি খারাপ হলে মহাপ্রভু তাদের উদ্ধার করতেন না। আমার ছোড়দাকে দেখলে তোমাদের মহাপ্রভুর কথা মনে পড়বে। মাথাটাও ন্যাড়া আবার স্বভাবের দিক থেকেও মহাপ্রভু। পার্থিব জগতে বিচরণ করে না। তুমি আজ একশ টাকা ধার নিয়ে পরের দিন শোধ দিতে যাও, চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কী ব্যাপার? টাকা দিচ্ছ কেন?
তোমাকে তখন গোড়া থেকে শুরু করতে হবে যে, কাল তোমার থেকে ধার করেছিলাম তাই শোধ দিচ্ছি।
আর বড়দার কাছে একশ টাকা ধার চেয়ে দেখো। শুনতে না পাবার ভান করে চলে যাবে। মেজদার ঘরের দরজা সব সময় বন্ধ থাকে পাছে আমরা ভাই বোনেরা কিছু ধার-টার চেয়ে বসি। মনে করে বিশ্ব সংসারের সমস্ত মানুষ ওর কাছে টাকা ধার চাইতে ছুটে আসছে। আমাকে দেখলেই দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দেবে। আসলে কী জানো, আমি বেশি কথা বলি তাতে ওর অসুবিধা হয়। ও কিছু একটা  আবিষ্কার করার চেষ্টায় আছে। ওটা আবিষ্কার হলে নাকি পৃথিবীতে একটা ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যাবে। একটা টাইম মেশিন আবিষ্কারের ব্যাপারে বিজি আছে। তবে অ্যাটম বম ছাড়া আর কিছু আবিষ্কার করতে পারবে বলে মনে হয় না। আমাকে দেখলেই চোখ মুখ লাল করে বলবে, ‘এক্ষুনি বেরো এখান থেকে। আমার সব কাজ পণ্ড করতে এসেছ!’ দরজা বন্ধ করে দেবার পর আমি জানলাগুলোতে উঁকি মারি। জানলাগুলোও দুম দুম করে বন্ধ করে দেয়। মাঝে মাঝে বাংলার বদলে হিব্রু ভাষায় কথা বলে আমার সাথে। যাতে আমি কথা না বলি। তবে ভাষাটা হিব্রু কিনা আমি ঠিক জানি না, ফরাসী হতে পারে। জাপানি বা স্প্যানিশও হতে পারে। তামিল বা তেলেগুও হলেই বা কি যায় আসে? বাংলা ছাড়া আমি আর কোনও ভাষা বুঝি না। তাই ইংরাজি, ফরাসি, জার্মানি, তেলেগু, মনিপুরী, সাঁওতালী, স্প্যানিশ সব সমান আমার কাছে।
যাই হোক, টাইম মেশিনটা হলে আমাকে চড়তেও দেবে না। তবে আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। নিজের আবিষ্কার গোপন রাখতে চায়, তাছাড়া ছ’মাস ছাড়া স্নান করে আর সাত দিন  ছাড়া দাঁত মাজে সেটাও পাছে বুঝে ফেলি, তাই এমন দূর দূর করে। সত্যান্বেষী হিসেবে আমার একটু নাম ডাক হয়েছে কিনা! তোমরা হাসছ যে বড়ো?  এখনও তেমন নাম হয়নি কিন্তু ভবিষ্যতে যে হবে না তা কে বলতে পারে? বড়দাও স্নান-টান করার পক্ষপাতী নয়। মেজদা বিদেশ থেকে ফিরেছে সবে। আর আমাদেরও জরুরি অবস্থা শুরু হয়ে গেছে। প্রত্যেক পরিবারে এমন এক জন মিলিটারি মেজাজের লোক থাকবেই। দুঃখের কিছু নেই।
তা মেজদা ফিরেই আমাদের বাগানে যে ভাঙ্গাচোরা ঘরটা ছিল ওটাকে সারিয়ে টারিয়ে দিব্যি একখানা ল্যাব বানিয়ে ফেলেছে। ওখানে বড়দা আর ছোড়দা ছাড়া আর কারোর প্রবেশ নিষেধ বড়দা, মেজদা আর ছোড়দা আমার বড়ো জেঠুর ছেলে। আর ইন্দুদি আর বিন্দুদি আমার মেজো জেঠুর দুই মেয়ে। দুজনেই যমজ। আমার আরও তিনজন দাদা আছে পাপাইদা, তাতাইদা আর বাপ্পাদাএরা আমার সেজো জেঠুর ছেলে। তবে বাপ্পাদা আমার পিসির ছেলে, আর আছে ছোটো ভাই ধানী লঙ্কা। ধানী লঙ্কা বয়সে অনেক ছোটো কিন্তু মনে করে সবার চেয়ে বয়সে বড়ো। ওর নাম ধানী লঙ্কা নয়, আমিই রেখেছি মনে মনে তবে দুঃশাসনও রাখা যায়। আমাদের গল্প তোমরা আগেও পড়েছ হয়ত। শাসন করা অসাধ্য যাকে। ডাক নাম বিট্টু ভালো নাম ভিক্টর। তবে নামে কি আসে যায়!
আমরা সবাই ছোটো, স্কুল অথবা কলেজে পড়ছি সবাই। বড়দা, মেজদা আর ছোড়দা আমাদের থেকে বেশ বড়ো। তবে ছেলেমানুষির কোনো কম্পিটিশান হলে এই তিন দাদাই প্রথম পুরস্কার পাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে এদের টাইম মেশিন সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানতে পারছি না, পারলে ঠিক তোমাদের জানিয়ে দেবআমার পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি। আমি এদের সবার ছোটোবোন দুষ্টু। আমার বাবা এদের ছোটোকাকা হয়, শুধু ধানী লঙ্কা আর বাপ্পাদাদাই যা ছোটোমামা বলে। বড়দার একটা শাড়ির দোকান আছে আর ছোড়দা রোজ অফিস যায়। মেজদা অনেক পাস টাস দিয়ে এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যস্ত। বাকি দাদা দিদিরা কেউ কলেজ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়। আমি আর বিট্টু এখনও স্কুল। মাঝে মাঝে এক একটা ক্লাস বেশ ভালো লেগে যায়, ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। বেশি পছন্দ হলে থেকেই যাই বাড়িতে সবাই বকে। তা বকুক। টকাটক পাশ করাতে কিই বা মজা আছে? বিট্টু তো কবেই আমাকে ধরে ফেলেছে।  আগে ও অনেক নিচু ক্লাসে ছিল। এবার আমাকে টপকে যাবে।

এক রবিবার সকালে ছাদে উঠে ফুল গাছে টবগুলোয় ভালো করে জল দিচ্ছি, এমন সময় সিঁড়িতে  দুম দুম শব্দ। এই পায়ের শব্দ আমি চিনি। ডাইনোসররা বহু যুগ আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু তারা যদি সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করত তাহলে ঠিক এইরকম শব্দই হত বলে আমি মনে করি। তারাই কি আবার ফিরে এল? কিন্তু ছাদে যারা উঠল তাদের দেখে আমি হতাশ হলাম। আমার দুই ভ্রাতা। বড়দা আর মেজদা। ডাইনোসরদের কান কাটতে পারে ওরা। লুকিয়ে পড়ি চট করে, এদের গোপন কথাগুলো শুনতে হবে। নিশ্চয়ই নিজের গবেষণার ব্যাপারে আলোচনা করবে মেজদা। কিন্তু যা ভাবলাম তা হল না।
মেজদা পায়চারি করতে করতে খুব রেগে গিয়ে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, ‘অসম্ভব এ যাতনা আর সহ্য হয় না
এ আবার কি! যাত্রা করবে নাকি দুই ভাই? তারই পার্ট মুখস্থ করতে ছাদে উঠেছে? আর একটু ভালো করে শুনি এদের আলোচনা।
মেজদা আবার বলল, ‘আমি নিজের দাঁত নিজে মাজতে পারছি না, এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে?
বড়দা বলল, ‘ডাক্তার দেখাতে হবে
মেজদা, ‘আমি নিজের ডান হাত তুলতে পারছি না। আমাকে দাঁত মাজিয়ে দিতে হবে বড়দা। তিনদিন দাঁত না মেজে আছি। প্লিজ দাদা
বড়দা তিন হাত পিছিয়ে গিয়ে বলল, ‘ওটি আমার দ্বারা হবে না ভাই। যখন তিনদিন মাজিসই নি তাহলে চারদিন হলেই বা কী ক্ষতি হবে?
ছোড়দাও ছাদে উঠে এল। কিছুক্ষণ ছাদে হাঁটবে তারপর আবার বিছানায় যেয়ে নাক ডাকাবে। সবাই মিলে ডেকে তোলার পর ও উঠে অফিসের জন্য তৈরি হবে। আজ তো রবিবার আরও ঘুমাবে। ও বলেছে কিছুদিন পর একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলবে। ধানী লঙ্কা ওর সহকারী হবে বলে ঠিক করে রেখেছে। কিন্তু গোয়েন্দা এতো ভুলো মনের হলে অসুবিধা আছে। মেজদা ছোড়দাকে দেখে খুব ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, ‘আমার দাঁত মাজতে পারছি না রে। ডান হাতে খুব ব্যথা ......’
‘আজই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি, মেজদার কথা শেষ হবার আগেই ছোড়দা বলে উঠল
‘কিন্তু আমি যে দাঁতই মাজতে পারছি না, মেজদা প্রায় কেঁদেই ফেলে।
‘তা আমি কী করব? মাজিয়ে দেব?
‘হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই, খুব ভালো হয়
‘ঠিক আছে মেজদা। আমি এক্ষুনি গিয়ে মাজন আর ব্রাশ আনছি
ছাদে আমাদের জল আসে তাই জল আনতে হবে না। ছোড়দা তো দৌড়ে গেল কিন্তু বেশ অনেক্ষণ কেটে যাবার পরও এল না দেখে বুঝলাম ও বিছানায় পড়ে নাক ডাকছে আর মাজন পেস্ট সব ভুলে গেছে।
এদিকে অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত মেজদা এ সময় ছাদে ঝুলতে থাকা দোলনায় বসতে যায়এই দোলনায় মেজদা বসলে আর দেখতে হবে না। আমাদের বোনেদের বড় সাধের দোলনা। দোলনার গায়ে অবিলম্বে নোটিস বোর্ড ঝোলাতে হবে, ভারী লোকেদের দোলনায় বসা নিষেধ। অথবা ভারী লোকেরা দোলনা থেকে দূরে থাকবেন। আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য হই, বলি, ‘দোলনায় বোসো না মেজদা। ভেঙ্গে যেতে পারে। আমি বরং চেয়ার আনছি তোমার জন্য
‘কেন? দোলনার দাম কি আমার চেয়েও বেশি তোর কাছে?
বললাম, ‘দোলনা ভাঙ্গুক ক্ষতি নেই, কিন্তু তুমি যদি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যাও মানে হাত পা ভেঙ্গে যায় তাহলে আমাদের দুঃখের সীমা থাকবে না। এমনিতেই হাতে ব্যথা বলছ
মেজদা শুনে কিছু বলল না। বড়দাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ছোটো বলেছিল আমার জন্য ব্রাশ আর পেস্ট আনবে। কী হল ওর?
আমি নিচে এলাম। যা ভেবেছি তাই, ছোড়দা দোতলার বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। ডাকাডাকি করতে খুব বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কী হয়েছে?
‘মেজদার ডান হাতে ব্যথা দাঁত মাজতে পারছে না। তুমি বলেছিলে যে মাজিয়ে দেবে
‘এটা কি বাসন যে মেজে দেব? এরকম কিছু আমি বলিনি। মেজদাকে বল বাঁ হাত ব্যবহার করতে, বলেই আবার ঘুমিয়ে পড়ল
আমি ছাদে গিয়ে খবরটা জানিয়ে এলাম। ওরা খুব চিন্তায় পড়ে গেল।
রবিবার বলে সবার স্কুল কলেজ ছুটি। আমাদের ধানী লঙ্কাও আছে আমাদের সাথে। মেজদার দাঁত মাজা নিয়ে খুব চিন্তা করছে ও। আমি বন্ধুর বাড়ি চলে গেলাম। ছুটি থাকলে আমি প্রায় দিনই বন্ধুর বাড়ি চলে যাই। এরা যা উৎপাত করে না! সহ্য হয় না। রিঙ্কুদের বাড়িতে অনেক্ষণ আড্ডা দিয়ে ফিরে এসে দেখি বিশাল গোলমাল বাড়িতে। তাতাইদার আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ জড়ানো। ব্রাশ না পেয়ে আঙ্গুলে পেস্ট নিয়ে ও মেজদার দাঁত মাজাতে গেছিল, ফলটাও পেয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। ছাদে একটা কালো বিড়াল দেখে মেজদার দাঁত কপাটি লেগে যায়। তাতাইদার আঙ্গুল যখন বার করা হল তখন আর সেটা আঙ্গুল বলে চেনাই যাচ্ছে না। পুরো ছিবড়ে করে দিয়েছে আঙ্গুলটা। তাতাইদার মুখ দেখে মায়া হল। বাপ্পাদাও চলে এসেছে এই বিপদে আমাদের ভরসা দেওয়ার জন্য। তাতাইদা বেচারি শুয়ে আছে নিজের ঘরে। বললাম, ‘ব্রাশ ব্যাবহার করা উচিত ছিল
‘কিন্তু ব্রাশ পাওয়া যাচ্ছে না
‘ও জিনিষ একেবারেই দুর্লভ নয়। পাড়ার দোকানগুলোতে খোঁজ করলে পারতে
‘কিন্তু মেজদা বলেছে ওই ব্রাশটাই চাই
তা আর জানিনা! তা না হলে আর মেজদা কেন? যখন যে বায়নাটা জুড়বে সেটাই করতে হবে সবাইকে।
আমার ভয়ানক খিদে পেয়ে গেছে। রিঙ্কুদের বাড়ি লাঞ্চটা সেরে আসলে ভালো করতামদুপুর গড়িয়ে এখন দেড়টা।
বললাম, ‘তোমাদের খাওয়া হয়ে গেছে?
‘মাথা খারাপ! মেজদার ব্রাশ পাওয়া যাচ্ছে না আমরা কি এই অবস্থায় খেতে পারি?
‘আমার তো খিদে পেয়ে গেছে খুব
‘তা তো পাবেই, তুমি কার জন্যই বা ভাবো?
‘কিন্তু মেজদার ব্রাশ হারিয়ে গেছে বলে খাবো না আমরা? মেজদা হারালেও বা একটা কথা ছিল!
‘অলক্ষুণে কথাগুলো না বলে বেরিয়ে যাও আমার সম্মুখ থেকে
তাতাইদা বার করে দিল ঘর থেকে। খোঁজ নিয়ে দেখি মেজদা দিব্যি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়েছে

বিকেলবেলা পাপাইদা জানাল যে সে একটা নীল রঙের টুথব্রাশ খুঁজে পেয়েছে।  বাথরুমে দরজার পেছনে পড়ে ছিল। বড়দা ছাড়া সবাই উপস্থিত ব্রাশ সংক্রান্ত মিটিং-এ। পাপাইদা ধাঁ করে নিজের পকেট থেকে একটা হাল্কা নীল রঙের টুথ ব্রাশ বার করে। বন্দুকের মত সেটা বাড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করে, ‘এটাই কি তোমার ব্রাশ মেজদা?
মেজদা একঝলক দেখেই বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই আমার ব্রাশ। লন্ডনের ফুটপাথ থেকে অনেক দরদাম করে কিনেছিলাম। থ্যাঙ্ক ইয়ু পাপাই
‘কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেছে। সেই জন্য ব্রাশটা তোমাকে দিতে পারছি না
‘কী সমস্যা?
‘ওটা দিয়ে আমি জুতো পালিশ করে ফেলেছি
হাতের ব্যথা বেদনা ভুলে মেজদা পাপাইদা কে মারতে যায়। অনেক কষ্টে ছোড়দা বোঝাল, ‘অল রেডি আমাদের এক ভাইকে তুমি জখম করে বসে আছো, আর একজনকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। ক্ষমা করে দাও মেজদা। ছোটো ভাই না জেনে করে ফেলেছে। এই সব বলে থামানো গেলো
ইন্দুদি বলল, ‘একটা ব্রাশ এর আর কতই বা দাম মেজদা? নতুন কিনে ফেলো একটা। এই চৈত্র সেল-এ ভালো ভালো ব্রাশ পাওয়া যাচ্ছে
‘ওটা আমার কাছে খুব দামি ছিল, মেজদার চিৎকারে কানে তালা ধরে যাবার জোগাড়
আমার বাবা মা, ঠাকুরমা, বড়মা ছাড়া সবাই পুরী গেছে তাই বাড়িতে লোক বেশি নেই। ঠাকুরমা আমাকে একবার ডেকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘কোনো দামি জিনিষ কি চুরি হয়েছে বুড়ি?
ঠাম্মি মাঝে মাঝে আমাকে বুড়ি বলে ডাকেন।
‘না তো
‘তাহলে এত চেঁচামেচি কীসের? আমি তো ভয়ে মরি যে ডাকাত পড়ল বুঝি! সেই থেকে গোপালকে ডাকছি, হে গোপাল রক্ষা করো বাড়িতে কেউ নেই বিশেষ, ওরা ফিরলে বরং ডাকাত পড়ুক। এরা খুব ছোটো .........’
ঠাকুরমার কথা একবার আরম্ভ হলে সহজে শেষ হতে চায় না। বললাম, ‘না না ওসব কিছু নয়। তুমি চিন্তা কর না।' আমি আবার মিটিঙে যোগ দিই। দেখি বড়দাও ফিরে এসেছে ব্রাশ সংক্রান্ত মিটিঙের জন্য
এদিকে পাপাইদা বলল, ‘ব্রাশটা তো পাওয়া গেছে মেজদা। তাহলেই হল
‘কিন্তু জুতো পালিশ করা ব্রাশ আমার আর কোন কাজে লাগবে?
আমার বাবা, মা আর বড়মাও চিন্তা করছেন ব্রাশ নিয়ে। বাবা বলছিলেন থানায় ডায়েরী করে আসবেন কিন্তু মা আর বড়মা আপত্তি জানিয়েছেন।
বড়দা বলল, ‘তোর বাঁ হাতে ব্রাশ করা উচিত ছিল
‘আমি করতে পারিনা
‘পারিনা বললে হয়না সব শিখে রাখতে হয়
‘ব্রাশটাই তো খুঁজে পাচ্ছিলাম না
ছোড়দা বলল, ‘ব্রাশটা ওখানে গেল কী করে? কে এটা করতে পারে? মোটিভ কী হতে পারে? ভালো করে ভেবে বলো যে ওর মধ্যে হীরে টিরে লুকানো ছিল কিনা?
‘তা ছিল না, কিন্তু লন্ডন থেকে কেনা ব্রাশ। তুই কি মনে করিস আমি স্মাগলিং করি!’ ব্রাশের শোকে কাতর মেজদা আবার চটে যায়।
বড়দা বলল, ‘এর চেয়েও ভালো ব্রাশ আমি তোকে এনে দেব। কাঁদিস না
ইন্দুদি বলল,ব্রাশের মুণ্ডু বদলে ব্যবহার করা যায় না? বিদেশী ব্রাশে শুনেছি অনেকগুলো মুণ্ডু থাকে ব্রাশের
আমি বললাম, ‘শুধু বিদেশী কেন আজকাল দেশি ব্রাশেও মুণ্ডু বদলে ব্যবহার করা যায়। আমি লোকাল ট্রেনেই বিক্রি হতে দেখেছি
‘তোরা এখন ব্রাশের মুণ্ডু নিয়ে পড়লি! ইচ্ছা করে তোদের মুণ্ডুগুলো চিবুই। নেহাত আমার শরীর ঠিক নেই তাই বেঁচে গেলি, মেজদা।
বাপ্পাদা বলল, ‘ছেড়ে দাও মেজদা, ওরা ছেলেমানুষ ভুলভাল বকে ফেলে
‘মোটেই আমরা ভুলভাল বকিনি। আমি দেখেছি একটা টুথব্রাশের সাথে আর একটা মাথা দেওয়া থাকে। দরকার হলে পুরানো মাথাটা খুলে নতুন মাথা বসিয়ে ব্যবহার করা যায়, আমি বললাম।
‘যেমন তোর মাথাটা খারাপ হলে ওটা খুলে নিয়ে সেই জায়গায় অন্য একজনের মাথা বসিয়ে দেওয়া যায়, ঠিক তেমন,বিট্টু বিদ্রুপ করে আমাদের। যেন মেজদা টাইম মেশিন তৈরি করলে ওকেই আগে চড়াবে
মেজদা উদাস ভাবে বলল, ‘আমার ব্রাশটা খুব স্পেশাল ছিল। একদিন দাঁত মাজলে আর ছ’মাস না মাজলেও চলে যেত
বাপ্পাদা বলল, ছ’ মাস না মাজলেও যদি চলে যায় তাহলে আর চিন্তা করছ কেন? আবার ছ’মাস পর কিনবে ব্রাশ
‘বাহ এত দামী ব্রাশটা আমার নষ্ট হয়ে গেল। একটু দুঃখ করব না?
ছোড়দা হাত ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, ‘ইয়েস! এই বার ব্রাশ চুরির মোটিভটা পরিষ্কার হল। যে নিয়েছে সে মোটেই দাঁত মাজতে ভালোবাসে না
‘হ্যাঁ চোরটা ঠিক তোর মত। তুই যেমন দাঁত মাজতে বিরক্ত হস,’ বড়দা
ছোড়দা বলল, ‘বাজে কথা। আমি দাঁত মাজতে খুবই পছন্দ করি। তাই আমার দাঁত এত পরিস্কার যাই হোক কী বলছিলাম, হ্যাঁ... আমি নিশ্চিত যে এটা পরিকল্পিত ভাবে চুরি করা হয়েছে। এত দামী জিনিস যখন!
‘তাহলে আমরা চুরি করেছি বলতে চাও?’ ইন্দুদি আর বিন্দুদির একসাথে আক্রম
‘রাগ করছিস কেন? আমি তো শুধু সম্ভাবনার কথা বলেছি। মোটিভ একটা থাকছেই
‘তোমারই মোটিভ বেশি, কারণ তুমিও ব্রাশ করতে পছন্দ করো না
‘তাই বলে আমি! আমি তো জানতামই না ব্রাশের এই গুণ। তাছাড়া আমি গোয়েন্দা। গোয়েন্দাকে সন্দেহ করতে নেই
‘হ্যাঁ তুমি গোয়েন্দা! গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল! আর আমরা অপরাধী! আমরাও কেউ জানতাম না। মেজদা তুমি আবার তৈরি করে নিতে পারো না?
‘এত সোজা নয় সব কিছু। মেজদা টাইম মেশিন করছে এখন ব্রাশের জন্য সময় কোথায়?
‘যে টাইম মেশিন বানাতে পারে সে ব্রাশ ও বানাতে পারে, আমি বললাম।
‘হ্যাঁ যেমন তুমি নাচতেও পারো সঙ্গে অঙ্কও কষতে পারো!
‘দেখ অঙ্ক নিয়ে আমায় কিছু বলবে না কিন্তু! বাংলায় যারা ভালো হয় অঙ্কে তারা একটু কাঁচাই হয়
‘গণ্ডা খানেক বানান ভুল করিস। এই তো তোর বাংলায় ভালো হবার নমুনা। বাকি বিষয়ের কথা তো আর উল্লেখই করা যাবে না
বাপ্পাদা বলল,  ‘এই এবার চুপ কর সব। আমরা কি রাতেও অনশন করব?
‘কভি নেহি! চল সবাই খেতে যাই, বড়দার মিলিটারি হুঙ্কার।

এরপর কিছুদিন মেজদা চুপচাপ রইল। শুকনো মুখ করে থাকে। ব্রাশের শোক এখনও ভুলতে পারছে না বেচারি। পণ করে রেখেছে যে লন্ডন-এর ব্রাশ ছাড়া দাঁতই ব্রাশ করবে না।
দিন দশেক পরে ব্রাশ রহস্যের সমাধান হল। আর হাত ব্যথারও। স্কুল থেকে ফেরার পথে মেজদার এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল, রঞ্জনদা। এই রঞ্জনদা আর মেজদা একই সঙ্গে বিদেশ গেছিল কেম্ব্রিজে। ফিরেছেও একই সঙ্গে। এখন ব্যাঙ্গালোরে ভালো চাকরী করে। আমার সাথে দেখা হতেই বাড়ির সবাই কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলবিশেষ করে মেজদা অর্থাৎ ফালতু।
‘ফালতু এখন নিজে নিজে ব্রাশ করছে?
‘মানে?
‘আর বলিস না, ওখানে ও কিছুতেই দাঁত মাজতে চাইত না। আমাকে মাঝে মাঝে মাজিয়ে দিতে হত।  স্নানও করতে চাইত না, বলে হেসে উঠল রঞ্জনদা
আসল ব্যাপার আমি আগেই টের পেয়েছিলাম। দাঁত মাজা আর স্নান ওর বরাবর অপছন্দের।
বললাম, ‘যাই হোক দাদা যে ভাবেই হোক লন্ডন থেকে একটা ব্রাশ এনে দিও মেজদাকে। যেটা এনেছিল সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। বলছে ওই ব্রাশ ছাড়া আর দাঁত মাজবেই না
‘ভাবিস না, চেষ্টা করব। আমার বাবা এখন ওই খানেই আছে। আজকেই বলব ব্রাশের কথা। তবে সময় লাগবে একটু। অ্যাকচুয়াল প্রবলেম হল ও ব্রাশ করতে পছন্দ করে না। এটাই আসল কথা। যার জন্য পুরো গল্পটাই বানিয়েছে। ওরকম ব্রাশ আবার হয় নাকি
তা আর আমরা জানিনা!   
মেজদার ব্রাশের অবশেষে একটা বন্দোবস্ত করা গেল। তবে মেজদা এখন ব্রাশ নিয়ে বেশি দুঃখ করছে না। এখন নতুন গবেষণায় হাত দিয়েছে। এমন একটা ব্রাশ তৈরি করছে যেটা দিয়ে এক বার মাজলে সারা জীবন আর দাঁত মাজতে হবে না। এটা সফল হলে নোবেল এবার বাঁধাটাইম মেশিনের কাজে ক’দিন পর হাত দিলেও চলবে। ওটার জন্যও আরও একটা নোবেল তো পাবেই।
----------------
ছবি - তন্ময় বিশ্বাস

No comments:

Post a comment