গল্পের ম্যাজিক:: চোর ধরলেন চণ্ডীবাবু - অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়

চোর ধরলেন চণ্ডীবাবু
অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়

সময়টা বিকেল। সন্ধে নামতে তখনও বেশ কিছু দেরি আছে। চণ্ডীচরণ সিংহ তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে মাঝের দরজা ও তারপরের বাড়ির সামনের লাগোয়া বাগানটুকু পেরিয়ে সদরের বড় দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সদর দরজায় একটা পাল্লা আছে। আর একটা কবে কোন কালে অদৃশ্য হয়ে গেছে এখন কেউ তা মনে করতে পারে না। আসলে বাড়িটা বহু পুরানো। মাঝের দরজার ভেতর দু-চারখানা  ঘর বাস যোগ্য রয়েছে। বাকি বাড়িটার বেশির ভাগ অংশই বসবাসের উপযুক্ত নয়। চন্ডীবাবু এই বাসযোগ্য অংশটুকুতে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ ও দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে বসবাস করেন। মাঝ ও বার এই দুই দরজার মাঝের অংশটুকু বাগান। বাগান মানে দু চারটে পেঁপে গাছ, কিছু কলা গাছ আর একটা ফলে ভরা বাতাবি লেবুর গাছ ছাড়া নানা ঝোপঝাড় ও ছোটোখাটো আগাছার জঙ্গল হয়ে আছে।
    বাড়িটা চণ্ডীবাবুর আদি বাড়ি। ওঁরা এখানকার বহুকালের বাসিন্দা। গ্রামের এই পশ্চিম দিকটা অপেক্ষাকৃত নির্জন। গ্রামের এই দিকেই চণ্ডী বাবুর বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে গ্রামের একমাত্র স্কুল সিদ্ধেশ্বরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। চণ্ডীবাবুর লেখা পড়ার শুরু এবং শেষ এই স্কুলেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে এই স্কুলেই তাঁর শিক্ষক জীবনের শুরু এবং প্রায় বছর দশ-বারো আগে অবসর নিয়ে এই পৈত্রিক নিবাসে জীবন কাটাচ্ছেন। সময়টা মন্দ কাটে না। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সেদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে কিছুটা পড়তে না পড়তেই ঘুমে চোখ দুটো জুড়ে আসেআবার বিকেল চারটে  বাজল কি বাজল না ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখে মুখে একটু জল ছিটিয়ে এক কাপ চা শেষ করেই বাড়ির বাইরের দরজার কাছে এসে দাঁড়ান। চেনা পরিচিত দু’চারজন যারা কখনও একটু আধটু চলা ফেরা করতে পারেন, তাদের সাথে দেখা হলে ভালো লাগে। স্কুল ছুটির ঘণ্টা এই সময়ই বাজে। দূর থেকে ছেলেদের চীৎকার-চেঁচামেচি কিংবা ছোট ছোট দলে কিছু কিছু ছেলের তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যাওয়া দেখতেও তাঁর ভালোই লাগে।
এদিনও চণ্ডীবাবু বাড়ির গেটে অর্থাৎ আধভাঙ্গা সদর দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। দূরের স্কুল থেকে ছুটির গোলমালটাও ভেসে আসছে। তবে আওয়াজটা যেন একটু বেশিইস্কুলে ইন্টার ক্লাস  খেলা থাকলে এমন হৈ- হল্লাই হয়। খেলা স্কুলের পাশে স্কুল মাঠটায় হয়। গোলমালটা সেখান থেকে বেশি আসছে। চণ্ডীবাবুর মনে পড়ল যে তাঁর ছাত্র জীবনে কিংবা শিক্ষকতার জীবনেও এমনই ঘটত।
তাঁর এইসব ভাবনা চিন্তার মধ্যে হঠাৎ কোথা থেকে একটা ছেলে এসে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে একটু সরিয়ে বাড়ির দিকে বাগানের বাতাবি লেবুর গাছের তলায় একটা ঝোপের দিকে দৌড়ল। চন্ডীবাবু ‘কে রে! কী চাই?’ বলে এগিয়ে যেতে ছেলেটা একটু মিনতির সুরে বলল, ‘আমাকে ওরা তাড়া করেছে, স্যার। ওরা এসে জিজ্ঞেস করলে আমার কথা কিছু বলবেন না। ধরতে পারলে খুব মারবে বলেছে ওরা। খেলা ভাঙ্গতেই তাই পালিয়ে এসেছি’ বলে বাতাবি লেবু গাছটার পেছনে একটা ঝোপের মধ্যে মুখ গুঁজে রইল, নিজেকে যতদূর সম্ভব আড়াল করে। চণ্ডীবাবু প্রশ্ন করেও আর কোনও উত্তর পেলেন না।
ব্যাপারটা কী হতে পারে ভাবার জন্য পাঁচটা মিনিটও টাইম পেলেন না। গোটা পাঁচ সাত ছেলে, ওই আগের ছেলেটারই সমবয়সী,  ওই বছর তেরো-চোদ্দ মত হবে, এসে চন্ডীবাবুকে ঘিরে দাঁড়াল। ওদেরই একজন বেশ গম্ভীর ভাবে চণ্ডীবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখান দিয়ে কোনও ছেলেকে পালাতে দেখেছেন?’
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘তোমাদের কথার উত্তর পরে দেব। আগে বল তো একথা কেন জিজ্ঞাসা করছ?’
ওই ছেলেটিই একজন বুড়ো মানুষকে যতটা মেজাজ নিয়ে বলা যায় ততটাই মেজাজ নিয়ে বলল, ‘তাতে কী দরকার আপনার? ব্যোমকে কোন দিকে গেছে বলে দিন না!’
ছেলেটার কথার জবাব না দিয়ে বললেন, ‘তোমাদের কেউ কি আমাকে চেন?’
দলটা একটু থমকে গেল। ওদের মধ্যে অন্য একটা ছেলে একটু ভয়ে ভয়েই বলল, ‘আমি চিনি স্যার। আপনি আমাদের স্কুলেই পড়াতেন। আমার দাদা আপনার কাছে পড়েছে। দাদাই বলেছে যে আপনি হচ্ছেন রণচণ্ডী স্যার
চণ্ডীবাবুর মনে পড়ল তাঁর শিক্ষকতার জীবনে অমন একটা খ্যাতি জুটেছিল বটে। অবশ্যই আড়ালে-আবডালে। কেউ বলত রণচণ্ডী স্যার। আবার অনেকের পছন্দ ছিল তাঁর চণ্ডী সিংহি নামটা
পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে মনে মনে হাসলেন চণ্ডীবাবু। তাঁর বেশ মজাই লাগছিল এদের সঙ্গে কথা বলে। বাতাবি লেবু গাছের তলায় বসে ওই ছেলেটা আরও খানিকটা জিরিয়ে নিক। এদিকে এদের ব্যাপারটাও আগে জেনে নিতে হবে। একটা ছেলেকে এতগুলো ছেলে মারবে, এটাও ঠিক নয়। কথাটা পাড়বার জন্যই তিনি সামনের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কত বছর আগে তোমার দাদা পড়ত? নাম কী ছিল তার? বল দেখি যদি মনে করতে পারি?’
ছেলেটা জবাব দিল, ‘অনেক বছর আগে পড়ত স্যার আমার বড়দাদা। দাদার নাম শম্ভুচরণ পাত্র
শম্ভুচরণ পাত্র। নামটা মনে মনে দুবার উচ্চারণ করলেন চণ্ডীবাবু। তারপর হঠাৎই ওঁর চোখের সামনে একটা রোগা পাতলা ছেলের মুখ ভেসে উঠল। এই ছেলেটির মুখের সাথে তার মিলও আছে। চণ্ডীবাবু হঠাৎ হেসে উঠলেন। ‘তোমার দাদারও একটা নাম ছিল। শম্ভু লিলিপুট। শম্ভু এখন কী করে? গাঁট্টার কথা কিছু বলেনি সে? ওই তো বেশি খেতো
ছেলেটা এবারও কিন্তু কিন্তু করে জবাব দিল, ‘তাও বলেছিল স্যার। দাদা এখন কলকাতায় কাজ করে। আর গাঁট্টার কথাও বলেছিল। চণ্ডী সিংহির গাঁট্টা একভুলে আটটা
চণ্ডীবাবু একটু হাসলেন। বললেন, ‘খুব ফাজিল ছিল। হাতটা তুললেই বলত, স্যার আস্তে মারবেন। মাটির পাত্র ফুটো হয়ে যাবে
দলটা হেসে উঠল। অনেকদিন পর একদল ছেলের সাথে কথা বলতে তাঁরও ভালো লাগছিল। এবার বললেন, ‘এইবারে আসল কথায় আসা যাক। তোমরা ওই ছেলেকে মারতে যেও না। কী হয়েছিল, আগে শুনে নিই। তারপরে অন্যায় দেখলে আমিই ওকে বকে দেব। চাও তো গাঁট্টাও একটা দিতে পারি। এখন তোমাদের সেই বন্ধু ওই কোণায় যে বাতাবি লেবু গাছটা আছে, তার আশে পাশে বসে আছে। কেউ একজন গিয়ে ওকে ডেকে নিয়ে এস
দু’জন ছেলে ছুটল বাগানের সেই কোণার দিকে এবং একটু এদিক-ওদিক দেখে চেঁচিয়ে বলল, ‘এখানে কেউ নেই স্যার। ব্যোমকেটা পালিয়েছে
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘সে কী! পালাবে কী করে? আর সামনে তো আমরা রয়েছি। দাঁড়াও, দেখি
এই সময় বাড়ির ভেতর থেকে চণ্ডীবাবুর স্ত্রী, তাঁর ছেলে আর বউমা ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। কোথাও যাবার জন্য সম্ভবত তাদের সুসজ্জিত হয়ে বেরিয়ে আসা।
ছেলে সুবিমল বলল, ‘বাবা আমরা বের হলাম। সাড়ে পাঁচটার বাস ধরব। যেতে ঘন্টা দেড়েক লাগবে। ওখান থেকে ফিরতি শেষ বাসটা সেই সাড়ে নটায়। ওটাই ধরব। রাত এগারোটা নাগাদ ফিরে আসব। একা থাকবে, সাবধানে থেকো
বউমা রনিতা বলল, ‘খাবার টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে, আটটা নাগাদ খেয়ে নেবেন’ দশ বছরের নাতি টাটুম বলল, ‘তুমিও তো আমাদের সাথে যেতে পারতে দাদু। একা একা বাড়িতে থাকতে হত না
‘না দাদু, তোমরা ঘুরে এস। বাড়িতেও কাউকে না কাকে থাকতে হবে। আমি বুড়ো মানুষ, ওই সব বিয়েবাড়ির ভিড় আমার আর ভালো লাগে না’ বলে হাত নেড়ে ওদের বিদায় জানিয়ে এদিকে ফিরে বললেন, ‘দাঁড়াও ছেলেটাকে খুঁজি’ আবার বসে পেছন ফিরতেই দেখেন যে ছেলেটা ঠিক তাঁর পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে।
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘তোমরা একেই খুঁজছ তো?’ সবাই হই হই করে উঠতে চণ্ডীবাবু আবার বললেন, ‘উঁহু, হইচই নয়। আগে গোটা ব্যাপারটা শুনি
এর ওর কাছ থেকে শুনে যা বোঝা গেল, সেটা হল যে ইন্টার ক্লাস ফুটবল প্রতিযোগিতা চলছে। এদিন ক্লাস সেভেন আর এইটের মধ্যে খেলা ছিল। এরা সব ক্লাস এইটের ছাত্র। এখন ক্লাস এইটের এই ছেলেরা ক্লাস সেভেনের এই ছেলেদের কাছে ছ’গোলে হেরেছে। আর এর জন্য দায়ী তাদের গোলকিপার ব্যোমকেশ। খেলা শেষ হতেই ব্যোমকেশ মাঠ ছেড়ে পালিয়েছে। আর নিচু ক্লাসের ছেলেদের কাছে হেরে এরা সেই হারের দায়িত্ব যার, সেই গোলকিপার ব্যোমকেশকে খুঁজতে বেরিয়েছে।
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘এতে অবশ্য রাগ হবার কথা। ছ’ ছটা গোল! তাও আবার নিচু ক্লাসের ছাত্রদের কাছে! তবে বড় বড় ক্লাবও ছটা সাতটা গোল খায়। একশো দশ বারোটা গোল খাবার নজিরও আছে। বিশ্বাস না হয় কলকাতা ফুটবলের ইতিহাস পড়। কিন্তু ও না হয় গোল খেয়েছে। কিন্তু তোমরা আর যারা খেলেছ, তারাও তো দু একটা গোল দিতে পারতে
ওদের একজন বলল, ‘ছয় নয় স্যার আমরা পাঁচটা আমরা খেয়েছি। আর একটা...’
এই সময় বাধা পড়ল। টাটুম তাদের পাশ কাটিয়ে দৌড়ে গিয়ে বাড়িতে ঢুকল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আবার বিয়ে বাড়ির দলের সঙ্গে দৌড়তে শুরু করল। চণ্ডীবাবু ‘কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?’ বলে জিজ্ঞাসা করলেও কোনও জবাব পেলেন না।
চন্ডীবাবু আবার এদের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ তোমরা পাঁচ গোল খেয়েছ আর একটা দিয়েছ। তাহলে তো পাঁচ গোলে হেরে গেছ। পাঁচ –এক। তাহলে ছ’ গোল ছ’ গোল করছ কেন?’
ছেলেটা বলল, ‘ওই একটা গোল স্যার আমাদের নিজেদের গোলেই করেছি। আসলে বলটা গোলকিপারকে ব্যাক করে দিয়েছিলাম, যাতে ও জোরে মেরে মাঝ মাঠে বলটা পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বলটা ও ছেড়েই দিল। আর সেটা গড়াতে গড়াতে গোলে ঢুকে গেল
চণ্ডীবাবুর বেশ মজা লাগছিল। বললেন, ‘সেটা করলে কেন গোলকিপার? কী যেন নাম? হ্যাঁ, ব্যোমকেশ
ব্যোমকেশ বলল, ‘আমি স্যার ঠিক করতে পারিনি, হাত দিয়ে ধরব না পা দিয়ে মারব। তাই ভাবতে গিয়েই গোলটা হয়ে গেল। ওরা কেন স্যার একটা গোলও দিতে পারল না? এদিকে আমি একা। ওরা আট –আট জন খেলছিল। ওরা যে একটা গোলও দিতে পারল না, তাতে দোষ হয় না?’
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘খুবই যুক্তিগ্রাহ্য কথা। তোমরা গোল করতে পারলে না কেন ?’
আগের ছেলেটাই বলল, ‘কী করে করব? আমাদের যে বেস্ট ফরওয়ার্ড বোকো সেই ছেলেটাই এদিন ক্লাসে এল না। আর সেভেন-এর ব্যাক খেলে যে আশু, সে তো গতবার আমাদের সঙ্গেই পড়ত। এবার ফেল করে সেভেনেই আছে। খুব মারকুটে প্লেয়ার স্যার। বলেই ছিল যে কেউ এগুলেই তার পা ভাঙবে
‘তাহলে ব্যাপারটা এখানেই মিটিয়ে নাও। সামনে ভালো থাকলে পেছনও ভালো হয়। সামনের ছেলেরা খেলতে না পারলে, পেছনে যারা থাকে তারাই কি বেশিক্ষণ ভালো খেলতে পারে? এবার থেকে সকলেই ভালো খেলবে। আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করলে খেলাই ভালো হবে না। এখন বলো তোমরা ক’জন আছো? বলে নিজেই গুনতে আরম্ভ করলেন , ‘এক-দুই ---।’ তারপর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লম্বা মত ছেলের দিকে চোখ পড়তে বললেন, ‘এই ছেলেটি কে? এও কি তোমাদের সঙ্গে পড়ে?’
লম্বা ছেলেটি নিজেই এগিয়ে এসে বলল, ‘না বাবু, আমি ওদের সঙ্গে পড়ি না। এখান দিয়ে যাবার সময় গণ্ডগোল দেখে দাঁড়িয়ে গেছি
চণ্ডীবাবু তাকে চলে যেতে বলে ফের দলটার ছেলেদের দেখে নিয়ে বললেন, ‘তোমরা দেখছি সাত জন আছ। সন্ধে হয়ে আসছে এখন গাছে উঠতে দেব না। বাতাবি লেবু গাছটার নিচের দিকে যে লেবু কটা ঝুলছে পেড়ে নিয়ে এস দিকি। ক’টা দিতে পারি দেখি
সবাই লেবু গাছটার দিকে ছুটল এবং মিনিট দশেকের মধ্যেই গোটা ছয়েক লেবু নিয়ে ফিরল। তাঁর কিছু বলার আগেই একটা ছেলে বলে উঠল, আর একটা গোল বেশি খেলে লেবু আরও বেশি পাওয়া যেতসাত জনের একটা একটা করে হত। কি রে দেবু তাই তো?’
‘তা যখন হয়নি এবং লেবুও একটা কম, তখন একজনকে দুএকদিন পরে এসে নিয়ে যেতে হবে’ দেবু এবার তার মত জানাল, ‘ব্যোমকে তো ছ’টা গোল খেয়েছে। আজকে ওকে আর লেবু দিতে হবে না, ওই বরং পরে একদিন এসে নিয়ে যাবে ব্যোমকেশ এতক্ষণ পর স্বাভাবিক ভাবে বলল, ‘তা কেন মকাই ও ঘণ্টে তো দু ভাই রয়েছে। ওরা একটা দুজনে নিয়ে যেতে পারবে। ওদের একজন ক’দিন পর এসে স্যারের কাছ থেকে একটা লেবু নিয়ে যাবে
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘খুব ভালো পরামর্শ। সবার বাড়িতেই একটা করে লেবু যাবে। ব্যোমকেশ গোল খেলে কী হবে? বুদ্ধি ভালই দিতে পারে। যাও, সবাই এবার বাড়ি যাও। আমিও গিয়ে ঘরে ঢুকি
ছেলের দল হই হই করতে করতে বাড়ির সামনের রাস্তাটুকু পেরিয়ে যাবার পর চণ্ডীবাবু সদর দরজার একটা পাল্লা বন্ধ করলেন, তারপর একটা কাঠের বেড়া মত টেনে দরজার ফাঁক অংশটা বন্ধ করলেন। এই দরজাটার অন্য পাল্লাটা নতুন করে তৈরি করতে হবে, না পুরো দরজাটা বদলে নতুন লোহার গেট লাগাবেন, সেটা এখনও স্থির করে উঠতে পারেননি। তাই এটা এই অবস্থায় আছে। বাড়ির চারদিকের  পাঁচিল অবশ্য মোটামুটি ঠিকই আছে। কিন্তু যে বাড়ির সদর দরজাই নেই, সেই বাড়ির পাঁচিল থাকল কি থাকল না তাতে কিই বা আসে যায়?
সন্ধে হয়ে যেতে চণ্ডীবাবু ঘরে এসে উঠানের সামনের ঘরের দরজাটা ভাল ভাবে বন্ধ করে খিল দিয়ে দিলেন। সামনের ঘরটাকে ঘর না বলে দালান বলাই ভালো। এর ভেতর দিকে খান তিনেক ঘর। সামনের দিকে একটা সিঁড়ি ঘর। অন্য দিকে বাইরের দরজা। দালানের পাশের দিকে একটা বড় জানলা। বেশ পুরানো। জানলার লোহার শিকগুলোয় জং ধরেছে। এক-আধটা শিক একটু আধটু ভাঙ্গাও আছে। জানলার পাল্লার চারটের মধ্যে একটা নেই। এর জন্য বিশেষ অসুবিধাও হয় না, কারণ এই ঘরটা যাওয়া আসার দরকার ছাড়া অন্য কোনও কাজে আসে না। একটা বড় তক্তা পোষ পাতা থাকে। দিনের বেলায় তাতে বসে একটু কাজকর্ম, কিছু গল্পগুজব, আর ছোট নাতনি চইএর পুতুল খেলার কাজ দিব্যি হয়। পুতুলগুলো দিব্যি সাজানো থাকে। রাত্রে এই দালানের দরজায় যেমন খিল পড়ে যায় তেমন প্রত্যেক ভিন্ন ভিন্ন ঘরও ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়। তাই দালানের দরজার একটা পাল্লা না থাকলেও খুব বিপদজনক কেউ মনে করে না। সন্ধেটা ঘন হয়ে গেলে চণ্ডীবাবু দরজাটা খুলে বেরিয়ে এসে চার দিকটা একবার দেখে নিয়ে ঘরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে আলো জ্বেলে কাগজ নিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পরেই তাঁর ঘরের ল্যান্ড লাইন ফোন বেজে উঠল।
উঠে গিয়ে তিনি ফোনটা ধরলেন। ওদিকে তাঁর ছেলে সুবিমলের গলা। জানাল যে তারা এই মাত্র বিয়ে বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। ওর ছোটমামার সাথে এই মাত্র দেখা, বাড়িতে আসছিলেন। এক সঙ্গে আসার জন্যই আসছিলেন। বাড়ি থেকে দু’পা দূরে দেখা হয়ে যাওয়ায় ওদের সঙ্গেই চলে এসেছেন। রাত সাড়ে ন’টার শেষ বাসটা ধরে চলে আসবে ওরা। তিনি যেন রাতের খাবার খেয়ে নেন ঠিক সময়। ইত্যাদি।
ফোনটা রেখে চণ্ডীবাবু এই টেলিফোনেরই মুণ্ডুপাত করলেন খানিকটা। আজকাল ল্যান্ডলাইনে এত ডিস্টার্ব হয় যে বিরক্ত ধরে গেছে। যাই হোক ওদের পৌঁছনোর খবরটা পাওয়া গেল। ছোট শালাটিও নিশ্চয় রাতে ওদের সঙ্গে এই বাড়িতেই আসবে। দুদিন থাকলে ভালই লাগবে। এই বয়সে গল্প গুজব করার লোক পাওয়া যায় না। ভাবতে ভাবতে তিনি রাতের খাবার নিয়ে বসে পড়লেন, ভাবতে লাগলেন কখন যে সকলে ফিরবে! একা জেগে বসে থাকতে হবে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য। কিছু যে পড়বেন তারও উপায় নেই। বই পড়তে পারেন না বেশিক্ষণ, চোখে কষ্ট হয়। আর টিভি! সেটা তাঁর অসহ্য মনে হয়।
রাতের খাওয়া শেষ করে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে নানা ভাবনার সঙ্গে বিকেলের ছেলেদের কথাও ভাবছিলেন, এমন সময় হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল আবার সুবিমল
‘বাবা, শেষ বাসটা মিস হয়ে গেছে। ব্যাচটা বসতে দেরি করল। এখন সারা রাত একা থাকতে পারবে? নাকি ফোন করে শিব মন্দিরের পাশের দীপককে ডেকে নেবে?’
‘দরকার নেই।  সারা রাত কেটে যাবে ঠিকই। তোদের ঘরগুলো তালা দিয়ে দিচ্ছি। দালানের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আর আমার ঘরও ভেতর থেকে বন্ধ থাকবে। ভয়ের কিছু নেই। দশটা তো বাজতেই চলল
‘আমরা ভোরের বাসেই ফিরে যাব। সাবধানে...
বাকি কথা আর শোনা গেল না। লাইনটা তার আগেই কেটে গেল।
যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। বড় আলোটা নিভিয়ে, রাতের হাল্কা সবুজ বাতিটা জ্বেলে দিয়ে শুয়ে পড়লেন। বিকেলের ওই ছেলেদের গণ্ডগোলের বিচারটা বেশ ভালই করেছিলেন তার তারিফ করতে করতে একসময় ঘুমিয়েও পড়লেন।
ঘুমটা বেশ ভালই হচ্ছিল। হঠাৎ একটা ‘ভূত ভূত’ বলে চিৎকার! তারপরই দড়াম করে কিছু পড়ার শব্দ এবং সেই সঙ্গে চইয়ের বড় চিনে পুতুলটার ওয়া ওয়া কান্না। চণ্ডীবাবুর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। তিনি আস্তে আস্তে উঠে বড় আলোটা জ্বাললেন, অন্য কোনও শব্দ আর আসে কি না সেটা শোনার জন্য কান পেতে একটুখানি অপেক্ষা করলেনশুনতে না পেয়ে ঘরের খিলটা খুলে দালানে এলেন। পুতুলটার কান্নাও থেমে গিয়েছিল। ঘরে আবছা অন্ধকারে একটা কাউকে তক্তপোষটার সামনে পড়ে থাকতে দেখলেন। আলোটা জ্বালিয়ে লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে কোনও লাভ হল না। সম্ভবত জ্ঞান হারিয়েছে। প্রথমে পুতুলটার সুইচটা বন্ধ করলেন। নচেৎ আবার নড়াচড়া হলেই কেঁদে উঠবে। তারপর লোকটার মুখে একটু জল ঢালতেই সে চোখ বুজে বলল, ‘এ বাড়িতে ভূত আছে জানলে আসতাম না
লোকটা উঠে বসল। চণ্ডীবাবু দেখলেন যে লোক নয়, গত কাল বিকেলে যে বড় ছেলেটিকে বাড়ির সামনে দেখেছিলেন, তিনি তাকে চলে যেতে বলেছিলেন। তাঁর সাহস বাড়ল। তিনি ছেলেটার কান ধরে টেনে তুললেন। বললেন, ‘তুইই কাল বিকেলে বাড়ির সামনে এসেছিলিস তো? মতলব কী ছিল? চুরি?
ছেলেটা জবাব দিল, ‘একটু রাতের দিকে এদিকে এসেছিলাম, একটা লেবু নেব বলে। ছেলেগুলোকে বাতাবি লেবু নিয়ে যেতে দেখে আমারও বড় লোভ হল। বাড়িতে সবাই চলে গেছে দেখেছিলাম, কিন্তু হাত দিয়ে একটাও পাড়তে পারলাম না। রাতে গাছে উঠতে ভয় করল। তারপর বাইরের জায়গায় বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে ছেলেটা একটু থামতে তিনি বললেন, ‘তারপর ঘুমাতে ঘুমাতেই এখানে চলে এলি?’
‘না বাবু না। খিদে পেয়েছিল আপনার বাড়ির দরজাটা খোলা দেখলাম। ভেতরে এসে দেখি যে এই ঘরের দরজাটাও খোলা। তাই যদি কিছু খাবার পাওয়া যায়, তার খোঁজে ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। তারপরে অন্ধকারে এই চৌকিটার সঙ্গে ধাক্কা লাগাতে হঠাৎ একটা বাচ্চা কোথা থেকে কাঁদতে শুরু করে দিল। আমি ভয়ের চোটে  পড়েই গেলাম। আর কিছু মনে নেই আমার। এই বাড়িতে ভূত আছে বাবু
‘খুব বানিয়ে গল্প বলতে পারিস দেখছি। আমি রাতে নিজের হাতে দরজায় খিল দিলাম, আর তুই বলছিস যে দরজা খোলা ছিল। এখন বসে থাক। কাল সকালেই সবাই আসবে তখন তোর ব্যবস্থা হবে
ছেলেটা দুকান ধরে বলল, ‘আমি চুরি করতে আসিনি বাবু। কিছু চুরিও করিনি। বসে থাকব সে ভালো কিন্তু কিছু খেতে পারলি বাঁচি। সকাল হলেই বাস ধরে চলে যাব
চণ্ডীবাবু ছেলেটাকে বিস্কুট খেতে দিলেন। মুড়ি বাতাসাও দিলেন। ভাবলেন বয়স হলে কত কীই না ভুল হয়। দালানের দরজাটা বন্ধ করেছিলেন কি না তাঁর মনে নেই। এই ছেলেটিকেও চোর ভাবার কারণ নেই। দেখেই মনে হচ্ছে নিরীহ স্বভাবের ছেলে। গাছের ফুল ফল চুরি করাকে তো আর চুরির পর্যায়ে ফেলা যায় না।
ছেলেটার খাওয়া হয়ে গেলে তিনি তাকে চলে যেতে বললেন। চণ্ডীবাবু দেখলেন একটা খদ্দরের ঝোলা ব্যাগ মেঝেতে পড়ে রয়েছে। নিশ্চয় ছেলেটার ব্যাগ। ঝোলা থেকে একটা পাঞ্জাবির অংশ দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা এগিয়ে গেছিল তিনি তাকে ডেকে ঝোলাটা ধরিয়ে দিলেন।
‘তুমি তোমার ব্যাগ ফেলে যাচ্ছ
ছেলেটি ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে চলে গেল। আর পেছন ফিরে তাকাল না। তখন ভোরের আলো ফুটে গেছে।
চণ্ডীবাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখলেন। তারপর দালানের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এই ঘটনার কথা আর কাকে না বলাই ভালো।
ঘরে ফিরে ঘণ্টা দেড়েক তিনি ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। বাড়ির সবাই ভোরের বাসে ঘরে ফিরে এল। দালানের তক্তাপোষে বসে তাঁর শ্যালক রামজীবনবাবু বললেন, ‘ভেবেছিলাম বাড়ি ঘুরে আপনার সাথে দেখা করে দিদিদের সঙ্গেই বেরুব। কিন্তু বাড়ির সামনে এসে দেখি দিদিরা বেরিয়ে পড়েছে, তাই আমিও আর বাড়ি না ঢুকে ওদের সঙ্গেই চলে গেলাম
রামজীবনবাবু চণ্ডীবাবুর স্ত্রীর ছোটো ভাই। কাছেই থাকেন একটা ব্যাংকে কাজ করেন। পঞ্চাশ বছর বয়স প্রায়। পারিবারিক একটি বিয়ে বাড়িতে একসঙ্গে নিমন্ত্রিত ছিলেন। চণ্ডীবাবু স্ত্রীকে বললেন, ‘বউমাকে বল দুকাপ চা দিয়ে যেতে। তারপর যেন একটু রেস্ট নেয়
রামজীবনবাবু বললেন, ‘আমি হাত মুখ ধুয়ে নিয়েছি। এবার শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে পাজামা –পাঞ্জাবিটা পরে ফেলি। দাদুভাই কোথায় রেখেছে দেখি আমার খদ্দরের ঝোলা ব্যাগটা
চণ্ডীবাবু বললেন, ‘রেখে গেছ মানে কী বলতে চাইছ?’
‘মানে আর কি! ওটা বয়ে নিয়ে আবার নিমন্ত্রণ বাড়ি যাব ভেবে ব্যাগটা দাদুভাই-এর হাতে দিয়ে বলি  বাড়িতে রেখে আসতে
চণ্ডীবাবুর বুকটা ইতিমধ্যে ধক ধক করতে শুরু করে দিয়েছে। চোরটাকে যে ব্যাগটা ধরিয়ে দিলেন ওই ব্যাগটা নয় তো?
এই কথাবার্তার মধ্যে টাটুম এসে বলল, ‘এই দরজার পাশেই ব্যাগ রেখেছি
‘ওটা ব্যাগ রাখার জায়গা? আমাকে বলে গেলি না কেন? তুলে রাখতাম,’ চণ্ডীবাবু ধমকে উঠলেন।
‘কী ব্যাপার? চোর টোর এসেছিল নাকি? নইলে ব্যাগটা গেল কোথায়?’  সুবিমল জিজ্ঞাসা করল।
চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার বলল, ‘জানলার শিকগুলো কেমন বাঁকা মনে হচ্ছে না?’
সকলে জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন যে শিক শুধু বাঁকা নয়, ভাঙ্গাও আছে একটা। জানলার পাল্লার আড়ালে ছিল সেটা। রামজীবনবাবু বললেন, ‘জামাইবাবু চোর এসেছিল টের পাননি?’
চণ্ডীবাবু আমতা আমতা করে বললেন, ‘টের পেয়েছিলাম। কিন্তু এই ঘরে তো কিছু থাকে না মনে করে বিশেষ খোঁজ করিনি, আর ছেলেটাও বাচ্চা। ব্যাগটা ওই দরজার পাশে ছিল। আমার ধারণা হল যে ব্যাগটা ওই ছেলেটার। ওটা যে তোমার তা জানা ছিল না। ছেলেটাও কিছু বলল না ওকে দিতেই ও সেটা নিয়ে চলে গেল
সুবিমল বলল, ‘ভাগ্য ভালো যে, ঘরে নেবার মত কিছু ছিল না। তা ছোটমামা তোমার ওই ব্যাগে শুধু  পাজামা পাঞ্জাবিই ছিল তো? ছেড়ে দাও বাবার পাজামা পাঞ্জাবি দিয়ে চালাও দুদিন।
হঠাৎ রামজীবন বললেন, ‘আরে আমার ওই পাঞ্জাবির পকেটে দিদির তিন ভরি সোনার বালা জোড়া ছিল। যে দুটো পালিশ করতে দিদি আমাদের পাড়ার সোনার দোকানে পাঠিয়েছিল। বালাগুলো পালিশ হয়ে যাবার পর সোনার দোকান থেকে নিয়ে এসেছিলাম। এতদিন বাড়িতেই পড়েছিল। কাল গিন্নি বলল যাচ্ছ যখন বালাগুলো নিয়ে যাও, দিদি হয়ত বিয়ে বাড়ি পরে যাবে। রাস্তায় যখন দেখা হল দিদিকে  বলতেই ভুলে গেছি
চণ্ডীবাবুর গিন্নি ততক্ষণে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছেন। আর ছেলে ফোনের কাছে চলে গেছে ফোন করতে। কিন্তু একটু পরেই বলল, ‘লাইন ডেড। যাক গে মোবাইল থেকে চেষ্টা করছি
চণ্ডীবাবুর স্ত্রী কাঁদছেন আর তাঁকে দোষারোপ করে চলেছেন। তিনি বললেন, ‘ছেলেটা বাস স্ট্যান্ডে যাবে বলেছিল। একবার গিয়ে দেখ তো যদি পাওয়া যায়
সুবিমল আর মুহূর্ত মাত্র দেরী না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুচার পা গিয়েই আবার ফিরে এসে বলল, ‘কেমন দেখতে ছেলেটাকে, আর কী পরেছিল একটু বল
‘অত রাত্রে তো ভাল করে দেখতে পাইনি। একটা হাফ হাতা সাদা গেঞ্জি আর একটা কালো মত বারমুডা প্যান্ট ছিল ওর পরনে। এমনই তো মনে হচ্ছে। আর বয়স ওই আঠারো উনিশ হবে বলেই মনে হচ্ছে
‘ইস! তোমার একটা ফটো তোলা মোবাইল থাকলে খুব ভাল হত,’ বলেই আর দাঁড়াল না সুবিমল। প্রায় দৌড়েই বাস স্ট্যান্ডের দিকে চলল। বাস স্ট্যান্ডটা প্রায় মিনিট পনেরোর মত রাস্তা। স্ট্যান্ডে খান দুই বাস দুটো জায়গায় যাবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। সুবিমল উঁকি দিয়ে দুটি বাসের যাত্রীদের দেখল। তেমন বয়সের কোনও ছেলেকে দেখতে পেল না


কন্ডাক্টর এবার চেঁচিয়ে যাত্রীদের ডাকতে শুরু করল। বাসে বেশ ভিড় হয়েছে। এমন সময় বছর কুড়ির ছেলে, পরনে কালো রঙের বারমুডা প্যান্ট আর গায়ে একটা ঢলঢলে লাল রঙের গেঞ্জি, একটা ঢাউস মাপের ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বাসে উঠতে গেল। কন্ডাক্টর তাকে ওই ব্যাগ নিয়ে উঠতে দিতে রাজি হল না। কারণ বাসে বেশ ভিড় হয়ে গেছে। মায়ের অসুখ বলে ছেলেটি কাকুতি-মিনতি করছে দেখে সুবিমল একটু অনুরোধও করল কন্ডাক্টরকেছেলেটিকে কন্ডাক্টর বাসে তুলে নিল, তবে তার জায়গা হল ছাদে। অনেক বেশি মাল পত্র নিয়ে যারা ওঠে তাদের স্থান ছাদেই হয় সাধারণত। বাস ছেড়েও দিল।
আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সুবিমল বাড়ি ফিরে এল। যথারীতি এসে বাবাকে জানাল যে, ‘এমন কোনও ছেলে ওঠেনি। তবে কিছুক্ষণ আগে একটা উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে বাসে উঠল বটে কিন্তু সে অন্য ছেলে। হাতে একটা ট্রলি ব্যাগ। আর জামা কাপড়টাও অন্য
‘ওকে কি আর পাওয়া যাবে! কোথায় না কোথায় গেছে! পুলিশে খবর দিয়েছিস তো?’
‘হ্যাঁ বাবা, তবে কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না। সব তো জানই। বড়বাবু চোখ কচলাতে কচলাতে রিপোর্ট লিখল
চণ্ডীবাবুর গিন্নি মাঝে মাঝে কান্না থামিয়ে শুনছেন আবার পরক্ষণেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদে নিচ্ছেন। রনিতা আর রামজীবনবাবু তাঁকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করছেন।
ওদের কথায় আর গিন্নির বিলাপে বাধা পড়ল। হঠাৎ ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজে উঠল সবাইকে চমকে দিয়ে
চণ্ডীবাবু নিজেই ধরলেন। ওপারে সুমিতার গলা, রামজীবনবাবুর স্ত্রী। সুমিতা জানালেন, ‘দিদির বালাজোড়া নিয়ে যেতে উনি ভুলে গেছেন জামাইবাবু। আমি একটা পলিথিনের ক্যারিবাগে ভরে আলমারিতে তুলে রেখেছিলাম আর বলেছিলাম ব্যাগে ঢুকিয়ে নিও মনে করে, কিন্তু এখন দেখছি ওনার  মনের ভুলে আলমারিতেই পড়ে আছে
চণ্ডীবাবু হা হা করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘ভালই হয়েছে সুমিতা। তোমার কর্তার একটু ভুলের জন্য আমরা অনেক বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেছি
বাড়ির সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। গিন্নির মুখে হাসি ফুটল।
চণ্ডীবাবুরও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। হঠাৎ তাঁর খেয়াল পড়ল দিন তিনেক আগে পুরী বেড়াতে যাবেন বলে যে বড় ট্রলি ব্যাগটা কিনেছিলেন সেটা হঠাৎ ভ্যানিশ হয়ে গেছে। তক্তাপোষের নিচে সেটা কাল পর্যন্ত ছিল! তার মানে ওই ছেলেটাই, সুবিমল যাকে দেখেছে।
ব্যাপারটা নিয়ে চণ্ডীবাবু আর উচ্চবাচ্য করলেন না। ছেলেটা ধরা পড়ার আগেই ব্যাগটা নিয়ে বাইরে রেখে এসেছিল। ইচ্ছা ছিল আরও কিছু হাতাবে। ধরা পড়ার পর ভাল ছেলে সাজে। তারপর চলে যাবার সময় ব্যাগটা নিয়ে চলে যায়। যাই হোক, ও যে কাজ করে তাতে এরকম একটা বড় ব্যাগ খুব কাজে দেবে। বাড়িতে আর কিছু বললেন না। একবার শুধু সুবিমল বলেছিল, ‘ছেলেটার ট্রলি ব্যাগটা কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল
--------------
ছবি - পুষ্পেন মণ্ডল

লেখক পরিচিতি - নিবাস কলকাতা। কলেজ জীবনের সাথে সাথেই পূর্ব রেলে চাকরি। গল্প লেখার প্রয়াস সেই কিশোর বয়স থেকেই। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা। প্রকাশিত হয়েছে একটি লিমেরিকের সংকলন এবং ছোটোদের জন্য বেশ কয়েকটি গল্পের বই। বড়দের জন্য একমাত্র গল্প সংগ্রহ ‘দ্বিতীয় শৈশব’।

No comments:

Post a comment