গল্পের ম্যাজিক:: কাঙ্গাল - বৈশাখী ঠাকুর

কাঙ্গাল
বৈশাখী ঠাকুর

হরেনের দিনকাল এখন মন্দ যাচ্ছেঅনেকদিন হল জুতসই একটা দাঁও মারতে পারছে না। বয়সও হয়ে যাচ্ছে। আর দূরে গিয়ে খেটেখুটে চুরি করা পোষায় না। তা ছাড়া ওদের লাইনেও বেজায় কম্পিটিশান। চারিপাশে যা কর্মী ছাঁটাই আর দুনিয়ার মিল কারখানা যেভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাতে পেটের দায়ে অনেকেই হাতের কাজে লেগে পড়েছে। সকালের মিঠে রোদে একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বাঁশী বানাতে বানাতে এইসব কথাই  চিন্তা করছিল হরেন। কিন্তু এভাবে বসে থাকলে তো পেট চলবে না। রোজ বউয়ের সাথে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই আছে তা বউয়ের কথাগুলো তো মিথ্যে নয়। অদূরে বসে শাক বাছছিল শিউলি। মুখ তুলে বলল,কোনও কাজের সন্ধান পেলে?
না রে বউ, সেই তো চিন্তা হচ্ছে
‘থাক। তোমার আর কাজ খুঁজে কাজ নেই। যা বলছি মন দিয়ে শোন। আমার এক বোন -
‘তোর বোন! তোর আবার বোন এল কোথা থেকে?’
আরে বাবা আমার দূরসম্পক্কের বোন, আমার জ্যাঠতুতো দিদির খুড়তুতো মেসোর পিসতুতো শালার মেয়ে
অ্যাঁ! হ্যাঁ তা কী বলছিলি বল
তা সেই বোন আমার এই মাকলার শেষ প্রান্তে এক বনেদি বাড়িতে কাজ নিয়েছে। এখন অবস্থা পড়ন্ত। কিন্তু একটু খুঁজে পেতে নিলে অনেক মূল্যবান জিনিস পাওয়া যাবে - সিন্দুক ভর্তি সোনাগয়না, রুপোর রেকাবি, হাতপাখা, মোমদানি ইত্যাদি। দেরী না করে আজ রাতেই রওনা হয়ে যেও
মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল হরেনের। বংশানুক্রমে তারা মোটেই চোর নয়। তাদের ছিল গানবাজনার বাড়িঠাকুরদার সাথে কত কত এ পাড়া ও পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছে। বড় বড় ওস্তাদজিদের গান শুনেছে। নিজের গানের গলাটাও বড় মিঠে ছিল। তবে ঠাকুরদার গলায় দরদ ছিল আর সেতারটাও বাজাত বড্ড ভাল। এক একদিন বাজাতে বাজাতে হাত দিয়ে রক্ত ঝরে পড়ত। কিন্তু বাপটা ছিল বাউন্ডুলে। ঠাকুরদার দেহ রাখার পর সংসারের হাল ধরতে গিয়েই তার এই অবনতি। পালা-গান আর চলে না। গান গেয়ে ভিক্ষে করলেও লোকে গান শুনে পালায়, কেউ পয়সা দেয় না তেমন। যা অল্প পয়সা রোজগার হয় তাতে সংসারের সুরাহা ছাই হয়!
বেরোবার আগে বউ যত্ন করে পরোটা মাংস খেতে দিল। হরেন তো অবাক। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়ের সংসারে মাংস কোত্থেকে এল?
‘কী রে বউ মাংস কোথা থেকে পেলি?
রেডিওটা বাঁধা দিয়েছি
রেডিওটা বেচে দিলি। ঐ তো একটা সম্বল ছিল। আর আমার গান শোনা হবে না
হতাশার সুর ঝরে পরল হরেনের গলা থেকে।
বেচে দিইনি গো। বাঁধা দিয়ে এসেছি। আজ আবার কিছু আমদানি হলেই ছাড়িয়ে নিয়ে আসব। এ আর এমন কী কথা!
‘তা ছাড়া তুই তো জানিস, আমার পেটে এইসব সয় না
ওইজন্যেই তো দিলাম। অম্বল হবে, ক্রমাগত ঢেঁকুর উঠবে, আইঢাই লাগবে। সারারাত আর দু চোখের পাতা এক করতে হচ্ছে না
রাস্তা-ঘাট চিনে যেতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি হরেনের। সাবেক আমলের মস্ত দ্বিতল বাড়ি। পশ্চিম দিকটার বেশ ভগ্নদশা। বাড়িটার সামনে পুকুর। পুকুরের ডানপাশে ঝোপের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসলে বাড়িটার দিকে নজর রাখা যায়। এখনও দু একটা ঘরে আলো জ্বলছে। বারোটার ভেতর সব নিভে যাবে। হরেন টের পেল পুবের দিকের ঘরটায় একটা ছেলে পড়া মুখস্থ করতে ব্যস্ত। তা এখন পরীক্ষার মরশুমই চলছে বটে! কিন্তু সে আর কতক্ষণ! পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করতে গিয়ে তারা কতবার ঘুমের রাজ্যে ঢলে পড়েছে। এই ছেলেরও অচিরে দু’চোখে ঘুম নেমে আসবে। হরেন বস্তা-দড়ি-ছুরি সব গুছিয়ে রাখে। মশার যা উপদ্রব তাতে ধীর পায়ে এগোনোই ভাল। ছেলেটা আলো নিভিয়ে দিয়েছে। হাতের টর্চটা ঠিক করে নেয় হরেন।
কে যায়?
চমকে ওঠে হরেন। টর্চটা জ্বালিয়ে হরেন দেখে নিচ্ছিল ঠিক মত চলছে কিনা! সে সাত তাড়াতাড়ি নিভিয়ে চারিদিকে তাকায়। ফের শুনতে পায় সেই গমগমে গলায়, কে যায়/ চুপিসারে ধায়/ নিশুতি অন্ধকারে ---
ভাল করে ঠাহর করে হরেন বুঝতে পারল একতলার ঘরে কে মোমবাতি জ্বেলে হাত-পা নেড়ে পায়চারি করছে আর বলছে, দাও না সাড়া/ কত যে ডাকিতেছি/ বারে বারে
পরক্ষণেই একটা ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দ শোনা গেল। তার সাথে একটা স্ত্রীলোকের চীৎকার, তোমার জ্বালায় আমার দুধের শিশুটা পর্যন্ত ঘুমোতে পারে না। এই আবৃত্তির পোকা কবে তোমার মাথা থেকে নামবে বল তো! হল ঘরে গেলেই তো পার!
তাতে কি তোমার বিশেষ সুবিধে হবে! আর কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই বড়দার বোল-তাল শুরু হয়ে যাবে
প্রমাদ গোনে হরেন। কি আর করা যাবে! ভোর রাত্রে সবার ভাল ঘুম হয়। সেই সময়ই না হয় সে কাজ সারবে। ঝোপে ফিরে গিয়ে জুত করে একটা বিড়ি ধরায়। বাচ্চাটার কান্নাটা থেমে গেছে। এই সময়টা কাজে লাগাবে কি! কিন্তু তা হবার জো নেই। মা ঠাকুরণের কবেরাজি ওষুধ খাবার সময়। চাকর বেচু অনুপাত বুঝে ত্রিফলা, মধু, তুলসীপাতা পেষাই করতে বসল। সে এক শব্দ বটে! কানে আঙ্গুল দিয়ে বসে রইল হরেন। কিন্তু জ্বালাতনের কি শেষ আছে! মশাদের গুনগুন ধ্বনিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ঝোপঝাড়ে বসে কেমন গা হাতপাও কুটকুট করছে। এবার সত্যি ধৈর্যচ্যুতি হবারই কথা। মানে মানে বড়কর্তা বোলচাল শুরু করলেই সে কাজে হাত দেবে। আর হত্যে দিয়ে এখানে বনে বাদাড়ে বসে থাকার কোনও মানে হয় না! কোন রাস্তা দিয়ে ঢুকবে সে একটু নজর করতে এগিয়ে গেল। পাইপগুলো দিয়ে তরতর করে ওপরে উঠে যাবে নাকি পশ্চিম দিকের কোনও জানলার শিক বাঁকিয়ে ঢুকে কাজ হাসিল করবে। ঠাকুর ঘরের একটা আন্দাজ সে মোটামুটি পেয়ে গেছে। সেখান থেকে কিছু সলিড মাল হাতালেই কেল্লা ফতে।
গুটি গুটি পায়ে সে এগিয়ে গেল। পশ্চিমের ঘরের জানলার শিক বেঁকিয়ে সবে পা দিয়েছে সেই ভগ্নপ্রায় ঘরটাতে ওমনি মাথার ওপরে তবলার বোল শুরু হয়ে গেল,
তেরে কেটে তাক/ তেরে কেটে তাক।
মনে মনে হরেন ভাবে ---  করে দিই সব ফাঁক।
গাঢ় অন্ধকারেও সে শাঁসালো জিনিস ঠাহর করতে পারে। চুরির লাইনে নেমে এই একটা বিদ্যে সে আয়ত্ত করেছে। এ ঘর ও ঘর নিঃশব্দে ঘুরে ঘুরে সে জিনিস ভরছে। মেলা পরিত্যক্ত ঘর চার পাঁচটা ঘর ছাড়া মানুষজনের পাত্তা নেই। তাও সবাই ওপরে। বুকে সাহস ঠুকে সে দোতলায় চলল এবারে। ঠাকুর ঘরে উপস্থিত হয়ে রুপোর কিছু জিনিস তুলেছে নেওয়ার আগে অবশ্য মাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। কি আর করবে? পেটের দায় বড় দায়। দেবী মা অন্তর্যামী। নিশ্চ বুঝবেন। এবার মা ঠাকুরণের ঘরে ঢুকে কিছু গয়না আর কাপড় হাতাতে পারলে অনেকদিনের জন্য নিশ্চিন্ত শিউলিও আর খোঁটা দিতে পারবে না। তবলার  বোল তখনও চলছে ---
ধিন ধিনা ধিন তাক/
ঠিক কথাই এবার ফিরেছে তার লাক।
তখন আর রাখব নাকো ফাঁক/ মন দিয়ে বাজাব—সেতার--পাখোয়াজ- ঢাক।
মনের সুখে সে জিনিস তুলছে। কদিন আগে একটা নট্টকোম্পানির লোকের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল। তাকে বলে কয়ে দেখলে হয় – যদি তাকে ওদের দলে নেয়। আর তাহলে সে এই চুরিচামারির কাজ করবে না। বড্ড রিস্ক এই সব লাইনে। মনে সুখ নেই। শান্তি নেই। ধুত্তোর!
এমন সময় কী যেন একটা শুনতে পেল হরেন কান পেতে শুনতে পেল এক সুন্দর সঙ্গীতের মূর্ছনা। আওয়াজটা তাকে টানছে। সে সম্মোহিতের  মত এগিয়ে যায়। উত্তরে, সেজবাবুর ঘর থেকে আসছে এই সুরেলা আওয়াজটা। এ যে সেতারের ধ্বনি! অনেককাল পরে শুনছে হরেন। সেই কবে ঠাকুরদার সাথে শেষবারের মত নওদাপাড়ার জলসায় গেছিল। আহা! বড় মিঠে হাত। কী নিপুতার সাথে মীড় টানছে। বড় দরাজ হাত হে! অনুশীলন করে বটে সেজবাবু। হরেন যেন সেই ছোটবেলায় ফিরে যাচ্ছে। ঝালাটা যখন শুরু হল হরেনের বুকের ভেতরটা পর্যন্ত হু হু করে উঠল। মনে পরে গেল তার ছোটবেলার কথা — গ্রামের কথা — সেই নদী-মাঠ-ঘাট-আমবাগান-ভোরের শিউলিফুল — সেই হলুদ ছোপা মায়ের আঁচল --- ঝাপসা হয়ে আসছে তার চোখ দুটো। সাতটা তার থেকে সুরগুলো যেন আছড়ে আছড়ে পড়ছে তার বুকে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। লুটিয়ে পরল সেজবাবুর পায়ের কাছে।
পুব আকাশে তখন সবে রং ধরতে শুরু করেছে।
----------------------
ছবি - সুদেব ভট্টাচার্য

লেখক পরিচিতি - বৈশাখী ঠাকুর বেশ কিছুদিন ধরেই লিখছেন। প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় উনিশ কুড়ি পত্রিকায়। তারপর থেকে নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখছেন। ছোটো এবং বড় উভয়ের জন্যই লেখেন।

No comments:

Post a comment