বহুরূপী :: তাহাদের কথা: জিম করবেট - মণিমালা চক্রবর্তী

তাহাদের কথাঃ জিম করবেট
মণিমালা চক্রবর্তী


জঙ্গল ছিল তাঁর হাতের তালুর মত চেনা, অজস্র পশু-পাখির ডাক নকল করতে পারতেন তিনি, বাঘের মতই নিঃশব্দ আর ক্ষিপ্র ছিল তাঁর গতি কূমায়ুন, গাড়ওয়াল এর বনে-পাহাড়ে এমনি আরও হাজারো কাহিনী ছড়িয়ে আছে তাঁর নাম ঘিরে। তিনি এডওয়ার্ড জেমস করবেট, সংক্ষেপে জিম করবেট; স্থানীয় মানুষদের প্রিয় 'কার্পেট সাহেব'জন্ম জুলাই ২৫, ১৮৭৫,  হিমালয়ের কোলে, অধুনা উত্তরাখন্ড এর নৈনিতাল-এ। প্রথম জীবনে দক্ষ শিকারি হিসেবেই তাঁকে এক ডাকে চিনত লোকে। কূমায়ুন-এর পাহাড়ি গ্রামগুলোতে তখন প্রায়ই লেগে থাকত মানুষখেকো বাঘ, চিতার উৎপাত। এমনি কোনও ভয়ানক নরখাদক-এর উদয় হলেই ডাক পড়ত তাঁর। অব্যর্থ লক্ষ্য, অসাধারণ মনঃসংযোগ, অসম সাহস আর জঙ্গল সম্পর্কে জ্ঞান, সব মিলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক কিংবদন্তী শিকারিজীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিকারে বেরোতেন তিনি, কখনো একা, কখনো বা সঙ্গে থাকত তাঁর প্রিয় স্প্যানিয়েল 'রবিন'১৯০৭ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে ১৯ টি বাঘ আর ১৪ টি চিতা শিকার করেছিলেন, যারা ছিল ১২০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ
এ সবের মাঝেই কোনও এক সময় photography তে আগ্রহ জন্মায় তাঁর। ধীরে ধীরে তাঁর হাতে বন্দুক সরিয়ে জায়গা করে নেয় ক্যামেরা। শিকারি থেকে তিনি হয়ে ওঠেন সংরক্ষণবিদ। স্থানীয় ভাষা বলতে পারতেন জলের মত। তাই গ্রামের লোকজনদের সহজেই বোঝাতে পারতেন তাঁর কথা। ওদিকে গ্রামের লোকজন তাঁকে প্রায় দেবতার মত শ্রদ্ধা করত, ডাকতো 'সাধু' বলে। সহজ করে বুঝিয়ে বলতেন বন্য প্রাণীর যথেচ্ছ শিকার করার ফলে কি বিপদ নেমে আসতে পারে। আশেপাশের স্কুলগুলোতে গিয়ে ছোটদের শোনাতেন তাঁর জঙ্গলের adventure এর গল্প, বোঝাতেন জঙ্গল বাঁচানোর প্রয়োজনীয়তা। সঙ্গে থাকত উপরি পাওনা তাঁর গলায় হাজারো পশু পাখির ডাক, যা শেষ হত বাঘ এর হাড় হিম করা গর্জন দিয়ে। বাঘ কেবলই নিষ্ঠুর, খারাপ Villain ছিল না তাঁর কাছে, বাঘকে তিনি বলতেন 'বড় মনের ভদ্রলোক'কূমায়ুন-এর এই বৈচিত্র্যে ভরা জঙ্গলের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেছিলেন তখনকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৩৬ সালে ভারতের প্রথম জাতীয় উদ্যান তৈরি হয় এই অঞ্চলে 'Hailey National Park' নামে, যার নাম বদলে পরে রাখা হয় 'Jim Corbett National Park', বর্তমানে যার 'Core Area' প্রায় ৫২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
তাঁর শিকারের গা-ছমছমে সব গল্প লিখে গেছেন বিখ্যাত বই 'Man Eaters of Kumaon'-এ। 'Jungle Lore', 'My India' এমনি আরও বেশ কিছু বই রয়েছে তাঁর লেখা, যেগুলো পড়লে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রকৃতি আর মানুষের জন্য তাঁর গভীর ভালবাসা। স্বাধীনতার পরে তিনি ভারত ছেড়ে বোনের সঙ্গে পাড়ি দেন কেনিয়া। সেখানেই তাঁর জীবনের বাকি দিন গুলো কাটে (মৃত্যু: এপ্রিল ১৯, ১৯৫৫)নৈনিতাল-এ তাঁর স্মৃতি ঘেরা বাড়ি এখন 'Jim Corbett Museum'সেখানকার মানুষ - পাহাড় - জঙ্গল এখনও ভোলেনি তাঁকে। কূমায়ুন-এর কিংবদন্তী বলে 'কার্পেট সাহেব' নাকি আবার ফিরে আসবেন!

বাঘের ফটো - স্বর্ণ চক্রবর্তী

No comments:

Post a comment