পুরোনতুন গল্প:: শেষ যোদ্ধা - স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

পুরোনতুন গল্প
শেষ যোদ্ধা
স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমি স্কুলে পড়ি। সময়টা বড়দিনের আগে অথবা পরে। অর্থাৎ সেই সময়ে আমার স্কুল বন্ধ শীতের ছুটি। দিনটা রবিবার। সকালবেলা জলখাবার খেয়ে নিয়মমত খাতা বই নিয়ে বসেছি। এমনিতেই ছুটিতে পড়তে বসতে ভাল্লাগে না। মনে হয় যাই ক্রিকেট খেলে আসি, বা ছাদে গিয়ে বল পেটাই। কিন্তু নিরুপায়। স্কুল সেবার একগাদা হোমটাস্ক বরাদ্দ করে দিয়েছে। গোটা ছুটিটাই মাটি। ঘণ্টা দুয়েক পড়াশোনা করার পরই প্রাণ হাঁপিয়ে উঠল। নাহ! এবার ওঠা যাক, অনেক্ষণ হল পড়তে বসেছি। মনকে বোঝালুম। কি করি, কি করি। দাদুর ঘরে ঢুকলাম। দেখি দাদু ঘরে নেই। কোথায় গেল? দেওয়ালে ঝোলানো পুরানো ঘড়িটায় দেখি সাড়ে বারোটা বাজছে। যাব্বাবা দাদুর সাথে গল্প করব বলে এলাম... তাও গেল! কোথায় বেরিয়েছে কে জানে?  ঠাকুমা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় আসতেই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘দাদু কি বেরিয়েছে কোথাও?’ মুচকি হেসে ঠাকুমা বলল, ‘নারে। তোর দাদু এখন বিশেষ কাজে ব্যস্ত। দালানে গেলেই দেখা পাবি......যা’ এতক্ষণ বাদে তবু একটা আশাপ্রদ ব্যাপার। আর কালক্ষেপ না করে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে গেলাম।
আমাদের বাড়িটা বেশ পুরানো আমলের। ঘরের দরজা জানলাগুলো সব পেল্লায় আকারের; সেগুন কাঠের তৈরি। সিলিংগুলো বেজায় উঁচু; তাতে আবার কড়ি বরগা দেওয়া। এ বাদে লম্বা দুখানা বারান্দা। একটা চারচৌকো দালান আর বিশাল ছাদ। এই ছাদটা আমার ভীষণ প্রিয়। কারণ বাড়িতে এটাই আমার খেলার জায়গা। আর এখানেই আছে ঠাকুরঘর আর চিলেকোঠা। তা সে যাই হোক দালানে এসে দেখি বেশ ঝলমলে রোদ তেরচা ভাবে এসে পড়েছে। কিন্তু ঠাণ্ডার শিরশিরে ভাবটা আছে পুরোমাত্রায়; এক একবার ঠাণ্ডা হাওয়া এসে হাড় কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। দাদু দেখি এরই মধ্যে এক শিশি সর্ষের তেল নিয়ে খালি গায়ে ধুতি পরে তেল মাখার তোজো করছে। আমাকে দেখে দাদু বলল, ‘কী রে...... পড়া হয়ে গেল?’  মুখ ভার করে আমি বললাম, ‘ভালো লাগছে না। মুড নেই’ দাদু হেসে বলল, ‘আচ্ছা বোস’ আমি বললাম, ‘তুমি এখন খালি গায়ে তেল মাখবে? ঠাণ্ডা লাগবে না?’  দাদু উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘বাঙ্গালির ছেলে তেল না মাখলে চলে?......। এতে শরীর ও মন দুই ই ভালো থাকে। SOUND MIND IN A SOUND BODY...’ এই বলে দাদু সাঁ করে খানিকটা তেল নাকে টেনে নিল; কিন্তু এরপরই একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমার চোখে পড়ল, যেটা এর আগে আমি কখনও খেয়াল করিনি।
দাদু বাঁ হাতে খানিকটা সর্ষের তেল নিয়ে ডান হাতের মধ্যমার সাহায্যে তার থেকে নিজের চারপাশে ছিটিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে অস্ফুটস্বরে কী যেন বলতে লাগল। খানিকবাদে সেটা থেমে আবার শুরু হয়ে গেল তৈলমর্দন। আমি একটু উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা দাদু...... এইটা কী হল? দাদু হাসিতে রহস্য মাখিয়ে জবাব দিল...... ‘আছে, আছে গুহ্য ব্যাপার......’ আমি আরও উৎসাহিত হয়ে বললাম, ‘শুনি শুনি। কী রকম?’ দাদু হাতে তেল ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞাসা করল, ‘মহাভারত পড়েছিস?’ আমি তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়েহ্যাঁবললাম। সঙ্গে সঙ্গে দাদুর প্রশ্নবাণবলতো অশ্বত্থামা কে ছিলেন?’ আমি ভেবে নিয়ে বললাম, ‘কৌরব পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের ছেলের নাম ছিল অশ্বত্থামা’ ‘হুম......ঠিকমাথা নেড়ে দাদু বলল, ‘একে নিয়েই যত ঘটনা বুঝলিআমি অবাক! বললাম, ‘তাই! এই ঘটনার সাথেও মহাভারতের যোগাযোগ! বলো না দাদু গল্পটা। আর হেঁয়ালি না রেখে...’ ‘শুনবি? তাহলে বলি শোন......’ বলে শেষমেশ শুরু করল সেই গল্প।
এটা বুঝলি দাদু একটা লোকশ্রুতি। বহুকাল ধরে লোকের মুখে মুখে ফিরে এই কাহিনী যে রূপ নিয়েছে, সেই গল্পই আমি তোকে বলছি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ পর্বের ঘটনা ভীম আর দুর্যোধনের গদা যুদ্ধ। সে এক সাংঘাতিক যুদ্ধ। দুজনেই এক অস্ত্রগুরু বলরামের শিষ্য, দুজনেই দক্ষ যোদ্ধা। তাদের যুদ্ধে মাটি কেঁপে উঠল। আকাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এল, একেবারে মহাপ্রলয় যাকে বলে। শেষটায় চালাকির আশ্রয় নিলেন ভীম। শ্রী কৃষ্ণের সহায়তায়, নিয়ম ভেঙ্গে দুর্যোধনের উরুতে গদাঘাত করলেন। সেই আঘাতেই ভূপতিত হলেন। বলরাম এই অন্যায় দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে চলে গেলেন। আস্তে আস্তে সবাই সেই স্থান ছেড়ে চলে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। কুরুক্ষেত্রের শত সহস্র মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে পড়ে রইলেন একা দুর্যোধন। তিনি ছাড়া কৌরবপক্ষে আর মাত্র তিনজন বেঁচে। তারা কারা বলতো?’ একমনে গপ্পো শুনছিলাম, হঠাৎ প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে বললুম, ‘ইয়ে......অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য আর কৃপবর্মা’ ‘উঁহু কৃপবর্মা নয়, কৃতবর্মা,দাদু বলে উঠল।দুর্যোধনের পরাজয়ের খবর এদের কাছে পৌঁছল। সেই রাত্রেই তারা এসে উপস্থিত হলেন সেই স্থানে। অন্তিম মুহূর্ত আগত জেনেও তিনজন বিশ্বস্ত মানুষকে দেখে খানিকটা ভরসা পেলেন দুর্যোধন। অন্যদিকে তাদের দলপতির অবস্থা দেখে চোখে জল তিনজনের। অশ্বত্থামা যন্ত্রণায় জর্জরিত দুর্যোধনকে দেখে বললেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না মহারাজ, আজ রাত্রেই পাণ্ডবদের বিনাশ করবসেই অবস্থাতেও কিছুটা আশান্বিত হয়ে দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে সেনাপতির পদে বরণ করে নিলেন। দুর্যোধনের থেকে বিদায় নিয়ে তিনজন সে রাত্রে এক বটগাছের নীচে বিশ্রাম নিতে মনস্থ করলেন। ক্লান্ত শরীর, অবসন্ন মন, কৃপ আর কৃতবর্মা ঘুমিয়ে পড়লেন ঘুমোলেন না কেবল অশ্বত্থামা, প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে তাঁর মনে রাগে, দুঃখে চিন্তায় চোখে ঘুম এল না তাঁর। ঠিক সেই সময় একটা বটগাছের ডালে কতগুলো কাক যখন তাদের বাসায় ঘুমে অচেতন হঠাৎ একটা প্যাঁচা এসে সেই ঘুমন্ত কাকগুলো কে মেরে ফেলল। এই দেখে অশ্বত্থামার মনে হল......’ আমি অমনি বললুম, ‘যে তিনিও ওই ভাবে পঞ্চপাণ্ডব কে হত্যা করতে পারেন
দাদু হ্যাঁ বলে আবার বলতে শুরু করল, ‘অশ্বত্থামা সেই পরিকল্পনার কথা কৃপবর্মা এবং কৃতবর্মাকে জানালে তারা ঘৃণা ও লজ্জায় প্রথমে আপত্তি করলেও পরে নিরুপায় হয়ে সেই রাতের অন্ধকারে পাণ্ডব শিবিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। দুজনকে বাইরে রেখে খড়গ হাতে তিনি ঢুকলেন শিবিরে। এবং নৃশংস ভাবে হত্যা করলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডী, পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচ সন্তানসহ অন্যান্য বীরদের। দৈবক্রমে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী পঞ্চপাণ্ডবসহ দ্রৌপদী সে রাতে শিবিরের পরিবর্তে যমুনাতীরে বিশ্রাম করতে গিয়েছিলেন ফলে তারা প্রাণে বেঁচে গেলেন। পরের দিন সকালে এই দুঃসংবাদ পেয়ে রাগে দুঃখে উন্মত্ত হয়ে কৃষ্ণ আর অর্জুন যুদ্ধ আরম্ভ করেন অশ্বত্থামার সঙ্গে। অর্জুন আর অশ্বত্থামা দুজনেই মহাবীর,  ভিন্ন ভিন্ন দিব্যাস্ত্রে বলীয়ান। এই দুই বীরের লড়াইয়ে সারা পৃথিবী কেঁপে উঠল। অশ্বত্থামা এই যুদ্ধে ‘ব্রম্ভশির’ নামে এক ভীষণ অস্ত্র  প্রয়োগ করেন। তাকে ঠেকানোর জন্য শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী অর্জুন আরেকটি দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করেন। শেষে দেবতাদের অনুপ্রবেশ ঘটে, তাঁরা দুপক্ষকেই অস্ত্র সংবরণ করতে বলেন এবং অশ্বত্থামাকেই দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তিবিধান করেন যে তাঁকে তাঁর নিজের মাথার মণিটি কেটে পাণ্ডবদের দিয়ে দিতে হবে। এটা বলে রাখা প্রয়োজন যে অশ্বত্থামার মাথায় জন্মাবধি একটি মণি ছিল, যার কারণে তাঁর এত তেজ, এত দীপ্তি, এত শৌর্য-বীর্য। সেই অমূল্য মণিটি কেড়ে নেওয়ায় এক লহমার মধ্যে তার সেই তেজ- দীপ্তি সব যেন কোথায় হারিয়ে গেল। অশ্বত্থামা হয়ে গেলেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। মাথার মণি কেটে ফেলায় সেখানে দেখা দিল ক্ষত, যার থেকে বিষক্রিয়া অসহ্য যন্ত্রণা পেতে লাগলেন তিনি। দেবতারা তখন তাঁর সেই যন্ত্রণা থেকে সাময়িক আরাম পাওয়ার জন্য এই আশীর্বাদ করলেন, যদি কোনও ব্রাহ্মণ সন্তান তেল মাখার সময় তাঁর নাম নিয়ে তাঁর উদ্দেশে তেল ছিটিয়ে দেয় তাহলে অশ্বত্থামার সেই যন্ত্রণার সাময়িক উপশম হবে
একনাগাড়ে গোটা গল্পটা বলে দাদু একটু থামল। আমি বললাম, ‘বাবা এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার’  দাদু এবার একটু বিষণ্ণ হয়ে বলল, ‘কী জানিস, কথিত আছে অশ্বত্থামা অমর। আমার এটা ভাবলে অবাক লাগে যে সে হয়তো এই জনস্রোতেই মিশে আছে। আর আমি যখন এই কাজটা করি তখন হয়তো সত্যিই সে তাঁর যন্ত্রণার কষ্ট থেকে সাময়িক আরাম পায়
আমারও মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। গল্পটা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে একে কাল্পনিক ভাবতে ইচ্ছাই করল না। হয়তো তিনি সত্যিই আছেন......আজও! মহাভারতের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মাথায় দ্বাপর যুগের ক্ষত নিয়ে, আমাদের শহর কলকাতাতেই। এই সব ভাবছি এমন সময় বাইরে সিঁড়িতে চট চট করে জুতোর শব্দ কানে এল।
দাদু বলল, ‘দেখ তো কে?’ বাইরে বেরিয়ে দেখি একজন লোক গায়ে মাথায় আলোয়ানে ঢাকা। আমাদের বাড়ির গেট ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেউত্তরের হাওয়া হঠাৎ খুব জোরে বইতে শুরু করল। আমি বেশ জোরেই ডাকলাম, "আপনি, কাউকে খুঁজছেন?" আমার কথা সম্ভবত হাওয়ার দাপটেই ভদ্রলোকের কানে পৌঁছল না তিনি গেট পেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে গেছেন এমন সময় হঠাৎ হাওয়ায় তার মাথা ঢাকা আলোয়ান খসে গেল একমুহূর্তের জন্য যা দেখলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না, ভদ্রলোকের ব্রহ্মতালু অর্থাৎ মাথার ঠিক মাঝখানে একটা গভীর ক্ষত!! পাতলা চুলের ফাঁকে খয়েরি রঙের শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ আমি গেটের কাছে ছুটে গেলাম; তার মধ্যেই ভদ্রলোক আলোয়ানটা ফের চাপা দিয়ে দ্রুতগতিতে বড়রাস্তার ভিড়ে মিশে গেলেন. . . . . আর তাকে দেখতে পেলাম না বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, "কে হতে পারে লোকটা? যার কথা ভাবছি তিনিই কী??. . . . . .
কাছেপিঠে কোথাও একটা টিকটিকি ডেকে উঠল, "ঠিক, ঠিক, ঠিক!!"
-------------
ছবি - লেখক

লেখক পরিচিতি - স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায় (জন্ম : ১৯৯৪) নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, বর্তমানে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়েই স্নাতকোত্তরের ছাত্র শখ: ছবি আঁকা, লেখালিখি, খেলাধুলো, বিবিধ দেশি বিদেশি গল্পের বই পড়া এবং সংগ্রহ করা

No comments:

Post a comment