Showing posts with label ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়. Show all posts
Showing posts with label ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়. Show all posts

দেশবিদেশের গল্প:: উরাশিমা এবং সমুদ্রকন্যা - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় (জাপানি রূপকথা)


উরাশিমা এবং সমুদ্রকন্যা
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

সে প্রায় একশো বছর আগের কথা। জাপানের এক জেলে পরিবারের কিশোর ছিল উরাশিমা। তারও নেশা ছিল মাছ ধরে বেড়ানো। নৌকো নিয়ে সে চলে যেত মাঝ নদীতে। মাছ নিয়ে ফিরত ঘরে। বিক্রি করত বাজারে। একদিন তার কী খেয়াল হল, মাছ ধরার পর সুমিনোয়ির সাগর তটে সে ভাসিয়ে দিল তার সাধের নৌকাখানি। সাদামাটা নৌকাটির রংচঙ নষ্ট হয়ে গেছিল। নৌকার দিক নির্দেশক রাডারও ছিল না। তবে আর পাঁচটা নৌকার মতো উরাশিমার নৌকার আকৃতি ছিল এক্কেবারে ভিন্ন। এমন নৌকো নাকি জাপানের লোকজন দেখেছে বহু যুগ আগে, জাপানের সমুদ্র উপকূলে ভেসে যেতে।
নৌকাটি ভাসিয়ে দেবার আগে কিছু মাছের সঙ্গে উরাশিমা সেদিন একটা কচ্ছপ ধরেছিল। জাপানে কচ্ছপকে ‘ড্রাগন গড অফ দ্যা সি’ বলে। তাই এমন পাপ কাজ সে কিছুতেই করবে না। আবার কচ্ছপটির বেশ বয়স হয়েছে। দেখে মায়া হল উরাশিমার। বয়সের ভারে সে যেন আরও কুব্জ আর ন্যুব্জ। উরাশিমা জাল থেকে মাছগুলোকে আলাদা করে বুড়ো কচ্ছপটিকে খুব আদরে আবার জলের মধ্যে ছেড়ে দিল। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল সে মনে মনে।
সেই দিনটা ছিল বর্ষার এক খামখেয়ালি বৃষ্টির দিন। আলো-আঁধারির আকাশে কখনও মেঘ। কখনও বৃষ্টি। উরাশিমা কচ্ছপটিকে ভাসিয়ে দিয়ে নৌকা ভাসানোর আগে নিজের নৌকায় খানিকক্ষণ শুয়ে পড়ল আলসেমিতে। হঠাৎ সে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল সাগরের মৃদুমন্দ হাওয়ার ছোঁয়া লেগে।
হঠাৎ সে দেখতে পেল সাগরের বুকে একটি সুন্দর মেয়েকে। আসমানি নীলের মধ্যে টকটকে লাল বড়ো বড়ো ফুল ফুল ছাপের কিমোনো পরা সেই মেয়ের খোলা চুল পিঠের ওপরে এলিয়ে পড়েছে। মুখে একটু হাসি হাসি ভাব। ঠিক যেন বহু যুগ আগে ছোটো থেকে দেখে আসা জাপানের রাজকন্যাদের ছবি। উরাশিমার মনে হল ঠিক তেমনই।
জলের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে সেই মেয়েটি সাগরের কিনারায় তখন। উরাশিমা চেয়ে আছে তার দিকে একদৃষ্টে। এবার সে উরাশিমার নৌকার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল।
মেয়েটি আলগা হাতে নৌকার গায়ে টোকা মেরে মৃদু শব্দ করতেই উরাশিমা ঘুম চোখে বলল, “কে তুমি?”
মেয়েটি বলল, “আমার বাবা হলেন এই মহাসাগরের ড্রাগন কিং। তিনিই আমাকে তোমার কাছে পাঠালেন। তুমি খুব দয়ালু মানুষ। আজ একটি কচ্ছপকে তুমি মুক্তি দিয়েছ। জালে ধরা সত্ত্বেও তুমি তাকে নিজের কাছে আটকে রাখনি। এবার আমার সঙ্গে চলো। তোমায় নিয়ে যাব এবার ঐ দূরে মাঝসাগরের বুকে ছোট্ট এক দ্বীপে। সেখানে আমার বাবার রাজপ্রাসাদ। আমরা সেখানে গিয়ে সুখে থাকব। সেখানে গ্রীষ্ম কখনও ফুরোয় না। মনোরম জলবায়ু। রঙিন ফুলে ভরা প্রকৃতি। চেরি ব্লসম সেখানে ফুটতেই থাকে আর ঝরে যেতেই থাকে। আমাদের প্রাসাদের বাগানে প্রায় অনেকটা সময় ধরেই চেরি ব্লসমের মসৃণ কার্পেট পাতা। আমরা খালি পায়ে হেঁটে বেড়াই। কত পাখি আসে। গান গায়। তুমি গিয়ে দেখতে পাবে। খুব ভালো লাগবে তোমার। যদি তুমি চাও আমি তোমার ‘ফ্লাওয়ার ওয়াইফ’ হতে পারি। বিয়ে করবে আমায়?”
উরাশিমা তো অবাক। এ তো মেঘ না চাইতেই জল। সামান্য জেলে পরিবারের ছেলে মাছ ধরে বেড়ায়। তার নাকি রাজকন্যার সঙ্গে বিয়ে হবে? ভেবেই শিহরিত হল সেই কিশোর। কিন্তু সেই মেয়ের রূপ কাছ থেকে দেখে উরাশিমা ভাবল এই মেয়ে কোনো মানবী হতে পারেই না। তবে মেয়েটিকে দেখেই ভালো লাগে। তার কথাবার্তায় বেশ একটা রুচির ছাপ। ভালোবাসার নরম ছোঁয়া।
নৌকার একটি দাঁড় হাতে তুলে নেয় কন্যা। উরাশিমা নেয় অন্যটি। এবার দু’জনে নৌকার দাঁড় টানতে টানতে সেই সাগর পাড় থেকে সমুদ্রের অন্য আরেক দিকে চলতে থাকল। আপাতত তারা দু’জন বন্ধু। স্বামী স্ত্রী, বিয়ে এসব ভাবনা রাজ্যে ফিরে গিয়ে হবে। রাজারানির তত্ত্বাবধানে।
আর পাঁচটা মাছ ধরার নৌকার মতোই মাঝ দরিয়ায় ভাসমান হয়ে চলল তারা দাঁড় বেয়ে।
মিষ্টি সুরে মেয়েটি গান ধরল... ‘চিন চিন কোবাকামা...’ চেনা কথা। চেনা সুর। ঘুমপাড়ানি গানের সুর। দু’জনেরই জানা গান। উরাশিমাও গলা মেলাল তার সঙ্গে। অস্তরাগের সোনালি আলোয় সাগরের বুকে এমন গান শোনেনি কেউ। ‘চিন চিন কোবাকামা...’। উত্তাল সমুদ্রের নীল, ফেনিল জলরাশি। তবুও অনাবিল আনন্দে গানের সঙ্গে ভাসতে লাগল তারা। অবলীলায় স্রোতের অনুকূলে ভাসে একবার। আবার স্রোতের বিপরীতে যায় ভয়ে ভয়ে। বড়ো বড়ো ঢেউ পেরোয়। দুলতে থাকে দু’জনে নৌকার মধ্যে। নির্জন সমুদ্র ওদের গানে মুখর হয়। ‘চিন চিন কোবাকামা...’
সন্ধের মুখেই তারা পৌঁছে গেল সেই দ্বীপ রাজপ্রাসাদে। রাজবাড়ির পরিচারকেরা এসে তাদের সাদরে বরণ করে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে নিয়ে গেল। উরাশিমাকে তারা দামি সিল্কের গাউন পরতে দিল। সেই ড্রাগন রাজার প্রাসাদে তখন বিয়ের ধূম। সবাই হবু জামাইকে খাতির করতে শুরু করেছে। রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হবে। সেখানে আনন্দের সীমা নেই। এখানে গ্রীষ্ম কখনও ফুরোয় না। সবসময়ই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। ফুল ফোটা থামে না। জাপানের চির বসন্তের দ্বীপ এটি। উরাশিমা ভাবতে থাকে। সে কী এমন ভালো কাজ করেছে যে এই রাজপ্রাসাদে তার স্থান হল এভাবে। সেখানে শুধুই আনন্দ খুশি আর মন্ত্রমুগ্ধতা।


বিয়ে হয়ে গেল উরাশিমার সঙ্গে রাজকন্যার। এভাবে কেটে গেল তিন-তিনটে বছর।
একদিন উরাশিমার খুব মনে হতে থাকল তার বাবা-মাকে। তারা না জানি ছেলের কষ্টে কেমনই বা আছেন। হয়তো অপেক্ষা করে আছেন। ভাবছেন একদিন ঠিক নৌকা নিয়ে উরাশিমা ফেরত আসবে তাদের কাছে। সমুদ্র দেবতাকে ডাকে উরাশিমা। বাবা-মায়ের জন্য বুকে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। অবশেষে একদিন রাজকন্যাকে বলেই ফেলল সে কথা।
“আমায় একটিবারের জন্যে আমার বাবা-মায়ের কাছে যেতে দাও। আমি আবার ফিরে আসব এখানে।”
রাজকন্যা সেই শুনে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
তাকে এই প্রথম কাঁদতে দেখল উরাশিমা।
রাজকন্যা বলল, “ঠিক আছে, তুমি নিশ্চয়ই বাড়ি যাবে, তবে আমার ভয় করছে একটাই। যদি আমাদের আর দেখা না হয়?”
উরাশিমা হেসে বলল, “না না, তাই কখনও হয় নাকি? আমি ঠিক আবার ফিরে আসবই আমার ফ্লাওয়ার ওয়াইফের কাছে।”
রাজকন্যা উরাশিমার হাতে একটি গালা দিয়ে আঁটা কাঠের ছোট্ট বাক্স দিয়ে বলল, “এই নাও। এটা যেন ভুলেও খুলো না, কেমন? এটা খুলে ফেললে তুমি কিন্তু আর আমার কাছে আসতে পারবে না পথ চিনে।”
রেশমের ফিতে বাঁধা সেই কাঠের সুদৃশ্য বাক্সটি হাতে নিয়ে উরাশিমা ভাবল, ঠিক এমনি বাক্স সে দেখেছে সমুদ্র তীরে কানাগাওয়া মন্দিরে । মায়ের সঙ্গে গেছিল একবার। নানারকমের দামি পাথর আটকানো থাকে বাক্সের গায়ে। এই বাক্স সঙ্গে থাকলে সমুদ্রযাত্রা নাকি শুভ হয়। তাই উরাশিমার মা নিয়ে গেছিল ছেলেকে। দূরে দূরে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যায় ছেলে। তার যাতে মঙ্গল হয় যাত্রাপথ।
মনে বড়ো শান্তি হল উরাশিমার। তার ফ্লাওয়ার ওয়াইফের দিকে চেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
বলল, “মনে থাকবে। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম। এই বাক্স আমি কখনওই খুলব না। প্রমিস, প্রমিস, প্রমিস।”
রাজকন্যাও খুশি হল সেই শুনে।
উরাশিমা পাড়ি দিল সমুদ্রের বুকে। ঘন নীল পাহাড়ের সারিকে পাশে রেখে। দূর দিগন্তে রুপোলি আলোর রেখা দেখতে পেয়ে মন চিকচিক করে উঠল তার। এই তো সেই চেনা জলপথ। কতদিনের অদেখা চেনা মাছ ধরার জায়গা। এসে গেছে তার গ্রাম। এসে গেছে তার বাড়ি। কতদিন সে দেখে না তার বাবা-মাকে।
নৌকোটিকে রেখে এক লাফে ডাঙায় নামে সে। কিন্তু উরাশিমা যতই তার গ্রামের বাড়ির দিকে এগিয়ে চলে ততই তার সেই স্থান বড়ো অপরিচিত মনে হল। সবকিছু পালটে গেছে। সাগরের তটে আর সারে সারে মাছ ধরার নৌকা বাঁধা নেই। তার বদলে বড়ো বড়ো ফিশিং ট্রলার বা মাছ ধরার জাহাজ। আরও কিছুদূর এগুতেই বড়ো বড়ো লাইট পোস্টের খুঁটি চোখে পড়ে তার। রাস্তাঘাট সব ঝাঁ চকচক করছে। পাকা রাস্তার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এগোয় উরাশিমা। দু-একজন মানুষ এগিয়ে আসে তার দিকে। কেউ কাউকে চিনতে পারে না। উরাশিমা জিজ্ঞেস করে তার বাবা-মায়ের কথা। নিজের নাম বলে। লোকগুলি কিছুই বলতে পারে না। তবে দূরে তারা পথনির্দেশ দেয়। সমাধি হয়তো আছে তাদের দূরের সেই কবরডাঙায়। নামও হয়তো বা খোদাই করা আছে। এই বলে গোরস্থানের পথ দেখিয়ে দেয় তারা।
মন ভারী হয়ে যায় উরাশিমার। কিছুই মেলাতে পারে না সে। গিয়ে চাক্ষুষ পরখ করে দেখে আসে সে। সবুজ মসে ঢেকে যাওয়া গোরস্থানের পাথরের ওপরে লতাপাতা সরিয়ে অবশেষে সে দেখতে পেল পাথরের ওপরে খোদাই করা তাদের তিনজনের নাম। কিন্তু মৃত্যুর সময়কাল মেলাতে পারে না সে। এ তো প্রায় চারশো বছর আগের তারিখ। তবে কী সে এদ্দিন নিজের কাছে তার সময়কে বেঁধে রেখেছিল?
তাদের গ্রামের বাড়িটা? সেটা বুঝি আর নেই এতদিন পরে? তবুও লোকজনকে জিজ্ঞেস করে গ্রামের বাড়ির খোঁজে বেরোয় উরাশিমা। বদলে গেছে রাস্তা, ঠিকানা। সেই ছোট্ট নদীর সাঁকো? কোথায় গেল? কোথায়ই বা গেল নদীর ধারে সেই শিন্টো মন্দির? ওদের বাড়িটা আর নেই দেখে চোখে জল আসে তার। কেউ সেটি ভেঙে নতুন অট্টালিকা বানিয়ে ফেলেছে। এরই নাম তবে উন্নয়ন? কী ছিল তার গ্রাম আর কী হয়েছে সেখানে সভ্যতার আলো পড়ে। খুব রাগ হয় মনে মনে। রাগে দুঃখে এবার সে কাঁধের ঝুলিতে রাখা তার ফ্লাওয়ার ওয়াইফের দেওয়া সেই মহার্ঘ্য কাঠের বাক্সটি বের করে আনে। ভুলে যায় সব প্রমিস।
রেশমের ফিতের বন্ধন খুলে ফেলে বাক্সের মধ্যে কী রাখা আছে দেখতে যায় উরাশিমা। গালার প্রলেপ সরিয়ে ফেলে কাঠের বাক্সটি খুলতেই বেরিয়ে পড়ে এক চেনা গানের সুর। ‘চিন চিন কোবাকামা, ইউমো ফুকে সোরও...’। মিউজিক্যাল বক্স দিয়েছে তার বউ? কী সুন্দর। কিন্তু গানের সঙ্গে আরও কিছু বেরিয়ে পড়ছে যে। ঠাণ্ডা, দুধ সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক। সঙ্গে অপূর্ব এক উদ্বায়ী গন্ধ। সেই সুর, গন্ধ, ধোঁয়া সব ছড়িয়ে পড়ছে দূরে সমুদ্রের দিকে...
পরক্ষণেই উরাশিমার মনে পড়ে সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। বাক্স কিছুতেই খুলবে না। কিন্তু কী যে হল তার! কেন যে সে হঠাৎ করেই তা খুলে ফেলল।
এবার হঠাৎ উরাশিমা আবিষ্কার করে তার পায়ে আর জোর নেই আগের মতো। তার দাঁত পড়ে গেছে। সে কানেও ভালো শুনছে না। একটা ঠাণ্ডা স্রোত যেন তার রক্তে বইছে। দেহে আর চলার শক্তি পায় না সে। তবে কী সমুদ্রের রাজকন্যা, ড্রাগন গড, দ্বীপের রাজপ্রাসাদের জামাই আদর, তার ফ্লাওয়ার ওয়াইফের দেওয়া বাক্স সবই মায়া? এতদিন ধরে উরাশিমা তবে মায়ার খেলা খেলল? ধীরে ধীরে অশক্ত শরীরে সে এগিয়ে গেল কোনোমতে। সাগর পাড়ে। তার অতি প্রিয় মাছ ধরার নৌকাটিকে আস্তে করে ঠেলে দিল সমুদ্রের দিকে। নৌকো ভাসতে ভাসতে চলল... বয়সের ভারে কুব্জ উরাশিমা যেতে যেতে শুনতে পেল সেই চেনা গানের সুর... ‘চিন চিন কোবাকামা, ইউমো ফুকে সোরও...’ সেই চেনা সুর বাজতে লাগল কানে। মনে পড়ল মায়ের মুখ। বালির চরে লুটিয়ে পড়ল উরাশিমা শেষ বারের মতো। সেই সাদা ধোঁয়ার মধ্যে থাকা সুগন্ধ লেপটে রইল উরাশিমার নাকে। দু’চোখ জুড়ে সে দেখতে পেল তার ফ্লাওয়ার ওয়াইফ, সমুদ্র দেবতার মেয়েকে। চির প্রশান্তির ঘুম তার দু’চোখ জুড়ে তখন। এদ্দিন সে যে সময়ের স্রোতকে আটকে রেখেছিল, সেই সময়ের স্রোতে সেও তবে বিলীন হয়ে গেল?
----------
(জাপানি রূপকথা অবলম্বনে)
মূল কাহিনী: Japanese Fairy Tales, Lafcadio Hearn
ছবি: Ruth Mccrea

গল্পের ম্যাজিক:: ছুতোরের কল - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ছুতোরের কল
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

অনেক দিন আগে তিব্বতের স্নালং নামে এক শহরে বাস করতেন সে দেশের রাজা জেন্ডং। রাজার মৃত্যুর পরে তাঁর ছেলে গেনচগ সেই রাজ্য শাসন করতে থাকলেন। দরবারে তাঁর দু’জন প্রধান হস্তশিল্পী মানুষ ছিল। একজন চিত্রশিল্পী আরেকজন কাঠমিস্ত্রি বা ছুতোর। রাজা এদের দু’জনের সূক্ষ্ম হাতের কাজের খুব পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অথচ এই শিল্পী এবং ছুতোর মোটেও পরস্পরের বন্ধু ছিল না। চিত্রশিল্পী ছুতোরকে খুব ঈর্ষা করত।
একদিন সেই চিত্রশিল্পী রাজা গেনচগকে গিয়ে বলল, “গতকাল রাতে আমি এক স্বপ্ন দেখেছি রাজামশাই। আপনার বাবা রাজা জেন্ডং স্বর্গ থেকে এক পরিকে পাঠিয়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আমিও গেছি আপনার বাবার কাছে সেই পরির সঙ্গে। গিয়ে দেখি আপনার বাবা আরও ধনী হয়ে গেছেন স্বর্গে গিয়ে। উনি আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বলেছেন আপনাকে দিতে। এই নিন রাজামাশাই, এই সেই চিঠি।”
রাজা গেনচগ বললেন, “বেশ। এবার পড় দেখি চিঠিতে কী লিখেছেন আমার স্বর্গত বাবা।”
চিত্রশিল্পী পড়ে বলল, “চিঠিখানি ঐ ছুতোর মিস্ত্রিকে নিয়ে।”
সেই শুনে রাজা বললেন, “দেখি দাও আমার হাতে।”
চিঠি খুলে রাজা পড়তে লাগলেন। সেখানে লেখা ছিল -
‘গেনচগ, শুনতে পাচ্ছ? আমি, তোমার বাবা বলছি। স্বর্গে এসে আমি খুব বড়োলোক হয়ে নতুন জীবন যাপন করতে শুরু করেছি। আগের জীবনে যা কিছু পাইনি সব পেয়েছি এখানে এসে। শুধু আমার একটি ইচ্ছে এখনও পূর্ণ হয়নি। আমি ভেবেছিলাম স্বর্গে একটি সুন্দর মন্দির তৈরি করব। সব দেবদেবীরা বাস করবেন সেই মন্দিরে। কিন্তু এখানে তেমন সুদক্ষ ছুতোর নেই যে বানাবে অমন এক মন্দির। সুতরাং শহরের সবচেয়ে নিখুঁত সেই কাঠমিস্ত্রিকে এই চিত্রশিল্পীর সঙ্গে যদি তুমি পাঠিয়ে দাও এখানে। তাই এর হাত দিয়ে তোমাকে আমি চিঠি পাঠালাম।’
গেনচগ ভাবলেন, এ আমার বাবার লেখা চিঠি হতে বাধ্য! বাবা চিরকাল একটা সুন্দর মন্দির বানানোর চেষ্টায় থাকতেন। অতএব আমার এ ব্যাপারে শীঘ্রই কিছু করা উচিত।
এই ভেবে তিনি তাঁর প্রিয় ছুতোর মিস্ত্রিকে ডেকে তাঁর বাবার ইচ্ছার কথা জানালেন। বললেন, “আমার বাবার ইচ্ছা পূর্ণ করতে তুমি শীঘ্র স্বর্গের পথে পা বাড়াও।”
ছুতোর ভাবল, এ কী আজব কথা বলছেন রাজামশাই! বাস্তবে সে কখনও সম্ভব? এ নিশ্চয়ই ঐ আর্টিস্টের কোনও কুমতলব। আমার সঙ্গে ওর মোটেও পটে না। তাই আমাকে ও এই রাজ্য থেকে সরিয়ে দিতে চাইবার ফন্দি আঁটছে।
ছুতোর রাজার সামনে কিছু প্রকাশ করল না, তবে বলল, “বেশ, তাই হবে রাজামশাই। কিন্তু সেখানে আমি পৌঁছব কেমন করে? সে তো শুনেছি অনেক দূর। সাধারণ মানুষ যেতে পারে না সেখানে।”
তখন রাজা গেনচগ তলব করলেন সেই চিত্রশিল্পীর। বললেন, “কেমন করে ছুতোরকে আমার বাবার কাছে পাঠানো যায়? তোমরা তার সব ব্যবস্থা করে ফেল।”
দুষ্টু চিত্রশিল্পী বলল, “ছুতোর সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসুক তবে। একটা কাঠের পাটাতনে সব রেখে তার ওপরে তাকে বসতে হবে। এবার সেই কাঠে অগ্নিসংযোগ করলেই সেই ধোঁয়ায় ছুতোরও ক্রমশঃ ধোঁয়ার সঙ্গে আকাশের দিকে উঠতে থাকবে। আর আকশের দিকেই তো স্বর্গের পথে যেতে হয় শুনেছি।”
ছুতোর সব শুনে বলল, “বাহ! এ দেখি দারুণ প্রস্তাব! কিন্তু একটা কথা আছে ভায়া। আমি আমার নিজের জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করব। আমাকে সাত দিন সময় দেওয়া হোক।”
রাজা বললেন, “বেশ তাই হবে।”
ছুতোর বাড়িতে ফিরে তার বউকে সব কথা খুলে বলল।
তার বউ বলল, “আমি জানতাম ঐ লোকটা একদিন ঠিক তোমাকে খুন করার ফন্দি বের করবে।”
ছুতোর বলল, “আজ থেকেই কাজ শুরু করে দিতে হবে, বুঝেছ?” এই বলে নিজের ঘরের নিচ থেকে একটা সুড়ঙ্গ কেটে ফেলে তাকে যে স্থানে পোড়ানো হবে সেইখান অবধি তার নির্গমন পথ রাখল।
সাতদিন কেটে গেল। রাজা গেনচগ ছুতোরকে খবর দিলেন, আর তার লোকজনদের বললেন কাঠের গুঁড়ি, জ্বালানোর তেল সব জোগাড় করে রাখতে। একটি চারকোনা গঠন বানানো হল সেই কাঠ দিয়ে। মধ্যিখানে হবে ছুতোরের বসার জায়গা। আর তার চারকোনায় স্তূপীকৃত কাঠকুটো রাখা থাকল। যথাসময়ে ছুতোর সেখানে বসে পড়ল তার সব যন্ত্রপাতি নিয়ে। এবার তেল ঢেলে দিল রাজার লোকজনেরা। সেই আর্টিষ্টের তখন মনে আনন্দ আর ধরে না। এবার যেইমাত্র অগ্নিসংযোগ করা অমনি পা পিছলে ছুতোর ঝাঁ করে সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে পড়ে গেল, আর সোজা তার ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়ল। চিত্রশিল্পী তখন জোরে হাততালি দিয়ে বলল, “এবার দেখ সকলে, এই ধোঁয়া কেমন আমাদের ছুতোর বন্ধুকে স্বর্গের দিকে নিয়ে চলে।” অথচ ততক্ষণে সেই ছুতোর নিজের ঘরের মধ্যে বানানো আরেকটি অন্ধকার ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়েছে। ঘরে যেতেই তার ব‌উ বলল, “কী গো! এত নোংরা মেখে এসেছ, এবার স্নান করে কাচা জামাকাপড় পরে নাও।” ছুতোর বলল, “দাঁড়াও, দাঁড়াও। আগে রঙ্গ তামাশা দেখি।”
এভাবে সেই অন্ধকার ঘরে তিন মাস ধরে থাকতে থাকতে ছুতোর ধবধবে ফরসা হয়ে গেল। তিন মাস পরে সে একদিন নিজের সবচেয়ে দামী, রেশমের ওপর জরির কাজ করা চকমকে পোষাকটি পরে রাজার দরবারে এল। তার হাতে ছিল রাজার জন্য লেখা একটি চিঠি।
রাজা বললেন, “বাহ! বেশ, বেশ। পড় দেখি বাবা কি লিখে পাঠিয়েছেন এবার?”
রাজামশাইয়ের সামনে ছুতোর জোরে জোরে চিঠিখানি পড়তে শুরু করে দিল -
‘স্নেহের গেনচগ,
তোমাকে সকলে সুশাসক বলে জানে। তুমি ভালোই দেশ পালন করছ। তুমি আমার কথামতো যে ছুতোরকে মন্দির বানানোর জন্য পাঠিয়েছিলে সে তাঁর কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করেছে। খুব সুন্দর মন্দির নির্মাণ করেছে সে। এবার তুমি দেখ, সে পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে তার পুরস্কার পাবে। এবার মন্দিরের গায়ে চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলার জন্যে তোমার রাজ্যের দক্ষ চিত্রশিল্পীকে আমার কাছে পাঠাতে হবে বাবা। নয়তো এ মন্দিরের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ঠিক যেমনিভাবে তুমি ছুতোরকে এখানে পাঠিয়েছিলে, ঠিক তেমন করেই চিত্রশিল্পীকে পাঠিয়ে দিও কিন্তু।
ইতি তোমার বাবা।’

ছুতোর আরও বলল, “রাজামশাই, কী অপূর্ব জায়গায় থাকেন আপনার বাবা, আর কী বিশাল বড়োলোক উনি। ওনার কাছে আপনি আর কী! ওনার ধন দৌলত, প্রভাব প্রতিপত্তি দেখবার মতো। ওনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমি পূর্ণ করেছি বলে আমাকে উনি কত কিছু দিয়েছেন।”
ছুতোরের গায়ের চামড়া দেখে চিত্রশিল্পীর সন্দেহ হল। আগুনে পুড়ে গিয়ে কারও এমন হয় নাকি? সে নিশ্চয়ই স্বর্গ অবধি পৌঁছাতে পারেনি। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে সে ফিরে এসেছে। তবে ছুতোরের গলায় প্রবালের মালা আর তার রাজকীয় পোশাক দেখে মনে হল, একবার চেষ্টা করলেই হয়। ও ব্যাটা কী সুন্দর ঝকমকে সব পোশাক পরে আছে আর আমি সাদামাটা পোশাক পরেই কাটিয়ে দিলাম জীবন।
তাকেও সাতটা দিন সময় দেওয়া হল। আগের বারের মতো কাঠ, তেল সব একত্রে জড়ো করল রাজার লোকজনেরা। যখন সেই সময় এগিয়ে এল, অগ্নিসংযোগের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ছুতোর বলল, “এবার আমাদের একটু গান শোনা যাক। এবার আমাদের আর্টিষ্ট স্বর্গে চড়বেন।”
সকলে মিলে ড্রাম, হর্ণ, ট্রাম্পেট নিয়ে গান শুরু করে দিল। অগ্নিসংযোগ করতেই সেই দুষ্ট চিত্রশিল্পী পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কিন্তু এত নাচাগানার মধ্যে কেউ শুনতেও পেল না চিত্রশিল্পীর চিত্কার। আগুনের কালো ধোঁয়ায় চারিদিক অন্ধকার তখন। কেউ কিচ্ছুটি দেখতেও পেল না। প্রকৃতপক্ষে সেদিন সত্যি সত্যি সেই দুষ্ট চিত্রশিল্পীর ভয়ানক স্বর্গবাস হল বটে!
(তিব্বতের কিংবদন্তী অনুসরণে)
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

গল্পের ম্যাজিক:: সুশা, মুকজোং এবং লামা - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

তিব্বতি উপকথা

সুশা, মুকজোং এবং লামা
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

তিব্বতিদের প্রাচীন কিংবদন্তী বেশ মজার। সে যুগে তিব্বতের মানুষদের সঙ্গে পশুপাখীদের ওঠাপড়া, ঘনিষ্ঠতা ওদের ধর্মে সর্বজনবিদিত। ওরা পশুপাখীদের ভাষা বুঝত আর পশুপাখীরাও ওদের কথাবার্তা বুঝতে পারত।
পৃথিবীটা তখন ছিল খুব তরুণ। সবেমাত্র সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য সদ্য সবুজ গাছপালায় ভরে উঠেছিল ছোটো ছোটো পাহাড়ের ঢাল। কত রকম রঙ সেই পাহাড়ের। আর মধ্য তিব্বতি হিমালয়ের অত অত পর্বতশৃঙ্গগুলো তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তবুও এই অঞ্চলকে পৃথিবীর ছাদ বলা হল। আনন্দে আপ্লুত তিব্বতের মানুষজনেরা। অত উচ্চতায় জীবনধারণের কত প্রতিকূলতা, তবুও পশুপাখিদের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক ছিল এখানকার মানুষদের। ছিল অগণিত জলাশয়ের মিষ্টি জল। অল্পস্বল্প খেতিজমিতে সামান্য চাষাবাদ করে মনের সুখে থাকত মানুষ। তিব্বতের এই শীতল মরুভূমিতে পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট কুঁড়ে ঘর বেঁধে এক বুড়ো লামা বাস করতেন। তিব্বতি সন্ন্যাসীকে লামা বলে।

কাদা, মাটি আর পাথর দিয়ে বানানো একটি মাড হাউজের বাইরে চমরি গাইয়ের গোবর লেপা থাকত। ঘরের মেঝেতে খুব ধুলো ছিল। সেই ঘরের মধ্যে ছোট্ট একটা কাঠের পাটাতনের ওপর শুয়ে থাকতেন সেই তিব্বতি সাধু বা লামা। তাঁর পরনের একটিমাত্র কাপড় ছিল। সেটি দিনের বেলায় নদীর জলে কেচে, রোদে শুকিয়ে আবার তিনি পরে নিতেন। তাঁর ঘরের কোনায় এক বস্তায় ভরা কিছু শস্যদানা ছিল। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সাম্বা নামক রোষ্ট করা গম জাতীয় একরকম শস্যদানা। আর ছিল বার্লি। একটি মাটির কেটলিতে ছিল কিছু চা’পাতা। আর ছিল একটি কাঠের স্যুপ খাওয়ার বাটি। চমরী গাইয়ের দুধ থেকে মাখন তুলে গরম মাখন-চা বানিয়ে খেতেন তিনি। তিব্বতের এই চা মানুষকে ঠাণ্ডায় খুব তৃপ্তি দেয়।
লোকালয় থেকে বেশ অনেকটা দূরে ছিল লামার কুঁড়েটি। নিজের ঘরে লামা প্রায়শই মগ্ন থাকতেন উপাসনায়, ধ্যানে। জীবজগতের মঙ্গল সাধনায় বিগলিত ছিল তাঁর প্রাণ। হাতে সর্বক্ষণের সঙ্গী তাঁর ধাতব প্রেয়ার হুইল আর জপের মালা। ঘূর্ণায়মান চাকাটি একহাতে আর অন্যহাতে জপের মালা নিয়ে সব্যসাচী লামা মনের সুখেই থাকতেন।
সুশা নামে তাঁর একটি খরগোশ আর মুকজোং নামে একটি ইঁদুর ছিল। এই দুই পোষ্যের মধ্যে বুঝি খুব ভাব ছিল? নাহ! মোটেও নয়। লামার সঙ্গে তারা বন্ধু ভাব দেখালেও আসলে তাদের দুজনের সম্পর্কটা পুরোটাই ছিল ভান করা।
রাতেরবেলায় যেই লামা নিদ্রামগ্ন হতেন সুশা আর মুকজোং চুপিচুপি সেই ঘরে ঢুকে বস্তার মুখ খুলে তার ভেতর থেকে সব শস্য দানা রোজ চুরি করে খেত। ঘরের মধ্যে শুয়ে শুয়ে রাতেরবেলায় খুটখাট আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে যেত তাঁর। লামা একদিন টের পেলেন তাদের এই কর্মকাণ্ডের কথা। তিনি ঠিক করলেন একটি ফাঁদ পাতবেন আর তাদের ধরে ফেলবেন। রাতের বেলায় একটি ঝুড়ি রেখে দিলেন কায়দা করে। সেদিন রাতেই কেল্লাফতে। লেজ আটকে মুকজোং আর সুশা দুজনেই ধরা পড়ল। পরের দিন সকালে তাদের গোঁফ, কান আর লেজ কেটে অতি সন্তর্পণে ঝুড়ি থেকে লামা তাদের বের করে আনলেন।
মুকজোং আর সুশার খুব অভিমান হল লামার ওপর। তারা বলল, “আমরা এক জায়গায় এতদিন রয়েছি আর তুমি আমাদের অবিশ্বাস করলে? আমরা কিন্তু কিছুই চুরি করিনি তোমার ঘর থেকে। আমরা শুধু দেখছিলাম তুমি বস্তায় কি রেখেছ, ব্যাস শুধু এইটুকুই ছিল আমাদের আগ্রহ।”
সুশা বলে উঠল, “সাধু, তুমি না ভগবানের তপস্যা কর। শোনো, তুমি যখন আমাদের মতো অবলা জীবকে এমন করে নিষ্ঠুর শাস্তি দিলে আমরা এবার আমাদের রাজামশায়ের কাছে যাব। তোমার জন্য তাঁর সেনাবাহিনী দিয়ে বস্তায় করে শস্যদানা পাঠিয়ে দিতে বলে আসব। অতএব তুমি তাদের জন্য বিশাল ফাঁদ পেতে রাখো এবার। দেখি রাজামশাইয়ের লোকজন কেমন সেই ফাঁদে ধরা দেয় আর তাঁর জন্য তোমার কী শাস্তি হয়।”
লামা বললেন, “শাস্তি তো পেতেই হবে তোমাদের। আমার কাছে এতদিন আছ তোমরা, আমাকে না বলে কেন চুরি করলে?”

মুকজোং যদিও এই শস্য চুরির ব্যাপারটায় খুব লজ্জিত, তবুও সুশার প্ররোচনায় সে রাজার কাছে ছুটল। গিয়ে বলল, “রাজামশাই, এই দেখুন, কতটুকুনি একটা জীব আমি। সাধুবাবা কেমন অবস্থা করেছেন আমার। আপনাকে এর বিহিত করতেই হবে।”
রাজা বললেন, “বেশ তাই হবে। আমি সেনা পাঠাচ্ছি লামার ঘরে।”
রাজা মুকজোং-কে এবার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার সঙ্গে আর কে ছিল?”
মুকজোং তখন সুশাকে দেখিয়ে বলল, “এই খরগোশ আর আমি খুব বন্ধু। আমরা একসঙ্গে বহুদিন ধরে আছি ঐ লামার কাছে।”
রাজার খুব চিন্তা হল। তিনি ভাবলেন মনে মনে। খরগোশ নিরীহ জীব। ইঁদুরের কুসঙ্গে পড়ে সেও বদস্বভাবের হয়ে গেছে তবে। এরমধ্যে চৌর্যবৃত্তি শিখে ফেলেছে। ঠিক আছে, আমি লামার বাড়িতে সেনা পাঠালাম বটে, তবে জেনে রেখো একটা কথা। চালাকির দ্বারা কোনও মহৎ কাজ হয় না। ইঁদুরকে সকলেই চেনে চোর রূপে। খরগোশের তেমন কোনও বদনাম নেই। অতএব আমিও লামাকে বলে দিচ্ছি আমার সেনার জন্য কোনও ফাঁদ না পাততে, তাদের বিপদে না ফেলতে।”
মুকজোং আর সুশা এবার বুঝতে পারল।
চালাকি করে সত্যি বড়ো কিছু জেতা যায় না। অন্যকে বিপদে ফেলতে গেলে নিজেদের বিপদ বেড়ে যায়। আর সত্যি তো লামার কোনও দোষ নেই। তিনি তো বিশ্বাস করেছিলেন তাদের। তারাই বরং হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। লজ্জায় আর মনের দুঃখে লামার ঘর থেকে পালিয়ে তারা সে যাত্রায় বাঁচে আর কি!
_____
ছবিঃ দীপিকা মজুমদার

প্রবন্ধ:: সহজে দুর্গাকথা - ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


সহজে দুর্গাকথা
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

তোমরা কি জান, দুর্গা শব্দের নামের অর্থ?
দুর্গ শব্দের অর্থ দৈত্য, বাধাবিঘ্ন, দুঃখশোক, নরকযন্ত্রণা, রোগব্যাধি। আর এহেন নানাবিধ অশুভ কিছু আর ‘আ’ অর্থটি বাংলাভাষায় নাশ করা বা বধ করা বোঝায়। সেই কারণে দুর্গা শব্দের অর্থ দাঁড়ায় জীবের জীবন থেকে যা কিছু অশুভ শক্তির বিনাশকারী দেবীশক্তি। নিজের নাম প্রসঙ্গে দেবী বলেছেন চন্ডীতে,

“তত্রৈব চ বধিষ্যামি দুর্গমাখ্যং মহাসুরং
দুর্গা দেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি”।।

কিন্তু দুর্গা নাম এল কীভাবে? পুরাকালে দুর্গম নামক এক অত্যাচারী অসুর দেবতাদের পরাজিত করে বেদশাস্ত্রকে হরণ করে। তার উদ্দেশ্য ছিল জীবজগতে ধর্মের বিনাশ ঘটানো। সমাজে এমন বিশৃঙ্খলা দেখে দেবতারা সমবেতভাবে মহামায়ার শরণাপন্ন হন। কোনও অসুর যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিষ্টসাধন না করতে পারে তাই দেবী দেবতাদের আরাধনায় তুষ্ট হয়ে সমগ্র ‘বেদ’কে নিজের দেহে ধারণ করেন। বেদময়ী দেবীকে দেবগণ ‘দুর্গা’ নামে ভূষিত করেন। ‘দেবী পুরাণ’ মতে দুর্গা নাম স্মরণ করলেই ত্রিতাপ দুঃখ, জ্বালা-যন্ত্রণা মুক্ত হয় এবং এরূপে তিনি জীবের কল্যাণদায়িনী, রোগ-শোক বিনাশিনী রূপে জীবকে অশুভ শক্তির হাত থেকে উদ্ধার করেন। অথবা বলতে পারি, মহাশক্তিকে লাভ করার দুর্গম পথকে যিনি সুগম করে দেন তিনিই দুর্গা।
লৌকিক উপাখ্যানগুলো মানুষের মনে বিশ্বাস আনানোর জন্য। লোকমুখে প্রচারিত হতে হতে দেবীমাহাত্ম্য আজ খ্যাতির শিখরে। আর স্বীয় ব্র্যান্ড সৃষ্টিতেও দেবী নিজেই বহুদূর এগিয়ে রয়েছেন। ঋগ্বেদের দেবীসুক্ততেই তো তা বর্ণিত।

অহং রুদ্রের্ভিবসুভিশ্চরাম্যহমাদিত্যৈরুতবিশ্বদেবৈ
অহং মিত্রাবরুণোভাবিভর্ম্যহমিদ্রাগ্নী অহমশ্বিনোভা…

অর্থাৎ, আমি‌ই সমগ্র জগতের ঈশ্বরী, সকলকে ধারণ করি। আমি‌ই সর্বভূতে জীবরূপে প্রবিষ্টা। আমাকেই সুর, নর ও মুনিগণ বিবিধরূপে আরাধনা করে।
এমন মাহাত্ম্য যাঁর তাঁকে কী করে অস্বীকার করি আমরা? তাই তো নানা অছিলায় সারাটি বছর ধরে তাঁর পূজায় আমাদের খামতি নেই। তিনি যে সেই নারীশক্তি, আমাদের ঘরের কন্যাশ্রী, দেবী দুর্গা যাঁর নাম।
আর আমাদের ঘরের এই কন্যাশ্রীটির জন্য শারদীয়া পুজোর বিশেষ আয়োজন। সারাবছরের মধ্যে এই সময়টাতে মহাধূম। মেয়ের স্নানে, মেয়ের পোষাকে, মেয়ের খাবারে সবকিছুতেই বিশেষ ছোঁয়া যেন।
আশ্বিনে পুবের নরম আলোয় স্নান করবে আমাদের আদরের মেয়ে। রোদ লাগবে বলে গায়ে শাড়ি জড়ানো কন্যে দুর্গার গায়। দুর্গা স্নানে যাবে বলে কথা! দুব্বোমাটি মাড়িয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, শাঁখ বাজিয়ে, উলু দিয়ে মেয়ে যাবে পাইক বরকন্দাজের কোলে চেপে। কেউ আবার পালকিতে নিয়ে যায়। কেউ আবার দোলায়। কেউ মাথার ওপর ছাতা ধরে তার, পাছে মেয়েটার কষ্ট  হয়। পরিপাটি করে লালপাড় কোরা শাড়িতে মেয়ের উথলে ওঠা রূপলাবণ্য ঢেকে দিয়েছে বাড়ির বড়োরা। লজ্জা মেয়ের ভূষণ কিনা।
আমাদের এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশে মানুষের এত রোগভোগ। আবার এ দেশটায় চাষাবাদ সর্বস্বতা! চাষ করেই কত মানুষ খেয়ে পরে বেঁচে থাকে। কৃষিকাজ তাদের রুজি-রোজগার। তাই মহাসপ্তমীর ভোরে এই সবুজের অভিযান। সবুজের স্নান। কলাবৌ স্নান। মেয়ে থাকে সকলের আড়ালে। নেপথ্যের নায়িকা হয়ে।

“ওঁ কদলীতরুসংস্থাসি বিষ্ণুবক্ষঃ স্থলাশ্রয়ে।
নমস্যতে পত্রি ত্বং নমস্তে চন্ডনায়িকে।।
ওঁ হ্রীং রম্ভাধিষ্ঠাত্র্যে ব্রহ্মাণ্যৈ নমঃ।”


বেদে কী আছে জান তোমরা? ভূমি বা মাটি হল মাতা, মৃত্শক্তি যা ধারণ করে সব জীবনদায়িনী উদ্ভিদকে। আয়ুর্বেদের ঐতিহ্যবাহী ভারতবর্ষে রোগভোগের প্রাদুর্ভাবও কিছু কম নয়। মা দুর্গার চিন্ময়ীরূপটি এই কলা-বৌয়ের অবগুণ্ঠনেই যে প্রতিস্থাপন করা হয় সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই কলাবৌকে বলা হয় নবপত্রিকা। নয়টি প্রাকৃতিক সবুজ শক্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনশক্তির মিলন হয় দেবীবন্দনায়। সম্বচ্ছর যাতে দেশবাসীর রোগভোগ কম থাকে এবং দেশ যেন সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে সেই বাসনায় এই নবপত্রিকাকে দুর্গারূপে পুজো করা হয়। ন’টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটির গুরুত্ব আছে। প্রত্যেকটি উদ্ভিদই দুর্গার এক-একটি রূপ এবং তার কারিকাশক্তির অর্থ বহন করে। এরা সমষ্টিগতভাবে মা দুর্গা বা মহাশক্তির প্রতিনিধি। যদিও পত্রিকা শব্দটির অর্থ হল পাতা, কিন্তু নবপত্রিকায় নয়টি চারাগাছ থাকে। আবক্ষ অবগুণ্ঠনের আড়ালে নববধূর একটি প্রতিমূর্তি কল্পনা করা হয়। বসন্তকালে বাসন্তী এবং শরৎকালে দুর্গার আরাধনায় নবপত্রিকা অর্চনার নিয়ম আছে। যে ক’টি চারাগাছের সমষ্টিকে একত্রিত করে অপরাজিতার রজ্জু দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরি করা হয় সেই নয়টি উদ্ভিদের নাম শ্লোকাকারে লেখা আছে, আর এই ন’টি গাছের প্রত্যেকের আবার অধিষ্ঠাত্রী দেবী আছেন।

রম্ভা, কচ্বী, হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ। অশোক মানকশ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা।।

এঁরাই আবার এই সময় নবদুর্গা রূপে পূজিতা হন। তাই দুর্গাপূজার মন্ত্রে পাই,

“ওঁ পত্রিকে নবদুর্গে ত্বং মহাদেব-মনোরমে”

এই মন্ত্রে দেবীকে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয়। শস্যোত্পাদনকারিণী দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী। স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর-স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে এক সঙ্গে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সঙ্গে স্থাপন করা হয়। এই তিনটি ঘটের একটি মা দুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট। নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা, অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা। মহাসপ্তমীর ভোরে বিল্ববৃক্ষের পূজা, নবপত্রিকা এবং জলপূর্ণ ঘটস্থাপনের দ্বারাই দেবীপূজার সূচনালগ্ন ঘোষিত হয়। ত্রিনয়নী ত্রিভুবনতারিণী তিনটি স্থানে আবির্ভূতা হন দুর্গাপুজোর সময়। ঘটে, নবপত্রিকায় এবং মৃন্ময়ী প্রতিমায়।

“ওঁ চন্ডিকে চল চল চালয় চালয় শীঘ্রং ত্বমন্বিকে পূজালয়ং প্রবিশ।
ওঁ উত্তিষ্ঠ পত্রিকে দেবী অস্মাকং হিতকারিণি”

নবপত্রিকাকে জনপদে মঙ্গলের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে পূজা করা হয়। একাধারে এটি কৃষিপ্রধান দেশের চিরাচরিত কৃষিলক্ষ্মী যা প্রাক্‌-আর্যসভ্যতার নিদর্শন, অন্যাধারে জীবজগতের কল্যাণকর এই উদ্ভিদগুলোর রোগনিরাময়ক গুণাবলীর জন্য বনৌষধিও বটে। তাই কলা, কালো কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, অশোক, ডালিম, মানকচু আর ধান - এই ন’টি গাছকে অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দেওয়ার অর্থ হল জনকল্যাণকর এই উদ্ভিদগুলি যেন রোগব্যাধির হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে বা মানুষ যেন এই পুজোর মাধ্যমে রোগব্যাধিকে জয় করতে পারে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে আমাদের কৃষিজ দ্রব্যাদি উত্পন্ন হওয়া এবং সুষ্ঠুভাবে চাষাবাদের সম্পর্কটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহাষষ্ঠীর সন্ধেবেলায় ভগবতী দেবী দুর্গা আর নবপত্রিকা যেন একাত্ম হয়ে ওঠেন ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে। গন্ধ-পুষ্প-মাল্য সহযোগে যে কোনও উপাচারেই পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে একাকার হয়ে ওঠে পুজোমন্ডপ। “ওনেন গন্ধেন ভগব্দ্দুর্গায়া নবপত্রিকায়াশ্চ শুভাধিবাসনমস্তু” আমরা নবপত্রিকার বাইরেটুকুনি দেখি শুধু। অবগুণ্ঠনা সজীব, সবুজ কলাগাছটি। একটি কলাগাছের একটি মোচা প্রায় শ’দুয়েক কলার জন্ম দেয়। আর বাংলার আবালবৃদ্ধবণিতা সেই কলার পুষ্টিতে পুষ্ট থাকে সারাটা বছর। তাই বুঝি নবপত্রিকার ন'টি উদ্ভিদের মধ্যে কদলীবৃক্ষটির জন্য যুগ যুগ ধরে এত দুর্বলতা।
প্রচলিত একটি ছড়ায় পাই যেখানে শিব তাঁর দুর্গাকে বলছেন,
“ও গণেশের মা,
কলাব‌উকে আমার দাগা দিও না।
ওর একটি মোচা ফললে পরে
কত হবে ছানাপোনা।”

এবার বলি মহাষষ্ঠীর বোধন কেন।
সীতাহরণের পর রামচন্দ্র বানরসেনাদের সাহায্যে সেতুবন্ধ করে লঙ্কায় হাজির হলেন। ব্রহ্মা তখন রামকে আদেশ করলেন অপরাজিতা দুর্গার পুজো করে জগতের উদ্ধারে নেমে পড়তে। সমগ্র রাক্ষসকুলকে ধ্বংস না করতে পারলে যে ধরিত্রীর নিস্তার নেই। তাই কৃষ্ণপক্ষেই নিদ্রিতা দেবীকে অকালে জাগ্রত করে, অকালে অর্থাৎ শরৎকালে (পূর্বে বসন্তকালে শুক্লপক্ষে দেবলোক জাগ্রত অবস্থায় পুজো হত), কাজে নেমে পড়েছিলেন রামচন্দ্র স্বয়ং। তাই তো অকালবোধন। ব্রহ্মার পরামর্শে দেবী দুর্গার দশভুজা মূর্তি মাটি দিয়ে গড়ে ব্রহ্মা স্বয়ং বিল্ববৃক্ষমূলে সিংহবাহিনী সেই দেবীর বোধন করেছিলেন। সেই দিনটিই ছিল শুক্লপক্ষের মহাষষ্ঠী।
রামচন্দ্র স্তব করলেনঃ
নমস্তে ত্রিজগদ্বন্দ্যে সংগ্রামে জয়দায়িনী
প্রসীদ বিজয়ং দেহি কাত্যায়নি নমোহস্তুতে।।

পূজা শুরু হল। পিতামহ ব্রহ্মা রামচন্দ্রের সঙ্গে বললেন, “হে দেবী! যতদিন না পর্যন্ত রাবণবধ হয়, রাক্ষসকুল ধ্বংস না হয়, আমাদের পূজা গ্রহণ করে তুষ্ট হোন।”
মিথিলার কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী গ্রন্থে ষষ্ঠীতে মায়ের বোধনের উল্লেখ আছেঃ
ষষ্ঠ্যাং বিল্বতরৌ বোধঃ সায়ংসন্ধ্যাসুকারয়েৎ।

বসন্তকালের দুর্গাপুজোয় বোধনের প্রয়োজন হয় না। কারণ, দেবতারা ঐ সময় জাগ্রত থাকেন। সমগ্র দেবকুলকে শরৎকালে জাগানোর উদ্দেশ্যেই এই বোধন। বোধনের অর্থ হল জাগরণ। কালিকাপুরাণে পাওয়া যায় এই বোধন নিয়ে,
“বোধয়েদ্বিল্ব্শাখায়াং ষষ্ঠ্যাং দেবীফুলেষু চ”

শুক্লাসপ্তমী থেকে মহানবমী অবধি বিশেষ পুজো চলতে লাগল। সপ্তমীর দিন দেবী স্বয়ং রামের ধনুঃশরে প্রবেশ করলেন। অষ্টমীতে রামের বাণে আশ্রয় নিলেন। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে দশানন রাবণের মস্তক পুনঃ পুনঃ ছেদন করলেন রামচন্দ্র।

তোমরা জান, সন্ধিপুজোর বিশেষত্ব কী?
দুর্গাপুজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ হল এই সন্ধিপুজো। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীতিথির শুরুর ২৪ মিনিট, এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দেবী দুর্গার পিছনদিক থেকে আক্রমণ করেছিল দুই ভয়ানক অসুর চন্ড ও মুন্ড। দেবী তখন এক অদ্ভূত রূপ ধারণ করেন। কেশরাজিকে মাথার ওপরে সুউচ্চ কবরীতে বেঁধে নিয়ে কপালে প্রজ্জ্বলিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি টিপ ও তিলক এঁকে, গলায় বিশাল মালা ধারণ করে, কানে সোনার কুন্ডল ও হলুদরঙা শাড়িতে নিজেকে সজ্জিত করেন। তাঁর রক্তচক্ষু, লাল জিহ্বা, নীলাভ মুখমন্ডল এবং ত্রিনয়ন থেকে অগ্নিবর্ষণ করতে থাকেন। ঢাল ও খড়্গ নিয়ে চন্ড ও মুন্ডকে বধ করেছিলেন দেবী এই সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে।
সন্ধিপূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ বলি দেন। কেউ সিঁদুরসিক্ত একমুঠো মাসকলাই বলি দেন। সবকিছুই প্রতীকী। সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা। রক্তবীজ অসুরকুল বিনষ্ট হয়। ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠে যুদ্ধজয়ের ভেরীর মতো। একশো আট প্রদীপের আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয় ভারতবর্ষের আনাচকানাচ। উত্তিষ্ঠত ভারতবাসীর জাগ্রত মননে দুষ্কৃতের বিনাশিনী এবং সাধুদের পরিত্রাণকারী মা দুর্গা কান্ডারী হয়ে প্রতিবছর অবতীর্ণ হন মর্ত্যলোকে।

নবমীর দিন সীতা উদ্ধার করলেন রাম। আর দশমীর দিন প্রাতে যুদ্ধে জয়লাভের পর দেবীমূর্তি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়ে বিসর্জনমন্ত্র পাঠ হল। সেদিন পালিত হল বিজয়া দশমীর বিজয়োত্সব। বিজয়ায় বিসর্জন দুর্গা মাকে ত্যাগ নয়, বিশেষ রূপে অর্জন। বিজয়া হল আসুরিক শক্তির ওপর দৈবশক্তির বিশেষ প্রভাব বিস্তারে জয়লাভ।

_____
স্তোত্র সমূহের তথ্যসূত্রঃ মহিষাসুরমর্দ্দিণি দুর্গা - স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ