বায়োস্কোপ:: সিনেমা: Tangled (2010) - রিভিউ: সোনাল দাস

সিনেমাঃ Tangled (2010)
সোনাল দাস

অভিনয়ে (কণ্ঠ) - Mandy Moore (রাপুনজেল), Zachary Levi (ফ্লিন রাইডার), Donna Murphy (মাদার গোথেল)
পরিবেশনায় - ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্স


কেমন আছ ম্যাজিক ল্যাম্পের বন্ধুরা? আশা করি সবাই খুব ভালো আছদেখতে দেখতেই এসে গেল নতুন বছর ২০১৭, আর এই নতুন বছরে ম্যাজিক ল্যাম্প তোমাদের জন্য নিয়ে এসেছে ‘রূপকথা স্পেশাল সংখ্যা’ তাই আজকে তোমাদের শোনাব ‘Tangled’ নামের একটা দুর্দান্ত রূপকথার ছবির গল্প।

ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্সের ৫০তম অ্যানিমেটেড ছবি হিসাবে ২০১০ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় Tangled জার্মান রূপকথার এক বিখ্যাত চরিত্র ‘রাপুনজেল’-এর কাহিনি অবলম্বনে ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্স তৈরি করেছে এই ফ্যান্টাসি-অ্যাডভেঞ্চার মুভিটি। মূল কাহিনিটি নেওয়া হয়েছে ‘The Brothers Grimm’ বা গ্রিমভাইদের সংগৃহীত লোককথা (folk tales) থেকে। এই গ্রিমভাইদের সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেব গল্পের শেষে। তাহলে চল শুরু করা যাক এবারের সিনেমার গল্প -

অনেক অনেক বছর আগে সূর্যের আলোর এক কণা এসে পড়েছিল পৃথিবীর মাটির বুকে যার থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এক সুন্দর সোনালি ফুলের। এই ফুলের এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। আর সেটা হল যে কোনও রোগ; চোট-আঘাত, এমনকি ক্ষয় বা বার্ধক্যও প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হত এই ফুলের সঠিক ব্যবহারে। মাদার গোথেল নামের এক স্বার্থপর দুষ্টু বুড়ি এই সোনালি ফুলের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা জানত। আর এই ফুল ব্যবহার করে সে প্রায় ১০০ বছর ধরে নিজের জীবন এবং যৌবন ধরে রেখেছিল।

দুষ্টু বুড়ি সোনালি ফুল ব্যবহারের আগে এবং পরে

কিন্তু একদিন এই রাজ্যের সেনারা এই জাদু-ফুলের সন্ধান পেয়ে যায় আর তারা সেটিকে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে নিয়ে যায় তাদের রাজার কাছে। এই রাজার রানির শারীরিক অবস্থা তখন খুব খারাপ ছিল এবং সে সন্তানসম্ভবাও ছিল তাই রাজা তার সৈন্যদের এই ফুল খুঁজে আনার আদেশ দিয়েছিলেন রানি এবং তার সন্তানকে বাঁচানোর উদ্যেশ্যে। এই ফুলের রস পান করে রানি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং জন্ম দেন ‘রাপুনজেল’ নামের এক ফুটফুটে সুন্দর রাজকন্যার।

ফুলের রস পান করার মুহূর্ত

রাজকন্যা জন্মানোর সাথে সাথে সারা রাজ্যে উৎসবের ধুম পড়ে যায়। রাজ্যের সকল প্রজারা প্রায় সাতদিন ধরে এই আনন্দ উদযাপন করল। রাজামশাই রাজকুমারী জন্মানোর আনন্দে একটি আলোক-প্রজ্বলিত ফানুস আকাশে উড়িয়ে দিলেন। নতুন রাজকন্যাকে নিয়ে খুব সুখেই তাদের দিন কাটতে লাগল। কিন্তু এই সুখ খুব বেশিদিন তাদের কপালে সইল না। মাদার গোথেল নামের সেই দুষ্টু বুড়িটা ঠিক খুঁজে বার করল শিশু রাপুনজেলকে। আর তাকে দেখেই সে বুঝতে পারল ওই ফুলের জাদু ক্ষমতা নিহিত রয়েছে রাপুনজেলের সোনালি চুলের মধ্যে। ব্যস, তাকে আর পায় কে। সেই রাতেই শিশু রাপুনজেলকে দোলনা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে সে তাকে লুকিয়ে ফেলল অত্যন্ত দুর্গম স্থানে অবস্থিত এক মিনারের (Tower) মধ্যে, যার খোঁজ সে ছাড়া আর কেউ জানত না।

রহস্যময় মিনার - যেখানে রাপুনজেলকে বন্দি রাখা হয়

রাজামশাই অনেক খুঁজেও রাজকন্যার সন্ধান পেলেন না আর সেই থেকে প্রতিবছর রাজকন্যার জন্মদিনের দিন একটি করে আলোক-প্রজ্বলিত ফানুস আকাশে ছাড়তে থাকেন এই আশা নিয়ে যদি কখনও সেটি দেখে তাদের রাজকুমারী ফিরে আসেন। রাজামশাইয়ের দেখাদেখি রাজ্যের প্রজারাও রাজকন্যার জন্মদিনের দিন একটি করে আলোক-প্রজ্বলিত ফানুস আকাশে ছাড়তে লাগল

রাপুনজেলের প্রথম জন্মদিনে ফানুস ছাড়ার মুহূর্তে

এদিকে মাদার গোথেল নামের সেই দুষ্টু বুড়িটা রাপুনজেলের জাদু-চুলের ব্যবহার করে আবার নিজের যৌবন ফিরে পায়, আর রাপুনজেলকে নিজের মেয়ের মতন মানুষ করতে থাকে। সে তাকে কখনও ওই মিনারের বাইরে বেরোতে দেয় না। রাপুনজেলকে বাইরে যেতে না দিলেও মাদার গোথেল নিজে বাইরে যেত খাবার সংগ্রহ করতে। আর মিনার থেকে নামার জন্য সে রাপুনজেলের লম্বা সোনালি চুলকে ব্যবহার করত। রাপুনজেল বাইরে যাবার জন্য খুব জেদ করলে তাকে বোঝাত বাইরের দুনিয়ার সব লোক খুব খারাপ, প্রচন্ড স্বার্থপর এবং হিংস্র। রাপুনজেলও সরল মনে তার পালিত মাকে বিশ্বাস করত আর ভাবত বাইরের দুনিয়াটা সত্যিই কেমন দেখতে

মাদার গোথেল আর রাপুনজেল

মিনারে বন্দি থাকা অবস্হায় রাপুনজেল লক্ষ করত প্রতিবছর তার জন্মদিনের দিন সারা আকাশ ভরে যেত আলোকময় ফানুসে। তার খুব জানতে ইচ্ছে করত এই ফানুসগুলি কোথা থেকে আসে কিন্তু মাদার গোথেল তাকে মিনারের বাইরে বেরোতে দিলে তো। তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কীই বা করার থাকে তার পক্ষে। এমনি করে রাপুনজেল যখন ১৮ বছরের হয়ে গেল তখন সে ঠিক করল যেভাবেই হোক সে এই আলোকময় ফানুসের উৎস জেনেই ছাড়বে। কিন্তু মাদার গোথেলকে এড়িয়ে সে কীভাবে মিনার ছেড়ে বেরোবে?

এই ফানুসগুলি আসে কোথা থেকে?

সুযোগটা একদিন এসে গেল একদম আকস্মিকভাবে। হয়েছে কী, ফ্লিন রাইডার নামের এক দাগী চোর রাজপ্রাসাদ থেকে রাজকন্যার হীরকখচিত মুকুট (crown) চুরি করে পালাতে গিয়ে ঘটনাচক্রে এসে পড়ে সেই দুর্গম স্থানে অবস্থিত মিনারের একদম সামনে। মিনারে প্রবেশ করার সাথেই সে বন্দি হয়ে যায় রাপুনজেলের হাতে - থুড়ি তার চুলের বাঁধনে। রাপুনজেল মুকুটটি হাতে পেলেও বুঝতে পারে না জিনিসটি ঠিক কী? শুধু এটুকু বুঝতে পারে যে ওই জিনিসটা হাতে পেলেই ফ্লিন রাইডার তাকে ছেড়ে চলে যাবে। রাপুনজেল মিনার ছেড়ে বেরোনোর একটা প্ল্যান বানায়। সে মাদার গোথেলকে এক জিনিস আনার বাহানায় তিনদিনের জন্য মিনার থেকে দূরে পাঠিয়ে দেয় আর ফ্লিন রাইডারকে বলে যদি সে তাকে ওই আলোকময় ফানুসের উৎসের কাছে নিয়ে যেতে পারে তাহলে ফেরার সময় তাকে তার মুকুট ফেরত দেবে। বেচারা ফ্লিনের মুকুট ফেরত পাবার জন্য এই শর্তে রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনও দ্বিতীয় পথ খোলা ছিল না

রাপুনজেলের চুলের বাঁধনে বন্দি ফ্লিন রাইডার

ফ্লিনকে সঙ্গী করে মিনার থেকে বেরিয়েই রাপুনজেল আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। জীবনে প্রথমবার সে বন্দিজীবন থেকে মুক্ত হয়ে বাইরের জগতে পা রেখেছে। ফলে কী করবে আর কী করবে না সেই আনন্দেই মশগুল হয়ে ওঠে। এরপর ফ্লিন তাকে নিয়ে এসে হাজির করে এক অদ্ভুত সরাইখানায়। সেখানে কিছুক্ষণ পরেই ফ্লিন রাইডারের সন্ধানে এসে হাজির হয় একদল সেনাবাহিনী; যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল ম্যাক্সিমাস (Maximus) নামের এক রাজকীয় ঘোড়া। রাপুনজেল ও ফ্লিন রাইডার সরাইখানা থেকে কৌশলে পালাতে সক্ষম হলেও সেনাবাহিনী, ম্যাক্সিমাস এবং দুজন মুকুট ছিনতাইকারী গুন্ডা তাদের পিছু নেয়। এরপর ঘটে এক ধুন্ধুমার কান্ড! এদের সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে তারা শেষমেশ পালাল সেটা মূল ছবিতে দেখে নিওসিনেমা দেখার সময় তোমরা এই অংশটা দারুন উপভোগ করবে। এই পালাতে গিয়েই ফ্লিন রাইডার রাপুনজেলের চুলের যাদু ক্ষমতা সম্বন্ধে জানতে পারে। আর প্রথমবার রাপুনজেলের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করে।

রাপুনজেলের চুলের জাদু

সেদিন বিকেলে তারা এসে হাজির হয় সেই রাজ্যে যেখানে প্রতিবছর রাজকন্যার জন্মদিন উপলক্ষে রাজা-রানি এবং দেশের সকল প্রজারা আলোকময় ফানুস ছাড়ে। রাপুনজেল প্রথমবার এই ফানুসছাড়ার উৎসস্থল দেখতে পেল এবং রাজ্যের সকলের সাথে কথা বলে এর কারণও জানতে পারল। পূর্ব-চুক্তি অনুসারে রাপুনজেল ফ্লিন রাইডারকে সেই হীরকখচিত মুকুট ফেরত দেয় কিন্তু তারপরই ঘটনাচক্রে ফ্লিন রাইডার তাকে ছেড়ে নৌকা করে চলে যায়। সাথে নিয়ে যায় সেই মুকুটটিও রাপুনজেলের অনেক ডাকাডাকিতেও সে সাড়া দেয় না, এমনকি ফিরেও তাকায় না তার দিকে। এসময় মাদার গোথেল এসে হাজির হয় রাপুনজেলের সামনে এবং তাকে বোঝায় কেন সে এতদিন এসব বাইরের জগতের মানুষের থেকে তাকে দূরে রাখত। রাপুনজেল সরল মনে মাদার গোথেলের কথা বিশ্বাস করে এবং তার সাথে আবার ফিরে আসে সেই মিনারে।

ফ্লিন রাইডারের সাথে রাপুনজেল - ফানুস উৎসবের দিন

মিনারে ফিরে এসে রাপুনজেল আবিষ্কার করে সেই এই রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া সেই রাজকন্যা এবং বুঝতে পারে মাদার গোথেল শুধুমাত্র তার চুলের জাদু-ক্ষমতা ভোগ করার জন্যেই তাকে এতদিন বন্দি করে রেখেছিল। ফ্লিন রাইডারকেও যে সে মনেপ্রাণে ভালোবাসে তাও সে অনুভব করে। কিন্তু এখন কীভাবে সে ফিরে পাবে ফ্লিন রাইডারকে, কীভাবে ফিরে পাবে তার আসল মা-বাবাকে? কীভাবে পালাবে এই মিনার ছেড়ে, মাদার গোথেলের হাত থেকে?

বাকিটা জানতে হলে অবশ্যই দেখে নিও অ্যানিমেটেড ছবি Tangled ইংরেজি মুভি চ্যানেলগুলোতে প্রায়ই দেখায় এই ছবিটিতাই একটু খেয়াল রাখলেই দেখে নিতে পারবে। এছাড়া নেটফ্লিক্স কিংবা যেকোনও মুভি (সিডি-ডিভিডি) বিক্রয়কেন্দ্রেই এই ছবিটি সহজেই পেয়ে যাবে।
আর দেখে তোমাদের কেমন লাগল তা জানিও আমাদের ম্যাজিক ল্যাম্পের পাতায়। নতুন বছরে সবাই খুব ভালো থেকো, সুস্থ থেকো।

The Brothers Grimm বা গ্রিমভাইদের কথা
জেকব লুডগার্ড কার্ল গ্রিম এবং উইলহেম কার্ল গ্রিম নামের এই দুই ভাইকেই বিশ্বসাহিত্যের জগৎ একনামে চেনে The Brothers Grimm বা গ্রিমভাই বলে। এদের দুজনেরই জন্ম হয় জার্মানির হানাউ শহরে। জেকব জন্মেছিলেন ৪ঠা জানুয়ারি, ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে এবং উইলহেম জন্মেছিলেন ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে। এই দুই ভাই ছিলেন রূপকথার গল্প বানাবার রাজা। বিভিন্ন জায়গা থেকে রূপকথা, লোককথা, নীতিকথা, উপকথার গল্প সংগ্রহ করে সেগুলিকে নিজেদের মতন করে লিখে রাখতেন, নতুনভাবে সাজাতেন। এদের লেখা সর্বকালের সেরা কিছু কাহিনির নাম হল - সিন্ডেরেলা (Cinderella), ব্যাঙ রাজকুমার (The Frog Prince), হ্যান্সেল এবং গ্রেটেল (Hansel and Gretel), রাপুনজেল (Rapunzel), রাম্পেলস্টিনকিন (Rumpelstiltskin), ঘুমন্ত রাজকুমারী (Sleeping Beauty) এবং স্নো-হোয়াইট (Snow White)
গ্রিমভাইদের রূপকথাগুলি বেশিরভাগই লেখা হয়েছিল ছোটদের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেগুলি সববয়সী মানুষদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বর্তমানে ১০০-র অধিক ভাষাতে গ্রিমভাইদের এই অমর রূপকথাগুলির অনুবাদ পাওয়া যায়। যদি কখনও হাতে পেয়ে যাও রূপকথার গল্পের এই আশ্চর্য গ্রন্থটি তাহলে অবশ্যই পড়ে নিও। বাংলাতে এর খুব সুন্দর একটি অনুবাদ তোমরা পাবে ‘এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি’ নামক প্রকাশনা থেকে। বইটির নাম ‘গ্রিমভাইদের রচনাবলি’ এবং বইটির অনুবাদ করেছেন কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।

এই ছবির কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা

১) এই ছবিটির নাম প্রথমে ‘রাপুনজেল’ রাখা হবে বলে স্থির করা হলেও ঘটনাচক্রে তা বদল হয়ে নাম হয় ‘Tangled কী কারণে ‘রাপুনজেল’ নাম বদল হয়ে ‘Tangled’ হয় সে রহস্য আজও অজানা।
২) Mandy Moore এবং Zachary Levi-র গাওয়া ‘I See the Light’ গানটি ৫৪তম Grammy Award-এ ভিসুয়াল মিডিয়ার জন্য লেখা সেরা গানের সম্মান পায়।
৩) Kristen Bell এবং Idina Menzel দুজনেই রাপুনজেল চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছিলেন। তিনবছর বাদে এদের দুজনকেই নির্বাচন করা হয় ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্সের ছবি Frozen (2013)-এর জন্য। যেখানে এদের নাম ছিল যথাক্রমে Anna এবং Elsa
৪) ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্সের ৫০তম অ্যানিমেটেড ছবি ‘Tangled
৫) ‘রাপুনজেল’ একমাত্র ডিজনি রাজকন্যা (Disney princess), যার চোখের রং সবুজ।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment