গল্পের ম্যাজিক:: কল্পবিজ্ঞানের গল্প:: অপারেশন ফ্রিডম - গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


অপারেশন ফ্রিডম
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

সিলভানে সন্ধ্যা নেমেছে।
আচ্ছা, এমন জোড়া চাঁদের পূর্ণিমা অন্য কোনও গ্রহে হয়?” মাথার উপর ডিমোস আর ফোবোসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে রান্তিমা
“বোকার মতো কথা বলিস কেন? চার্বাকের সতেরটা উপগ্রহ আছে তুই জানিস না? আমাদের পাশের সৌরজগতের পৃথুলারও অন্তত তেরটা উপগ্রহের খবর আমরা রাখি তারপর” সাইদ কথা শেষ করতে পারে না।
“বোকার মতো কথা তুই বলছিসচার্বাক, পৃথুলা এরা সব তো গ্যাস-দানব এদের উপগ্রহগুলো কি ডিমোস আর ফোবোসের মতো দেখায় নাকি?’’
সাইদ মনে মনে স্বীকার করে রান্তিমা ঠিকই বলেছে। গ্যাস-দানবদের আয়তনের তুলনায় তাদের উপগ্রহগুলো খুবই ছোটো, থাকেও অনেকদূরেতাদের বেলায় পূর্ণিমা অমাবস্যা বলার কোনও মানেই হয় না।
“মঙ্গলেরও তো দুটো উপগ্রহ তাদের নামেই তো আমাদের চাঁদ দুটোর নাম। অবশ্য তারাও অনেক ছোটো। পৃথিবীর চাঁদকে চোখে দেখিনি, ছবিতে দেখেছি। মনে হয় পৃথিবী থেকে চাঁদকে আমাদের ডিমোস বা ফোবোসের মতো বড়ো দেখায়। যদি আমাদের স্পেস প্রোগ্রাম বন্ধ না করে দিতে হত, তাহলে এতদিনে আশেপাশের সব তারাগুলো সম্পর্কে আরও অনেক খবর...” সাইদ আবার কথা শেষ করতে পারে না।
“আবার সেই একই কথা। তুই কি কোনোদিন ভুলতে পারবি না?”
সাইদ আকাশের দিকে তাকায়। ডিমোস আর ফোবোসের জ্যোৎস্নাতে আকাশ আজ ভেসে যাচ্ছে। আজ রাতে কোনও তারা দেখা যাবে না। বছরে তিনদিন দুটো চাঁদের পূর্ণিমা একসঙ্গে হয়। একমাত্র সেই দিনগুলোতেই  আকাশের দিকে তাকালে সাইদের বুকের ভেতরটা ব্যথা করে না। রান্তিমা ভুলে যেতে বলছে। কেমন করে ভুলবে সাইদ? সারাজীবনের সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত পরিশ্রম, সব এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে বলেই কি তাদের ভোলা যায়? বেদাসের সম্রাট জাবাজের স্পেস ডেস্ট্রয়ার যেদিন সিলভানের একটা অংশকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, কয়েক হাজার মানুষ খুন হয়েছিলকিন্তু মানুষ মারলেই কি শুধু তাকে খুন বলা হবে? মানুষের জীবন থেকে স্বপ্ন মুছে দেওয়াকে কী বলে সাইদ জানে না। শুধু জানে সেদিনই ক্ষত্রপের স্পেস অ্যাকাডেমির সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিবান ক্যাডেট সাইদের জীবনের সমস্ত স্বপ্ন মুছে গিয়েছিল। জাবাজের কঠোর নির্দেশে অ্যাকাডেমি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। সিলভানের পুরনো স্পেসপোর্ট ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন পোর্ট তৈরি হয়েছে এখন বেদাসের নতুন রাজধানী অ্যাক্রোপোলিসে সেটাই এখন ক্ষত্রপ গ্রহের একমাত্র স্পেসপোর্ট। সম্রাট জাবাজের নিজস্ব মহাকাশযান ছাড়া অন্য কিছুই সেখান থেকে আকাশে ওঠে না। মহাকাশের গ্রহ-তারা-নক্ষত্রমণ্ডলীতে অভিযানের স্বপ্ন আর মনে না রাখাই হয়তো ভালো। কিন্তু মন যে মানে না। সাইদ ম্লান হাসে।

“ভিতরে আসতে পারি?”
রান্তিমা আর সাইদ বাড়ির উঠোনে বসেছিল। দুজনেই অবাক হয়ে গেটের দিকে তাকায়। তাদের বাড়িতে বিশেষ কেউ আসে না। যমজ ভাইবোনের সংসার, আত্মীয় প্রায় কেউ নেই বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও কমতাছাড়া আগে থেকে মেসেজ না পাঠিয়ে কেউ কারোর বাড়িতে কখনও যায় নাকি?
“আসুন,” রান্তিমা বলে। আগন্তুক ভেতরে আসেন। সাইদ একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়।
“ধন্যবাদ। আমার সাইদের সঙ্গে একটু প্রয়োজন ছিল।”
“আপনাকে তো চিনতে পারছি না,” সাইদ বলে। ভদ্রলোক ওর থেকে বয়সে সামান্য বড়ো হবেন।
“আপনার সঙ্গে আগে আমার কখনও দেখা হয়নিআমার নাম আমতে। একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনার কাছে এসেছি। এই চিঠিটা পড়ুন।”
সাইদ অবাক হয়ে দেখে আমতে তার দিকে একটা খাম এগিয়ে দিচ্ছে। আজকের যুগে কাগজে লেখা চিঠি! কে তাকে মেসেজ না পাঠিয়ে কাগজে চিঠি লিখবে? আমতে সম্ভবত সাইদের মনের ভাব বুঝতে পারে। বলে, “চিঠি কি শুধু মেলেই যাবে? কথাগুলো পৌঁছোনো তো আসল ব্যাপার। কোনও একদিন আপনাকে একটা চিঠির গল্প বলব। এখন পড়ুন।”
কার কাছ থেকে চিঠিটা পেল খামটা হাতে নিয়ে সাইদ ভাবে। খামটা ছিঁড়ে ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করলনিচে সইটা দেখে একমুহূর্ত থমকে যায়। কম্যান্ডার স্টেসি! কম্যান্ডার স্টেসি, অনাথ সাইদকে যিনি একই সঙ্গে মায়ের স্নেহ আর শাসন দিয়ে স্পেস অ্যাকাডেমিতে আগলে রেখেছিলেন, যিনি সাইদকে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দিতেন যিনি শুধু সাইদ নয় সমস্ত ক্যাডেটকেই নিজের করে নিয়েছিলেনঅথচ অ্যাকাডেমি যেদিন বন্ধ করে দিতে হল সেদিন থেকে সাইদ তাঁর আর কোনও খবর পায়নিকম্যাণ্ডার স্টেসি তাকে চিঠি লিখেছেন! কেন? কেন এতদিনে একবারও সাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি? ফোন পাওয়া যায়নি, মেল ফেরত এসেছে।
আমতের কন্ঠস্বরে আবার নিজেকে ফিরে পেল সাইদ।
“বিষয়টা গোপনীয়। কাগজটা অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসেছে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুড়ে যাবে। পড়ে নিন।”
দ্রুত চোখ বোলায় সাইদ। বিশেষ কিছু লেখেননি স্টেসি। শুধু লিখেছেন আমতের প্রস্তাব শুনতে, তাকে বিশ্বাস করতে। আর সব শোনার পরে সিদ্ধান্ত যাই নিক না কেন, সমস্ত কথা গোপন রাখতে। প্রয়োজন মনে করলে শুধু রান্তিমার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে কিন্তু অন্য কারও সঙ্গে নয়। কোনও কথা না বলে চিঠিটা মাটিতে রাখল সাইদ দু’মিনিটের মধ্যে কাগজটাতে নিজে থেকে আগুন লেগে গেল।
রান্তিমা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল। সাইদ শুধু বলল, “কম্যান্ডার স্টেসির চিঠি।”
রান্তিমা আর কোনও কথা বলে না। স্টেসি সাইদের মনে কোন জায়গা অধিকার করে আছেন তা সে ভালোই জানেসাইদ বলে,  “বলুন আপনি।”
“আমার নাম আমতে, আগেই বলেছি। আমি কীভাবে এই ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছি সে কথার সঙ্গে আপনাকে যা বলতে এসেছি, তার কোনও সম্পর্ক নেই। শুধু একটা কথা বলতে পারি; আমি একজন মানুষকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করতাম তাঁরই একটা কাজ করতে গিয়ে আমি আরও কয়েকজন মানুষের সংস্পর্শে আসি যাঁরা সবাই ক্ষত্রপের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কম্যান্ডার স্টেসি তাঁদেরই একজন। তিনিই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন।”
মুহূর্তের বিরতি নেয় আমতে, “একটা অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি আপনার কাছে। কাজটাতে প্রাণের ভয় আছে যথেষ্ট। কিন্তু ক্ষত্রপের সমস্ত মানুষের কথা ভেবে আপনি যদি রাজি হন, তবে...” কথাটা শেষ করে না আমতে।
সাইদ অবাক হয়ে যায়। পাগল নয়তো লোকটা? কিন্তু কম্যান্ডার স্টেসি তো আর যাকে তাকে পাঠাবেন না। রান্তিমা কড়া গলায় বলে, “বিপজ্জনক কাজে সাইদ কেন অংশ নেবে? আপনি তো কিছুই ভেঙে বলছেন না।”
সবকিছু খুলে বলার মতো পরিস্থিতি এখন নেই। শুধু একটা কথাই বলতে পারি, কম্যান্ডার স্টেসি একটা মহাকাশযানের ক্রু খুঁজছেন। আপনারা জানেন সম্রাট জাবাজের আদেশে সমস্তরকম মহাকাশযাত্রা এখন বন্ধ। তাই প্রাণের ভয় তো আছেই। কম্যান্ডার শুধু জানতে চেয়েছেন সাইদ অংশ নিতে রাজি কি না।
রান্তিমা কড়া গলায় বলতে চেয়েছিল, এরকম পাগলের মতো প্রস্তাবে রাজি হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা আটকে গেল। সাইদের চোখ থেকে অবিরল জলের ধারা নেমে এসেছে।

*

অ্যাক্রোপোলিসে বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছেলিস্টিল উল্টোদিকের বাড়িটার দিকে দেখে না, জানলাটা এখনও ফাঁকা। লিস্টিলের দোকানে এখন বিশেষ খরিদ্দার নেই। এমনি গোটা বেদাসের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে। পেটে খাবার না থাকলে কে আর বই কিনতে চায়? তার উপর জাবাজের, না না, লিস্টিল সংশোধন করে নেয়, মনে মনে ভাবলেও সে কথা কখন মুখে চলে আসবে... বেদাসের একাধিপতি মহামান্য সম্রাট জাবাজের শাসনে বই জিনিসটাকে খুব সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অন্য কোনও উপায় থাকলে  লিস্টিল এই বুকফিল্মের দোকানটা অন্তত কিনত না। কিন্তু ছ’মাস আগে যখন নির্দেশ এল ঐ বিশেষ বাড়িটার উল্টোদিকে একটা জায়গা তাকে খুঁজে নিতে হবে তখন এই বিশেষ দোকানটা ছাড়া অন্যকিছুই লিস্টিল জোগাড় করতে পারেনি তারপর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে দোকান খুলে উল্টোদিকের বাড়িটার জানালায় নজর রাখে। বাড়িটাতে কী আছে কেউই জানে না তবে সামনে বেদাসের পুলিশ সারাক্ষণ পাহারা দেয়।
নিঃশ্বাস ফেলে লিস্টিল উঠে দাঁড়ায়। আরও একটা দিন তাকে বেদাসের রাজধানীতে কাটাতে হবে। প্রথম প্রথম ভেবেছিল তাড়াতাড়িই মুক্তি পাবে, ফিরে যেতে পারবে নিজের বাড়ি। কিন্তু দেখতে দেখতে প্রায় ছ’মাস হয়ে গেল। দোকান বন্ধের আগে শেষবারের মতো চোখ তুলে তাকাল।
জানালায় একটা ফুলগাছের টব এর মধ্যে কেউ রেখে গেছে। টবে ফুটে আছে, লিস্টিল দু’বার গুনে দেখল, তিনটে গোলাপ। এবার তাহলে লিস্টিলের ছুটি খালি তার আগে ফুলের সংখ্যাটা জানিয়ে দিতে হবে ঠিক জায়গায়।

*

“বেদাস থেকে খবর এসেছে। তিন নম্বর অপশন
তিন নম্বর। সাইদ মনে মনে হিসেব করে নেয়। আর দশদিন বাকি। তারপরেই...
প্রায় সাতমাস হল সাইদ এই গোপন আশ্রয়ে এসেছে। রান্তিমা তাকে ছাড়তে চায়নিছোটোবেলায় বাবা-মাকে হারানোর পরে অনাথ আশ্রমে দুজনে দুজনকে আঁকড়ে বড়ো হয়েছে। আলাদা আলাদা কেরিয়ার বেছে নিয়েছিল তারা। সাইদ গিয়েছিল স্পেস অ্যাকাডেমিতে রান্তিমা বেছে নিয়েছিল লেখাপড়া। অ্যাকাডেমি বন্ধ হওয়ার পরে সাইদের জগৎ যখন তার চারপাশে ভেঙে পড়েছিল তখন তার বোনই তাকে শক্তি যুগিয়েছে। তাই সাইদের এই বিপদের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়া সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। বার বার বলেছে, “কিন্তু তোর যাওয়ার দরকার কী? তোকেই কেন দরকার? কী পরিকল্পনা করা হচ্ছে আমতে তার কিছুই তো বলল না। সত্যি যদি আবার কোনোদিন ক্ষত্রপ মহাকাশ অভিযান শুরু করে তখন না হয় অংশ নিবি। শুনেছিস তো বিপদের কতখানি সম্ভাবনা। তুই না থাকলে আমি কী নিয়ে বাঁচব?”
সাইদ নাছোড়বান্দা তার জীবনের স্বপ্ন সফল হওয়ার একটা সুযোগ এসেছে।
“তুই ভালোই জানিস, জাবাজ যতদিন শাসন করবে ততদিন স্পেস আমাদের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। তাই বেদাসকে পরাজিত করতেই হবে। সবাই যদি অন্য কেউ করে দেবে মনে করে বসে থাকে তাহলে কোনোদিনই কাজটা হবে না। আর আমতে সব খুলে বলবে কেমন করে? প্ল্যানটাকে গোপন কেন রাখতে হবে সেটা কি আলাদা করে বলে দিতে হবে?
“কিন্তু এখনই কেন?” রান্তিমা কাতর হয়ে প্রশ্ন করে, “কয়েকটা বছর অপেক্ষা করলে হয়তো পৃথিবী থেকে সাহায্য আসতে পারে। পৃথিবী বা তার কাছের তারা থেকে কোনও দূতই কি আসবে না?”
“অনেকদিন তো হয়ে গেল পৃথিবীতে খবর পাঠানোর কোনও উপায়ই কেউ বার করতে পারেনি। তাছাড়া তুই তো আমার থেকেও ভালো জানিস, পৃথিবী অন্য কোনও গ্রহের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সাধারণত হাত পোড়াতে চায় না। তাই তার সাহায্য আদৌ পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে তার উপর দূরে সরে থাকার দিনও শেষ হয়ে এসেছে। বেদাসের প্রায় ভেঙে পড়া অর্থনীতি থেকে প্রজাদের নজর ঘোরাতে হলে আবার সিলভান আক্রমণ ছাড়া জাবাজের অন্য কোনও রাস্তা নেই।
বারবার একই আলোচনা। শেষপর্যন্ত রান্তিমা মেনে নিয়েছে বুঝেছে এই সুযোগ চলে গেলে সাইদ আর বেঁচে থাকার কোনও অর্থ খুঁজে পাবে না। আমতের দেওয়া নম্বরে ফোন করেছিল সাইদ। ফোন কেউ ধরেনিকিন্তু তারপরেই একটা মেসেজে তাকে তৈরি হয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে বলা হয়।
রান্তিমার থেকে বিদায় নিয়েছিল সাইদ। ব্যাগ নিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির দরজা খুলেছিল আমতে, “উঠে এস
সাইদ আমতের পাশে বসেছিল। দরজা বন্ধ করে সাইদকে অবাক করে দিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করল আমতে। জীবনে প্রথম কোনও মানুষকে গাড়ি চালাতে দেখেছিল সাইদ। আমতে তার বিস্ময় টের পেয়েছিল। বলেছিল, “অটোপাইলট চালালে গাড়ির কম্পিউটারে রেকর্ড থেকে যাবে তার থেকে আমরা কোথায় যাচ্ছি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়আমরা কোথায় যাচ্ছি তা কাউকে জানতে দিতে পারি না। আমাকে গাড়ি চালানো শিখতে হয়েছে। কম্পিউটারের উপর নির্ভর না করে মানুষের উপর ভরসা করলে ঝুঁকি অনেক কম। আরও অনেকরকম সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে নিজেই বুঝতে পারবে সাইদ।
তা সাইদ সত্যিই বুঝতে পেরেছিল। সেই শুরু। গাড়িটা এক জায়গায় রেখে দুজনকে পায়ে হেঁটে বেশ কিছুটা যেতে হয়েছিল। তারপর অন্য একটা গাড়ি। রাত্রি কাটিয়েছিল এক হোটেলে। সকালে সাইদ আমতের আগেই তৈরি হয়ে নেমে এসেছিল। কিন্তু তাদের গাড়িটা কোথায়?
আমতে এসে সাইদের হতবুদ্ধি অবস্থা দেখে হেসে ফেলেছিল। বলেছিল, “আমাদের গাড়ি আজ আলাদা মুহূর্তমাত্র ইতস্তত না করে অন্য একটা গাড়ির দরজা খুলে ফেলেছিল। “কালকের গাড়িটা আবার সিলভানে ফিরে গেছে। অটোপাইলট ব্যবহার করা যাচ্ছে না, কোনও একজনকে এসে নিয়ে যেতে হয়েছে। যেমন অন্য আরেকজন এই গাড়িটা আমাদের জন্য রেখে গেছে। সাইদের নিজেকে ভীষণ বোকা মনে হয়েছিল।
আরও দু’দিন এভাবে বারবার গাড়ি পাল্টেছিল তারা। ইতিমধ্যে সাইদ অনেকবার আমতেকে জিজ্ঞাসা করেছে কম্যান্ডার স্টেসি তাকে ডেকেছেন কেন। আমতের একটাই উত্তর। সে এ বিষয়ে কিছুই জানে না তাকে বলা হয়েছিল সাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সাইদ তার প্রস্তাবে রাজি হলে তাকে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও তার। আমতে সত্যিই জানে না, নাকি জেনেও এড়িয়ে যাচ্ছে তা সাইদ বুঝতে পারেনি
আমতের সম্পর্কেও সাইদ সামান্য কথাই জানতে পেরেছিল। কথায় কথায় সে সাইদকে বলেছিল, সে একজন পেশাদার বিজ্ঞানী তার গবেষণার বিষয় জেনেটিক্স সিলভানেই তার ল্যাবরেটরি। কেমন করে একজন জেনেটিসিস্ট এ সমস্ত ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছে সে প্রশ্নের জবাবে আমতে শুধু বলেছিল, “সে গল্পটা বড়ো এবং গোপন। তোমাকে একটা অদ্ভুত চিঠির গল্প বলব বলেছি, এটা তারই একটা অংশ। পরে একদিন বলব।
তিনদিন পরে বিকেলবেলা গাড়ি থামিয়ে আমতে বলেছিল, “এসে গেছি।
সাইদ অবাক হয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। স্পেশশিপ কোথায়, স্পেসপোর্ট কোথায়? এ তো একটা পুরনো কারখানার শেড। দেয়াল দিয়ে ঘেরা দরজাটা বিরাট, বড়ো বড়ো ট্রাক ঢুকে যেতে পারে তার খানিকটা ভেঙে ঝুলছে। বহুদিন কেউ এখানে ঢুকেছে বলে মনে হয় না। আমতে গাড়িটাকে আবার স্টার্ট করে ভাঙা দরজা দিয়েই ভেতরে ঢুকে সাবধানে এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছিল স্টার্ট বন্ধ করে বলেছিল, “সাইদ, তোমাকে পৌঁছে দিয়েছি, এবার আমার দায়িত্ব শেষ।
সাইদ সবে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল, কোথায় তাকে পৌঁছে দিল আমতে। এমন সময় হঠাৎ দেখল তাদের গাড়িটা মাটির তলায় ঢুকে যাচ্ছে তার মানে আমতে গাড়িটাকে একটা লিফটের উপর দাঁড় করিয়েছে। নিচে, নিচে, আরও অনেক নিচে। অবশেষে লিফটটা দাঁড়াল। শুধু উপর থেকে সূর্যের আলোতে যতটুকু দেখা যাচ্ছে। আমতে গাড়িটাকে সামান্য এগোল। লিফটটা আবার উপরে উঠতে শুরু করল। তারপরেই একটা আলো জ্বলে উঠেছিলআমতে একটু ইয়ার্কির সুরেই বলেছিল, “অপারেশন ফ্রিডমের মূল ঘাঁটিতে তোমাকে স্বাগত জানাই সাইদ।”
সাইদ অবশ্য তখন সেদিকে মন দিতে পারেনি। তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কম্যান্ডার স্টেসি। শুধু বলেছিলেন, “সাইদ, আমি জানতাম তুমি আসবে।
সেই শুরু তারপর সাতমাস যেন ঝড়ের গতিতে কেটে গেল। মাটির তলায় ঘাঁটি বানানো ছাড়া উপায় নেই সমস্ত স্যাটেলাইটের ক্যামেরার ছবি বেদাসে যায়। জাবাজের সঙ্গে লড়াই করতে হবে কিন্তু কেমন করে? আইনস্টাইন ইন্টারস্টেলার ড্রাইভ আছে এমন সমস্ত মহাকাশযান বেদাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছেক্ষত্রপের মাটিতে বসে নতুন ইন্টারস্টেলার ড্রাইভ তৈরির প্রশ্নই ওঠে না কোনও গ্রহেই তা সম্ভব নয়। আইনস্টাইন ড্রাইভ একমাত্র শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র থেকে দূরে মহাকাশে কোনও জায়গায় বানানো সম্ভব। জাবাজের শাসনে ক্ষত্রপের একমাত্র স্পেসপোর্ট নাগালের বাইরেযতদিন পর্যন্ত স্পেস-ডেস্ট্রয়ারটা জাবাজের হাতে থাকবে ততদিন লড়াই করার কোনও উপায়ই প্রায় নেই। মহাকাশযুদ্ধে অংশ নেওয়ার মতো কোনও যান ক্ষত্রপে কোনওদিন ছিলই না।
এ সমস্ত কথা জানার পরেও অপারেশন ফ্রিডম একটা পুরনো মালবাহী মহাকাশযান নিয়েই লড়াই করতে নেমেছে। জাবাজের আক্রমণের সময় এই রকেটটা স্পেসপোর্টে ছিল না - গ্রহাণুপুঞ্জ থেকে খনিজ পদার্থ নিয়ে ক্ষত্রপে আসছিল। এর ক্যাপটেন সাশা বিপদটা বুঝতে পেরে তাঁর পুরনো বন্ধু কম্যান্ডার স্টেসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। স্টেসিই তাঁকে বহুদিন আগে বাতিল হয়ে যাওয়া এই ঘাঁটিটার সন্ধান দেন। মহাকাশযান নামার পরেই সেটাকে ঐ কারখানার শেডের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। জাবাজের স্পেস-ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে যাতে সে লড়াই করতে পারে তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। সাইদের উপর দায়িত্ব ছিল বাইরের হিট শিল্ডের। লেজার রশ্মি আটকানোর জন্য সাধারণ রকেটে যেরকম শিল্ড থাকে, তার থেকে অনেক ভারী শিল্ড লাগানো হয়েছেমালবাহী যানের রকেট ইঞ্জিন অনেকটাই শক্তিশালী হয় তাই খুব ভারী শিল্ডের ওজনও আকাশে তুলতে পারবে। কিন্তু একবার ডেস্ট্রয়ারের নিউক্লিয়ার টর্পেডোর আওতায় এলে  কেমন করে তারা রক্ষা পাবে তা সাইদ জানে না। স্পেস-ডেস্ট্রয়ারে ইন্টারস্টেলার ড্রাইভ আছে তাই পালিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। প্রথম যুগের ড্রাইভগুলো কোথায় পৌঁছে দিত তা আগে থেকে বলা শক্ত ছিল এমনকি কয়েক হাজার আলোকবর্ষ গণ্ডগোল হওয়াও বিচিত্র ছিল না। ক্ষত্রপের কলোনি-শিপে এরকম একটা ড্রাইভ ছিল তার উপর প্রায় কোনও নিয়ন্ত্রণই ছিল না। সে কারণেই পৃথিবী থেকে এত দূরে কলোনিটা তৈরি হয়েছিলকিন্তু আইনস্টাইন ড্রাইভের আধুনিক মডেল প্রায় ম্যাজিকের মতো কাজ করেখুব ছোটো, এমনকি মাত্র এক লক্ষ কিলোমিটারের জাম্পও তার কাছে খুব সহজ।

এত পরিশ্রমের পরে আসল দিনটা আসছে। সাইদ বুঝতে পারছে না এতে খুশি হবে নাকি ভয় পাবে একদিকে মহাকাশে প্রথম পা দেওয়ার উত্তেজনা অন্যদিকে স্পেস-ডেস্ট্রয়ারের আতঙ্ক। স্টেসি যখন সবাইকে ডাকলেন তখনও পর্যন্ত সাইদ মনস্থির করতে পারছিল না।
স্টেসি বললেন, “দশদিন পরে আমরা আমাদের অপারেশন শুরু করবআমাদের এখানে সকাল, অ্যাক্রোপলিসে ভোর তখন লিফট অফ। কারণ, ভোরবেলা মানুষের তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার, কাজ করার ক্ষমতা সবচেয়ে কম থাকেআপনারা সবাই জানেন আমরা এক সাংঘাতিক ঝুঁকি নিতে যাচ্ছি। তাই শুধু স্বেচ্ছায় রাজি এমন ক্রুদেরই আমি চাইযাঁরা যেতে চান তাঁরা পাশের ঘরে গিয়ে দাঁড়ান।”
প্রথমেই যারা পাশের ঘরে গিয়েছিল তাদের মধ্যে নিজেকে দেখে সাইদ নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিল।

*

স্পেস-ডেস্ট্রয়ারের চাবিকাঠি জাবাজ অন্য কারও হাতে ছাড়েনি। ওটাই তার ক্ষমতার উৎস তাই ডেস্ট্রয়ারের সমস্ত অ্যাকসেস কোড তার মাথার মধ্যেই রেখে দিয়েছে। জাবাজের অনুমতি ছাড়া ডেস্ট্রয়ারে কেউ ঢুকতে পারে না। হঠাৎ কোনও দরকার হলে অবশ্য সেটাকে চালু করতে একটু সময় লাগবে কিন্তু তা নিয়ে জাবাজ চিন্তা করে নাএই ক্ষত্রপ গ্রহের সামরিক শক্তি নেই বলেই চলে তার বিরোধিতা কে করবে?
জাবাজ মহাকাশদস্যু, দীর্ঘদিন পৃথিবীর কাছের কলোনিগুলোর আশেপাশে সে দস্যুবৃত্তি চালিয়েছিল। কিন্তু সেখানে ঝুঁকি খুব বেশি কারণ, পুলিশ সেখানে খুবই সক্রিয়তারপর একদিন তার ভাগ্য খুলে গেল। বহু শতাব্দি হল মহাকাশে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাই পুরনো স্পেস-ডেস্ট্রয়ারগুলো অন্য কাজে ব্যবহার হয়। জাবাজ খবর পেয়েছিল এরকমই একটা ডেস্ট্রয়ার কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে পৃথিবী থেকে ভেগা যাবেএই বিজ্ঞানীরা সবাই মহাকাশযান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। জাবাজের এক অনুচর ঐ ডেস্ট্রয়ারে কর্মীর কাজ নেয়। তারপর সময় বুঝে কন্ট্রোল রুমে একটা বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে ক্যাপটেনসহ সমস্ত অফিসারকে মেরে ফেলা খুব সহজ কাজ। জাবাজ সেই ডেস্ট্রয়ারের দখল নেয়। বিজ্ঞানীদের চাপ দিয়ে বাতিল করা অস্ত্রগুলো আবার চালু করায়। প্রথমে অবশ্য তারা জাবাজকে সাহায্য করতে চায়নি কিন্তু ঠিকঠাক ওষুধ জানলে সবই করানো যায়।
ডেস্ট্রয়ার দখলের অনেক আগে থেকেই জাবাজ ক্ষত্রপ সম্পর্কে খবর নিচ্ছিলপৃথিবী থেকে চল্লিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে এই গ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর বা অন্যান্য কলোনিগুলোর যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলেশান্তিপূর্ণ গ্রহ, একটা মাত্র ডেস্ট্রয়ারের মোকাবিলা করার ক্ষমতাও তার নেই। রেডিওতে সাহায্য চাইতে গেলে সেই বার্তা পৌঁছোতে চল্লিশ হাজার বছর লাগবে। শুধু দেখতে হবে কোনও ইন্টারস্টেলার ড্রাইভ যেন তার শত্রুদের হাতে না থাকে তাহলে কোনোভাবেই তারা অন্য কারও থেকে সাহায্য চাইতে পারবে না। ডেস্ট্রয়ারটা তার হাতে ক্ষত্রপ জয়ের চাবিকাঠিটা তুলে দিয়েছিল। প্রথমে একটা বেস তৈরি, তারপর অতর্কিত আক্রমণে স্পেসপোর্ট দখল এবং সবশেষে একটা নগরের অর্ধেক অংশকে ধ্বংস করে তার ক্ষমতার পরিচয় – সব কিছুই একেবারে তার পরিকল্পনা মাফিক ঠিকঠাক চলেছে।
ক্ষত্রপের লোকগুলোও বোধহয় বুঝতে পেরেছে যে সম্রাট জাবাজের বিরোধিতা করা অর্থহীন তাই আস্তে আস্তে তারা নিজে থেকেই তার পক্ষে যোগ দিচ্ছে। একজন বড়ো বিজ্ঞানী, হেরন না ওইরকম কী যেন নাম, সে তো বেশ কিছুদিন আগেই অ্যাক্রোপোলিসে তার গবেষণাগার সরিয়ে এনেছে। এখনও অবশ্য নতুন কিছু তার থেকে পাওয়া যায়নি কিন্তু তা শুধু সময়ের অপেক্ষা। কেমন করে কাজ আদায় করতে হয় সম্রাট জাবাজ তা ভালোই জানে।

ভোরবেলা। কাল রাত্রের নেশা তখনও ভালো করে কাটেনি এমন সময় জাবাজের ফোনটা বেজে উঠল। হাত বাড়িয়ে তুলে নিল জাবাজ। জড়ানো কণ্ঠে বলল, “কী হয়েছে? কে এমন সময়ে বিরক্ত করছ?”
“মহামান্য সম্রাট, আমি বামাস।”
বামাস হল বেদাসের সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান।
“স্যাটেলাইটের ছবি থেকে দেখলাম অ্যাক্রোপলিস থেকে ছ’হাজার কিলোমিটার পূর্বদিকে একটা মহাকাশযান একটু আগে ক্ষত্রপ থেকে লিফট অফ করেছে। ফটো থেকে মনে হচ্ছে এটা একটা মালবাহী যান।”
“স্যাটেলাইট থেকে লেজার দিয়ে ওটাকে উড়িয়ে দাও।”
এই লেজারগুলো জাবাজ আসার আগে থেকেই ক্ষত্রপে ছিল কোনও বড়ো উল্কা যদি গ্রহের উপর এসে পড়ার আশঙ্কা থাকত, তাহলে লেজার দিয়ে তাকে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হত। সেটাকেই মহাকাশযানের উপর ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
“সে চেষ্টা করেছি, কিন্তু লাভ হয়নিওদের শিল্ড মনে হয় খুব ভারী। তাছাড়া উল্কারা তো রকেটের মতো লেজারকে এড়ানোর চেষ্টা করতে পারে না তাই স্যাটেলাইট লেজারগুলোর টার্গেট ট্র্যাক করার ক্ষমতা খুব একটা ভালো নয়।  যানটা এখন লেজারের নাগালের বাইরে চলে গেছে
জাবাজের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে গেল, “ঠিক আছে, আমি আসছি ডেস্ট্রয়ারে। আজ যাদের ডিউটি আছে তাদের স্পেসপোর্টে পাঠাও। বিজ্ঞানীদের মধ্যে আজ কে আছে?”
জাবাজ যখনই ডেস্ট্রয়ারে ওঠে কোনও না কোনও বিজ্ঞানীকে ডিউটিতে থাকতে হয়। প্রথমত, জাবাজের লোকজন জটিল যন্ত্রপাতি বিষয়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ। দ্বিতীয়ত, জাবাজ মনে করে যে একজন বিজ্ঞানী অন্তত তার সঙ্গে থাকলে অন্যরা সাবোটেজ করার সাহস পাবে না।
“ডক্টর হারাইন।”
“হারাইন, সে জেনেটিসিস্ট না?”
“হ্যাঁ, কিন্তু কম্পিউটার চালানোর ব্যাপারে ওস্তাদ। তাছাড়া ও অন্যদের থেকে ডেস্ট্রয়ারটার ব্যাপারে অনেককিছু শিখে নিয়েছে। যে কারও ব্যাক-আপ হিসাবে কাজ করতে পারে।”
“ঠিক আছে। সবকিছু রেডি করো, আমি আসছি।”
ঠিক নামটা এবার মনে পড়েছে জাবাজের হারাইন। নিজে থেকেই যে জাবাজের পক্ষে যোগ দিয়েছিল, এই সেই লোক

*

ক্ষত্রপের স্বাধীনতাপ্রিয় অধিবাসীদের আশা যে মহাকাশযানের উপর, স্বাভাবিকভাবেই তার নতুন করে নামকরণ হয়েছে প্রত্যাশা
সাইদের এইমুহূর্তে কোনও ডিউটি নেই। একটু আগে যখন স্যাটেলাইট লেজার হিট-শিল্ডের উপর পড়েছিল তখন কম্যান্ডার স্টেসি প্রত্যাশাকে আস্তে আস্তে পাক খাওয়াচ্ছিলেন যাতে করে লেজার বিমটা একই স্পটে না পড়ে। হিট-শিল্ডের উপর এভাবে চাপ কমানোটা সাইদেরই মাথা থেকে বেরিয়েছিল। তবুও যদি কোনও সেরামিক টালি পুড়ে যায় তাহলে সেটাকে সঙ্গে সঙ্গে পালটাতে হবে। সেজন্য আগে থেকেই তৈরি হয়ে সাইদ প্রত্যাশার এয়ার লকে বসে ছিল। প্রত্যাশা লেজারের পাল্লার বাইরে আসার পরে সে কন্ট্রোল রুমে ফিরে এসেছে।
অধিকাংশ ক্রুর ডিউটি শিপের অন্যান্য জায়গায়। কন্ট্রোল রুমে যে কজন ছিল সকলেরই চোখ রাডারের পর্দায়। সবাই জানে স্পেস-ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শুধু সময়ের অপেক্ষা।
নীরবতা ভেঙে কোনও একজন, সাইদের মনে হল নেভিগেটর ডেরিয়া, প্রশ্ন করে, “জাবাজ যদি ডেস্ট্রয়ারটাকে না পাঠায়? তাহলে আমরা কী করব? অ্যাক্রোপোলিসে জাবাজের প্রাসাদে বোমা ফেলতে গেলে তো শহরেও অনেক লোক মারা যাবে? তাদের মধ্যে অধিকাংশই নিরপরাধ।”
বোমা বা মিসাইলজাতীয় কিছু মালবাহী রকেটে ছিল নাকিন্তু গ্রহাণুপুঞ্জে মাইনিংয়ের জন্য যে বিস্ফোরক লাগে সেরকম বিস্ফোরক ছিল অনেকগুলোআরও কিছু জোগাড় করা হয়েছেকতগুলোকে দিয়ে স্পেস-মাইন বানানো হয়েছে। অ্যাক্টিভেট করার পর মাইনগুলো যদি কোনও মহাকাশযানকে কাছে পায় তাহলে ফেটে যাবেআর কয়েকটাকে খুব সরল প্রপালশন ও গাইডিং সিস্টেম দিয়ে মিসাইল বানানো হয়েছে। মাটিতে স্থির লক্ষ্যবস্তুর উপর সেগুলো কার্যকরী হবেকিন্তু এ সবই খুবই প্রাথমিক স্তরের স্পেস-ডেস্ট্রয়ারের বিরুদ্ধে সেগুলো কোনও কাজে লাগবে বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও কম্যান্ডার স্টেসির নির্দেশে এগুলো তৈরি করা হয়েছে।
স্টেসি ক্যাপটেনের চেয়ারটা ঘুরিয়ে বসলেন, “জাবাজের মনস্তত্ত্ব তোমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রথমত, ও নিজে এই অবস্থায় পড়লে বোমা ফেলত সাধারণ মানুষের জীবনের দাম ওর কাছে নেই। তাই ও মনে করবে আমরাও একই কাজ করব। দ্বিতীয়ত, আমাদের আইনস্টাইন ড্রাইভ আছে কি নেই সে নিয়ে ও নিশ্চিত নয়। ইন্টারস্টেলার ড্রাইভ থাকলে আমরা এই সৌরজগত ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারি, পৃথিবীর কাছে গিয়ে সাহায্য চাইতে পারি তাই আমাদের পিছু নেওয়া ওর দরকার
“কিন্তু একবার ইন্টারস্টেলার জাম্পের পর কি আর কারোর পিছু নেওয়া সম্ভব?” ডেরিয়া জিজ্ঞাসা করে।
“সাধারণভাবে সম্ভব নয় কারণ, ওয়ার্ম হোলের অন্যপ্রান্তটা কোথায় আছে সেটা বিশ্লেষণ করতে অনেক সময় লাগে। তাই জাবাজ জাম্পের আগে যেকোনওভাবে আমাদের ধ্বংস করতে চাইবে। ওর একটা সুবিধা আছে। ক্ষত্রপে আমরা যে ড্রাইভ ব্যবহার করতাম সেটা সেই পুরনোটারই রকমফের, যেটার সাহায্যে আমাদের পূর্বসুরীরা এই গ্রহে এসেছিল। তার থেকে জাবাজেরটা অনেক আধুনিকসত্যিই যদি আমাদের কাছে পুরনো আইনস্টাইন ড্রাইভ থাকত তাহলেও আমরা ক্ষত্রপের এত কাছে সেটা চালু করতে পারতাম না। আমাদের ড্রাইভগুলোর জন্য যতটা সম্ভব মাধ্যাকর্ষণমুক্ত অঞ্চল দরকার হয়আমি জানি, জাবাজের ডেস্ট্রয়ারটার ড্রাইভ অনেক অনেক বেশি উন্নত সেটা গ্রহের অনেক কাছেই চালু করা যায়। তাই আমরা জাম্পের মতো জায়গায় পৌঁছোনোর আগেই ও আমাদেরকে ধরে নেবে।”
আইনস্টাইন ড্রাইভ কেমন করে কাজ করে সাইদ অ্যাকাডেমিতে শিখেছিল। মহাকাশযানের গ্রাভিটি ফিল্ড জেনারেটর ব্যবহার করে ওয়ার্ম হোল তৈরি করা হয়। ওয়ার্ম হোল মহাবিশ্বের সাধারণ স্থান-কালের বাইরে আলোর বেগের সীমা তার ভেতর প্রযোজ্য নয়। তাই বাইরে দিয়ে ওয়ার্ম হোলের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেতে আলো যত সময় নেয়, মহাকাশযান হোলের ভেতর দিয়ে তার চেয়ে অনেক কম সময়ে পৌঁছে যাবেফিল্ড জেনারেটরটা যত নিখুঁত হবে ওয়ার্ম হোলের অন্যপ্রান্তের অবস্থানটা তত নির্ভুল হবে।
কম্যান্ডার স্টেসি নিশ্চিতভাবে বলছেন যে ডেস্ট্রয়ারটা ওদের পিছু নেবেঅথচ তার মোকাবিলায় তাদের হাতিয়ার শুধু কিছু স্পেস-মাইন আর জোড়াতালি দিয়ে বানানো কিছু মিসাইল। এই অসম লড়াইয়ে তারা কিছুতেই পেরে উঠবে না। সাইদ যতবার এই কথাটা তুলেছে ততবারই কম্যান্ডার তাকে থামিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, “আমাদের একটা গোপন অস্ত্র আছে। কিন্তু সেটা একবারই প্রয়োগ করা যাবে। তার কথা একবার বেরিয়ে গেলে সেটার মোকাবিলা করা খুব সহজ কাজ
কিন্তু কোথায় সেটা? সাইদ এই স্পেসশিপটাকে নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। সেরকম কিছু থাকলে তার চোখ তো এড়াত না। তাহলে?
রাডার টেকনিশিয়ান সিন্ধু হঠাৎ বলল, “ওই যে।”
ডিসপ্লেতে একটা নতুন আলোকবিন্দু দেখা গেছে। রাডারের ইকো বিশ্লেষণ করে কম্পিউটার জানাল নতুন যানটার প্রোফাইল ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। দ্রুত সেটা প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে আসছে।
স্টেসি জিজ্ঞাসা করলেন, “জাবাজ আমাদের কখন মিসাইলের পাল্লার মধ্যে পাবে?”
ডেরিয়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “একঘণ্টা সতের মিনিট প্লাস মাইনাস চার মিনিট।”
“ঠিক আছে। স্পেস-মাইন আর মিসাইল পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজাও

*

ডক্টর হারাইন নিচে ক্ষত্রপের দিকে একবার তাকালেন। সকাল হয়েছে, আলো পড়েছে। এত উঁচু থেকে মানুষের তৈরি কোনওকিছু দেখা সম্ভব নয়। তবু কল্পনা করা যায় হয়তো সিলভানই তাঁদের ঠিক নিচে। জাবাজের আক্রমণে যে অংশটা ধ্বংস হয়েছিল সেটা এখনও পর্যন্ত সেরকমই আছে, হারাইন জানেন। এও জানেন যে এই ডেস্ট্রয়ারটা থেকেই সেই মিসাইলটা ছোঁড়া হয়েছিল। সিনা... ছোট্ট সিনা...
জাবাজ তাঁর একেবারে নাগালের মধ্যে কিন্তু কিছু করার উপায় নেই। তাছাড়া শুধু জাবাজকে সরালেই তো হবে না। অন্য কোনও জাবাজ যেন তার জায়গা না নিতে পারে। ডেস্ট্রয়ারটাকে ধ্বংস করতে হবে যেমন করেই হোক।
ডক্টর হারাইনের প্রথম ভয় ছিল তাঁর চিঠিটা আমতে পড়তে পেরেছে কি না। কোষের ডি.এন.এ.-র মধ্যে লেখা চিঠির কথা তো কেউ আগে শোনেনি। অ্যাক্রোপোলিসে কোনোভাবেই তাঁর কাছে অপারেশন ফ্রিডম খবর পাঠাতে পারছিল না তাই তাঁর চিঠি তারা পড়েছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কোনও উপায় তাঁর ছিল না বাধ্য হয়ে তাঁকে ধরে নিতে হয়েছে পড়া হয়েছে আর সেইমতোই সবকিছু চলছে।
এই মহাকাশযানের ড্রাইভের খুঁটিনাটি তাঁকে দেখিয়েছেন ডক্টর এন্ডর। যেসব বিজ্ঞানীদের জাবাজ কিডন্যাপ করেছিল তাঁদের মধ্যে তিনিই ছিলেন আইনস্টাইন ড্রাইভের এক্সপার্ট। হারাইনের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল জাবাজের বিশ্বাস অর্জন করে এই বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং সম্ভব হলে তাঁদেরকে নিজেদের পক্ষে আনা। কিন্তু তিনি শীগগিরি বুঝতে পারলেন যে ওনাদের পক্ষে জাবাজের বিরোধিতার পথ বন্ধ। তাঁদের সকলেই নিজের নিজের পরিবারের সঙ্গে জাবাজের হাতে ধরা পড়েছেন। এখন কারোর স্ত্রী, কারোর স্বামী বা কারোর সন্তান পণবন্দী। বিন্দুমাত্র সন্দেহ করলেই জাবাজ তাদের উপর প্রতিশোধ নেবে। তাই সমস্ত পরিকল্পনা তাঁকে একাই করতে হয়েছে কাউকে সাহস করে বিশ্বাস তিনি করতে পারেননি। কখনও কখনও মনে হয়েছে এণ্ডরের হয়তো সন্দেহ হয়েছে তবে সেটা এন্ডর কখনও প্রকাশ করেননি।
“ব্যান্ডিটকে পেয়েছি। একটাই। পালাচ্ছে,” রাডার টেকনিশিয়ানের কথায় তাঁর চটকা ভাঙে
“পিছু নাও। কতক্ষণ লাগবে মিসাইলের পাল্লার মধ্যে পেতে?” জাবাজ বলে।
“একঘণ্টা কুড়ি মিনিট, প্লাস মাইনাস তিন মিনিট,” নেভিগেটর বলে।
জাবাজের ক্রু কারোর সঙ্গেই হারাইনের আলাপ হয়নি। ইচ্ছা করেই করেননি। তারাও জাবাজের মতোই নিষ্ঠুর দস্যু।
“যদি ওদের ইন্টারস্টেলার ড্রাইভ থাকে তাহলে কখন ওরা জাম্প করতে পারবে?”
“আমরা তো এখনই জাম্প করতে পারি ওরা কেন পারবে না?” নেভিগেটর জাবাজের উদ্দেশ্যে বলে।
“উজবুক। ড্রাইভ থাকলেও ওদের মডেলটা খুব পুরনো হতে বাধ্য। এই গ্রহে নতুন মডেলের একটা ড্রাইভ থাকলে তোমাকে আর এখানে আয়েস করতে হত নাওদের মডেলগুলোর লিস্টটা কম্পিউটারে আছে। সেটা দেখো।”
নেভিগেটর অনেকক্ষণ হিসাব করে বলল, “এখন যেভাবে যাচ্ছে তা না পাল্টালে ওয়ার্ম হোল জাম্পের আগে ওদের আরও অন্তত একঘণ্টা তিরিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে
“যদি ওরা আরও জোরে যেতে পারত তাহলে আগেই সেটা করতএটাই ওদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। আমরা ওদের নাগালের মধ্যে পাব একঘণ্টা পরে। লেজার ওদের শিল্ডের উপর কাজ করছে না। মিসাইল, নিউক্লিয়ার দিয়ে হিট করতে কতক্ষণ লাগবে?”
মিসাইল টেকনিশিয়ান উত্তরটা আগে থেকেই হিসাব করে রেখেছিল, “পাল্লায় পাওয়ার পরে আরও দশ মিনিট।”
“ঠিক আছে, যথেষ্ট সময়, ওয়ার্ম হোল জাম্পের দরকার নেই। বাই বাই ব্যান্ডিট।”

*

“মাইনফিল্ডের কাছে এসে গেছে ডেস্ট্রয়ার,” সিন্ধু রিপোর্ট করে।
“যে মুহূর্তে বুঝবে ওরা মাইনগুলোকে দেখতে পেয়েছে, প্রথম গ্রুপের মিসাইল অ্যাকটিভ করার সিগন্যাল পাঠাবে। দেখা যাক,” স্টেসি নির্দেশ দেন।
মাইনফিল্ডে শুধু স্পেস-মাইন নয়, সবকটা মিসাইলই রেখে দেওয়া হয়েছে। যদিও স্পেস-ডেস্ট্রয়ারের যে পরিমাণ শিল্ডিং থাকে তা মাইন বা কনভেনশনাল মিসাইল দিয়ে ভেদ করা শক্ত। নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড থাকলে হয়তো সম্ভব হত কিন্তু শান্তিপূর্ণ ক্ষত্রপে কোনোদিনই সে জিনিস ছিল না। তবু ভাগ্য খুলে যেতেও পারে। সাইদ অন্তত সেই আশা করছে। 

*

“রাডারে একটা অদ্ভুত সিগন্যাল আসছে। ছোটো ছোটো অনেকগুলো বস্তু সামনে। মাইন, মাইন!” রাডার টেকনিশিয়ান প্রায় আর্তনাদ করে উঠল
       “কত দূরে?” জাবাজের ইস্পাত কঠিন গলা।
সকলের চোখ রাডার ডিসপ্লের উপর। ডক্টর হারাইনের দিকে কেউ দেখছে না। আইনস্টাইন ড্রাইভের কম্পিউটারের কনসোলে একটা কী টিপলেন। তাঁর পকেটের কম্পিউটার থেকে একটা প্রোগ্রাম গিয়ে শিপবোর্ড মেশিনে লোড হয়ে গেল।
“তিন মিনিট,” রাডার।
“কতগুলো মাইন আছে?”
“বুঝতে পারছি না। রাডারের ইকো খুব দুর্বল। সাধারণ স্পেস-মাইনের প্রতিফলন অনেক শক্তিশালী হয়মনে হয় এগুলো খুব ছোটো।”
“রাডার খুঁজে পাচ্ছে না মানে লেজার দিয়ে রাস্তা সাফ করা যাবে না। নেভিগেটর, মাইনফিল্ডটা ম্যাপ করে পথ পাল্টাও রাডার, এতক্ষণ কী করছিলে?”
“এরকম মাইন আগে কখনও দেখিনি। ঘোস্ট রিফ্লেকশন থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না, এতই ছোটো,” রাডার টেকনিশিয়ান আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে।
“ঠিক আছে আমাদের হাতে কুড়ি মিনিট অতিরিক্ত সময় আছে। নেভিগেটর, নর্মাল স্পেসে থেকে মাইনফিল্ড এড়িয়ে ঐ সময়ের মধ্যে ওদের ধরা যাবে?”
“সহজেই।”
ডক্টর হারাইন চোখ বুজলেন। তাঁর হিসাবের গণ্ডগোলের জন্যই কি অনেকগুলো সাহসী প্রাণ শেষ হয়ে যাবে?

*

“ওরা রাস্তা পালটাচ্ছে।”
“প্রথম গ্রুপের মিসাইলগুলোকে চালু কর,” স্টেসি নির্দেশ দিলেন।
মিসাইলগুলোর মেমরিতে ডেস্ট্রয়ারের প্রোফাইল লোড করা আছে তারা সেটাকে অটোমেটিকালি টার্গেট করল।

*

“কোড রেড। ইনকামিং মিসাইল অ্যালার্ট! একদম কাছে,” রাডার টেকনিশিয়নের আবার আর্তনাদ।
জাবাজ ঘুরে বসল, “কোথা থেকে এল? আমরা তো ব্যান্ডিটের পাল্লার বাইরে।”
“ব্যাণ্ডিট থেকে নয়।”
“তার মানে মাইনফিল্ডের মধ্যে রাখা ছিল, আমরা পাল্লার মধ্যে আসার পর অ্যাক্টিভেট করেছে। নেভিগেটর, রাস্তা পালটাও যাতে মিসাইলগুলোকে এড়ানো যায়। লেজার, একটা একটা করে মিসাইল ধ্বংস কর
ক্যামেরা ডিসপ্লেতে একটা আলোর ফুল ফুটে উঠল। তারপর আরও একটালেজার গানার গুনছে ‘একটা, দুটো, তিনটে...’
মিনিট খানেক পরে লেজার গানার সোজা হয়ে বসল, “সবগুলোর ব্যবস্থা হয়েছে।”
“সময় বিশেষ নষ্ট হয়নিপালাতে ওরা পারবে না।”

*

“প্রথম গ্রুপের সমস্ত মিসাইল ধ্বংস হয়ে গেছে,” সিন্ধুর গলায় স্পষ্টই হতাশা।
“ডেস্ট্রয়ার?” প্রশ্নটা স্টেসি উচ্চারণ করলেও আসলে প্রত্যাশার কন্ট্রোল রুমে সকলের একই প্রশ্ন।
“মাইন বা মিসাইল কেউই নাগাল পায়নি। কোনও ক্ষতি হয়নি।”
স্টেসির গলা একটুও কাঁপল না, “দুই আর তিন নম্বর গ্রুপের মিসাইল অ্যাক্টিভেট কর।”
এর পরে আর কিছু নেই। শুধু স্টেসির সেই গোপন অস্ত্র। যা সাইদ কোথাও খুঁজে পায়নি।

*


“কোড রেড। কোড রেড। ইনকামিং মিসাইল অ্যালার্ট! সামনে পেছনে।”
“লেজার।”
“টার্গেট করছি কিন্তু সামনে পেছনে একসঙ্গে কন্ট্রোল করা শক্ত। সবগুলোকে সামলাতে সময় লাগবে।”
“অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। লেজার, কাছের মিসাইলগুলোকে আগে পুড়িয়ে দাও। নেভিগেটর, ব্যান্ডিটের পাঁচ হাজার কিলোমিটার সামনে জাম্প করব। ওয়ার্ম হোলের প্যারামিটার ক্যালকুলেট কর,” জাবাজ আদেশ দেয়।
“জাম্প কি খুব দরকার? এখনও ব্যান্ডিট টাইম-উইন্ডোর মধ্যে আছে,” নেভিগেটর জানতে চায়।
ডক্টর হারাইন ওভার-অলের পকেটে হাত ঢুকিয়ে শক্ত করে স্প্যানারটা ধরলেনএবার...
“উজবুক কি সাধে বলেছিলাম? আরও যদি মিসাইল থাকে? সেগুলোকেও তো এড়াতে হবে তার জন্য সময় লাগবে না? হয়তো ওগুলো এত দুর্বল যে আমাদের ডেস্ট্রয়ারের কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু একটাও যদি আমাদের রকেট ইঞ্জিনের সামান্য কোনও ক্ষতি করে, যদি আমাদের বেগ একটুও কমে তাহলে ওদের জাম্পের আগে আর হয়তো নাগালে পাব না। ব্যান্ডিটের সামনে আমরা নিরাপদ নিজের সামনে মাইন বা ডিঅ্যাক্টিভেটেড মিসাইল রাখা যায় না। মিসাইল প্রস্তুত থাকওয়ার্ম হোল থেকে যখনই বেরোব ব্যান্ডিটকে টার্গেট করবে। ওরা কিছু বোঝার আগেই চুরমার হয়ে যাবে।”
কয়েক মিনিট পরে ন্যাভিগেটর বলল, “রেডি।”
জাবাজ হুকুম দিল, “ঠিক আছে। জাম্প।”
ডক্টর হারাইন শেষবারের মতো ক্ষত্রপের দিকে তাকালেন। যাই হোক না কেন, আজকের ক্ষত্রপকে তিনি কখনও আর দেখবেন না। যদি তাঁর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় তাহলে তিনি সরাসরি জাবাজের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন যেভাবে হোক ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন। রে গানের সঙ্গে স্প্যানারের লড়াইয়ের একটাই ফল হতে পারে। কিন্তু বেঁচে থেকেও লাভ নেই সামনের ঐ রকেটের এতগুলো মানুষের মৃত্যুর দায়ভার তিনি বইতে পারবেন না। আর যদি সফল হন? তাহলে একটা নরপিশাচ খুনির থেকে ক্ষত্রপ মুক্ত হবেজাবাজরা বুঝতেই পারবে না কী হয়েছে। তিনিই যে এর জন্য দায়ী তা ওদের মাথায়ই আসবে না। তারপর কী হবে ভেবে লাভ নেই। বিদায় সিনা। বিদায় ক্ষত্রপ।

*

প্রত্যাশার কন্ট্রোল রুমে সকলের নজর রাডার ডিসপ্লের উপরহঠাৎ করে ডেস্ট্রয়ারটা স্ক্রিন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ওয়ার্ম হোল জাম্প করেছে। একমুহূর্ত পরে গ্রাভিটি ওয়েভ ডিটেক্টরটা অ্যালার্ম বাজিয়ে জানান দিল কাছেই একটা স্পেস-টাইম সিঙ্গুলারিটি তৈরি হয়েছিল
ওয়ার্ম হোল থেকে কোথায় বেরোবে ডেস্ট্রয়ারটা? কোনদিকে? কত কাছে? বিপদ কি বোঝার সময় পাওয়া যাবে? নাকি অতর্কিতে নেমে আসবে মৃত্যু? এক মিনিট, দু’মিনিট। কতক্ষণ লাগে ওয়ার্ম হোল ট্রানসিটে?
একমাত্র কম্যান্ডার স্টেসি একেবারেই নিশ্চিন্ত তিনি রাডারের ডিসপ্লের দিকে তাকাচ্ছেনই না। গ্রাভিটি ওয়েভের প্যাটার্ন দেখছেন। কম্পিউটারে কী সমস্ত হিসাব করলেন। সবাই চুপচাপ। পাঁচ মিনিট কেটে যাওয়ার পরে সিগন্যালারকে বললেন, “আমাকে মূল ঘাঁটির সঙ্গে যোগাযোগ করান
এতক্ষণ নিরাপত্তার কারণে রেডিও যোগাযোগ বন্ধ ছিল এবারে চালু করা হল। স্টেসি মাইকে বললেন, “মিশন সফল। বিশ্লেষণের জন্য গ্রাভিটি ওয়েভের প্যাটার্ন পাঠালাম।”
কম্পিউটারকে ডাটা পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারপর স্পেসশিপের মাইকে বললেন, “আমরা জিতেছি। সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।”
তারপর ডেরিয়াকে বললেন, “চলো, আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চলো।”
কারও মুখ থেকে কথা সরছে নাসত্যিই কি তারা সফল হয়েছে? নিশ্চয়ই তাই। কম্যান্ডার স্টেসি তো স্তোক দেওয়ার লোক নন। কিন্তু কেমন করে? একমুহূর্ত আগেও সবাই মৃত্যুর জন্য তৈরি হচ্ছিল। তারপরে কী হল?
অনেকক্ষণ পরে সাইদ প্রথম মুখ খুলল, “কম্যান্ডার, কী হয়েছে? ডেস্ট্রয়ারটাকে কেমন করে ধ্বংস করলেন?”
“কই, ধ্বংস করলাম কোথায়? আমি কিছুই করিনি। ডেস্ট্রয়ারও যেমন ছিল তেমনি আছে। বা আরও ঠিকঠাক বললে তেমনি থাকবে।”
সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তিনি হেসে ফেললেন, “আচ্ছা আচ্ছা, সব বলছি। এই গল্পটা আসলে যার বলার কথা সেই অসমসাহসী মানুষটার নাম আপনারা প্রায় সবাই শুনেছেনআমতেকে আপনারা দেখেছেন আমতের মাস্টারমশাই বিখ্যাত জেনেটিসিস্ট ডক্টর হারাইন কিছুদিন আগে প্রকাশ্যে জাবাজকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়ে অ্যাক্রোপোলিসে চলে যান। সেটা ছিল আসলে একটা ধোঁকা। ওঁর ভাইয়ের পরিবার সিলভানে জাবাজের আক্রমণে মারা গিয়েছিল। তারপর উনি প্রতিজ্ঞা করেন যে করেই হোক জাবাজের হাত থেকে ক্ষত্রপকে মুক্ত করতে হবে। জাবাজের বিশ্বাস অর্জন করেন, জাবাজের কবজার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেনতারপর উনি একটা পরিকল্পনা করেন সেটা আমাদের যেভাবে জানিয়েছিলেন সেটাও একটা গল্পের মতো। কিন্তু সে কাহিনিটা আজ তোলা থাক
       “ডক্টর হারাইন আমাদের জানান, একটি নির্দিষ্ট দিনে যদি জাবাজের ডেস্ট্রয়ারটাকে ওয়ার্ম হোল জাম্প করাতে বাধ্য করতে পারি তাহলে তিনি এমন ব্যবস্থা করবেন যে ডেস্ট্রয়ারটা আমাদের আর কিছু করতে পারবে না। তার জন্য ডেস্ট্রয়ারের ইন্টারস্টেলার ড্রাইভের প্রোগ্রামে সামান্য পরিবর্তন করতে হবেতার দায়িত্ব উনি নেবেন।
“সত্যি কথা বলতে আমিও খুব নিশ্চিত ছিলাম না উনি যা বলছেন তা পারবেন কি না। কিন্তু ঝুঁকি তো নিতেই হবে। আমরা কয়েকজন মাত্র পুরো বিষয়টা জানতাম। কাউকে বলিনি, তার মানে এই নয় যে আপনাদের আমরা বিশ্বাস করি না। কিন্তু যদি ভুলক্রমেও কথাটা বেরিয়ে যায় তাহলে ডক্টর হারাইন তো মরবেনই, আমাদেরও সমস্ত পণ্ড হয়ে যাবে। সাধারণভাবে স্পেস ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে আমরা পারব না সে আমরা জানতাম। ডক্টর হারাইনই ছিলেন আমাদের গোপন অস্ত্র। আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে ডেস্ট্রয়ারটা ওয়ার্ম হোল জাম্প করতে বাধ্য হয়যাক গে, ডেস্ট্রয়ারও নেই, জাবাজও নিশ্চয় ডেস্ট্রয়ারে ছিল, সেও এখন নেই, এখন আর ক্ষত্রপের মুক্তির পথে কোনও বাধা নেই।”
“কিন্তু ধ্বংস হয়নি তো ডেস্ট্রয়ারটা কোথায় গেল? আবার যে ফিরে আসবে না সেটা আপনি কেমন করে জানলেন?” ডেরিয়া জিজ্ঞাসা করে।
“ডেস্ট্রয়ারটা দূরত্ব হিসাবে ধরলে কাছেই আছে। কিন্তু ওয়ার্ম হোলের সমাধানের একটা অংশ আমরা কখনোই মনে রাখি না। ওয়ার্ম হোল শুধু যে অল্প সময়ে অনেকদূরে নিয়ে যেতে পারে তা নয়, মুহূর্তের মধ্যে দূর ভবিষ্যতেও নিয়ে যেতে পারে। ডক্টর হারাইন প্রোগ্রামটাকে এমনভাবে পালটে দিয়েছিলেন যে ওয়ার্ম হোলের মাধ্যমে ডেস্ট্রয়ারটা ভবিষ্যতে পৌঁছে গেছে। কতদূর ভবিষ্যতে আমি ঠিক জানি না তবে গ্রাভিটি ওয়েভ থেকে ওয়ার্ম হোলের সিঙ্গুলারিটির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে দশ বছর পরে ডেস্ট্রয়ারটা আবার আমাদের বিশ্বের স্থান-কালে ফিরে আসবে। আমাদের বিজ্ঞানীরা আরও ভালোভাবে দেখে আমাদের বলবেন ঠিক কবে এবং কোথায়। আমরা তৈরি থাকবআমাদের দশ বছর চলে যাবে কিন্তু জাবাজদের কাছে জাম্পটা একমুহূর্ত নেবে। পরের মুহূর্তেই ও দেখবে ওদের ঠিকঠাক অভ্যর্থনার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। সেই সময় জাবাজের মুখটা দেখতে পেলে ভালো লাগত। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা হল ডক্টর হারাইনকেও আমরা আবার আমাদের মধ্যে ফিরে পাব।”
_____
অলঙ্করণঃ শ্রীময় দাশ

No comments:

Post a comment