ভ্রমণ:: ডুয়ার্সের ডায়েরী - সহেলী চট্টোপাধ্যায়

ডুয়ার্সের ডায়েরী

সহেলী চট্টোপাধ্যায়



১৩।৩।১৫

মাদারিহাটের একটা সুন্দর কটেজে বসে বসে ডায়েরী লিখছি। এখন রাত নেমে এসেছে। টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে কটেজের ভেতর। আলো বেশ কম, এটাই যা অসুবিধে। ঠাণ্ডাটা কলকাতার চেয়ে একটু বেশি। গতরাতেই একপশলা ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেছে। আজ সকালেই এসে পৌঁছেছি। গত রাতে নাকি একটা হাতি আমাদের কটেজের সামনে চলে এসেছিল। একটা মাধবীলতার ঝাড় শুয়ে পড়েছে তবে সেটা ঝড়ের জন্যও হতে পারে। কটেজের দোতলায় চেয়ার বা দোলনায় বসে সারা বিশ্ব সংসার ভুলে থাকা যায়। আমরা কয়েকজন মিলে বেরিয়ে পড়েছি তরাইয়ের পথে। উত্তরবঙ্গের সাথে আমার পরিচয় অর্জুনের সাথে। সমরেশ মজুমদারের অর্জুন। সেই সেবক রোড, তিস্তা ব্রিজ, চিলাপাতার জঙ্গল, হাসিমারা, গরুমারা, বেলাকোবা, ফালাকাটা, গয়েরকাটা, চাপড়ামাড়ি, লাটাগুড়ি, হলং। এই সব নামের সাথে পরিচয় বহুদিন ধরে। ছোটোবেলায় একবার আলিপুরদুয়ার এসেছিলাম। অর্জুনের বইগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমি নিজেও যেন উত্তরবঙ্গেরই মানুষ। কলকাতার নয়। উত্তরবঙ্গকে প্রকৃতি সাজিয়েছে অঢেল সম্পদ দিয়ে আর স্নেহ দিয়ে। তবে এখানকার জীবনযাত্রায় ভয় ও আছে। এক কথায় বলা যায় ভয়ঙ্কর সুন্দর।

তিস্তা-তোরসা ধরে এসেছি। ফালাকাটায় নেমেছি সকাল সকাল। সেখান থেকে প্রাইভেট কারে এই মাদারিহাটের কটেজ। এখানে কিছুক্ষণের রেস্ট নিয়ে পাড়ি দিলাম কোচবিহার রাজবাড়ির উদ্দেশে। পথে পড়ল চা বাগান আর ঘন জঙ্গল। সূর্য ও এই ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করতে ভয় পায় হয়ত, তাই বিশাল এক ছাতার তলা দিয়ে যাচ্ছি মনে হল। অরণ্যের নিজস্ব একটা গন্ধ আছে। বুনো অথচ মিষ্টি। কেমন ভিজে ভিজে জঙ্গুলে একটা গন্ধ। এই জঙ্গলের নাম চিলাপাতার জঙ্গল। ভেতর থেকে অবিরাম একটা পোকা ডেকে চলেছে। ঠিক ঝিন ঝিন করে ডাকছে খুব তীক্ষ্ণ শব্দ। এই পোকা গুলোর ডানা থেকে এমন শব্দ হয় শুনলাম।

পথে চলতে চলতে
উত্তরবঙ্গে বেড়াতে আসলে কোচবিহার রাজবাড়ি দেখতে ভুলো না। ইউরোপের রেনেসাঁর যুগে চলে এসেছি বলে মনে হতে পারে। বাইরে ছবি তুলতে পারলেও ভেতরে তোলা যাবে না। টিকিটের দাম পাঁচ টাকা। শুক্রবার এখানে সংগ্রহশালা বন্ধ থাকে। ভেতরটায় ঢুকলে তাক লেগে যায়। রোমের বিখ্যাত চার্চ এর মধ্যে ঢুকে পড়েছি বলে মনে হয়। ভেতরে রাজপরিবারের লোকেদের ছবি আছে, তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র আছে। গায়ত্রী দেবী, সুনীতি দেবীর ছবি আছে। সুনীতি দেবী বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃ শ্রী কেশব সেনের কন্যা। এছাড়াও কোচবিহার সম্পর্কে আরও বহু তথ্য পাবে। পাল যুগে তৈরি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, তাম্রফলক, উপজাতিদের শ্রেণীবিভাগ, তাদের ধর্মবিশ্বাস, জীবিকা, পোশাকআশাক, লৌকিক আচর প্রভৃতি সম্পর্কেও বহু মূল্যবান তথ্য সংরক্ষিত আছে। অবাক লাগে যে টোটো জনগোষ্ঠীর লোকেরাও মা বিষহরির পুজো করেন। আমরা যেমন মা মনসার পুজো করি সাপের ভয় থেকে বাঁচার জন্য। তেমনই শিব, সূর্য, কালী, দুর্গা, লক্ষ্মী, বাগদেবীর পুজো ওরাও করেন। তারা নামে এক বৌদ্ধ হিন্দু দেবীরও আরাধনা করা হয়। এখানে দুর্গার একটা আলাদা নাম আছে, মহিষমর্দিনী। বিভিন্ন রকমের মুখোশের সংগ্রহ আছে। মিউজিয়াম দেখা হয়ে গেলে মদনমোহন-কে দর্শন করতে যেও। মন্দিরে মা কালী আর মা মহিষমর্দিনীও পূজিতা হন। মাদারিহাট থেকে কোচবিহার রাজবাড়ি প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূর হলেও জার্নির কষ্ট গায়ে লাগে না পরিবেশের গুণেফেরার পথে আবার সেই চিলাপাতার জঙ্গল। দু’ধারে তাকাতে তাকাতে যেও, বলা যায় না কখন আবার হাতি বেরিয়ে পড়ে। তবে বাঁদর অনেক দেখা যায়। ফিরে এসে লাঞ্চ সেরে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। বিকেলে একটু হাঁটাহাঁটি। এখন সন্ধে হয়ে গেছে।  অবশ্য এখানে সন্ধে নামে না, একেবারে রাত নেমে যায়। ছাদের ওপর খুব শব্দ হচ্ছে, কীসে যেন খুব হুড়োহুড়ি করছে। ঘরে আমি একা তবু শব্দ হচ্ছে কিছুর। বোধ হয় ঘুণ পোকার শব্দ। আজ লোডশেডিং হলেই গেছি! এখানে টিভি নেই, একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, এই নীরবতাকে তো উপলব্ধি করতে পারছি।

১৪।৩।১৫

চিলাপাতার জঙ্গলে গতকাল অনেকে হাতি দেখেছে, আমরা মদনমোহন দেখে ফিরে আসার সময় অনেকেই নাকি দেখেছে। আমাদের আগের গাড়িটা দেখেছে। আমাদের দেখা হয়নি এই যাত্রা। কটেজের চালে নানারকম শব্দ হয়েই চলেছেপায়রার বকবকানি শুনেই চলেছি। রাত্তিরে ভাম-ও আসে। আলমারির ভেতর খুটখাট শব্দ হয়েই চলেছে। একদল বাঁদর কিচমিচ শব্দ করেই যাচ্ছে। নানা রকম পাখিও গলা সাধতে শুরু করে দিয়েছে। সকালে জলদাপাড়া অভয়ারণ্য দেখে এলাম। একটু পরেই জয়ন্তীর উদ্দেশে যাত্রা করছি। সকাল থেকেই আজ অনেক প্রোগ্রাম। ভোর বেলা জলদাপাড়া ফরেস্ট। জীপে ওঠার পর খুব ঠাণ্ডা লাগছিল। একে একে দেখা মিলল বাইসন, গণ্ডার আর একদল ময়ূরের। অনেকে হাতির পিঠে চড়েও সাফারি করছে। গভীর জঙ্গলে নীরব হয়ে থাকতে হয়, তবে তো জঙ্গলের শব্দ শোনা যায়। বিভিন্ন রকম পাখির ডাক আর পোকামাকড়ে ডাক শুনলে মনে হবে ওরা তোমাকেই ওয়েলকাম জানাচ্ছে। ময়ূরের কেকাধ্বনি শুনলে বুক কেঁপে উঠলেও আনন্দ লাগে। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়ার মধ্যেও একটা আনন্দ রয়েছে। এখানে ওয়াচ টাওয়ারে উঠতে হবে। ময়ূর ছাড়া কিছু দেখা গেল না। এখানে আসলে দূরবীন নিয়ে আসলে ভালো হয়। কার অনেক দূর থেকে এরা দেখা দেয়। ওয়াচ টাওয়ারে ওঠার আগেই আমরা গণ্ডার দেখে নিয়েছি। পোজ দিচ্ছিল। বিখ্যাত অভিনেতাদের মত। সবার ছবি নেবার পর ও  জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেল। ও জানে যে আমাকে দেখতে রোজ লোক জড়ো হয়। একদল বাঁদর গাছের ওপর থেকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আমাদের দেখছিল।


কটেজে ফিরে স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করে আবার পথ চলা। এবার শিকিয়াঝোরানাহ কোনও ঝর্ণা বা ঝোরা জাতীয় কিছু নয়। নতুন একটা টুরিস্ট স্পট সবে হচ্ছে। একটা খাল আছে তার দুপাশে জঙ্গল। উত্তরবঙ্গে বসে সুন্দরবনের মজা নিতে চাইলে শিকিয়াঝোরা অবশ্যই আসতে হচ্ছে। নৌকা করে মাঝি নিয়ে গেল। জীবনে প্রথম বার লগি দিয়ে ঠেলা নৌকায় চড়লাম। নৌকা বা বোট যাই বোলো না কেন। এখানে তোমরা বিভিন্ন রকম জলজ উদ্ভিদ দেখতে পাবে যার মধ্যে শাপলা পাতাঝাঁঝি আর কচুরিপানাই বেশি। এছাড়াও আরও নানা রকম জলজ উদ্ভিদ। আর দুপাশে ঘন জঙ্গল তো আছেই। আর বালিহাঁস, পানকৌড়ি, বিভিন্ন রকম জলজ পাখি দেখতে পাবে। মাছরাঙা, বক, শামুকখোল। যে গুলো আমরা নিজেদের এলাকায় দেখতে পাই না। তবে একজন গাইডের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত, এই উদ্ভিদ আর প্রাণীদের নাম গুলো জানা হয়ে যেত। দুপাশের জঙ্গলে নাকি হাতি, চিতা আর ভালুকের উপাত আছে। এই জঙ্গলে প্রচুর চালতা হয়।

এইখানেই আমরা লাঞ্চ সারলাম তবে নৌকায় নয়। চাঁদি ফাটা রোদ এখানে। এরপর রাজাভাতখাওয়া, এখানে একটা ছোটো মিউজিয়াম আছে বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত। বক্সা টাইগার প্রজেক্টে এখন নাকি ২৪ টা বাঘ। ভরা দুপুরে কেউ দেখা দিতে ইচ্ছুক নন। এরপর জয়ন্তীর পথে। জয়ন্তীর জঙ্গলে একটা উপন্যাস পড়েছিলাম সমরেশ মজুমদারের। এটাও অর্জুনের অ্যাডভেঞ্চার। বার বার সেই অর্জুনের কথাতেই ফিরে আসছি। জয়ন্তী শুধু ফরেস্ট নয়, জয়ন্তী একটা নদীর নাম। এই নদী অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। ওপরে পাথর ভর্তি, কিছু কিছু জায়গায় তির তির করে জলের ধারা বইছে। ভীষণ ঝাঁকুনি লাগে যখন গাড়িটা পাথরের ওপর দিয়ে যায়। কখনও জলের ওপর দিয়ে যায়, জয়ন্তী অনেকটা আমাদের ফল্গু নদীর মত। ভেতরে জল ওপরে পাথর দিয়ে সাজানো। জয়ন্তী নামে পাহাড়ও আছে। আর আছে মা জয়ন্তীর (দুর্গার) মন্দির। কিন্তু সেই পথ খুব বিপজ্জনক বলে অনেকেই গেলেন না। আমি নিজেও খুব পড়ে যাবার ভয় পাই তাই সাহস করে আর গেলাম না। উঠতে গেলে একটু ট্রেকিং জানলে ভালো হয়। জয়ন্তী নদীকে অতিক্রম করে যেতে হবে। পাথরের ওপর অনেকেই বসে পড়েছে, পা দুটো জলে ডুবিয়ে। আমিও বসলাম একটা পাথরের ওপর। জলে পা ডোবাতে বেশ আরাম লাগল। বেশ রোদ্দুর লাগছিল এতক্ষণ এবার একটু আরাম হল। এই জায়গা ছেড়ে আর নড়তে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু তবু উঠতে হল। ভুটানের বর্ডার কাছেই। ফেরার পথে আমরা হাতি দেখলাম। একটার দাঁত বেশ বড়ো। ডাঁটও আছে বেশ। গাছপালা ভেঙ্গে ভেঙ্গে কি যেন একটা করছিল। সবাই ছবি তুলছে দেখে বিরক্ত হয়ে ওরা আবার জঙ্গলে ঢুকে গেল। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। আবার পথ চলা শুরু হল, একটুর জন্য আমরা কিং কোবরা মিস করলাম। অন্য এক গাড়ির ড্রাইভার আমাদের ড্রাইভারকে বলল, যে সে কিং কোবরা দেখেছে আসার সময়। সারা দিন প্রচুর ঘোরা হয়েছে, ফেরার পথে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন সেই কটেজ মার্কা হোটেলে ফিরে তোমাদের জন্য ভ্রম কাহিনী লেখার চেষ্টা করছি। আজ এখানেই শেষ রাত। কাল যাচ্ছি লাটাগুড়ির উদ্দেশে। মাঝে মাঝেই ছাদে হুড়োহুড়ি করছে কেউ। ভাম বিড়ালের উপাত আছে। মন খারাপ লাগছে, এই কটেজের ওপর একটা মায়া পড়ে গেছে। এখানে বিদ্যুতের বেশ সমস্যা। বেশ কষ্ট করেই লিখছি এখন।

শিকিয়াঝোরা

১৬।৩।১৫

গতকাল এত ক্লান্ত ছিলাম যে ডায়েরি লেখা আর হয়ে ওঠেনি। গতকাল আমরা লাটাগুড়ি এসে পৌঁছেছিএইখানে সকালে বেশ গরম থাকলেও রাতের দিকে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে যায়। বেশ সুন্দর আবহাওয়া। লাটাগুড়িতে প্রথমেই আমরা হোটেলে উঠলাম। আসার পথে ডায়না আর মূর্তি নদী চোখে পড়ল। মূর্তি নদীতে অনেকেই নেমে পড়েছে। সেই তিরতির করে জল বয়ে যাচ্ছে। নুড়ি পাথরের মধ্যে দিয়ে। আমি অনেকগুলো পাথর কুড়িয়ে ফেললাম। এই সব পাথরের মধ্যে খনিজ সম্পদ থাকে। এখানে তিস্তা, তোরসা, রায়ডাক, জলঢাকা, মহানন্দা, কালাজানি ইত্যাদি নদী বেশ বিখ্যাত। তোমরা সবাই ভূগোল পড়ো, তোমাদের সবই জানা আছে। হোটেলে পৌঁছে লাঞ্চ সেরে মেদলা ওয়াচ টাওয়ার। এটা একটা ফরেস্ট। মোষের গাড়ি করে যেতে হবে কিছুটা, তারপর একটু হাঁটা, তারপর ওয়াচ টাওয়ার। গাড়িতে উঠতে প্রথমে ভয় করে, বিশেষ করে মোষ গুলোর চেহারা দেখলে। তবে এরা খুব নিরীহ প্রাণী। মায়া লাগে দেখলে। এক পাশে চা বাগান আর এক পাশে শুকিয়ে যাওয়া নদী। সেখানে গরু ছাগল চরেওয়াচ টাওয়ারে অনেকক্ষণই ছিলাম। এখানে আসলে কিছু না কিছুর দেখা ঠিক পাবে। এখানে একটা নালা আছে বন্য প্রাণীরা জল খেতে আসে। আর একটা সল্ট লিক আছে। পশু পাখি দের শরীরেও নুন এর দরকার হয়। আমাদের মত লব খেতে পারে না কার ওরা রান্না করতে জানে না। তাই বন দফতর থেকে সল্ট লিক বানানো হয়। লব ঢালা হয় একটা জায়গায় গর্ত করে, ওরা এসে চেটে চলে যায়। এখানে গণ্ডার, বাইসন, ময়ূর দেখা গেল। হরি, লেপার্ড, হাতি এরা দেখা দিল না। ছটা পর্যন্ত এখানেই কাটিয়ে দিলাম। তারপর আবার মোষের গাড়ি করে ফেরা হল। এইখানে অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য সন্ধ্যা বেলায় আদিবাসী নৃত্যের আসর বসে। এটা বাড়তি পাওনা পর্যটকদের কাছে। চাপড়ামারি, চন্দ্রচূড়, চুখাচুখি এই ওয়াচ টাওয়ারগুলোও তোমরা দেখে নিতে পারো

এত গেল গতকালের কথা, আজ বেরিয়েছি বেশ দেরীতেই। পাহাড়ে উঠেছিলাম। জঙ্গলের মধ্যে মহাকাল মন্দির আছে, তবে এটা ঠিক মন্দির নয়। এখানে কিছু শিবলিঙ্গ আছে। লাল রঙের ধ্বজা টাঙ্গানো চারদিকে। হাতিকে পুজো করা হয়। সামনে যদি কোন দাঁতাল হাতি এসে দাঁড়ায় মনে হবে মহাকাল নিজেই চলে এসেছেন। হাতি এখানে অনেক ক্ষয় ক্ষতি করে ফেলেজঙ্গলে খাবার না পেলে লোকালয়ে চলে আসে। এখানে পুজো দিলে হাতি নাকি আর উপাত করে না। এমনটাই বিশ্বাস মানুষ জনের। হাতির ভয় থেকে বাঁচবার জন্য মানুষ জন মহাকাল, বিশ্বকর্মা, গণেশ এর পুজো করে। মহিষমর্দিনীর পুজো হয় কোচবিহারে। বন্য মহিষের ভীতি থেকেই কি মানুষ এই দেবীর পুজো করে? মহিষাসুরের গল্প আমরা সবাই জানি। বুনো মোষের একজন দেবতা হলেন ট্যাঁরবারোআরণ্যক যারা পড়েছ তারা জানো। আজ আমরা চা বাগানের ভেতর ঢুকেছি। দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তোলা দেখেছি। জানকী বলে একজন মহিলা শ্রমিকের সাথে আলাপ হল। এরপর সামসিং ভিউ পয়েন্ট। এটা একটা নেপালি গ্রাম। চোখ জুড়নো সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে। এর পর আবার মূর্তি নদী। এখানে নদীর রূপ অন্য রকম। তির তির করে আর বইছে না, রীতিমত গর্জন করছে। বিশাল বিশাল পাথরের ফাঁক দিয়ে এই নদী বইছে আর শব্দ করছে অবিরাম। এই জায়গার নাম রকি আইল্যান্ড। নদীর ভেতরটা পুরো দেখা যায়, অনেক মাছ খেলে বেড়াচ্ছে ভেতরে। অনেকেই চেষ্টা করল মাছ ধরার, কিন্তু ওরা আমাদের চেয়ে অনেক চালাক। কিছুতেই ধরা গেল না। বিশাল বিশাল পাথরের জন্যই রকি আইল্যান্ড নাম হয়েছেএক একটা পাথর ঠিক কচ্ছপের পিঠের মত দেখতে। কোনোটা আবার হাতির পিঠের মত দেখতেআর আছে জলের অবিরাম বয়ে চলার শব্দ। রঙ্গিন প্রজাপতির দল। প্রজাপতিগুলো আমাদের দেখেও উড়ে গেল না। ডানা দুলিয়ে দুলিয়ে পোজ দিচ্ছিল। এই খানেই আমরা দুপুরের লাঞ্চ সারলাম। প্লাস্টিকের থালা গুলো ফেলার জন্য ডাস্টবিন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এর পর দুপুরে ঝালং আর বিন্দু নামে দুটো নেপালি গ্রাম। পাহাড় আর অরণ্যের শোভা দেখতে দেখতে  পথ চলা। ঝালং-এ যখন পৌঁছলাম তখন বেশ মেঘ করেছে। এখানে ভিউ পয়েন্ট আছে। দূরে যে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে সেটা ভুটানের মধ্যে পড়েছে। নীচে দেশলাইয়ের খোলের মত বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে। এই অংশ পড়েছে ভারতে। আমরা বেশ খানিকটা উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছি। দূরের পাহাড়ে অর্থা ভুটানে ছোটো ছোটো খেলনা গাড়ির মত গাড়ি চলছে। খেলনার মতই দেখতে পারছি এই পার থেকে। খেলনা বাড়ি দিয়ে শহর সাজানো মনে হবে। ইতিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। অদ্ভুত একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছিল কিন্তু বৃষ্টির জন্য বিন্দুতে নামা হল না। গাড়িতেই বসে অনেক্ষ অপেক্ষা করলাম, তবুও বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। আমরা এক সময় ফিরে এলাম। সমতলে নেমে এলাম। নেপালি গ্রাম গুলো ভারী সুন্দর সাজানো। একদম মেঘের মুলুকে এসে পড়েছি বলে মনে হবে।

আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। কালকেই ফেরার পালা। লাটাগুড়ি থেকে ফেরার পথে কিছু কেনাকাটা করে নিতে পারো। শপিং কম করাই ভালো, কিন্তু এদের হাতের কাজ অবশ্যই দেখবে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প আছে। এখানে কাঠ, বাঁশ, বেত, মোষের শিঙ্ থেকে বিভিন্ন রকম জিনিস পাওয়া যায়। চাও পাওয়া যায়।

এই কদিন আমরা অনেক আনন্দ করলামতবে সব আনন্দেরই শেষ আছে। আবার সেই ঘরে ফেরার পালা। এক রকম জীবন যাপন। তবে বাড়ি ফেরার ও আনন্দ আছে আলাদা। অনেক গুলো মানুষ যে অপেক্ষা করে আছে!

জয়ন্তী নদী
____________
ফোটোঃ লেখক

No comments:

Post a comment