দেশবিদেশের গল্প:: কী ভাবে এল গাছপালা আর জল (দক্ষিন আফ্রিকা) - মল্লিকা ধর

কী ভাবে এল গাছপালা আর জল (দক্ষিন আফ্রিকা)

মল্লিকা ধর

এটি আফ্রিকার দক্ষিনাংশের সান (san) জাতির উপকথা। গল্পটি অপূর্ব। এই গল্পে আছে একেবারে প্রথমে সৃষ্টিকর্তা ক্যাগেন সব পশু পাখি তৈরি করে পৃথিবীতে ছেড়ে দিলেন, কিন্তু না বানালেন কোনও পুকুর, না কোনও নদী, না কোনও ঝর্না বা কোনও প্রস্রবণ। কোনও ঘাস জমি নেই, কোনও ফলের গাছ নেই, চারদিকে শুধু ধূ ধূ বালির মরু, তীব্র সূর্য আগুন ঢেলে তাতিয়ে তোলে তা সারাদিন। পশুপাখিরা সবাই পশুপাখি মেরেই মাংস ভক্ষণ করে আর তৃষ্ণা মেটায় রক্তে। কী ভয়ঙ্কর রক্ত লাল সেই সব দিন। কারোর জীবনের ই কোনো নিরাপত্তা নেই।

এক ছিল বিরাট হাতি, সে এই সব দেখে ব্যথিত। সে বলল, “এই রকম চলতে পারে না, পারে না, পারে না”। পশুপাখিরা কাছে এগিয়ে আসে, কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তাহলে”?



মহান হৃদয় হাতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আমি মরে গেলে আমার দেহের পশম থেকে গজাবে ঘাস। আমার শিরা উপশিরা থেকে হবে তরমুজের লতা তাতে রসটসটসে তরমুজ ফলবে। আমার হাড় গুলি থেকে হবে ফলের গাছ। রসালো ফল হবে তাতে। আর কাউকে মাংস খেতে হবে না। রক্ত পান করতে হবে না। প্রচুর খাবার আর পানীয় পাবে সব পশুপাখি”।

আগ্রহে উদগ্রীব হয়ে সব পশুপাখি হাতির দিকে চেয়ে থাকে, একজন বলে, “কবে, সে কবে? আহা কবে?”

হাতি বলে, “কী জানি? আমরা হাতিরা তো অনেকদিন বাঁচি। দেখা যাক কী হয়!”
সবাই আশায় আশায় চলে যায়, ভাবতে ভাবতে যায় একদিন মরু সবুজ হবে, কত ঘাস, কত ফল, মাটিতে কত রসালো তরমুজ! এত তৃষ্ণা আর থাকবে না, ক্ষুধা থাকবে না, রক্তলোলুপ এই সব ভয়ঙ্কর দিনের অবসান হবে। কিন্তু সে কবে?
এক ছিল মস্ত সাপ। সে হাতিকে এসে বলল, “হাতি সত্যি তুমি তোমার নিজের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন সুন্দর করতে চাও? আমাদের রক্ষা করতে চাও”?
হাতি বলে, “হ্যাঁ সত্যি। এই বীভৎস যন্ত্রণা আর চোখে দেখতে পারি না। এর অবসান চাই”।

সাপ বলল, “আর এক বার ভেবে দ্যাখো । সকলের জীবন সুন্দর হবে কিন্তু তার জন্য চরম মুল্য দিতে হবে তোমাকে”।

হাতি বলে, “আমি ভেবে দেখেছি অনেকবার, আমি তৈরী”।

সাপ বলে, “তবে তাই হোক”। বিদ্যুতের মতন চমকে ওঠে সাপের ফণা। গভীর দংশন করে সে হাতিকে। সব টুকু বিষ ঢেলে দেয়। হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যন্ত্রণায় নীল হয়ে যেতে থাকে তার বিরাট দেহ। কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যু হয় হাতির।

হাতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মত। দলে দলে পশুপাখিরা এসে হামলে পড়ে হাতির মৃতদেহের ওপর। পেট ভরে মাংস খায়, তৃষ্ণা মিটিয়ে রক্ত পান করে তারা, খায় আর পান করে। খেতে খেতে দিন ফুরায় প্রায়, আর কিছুই পড়ে থাকে না, চামড়া, হাড় আর শিরা উপশিরা ছাড়া। এক সময় সূর্য নামে পাটে , পরিতৃপ্ত উদরে পশুপাখিরা ঘুমাতে যায়। বহুদিন পরে পেট ভরে খেতে পেয়েছে তারা, মিটাতে পেরেছে তৃষ্ণা।
পরদিন সকালে একে একে জেগে উঠতে থাকে পশুপাখিরা। আবার তপতপে গরমের দিন, আবার ক্ষুধা আবার তৃষ্ণা। আবার সেই যন্ত্রণা। সকলে উন্মত্তের  মতন “হা খাবার হা পানীয়” শুরু করে দিল। সাপ বলে, “আরে তোমরা এত অধীর হয়ো না। মনে আছে হাতির প্রতিশ্রুতির কথা?” পশুপাখিদের স্মৃতিশক্তি বেশী না, অনেকেরই কিছু মনে নেই, শুধু কয়েকজন তোতলাতে তোতলাতে বলে, “ হ্যাঁ কী যেন ......হাতি বলেছিল সে মরে গেলে তার হাড় থেকে ফল গাছ হবে...... তাই বলেছিল না? কিন্তু হাতি তো মরেনিসাপ তুমি তাকে মেরেছ। সাপ ফোঁস করে ওঠে, “এখন আমার নামে দোষ, না? সুবিধাটুকু পাওয়া হয়ে গেলে এরা সব ভুলে যায় । আয় কে খেতে চাস আমার রক্ত? সাহস থাকে তো এগিয়ে আয়”।

সাপের ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে সবাই পিছু হটে, সাপের বিষ দাঁতের কথা কে না জানে! সাপ কে কেউ ঘাঁটাতে চায় না।


অনাহারে আর বিনা পানীয়তেই কেটে যায় একটি দিন, ক্রমে সূর্যাস্ত হয়। রাতের বেলা একে একে পরিচিত তারারা ফোটে আকাশে। তার সাথে দেখা যায় নতুন এক তারা, সেই তারা এগিয়ে আসতে থাকে। ভয়ে শিউরে ওঠে সব প্রাণী , বলে, “ওই যে হাতির আত্মা। আমাদের ধ্বংস করতে আসছে।”

চুপ করে দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে পশুপাখিরা, নতুন তারাটি এগিয়ে আসতে আসতে ক্রমে স্থির হয় হাতির দেহাবশেষের উপর। সহসা হাতির হাড়গুলি খাড়া হয়ে ওঠে, শিকড় গজিয়ে ছড়িয়ে যায় মাটির গভীরে, উপরে ডালপালা গজায়, পাতাপত্তর হয়। ফলের গাছ হয়ে যায় ওরা। হাতির শিরা উপশিরা থেকে তরমুজের লতা হয়, রসালো তরমুজ ধরে তাতে। আর হাতির গায়ের পশম থেকে হয় মস্ত মস্ত লোম, হাতি ঘাসের জঙ্গল বলে যা এখন পরিচিত।

পরদিন সকালে পশুপাখিদের আনন্দ দেখে কে! দলে দলে হরিন, খরগোশ, গরু, ভেড়া, জেব্রা, ঘোড়া আর বাকি সবাই বেরিয়ে পড়ে খেতে। মাঠ ভরা সবুজ ঘাস, আহা! শুধু কিছু  কিছু প্রাণী চিতা, হায়না, সিংহ, নেকড়ে, পেঁচা এই রকম কিছু প্রাণী বলল, তারা মাংস ছাড়া বাঁচতে পারবে না। তারা চলে গেল রাত্রির অন্ধকারে রাতে শিকার ধরে খাবে। শকুন বলল, যে তারও মাংস লাগবে কিন্তু সে নিজে মারবে না, এমনি এমনি কেউ মরে গেলে তবে খাবে। খাবারদাবারের ব্যবস্থা তো হয়ে গেল, কিন্তু পানীয়? কী ভীষণ তৃষ্ণা ! আবার সাপ কে তারা বলে, “পানীয় চাই, পানীয় চাই। তেষ্টায় মরে গেলাম”।

সাপ বলে, “ফলে রস আছে, তরমুজেও। ঘাসেও। সে সবে তেষ্টা মেটে না তোমাদের?”
কিন্তু কেউ শোনে না, আহা, তৃষ্ণা! আবার তাকাতে থাকে এদিক ওদিক, নধর কোনো প্রাণীর মিঠা রক্তে তারা তৃষ্ণা মেটাবে ।


সাপ বাধা দেয়, বলে, “ না না না, আর নয়। মহান হাতি নিজের জীবন দিল তোমাদের জন্য, তবু তোমাদের সন্তুষ্টি নেই। দাঁড়াও , দেখি কি করা যায়।” সাপ মাটিতে গর্ত করে নেমে গেল পাতালে, সেখান থেকে ফণা আর লেজের ঝাপটা দিয়ে ঠেলে ঠেলে পাতালের জল নিয়ে এল উপরে, দেখা দিল ঝর্না আর প্রস্রবণ। নীচু নীচু জায়গা জলে ভরে গিয়ে হল পুকুর, দিঘী, হ্রদ, নদী বয়ে গেল উপত্যকার মাঝ দিয়ে।

খাদ্য ও পানীয়র সমস্যা মিটে গেল। এখন পৃথিবী ঘাসে, পাতায়, লতায়, গাছে সবুজ, স্নিগ্ধ, জলের অভাব এখন আর নেই। সকলে সুখী।

সাপ রইল না, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে সে ফিরে গেল স্বর্গেসে কাউকে বলেনি যে হাতিকে সে মর্মান্তিক ভালোবাসতো, তাকে ছাড়া সে থাকবে কেমন করে?

রয়ে গেছে হাতিঘাসের জঙ্গল, রয়ে গেছে সেই জলকুণ্ড যেখানে প্রথম পাতালের জল নিয়ে এসেছিল সাপ। আর রয়ে গেছে এই গল্প। 

ছবি- পিয়ালী বন্দোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতিঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। লেখালেখির সূত্রপাত স্কুল জীবন থেকেই। ছোটোবড়ো প্রত্যেকের জন্যই লেখেন। প্রথম সারির সমস্ত পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়। ‘অশেষ আকাশ’ এবং ‘অনন্ত আগামী’ লেখিকার প্রকাশিত দুটি বই। বাংলা ব্লগেও নিয়মিত লেখালেখি করেন।

No comments:

Post a comment