পুরোনতুন গল্প:: ত্রিপুর - অদিতি ভট্টাচার্য্য

ত্রিপুর

অদিতি ভট্টাচার্য্য


দেবতা আর অসুরদের মধ্যে ছিল ভয়ানক শত্রুতা, যুদ্ধ লেগেই থাকত। তাতে কখনো দেবতারা জয়ী হতেন, কখনো বা অসুররা। একবার এরকমই এক ভীষণ যুদ্ধে দেবতারা অসুরদের পরাস্ত করলেন। অসু্ররা বুঝল যে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে গেলে তাদের আরো শক্তিশালী হতে হবে তখন অসুরদের রাজা ছিল তারকাসুর। তার তিন ছেলে – তারকাক্ষ, কমলাক্ষ আর বিদ্যুন্মালী। ব্রহ্মার কাছে বরলাভ করার জন্যে তারা তিনজন কঠোর তপস্যা শুরু করল। বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হয় কিন্তু তাদের তপস্যা আর শেষ হয় না, বরং তা কঠোর থেকে কঠোরতর হয়। অবশেষে একদিন ব্রহ্মা প্রসন্ন হলেন। তপস্যারত তিন ভাইয়ের সামনে তিনি আবির্ভূত হলেন তাদের ঈপ্সিত বর প্রদান করার জন্যে।

তারকাক্ষ, কমলাক্ষ আর বিদ্যুন্মালী তো খুব খুশী, তাদের তপস্যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। তারা ব্রহ্মাকে প্রণাম করে বলল, “প্রভু, যদি আপনি আমাদের তপে সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে এই বর দিন যেন আমরা সর্বভূতের অবধ্য হই, ত্রিভুবনের কেউই যেন আমাদের কখনো হত্যা করতে না পারে

ব্রহ্মা কিন্তু এই বর দিতে রাজী হলেন না, বললেন, “অমরত্ব লাভের অধিকারী সবাই হয় না। তোমরা অন্য কোনো বর প্রার্থনা করো।”

তিন ভাই তখন গভীর পরামর্শ শুরু করল। অনেক ভাবনা চিন্তার পর তারা ব্রহ্মাকে বলল, “ভগবান, আমরা তিনজন তিনটি নগরে বাস করতে ইচ্ছুক। এই তিনটি নগর এমন হবে যাতে অবস্থান করে আমরা ত্রিলোকে বাধাহীনভাবে বিচরণ করতে পারব। এই নগর তিনটিতে আ্মাদের প্রয়োজনীয় সমস্ত বস্তু থাকবে এবং দেব, দানব, মানব, যক্ষ, রাক্ষস – কেউ এদের বিনষ্ট করতে পারবে না। এমন কী কোনো দৈব অস্ত্র বা ব্রক্ষ্মশাপও এই তিনটি পুরের কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। হাজার বছর পরে একদিন কিছুক্ষণের জন্যে আমরা তিনজন মিলিত হব, তখন আমাদের ত্রিপুরও এক হবে। সেই সময় যদি কোনো দেবতা একটি মাত্র বাণে ত্রিপুর ভেদ করতে পারেন তবেই আমাদের মৃত্যু হবে।”

ব্রহ্মা “তথাস্তু” বলে চলে গেলেন।

মনোমতো বর পেয়ে তারকাক্ষদের তিন ভাইয়ের আনন্দের আর সীমা পরিসীমা রইল না। এ তো প্রায় অমরত্ব লাভেরই সমান হল। ত্রিপুরকে একটি মাত্র বাণে বিদ্ধ করা কি যে সে কাজ! তারকাক্ষরা নিশ্চিত যে কেউই  এ কাজ করতে পারবে না। তারা ময় দানবকে নিযুক্ত করল নগর তিনটি নির্মাণের কাজে। স্থপতি হিসেবে ময় দানবের খুব খ্যাতি ছিল। তাছাড়া তপোবল তারও কিছু কম ছিল না, অনেকরকম মায়া, জাদুবিদ্যা জানত সে। ময় একটি সোনার, একটি রুপোর আর একটি লোহার পুর তৈরি করল। সোনার পুরটি রইল স্বর্গে, রুপোরটি অন্তরীক্ষে আর লোহারটি পৃথিবীতে। এই তিনটি বিরাটাকার পুরেই বহু সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, অট্টালিকা, ফুলে ফলে ভরা বাগান, চওড়া চওড়া রাজপথ, তোরণ ইত্যাদি তৈরি হল। দেবতাদের দ্বারা পরাজিত, বিতাড়িত অসুর, দানবেরা দলে দলে এই ত্রিপুরে আশ্রয় নিতে লাগল। তাদের পক্ষে এত নিরাপদ স্থান আর কোথাও ছিল না। ময় দানবের মায়ার প্রভাবে তারা যখন যা চাইত তাই পেত

তারকাক্ষের এক পুত্র ছিল, তার নাম হরি। সেও ব্রহ্মার তপস্যা করেছিল। তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাকে বর দিতে চাইলে সে বলল, “আমি আমাদের ত্রিপুরে এমন পুকুর তৈরি করতে চাই যাতে স্নান করলে মৃত অসুররাও প্রাণ ফিরে পাবে।”

ব্রহ্মা হরিকে সেই বরই দিলেন। হরি তো মহা আনন্দিত হয়ে ত্রিপুরের প্রতিটা পুরেই একটি করে মৃত সঞ্জীবনী পুকুর তৈরি করল।এরপর চতুর্দিকে অসুরদের অত্যাচার ক্রমশই বাড়তে লাগল। যদি বা কোনো অসুর মারা যায়, অন্যরা তাকে এনে মৃত সঞ্জীবনী পুকুরের জলে স্নান করায় আর অমনি সে জীবিত হয়ে ওঠে। অসুরদের আর কোনো ভয়ই রইল না। তারা যা খুশী তাই করে বেড়াতে লাগল। ত্রিভুবনে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল।অসুরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর অস্ত্র বজ্র নিক্ষেপ করলেন ত্রিপুরের ওপর। কিন্তু ব্রহ্মার বরে বজ্র ত্রিপুরের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারল নাতখন নিরুপায় হয়ে দেবরাজ সহ সব দেবতারা ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হলেন এবং ত্রিপুর বিনাশের নিবেদন করলেন।

ব্রহ্মা বললেন, “আমার বর পেয়ে অসুররা সাহসী হয়ে উঠেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। এদের বিনাশ করা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু কেউ যদি একটি মাত্র বাণে ত্রিপুরকে বিদ্ধ করতে পারে তবেই তা সম্ভব। মহেশ্বরই একমাত্র এই কাজ করতে পারবেন, তোমরা তাঁর শরণাপন্ন হও।”

দেবতারা ব্রহ্মাকে সঙ্গে নিয়ে মহেশ্বরের কাছে গেলেন এবং তাঁর স্তব করে তাঁকে সন্তুষ্ট করলেন।

ব্রহ্মা অসুরদের অত্যাচারের কথা জানিয়ে বললেন, “একমাত্র আপনিই ত্রিপুর ধ্বংস করে অসুরদের হাত থেকে জগত সংসারকে রক্ষা করতে পারেন পিনাকপাণি। আপনি প্রসন্ন হোন, ত্রিপুর বিনাশ করুন।”

“ব্রহ্মার বর লাভ করার পর অসুরদের শক্তি অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি একা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে উৎসাহী নই। তোমরা সব দেবতারা এক হও, আমি আমার অর্দ্ধেক বল তোমাদের দিচ্ছি, তোমরা সম্মিলিত হয়ে যুদ্ধ করে অসুরদের পরাজিত করো,” দেবতাদের বললেন মহেশ্বর।

“আপনার অর্দ্ধেক বলও আমরা সকলে মিলে ধারণ করতে অসমর্থ। আপনিই বরং আমাদের সকলের সম্মিলিত শক্তির অর্দ্ধেক গ্রহণ করুন এবং শত্রু দমন করুন,” দেবতারা আর্জি জানালেন, “ত্রিপুর এক হওয়ার সময় শীঘ্রই আসছে। এই সুযোগ অসুরদের বিনাশ করার।”

মহেশ্বর সম্মত হলেন। তিনি দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির অর্দ্ধেক গ্রহণ করলেন। এর ফলে তিনি সকলের চেয়ে বেশী বলশালী হলেন এবং মহাদেব নামে খ্যাত হলেন।

মহাদেব অসুরদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করবেন, বিশ্বকর্মা এলেন তাঁর জন্যে রথ নির্মাণ করতে। সে এক অসামান্য রথ প্রস্তুত হল। পৃথিবী, হিমালয় পর্বত, গ্রহ, নক্ষত্র, নাগরাজ বাসুকি, সপ্তর্ষি মণ্ডল, নানান নদী ইত্যাদি দিয়ে রথের বিভিন্ন অংশ তৈরি হল। চন্দ্র আর সূর্য রথের চাকা হলেন। ইন্দ্র, বরুণ, যম আর কুবের হলেন রথের চার ঘোড়া। সুমেরু পর্বত হল রথের ধ্বজদণ্ড আর বিদ্যুৎ সহ মেঘ হল ধ্বজা। বিষ্ণু, অগ্নি, সোম মহাদেবের বাণ হলেন। ব্রহ্মা হলেন সারথি।

রথ দেখে মহাদেব প্রসন্ন হলেন। তিনি রথে আরোহণ করলেন এবং ব্রহ্মাকে বললেন রথ অসুরদের কাছে নিয়ে যেতে। অন্যান্য দেবতারাও অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে যুদ্ধযাত্রা করলেন। দেখতে দেখতে ঘোর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মহাদেব ধনুকে শর যোজনা করে অপেক্ষা করছিলেন এমন সময় সেই মুহূর্ত এল। ত্রিপুরের তিনটি পুর আলাদা আলাদাভাবে বিচরণ করতে করতে এক হল। দেবতারা উল্লসিত হয়ে উঠলেন। মহাদেব একটুও সময় নষ্ট না করে সেই দিব্য বাণ নিক্ষেপ করলেন ত্রিপুরের উদ্দেশ্যে। অসুরদের আর্তরবে চতুর্দিক ভরে গেল, ত্রিপুর শত শত অসুর সহ দগ্ধ হয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপিত হল।

________

তথ্যসূত্র - কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারত সারানুবাদ, রাজশেখর বসু।

ছবি- অভিনব সাহা

লেখক পরিচিতি: লেখক সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কর্মসূত্রে আরব দুনিয়াতেও থেকেছেন ভ্রমণ, ছবি তোলা, এমব্রয়ডারির পাশাপাশি লেখালিখিতেও সমান উৎসাহী নানান ওয়েব ম্যাগাজিন এবং পত্র পত্রিকায়  নিয়মিত লেখেন প্রকাশিত গল্প সংকলনগল্পের খোঁজে

No comments:

Post a comment