Showing posts with label রূপা মজুমদার. Show all posts
Showing posts with label রূপা মজুমদার. Show all posts

প্রবন্ধ:: স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অকুতোভয় নারী: কল্পনা দত্ত - রূপা মজুমদার


স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অকুতোভয় নারী: কল্পনা দত্ত
রূপা মজুমদার

পরাধীন ভারতে অনেক বিপ্লবী দলই মেয়েদের দলে নিতে আগ্রহী ছিল না, কারণ সেই সময় বিপ্লবী কাজে প্রতি মুহূর্তেই বিপদ ওত পেতে বসে থাকত। সেই সময় অনেকেই মনে করত মেয়েরা কোমল হৃদয়যুক্ত দরদী হয়ে থাকে আর সে কারণে বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বিপ্লব করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। এছাড়াও সে সময় অনেকেই মনে করতেন দলে মেয়ে থাকলে অর্থাৎ একটি ছেলে ও একটি মেয়ে পাশাপাশি কাজ করলে ছেলেদের নৈতিক আদর্শেরও স্খলন ঘটতে পারে। আর এই ধরনের মনোভাবের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন কল্পনা দত্ত।
তিনি লিখেছিলেন, “It was an iron rule for the revolutionaries that they should keep aloof from the women.” আর তিনি এই কঠোর নিয়মের প্রতিবাদ করে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা এবং চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অন্যতম সদস্যা ছিলেন কল্পনা দত্ত। ১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর অঞ্চলের বোয়ালখালি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার বাবা ছিলেন বিনোদ বিহারী দত্ত আর মা ছিলেন শোভনবালা দত্ত। চট্টগ্রামের স্বনামধন্য ব্যক্তি ডাক্তার দুর্গাদাস দত্ত ছিলেন কল্পনা দত্তের ঠাকুরদা। তার ঠাকুরদাকে ইংরেজ প্রশাসন যথেষ্ট সম্মান দিত আর সেই কারণেই তাদের বাড়িটা সব সময় পুলিশের নজরের বাইরে থাকত।
ছোটোবেলা থেকেই কল্পনা দত্ত ছিলেন অন্যান্য মেয়েদের থেকে আলাদা। তিনি ছিলেন স্বপ্নবিলাসী, স্বপ্ন দেখতেন সুখী সমৃদ্ধ সমাজের। কৈশোর থেকেই তার মধ্যে স্বদেশী ভাবনা জাগ্রত হতে শুরু করে। তার মনে বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা দিনকে দিন বাড়তে শুরু করে, এই সময় তিনি বিভিন্ন ধরনের স্বদেশী বই পড়তে শুরু করেন। আর এই সমস্ত স্বদেশী বই পড়তে পড়তেই তার মনে স্বাধীন ভারত গড়ার স্বপ্ন প্রকট হয়।
পড়াশোনায় ভীষণ ভালো ছিলেন কল্পনা দত্ত। চট্টগ্রামের খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন তিনি। সে সময় তিনি মেয়েদের মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে আইএ প্রথম বর্ষের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন। বেথুন কলেজে পড়ার সময় থেকেই কল্পনা দত্ত নানা রকমের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। বেথুন কলেজে সেই সময় গড়ে উঠেছিল ছাত্রী সংঘ, আর কল্পনা বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই ছাত্রী সংঘে যোগ দেন। ছাত্রী সংঘের কাজ ছিল বিভিন্ন ধরনের হরতাল করা এবং নানাবিধ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা। সেই সব বৈপ্লবিক কাজে পুরোপুরিভাবে জড়িয়ে পড়েন কল্পনা দত্ত। লেখাপড়ায় ভালো হওয়ার জন্য তিনি স্কলারশিপ পেতেন। বিপ্লবী হিসেবে নিজেকে শক্তপোক্ত বানানোর জন্য সেই স্কলারশিপ-এর টাকায় তিনি একটি সাইকেল কিনেছিলেন এবং রোজ ভোরবেলা বেথুন কলেজের কম্পাউন্ডের মধ্যেই সাইকেল চালানো শুরু করেন। এছাড়াও প্রতি রবিবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়ে নৌকা চালানো অভ্যাস করতেন তিনি।
এই সময়ই চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতা সূর্য সেনের অনুগামী পূর্ণেন্দু দস্তিদার-এর সঙ্গে পরিচয় হয় কল্পনার। আর পূর্ণেন্দু দস্তিদার এবং প্রীতিলতার প্রভাবেই তিনি বিপ্লবী দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কল্পনার মতন একজন বিপ্লবী-মনস্কা নারীকে পেয়ে তাকে সবরকমভাবে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন পূর্ণেন্দু দস্তিদার। আর পূর্ণেন্দুর মাধ্যমেই মাস্টারদা-সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে কল্পনার। এর পরেই কল্পনা মাস্টারদার প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’-র চট্টগ্রাম শাখায় যোগদান করেন। সে সময় মহিলাদের বিপ্লবী দলে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু মাস্টারদা সূর্য সেন সমস্ত নিয়ম শিথিল করে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের সঙ্গে সঙ্গে কল্পনা দত্তকেও তার দলে স্থান দিয়েছিলেন।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সারা দেশে আলোড়ন ফেলে দেয়। এই অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরবর্তী সময়কালে বিপ্লবী কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য কল্পনা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর এরপরই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের দায়ে অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল সহ অনেক বিপ্লবী নেতা গ্রেপ্তার হন আর সূর্য সেন আত্মগোপন করেন। বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায়ের মাধ্যমে মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে অনেক কষ্টে সাক্ষাৎ করেন প্রীতিলতা আর কল্পনা। মাস্টারদার কাছে সশস্ত্র বিপ্লবে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার কথা বলেন। আর এরপর মাস্টারদা তাদের বিপ্লবী দলের শপথ বাক্য পাঠ করান।
১৯৩১ সালের এপ্রিল মাসে এক বিশেষ আদালতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের দায়ে বন্দি বিপ্লবীদের বিচার আরম্ভ হয়। আর সেই সময় মাস্টারদা বন্দি বিপ্লবীদের মুক্ত করার জন্য একটি দুঃসাহসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি ডিনামাইট ব্যবহার করে জেলের প্রাচীর উড়িয়ে বন্দিদের মুক্ত করা এবং আদালত ভবন ধ্বংস করার উদ্যোগ নেন। আর এই ডিনামাইট ষড়যন্ত্রে কল্পনা এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে আসার সময় তিনি কিছু বিস্ফোরক নিজের সঙ্গে লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, এছাড়াও দলের সদস্য হওয়ার পর অত্যন্ত মেধাবী এই বিজ্ঞানের ছাত্রীটি নিজের পড়ার ঘরে বসে বোমা বানানোর জন্য গান-কটন তৈরি করা শুরু করেন। আর এই সব বিস্ফোরক কল্পনার মাধ্যমেই জেলের ভেতর গোপনে চলে যেত।
এই ডিনামাইট ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা শেষ অবধি ফাঁস হয়ে যায় আর ব্রিটিশ সরকারের সন্দেহ তালিকায় উঠে আসে কল্পনার নাম, ফলে তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে তারা। সে সময় শুধুমাত্র চট্টগ্রাম কলেজে গিয়ে তাঁকে বিএসসি পড়ার অনুমতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার, কিন্তু বুদ্ধিমতী কল্পনা ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে রাতের বেলায় মাস্টারদার সঙ্গে গ্রামে ঘুরে গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন আর বন্দুক চালানো শিখতেন।
এরপরে সংগঠনের পক্ষ থেকে পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের জন্য বেছে নেওয়া হয় কল্পনা দত্ত আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। কিন্তু আক্রমণের আগেই কল্পনা যখন পুরুষের ছদ্মবেশে সহকর্মী নির্মল সেনের সঙ্গে মাস্টারদার কাছে দেখা করতে যান, সে সময় তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। কিন্তু দু-মাস জেলে থাকার পরে প্রমাণের অভাবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবুও পুলিশ তার বিরুদ্ধে ১০৯ ধারায় অর্থাৎ ভবঘুরে বলে মামলা দায়ের করে আর পুলিশের সন্দেহ-দৃষ্টি এড়াতে তাকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন মাস্টারদা সূর্য সেন।
১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সমুদ্র তীরবর্তী গ্রাম গৈরালাতে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে বিপ্লবীদের সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গী ছিলেন কল্পনা। এই সংঘর্ষে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেন ধরা পড়লেও কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘটনার তিন মাস পরে ১৯ মে গৈরালা গ্রামেই আরও একটি সশস্ত্র সংঘর্ষ হয় আর এই সংঘর্ষে কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে কল্পনাও গ্রেপ্তার হন। ওই বছরই ১৪ আগস্ট একটি বিশেষ আদালতে বিপ্লবীদের বিচার শুরু হয়। এই মামলার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সেকেন্ড সাপ্লিমেন্টারি কেস’। এই মামলার আসামি ছিলেন সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার আর কল্পনা দত্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতা, ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক আইন, অস্ত্র আইন, হত্যা প্রভৃতি ধারায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। বিচারে সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির আদেশ হয় আর কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের আদেশ হলেও সেটা পরে স্থগিত হয়ে যায়। মামলায় স্পেশাল ট্রাইবুনাল জজ বলেছিলেন যেহেতু কল্পনা মেয়ে এবং তার বয়স কম, তাই তাকে প্রাণদন্ডে দণ্ডিত করা গেল না।
শাস্তি পাওয়ার পরে কল্পনাকে হিজলি স্পেশাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর সেখানেই তার হাতে আসে জায়াড, কোল, বানার্ড শ-এর লেখা সোস্যালিজম, কমিউনিজম সম্বন্ধে কিছু বই। এই বইগুলোর যুক্তি তর্ক তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আর এই সমাজতন্ত্রবাদ এবং সাম্যবাদই তাকে অন্য জগতে নিয়ে যায়।
১৯৩৭ সালে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় বিনা বিচারে রাজবন্দিদের ছেড়ে দেওয়া, রাজনৈতিক বন্দিদের আন্দামান থেকে নিয়ে আসা এবং তাদের মুক্তি দেওয়ার দাবিতে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই বছরই নভেম্বর মাসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কল্পনার মুক্তির আবেদন জানিয়ে গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ১৯৩৯ সালের ১ মে ছাত্র আন্দোলনের চাপে কল্পনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। প্রায় ছয় বছর কারাভোগের পরে ছাড়া পান কল্পনা দত্ত।

এরপর তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং সেখানেই শুরু হয় তার অন্য জীবন। সে সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। আর এই নিষিদ্ধ থাকা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন কল্পনা।
সে সময় তিনি দলের মহিলা আর কৃষক সংগঠনকে চাঙ্গা করেছিলেন। মালিপাড়া, ধোপাপাড়া, কুলিপাড়া, সাঁওতাল পাড়া প্রভৃতি জায়গায় গিয়ে গোপনে তাদের সঙ্গে সভা করতেন কল্পনা। তিনি মনে করতেন সাম্যবাদই প্রকৃত দেশপ্রেম। আর সাধারণ জনগণের মনে এই দেশপ্রেম নামক আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার কাজে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন।
১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রী পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার ফলে কলকাতা ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন কল্পনা। ১৯৪৩ সালে বাংলায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সেই সময় কল্পনার নেতৃত্বে মহিলা সমিতি ক্ষুধাতুর মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় এবং তাদের সেবায় নিযুক্ত হয়। সে বছরই কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করেন কল্পনা। আর বছরের শেষে মুম্বাইতে একটি সম্মেলনে চট্টগ্রামের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। সেখানেই পরিচয় ঘটে তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পি. সি. যোশীর সঙ্গে। ১৯৪৪ সালে পি. সি যোশীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কল্পনা। বিয়ের পর চট্টগ্রামে ফিরে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে আইনসভার নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে প্রার্থী ছিলেন কল্পনা দত্ত, আর কংগ্রেস থেকে দাঁড়িয়েছিলেন নেলি সেনগুপ্ত। কল্পনা দত্ত অবশ্য সে সময় বিজয়ী হতে পারেননি।
১৯৪৭ সালের পর ভারতে চলে আসেন কল্পনা। ১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটে চাকরি নেন। পরবর্তীকালে তিনি দিল্লি চলে যান। কল্পনা রুশ এবং চীনা ভাষায় দক্ষ ছিলেন। আর সেই জন্য পরবর্তীকালে দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ রাশিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ-এর সম্পাদক ও শিক্ষিকা হন তিনি। দিল্লি থাকাকালীন তিনি নারী আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার মৈত্রী সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল লক্ষণীয়।
ইংরেজি এবং বাংলা ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন কল্পনা। চল্লিশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন মুখপত্র ছিল ‘পিপলস ওয়ার’। এই মুখপত্রটিতে কল্পনা নিয়মিত তৎকালীন সামাজিক বিষয়ের উপর লিখতেন। তার লেখা ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ নামক বইটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপরে ‘চট্টগ্রাম অভ্যুত্থান’ নামে আরও একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কল্পনা দত্তর লেখাগুলি গবেষকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
মাস্টারদা সূর্য সেনের প্রিয় পাত্রী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্নিকন্যা, বীরাঙ্গনা কল্পনা দত্ত ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে কল্পনা দত্ত একটি চিরস্মরণীয় নাম।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

শব্দ রেল:: কবিতা পাঠের অডিও: এপ্রিল ২০২০

শব্দ রেল
কবিতা পাঠের অডিও
শুনতে হলে ক্লিক করো ভিডিও-গুলিতে

(১)
ছড়াঃ বিষম সংকট
রচনা ও পাঠঃ রূপা মজুমদার


(২)
কবিতাঃ মৃত্যু বর্ডারে আছি
রচনা ও পাঠঃ দীপ মুখোপাধ্যায়

_____

মুখোমুখি (ভিডিও) :: এপ্রিল ২০১৮ :: চুমকি চট্টোপাধ্যায় ও রূপা মজুমদার

মুখোমুখি (ভিডিও)

ম্যাজিক ল্যাম্প পত্রিকার তরফ থেকে ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে এবার আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম বাংলা শিশুকিশোর সাহিত্যের এই সময়ের দু'জন অভিভাবকস্থানীয় এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের। একজন কিশোর ভারতী পত্রিকার সহ-সম্পাদিকা এবং লেখিকা শ্রীমতী চুমকি চট্টোপাধ্যায়, অন্যজন শুকতারা এবং নবকল্লোল পত্রিকার সম্পাদিকা শ্রীমতী রূপা মজুমদার। দু'জনেই আমাদের খুব কাছের মানুষ, ম্যাজিক ল্যাম্পের চলার পথে দু'জনেই নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়ে চলেছেন আমাদের। এখানে তুলে দেওয়া হল সেই আকর্ষণীয় আলাপচারিতা।

নিচের ভিডিও-তে ক্লিক করলেই দেখা যাবে সেই সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শ্রী সৌম্যকান্তি দত্ত
ক্যামেরায় সৌরদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মুখোমুখি চুমকি চট্টোপাধ্যায় এবং রূপা মজুমদার


_____

আমার ছোটোবেলা:: আমার ছেলেবেলা - রূপা মজুমদার


আমার ছেলেবেলা
রূপা মজুমদার

আমার ছেলেবেলা লিখতে বসে আজ মনের মধ্যে একগুচ্ছ স্মৃতি ভিড় জমিয়েছে। সবচাইতে বেশি মনে পড়ছে বাবার কথা। তিনি এখন আমাদের মধ্যে নেই। তিন বছর আগে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে তিনি চলে গেছেন। আমার একদম ছোটোবেলায় বাবা প্রথমে শিলিগুড়ি, তারপরে বহরমপুরে পোস্টেড ছিলেন। আমার যখন চার বছর বয়স তখন বাবা কলকাতায় ট্রান্সফার হয়ে আসেন। শিলিগুড়ির কথা আমার প্রায় কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে আমাদের রান্নাঘরের জানালা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যেত। বহরমপুরে সেন্ট ইমাকিউলেট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু বছরের মধ্যভাগে বাবার ট্রান্সফার হওয়াতে দু-তিন মাসের মধ্যেই স্কুল ছেড়ে দিতে হয়। মনে আছে, আমাদের চলে আসার আগের দিন স্কুল থেকে দু’জন সিস্টার বাড়িতে এসে আমাকে একটি গ্রিটিংস কার্ড, বই ও একটি খেলনা-ট্রেন উপহার দিয়েছিলেন। সেগুলো এখনও সযত্নে রাখা আছে।
আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা ছিলেন আই.আই.টি.র ইঞ্জিনিয়ার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত বিভাগের চিফ ইঞ্জিনিয়ার। স্বচ্ছলতার মধ্যে বড়ো হলেও বাজে আবদার বা বায়না আমার কোনওদিনই ছিল না। প্রয়োজনের বাইরে কিছু চাইতে বা নিতে আমি কোনওদিনই পছন্দ করতাম না। অবশ্য ব্যতিক্রম ছিল বইয়ের ব্যাপারে। বই উপহার পেতে ভালো লাগত এবং বইয়ের দোকানে গেলে একসাথে অনেক বই কিনে ফেলতাম। আর ভালোবাসতাম গল্প শুনতে। ঠাকুমাকে মনে আছে আবছা আবছা। তিনি আমাকে মেছোভূতের গল্প শোনাতেন। মেদিনীপুর জেলার কোলাঘাটের কাছে গোপালনগর আমাদের আদি নিবাস। ঠাকুমা বিয়ের পর বছর পাঁচেক ওখানে থাকেন। তারপর কলকাতায় চলে আসেন। ঠাকুরদা ছিলেন অঙ্কের মাস্টার। হেয়ার স্কুলের হেড মাস্টার। ঠাকুমার গল্পে বারবার চলে আসত গোপালনগর গ্রামের কথা। সন্ধ্যার পর স্টেশন থেকে যদি কেউ মাছ কিনে মেঠোপথ দিয়ে গ্রামে ফিরত, ভূতপেত্নীরা নাকি সুরে কেঁদে কেঁদে মাছ চাইত। এমনকি রাতের বেলায় সেই বাড়ির গিন্নি যখন মাছ ভাজতে বসত, সেই ঘ্রাণের টানে তারা অন্ধকার থেকে হাত বাড়িয়ে বলেই চলত - এঁকটা মাঁছ দেঁ নাঁ। আমার এই আজগুবি গল্প শুনতে খুব ভালো লাগত আর বার বার এই একই গল্প শুনতে চাইতাম। আবার ভয়ও পেতাম। ভয় পেলে ঠাকুমা বলতে শিখিয়েছিলেন –
‘ভূত আমার পুত
পেত্নি আমার ঝি
রামলক্ষ্মণ সাথে আছেন
করবে আমার কী?’
তা আমার এই ঠাকুমা অসুস্থ হয়েছেন, খবর এল বম্বে থেকে। তখন তিনি বম্বেতে ছিলেন আমার জেঠুর কাছে। আমি স্কুল থেকে বাড়ি এসে শুনলাম বাবা তৎক্ষণাৎ বম্বে পাড়ি দিয়েছেন। আমি তখন কে.জি. ক্লাসে পড়ি সেন্ট থমাস স্কুলে। সেই রাতেই বাবা ট্রাঙ্ক-কল করে ঠাকুমার মৃত্যুসংবাদ দিলেন। মৃত্যুকে আমার সেই প্রথম জানা। কয়েকদিন পর মা আমাকে নিয়ে বম্বে গেলেন। আমার জেঠতুতো তিন দাদা। মনে আছে, আমি অত শোক বা দুঃখ বুঝিনি। তিন দাদার সঙ্গে সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম। ঠাকুমার কাজ হয়ে যাওয়ার পরও বেশ কিছুদিন বম্বেতে ছিলাম। আর বড়দা, মেজদা, ছোড়দা আর ওদের ফ্ল্যাটের বন্ধুদের সঙ্গে বেশ ভাব জমে গিয়েছিল। বড়ো হয়ে দেশে-বিদেশে বহু জায়গায় কাজে বা বেড়াতে গিয়েছি। বম্বেও জেঠুর বাড়ি বহুবার গিয়েছি, কিন্তু ছেলেবেলায় জেঠুর বাড়িতে থাকার সেই স্মৃতি আজও আমার মনে জাগ্রত। ঠাকুমা আমার পাঁচ বছর বয়সে চলে গেলেন। ঠাকুরদা আমার জন্মের আগেই।
দাদু-দিদার আদর বলতে বুঝতাম আমার মামার বাড়ি। দাদু ছিলেন ডি.ভি.সি.-র চিফ ইঞ্জিনিয়ার। ছেলেবেলায় কত যে তিলাইয়া, পাঞ্চেৎ, মাইথন, কোনার ড্যামের ওপর বেড়িয়েছি তার হিসেব নেই। হাইডেল পাওয়ার প্ল্যান্টের ভিতরেও দাদু কয়েকবার নিয়ে গিয়েছিলেন। অবাক হয়ে দেখতাম মেশিনের কাণ্ডকারখানা। পাঞ্চেতে বছরে দু’বার যেতাম। যখন ড্যামের গেট খোলা হত, জলের কণা হাওয়ায় ভেসে বাংলো পর্যন্ত চলে আসত। কী ভালোই না লাগত! আর কী শব্দ! রাতের বেলায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে জলের সেই শব্দ উপভোগ করতাম। বাগানে দু’জন মালী ছিল। পদদাদা আর কোরবানদাদা। তারা আমার পুতুলের জন্য খাট আর চাকি-বেলুন তৈরি করে দিয়েছিল। এখনও আমার ওই দুটো আছে। আমি দাদু-দিদার খুব আদরের ছিলাম। দাদু আমাকে কুচুকমণি বলে ডাকতেন। রোজ রাতে শোওয়ার সময় দিদার কাছে গল্প শুনতাম। দিদা ঘুমিয়ে পড়লে ঠেলে ঠেলে তুলে দিয়ে বলতাম, “তারপর?”
দাদুর সঙ্গে আমার ছিল সবচাইতে বেশি ভাব। দাদুর যে টেবিলে ফোন রাখা ছিল তার পাশে একটা অকেজো বাতিল ফোন থাকত। ওটা আমার। দাদু যখন ফোনে কোনও কথা বলতেন আমি তখন পাশে দাঁড়িয়ে ওই ফোনটা থেকে আবোলতাবোল বকতুম। যত বড়ো হয়েছি, দাদু-দিদার আদর একটুও কমেনি। বরং বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছিল।
দাদু যখন রিটায়ার করে কলকাতা চলে এলেন, আমার আনন্দ আর ধরে না। মামার বাড়ি বেড়াতে গেলেই দাদু বলতেন, “কুচুকমণি কী কী চাই তার লিস্ট তৈরি করে ফেল।”
আর আমি কিছুতেই লিস্ট করতাম না। দাদুও ছাড়ার পাত্র নন। শেষে দিদা মধ্যস্থতা করে বলতেন, “ও যখন লিস্ট তৈরি করতে চাইছে না তখন তুমি জোর কোরো না। তুমি নিজেই পছন্দ করে কিনে দাও।”
তাই হত। দাদু বিভিন্ন জিনিস কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করতেন। গ্রেট ইস্টার্ন থেকে কেক, নিউমার্কেট থেকে টয়লেট-ট্রি, লেক মার্কেট থেকে চিংড়িমাছ, হাজরা মিট শপ থেকে মটন ইত্যাদি ইত্যাদি। দিদা খুব ভালো রাঁধতেন, বিশেষ করে চপ-কাটলেট। চিপস খেতে ভালোবাসতাম বলে বাড়িতে কী সুন্দর করে চিপস তৈরি করে প্যাকেটে ভরে দিতেন। সঙ্গে টোম্যাটো সস। না বলে দিলে কেউ বুঝবে না যে ওগুলো বাড়ির তৈরি। আজ তাঁরা নেই, কিন্তু আমার ছেলেবেলার বেশিরভাগটাই তাঁরা জুড়ে আছেন। লিখতে বসে পুরনো সেই দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আর মনটা কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।

আমি খুব পুতুল খেলতে ভালোবাসতাম। বেশ কয়েকটি পুতুল ছিল সংগ্রহে। তাদের জামাকাপড়, খাট – বিছানা, চিরুনি, রান্নার বাসন নিয়ে ছিল আমার সংসার। আর ভালোবাসতাম রঙিন হার্ড বাউন্ড ছবির বই দেখতে ও পড়তে। বাড়িতে শুকতারা, চাঁদমামা, চম্পক আসত। মা রাশিয়ান ফেয়ারি টেলস কিনে দিতেন। ঠাকুরমার ঝুলি পড়তে খুব ভালো লাগত। বার বার পড়তাম। একবার কাকা আমাকে রাক্ষস-খোক্কস-এর একটি বই দিয়েছিলেন। খুব ভালো লেগেছিল। এত ভালো লেগেছিল যে যেখানেই যেতাম বইটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। একবার বেড়াতে গিয়ে বইটা হারিয়ে ফেলি। কী মনখারাপই না হয়েছিল! বহুদিন পরে এই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে একদিন গো-ডাউনে পুরনো বই দেখতে গিয়ে হঠাৎ হাতে আসে আমার সেই ছেলেবেলার বইটি। নাম ‘ভূত-পেত্নী-দত্যি-দানো’ - প্রকাশক দেব সাহিত্য কুটির।
তখন স্কুলের বন্ধুদের বাড়িতে অত যাওয়া আসার ব্যাপার ছিল না। তাই বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা হত স্কুলের গণ্ডির মধ্যেই। স্কুলের বাইরে বন্ধু বিশেষ ছিল না। ফ্ল্যাটে আমার বয়সী কেউ ছিল না, নয় বড়ো বা একদম ছোটো। তাও ওদের সঙ্গেই বিকেলে আই স্পাই বা লক অ্যান্ড কট খেলতাম। বন্ধু বলতে বুঝতাম আমি মা’কে। বাবা তো অফিসের কাজেই ব্যস্ত থাকতেন। দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করতেন, তাই অফিসের কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। শুধু রবিবার আমরা তিনজন সিনেমা দেখে, পার্ক স্ট্রিটে রেস্তরাঁয় খেয়ে ফিরতাম। আমার এবং বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব ছিল মায়ের ওপর। মায়ের কাছেই পড়তাম অনেক বড়ো বয়স পর্যন্ত। গরমের ছুটিতে মায়ের সঙ্গে আত্মীয়দের বাড়িতে দেখা করতে যেতাম। এখন তো আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া উঠেই গেছে। আমার ছেলেবেলায় কিন্তু এই রীতি ছিল। সকলের বাড়িতে তো ফোন থাকত না। তাই না জানিয়েই চলে যেতাম। এখন অবশ্য কেউ কারোর বাড়িতে না জানিয়ে যাওয়া কল্পনাই করতে পারবে না। বিজয়ার সময় আবার আত্মীয়দের বাড়িতে যেতাম। তখন অবশ্য বাবাও যেতেন। আমাদের বাড়িতে অনেকে আসতেন। মা বাড়িতে কুচো নিমকি, ঘুগনি, নারকেল নাড়ু বানিয়ে রাখতেন। ফ্রিজে মিষ্টিও রাখা থাকত, কে কখন চলে আসে!
স্কুলে সেশন শুরু হত জানুয়ারি মাস থেকে। পরীক্ষা হয়ে যেত নভেম্বরে। তাই ডিসেম্বর মাসটা পুরো ছুটি পেতাম। এই সময় প্রচুর বই পড়তাম আর পুতুল খেলতাম। মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যেতাম চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তারামণ্ডল। আর যেতাম নিউ মার্কেট। খ্রিস্টমাসের সময় নিউমার্কেট যাবই যাব। সেই অভ্যাস আমার এখনও আছে। শীতকালে এই সময় আরেকটা জিনিস খুব ভালো লাগত সেটা হল নতুন ক্লাসের বইপত্র। মা ব্রাউন পেপার দিয়ে কভার দিতেন। আমি সামনে বসে লেভেল আটকাতাম। আর নাম লিখতাম। খ্রিস্টমাসের দিন মা বাড়িতে কেক বানাতেন। বাবা দোকান থেকেও আনাতেন। তাও বাড়িতে কেক হতই। তখন তো দোকান মানে ফ্লুরি, গ্রেট ইস্টার্ন, নাহোমস এবং জলযোগ। তা একবার হল কী, মা সবে আভেনে কেক বসিয়েছেন আর অমনি একটা শব্দ করে আভেনটা ফিউজ হয়ে গেল। কী হবে? মা বললেন, কড়াইয়ের ওপর বালি দিয়ে তার ওপর পাত্রটা বসালে কেক বেক করা যেতে পারে। যেমনি বলা অমনি কাজ। কাছেই মিস্ত্রিরা কাজ করছিল। সেখান থেকে বালি যোগাড় হল। সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু আমার অতিরিক্ত উৎসাহে পাত্রের ঢাকাটা বার বার খুলতে হচ্ছিল মাকে। তাই যখন কেক তৈরি হল খেতে গিয়ে দেখি বালি কিচ কিচ করছে। অগত্যা সেবার দোকানের কেক দিয়েই মন ভরাতে হয়েছিল।
ছেলেবেলায় নিউ ইয়ারের সময় গ্রিটিংস কার্ডের খুব চল ছিল। আমরাও কিনতাম। মা ঠিকানা লিখতেন আর প্রেরকের জায়গায় আমি নাম লিখতাম। এখন তো গ্রিটিংস কার্ডের কনসেপ্ট উঠেই গেছে।
তখন সকলের বাড়িতেই রেডিও শোনা হত খুব। আমিও শুনতাম গল্পদাদুর আসর। আর দেখতাম চিচিং ফাঁক। চিচিং ফাঁকে একবার এল কথা বলা পুতুল মাইকেল। কী আনন্দই না পেয়েছিলাম! পরে বড়ো হয়ে একটা মেলাতে সামনাসামনি মাইকেলকে দেখেছিলাম। তখন কি আর জানতুম, একে বলে ভেন্ট্রিলোকুইজম?
বাবা ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার পড়াশোনার প্রতি নজর তাঁর বরাবর ছিল। হয়তো বাবার থেকেই আমার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহটা পেয়েছি।
আজকে ছেলেবেলার বেশিরভাগ মানুষগুলোই হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা, স্মৃতি আমার মনের মণিকোঠায় সযত্নে রক্ষিত আছে।
_____