Showing posts with label পল্লব বসু. Show all posts
Showing posts with label পল্লব বসু. Show all posts

ছড়া-কবিতা:: পরির মার্কেটিং - রোজ ফাইলম্যান; অনুবাদ - পল্লব বসু


পরির মার্কেটিং
রোজ ফাইলম্যান
অনুবাদ - পল্লব বসু

মিষ্টি পরি গিয়েছিল মার্কেটিং-এ,
নিয়ে এল ছোট্ট একটা মাছ কিনে,
রাখল তাকে ছোটো কাচের বাটিতে,
সোনার ডিশ রাখল তার নিচেতে।
একটি ঘন্টা, বসে থাকে সে অবাক হয়ে,
দেখে মাছের রূপালি আলোর ঝিলিমিলি -
তারপরেই আলতো ছোঁয়ায় তাকে নিয়ে,
ভাসিয়ে নদীর জলে, দেখে জলকেলি।
আবার পরি যায় কোন এক দোকানে,
একটা রঙিন পাখি সে আনে কিনে।
উচ্চস্বরে পাখি গায় মিষ্টি গান,
এমন গানে ভরল পরির মন ও প্রাণ।
অর্ধেক দিন সে, এমনই করেই গান শোনে -
রঙিন খাঁচার পাশে বসে এক মনে,
তারপরেই, খাঁচার দরজা দেয় খুলে -
উড়ল পাখি দূর আকাশে ডানা মেলে।
পরি এবার আনল কিনে, নরম গাউন শীতের,
নরম সুতোর বুনন যে তার, কিনারা পাতলা ফিতের।
সারা বিকেল, পরমানন্দে নাচল গাউন পরে,
গাউনখানা সে উপহার দিল ব্যাঙকে তারপরে -
রাতভর ব্যাঙ থাকবে গরম, গাউন গায়ের 'পরে।
ছোট্ট একটা ইঁদুর কিনে আনল এবার পরি,
ছোট্ট ঘরে রাখল তাকে, ছোট্ট যে তার বাড়ি।
সারাটা দিন ইঁদুর ছোটে, বাড়িটা মাথায় করে,
খেলার শেষে, আদর করে, তাকে দিল ছেড়ে।

--------
মূল কবিতাঃ A Fairy Went A-Marketing - Rose Fyleman
ছবিঃ আন্তর্জাল

গল্পের ম্যাজিক:: ভুলোর কীর্তি - পল্লব বসু


ভুলোর কীর্তি
পল্লব বসু

।। ১ ।।

ভোম্বলের স্কুল ছুটি হয় দুটো চল্লিশে। স্কুল থেকে ওর বাড়ি হাঁটা পথে মিনিট দশেক। বাবা-মা দু'জনেই এসময় অফিসে থাকেন। ভোম্বল একা একাই বাড়ি ফেরে। গরমটা পড়েছে বেশ জাঁকিয়ে। রাস্তার পীচ গলতে শুরু করেছে। এসময় খাঁ খাঁ করছে রাস্তা। জনমনিষ্যির চিহ্ন তো নেইই, দু-একটা পাখি কিম্বা কুকুর বিড়ালও চোখে পড়ছে না। এই সময় রোজ ভোম্বল পাড়ায় ঢুকলেই ভুলো ছুট্টে আসে ওর কাছে। তারপর লেজ নাড়তে নাড়তে বাড়ি অবধি পিছন পিছন যায়। ভুলো ওদের পাড়ার নেড়ি কুকুর। ভোম্বলের সঙ্গে ভুলোর খুব ভাব। রাত্রে ওদের বাড়ির সামনের বারান্দাতেই ভুলো শুয়ে ঘুমায়। ভোম্বলও রোজ স্কুলের পাশের ঝালমুড়ি-কাকুর  থেকে দু-প্যাকেট ঝালমুড়ি কেনে। বাড়ির দরজায় এসেই ভুলোকে প্যাকেটটা দিয়ে মাথায় গলায় আদর করে ভোম্বল ঢুকে যায়, আর ভুলো গলার ভিতর থেকে আনন্দসূচক গরররর শব্দ করতে করতে ঝালমুড়ি খায়।
আজ কিন্তু ভুলোর দেখা নেই। ভোম্বল বেশ অবাক হয়। চিন্তাও হয় একটু। সকালে কিন্তু ভুলো পাড়ার মোড় অবধি এগিয়ে দিয়েছে ভোম্বলকে। চারিদিকে দেখতে দেখতে ভোম্বল এগোতে থাকে। মিলিদের বাড়ির পড়েই জঞ্জালের একটা ভ্যাট আছে। তারপরেই ভোম্বলদের খেলার মাঠ। মিলিদের বাড়ি পেরোতেই চেনা ডাকটা কানে ভেসে আসে ভোম্বলের। ভ্যাটের পাশেই ভুলো দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে বললে ভুল হয়, কান খাড়া করে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কতগুলো কাককে রীতিমতো তাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। মাঠের পাঁচিলের উপরে একটা চিল তার ছানাকে নিয়ে বসে নিচের দিকে একদৃষ্টে কিছু দেখছে বলে মনে হয় ভোম্বলের। ও এগিয়ে যেতেই কাকগুলো উড়ে বাড়ির কার্নিশ, পাঁচিলের উপরে আশ্রয় নেয়। মাটিতে চোখ যেতেই ভোম্বলের মুখটা ফুটবলের মতো হাঁ হয়ে যায়। ভ্যাটের পাশে পড়ে থাকা যে বস্তুটিকে পরম যত্নে ভুলো সকলের আক্রমন থেকে বাঁচিয়ে আগলে রেখেছে, সেটা আর কিছু না, একটি সাদা গজ কাপড়ে জড়ানো ফুটফুটে এক মানবশিশু। খুব ক্ষীণ একটা চিঁচিঁ আওয়াজ শিশুটির মুখ থেকে এতক্ষণে ভোম্বলের কানে এসে বাজে। ভুলো ভোম্বলকে দেখে পরম আনন্দে লেজ নাড়তে থাকে।
ভুলো পাড়ায় এখন বেশ কেষ্টবিষ্টু হয়ে গেছে। লোকাল থানার বড়োবাবু আর পাড়ার সবাই মিলে ভুলোকে পাঁঠার মাংস-ভাতের গ্র্যান্ড ফিস্ট করিয়েছে। মাত্র দু’দিনের মেয়েকে কেউ ওখানে ফেলে দিয়ে গেছিল। ভুলো যদি না রক্ষা করত, তবে কাকে চিলে ছিঁড়ে খেত শিশুটিকে। এক অর্থে ভুলোই ওর মা। ভোম্বলের কাছ থেকে নিয়ে শিশুটিকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।
ভুলো খুবই স্বভাবমিষ্টি কুকুর। সাধারণত এক পাড়ার কুকুর অন্য পাড়ার কুকুরদের এক্কেবারে সইতে পারে না। বেপাড়ার কুকুর দেখলেই রে রে করে তেড়ে আসে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, ভুলো আশেপাশের পাড়ায় অবাধে ঘুরে বেড়ায়। দু’দিন হল, ভুলোর চারটে ফুটফুটে ছানা হয়েছে। তুলতুলে দুটো বাচ্চা সাদাকালোয় ছোপ ছোপ, একটা লালচে বাদামি আর একটা মেটে রঙের। ভোম্বলদের বারান্দায় বস্তা পেতে ওদের জায়গা হয়েছে। ভোম্বল প্রত্যেক শনিবার বিকেলবেলা, মিউনিসিপাল অফিসের কাছে অঙ্ক স্যারের কোচিং-এ যায়। সন্ধ্যার সময় যখন ও কোচিং থেকে ফেরে, ভুলোও ওর পেছন পেছন যেন পাহারা দিতে দিতে আসে। স্যারের কোচিং-এর সামনের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় কালো রঙের একটা কুকুর। কোচিং-এর সবাই ওকে কালু বলে ডাকে। ওরও দিন কয়েক হল, মিষ্টি তিনটে কুচকুচে কালো বাচ্চা হয়েছে। কালুর সঙ্গে ভুলোর খুব ভাব। ভোম্বল ব্যাগে করে কালু ভুলো আর তাদের ছানাদের জন্য বিস্কুট নিয়ে যায়। আজ কোচিং থেকে বেরিয়ে এসে ভোম্বল, মিলি আর বাচ্চু, কালু-ভুলোর কাউকেই দেখতে পায় না। বড্ড অবাক হয়ে যায় ওরা। প্রবল বৃষ্টির দিনেও ভুলোর রুটিনের কোনও পরিবর্তন দেখা যায় না। ওরা কথা বলতে বলতে এগোতে থাকে। শিবমন্দিরের সামনে অনেক মানুষের জটলা। সেখানেই ভিড়ের মধ্য থেকে ভুলোর গলা পাওয়া যায়। সে অবশ্য ডাক নয়, একটানা করুণ আর্তনাদ, আর সঙ্গে কয়েকটা কুকুরছানার সমবেত চিৎকার। জটলার মধ্যস্থলে আসতেই কৌতূহল নিবৃত্ত হয় ওদের। একবার তাকিয়েই ওরা চোখ ফিরিয়ে নেয়। নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসা রক্তের দলার মতো কালুর নিঃস্পন্দ দেহ। কিছু আগেই একটা অ্যাম্বাসাডার পিষে দিয়ে চলে গেছে কালুকে। বোধহয় সন্ধেবেলা শিবমন্দিরে সন্ধ্যারতির পর ছেলেমেয়েদের নিয়ে পূজার ভোগপ্রসাদ পাবার আশায় এসেছিল কালু। সেটাই তার কাল হোল। ভোম্বল মিলিদের চোখগুলো ভিজে ওঠে কালুর অনাথ ছেলে মেয়েদের কথা ভেবে। একেবারে দুধের ছানা ওরা। ওদেরও বুঝি চিল শকুন কাকে ছিঁড়ে খাবে......
ভোরবেলা দাঁত মাজতে মাজতে রাস্তার বারান্দায় আসে ভোম্বল। ভুলো বস্তার উপরে শুয়ে বাচ্চাগুলোর গা চেটে দিচ্ছে, আর ওরা মায়ের কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে পরম শান্তিতে দুধ খাচ্ছে। ভোম্বলের দাঁত মাজা থেমে যায়। ও বেশ কয়েকবার চোখ কচলায়। না, কোনও ভুল নেই, চারটে নয়, সাতটা বাচ্চা নিজেদের মধ্যে দুধ খাওয়ার জন্য মারামারি করছে, আর ভুলো পরম যত্নে একটা মিশমিশে কালো রঙের ছানার গা মাথা চেটে দিচ্ছে!!!

।। ২ ।।

ভোম্বল হঠাৎ বিকেল থেকে নিরুদ্দেশ। স্কুল থেকে প্রতিদিন তিনটের মধ্যেই বাড়ি ঢুকে যায় ভোম্বল। বাড়িতে মানদামাসি থাকে, ভোম্বলের জন্য দুপুরের খাবার বেড়ে দেয়। খেয়ে ঘণ্টাখানেক একটু বিশ্রাম করে ভোম্বল খেলতে বেরোয়। কিন্তু আজ চারটে বেজে যেতেও যখন ভোম্বল ফিরছে না, মাসি তখন ভোম্বলের বাবাকে ফোন করে জানায়। তারপর তো কান্নাকাটি, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ফোন, থানা-পুলিশ এসব। কিন্তু, কোনও সন্ধানই পাওয়া যায় না ওর। কেবল ভোম্বলের স্কুলব্যাগ আর জলের বোতল মিলিদের বাড়ির সামনে থেকে কুড়িয়ে পাওয়া গেছে।
রাত্রিবেলা ভোম্বলদের ল্যান্ড নম্বরে ফোন এল, ওর মা তনিমা ফোনটা ধরেছেন -
“হ্যালো?”
“আপনার ছেলে ভোম্বল এখন আমাদের জিম্মায়। ভালোই আছে এখনও, একটু ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করছিল, তা, দুটো থাপ্পড় মারতেই এক্কেবারে চুপ। এখন বসে বসে কাঁদছে।”
“কী বলছেন কী, ওকে মারবেন না, আমরাই কখনও ওর গায়ে হাত তুলি না, প্লিজ, আপনাদের পায়ে পড়ি, ওকে ছেড়ে দিন?”
“আরে কাঁদবেন না, কাঁদবেন না। ওকে আটকে রেখে আমাদের কোনও লাভ নেই। দশ লাখ রেডি রাখুন, এর পরের ফোনে যেখানে রাখতে বলব সেখানে রেখে দেবেন, দেখবেন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে। আপনারা যদি আবার পুলিশ-টুলিশকে এসব কথা জানান, তাহলে  কিন্তু ছেলের বাড়ি ফেরার গ্যারান্টি আমি দিতে পারছি না।”
“আমাকে ওর সঙ্গে একবার কথা বলতে দিন না, হ্যালো, হ্যালো......?”
ফোনটা ততক্ষণে কেটে গেছে।

।। ৩ ।।

ভোম্বলের বোন তুলি ভুলোকে নিয়ে মনমরা হয়ে বিকেলবেলা ওদের বাড়ির ঠিক বিপরীতে যে ছোট্ট পার্কটা আছে সেখানে এসে বসে আছে। আজ অবশ্য ওকে সাহস করে একা বাড়ি থেকে ছাড়েনি, দাদু সঙ্গে এসে বেঞ্চে বসে আছেন। অন্যদিন ভুলো সারা পার্ক ছুটে বেড়ায় কখনও বেড়ালছানার পিছনে, কখনো তুলির ছুঁড়ে দেওয়া বলের পিছনে, আবার কখনও নিজের ল্যাজটাকে তাড়া করে বন বন করে ঘুরতে থাকে। তুলি দোলনায় দোল খায়, কাঠবিড়ালী তাড়া করে ছুটে যায়। আজ কিন্তু চরম ছন্দপতন হয়েছে, চুপটি করে তুলি দাদুর পাশে বসে ফ্রকের ফিতেটা আঙুলে জড়াচ্ছে। একপশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় আজ পার্ক ফাঁকা, দূরে অন্য একটা বেঞ্চে একটা ভবঘুরে টাইপের লোক বসে, কিন্তু অন্যান্য দিনের মতো বাচ্চারা নেই। ভুলো অবশ্য এদিক সেদিক ঘুরছে, কিন্তু ওর মধ্যেও সেই উদ্যমের কোনও চিহ্ন চোখে পড়ছে না।
ক্রমশ সন্ধে নামে পাখির ডানায়, তুলি আর ওর দাদু সমরবাবু একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎই যেন খেয়াল হয় সন্ধে হয়ে গেছে, তুলির হাত ধরে উঠে পড়েন। কিন্তু আশেপাশে কোথাও ভুলোকে চোখে পড়ে না। তুলি চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে সমস্ত পার্কটা একবার চক্কর দেয়, কিন্তু ভুলো ছুটে আসে না। এমনটা কক্ষনো হয়নি আজ অবধি, তুলিকে বাড়িতে পৌঁছে তবে শান্তি পায় ভুলো। ভুলোও কি তবে হারিয়ে গেল দাদার মতো?
ভবঘুরে লোকটা পায়ে পায়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে আসে। ভোম্বলদের বাড়ির দিকে দেখতে দেখতে খানিকটা এগিয়ে যায়। রাস্তার ধারে একটা বাইক দাঁড় করানো আছে, সেটাতে বসে ছুটিয়ে দেয় ন’পাড়ার দিকে।
রিলে রেস তোমরা কেউ দেখেছ? ধর রেসের মাঠে একটা মশাল নিয়ে একজন দৌড়োচ্ছে, কিছুটা দূরত্বে আরেকজন দাঁড়িয়ে থাকে, সে তার হাত থেকে মশালটা নিয়ে আবার ছোটা শুরু করে, এইভাবে শেষের দড়ি না ছোঁয়া অবধি চলতে থাকে দৌড়। একটা অদ্ভুত দৌড়ের সাক্ষী থাকল রাস্তার কিছু মানুষ আর ল্যাম্প পোষ্টের আলোগুলো। ন’পাড়ার লেকের এদিকটা খুবই নির্জন, ভুলো বাইকের পিছু নিয়ে কিছুদূর এসে থেমে যায়, তারপর ভউ ভউ করে ডেকে ওঠে। রাস্তার ধারে বসে থাকা দুটো কুকুর ভুলোর ডাক শুনে গা ঝেড়ে ওঠে, তারপর ছুট লাগায় বাইকটার পিছনে। ভুলোও কিন্তু ছুটতে থাকে। এইভাবে বিভিন্ন পাড়া থেকে কুকুর বাইকের পিছনে ছুটতে থাকে। ওদের মধ্যে অদ্ভুত এক বোঝাপড়া। বাইকের আয়নায় একবার চোখ পড়ে লোকটির, কিন্তু ভাবে কুকুরগুলোর এই এক সমস্যা, অচেনা লোক দেখলেই পিছু নেওয়া। রাজীবনগর কলোনির একটু পরেই একটা পরিত্যক্ত কারখানা আছে, তার সামনে বাইক নিয়ে এসে থামে লোকটি। ভুলো সমেত পাঁচটা কুকুর এসে একটু দূরে অন্ধকারে মিশে দাঁড়ায়। ওরা পুলিশের ট্রেনিং প্রাপ্ত কুকুর নয়, ওরা রাস্তায় অবজ্ঞায় উচ্ছিষ্ট খেয়ে বড়ো হয়ে ওঠা সামান্য নেড়ি কুকুর। কিন্তু ওদের কী অদ্ভুত সমন্বয়, কী অনবদ্য নেটওয়ার্ক!
লোকটি কারখানার ছোটো লোহার দরজাটায় তিনটে টোকা মারতেই দরজা খুলে যায়। বাইকটা নিয়ে মাথা নিচু করে ও ভিতরে ঢুকে যায়।
ভুলো বাকিদের পাহারায় রেখে ছুটতে ছুটতে ফিরে আসে ভোম্বলদের পাড়ায়। তুলি বাড়ির সামনের বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, ভুলোকে ছুটে আসতে দেখে গেট খুলে বেরিয়ে আসে।
ভুলো তুলির ফ্রক ধরে টানতে থাকে, আর মুখ ঘুরিয়ে বারংবার রাস্তার দিকে দেখাতে থাকে। তুলির মনে হয়, ভুলো ওকে কোথাও নিয়ে যেতে চায়। তুলি ওর পেছু নিয়ে গিয়ে হাজির হয় একেবারে থানায়। কিন্তু গেটে কনস্টেবল পথ আটকায়, একে একটা বাচ্চা মেয়ে, তায় সঙ্গে আবার একটা কুকুর, সোজা বড়ো সাহেবের ঘরে ঢুকে যেতে চায়, কী কাণ্ড। তুলি ভুলোকে ডেকে নিয়ে চলেই আসছিল, ভুলো মাথা নিচু করে তুলির পিছনে আসছিল, কনস্টেবলটিও বেশ খুশি হয়ে একটু বুঝি অন্যমনস্ক হয়েছে, ভুলো পেছন ঘুরে আচমকা ওর পায়ের ফাঁক গলে সিধে ও সি অতিন ঘোষের সুইং ডোরের তলা দিয়ে ঢুকে যায়। এই ঘরটা ও খুব ভালো চেনে, কারণ কয়েকদিন আগেই শিশুটিকে উদ্ধার করার পরে এই ঘরে ঢোকার সৌভাগ্য হয়েছিল ওর।

।। ৪ ।।

একটা মারুতি ওমনি এসে থামে কারখানার সামনে, একটা লোক নেমে এসে আবার দরজায় তিনটে টোকা দেয়, তার পরে পরেই কারখানার বড়ো গেটখানা হাট করে খুলে যায়, মারুতিটা ঢুকে যায় ভিতরে, কেউ খেয়ালও করে না দুটো কুকুর চুপটি করে লুকিয়ে গেছিল মারুতির পিছনে, গাড়ির পিছন পিছন ওরা ভিতরে ঢুকে দ্রুত লুকিয়ে পড়েছে দুপাশের পাঁচিলের ধারের ঝোপের অন্ধকারে। কারখানার দরজা বন্ধ করতে যায় একটি লোক, সেই সময় বাইরে অপেক্ষমান আরও দুটো কুকুর ঢুকে আসে গেট দিয়ে, একটা ঝাঁপিয়ে পড়ে দরজার লোকটির উপরে, বাকি তিনজনে বাকিদের উপরে......।
থানার বড়োবাবু অতীন ঘোষ মানুষটি একটু ভাবুক প্রকৃতির। থানায় বসে কাজের ফাঁকে যেটুকু অবকাশ পান, তার সদ্ব্যবহার করেন গল্প-কবিতা লিখে। শুকতারার পুরস্কৃত গল্পের বিভাগে মাঝে মাঝে তার লেখাও বেরোয়। আজও দুপুরের দিকে একটু হালকা যাচ্ছে থানার পরিবেশ। গরমে মানুষ ডাইরি লেখাতেও আর আসছে না। অতীনবাবু গুছিয়ে একটা গল্প লিখতে শুরু করেছেন। বিভোর হয়ে গেছিলেন, হঠাৎ প্যান্টে টান পড়ল। প্রথমে গ্রাহ্য করেননি। দ্বিতীয়বার টান পড়তে নীচে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। জলজ্যান্ত এক নেড়ি কুকুর তাঁর প্যান্ট ধরে টানছে। প্রথমে খুব একচোট রেগে গেলেন। গেটের কনস্টেবলের চোখ এড়িয়ে এটা ভেতরে আসে কী করে!! চিৎকার করতে গিয়েও থমকালেন। কুকুরটা দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ওনাকে কিছু ইশারা করছে, আর করুণ চোখে কিছু একটা বলতে চায়। উনি লেখেন। অনেকপ্রকার ভাবনা মনে আসে। কুকুরটা একবার ছুটে দরজার দিকে যায় আবার ফিরে এসে এবার মাটিতে আঁচড় কাটে, মুখ ঘষে আর কুঁই কুঁই শব্দ করতে থাকে।
ভালো দৌড়ঝাঁপ গেল অতীনবাবুর। এ এস আই জয়ন্ত, দুজন কনস্টেবল আর তুলিকে সঙ্গে নিয়ে জীপে ভুলোকে ফলো করে গিয়ে পৌঁছেছিলেন পরিত্যক্ত ওই কারখানায়। সেখানে গিয়ে তো একেবারে তাজ্জব। কারখানার বাইরে জিপ রেখে দেখেন, গেট হাট খোলা পড়ে, ভিতরে একটা ওমনি দাঁড়িয়ে, আর দরজার সামনেই পড়ে একটি লোক রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে, তার প্রহরায় একটি বাদামি-সাদা কুকুর। সেটাকে পিছনে ফেলে একটু এগোতেই দেখেন একটা তালা দেওয়া ঘরের সামনে তিনটে লোক রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় গোঙাচ্ছে, আর তাদের ঘিরে আরও তিনটি কুকুর পাহারা দিচ্ছে। একজনের পকেট থেকে পিস্তলের বাঁট বেরিয়ে আছে দেখা যায়, কিন্তু কুকুরে ওর দুটো হাত এমনভাবে কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে, যে পিস্তল তো দূরস্থান, হাত নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও নেই। তুলি ওদের মধ্যে একজনকে ইঙ্গিত করে জানায় ওই লোকটিই ভবঘুরের বেশে ওদের বাড়ির বিপরীতের পার্কে বসে ওদের বাড়ির উপরে সম্ভবতঃ নজর রাখছিল।
তুলি চেঁচিয়ে ওঠে, “ওই দেখ, ওর হাতে দাদার রুমালটা বাঁধা, তার মানে দাদাকে ওরাই চুরি করেছে। ও পুলিশকাকু, দাদাকে এখানেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে বোধহয়। দাদা, অ্যাই দাদা, কোথায় তুই, আমি তুলি, দাদাআআআআআআ.........”
“তাই তো, এবার আমি সবটা বুঝতে পারছি। এই লোকটির হাত কোনোভাবে কেটে গেছিল, আর সে ভোম্বলের রুমালটাই হাতের কাছে পেয়ে ক্ষতটা বেঁধেছিল, আর সঙ্গে নিজের পায়ে কুড়ুল মেরেছিল। ভুলো পার্কে ঘুরতে ঘুরতে ওর গা থেকে ভোম্বলের গন্ধ পেয়েই ওর পিছু নিয়েছিল, আর যার এই ফল।”
একটা কুকুরের মুখে একটা চাবির গোছা, সম্ভবতঃ আহতদেরই কারও কাছ থেকে উদ্ধার করেছে। ওরা চাবি নিয়ে ঘর খুলে দেখে, দুটি ছেলে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় বন্দি রয়েছে, সম্ভবত ঘুমের ওষুধের ঘোরে অচেতন। ওদের একজনই ভোম্বল। ওদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে, প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে, ছেলেধরাদের ব্যবস্থা করে, এসে হাজির হলেন ভোম্বলের পাড়ায়। ভোম্বলের বক্তব্য অনুযায়ী -
স্কুল থেকে ফেরার পথে পাড়ার মাঠের সামনে থেকে একটা ওমনিতে দু’জন মুখোশ পরা লোক ভোম্বলকে উঠিয়ে নেয়। ভুলো কোনও কারণে তখন পাড়ায় ছিল না, সারা পাড়া তখন নিস্তব্ধ। ভোম্বলকে ক্লোরোফর্ম করার আগেই ওর সঙ্গে কিছুটা ধ্বস্তাধস্তি হয়, সেইসময় ভোম্বল ওই ভবঘুরে লোকটির হাতে কামড়ে দেয়। অজ্ঞান হওয়ার আগে দেখেছিল, লোকটি ভোম্বলের পকেট থেকে রুমাল বার করে হাত বাঁধছে আর গালি দিচ্ছে ওকে।”

পরিশিষ্ট

কলকাতা শহরের রাস্তায় রাস্তায়, পাড়ায় পাড়ায়, পরম অবজ্ঞায় আর নিতান্ত অনাদরে, মানুষের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বা কোনও কোনোদিন উপবাসে বেড়ে ওঠা মানুষের আদি অনন্তকালের পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী কুকুর, বারংবার এই শহরকে ঋণী করে তুলেছে তাঁদের কাছে। কখনও রুখে দিয়েছে, বড়ো কোনও ডাকাতি কিম্বা জঙ্গি কার্যকলাপ। আবার কখনও, সে পরিত্যক্ত শিশুকন্যাকে মায়ের মতো নিজের বুকের দুধ খাওয়াতেও কুণ্ঠিত হয়নি। কখনও আবার লুকিয়ে রাখা বোমা টেনে বার করতে গিয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। কখনও সাপের কামড়ের হাত থেকে ছোট্ট শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে সাপের বিষে নিজে নীল হয়ে গিয়েছে। আততায়ীর অতর্কিত আঘাতের হাত থেকে মনিবকে বাঁচাতে গিয়ে সমস্ত ছুরির আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে মৃত্যুবরণও করেছে। তবে, অতীতের সবকিছুকে ছাপিয়ে, সামান্য নেড়ি কুকুরের দলের এমন সংঘবদ্ধ এবং বুদ্ধিমান পদক্ষেপ, ভুলোর নেতৃত্বে কলকাতা দেখল এই প্রথম। রাজ্যপালের হাত থেকে ভুলো আর তার দলবলের তরফে, ভোম্বল যখন সাহসিকতার পুরষ্কার নিচ্ছে, সারা পাড়া তখন চেঁচাচ্ছে হিপ হিপ হুররে। কিন্তু এই শেষ কথা নয়, আজ প্রমাণ হয়েছে, পাড়ার কুকুরগুলো প্রতিটা পাড়ার সম্পদ, সামান্য খাবার আর একটু সমাদরের বিনিময়ে তাঁরা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ফিরিয়ে দিতে জানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ভুলো জিন্দাবাদ!! কোলকাতার সমস্ত সারমেয় জিন্দাবাদ!!
_____
ছবিঃ রুমেলা দাশ

গল্পের ম্যাজিক:: চিকিৎসা সংকট - পল্লব বসু


চিকিৎসা সংকট
পল্লব বসু

মানব শরীর বড়ো জটিল। আর তেমনি বিচিত্র আর অগণিত তার রোগ। ছয় সাত বছর ধরে ডাক্তারি পড়ে একজন ডাক্তার মাত্র তার তিরিশ-চল্লিশ শতাংশই জেনে উঠতে পারেন। আর তারপর সারা জীবন ধরে অভিজ্ঞতার আলোয় হয়তো আর কুড়ি-তিরিশ শতাংশ শেখেন। একজন্মে সব জেনে ফেলা প্রায় অসম্ভব। আর সব কিছু তো বিজ্ঞানই এখনও জানে না, ডাক্তার জানবে কেমন করে? এখন গুগুলের হাত ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষের হাতের মুঠোয়। সব রোগের চিকিৎসা সেখানে লেখা আছে। তবুও ডাক্তারের কী প্রয়োজন? প্রয়োজন শরীরে হাত দিয়ে পরীক্ষার, আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার, যেটা ডক্টর গুগুল, মিস্টার ইন্টারনেট আর সর্বজ্ঞ নেটিজেনদের নেই। তাই বুকের বামদিকে ব্যথা ‘অ্যাসিডিটি’-র জন্য, নাকি হৃদযন্ত্রের ব্যথা, নাকি ফুসফুসের টিউমার থেকে হচ্ছে, কিম্বা বুকের মাংসপেশি বা হাড়ে বেদনা এটা গুগুল বা নেট বলে দিতে পারে না। পারে ডাক্তারের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান আর স্পর্শ। আর তাই আজও অসুখ বিসুখে মানুষ চিকিৎসকের কাছে ছোটে, গুগুলের কাছে নয়। আর তার অন্যথা ডেকে আনতে পারে ভয়ানক বিপদ। এই গল্প হাসি মজার ছলে জীবনের এই অনস্বীকার্য ধ্রুব সত্যকেই তুলে ধরেছে।

।। ১।।

মিলনবাবু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন দেখেন। বাস্তবে তাঁর মতো হাড়কেপ্পন মানুষের জুড়ি মেলা কঠিন। সরকারি অফিসে ভালো চাকরি করেন। কিন্তু, খরচের ব্যাপারে দশ পা দূরে। সাহায্যপ্রার্থীরা তাঁকে আড়ালে মক্ষীচুষ বলেন, পাড়ার ক্লাবের পূজা কমিটির ছেলেরা তাঁকে দেখলে আওয়াজ দেয়, কারণ গেল দুর্গা পূজায় যখন শেষ অবধি অনেক দরাদরির পর দশ টাকা চাঁদা দিতে রাজি হলেন, পাড়ার পরোপকারী বিশু উলটে ওনাকেই মিষ্টি খাবার টাকা ধরিয়ে এসেছিল, আর সেটা উনি ভালোবেসে নিয়েও নিয়েছিলেন। রবিবার বাজার করতে যান সবসময় বেলার দিকে। কারণ সে সময় কিছু পচা সবজি, বাতিল ফল আর মরা মাছ পড়ে থাকে। সেগুলো সস্তায় কেনার জন্যও যে পরিমাণ দরাদরি উনি করেন, তাতে বিরক্ত হয়ে শেষমেশ বিক্রেতা অনেক কমেই পরিত্যক্ত সামগ্রী ওনার হাতে তুলে দেন। তবে কেউ ওনার মেয়ে তুলির ফেসবুকের পোস্ট দেখে বিভ্রান্ত হবেন না যেন। আম কাঁঠালের মরশুমে হিমসাগরের ঝুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে পোস্ট কিংবা ইলিশ বিক্রেতাকে দশ টাকা দিয়ে হাতে দেড় কিলোর ইলিশ ধরে সেলফি আর তাতে বারো হাজার লাইক, কিংবা মাল্টিপ্লেক্সের বাইরে “অ্যামাজন অভিযানের” পোস্টারের সামনে ছবি, এসবের পিছনে লুকিয়ে থাকা তুলির চোখের জল, বাবার বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভের মিথ্যে আস্ফালন অবশ্য কারও চোখে পড়ে না।
কিন্তু, মিলনবাবুর কার্পণ্য ধ্রুপদী মাত্রা পায় যখন তিনি বা পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবার বলতে স্ত্রী, মেয়ে আর বৃদ্ধা মা। বিভিন্ন রোগ ও তার নিরাময়ের ব্যাপারে মিলনবাবুর রিসার্চ ওয়ার্ক এবং নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় দেখলে যে কোনও প্রতিষ্ঠিত গবেষক ঈর্ষান্বিত হবেন। বেশ কিছুদিনের অক্লান্ত গবেষণা ও পরিশ্রমে অফিস কলিগ, আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোক, প্রতিবেশী এবং সর্বোপরি পাড়ার মেডিসিন শপের ছেলেটি, এঁদের সহায়তায় তিনি একটি ফাইল প্রস্তুত করেছেন। পরিবারের যে কোনও রকম অসুখে এই ফাইল একেবারে অব্যর্থ। অবশ্য উদাহরণ ব্যতীত বিষয়টা খোলসা হবে না। তুলি তখন আরেকটু ছোটো। ধুম জ্বর। ওর মা বার বার জলপট্টি করছেন, ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু জ্বর কমার নাম নেই। শেষে পাড়ার শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নাম লিখিয়ে এলেন। যখন চেম্বারে যাবার জন্য তৈরি, মিলনবাবু আটকে দিলেন। তাঁর বহু গবেষণালব্ধ ফাইলটি প্রথমবারের মতো সেবার বেরিয়েছিল। পাড়ার মিলি কিছুদিন আগে জ্বরে পড়েছিল, তুলির খেলার সঙ্গী, তাকে ডাক্তার দেখে যে প্রেসকিপশান করেছিল তার জেরক্স কপি বেরোল। না, বন্ধুরা,  মিলনবাবু জেরক্সে খরচ করেননি। মিলির বাবাই ওনার অনুরোধে জেরক্স করে দিয়েছিলেন ওনাকে। সেটাই মিলনবাবুর গবেষণার প্রথম সফল বাস্তব প্রয়োগ ছিল। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে, পরিবারের সবরকম অসুখবিসুখেই তাঁর গবেষণা একেবারে স্টেপ আউট করে ছক্কা হাঁকিয়েছে।

।। ২।।

দু-একটা সফল প্রয়োগের পরেই বাবার কুখ্যাতির ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকা তুলি হঠাৎ আবিষ্কার করে তাকে আর তার মাকে তার বন্ধুরা আর তাদের মায়েরা বেশ সম্ভ্রমের চোখে দেখছে। খেলার মাঠে সে যেমন বন্ধুদের কাছে কিপটের মেয়ে হিসেবে ব্রাত্য হয়ে থাকত, হঠাৎ করেই তার খাতির গেছে বেড়ে। ওকে আগে ব্যাট করতে দেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যাচ্ছে। যে ঝিমলি আম্পায়ারিং করার সময় খালি ওকে লেগ ষ্ট্যাম্পের অনেক বাইরের বলেও লেগ বিফোর দিয়ে আউট করে দিত, সে পরিস্কার উইকেটের পিছনের ক্যাচ ব্যাটে লাগেনি বলে মাথা নেড়ে দিচ্ছে, আর সকলে প্রতিবাদ না করে নির্দ্বিধায় সেটা মেনেও নিচ্ছে, এমনটা তুলির কাছে অভূতপূর্ব।
অফিস যাওয়ার আগে, সকালে পাড়ার শিবুর চায়ের দোকানে মিলনবাবু খানিক বসে থাকেন, সেটা শিবুর দোকানে রাখা খবরের কাগজটায় টুক করে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়ার জন্য। কোনোদিন যদি খুব ভিড় থাকে বা কাগজ বহু হাত ঘুরে আর ওনার কাছে এসে না পৌঁছায়, খুব একটা ক্ষতি হয় না ওনার। বেঞ্চে বসা লোকজনের আলোচনা থেকে ভারত সাউথ আফ্রিকার খেলার ফলাফল, কিম্বা শেয়ার মার্কেটের ধ্বস, ডিমানিটাইজেশান থেকে শতাব্দীর ডিরেইল হওয়া, আজ আর কালের ভাগ্যফল থেকে ভোটের সিট ভাগাভাগি সব খবরই বিনামূল্যে সংগ্রহ করে ফেলেন, অথচ খবরের কাগজের বা কেবলের পয়সা কিছুই গুনতে হয় না। যেটুকু খবর পেতে বাকি থাকে, সেটা অফিসে বসে, আর বাসে একটু চোখকান খোলা রাখলেই জোগাড় করে নেওয়া যায়। অফিস থেকে ফিরে মিলনবাবু গরমের দিনে একটু পার্কে বসেন। এতে কিছুটা হলেও সিলিং ফ্যানের বিল বাঁচানো যায়, যদিও ঘুমোনোর সময় ছাড়া উনি হাতপাখাই সাধারণতঃ ব্যবহার করেন - ভগবান হাত দিয়েছেন কীসের জন্য, তোমরাই বল? কিন্তু, ছেলে আর বৌ এত কুঁড়ে, ভগবানের দেওয়া হাতে জং ফেলে দিয়ে সর্বদা সিলিং ফ্যান চালিয়ে রাখবে। যাই হোক, উনি পার্কের বেঞ্চে এসে বসলেই সে বেঞ্চ থেকে লোকজন দ্রুত পাতলা হয়ে যায়। মিলনবাবু এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, তাই তেমন মাইন্ড করেন না। কিন্তু, পাড়ার রমেশ যখন উঠে গেল না, তখনই উনি বরঞ্চ মাইন্ড করলেন, কারণ এমনটি আগে কখনও ঘটেনি। রমেশ যখন একেবারে পাশে সরে এল, তখন উনি রীতিমতো ঘামতে শুরু করলেন। আসলে, যাকে লোকে এড়িয়ে চলে, তার কাছাকাছি কেউ এলে তার ভয় হবারই কথা। রমেশের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানেন না মিলনবাবু। শুনেছেন, সেলসম্যানের কাজ করে। তবে কি কোনও জিনিস বিক্রি করার ধান্দায় আছে ছেলেটি? এইসব সেলসম্যানরা খুব বলিয়ে কইয়ে হয়, আর এমনভাবে নিজের প্রোডাক্টের গুণকীর্তন করবে, আর একটা কিনলে দশটা ফ্রি গোছের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে দেবে যে ওনার মতো হারকেপ্পন মানুষও বিভ্রান্ত হয়ে কিনে ফেলতে পারেন। একবার বাসে আর একবার ট্রেনে এমনি ঠকে গেছিলেন মিলনবাবু। ট্রেনে উঠেই হকার ছেলেটি বলেছিল, “আজ আপনাদের জন্য কোম্পানির তরফে বিশেষ অফার। আপনি যদি এই একটি নীল কালির পেন দশ টাকা দিয়ে কেনেন, তাহলে শুধুমাত্র আজকের জন্য কোম্পানি এর সঙ্গে আপনাকে আরও দুটো লাল কালির পেন দিচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।” মিলনবাবু তখনও ফিরেও তাকাননি তাঁর দিকে। যত আজেবাজে জিনিস গছিয়ে দেবে। কিন্তু এরপর কান খাড়া হয়ে যায়, ছেলেটি যখন বলতে থাকে, “ভাবছেন এখানেই শেষ? এই তিনটি পেন নিলে, কোম্পানি আপনাকে কালো কালির আরও দুটো পেনও দিচ্ছে শুধুমাত্র সেই দশ, হ্যাঁ হ্যাঁ, মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে।” মিলনবাবুর বুকটা তখন কেমন ধড়ফড় করছে, তবু সংবরণ করেছিলেন নিজেকে, কিন্তু আর পারলেন না, যখন ছেলেটি আরও বলতে লাগলো, “হ্যাঁ, হ্যাঁ শুধুমাত্র এই শিয়ালদা নৈহাটি লাইনে, একমাত্র এই হকার বন্ধুর কাছেই শুধু আপনি পাবেন এই অফার, এবং সেটাও কেবল আজকের দিনের জন্যে। আর হ্যাঁ, এই পাঁচটি পেনই নয়, যিনি দশ টাকা দিয়ে এই অফারটি সংগ্রহ করবেন, কোম্পানি তাঁকে আজ প্রচারের খাতিরে আরও দুটি সবুজ কালির পেন দেবেন বিনামূল্যে। তাহলে এই সাতটি পেন যিনি সংগ্রহ করতে বা হাতে নিয়ে পরখ করে দেখতে চান, তিনি একটু আওয়াজ দেবেন। দেখাশোনা একেবারেই ফ্রি, কেনাকাটা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার।” এইবার মিলনবাবুর সংযমের সব বাঁধ ভেঙে পড়ল। বারবার পরখ করে কাগজে লিখে দেখে একসেট পেন নিলেন, আর নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরলেন। সত্যি খুব লাভ হয়েছে আজ। তুলি অনেকদিন ধরেই পেনের কথা বলছিল, সে নাকি বন্ধুদের কাছ থেকে পেন চেয়েচিন্তে লিখছে, লজ্জায় নাকি তার মাথা কাটা যায় এতে। কে জানে বাপু, বন্ধু বন্ধুকে ধার দেবে না তো কী? তাও সামান্য তো একটা পেন, সে কি এমন হাতি ঘোড়া? আজকালকার ছেলেমেয়েদের মান সম্মান বোধগুলোও যেন কেমন ধারা। কই তাঁর তো এমন লজ্জা বাতিক নেই? এই তো সেদিন বাসে উঠেই দেখেন অফিস কলিগ, ওনার অনেক জুনিয়র সুশান্ত বসে, ওনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। উনি কখনও চেনা কাউকে দেখলে বাসে ট্রামে চেনা দেন না, পাছে টিকিট কাটতে হয় তাই। কিন্তু, ও একেবারে দরজার সামনাসামনি পড়ে গেল। বসে থেকে ইতস্ততঃ করছিলেন। দুটো ভাড়া কাটার চিন্তায় মুখ শুকিয়ে গেছিল। পারতপক্ষে এই জন্য ফাঁকা বাসেই উনি ওঠেন না। কী অবাক লাগছে বন্ধুরা? আরে তোমরা ভিড় বাস দেখলে বিরক্ত হও। কী বোকা তোমরা? ফাঁকা বাসের সমস্যাগুলো কিছুই জানো না যেন? বাস ফাঁকা থাকলে টিকিট কাটতেই হয়, আর যত ভিড় বাস মিলনবাবুর তত পোয়া বারো, টিকিট কাটার ঝামেলা নেই। ফাঁকা বাসে এইরকম চেনা বেরোলেই হল, আর ভিড়ে চেনা মুখও চোখে পড়ে না। ও তোমরা ভাবছ মিলনবাবু এবার খুব ফাঁদে পড়েছেন, সুশান্তর টিকিট কাটতেই হল? আরে ছোঃ! ওনার নাম মিলন। কন্ডাকটার ওদের সিটের দিকে এগোতেই উনি মোবাইলে কথা বলতে শুরু করলেন মেয়ের সঙ্গে। সুশান্ত সেদিন একটু অবাক হয়েই দু’জনের টিকিট কেটে নিয়েছিল, কারণ পাশে বসেও মিলনবাবুর ফোনে রিং হবার শব্দ পাননি তাই। যাই হোক কথায় কথায় আসল কথা থেকে সরে গেছি। তুলি একটা পেন চেয়ে একেবারে সাত সাতটা পেন পেয়ে বেশ ব্যোমকেই গেছিল, বাবার টাকে একটা চুমুও দিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু, দু’দিন পরেই সেই পেনগুলো তুলি বাবার গায়ে ছুড়ে দিয়ে বলেছিল, “তুমি যখন একসঙ্গে সাতটা পেন এনে দিয়েছিলে তখনই আমার বোঝা উচিত ছিল! যে লোক রিফিলের কালি জমে গেলে চাটুতে গরম করে কাজ চালায় সে একসঙ্গে কিনা সাতটা পেন কিনেছে! একটু লিখলেই কালি আটকে যাচ্ছে, জোরে লিখলে খাতার পাতা ছিঁড়ে যাচ্ছে! এই পেন তুমি তোমার কাছেই রাখ। আমার ধার করেই চলে যাবে, আমার বন্ধুর বাবারা তোমার মতো নয়।” তুলি চলেই যাচ্ছিল, কী মনে করে আবার ফিরে এসে বাবার টাক থেকে আগের দিনের চুমুটা ঘষে ঘষে মুছে দিয়ে গেল। ভাব তো, এই হল আজকালকার ছেলেমেয়ে!! আরেকবার দশ টাকায় দশ প্যাকেট ধূপকাঠি বাসে কিনে এমনি ধারা ঠকে গেছিলেন। হকার ছেলেটি যে ধূপগুলো হাতে জ্বালিয়ে ঘুরছিল সেগুলোর সুমিষ্ট গন্ধ। জলের দরে অমন সুন্দর ধূপ পেয়ে একেবারে কুড়ি টাকার কিনে নিয়েছিলেন। বাড়ি এসে যখন হাসতে হাসতে গিন্নির হাতে দিয়েছিলেন, তাঁর তো ভিরমি খাবার জোগাড়। তবে দু'দিন পরেই রেগেমেগে এসে ধূপের বাক্সগুলো মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “এগুলো তুমিই রাখ, মশা তাড়াতে কাজে আসবে। আর যদি এর গন্ধে আর ধোঁয়ায় তুমি বিদেয় হও তো আমার হাড় জুড়ায়।” মিলনবাবু এরপরে যদি মনে মনে বলেন, “যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর”, সেটা কি খুব দোষের বল? যাক গে, একদিন নিশ্চয় নিজের লোকেরা তাঁকে চিনতে পারবে, তবে পাড়ার লোক কিন্তু এর মধ্যেই এই গুণী মানুষটাকে বুঝতে শুরু করেছে। তার প্রথম আঁচটা তিনি পেলেন রমেশের কথায়। রমেশের এগিয়ে আসাতে যখন উনি ত্রস্ত, রমেশ বলেন, “আমাকে একটা সাহায্য করবেন, তাহলে বড়ো উপকৃত হই।”
ঠিক ধরেছেন মিলনবাবু, নিশ্চিত কোনও প্রোডাক্ট গছাতে চায়।
“দেখুন ভাই, আমার কিছু লাগবে না।”
“না না, আমি কিছু বিক্রি করতে চাইছি না। কিছুদিন ধরে আমার খুব দ্রুত চুল উঠে যাচ্ছে, এর ওর শুনে নানারকমের তেল শ্যাম্পু লাগালাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এদিকে সেলসম্যানের কাজে চেহারাটাই একটা বড়ো সম্পদ। আমার ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য নেই। আমি পাড়ার অসীমের কাছে জানলাম, আপনাকে নাকি স্বপ্নে ধন্বন্তরি একটা খাতা দিয়ে গেছে, যাতে মানুষের সমস্ত রোগের নিরাময় রয়েছে। ওর কানে ব্যথা নাকি আপনি ভালো করে দিয়েছেন? আমার এই রোগের কি কিছু নেই কাকা, একটু দেখুন না?”
বোঝো কাণ্ড! মানুষের মুখে মুখে তিল থেকে কী ভাবে তাল হয় দেখ!! মিলনবাবুর দিনের পর দিনের অক্লান্ত গবেষণা, কিনা স্বপ্নে প্রাপ্ত ধন্বন্তরির খাতা হয়ে গেল? তবে, যাই হোক, মিলনবাবুর বেশ গর্ব হল নিজের উপর। আর এমন হলেই ওনার কথার বেগ আসতে শুরু করে, “বুঝলে সুশান্ত, ডাক্তার দেখানো একধরণের বাজে খরচা। ওরা কয়েকখানা ওষুধকেই বিভিন্ন অসুখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখে, আর কাঁড়ি কাঁড়ি ফিজ্ নেয়। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে, আমরা নিজেরাই সব অসুখের নিরাময় করে ফেলতে পারি, ডাক্তারের দরকারই পড়বে না। আমি দেখছি, তোমার রোগের কী চিকিৎসা আছে।” শুধু সুশান্তই নয়, এরকমভাবে পাড়ার বহু মানুষেরই এখন অসুখবিসুখে ভরসা মিলনবাবু। কৃপণ হলেও, পাড়ার লোকের অসুখের চিকিৎসা কিন্তু মিলনবাবু বিনে পয়সাতেই করে দেন। আসলে এ এক অন্যরকম প্রাপ্তি। পাড়ার লোক তাঁদের পরিবারকে আর ছোটো চোখে দেখে না, আর সবচেয়ে বড়ো কথা, অসুখ ভালো হয়ে গেলে আলুটা, মুলোটা, জিনিসপত্র এসব ওনাকে উপহার দিয়ে যান। ডাক্তারের ফিজের পিছনে টাকা নষ্টের থেকে, আই প্যাড, আই ফোন কেনা, বড়ো রেস্তোরাঁয় খাওয়া, সপ্তাহান্তে কারণবারি সেবনে পয়সা ওড়ানো অনেকগুণ ভালো।

।। ৩।।

কিন্তু, মনুষ্য শরীর, বড়োই জটিল। আপাত নিরীহ রোগের যে কতরকমের জটিলতা সে আর কহতব্য নয়। ঘরে ঘরে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন নেটিজেন, গুগুল শিক্ষিত ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও, মাঝে মাঝে ডাক্তার নামের এলিয়েনদের দরকার পড়ে সেটা মিলনবাবু হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। শালার বৌভাত খেয়ে বাড়ি ফিরে শুয়েছেন। মেয়ে, স্ত্রী ঘুমিয়ে কাদা, শুরু হল অসহ্য পেট ব্যথা। সে পেটের ডানপাশে নিচের দিকে এমন অসহ্য যন্ত্রণা, যে কহতব্য নয়। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে, শেষ অবধি তার ধন্বন্তরির ফাইল বেরোল। পেটব্যথার একটা প্রেসক্রিপশানে কয়েকটা অ্যান্টাসিডের নাম লেখা রয়েছে। বাড়িতেই তার মধ্যে দুটি আনা আছে। চটপট খেয়ে নিলেন। তারপর ঘণ্টাখানেক পার হয়ে গেল। ব্যথা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, কমার নামগন্ধ নেই। ঠাণ্ডা জলে ভিজিয়ে গামছা পেটের উপরে দিয়েও কোনও আরাম পেলেন না। এদিকে তাঁর নড়াচড়া, ওঠা-বসায় স্ত্রী রমলার ঘুম ছুটে গেছে। সব দেখেশুনে পাড়ার বড়ো নার্সিংহোমে ওনাকে নিয়ে যেতে চাইলেন রমলাদেবী। যন্ত্রণার চাপে একবার সেখানে যাওয়ার কথা মনেও হল, কিন্তু তারপরেই মিলনবাবু স্ত্রীকে বললেন, “ওরা সব ডাকাত, এ চিকিৎসার জন্য আমার রিসার্চ ফাইলই যথেষ্ট।” বললেন তো বটে, কিন্তু পেটব্যথা কমার নামগন্ধ নেই।
ভোর হতে না হতেই, লজ্জার মাথা খেয়ে ফোন করলেন অফিস কলিগ অমরকে। কদিন আগেই অমর পেট ব্যথায় নিদারুণ কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু ডাক্তারের ওষুধে একদিনের মধ্যে ফিট হয়ে অফিস জয়েন করেছিলেন। অগত্যা তাকেই ফোন করলেন ভোর সাড়ে পাঁচটায়...
“হ্যালো?” ঘুম চোখে অমর ফোন ধরেন।
“ভাই, কিছু মনে কোরো না, বড়ো বিপদে পড়ে তোমায় ফোন করছি। আসলে ভোররাত থেকে বড্ড পেট ব্যথা শুরু হয়েছে (মাঝরাত থেকে ব্যথার কথা বেমালুপ চেপে গেলেন)। এত ভোরে ডাক্তার কোথায় পাই (যেন ডাক্তার পেলেই ছুটে গিয়ে দেখিয়ে নিতেন!), তাই তোমায় বিরক্ত করছি। ক’দিন আগেই তোমার পেট ব্যথা হয়েছিল না, তখনকার ডাক্তারের ওষুধটা আমায় একটু বলবে?”
“হ্যাঁ, সে না হয় বলছি। কিন্তু, পেট ব্যথা তো কত কারণেই হতে পারে, তোমার আর আমার কারণ তো এক নাও হতে পারে? সেক্ষেত্রে তো তোমার ব্যথা কমবে না?”
“ভাই, এখনকার মতো তো চেষ্টা করি, তারপর যদি না কমে, তাহলে ডাক্তারখানা খুলতেই গিয়ে দেখিয়ে নেব।”
“আচ্ছা, সে না হয় হল। কিন্তু, এত ভোরে তো কোনও ওষুধের দোকান খোলা নেই? ওষুধটা তুমি কিনবে কী করে মিলনদা?”
“তাও তো বটে, কী করি বলো তো এখন?”
“আচ্ছা দাঁড়াও দাদা, আমার কাছে ওষুধ অনেকটাই রয়ে গেছে শিশিতে, দরকার পড়েনি। আমি প্রেসক্রিপশান আর শিশি নিয়ে যাচ্ছি।”
ভোরবেলা বহু কষ্টে অমরবাবু এসে ওষুধ আর প্রেসক্রিপশান রেখে গেলেন। প্রেসক্রিপশানে ওষুধটা দু’চামচ খাওয়ার কথা লেখা। কিন্তু, মিলনবাবুর মনে হল, ওনার যেরকম প্রচণ্ড পেট ব্যথা হচ্ছে, তাতে দু’চামচে কমার নয়। উনি সাধারণ ব্যথার প্রায় তিনগুন হিসাবে ছয় চামচ ওষুধ খেয়ে নিলেন। মিনিট পনেরো পরে একটু একটু যেন আরামও হল। নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়ে এবার একটু শুয়ে পড়লেন।
কিন্তু, আধঘণ্টা কী পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে শুরু হল পেটে মোচড় দিয়ে পেট ব্যথা, আর তার কিছু সময়ের মধ্যেই ‘বড়ো বাইরে।’ ল্যাট্রিন থেকে ঘুরে আসার পনেরো মিনিটের মধ্যে আবার মোচড়, আবার ল্যাট্রিন যাত্রা, আবার বেডরুমে ফিরে আসতে না আসতেই আবার ফিরে যাওয়া। বাড়ির ট্যাঙ্কের জল ফুরিয়ে গেল ফ্লাশ করতে করতে, কিন্তু তিনি যেন ম্যাজিশিয়ান পি সি সরকার হয়ে উঠেছেন, তাঁর পেট নামক কমন্ডুলুর ‘ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার’ ‘ম্যাজিক ওয়াটার’ আর ফুরায় না। এদিকে শরীরের জল গেল শুকিয়ে, তায় সাতান্ন বার ল্যাট্রিন যাওয়া আসা করে জীবনের আশা মিলনবাবু প্রায় ছেড়েই দিলেন।
এবার অবশেষে রমলাদেবী মাঠে নামলেন, কারণ ততক্ষণে মিলনবাবু ‘রিটায়ার্ড হার্ট’ হয়ে প্যাভিলিয়নে খাবি খাচ্ছেন, আর কানের কাছে শুনতে পাচ্ছেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা “বল হরি হরি বোল” ধ্বনি। রমলাদেবী যখন ডাক্তার ডাকতে বেরোচ্ছেন, তখনও মিলনবাবু ওনার শাড়ির আঁচল টেনে ধরেছিলেন, কিন্তু বাধা দেবেন, শরীরে সে শক্তিও তাঁর নেই তখন।
ডাক্তারবাবু এসে পেট টিপে টিপে, জিভ দেখে, প্রেশার, পালস দেখে পরীক্ষা করে বললেন, “করেছেন কী আপনারা! মানুষটাকে তো একেবারে মেরে ফেলেছেন! কী করে এমন হল?”
রমলাদেবী এগিয়ে দিলেন ওষুধের শিশিটা আর প্রেসক্রিপশান। সেটা দেখে ডাক্তারবাবুর টানা হেঁচকি ওঠা শুরু হল, যেটা থামল প্রায় আট গ্লাস জল খেয়ে। চোখ কপালে তুলে বললেন, “এটা তো একটা পারগেটিভ। অমরবাবুর টানা সাতদিন পটি হয়নি, তাই পেট ব্যথা হচ্ছিল। তাই এই ওষুধের দুই ডোজে পেট পরিষ্কার হয়ে গেছিল আর পেট ব্যথাও কমে গেছিল। কিন্তু মিলনবাবুকে পরীক্ষা করে আমি অনেকটাই নিশ্চিত যে ওনার পেট ব্যথার কারণ ডান কিডনিতে পাথর। সে ব্যথা পায়খানা হবার ওষুধে কমবে কী করে? উলটে অতিরিক্ত মাত্রায় ওই ওষুধ খেয়ে পায়খানা করতে করতে ওনার সিভিয়ার ডিহাইড্রেশান হয়ে গেছে। এখুনি নার্সিংহোমে ভর্তি করে স্যালাইন না চালালে ওনাকে বাঁচানো ভগবানেরও অসাধ্য। আমি লিখে দিচ্ছি, দ্রুত ওনাকে পাড়ার নার্সিংহোমে নিয়ে যান, আর ভবিষ্যতে জীবন নিয়ে এমন ছেলেখেলা দয়া করে আর করবেন না। জানবেন দশ টাকা বাঁচাতে গিয়ে দশ হাজার বেরিয়ে যাবে, এবং তাতেও জীবন ফিরবে কিনা তার গ্যারান্টি নেই।”

পরিশিষ্ট

অবশেষে পাড়ার লোকের সাহায্যে রমলাদেবী আর তুলি মিলে বাবাকে পাড়ার নার্সিংহোমে ভর্তি করল। মাত্র ‘সাত’ টাকার একটা ‘ভোভেরান’ ট্যাবলেট আর বেশি করে জল খেলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেখানে মিলনবাবুর ব্যথা কমে যেতে পারত, সেখানে ‘সাত হাজার’ টাকা খরচ করে তিনদিন পর মিলনবাবু মৃত্যুর মুখ থেকে এই যাত্রায় ফিরে এলেন। তবে যখন রমলাদেবী আর তুলি ডাক্তারদের আর ভগবানকে বারংবার ধন্যবাদ দিচ্ছেন মনে মনে, মিলনবাবু তখন চুপচাপ নিজের ঘরে বসে খরচের হিসাব করছেন আর মাথা চাপড়াচ্ছেন। হ্যাঁ, শেষ মুহূর্তেও যখন মেয়ে-বৌ নার্সিংহোমে নিয়ে যাচ্ছিল, ধন্বন্তরির ফাইলটা উনি একবার চেয়েছিলেন। কিন্তু ওরা কেউ শুনল না। হায়রে হায়রে হায়, এখন সেই ফাইল খুঁজে দেখছেন, অফিস কলিগ বিমলের হসপিটালের ডিসচার্জ সার্টিফিকেটটা, বারংবার পায়খানা হয়ে শরীরের জল শুকিয়ে গেলে তার চিকিৎসার পদ্ধতি স্পষ্ট লেখা আছে। ইশ তখন রমলা যদি একটিবার ফাইলটা এনে দিতেন, তাহলে ভর্তি হয়ে এতগুলো টাকা গচ্চা দিতে হত না, বাড়িতেই.........। আসলে ‘থাকিলে ডোবা-খানা, হবে কচুরিপানা; বাঘে হরিণে খানা একসাথে খাবে না; স্বভাব তো কখনও যাবে না’ – তাই মিলনবাবুরাও বুঝি পালটাবেন না!!!
_____
অলংকরণ - পার্থ মুখার্জি

গল্পের ম্যাজিক:: সিদ্ধিদাতার অন্তর্ধান - ডাঃ পল্লব বসু


সিদ্ধিদাতার অন্তর্ধান
ডাঃ পল্লব বসু

।। ১।।

বেশ একচোট বৃষ্টি হয়ে গেল। বাতাসে সোঁদা গন্ধ লেগে আছে এখনও। বরানগর থানার অপর পারে অনেকটা জায়গা জুড়ে জল দাঁড়িয়ে গেছে। শ্রীপর্ণা সবে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছে, কনস্টেবল সুশান্ত চেম্বারে প্রবেশ করল। “ম্যাডাম, ডিউটি রুমে এক ভদ্রলোক ডায়েরি লেখাতে এসেছেন। জয়িতা-ম্যাডাম তাঁকে আপনার কাছে পাঠানোর অনুমতি চাইলেন।”
“জয়িতা যখন আমার কাছে পাঠাতে চায় নিশ্চয়ই ব্যাপারটা আমার নোটিসে আনা জরুরি মনে হয়েছে ওর। আপনি পাঠিয়ে দিন তাঁকে।”
দামি পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের সুপুরুষ, ছ’ফিটের মতো উচ্চতার এক ভদ্রলোককে নিয়ে জয়িতা চেম্বারে ঢুকল। শ্রীপর্ণা ওদের সামনের চেয়ারে বসতে নির্দেশ করল। “আপনি একটা জন্মদিনের পার্টি থেকে সোজা চলে এসেছেন দেখছি। অনুষ্ঠানের হলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে নাকি?”
চেয়ারে বসেও লোকটির আঙুল কাঁপছিল তির তির করে। শ্রীপর্ণার চেম্বারটা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও দরদর করে ঘামছিলেন। এবার শ্রীপর্ণার কথায় মুখটা তার হাঁ হয়ে গেল। জয়িতাও কম অবাক হয়নি, তবে তাঁদের ম্যাডামের এই বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এবং তার থেকে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ক্ষমতা সম্বন্ধে সে যথেষ্টই অবহিত।
“অবাক হবার মতো কিছু নেই। আপনার পরনের পোশাক, পাঞ্জাবির সোনার বোতাম আর তীব্র পারফিউমের গন্ধই বলে দিচ্ছে আপনি কোনও অনুষ্ঠানবাড়ি থেকে আসছেন। কিন্তু হাতের আঙুলগুলো যেভাবে কাঁপছে আর যেরকম ঘামছেন, মাথার চুল যেরকম অবিন্যস্ত তাতে একটা বড়ো দুর্ঘটনা...”
“কিন্তু জন্মদিনের পার্টি, সেটা কীভাবে বলছেন? চারদিকে বহু বিয়ের অনুষ্ঠানও তো...” শ্রীপর্ণার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভদ্রলোক এবার মুখ খোলেন।
“খুবই সাধারণ পর্যবেক্ষণ। একটু আগেই কেক কাটার অনুষ্ঠানটা হয়েছে। যার জন্মদিন, আপনি তাঁর নিকট আত্মীয়। ফলে দুষ্টুমি করে কেক খাওয়াতে গিয়ে সে আপনার মুখে-গায়ে কেকের ক্রিম লাগিয়েছে। মোছার বা ধোবার পরেও কানের পাশে, গালের অংশে, আর পাঞ্জাবিতে তার অবশেষ এখনও লেগে আছে।”
“ঠিক ধরেছেন। সবে সারা মুখে লাগিয়ে দেওয়া পেস্ট্রির ক্রিম মুছছি, এমন সময়েই তো পাওয়ার কাট, তারপরেই অন্ধকারে মেয়ের চিৎকার, আর আলো আসতেই দেখি, মেয়ের গলার লকেটটা উধাও!”
“একটু বিস্তারিত বলুন, তাহলে সুবিধা হয়।”
“আমার নাম গৌতম ঘটক। আজ মেয়ে শালিনীর পাঁচ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলছিল বাড়িতেই একতলার হলঘরে। আমন্ত্রিতদের মধ্যে প্রধানত নিকট আত্মীয়রা, আমার কারখানার স্টাফেরা, আর মেয়ের স্কুলের কিছু বন্ধু আর তাঁদের বাবা-মায়েরা। কেক কাটার পর আমাকে, ওর মাকে, দুই মাসি, মামা, দিদা, এক কাকা আর এক পিসিকে ও নিজের হাতে কেকের টুকরো খাওয়ায়। এরপর ক্যাটারিংয়ের দু’জন সার্ভিস বয় প্লেটে করে বাকিদের কেক সার্ভ করতে থাকে। আমরা তখন ওর দুষ্টুমি করে মাখানো ক্রিমগুলো মুছতে ব্যস্ত। মেয়ে বাকি বাচ্চাগুলোর সঙ্গে হুল্লোড় করছে। ঠিক এই সময় সমস্ত বাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়। আমার বাড়ির পাওয়ার মেইনের সাথে ইনভার্টার লিঙ্ক করা আছে। পাওয়ার কাট হলেই ইনভার্টার চালু হয়ে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা হয়নি। এই ঘটনার জন্য আমরা স্বভাবতই কেউ তৈরি ছিলাম না। এরমধ্যে অন্ধকারে বাচ্চাদের চিৎকার-চ্যাঁচামেচি বেধে যায়। কেউ কেউ মোবাইলের আলোয় দেখার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু অত বড়ো হলঘরে তখন একটা সাংঘাতিক এলোমেলো অবস্থা। তার মধ্যে ভয়ে বাচ্চারা ছোটাছুটি করতে গিয়ে, এর ওর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি, কাচের গ্লাস-বাটি ভেঙে চুরমার, আর আমার মেয়ের চিলচিৎকার। লোডশেডিং এখন কলকাতায় প্রায় হয়ই না, তায় বাড়িতে ইনভার্টার রয়েছে। ফলে সঙ্গে সঙ্গে যে কোনও একটা আলোর ব্যবস্থা করা যাবে, তাও সম্ভব হয়নি। আর যে লোকটা কিছু করতে পারত, সেই বাবুলালকে তার একটু আগেই আমি সিগারেট কিনতে বাইরে পাঠিয়েছিলাম। ওই অন্ধকারে ভিড়ের মধ্যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাই শ্রেয় মনে হয়েছিল। ভেবেছিলাম, এই বুঝি আলো এসে যাবে। খুব হলে মিনিট পাঁচ-সাতেক আলো ছিল না। এরপরেই আলো জ্বলে ওঠে। তখনই আবিষ্কার করি, মেয়ের গলায় বহুমূল্য লকেটটা নেই। একটা দুই ইঞ্চির সোনার গণেশ, একটা সবুজ পান্না তাঁর নাভিতে, দুই চোখে সাত সেন্টের দুটি হিরে একটা সোনার চেনের সঙ্গে মূর্তিটা ঢালাই করে লাগানো। আমার মেয়ে যেদিন জন্মায়, সেদিন বাবা ওই লকেটটা দিয়েই মেয়ের মুখ দেখেছিলেন। ওটা আমার সিন্দুকে রাখা থাকে। আমি ওই মূর্তিকে খুব শুভ মনে করি। কারণ, ওই মূর্তি বাড়ি আসার পরই আমার ব্যাবসা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। প্রত্যেক বছর জন্মদিনে আমার মেয়ে ওই লকেটটা পরে থাকে। মেয়ে তো কেঁদেকেটে একশা। মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে বলল, অন্ধকারের মধ্যে কে যেন গলা থেকে লকেটটা টান মেরে ছিঁড়ে নিয়ে পালায়। আমি ঘরের মধ্যে খেয়াল করি। সবাই পরিচিত মানুষজন, আর সার্ভিসের ছেলেদুটি। আমি ছুটে হলঘরের বাইরে যাই। আমাদের বাড়িতে রাতদিনের জন্য থাকে বাবুলাল। ও প্রায় দশ বছর আছে। চল্লিশের ঘরে বয়স। আর আছে রান্নার একটি মেয়ে। তিরিশের ঘরে বয়স, বছর দুয়েক আছে আমার বাড়িতে। ওদের দু’জনেই, সঙ্গে ক্যাটারিংয়ের অন্য চার-পাঁচটি ছেলেও হলঘরের ঠিক বাইরের বারান্দায় চলে এসেছে। আমি ছুটে বাইরের লনে, সেখান থেকে মূল ফটকের দিকে গেলাম ছুটে। ফটকে দারোয়ান ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করতে জানাল, পাওয়ার কাটের সময়ও সে ফটকেই দাঁড়িয়ে ছিল, একটুও নড়েনি, বাবুলালকে শুধু পাওয়ার কাটের সামান্য পরেই ঢুকতে দিয়েছিল কিন্তু কেউ বেরিয়ে যায়নি। এরপর আমি বাগানের দিকেও ছুটে যাই, কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পাইনি। এরপর বাড়ির সবাইকে হলঘরে থাকতে বলে থানায় আসি খবর করতে।”
“সিইএসসির পোল নাম্বার, আর কনজিউমার নাম্বার বলুন।”
গৌতমবাবু তাঁর বাড়িতে ফোন করলেন, “হ্যালো, মৌসুমি, শোনো, আমি থানায় আছি। তুমি একবার ইলেকট্রিক বিল দেখে আমায় পোল নাম্বার, আর কনজিউমার নাম্বারটা বলো তো।”
জয়িতা ওঁর দিকে কাগজ আর পেন এগিয়ে দিলেন। নাম্বার লিখে গৌতমবাবু এগিয়ে দিলেন শ্রীপর্ণার দিকে।
“হ্যালো, বরানগর থানা থেকে আইসি বলছি। একটা পোল নাম্বার, আর কনজিউমার নাম্বার বলছি, আধাঘণ্টার মধ্যে এখানে বা এই এলাকায় কোনও পাওয়ার কাট হয়েছে কিনা প্লিজ জানান।”
“শুনুন, গৌতমবাবু, আজ কোনওরকম পাওয়ার কাট আপনার বা আপনার আশেপাশের কোনও এলাকায়ই হয়নি। বুঝতেই পারছেন আপনি একটা গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। সম্ভবত আপনার বাড়ির মেইন সুইচ সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং তার মধ্যেই চুরিটা করা হয়, কাজ মিটে গেলে আবার মেইন অন করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটাই পূর্বপরিকল্পিত এবং এতে একাধিক লোকের হাত আছে। কারণ, একই সঙ্গে মেইন অফ করা আর লকেট কেড়ে নেওয়া একজনের পক্ষে সম্ভব না।”
“কিন্তু, ইনভার্টার কাজ করল না কেন?”
“আরে, এ তো জলের মতো সোজা। ইনভার্টারের ইউপিএসের পাওয়ার সুইচ কেউ অফ করে দিয়েছিল। তাই মেন সুইচ বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও ইনভার্টার চালু হয়নি। আর দেরি নয়, চলুন আপনার বাড়ি গিয়ে বাকি তদন্ত সারতে হবে, আর সেটা যত তাড়াতাড়ি করা যাবে ততই ভালো।”

।। ২।।

“আপনার সমস্ত বাড়িটা আমি আগে ঘুরে দেখে নিতে চাই। তাহলে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেকটা সুবিধা হবে।” প্রধান ফটক দিয়ে পুলিশের জীপে ঢুকতে ঢুকতে শ্রীপর্ণা গৌতমবাবুকে বলে ওঠে।
“চলুন তবে, বাড়ির বাইরেটা আগে ঘুরে দেখে নিন।”
ফটক থেকে পিচ বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে বাড়ির দরজা অবধি। রাস্তার দু’পাশে অত্যন্ত যত্নে সাজানো ফুলের বাগান। দু’ধার দিয়ে আর পাঁচিলের গা ঘেঁষে ফুলগাছের টব সাজানো - গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা এইসব। পুরো বাড়িটা ঘিরেই রয়েছে বাগান। ছোটো গাছের পাশাপাশি বিভিন্নধরনের বড়ো বড়ো গাছও ছড়িয়ে বাগান জুড়ে। বাকিদের আসতে বারণ করে শ্রীপর্ণা একাই বাগানের দিকে পা বাড়ায়। আসলে ও চায় না, বহুজনের পদাঘাতে বাগানের বৃষ্টিসিক্ত মাটিতে যদিবা কোনও প্রমাণ থাকার আশা থাকে, তা লোপ পায়।
একতলায় ঢুকলেই বিরাট বারান্দার একপাশ থেকে দোতালায় যাবার ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ির ঠিক নিচে ইনভার্টার স্টেশন। শ্রীপর্ণার কথাই মিলে গেল। দেখা গেল ইনভার্টারের পাওয়ার স্যুইচ অফ করা আছে। এটা যদি চোরের কাজ হয়, তাহলে বাড়ির বিদ্যুতের মেইন স্যুইচ অন করার সময় এটা অন করার কথা সে ভুলে গেছে। বারান্দার ডানদিকে প্রশস্ত ডাইনিং স্পেস। তারপরেই রান্নাঘর। ডাইনিংয়ের দেয়াল জুড়ে চোখ জুড়ানো কেরালার কোভালাম বিচের শোভা। বাঁপাশে হলঘরের দরজা। এছাড়া একতলায় ছড়িয়ে আছে অতিথিদের থাকবার সুসজ্জিত দুটি ঘর, আর বাবুলাল ও রাঁধুনি নন্দিনীর থাকার জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে ছোটো আকারের আরও দুটো ঘর।
হলঘরের ভিতরে সবাইকে একঝলক দেখে নিয়ে শ্রীপর্ণা প্রত্যেককে একে একে জেরা করার প্রস্তাব করল। শালিনীর কাকা অরিন্দম মৃদু প্রতিবাদ করে বললেন, “ভোরে আমায় দিল্লীর ফ্লাইট ধরতে হবে। বাড়ি ফিরে বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এখন জেরার জন্য ডিটেইন্ড হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। আপনি আমায় আগেই জেরা করে ছেড়ে দিন, প্লিজ।”
“আমি আগে শালিনীর সঙ্গে কথা বলব, তারপরেই বাকিদের জেরা করা সম্ভব। কারণ, ওর বয়ানের উপরে আমার পরবর্তী জেরার ধরন নির্ভর করবে। আমি চেষ্টা করব শালিনীর পরে আপনার সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ছেড়ে দিতে।”
“কিন্তু ম্যাডাম, কাল মেয়ের স্কুল আছে ভোরবেলা। এখানে কতক্ষণ আটকে থাকব?” মিসেস দত্তগুপ্ত, শালিনীর এক বন্ধুর মা বলে উঠলেন।
“দেখুন, আপনাদের সবার উপস্থিতিতে একটা বড়ো চুরি হয়ে গেছে এই হলঘরে। অত্যন্ত দামি একটি লকেট। আমি আপনাদের কাউকেই চোর বলছি না, কিন্তু আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে দিয়েই একটা সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে, কারণ আপনারা সকলেই সে সময় হলঘরে উপস্থিত ছিলেন। শালিনী আপনাদের সকলেরই প্রিয়। আমার মনে হয় তার মুখ চেয়েই আপনাদের এটুকু কো-অপারেশন করা উচিত। আমি খুব বেশি সময় নেব না। আপনারা খেতে শুরু করে দিন এখানে বসেই। এই ঘর থেকে শুধু কেউ এখন আর বেরোবেন না, প্লিজ। খাবার এখানেই সার্ভ করবে।”
“আচ্ছা, আপনি সকলের একবার তল্লাশি নেবার কথা বলছেন না কেন? এখানেই কারও কাছে যদি থেকে থাকে?” শালিনীর পিসি মল্লিকা বলে ওঠেন। তাঁর কথায় চারদিক থেকে কোলাহল শুরু হয়।
“আপনি ঠিকই বলেছেন। পুলিশি তদন্তের একটি বাঁধা গত হল তল্লাশি। কিন্তু আপনার কি মনে হয় না, যে তল্লাশির কথাটা চোরেরও মনে এসেছে, আর এতটা সময়ের মধ্যে সে সেটা পাচারও করে দিয়েছে?”
“না ম্যাডাম, আমি খেয়াল রেখেছিলাম। এখানে যারা উপস্থিত, তাঁদের মধ্যে মাত্র দু’জন আলো আসার পর থেকে বাইরে বেরিয়েছিলেন। মিসেস দত্তগুপ্ত, অর্থাৎ পম্পার মা আর মিস্টার সেন, মানে গৌতমের বন্ধু।”
“মানে আপনি কি বলতে চাইছেন, আমি বেরিয়েছিলাম, এর অর্থ আমি চুরির জিনিস পাচার করতে গেছিলাম! মেয়ে পম্পাকে টয়লেটে নিয়ে গেছিলাম। আমি আপনার নামে মানহানির মামলা করব।” দত্তগুপ্ত প্রায় তেড়ে এলেন মল্লিকার দিকে। মিস্টার সেন করুণ চোখে বন্ধু গৌতমের দিকে চাইলেন।
“আমি উপস্থিত থাকার সময় নো পার্সোনাল অ্যাটাক। মিসেস মল্লিকা, আপনি কি জানেন কারা কারা পাওয়ার কাটের পাঁচ-সাত মিনিট সময়ের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে আবার হলে ফিরে এসেছিলেন?”
“না। তখন এত অন্ধকার ছিল, মোবাইলের আলোতেও বাচ্চাদের ছোটাছুটি আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে অত খেয়াল করতে পারিনি।”
“তার প্রয়োজনও নেই। এখন আর কোনও কথা নয়। জেরার সময় আপনারা যা দেখেছেন বা বুঝেছেন সব বলবেন, তার থেকে সত্যিমিথ্যে বেছে নেওয়ার দায় আমার। আমার তদন্ত পদ্ধতিটা একটু অন্যরকম। তল্লাশির মতো অন্ধকারে হাতড়ানো পদ্ধতিতে আমি বিশ্বাসী নই। যে অপরাধী, তাকে সরাসরি চিহ্নিত করতে পারলে আর ‘beating about the bush’ অপ্রয়োজনীয়।”

।। ৩।।

শালিনীর সঙ্গে কথা বলে তারপর শ্রীপর্ণা প্রতিশ্রুতি মতো ডাকল অরিন্দমকে। দোতলায় শালিনীর স্টাডি-রুমেই জেরার ব্যবস্থা হয়েছে। বাবুলাল হলঘর থেকে একজন একজন করে ডেকে দেবার দায়িত্বে আছে। ক্যাটারিংয়ের অন্য চার-পাঁচটি ছেলে খাবার দিতে শুরু করে দিয়েছে হলঘরেই। তবে কারোরই খাওয়ায় খুব একটা আর মন নেই। পুলিশি জেরার ভয় সবাইকেই গ্রাস করেছে।
“যখন অন্ধকার হয়ে গেল আপনি তখন কী করছিলেন, অরিন্দমবাবু?”
“শালু আসলে আমার সারা মুখে পেস্ট্রি মাখিয়ে দিয়েছিল। আমি টিস্যু পেপারে সেটাই মুছছিলাম, এসময়েই সমস্ত অন্ধকার হয়ে যায়।”
“অন্ধকার হয়ে যেতে কী করলেন?”
“প্রথমে ভেবেছিলাম, এখুনি ইনভার্টার চালু হয়ে যাবে। তার মধ্যেই শালুর চিৎকার শুনলাম। আমি ওর থেকে খানিকটা দূরেই ছিলাম। ওর চিৎকারে ভয় পেয়ে অন্যান্য বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছিল। আমাকেই দুটো বাচ্চা এসে ধাক্কা মারে। মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় দেখতে চেষ্টা করলাম কী ব্যাপার। কিন্তু কেক কাটাকে কেন্দ্র করে সবাই হলঘরে জমায়েত হয়েছিল, ফলে ওই ভিড়ের মধ্যে একেবারে দিশাহারা ব্যাপার আর কী!”
“কাউকে ঘর থেকে বেরোতে বা ঢুকতে দেখেছিলেন কি?”
“না, ম্যাডাম।”

অরিন্দম বেরোতেই শ্রীপর্ণা বাবুলালকে জেরার জন্য ডেকে নিল। বাবুলাল রীতিমতো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে এল এবং বসতে বলা সত্ত্বেও দাঁড়িয়েই রইল।
“যখন আলো চলে যায় তুমি কোথায় ছিলে, বাবুলাল?”
“বাবুর সিগারেটের প্যাকেট শেষ হয়ে গেছিল, আমি দোকান থেকে আনতে গেছিলাম। যখন বাড়ির দিকে আসছি, দেখলাম সমস্ত বাড়ি অন্ধকার। অথচ আশেপাশের বাড়িগুলোয়, দোকানপাট, আর রাস্তায় সর্বত্র আলো আছে।”
“তুমি কী করলে তখন?”
“একতলার দরজাটা আমি ভেজিয়ে গেছিলাম। কোনওরকমে হাতড়ে হাতড়ে ভেতরে ঢুকলাম। ক্যাটারিংয়ের ছেলেগুলো তখন কেউ লাইটার, কেউ মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। আমার ঘরে একটা টর্চ থাকে। আমি কোনওরকমে আমার ঘর থেকে টর্চ নিয়ে এলাম। আমি দিদিভাই, একটু আধটু ইলেকট্রিকের কাজ জানি। আমার সন্দেহ হল, এটা আমাদের বাড়ির লাইনের কোনও সমস্যা। কারণ, আর কোথাও লোডশেডিং হয়নি। তাই আমি সিঁড়ির নিচে বাড়ির মেইনটা চেক করতে গেলাম। দেখি, মেইন স্যুইচ বন্ধ করা। আমিই ওটা অন করে দিই, আর আলো এসে যায়।”
“ও, তাহলে চোর নয়, তুমি মেইন অন করেছ। একথা বাবুকে বলোনি কেন?”
“কখন বলব, দিদিভাই? যেই আলো জ্বলল, শালুদিদির চিৎকার, বাবু, মেমসাহেবের চিৎকার, বাবুর কাছে শুনি, দিদিভাইয়ের লকেট চুরি হয়ে গেছে। আর তখনই তো বাবু ছুটল থানায়, ওসব কথা আর খেয়াল নেই।”
“আচ্ছা, ইনভার্টারের পাওয়ার স্যুইচটা যে অফ করা ছিল, সেটা খেয়াল করেছিলে?”
“তাই নাকি? না তো দিদিভাই, আমার চোখ তো ছিল মেইন স্যুইচের দিকে। আর টর্চের আলোয় সবদিক দেখাও যায় না।”

বাবুলাল বেরিয়ে গিয়ে নন্দিনীকে পাঠিয়ে দিল শ্রীপর্ণার কাছে। নন্দিনী শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পাকাতে পাকাতে দাঁড়িয়ে রইল চেয়ারের সামনে।
“যখন আলো চলে যায় তখন তুমি কী করছিলে?”
“শালিনীদিদির কেক কাটার সময় হলঘরেই ছিলাম। বিকেল থেকে বড্ড গা-টা গোলাচ্ছিল, মাথা ধরেছিল। দিদিভাই একটুকরো কেক মুখে দিয়ে দিচ্ছিল। তা, সেটা আমি খাইনি। ওটা হাতে করে এনে আমার ঘরে রাখতে ঢুকেছি, অমনি সব অন্ধকার হয়ে গেল। আমার আবার দিদি, অন্ধকারে বড়ো ভয়। মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে ঘরেই বসেছিলাম। ঘর থেকে বেরোতেই ভয় লাগছিল। এখন তো তেমন লোডশেডিং বড়ো একটা হয় না, ভাবলাম এই বুঝি আলো চলে আসবে। একটু বসেই থাকি। তা মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে এল তো।”
“তোমার ঘর থেকে বারান্দায় সন্দেহজনক কিছু দেখোনি?”
“সে তো ঘন অন্ধকার দিদি, মাঝে মাঝে কারও কারও মোবাইলের আলোর ঝলকানি শুধু। কিন্তু অত বড়ো বারান্দা, সে আলো কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল।”
“তোমার আঙুল কাটল কী করে?”
“আর বলেন কেন, দিদি। আজ দুপুরে কাপড় সেলাই করতে গিয়ে ছুঁচ ফুটে গেছে।”

।। ৪।।

জেরা সাময়িক স্থগিত আছে। শ্রীপর্ণা বাবুলালের সঙ্গে পুরো একতলাটা আরেকবার ঘুরে দেখছে। সিঁড়ির একপাশে বাবুলালের ঘর, আরেক পাশে নন্দিনীর। তার পাশেই দুটো পরপর বাথরুম-পায়খানা। এরপাশেই একটা ছোটো স্টোর-রুম। রান্নাঘরে ক্যাটারিংয়ের কয়েকটি ছেলে খাবারের বাটি, গামলার সামনে জটলা করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। শ্রীপর্ণাকে দেখে চুপ করে যায়। ওদের সবারই মুখেচোখে আতঙ্ক।
“পাওয়ার কাটের সময় তোমাদের কে কে হলঘরে কেক সার্ভ করছিলে?”
“আমি আর ও, মানে, বিকাশ তখন হলের ভেতরে ছিলাম কেকের ট্রে নিয়ে, ম্যাডাম। আলো নিভে যেতে চুপ করে দাঁড়িয়ে যাই একটা সোফার পাশে। সেখানেই ছিলাম একভাবে আলো আবার জ্বলে ওঠা অবধি।”
“বিকাশ, তোমার কথা বলো।”
“আমি সামনে একটা টেবিল পেয়ে ট্রেটাকে নামিয়ে রাখি। তার মধ্যেই কোনও একটা বাচ্চা ‘আমার লকেট’ বলে খুব জোরে চেঁচিয়ে ওঠে। ওর চিৎকারের পরেই অন্য বাচ্চাগুলো এদিক ওদিক ছোটাছুটি, ধাক্কাধাক্কি করতে শুরু করে ভয়ে। আমি ম্যাডাম দরজার কাছেই ছিলাম। একটা অন্ধকারের ডেলা মনে হল ছুটে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। তবে আমার ভুল হতে পারে, অত অন্ধকার...”

শ্রীপর্ণা আবার দোতলায় শালিনীর স্টাডি-রুমে গিয়ে জেরা শুরু করল। একে একে শালিনীর মা, বাবা, দিদা, দুই মাসি, গৌতমবাবুর কর্মচারীদের, শালিনীর বন্ধুদের, তাদের মা-বাবাদের ক্রমান্বয়ে জেরা করে গেল। কিন্তু কারোর কাছ থেকেই কোনওরকম ক্লু পাওয়া গেল না। ঘন অন্ধকারে ভিড়ের মধ্যে না কেউ চুরি করতে দেখেছে, না পালাতে।
“ম্যাডাম, কিছুই তো সূত্র মিলল না যা দিয়ে চোর কে হতে পারে সে সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা করা যায়।”
“জয়িতা, জেরা মানে জাস্ট কতগুলো প্রশ্ন করা নয়। এর অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। তোমার প্রশ্ন শুনে উত্তরদাতার প্রতিক্রিয়া, উত্তর দেবার সময় উত্তরদাতার কনফিডেন্স লেভেল, সে ফাম্বল করছে কি না, দু’জন উত্তরদাতার উত্তরের মধ্যে দ্বন্দ্ব, উত্তরদাতার কোনও বিষয়ে সদর্থক বিশ্লেষণ, জেরায় বেরিয়ে আসা কোনও নতুন অজানা তথ্য ইত্যাদি বহু জরুরি জিনিস তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিশেষ সাহায্য করে। তুমি সবাইকে হলঘরে জমা কর। থানায় ফোন করে বিকাশবাবু আর রাখালদাকে চলে আসতে বল। within 15 to 30 minutes I shall unveil the mystery, get ready for arrest. আমি জাস্ট একটু ঘুরে আসছি।”

।। ৫।।

পুরো বাড়ি এখন হলঘরে। ক্যাটারিংয়ের ছেলেগুলোকেও ডেকে নেওয়া হয়েছে সেখানে। হলঘরের বাইরে প্রহরায় বিকাশবাবু আর রাখালবাবু। সবাই উদ্বেগ নিয়ে শুকনো মুখে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। কেউই বুঝতে পারছে না, শ্রীপর্ণা তাদের ঠিক কী বলতে চান।
“আপনারা সকলেই বেশ উদ্বেগে আছেন, সেটা আপনাদের মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। তাছাড়া আপনারা অনেকক্ষণ আটকেও আছেন। যাক, আপনাদের আর বেশি সময় নেব না। শুধু আমি আপনাদের ওপেন কয়েকটা প্রশ্ন করব। আলো চলে যাবার পরে যে অন্ধকারে আপনারা হলঘরে আপনাদের পাশের লোকটিকেই সঠিক ঠাহর করতে পারছিলেন না, সেখানে ওই ঘন অন্ধকারে আলো নেভার মুহূর্তের মধ্যে কেউ শালিনীর লকেটটা ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল কী করে? ঘটনাটা এতটাই দ্রুত এবং আলো নেভার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটানো হয়েছিল, যে তখনও ঘরের অতিথিরা কেউ দিশাহারা ভাবটাই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কীভাবে ঘটল এটা?”
সারা ঘরে গুঞ্জন। সত্যিই এর উত্তর সেভাবে চোর ছাড়া আর কারোর কাছেই নেই।
“জানি আপনারা এর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন না,” শ্রীপর্ণা আবার বলতে শুরু করে, “আমি এবার শালিনীকে কয়েকটা প্রশ্ন করব, যার অনেকগুলোই আমি আগেও একবার ওকে করেছি এবং লকেট খুঁজে বার করতে ওর উত্তরগুলো আমায় খুব সাহায্য করেছে। আপনাদের অবগতির জন্য আমি ওকে প্রশ্নগুলো আবার করছি।”
“শালিনী, মনে করে বলো, যখন পাওয়ার কাট হয় তুমি ঠিক কী করছিলে?”
“আমি পম্পা, মাম্পি, লিজা, অহনা, ওদের নিয়ে হলের মাঝের টেবিলে রাখা একটা গিফট প্যাক খুলছিলাম।”
“ওই বাচ্চারা ছাড়া তোমার আশেপাশে আর কেউ ছিল?”
“হ্যাঁ, বড়োমাসি, পিসি, রায়-আন্টি, দত্তগুপ্ত-আন্টি ছিল। আর কেউও থাকতে পারে, খেয়াল করিনি।”
“গুড। অন্ধকার হওয়ামাত্র কেউ তোমার লকেট ছিনিয়ে নিল?”
“প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, আর মুহূর্তে অন্ধকারে মিশে গেল।”
“আচ্ছা, ঠিক সেই মুহূর্তে কোনও বিশেষধরনের গন্ধ পেয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, দিদুন আর রায়-আন্টি যেমন জর্দা খায় ওই ধরনের গন্ধ। লোকটা অন্ধকারে মিশে গেল আর গন্ধটাও হারিয়ে গেল।”
“চমৎকার। আচ্ছা, তোমার গলার ঐ যে খুব সুন্দর একটা হার ঝুলছে, ওর পুঁতিগুলো ফ্লুরসেন্ট ম্যাটেরিয়ালে তৈরি, তাই না? অন্ধকারে কি পুঁতিগুলো উজ্জ্বল হয়ে থাকে, দেখতে পাওয়া যায়?”
“হ্যাঁ শ্রীপর্ণামাসি, আমার খুব পছন্দ হয়েছে এটা।”
“হারটা তোমায় কে উপহার দিয়েছেন আজ?”
“রায়-আন্টি।”
“আচ্ছা, গণেশের লকেটটা কি ওই মালার উপরে পরেছিলে, না নিচে?”
“আরে, রায়-আন্টি নিজের হাতে ওটা আমায় পরিয়ে দেন। তবে গণেশের অত্যন্ত শুভ ওই লকেটটা যাতে ওর জন্য ঢাকা পড়ে না যায় তাই নিজে গণেশের লকেটটা খুলে ওই হারটা আগে পরিয়ে দেন, আর তার উপরে লকেট।”
“আচ্ছা, তোমার রায়-আন্টির কালো রঙ কি খুব পছন্দ? যেমন আজ কালো রঙের শাড়ি, ম্যাচিং ব্লাউজ, এমনকি গলার পুঁতির হার, কানের দুল, কপালের টিপ সব কালো!”
“কে জানে মাসি, আন্টির তো প্রিয় রঙ সাদা। সবসময় সাদা বা ঘিয়ে ঘেঁষা সালোয়ার, শাড়ি, হার, দুল পরেন। এমনকি ওঁদের গাড়িটাও সাদা রঙের। আজই প্রথম ওঁকে কালো জিনিস পরতে দেখলাম। তাছাড়া আন্টির দুই হাতেই তিনটে করে সোনার চুড়ি ছিল। আজই কেন জানি না চুড়িগুলো হাতে দেখতে পাচ্ছি না, আন্টি খুলে রেখেছেন।”
“আচ্ছা শালু, নন্দিনীদি শুধু তোমাদের বাড়িতেই থাকে, রান্না করে?”
“হ্যাঁ, এতদিন তাই করছিল। তবে গত দু’মাস হল রায়-আন্টির রান্নার দিদিটা কাজ ছেড়ে দিয়েছে। রায়-আন্টিরা তো আমাদের পাড়াতেই থাকে। তাই মা বলল, ওঁদের অসুবিধা হচ্ছে, যতদিন না ওঁরা আরেকজন রাঁধুনি পাচ্ছেন, নন্দিনীদি ওখানে একবেলা অন্তত রান্না করে দিয়ে আসুক।”
“শালু, আজ দুপুরে নন্দিনীর যে ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা কেটে গেছে, তুমি জানো? তুমি সাদা কাপড় বেঁধে দিয়েছিলে?”
“ও মা, কই না তো! সেটা কী করে হবে? আমি দিদিকে যখন কেক খাওয়াতে গেলাম, দিদি বাধা দিয়েছিল, বলেছিল শরীর ভালো নেই। আমার হাত থেকে কেকটা ডান হাতেই তো নিয়েছিল, কোনও ব্যান্ডেজ ছিল না। আমি স্পষ্ট দেখেছি।”
“Well, thanks Shalini, তোমাকে আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। এই ঘরে উপস্থিত সবাই আমাদের প্রশ্নোত্তরের থেকে হালকা একটা আভাস পেয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। আর চোরেরা হয়তো পালানোর রাস্তা খুঁজছেন। কিন্তু, হা হতোস্মি! এই ঘর থেকে পালানোর সব পথ বন্ধ। তাই চুপচাপ আমি এবার যে কথাগুলো বলছি, শুনে যান। ওই ঘন অন্ধকারে মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলো জ্বলে ওঠার বা সবার চোখ সয়ে যাবার আগেই চোর চুরি করে লকেটটা হস্তান্তর করতে চেয়েছিল। সেক্ষেত্রে তাকে শালিনীর একদম কাছে, শালিনীর দিকে স্থিরদৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে থাকা জরুরি ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ-বিষয়ে আমারই মতো চোরেরও সন্দেহ ছিল, অন্ধকারে লকেটটার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা আদৌ যাবে কি না। আর একটুও নিশানা ভুল হবার অর্থ সুযোগ হাতছাড়া করা, এমনকি ধরা পড়ে যাবার সম্ভবনা। সুতরাং এমন কিছু করতে হবে যাতে অব্যর্থ নিশানায় একটানে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ওটা ছিনিয়ে নিয়ে শাগরেদের হাতে তুলে দেওয়া যায়। আর তার অমোঘ পথটি যে কী, তা আপনারা এখুনি শালিনীর মুখে শুনেছেন। গণেশের লকেটের ঠিক নিচেই ছিল উজ্জ্বল ওই মালা, যা অন্ধকারেও লকেটের অবস্থান নির্দেশ করছিল। জর্দার নেশাটা রায়-গিন্নির অনেকদিনের। লকেটটা কাড়তে গিয়ে শালিনীর খুব কাছে এসেছিলেন তিনি, আর তখনি গন্ধটা শালু পেয়েছিল। অনেক সময়েই রহস্য সমাধানের চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে শব্দ, গন্ধ আর বর্ণের মধ্যে। সাদা রঙ এমন এক রঙ যা অন্ধকারেও একটু চোখ সয়ে গেলে চোখে পড়ে। অন্ধকারে মিশে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো রঙ কালো। আর তাই সাদার বদলে আজ কালো বেশে রায়-গিন্নি। লকেট কেড়ে নেওয়ার সময় চুড়িতে চুড়িতে লেগে শব্দ হতে পারে, তাতে শালু চুরির পিছনে কোনও মেয়ের হাত থাকার কথা মনে করতে পারে, তাই হাতের চুড়ি বাড়িতে খুলে রেখে আজ মিসেস রায় মাটির ট্রেন্ডি গয়না পরেছেন।
“বাবুলাল বেরিয়েছে। ক্যাটারিংয়ের ছেলেগুলোও ডাইনিংয়ের দিকে, কেক কাটার পর বাকি সবাই হলঘরে। নন্দিনীর ঠিক ঘরের সামনেই সিঁড়ির তলায় মেন স্যুইচ, ইনভার্টার। চারদিক দেখে নিয়ে এই সুযোগে নন্দিনী ওই দুটো স্যুইচই বন্ধ করে দিল। এবার হলঘরের মুখে এসে মিসেস রায়ের থেকে নিল লকেটটা। নন্দিনীর ঘরের পাশের বাথরুমের পিছনে সুইপারের ঢোকার দরজা। জেরার সময় নন্দিনী আমায় বলল, ও পাওয়ার কাটের সময় থেকেই নিজের ঘরে আছে আলো জ্বলে ওঠা অবধি। ওর ঘরের সামনেই সিঁড়ির তলার অংশ। বাবুলাল মেইন স্যুইচ অন করল আর ও দেখতেই পেল না? তার মানে ও আমায় মিথ্যা বলেছে। বাবুলাল যখন মেইন অন করে, তখন ও আশেপাশে কোথাও ছিল না। বাথরুমের পিছনের দরজাটা দেখলাম ভেজানো রয়েছে মাত্র। ভিতর থেকে বন্ধ নেই। বাথরুমের মেঝেতে কাদা পায়ের ছাপ আর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে রয়েছে। বাগানের বৃষ্টিভেজা নরম মাটিতে পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগিয়ে পৌঁছলাম পাঁচিলের গা বরাবর রাখা একটা বড়ো গোলাপের টবের সামনে। পায়ের ছাপটা সেখানে গভীর, মানে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল কেউ। টবের মাটি এলোমেলো, তাড়াহুড়োয় খুঁড়ে আবার বোজানো হয়েছে। পাশে খুরপিতে টাটকা মাটি লেগে। গোলাপ পাতার উপরে পড়ে আছে টাটকা রক্তের ফোঁটা।”
শ্রীপর্ণা একটু থামে। সারা ঘরে গুঞ্জন। মিসেস রায় আর নন্দিনী মুখে হাতচাপা দিয়ে মাথা নিচু করে বসে। নন্দিনী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মিসেস রায়ের মেয়ে মাম্পি এখনও ঠিক ব্যাপারটা ধরতে পারেনি, তাই অবাক হয়ে মায়ের মুখটা হাতের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।
শ্রীপর্ণা হাতে গ্লাভস পরে নেয়। তারপর পকেট থেকে বার করে আনে ওর দলা পাকানো রুমাল। আর তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে পান্না আর হীরকখচিত সোনার গণেশ মূর্তি; দক্ষ পুলিশ অফিসারের যোগ্য হাতে পুনরাবির্ভাব ঘটে সিদ্ধিদাতার।
_____
অলঙ্করণঃ সুমিত রায়