বিজ্ঞান:: এ-এম যেখানে জি-এম-এর চেয়ে বড় - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

এ-এম যেখানে জি-এম-এর চেয়ে বড়

সূর্যনাথ ভট্টাচার্য


আজ এমন একটা বিষয়ের অবতারণা করছি যা সাময়িক পত্রের বিনোদন বিভাগের চেয়ে কলেজ গণিতের পাঠ্যপুস্তকেই হয়ত বেশী মানানসই হতো। বস্তুত যে উপপাদ্যটি আমি আলোচনা করতে বসেছি, তা অসমীকরণ তত্ত্বের একটি বুনিয়াদী ও বহুল ব্যবহৃত সূত্র।
কিন্তু আপাতত উপপাদ্য মাথায় থাকআগে বলো দেখি, -এম কি জি-এম এর চেয়ে বড় হয়?
কর্পোরেট জগতের খবর বিশেষ রাখি নাতবে যতদূর মনে হয়, যে কোনও বাণিজ্যিক সংস্থায় অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (এ এম) নিশ্চয়ই জেনারাল ম্যানেজারের (জি এম) চেয়ে পদমর্যাদায় বড় হবে না
অঙ্কের জগতে কিন্তু এটা সম্ভব সম্ভব শুধু নয়, এটাই দস্তুর অর্থা-এম সর্বদা জি-এম এর চেয়ে বড়!
হ্যাঁ, এরা যে অঙ্কের জগতের এ-এম আর জি-এম, বাস্তবিক কোনও কার্যবাহী প্রবন্ধক নয় এদের পুরো নাম হল, অ্যারিথমেটিক মীন আর জিওমেট্রিক মীন, বাংলা করলে দাঁড়ায় যথাক্রমে সমান্তর ও গুণোত্তর মধ্যক
এরা কী বস্তু, খায় না মাথায় মাখে জানতে হলে গুটিকয় কথা এসে পড়ে মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র ও শিক্ষকবর্গ আমায় মাপ করবেন, বিষয়টি সর্বজনগ্রাহ্য করতে আমাকে সমান্তর ও গুণোত্তর মধ্যক সম্বন্ধে দুচারটি কথা বলতে হচ্ছে
সমান্তর মধ্যক নিয়ে বিশেষ সমস্যা নেই এটা হল কয়েকটি সংখ্যার গড় মান সোজা কথায় সংখ্যা কটিকে যোগ করে যতগুলি সংখ্যা তা দিয়ে ভাগ দিলেই এই মধ্যকটি পাওয়া যায় অর্থা n সংখ্যক সংখ্যার যোগ ফল যদি S হয়, তাহলে ঐ সংখ্যাগুলির সমান্তর মধ্যক হচ্ছে (S/n), ব্যাস
গুণোত্তর মধ্যক ঠিক এতোটা সরল নয় দুটি সংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপারটা বোঝা অবশ্য খুব কঠিনও নয় দুটি সংখ্যার গুণোত্তর মধ্যক হল ঐ সংখ্যাদুটির গুণফলের বর্গমূল অর্থা ধরুন আপনার একটি আয়তাকার জমি আছে যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে x এবং y , যেখানে এই x, y পরস্পর সমান নয় এই জমিটির সমান ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট বর্গাকার একটি জমি যদি পাওয়া যায়, তাহলে ঐ বর্গক্ষেত্রটির বাহুর দৈর্ঘ্য হবে x এবং y এর গুণোত্তর মধ্যক
এইভাবে তিনটি সংখ্যার গুণোত্তর মধ্যক হবে ঐ সংখ্যা তিনটির ঘনমূল তিনের বেশী সংখ্যক সংখ্যার জন্যেও একইভাবে গুণোত্তর মধ্যকের সংজ্ঞা নিরূপণ করা যাবে এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগুলির গুণফলের, যতগুলি সংখ্যা তততম মূল নিতে হবে
একটু খটমট লাগছে কি? তা লাগবে বৈকি, জেনারাল ম্যানেজার বলে কথা! কিন্তু এর বেশী জটিলতা আর নেই আমাদের বর্তমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এইটুকুই যথেষ্ট আশা করি, যে সূত্রটার কথা গোড়াতেই বলেছিলাম এবার সেটা বলা যেতে পারে সূত্রটি হল এই –
সসীমরূপে বহুসংখ্যক ধনাত্মক সংখ্যার গুণোত্তর মধ্যক সর্বদা তাদের সমান্তর মধ্যকের চেয়ে কম হয়। গুণোত্তর মধ্যকটি বড়জোর সমান্তর মধ্যকের সমান হতে পারে, একমাত্র সেই ক্ষেত্রে যখন সব কটি সংখ্যা পরস্পর সমান[1]
এই পর্যন্ত পড়েই যারা পাতা পাল্টাতে চলেছো, তাদের বলি উচ্চ গণিতের বিমূর্ত কচকচিতে আপনাদের বিরক্তি উপাদন করার দুরভিসন্ধি কিন্তু আমার নেই। বিশ্বাস করো, আমার উদ্দেশ্য ঠিক এর বিপরীত। গণিতশাস্ত্রের এই প্রতিপাদ্যটি, যা বহু জটিল সমস্যার সমাধান জলের মত সহজ করে দেয়, আমি প্রমাণ করতে চাই অত্যন্ত সহজভাবে, কোন কূটতত্ত্বের সাহায্য ছাড়াই। আমি সহজ বাংলায় ব্যাপারটা বোঝাতে চাই, যাতে করে প্রমাণটা যেন ইতিহাস বা সাহিত্যের ছাত্রেরও বোধগম্য হয়। তাই অংক আপনার বিষয় না হলেও মনের জানলাটা একটু খুলে রাখতে অনুরোধ করবো। দেখো না, বোধহয় হতাশ হবে না।
কয়েকটা উদাহরণের মাধ্যমে পরিবেশটা একটু হালকা করা যেতে পারে। নীচের সারণীতে দেখো, ¾
প্রতিক্ষেত্রেই এ-এম জি-এম-কে টেক্কা দিয়েছে। এখানে গুটি চার-পাঁচ সংখ্যা নিয়ে দেখানো হয়েছে, কিন্তু যথেচ্ছ বেশী সংখ্যক সংখ্যার জন্যেও করে দেখা যেতে পারে। অবস্থার হেরফের হবে না।
সারণী থেকে একটা জিনিস বেশ পরিষ্কার, সংখ্যাগুলোর মানের ব্যবধান যখন বেশী, গুণোত্তর মধ্যক অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। ব্যাপারটা ঠিক সেরকম থাকে না, যখন সংখ্যাগুলি খুব ‘কাছাকাছি’শেষ উদাহরণটা দেখো। এক্ষেত্রেও জি-এম এ-এম-এর চেয়ে কম বটে, কিন্তু প্রায় ধরে ফেলেছে। একেবারে ধরে ফেলে যখন সংখ্যাগুলো সব সমান!
ধরে ফেলে কিন্তু অতিক্রম করে না। এইটাই প্রতিপাদ্য। গাণিতিক পদ্ধতিতে বেশ কিছু আকর্ষণীয় উপায়ে এটি প্রমাণ করা যায়। কিন্তু এটা তো অঙ্কের ক্লাস নয়। তাই ন্যূনতম সাংকেতিক চিহ্ন ও বেশীটাই সাধারণ যুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপারটা সিদ্ধ করা যায় কিনা দেখা যাক।
তো আমাদের প্রামাণ্য হল, n সংখ্যক ধনাত্মক সংখ্যার অ্যারিথমেটিক মীন, অর্থা সমান্তর মধ্যক, তাদের জিওমেট্রিক মীন, অর্থা গুণোত্তর মধ্যকের চেয়ে সর্বদা বড় হয় এইতো?
সাদা বাংলায় প্রমাণের যুক্তিগুলো বলি ¾
কেননা এ আর কে না জানে দুটো সংখ্যার বিয়োগফল যদি শূন্যের চেয়ে বেশী হয় অর্থা ধনাত্মক হয়, তাহলে প্রথম সংখ্যাটা নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টার চেয়ে বড়
(৩) বাকী সংখ্যাদের মধ্যে আবার দু’টো অসমান সংখ্যা পছন্দ করে একই প্রক্রিয়া চালাও। আবার যোগফল সমান রইল, কিন্তু তাদের গুণফল বেড়ে গেল।
(৪) এই করে যাও, যতক্ষণ না সব সংখ্যাগুলো সমান হয়ে যায়। যখন সবকটি সংখ্যা সমান হয়ে গেল, সে অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাগুলোর যোগফল আসল সংখ্যাগুলোর যোগফলের সমান আছে, কিন্তু তাদের গুণফল আসল সংখ্যাগুলোর গুণফলের চেয়ে বেড়ে গেছে। অতএব গুণোত্তর মধ্যকের মানও বেড়ে গেছে
(৫) বেড়ে কী হয়েছে? এখন যেহেতু সংখ্যাগুলো সব সমান, তাদের সমান্তর মধ্যক এবং গুণোত্তর মধ্যক সমান। এবং আমাদের প্রক্রিয়া অনুযায়ী যেহেতু সংখ্যাগুলির যোগফলে কোনও বৃদ্ধি হয় নি, অতএব সমান্তরমধ্যক একই আছে। গুণোত্তর মধ্যক বেড়ে সমান হয়েছে।
(৬) অতএব আদতে গুণোত্তর মধ্যক সমান্তর মধ্যকের চেয়ে কম ছিল। ঠিক কিনা?
এখন বলো, আমি কি কোনও দুর্বোধ্য গাণিতিক তত্ত্ব ব্যবহার করেছি?
__________________________________________
[1]সসীমরূপে বহুসংখ্যক ধনাত্মক সংখ্যা, এই কথাটি মনে রাখতে হবে অসীম সংখ্যক অথবা ঋণাত্মক সংখ্যার জন্য সূত্রটি খাটে না সংখ্যা যেমন ইচ্ছে হতে পারে, পূর্ণসংখ্যা, ভগ্নাংশ বা অমূলদ
____________
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment