বিজ্ঞান:: বন্ধু পাখির গল্প - কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়


বন্ধু পাখির গল্প
কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

পাখি কি আমাদের বন্ধু হতে পারে? কেন হবে না? টিয়া বা কাকাতুয়াকে খাঁচায় বন্দি রেখে কথা শেখালে কী সুন্দর কথা বলে, গান গায়। না আমি এ ধরনের বন্ধুত্বের কথা বলছি না। যেসব পাখি নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় আমি তাদের কথা বলছি। তারা কি বন্ধুর মতো আমাদের কোনো উপকার করে?
পাখি সব সময়ই আমাদের কিছু না কিছু উপকার করে। তবে কিছু পাখি আছে যাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে উপকারে আসে। এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় শকুনের কথা। এরা মৃত প্রাণীদেহের মাংস খেয়ে পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। যদিও শকুনের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এটা আমাদেরই কৃতকর্মের ফল।
চড়াই পাখি আমরা সকলেই দেখেছি। বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। দেওয়ালের ফাটলে, ঘুলঘুলিতে, কড়ি-বরগার ফাঁকে এরা বাসা বাঁধে। সেখানে ডিম পাড়ে, ছানাপোনা হয়। বড়ো হয়ে বাড়ির চারপাশে ফুড়ুৎ-ফুড়ুৎ করে উড়ে বেরায়। আমরা কি কখনও ভেবেছি এই ছোট্ট পাখিগুলিই ভূমিকম্পের আগাম খবর দিয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচাতে পারে? ১৮৫৭ সালে ইতালির জিনোয়া শহরে যে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল তার আগাম খবর দিয়েছিল এই পাখিরা। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগে এরা শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। তাই দেখে সেখানকার মানুষ সতর্ক হওয়াতে তারা প্রাণে বেঁচে যায়। ১৮৫৫ সালে জাপানের টোকিও শহরে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল। এই ঘটনার সাতদিন আগে থেকে সেখানকার মুরগিদের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা গিয়েছিল। ওই সময় ওরা ডিম দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং নিজেদের ঘরে থাকতে চাইছিল না। ওদের আচরণ দেখে ভূমিকম্পের আগাম খবর পেয়ে গিয়েছিল সেখানকার মানুষেরা। ১৯৭৫ সালে চিনের হেই-চেং শহরে এবং ১৯৭৬ সালে ইতালির উত্তরাঞ্চলে যে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল তার হাত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল পাখিদের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করে সতর্ক হওয়াতে।
আমাদের বাড়ির চারপাশে দেখা যায় এমন আর একটি পাখির কথা বলি। এরা হল শালিক। এক শালিক, দুই শালিক নিয়ে আমাদের মধ্যে যতই সংস্কার থাক, এরা কিন্তু আমাদের উপকারী বন্ধু। সম্প্রতি জানা গেছে শালিক পাখি আবহাওয়া পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে পারে। সাধারণত এরা ‘কিক্‌ কিকিউ কিক্‌ কিকিউ’ শব্দ করে নিজেদের মধ্যে ডাকাডাকি করে। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ু আসার ঠিক আগে এদের ডাক পালটে যায়। তখন এরা ‘পিকিউ পিকিউ’ শব্দে ডাকে। এই ডাকের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট তাল ও ছন্দ থাকে। কুড়ি থেকে তিরিশ সেকেন্ড এক নাগাড়ে ডাকার পর দশ থেকে পনেরো সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর আবার শুরু হয় ডাক। দেখা গেছে বজ্র-বিদ্যুৎ সহ ঝড়বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ সৃষ্টির আট থেকে ছত্রিশ ঘন্টা আগে এরা এইভাবে ডাকতে থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেটে গেলে এদের ডাকও পালটে যায়।
‘কমন সুইফ্‌ট’ নামে এক ধরনের পাখিও ঝড়ের আগাম খবর দিতে পারে। ঝড় আসার আগে এরা নিজেদের বাসা ছেড়ে আকাশে উড়তে থাকে। ঝড় না থামা পর্যন্ত এরা আকাশ থেকে নামে না।
হাঁসের ডাকেও রকমফের আছে। এদের শরীরে এক ধরনের সূক্ষ্ম অনুভূতি আছে যার সাহায্যে এরা বিপদের আঁচ আগে থেকেই করতে পারে। আর তখনই এরা একটি নির্দিষ্ট স্বরে ডাকতে থাকে। শোনা যায়, হাঁসের এই বিপদ-সূচক ডাক শুনে অতীতে রোমের মানুষ এক বড়ো ধরনের বিপদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছিল।
পাখিদের দেওয়া এইসব বিপদ সঙ্কেত আমরা অনেক সময়েই গ্রাহ্য করি না। ফলে বহুক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে পাখিরা নিজেদের বাঁচাতে পারলেও, বুদ্ধিমান জীব হয়েও আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি না।
শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগেই নয়, আরও নানা ক্ষেত্রে পাখি প্রকৃত বন্ধুর মতো আমাদের সাহায্য করে। বিশেষ করে নতুন দেশ সন্ধানে পরিযায়ী পাখির ভূমিকা এক সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রাচীনকালে সমগ্র পৃথিবীর মানচিত্র আমাদের জানা ছিল না। তাই নতুন দেশের সন্ধানে বহু দুঃসাহসিক অভিযাত্রী সমুদ্রের বুকে ভেসে পড়ত পালতোলা জাহাজ, কম্পাস, জনশ্রুতি আর আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র সম্বল করে। একটু ভুল হল বলতে। এইসব অভিযাত্রীদের আরও একটি সম্বল ছিল — পরিযায়ী পাখি। এই পাখিদের যাতায়াতের পথ ধরে জাহাজ চালিয়ে অভিযাত্রীরা অনেক নতুন দেশ আবিষ্কার করেছেন।
দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে আছে দুটি দ্বীপ — তাহিতি ও রাইয়াটিয়া। প্রতি বছর শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে আসে। এরা আসে উত্তর দিক থেকে। এদের যাতায়াতের পথ লক্ষ করে এখানকার অধিবাসীরা একদিন ভাবতে শুরু করল যে উত্তরে নিশ্চয়ই কোনও দেশ আছে যেটা এদের প্রকৃত বাসস্থান। ব্যস, দেশ খোঁজার নেশায় একদল নির্ভীক মানুষ ভেসে পড়ল সমুদ্রের বুকে। চলল উত্তর বরাবর পাখিদের যাতায়াতের পথ ধরে। বহু কষ্ট সহ্য করে ওই পলিনেশিয়ান দলটি যে দেশটি আবিষ্কার করল তার নাম ‘হাওয়াই’।
তাহিতির আর এক দুঃসাহসিক নাবিক ‘কুপে’-কে দেশ আবিষ্কারের সম্মান এনে দিয়েছিল পরিযায়ী পাখির একটি দল। এদের দেখতে কোকিলের মতো। তবে লেজগুলো হয় খুব লম্বা। এই পাখির দলটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে তাহিতি-তে উড়ে আসত। এদের পথ অনুসরণ করে কুপে রওনা দিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে অবশেষে তাঁর জাহাজ গিয়ে ভিড়ল নিউজিল্যান্ডের উপকূলে।
কলম্বাস যখন নতুন দেশের খোঁজে সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়েছিলেন তখন তাঁর জাহাজের গতিপথ ছিল এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখিকে অনুসরণ করে। সমুদ্রে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে একদিন তিনি পৌঁছেছিলেন আমেরিকায়। সময়টা ছিল ১৪৯২ সাল।
ভারতবর্ষের খোঁজে পর্তুগীজদের একটি দল দমুদ্রে যাত্রা করেছিল। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তারা এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখিকে পশ্চিম দিকে উড়ে যেতে দেখে সেদিকে জাহাজের মুখ ঘোরায়। কিছুদিন পর তারা যে দেশে পৌঁছোয় সেটা অবশ্য ভারতবর্ষ ছিল না, ছিল ব্রাজিল।
৮৫৪ সালের কথা। জলদস্যু গার্ডার-সুইডেন লক্ষ করলেন যে এক ঝাঁক পাখি প্রতি বছরই গ্রীষ্মকালে নরওয়ের পশ্চিম উপকূল ছেড়ে উড়ে চলে যায় উত্তর সাগরের দিকে। কোথায় যায় ওরা? ঐ দিকে কি কোনো দেশ আছে? ওদের গন্তব্যস্থল দেখার উদ্দেশ্যে গার্ডার চললেন ওদের অনুসরণ করে। অবশেষে একদিন অবাক হয়ে দেখলেন ওদের দেশ ‘আইসল্যান্ড’।
শোনা যায়, আলেকজান্ডার একবার লিবিয়ার মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এক ঝাঁক পাখির জন্য সে যাত্রা তাঁর প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। পাখিদের অনুসরণ করেই তিনি সেবার মরুভূমি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
“রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে….” সুকান্তর লেখা এই কবিতাটি আমরা প্রায় সকলেই পড়েছি। দেশ থেকে দেশান্তরে প্রিয়জনের কথা, নানা ধরনের সংবাদ পৌঁছে দিতে একসময় এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এক সময় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার জন্য মানুষ পাখির সাহায্য নিত। আর এ ব্যাপারে পায়রাই ছিল মানুষের প্রথম পছন্দের পাখি। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় যে রাজা সলোমনের কয়েকটি পায়রা ছিল। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে দূরে কোথাও গেলে তিনি এই পায়রাগুলিকে সঙ্গে নিতেন। রাজপ্রাসাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য এরাই তখন পত্র-বাহকের কাজ করত। জুলিয়াস সিজার রাজ্য শাসনকালে গুপ্ত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য পায়রার সাহায্য নিতেন। শোনা যায়, ইরাকে এক সময় পায়রার সাহায্যে ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়েছিল। ১৮৭১ সালে ফ্রান্স ও প্রুশিয়ার যুদ্ধের সময় পায়রা-নিয়ন্ত্রিত ডাক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
প্রাচীনকালে গ্রিক নাবিকেরা সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার সময় সঙ্গে পায়রা নিয়ে যেত। দেশে ফেরার আগে সেই পায়রা তারা উড়িয়ে দিত। পায়রাগুলি দেশে ফিরে এসে নাবিকদের আগমন-বার্তা আগাম পৌঁছে দিত তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে।
শোনা যায়, হিটলারের পরাজয়ের অন্যতম কারণ নাকি একটি পায়রা। পায়রাটি এমন একটি গোপন খবর মিত্র পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল যাতে হিটলারের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। এই পায়রাটিকে পরে ‘ভি’ মেডাল দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছিল।
এক সময় আমেরিকার উপকূল রক্ষীবাহিনী উদ্ধার কার্যের জন্য পায়রার সাহায্য নিত। এদের হেলিকপ্টারের নীচে একটি খাঁচা ঝোলানো থাকত। এই খাঁচায় তিনটি খোপ থাকত। এই খোপগুলি এমনভাবে তৈরি করা হত যাতে এখানে রাখা পায়রাগুলি একে অপরের সঙ্গে ১২০ ডিগ্রি কোণ করে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে পারে। প্রত্যেক খোপে একটি করে বোতাম রাখা হত। এগুলির সঙ্গে চালকের কেবিনে রাখা নির্দিষ্ট তিনটি আলোর সঙ্গে সংযোগ থাকত। খোপের পায়রাগুলি প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত হত। সমুদ্রে লাল, হলুদ বা গোলাপী রঙের কোনো ভাসমান বস্তু দেখলে এরা বোতামে ঠোক্কর মারত। সঙ্গে সঙ্গে চালকের কেবিনে নির্দিষ্ট করা আলো জ্বলে উঠত। চালক সেই আলো দেখে বুঝতে পারত কোন পায়রাটি বোতামে ঠোক্কর মেরেছে। সেই অনুযায়ী হেলিকপ্টারের মুখ ঘুরিয়ে উদ্ধারকারীর দল রওনা দিত গন্তব্যস্থলের দিকে।

_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment