একটা লম্বা সফরের কাহিনী
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
।। পর্ব ছয় ।।
এবারে গ্যালাপোগোস দ্বীপে ডারউইনের কাজকর্মের বিবরণ সরাসরি তাঁর
ডায়েরি আর চিঠিপত্র অবলম্বনে। তাঁর নিজের জবানিতে।
১৬
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
চ্যাথাম
দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটায় জাহাজ থামল। দূর থেকে এখানকার দ্বীপগুলোকে সমুদ্রের
দিকে ঢালু হয়ে আসা মসৃণ গড়নের জমির মতো দেখায়। মাঝে মাঝে দু-একটা টিলা বা পাথরের
স্তূপ শুধু সেই মসৃণতাটাকে ভাঙে। এদের গোটাটাই কালো লাভায় তৈরি। নিচু নিচু গাছ আর
পাতাহীন ঝোপঝাড়ে ঢাকা ভূত্বক। লাভা ছাওয়া জমির যে এলাকাগুলো বেশি ঝাঁঝরা হয়ে আছে
সেখানগুলোকে লালচে ছাইয়ের মতো দেখায়। বামন চেহারার গাছগাছালিতে প্রাণের কোনও চিহ্ন
দূর থেকে টের পাওয়া যায় না।
কালো কালো পাথরগুলো সূর্যের খাড়া আলোর তেজে চুল্লির মতো গরম। গুমোট
গরম বাতাসে চামড়ায় যেন ছ্যাঁকা লাগে। এমনকি গাছপালা ঝোপঝাড়েও কেমন একটা বোঁটকা
গন্ধ ছাড়ছিল। বিষুবরেখার চল্লিশ মাইল দূরে এ-জায়গাটায় এসে পৌঁছে বেশ কিছুকাল পরে
কড়া গরমের আন্দাজটা পাওয়া গেল। অ্যাদ্দিন জাহাজে চলতে চলতে না-গরম না-ঠাণ্ডা
আবহাওয়ায় বেশ ভালোই কেটেছে আমাদের। অবশ্য মহাদেশের উলটো উপকূলে আটলান্টিক দিয়ে
চলতাম যদি তাহলে এ সুখ মিলত না বলাই বাহুল্য।
গ্যালাপোগোসে পৌঁছোবার জন্য আমি নিজেও খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। কৌতূহলটা
বিশেষ করে হচ্ছিল এখানকার ভূতত্ত্ব আর প্রাণীজগত নিয়ে। এখানে বেশ কিছু জীবন্ত
আগ্নেয়গিরি রয়েছে এখনও। আশা ছিল কিছু ‘টারশিয়ারি স্ট্রেটা’-র (বলা যায়,
‘পুরোনোকালের ভূস্তর’-এঁর) দেখাও মিলবে।
১৭ সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
সেন্ট
স্টিফেন জেটিতে বিগল নোঙর করেছে। একটা আমেরিকান তিমিশিকারি জাহাজও সেখানে এসে
হাজির হয়েছে দেখা গেল। এই এলাকার গোটা উপসাগরটা সামুদ্রিক জীবজন্তুতে ঠাসা। এদিক সেদিক
চোখ ফেললেই হাঙর, কাছিম আর নানা জাতের মাছের উঁকিঝুঁকি চোখে পড়ে। জাহাজের লোকজন
তাই দেখে জলে বঁড়শি ফেলে দু-তিন ফুট লম্বা গাদা গাদা মাছ তুলে আনছে। ডেকের
চারদিকেই তাদের পাখনা আছড়ানোর দুমদাম শব্দ আর লোকজনের হাসির আওয়াজ।
তাজা মাছের ভোজ সেরে একটা দল গিয়ে ডাঙায় নামল কাছিম ধরবার ধান্দায়।
দ্বীপগুলোতে কতজাতের যে সরীসৃপ রয়েছে তার লেখাজোখা নেই। তিন প্রজাতির কাছিম (Turtle)
বাদেও রয়েছে নানাজাতের কচ্ছপ (tortoise)। সংখ্যায় তারা এতই বেশি যে জাহাজের লোকজন একদিনেই বেশ কিছু কচ্ছপ ধরে
ফেলতে পেরেছিল।
[এইখানে বলে রাখি, কাছিম ও কচ্ছপে কিছু
তফাত আছে। আদতে তারা একই পরিবারের জীব হলেও, কাছিম বা টার্টলরা জলবাসী। তারা কেবল
ডিম পাড়তে ডাঙায় আসে। তাদের সামনের পা ফ্লিপারের মতো। পেছনের পায়ের আঙুলগুলো
চামড়ায় জোড়া। তারা সর্বভূক। অন্যদিকে কচ্ছপ বা টরটয়েজরা বেশিরভাগই স্থলবাসী। তাদের
ফ্লিপার টিপার নেই। দিব্যি আঙুলওয়ালা পা। তারা নিরামিষ খায়। এই সঙ্গে ত্রিপুরার
ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের সামনের বিরাট দিঘিতে ঘুরে বেড়ানো একটা কাছিমের ছবি দিলাম।
সে মহা দুষ্টু। আমার পায়ের বুড়ো আঙুলটা খাবার ভেবে গলা বাড়িয়ে কামড়ে দিয়েছিল। কথায়
বলে কাছিমের কামড় নাকি ধরলে আর ছাড়ে না। তবে এই কাছিমবাহাদুর আঙুলখানা কামড়ে ধরে
সঙ্গে সঙ্গেই সে কামড় ছেড়ে দেয়। আমাদের সঙ্গে ছিল ত্রিপুরার বন্ধু রাজীব। সে অনেক
ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে যে আকাশে ঘন ঘন মেঘ ডাকছে বলে কাছিম তার কামড় ছেড়ে
দিয়েছে। কে জানে বাবা! -লেখক]
দ্বীপের কালো লাভাপাথরের প্রান্তরে বেজায়
বড়ো বড়ো বিশ্রী চেহারার গিরগিটির দল ঘুরে বেড়ায়। লম্বায় একেকটা তাদের দু-তিন ফুট
করে হবে। গায়ের রঙ লাভাপাথরের মতোই কুচকুচে কালো। গদাইলশকরি চালচলন। দেখলেই কেমন
গা ঘিনঘিন করে। সাধে কি আর লোকে এদের “নরকের খুদে শয়তান” নাম দিয়েছে?
জমিতে নেমে আমি গুটিদশেক বিভিন্ন
প্রজাতির ফুলের নমুনা জুটিয়েছি আজ। বিশ্রী খুদে খুদে সব ফুল। দেখে মনে হয় যেন মেরু
অঞ্চলে আছি। এই ক্রান্তীয় আবহাওয়ায় এগুলো একেবারেই বেমানান। এ দ্বীপের পাখপাখালির
দল মানুষ দেখেনি বিশেষ। মানুষকে বোধ হয় এরা তাদের প্রতিবেশী বড়ো বড়ো কচ্ছপদেরই
জাতভাই ভেবে নিয়েছে। ফলে ভয়ডর বিশেষ পায় না। আমাদের তিন চার ফুটের মধ্যে ঝোপঝাড়ে
দিব্যি খেলে বেড়াচ্ছিল সব। ঢিল মারলেও ভ্রূক্ষেপ নেই কোনও। মিস্টার কিং তো টুপির
ঝাপটা দিয়ে একটাকে মেরেই ফেললেন। আমি নিজেও বন্দুকের নলটা দিয়ে গুঁতো মেরে একটা
বাজপাখিকে গাছের একটা নিচু ডাল থেকে ফেলে দিলাম। তাতেও দেখি কোনও সাড়াশব্দ করে না।
১৮
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
আজ জাহাজ নতুন জায়গায় সরিয়ে আনা হল। খাওয়াদাওয়ার পর হাঁটতে নেমে একটা
পুরোনো জ্বালামুখের ভাঙাচোরা ধ্বংসাবশেষ বেয়ে উঠেছিলাম। জ্বালামুখটা খুব একটা উঁচু
নয়। তবে বেশ চওড়া। আমাদের চারপাশে তার ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া দেয়াল আগ্নেয়ভস্মের
গুঁড়ো মেশানো শক্ত বেলেপাথরে তৈরি। বোঝা যাচ্ছিল, এই আগ্নেয়গিরিটা একসময় জলের নীচে
ছিল।
সেখান থেকে কয়েক লিগ উত্তরে গিয়ে দেখি
একটা ফুটিফাটা এলাকা পড়ে আছে। তার বুকে ছোটো ছোটো মোচা আকারের অজস্র কালো পাথরের
স্তূপ। ওরা ভূগর্ভস্থ লাভাবাহী চিমনিদের প্রাচীন মুখ। আজকেও আমাদের শিকারীর দল
পনেরোটা পর্বতপ্রমাণ কচ্ছপ ধরে নিয়ে ফিরেছে।
১৯, ২০
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
এই দু’দিন ধরে আমরা দ্বীপের উপকূলবর্তী এলাকাটার জরিপ সেরে ফেলেছি। জরিপের
শেষে প্রথমদিন যেখানে তিমিশিকারি জাহাজটাকে দেখেছিলাম সেইখানটায় ফিরে এলাম। পথে
একজায়গায় সরু সরু জলের ধারা নজরে পড়েছে। আর পেয়েছি একটা ঝোরা। আশপাশের উপত্যকার রঙ
খানিক উজ্জ্বল সবজেটে। যখন প্রথম এখানে এসে নামলাম, জায়গাটাকে মনে হয়েছিল পাতাঝরা
ঝোপঝাড়ে ভরা একটা এলাকা। আপাতদৃষ্টিতে সেরকমই দেখালেও এখন বুঝতে পারছি এই ঝোপঝাড়
আসলে ফুলপাতা সবই ধরে আছে এখন। তবে তাদের মধ্যে রঙ বলতে কেবল ক্বচিৎ দু-একটা বাদামি
রঙের দেখা মেলে।
২১
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
পাথুরে মোচাওয়ালা ফুটিফাটা এলাকাটা ভালো করে দেখবার জন্য আমাকে একজন
কর্মচারী সঙ্গে দিয়ে উত্তরপূর্বে কয়েক মাইল এগিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল আজ। উলভারহ্যাম্পটনের
লোহা গলাবার চুল্লির যে এলাকাটা আছে, এ-জায়গাটাকে দেখতে লাগে অনেকটা সে-রকম। জমাট
লাভাস্রোতের উঠোনের বুকে, পঞ্চাশ থেকে একশো ফুট উঁচু খুদে খুদে প্রায় ষাটটা লাভার
টিলা গুণলাম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। স্রোতগুলোর কোনটা কত নতুন বা পুরোনো সেটা টের
পাওয়া যায় তাদের আশপাশে ঝোপঝাড় গজিয়েছে না গজায়নি সেইটে খেয়াল করলে। তুলনায় নতুন
এলাকাগুলো বেজায় রুক্ষ্ম আর বিদঘুটে চেহারার। দেখে মনে হবে যেন ঝোড়ো সমুদ্রের ঢেউ
ওঠা বুক হঠাৎ কোনো ম্যাজিকে জমাট বেঁধে পাথর হয়ে রয়েছে। তবে এমন এলোমেলো ঢেউ কোনও
সমুদ্রে কখনই উঠবে না সেটাও ঠিক। চিমনিগুলোর জ্বালামুখগুলো অবশ্য এখন একেবারেই
মরা। তাদের ঘিরে রাখা আঙরার বৃত্তগুলো ছাড়া আর কোনও চিহ্নই চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে
বিরাট বিরাট গোল কুয়োর মতো জায়গা চোখে পড়ছিল। আপাতদৃষ্টিতে ত্রিশ থেকে আশি ফুট
গভীর কুয়োগুলোকে জ্বালামুখ মনে হলেও খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় সেগুলো আসলে তা নয়।
ভূগর্ভস্থ কোনও গুহার ছাদ ধ্বসে গিয়ে তাদের সৃষ্টি। সম্ভবত লাভা গলিত অবস্থায়
থাকবার সময় তার থেকে বার হওয়া গ্যাসের চাপে তরল লাভার স্তরের ভেতর সেইসব গুহার
সৃষ্টি হয়েছিল।
মাঝে মধ্যে বইতে পড়ে চেনাজানা হয়ে যাওয়া
কোনও জিনিস চাক্ষুষ দেখতে পেলে ভারী মজা হয়। তা এইখানে ঘুরতে ঘুরতেই তেমন মজা
পেলাম আজ দুটো রাক্ষুসে কচ্ছপের সঙ্গে দেখা হয়ে। তাদের খোলার বেড় কম সে কম সাত ফুট
হবে। তাদের একজন মনের সুখে ক্যাকটাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল। কাছে যেতে দিব্যি
সভ্যভব্য হয়ে সরে গেল। অন্যজন দেখি খানিক বিরক্ত হয়েছে। বেশ গম্ভীর একটা হিশহিশে
শব্দ করে একটা ডাক দিল সে। তারপর গলাটাকে চটপট গুটিয়ে নিল। বেজায় ভারী ছিল
জীবদুটো। তাদের টেনে তুলে দেখতে গিয়ে আমার দম বেরিয়ে যাবার দশা। ঢেউ ওঠা লাভার
উঠোনের বুকে, পাতাহীন ঝোপঝাড় আর বিরাট বিরাট ক্যাকটাসের ভেতর ঘুরে বেড়ানো
জীবদুটোকে দেখতে মনে হচ্ছিল যেন আদিম যুগের কোনও হারিয়ে যাওয়া জন্তুকে দেখছি।
২২
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
কাল রাতে একটা বালুকাবেলায় আস্তানা গেড়েছিলাম আমরা। সকালে ঘুম থেকে উঠে
বেশ কিছু নতুন নতুন পাখি, গাছগাছড়া, শামুক আর পোকামাকড়ের নমুনা জুটিয়ে নিয়ে সন্ধের
মুখ মুখ জাহাজে ফিরে এলাম। দিনটা আজ বেজায় গরম ছিল। বিষুবরেখার কাছাকাছি রয়েছি যে,
সেটা হাড়ে হাড়ে মালুম পড়েছে সারাদিন ধরে।
২৩,২৪
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
উপসাগর পেরিয়ে চার্লস দ্বীপে (এখনকার নাম আইলা ফ্লোরেনা। - লেখক) এসে নোঙর
করা হয়েছে। বছর পাঁচ-ছয় যাবত এখানে একটা ছোটো জনবসতি গড়ে উঠেছে। মিস্টার লসন নামে
একজন ইংরেজ (নিকোলাস ও’ লসন। ইকোয়েডর সরকারের প্রতিনিধি ছিলেন সেখানে। - লেখক) এখন
তার গভর্নর হিসেবে কাজ করছেন। সকালে একটা তিমিশিকারি জাহাজ পরিদর্শনের জন্য জেটিতে
এসেছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে সঙ্গে করে বসতিতে নিয়ে এলেন।
২৫
সেপ্টেম্বর ১৮৩৫
বসতিটা উপকূল থেকে প্রায় সাড়ে চার মাইল ভেতরে, দ্বীপের একেবারে মাঝখানটায়
গড়ে উঠেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় হাজার ফুট উঁচুতে। দ্বীপে আসবার পথে প্রথমে পড়ল
চ্যাথাম দ্বীপের মতো পাতাঝরা ঝোপঝাড় ঢাকা একটা এলাকা। শুকনো আগ্নেয় মাটিতে গিরগিটি
জাতীয় প্রাণী ছাড়া আর বিশেষ কোনও জীবজন্তু নেই।
তারপর যত উঁচুর দিকে উঠছিলাম, ততই গাছপালার ভিড় বেড়ে উঠছিল। দখিনা
বাণিজ্যবায়ুর ঠাণ্ডা ছোঁয়ায় ভারী আরাম ঠেকছিল শরীরে। জমিও ক্রমশই বসন্তের
ইংল্যাণ্ডের মতো সবুজ হয়ে উঠছিল। বসতি এলাকায় পৌঁছে দেখি, সেখানে অনেকটা এলাকা সাফ
করে তাতে কলা আর মিষ্টি আলুর চাষ হয়েছে। খেতখামারের ফাঁকে ফাঁকে ছড়ানো ছিটোনো
বাড়িঘরগুলো দেখলে হঠাৎ করে মনে হবে, চিলির কোনও ‘পুয়েবলো’-তে এসে হাজির হয়েছি। ব্রাজিল ছাড়বার পর
থেকে এমন সুন্দর কোনও ক্রান্তীয় ল্যান্ডস্কেপ আমাদের চোখে পড়েনি এতদিন। শুধু এখানে
ও-এলাকার মতো বড়ো বড়ো অপূর্ব সুন্দর গাছপালা কিছু নেই।
তবে তাতে আমাদের কোনও আক্ষেপ ছিল না।
পেরু আর উত্তর চিলির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর ফের একবার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কালো
কাদা, গাছের গায়ে মসের আস্তর আমাদের চোখে ভারী শান্তির প্রলেপ দিচ্ছিল। সম্ভবত
বছরের এই সময়টা খানিক অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলেই সে-জায়গাটা অত স্বভাব-বহির্ভূতভাবে
সুন্দর হয়ে ধরা দিয়েছিল আমাদের চোখে। তার একটা প্রমাণ হল, এত সবুজের ছড়াছড়ির মধ্যে
কীটপতঙ্গের অভাব। এটা প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ।
বসতির জনসংখ্যা বড়োজোর দু-তিনশো হবে।
তাদের প্রায় সবাই অ-শ্বেতাঙ্গ। প্রায় সকলেই ইকোয়েডরের কুইটো বা গুইয়াকুইল জাতীয়
বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজনৈতিক অপরাধের সাজা পেয়ে নির্বাসনে এসেছে এখানে। তবে লোকজন
দেখলাম মোটেই আনন্দে নেই। চিলির মতোই এখানেও তাদের প্রধান অভিযোগ, নগদ টাকাপয়সার
অভাব। তবে অভাবটা আমার মনে হয় শুধু নগদের নয়। তাদের উৎপাদন করা জিনিসপত্র বিক্রি
করবার মতো কোনও বাজার যে এখানে নেই, সেটাও একটা বড়ো কারণ। তবে এ-অভিযোগ আস্তে
আস্তে কমে আসবে। এ-বছরেই অন্তত ষাট সত্তরটা তিমিশিকারি জাহাজ এখানে নোঙর করেছে রসদ
কেনবার জন্য। সেটা আরও বাড়বে।
এখানকার আসল সমস্যাটা হল জলের অভাব। সরু
সরু জলধারাগুলো খুব কম জায়গাতেই সমুদ্রকূল অবধি গিয়ে পৌঁছোয়। আগ্নেয় পাথরের ঝাঁঝরা
ত্বক আকাশ থেকে ঝরা সামান্য বৃষ্টির জলের বেশির ভাগটাই শুষে নেয়, কিন্তু তা আর ফেরত
দেয় না। দ্বীপের জলের উৎস বলতে গুটিকয় ঝরনা আর পুকুর। ওর মধ্যে কেবল তিন-চারটে
উৎসেই সারাবছর জল থাকে। প্রশান্ত মহাসাগরের আর দশটা দ্বীপের মতোই এই দ্বীপটাও
সম্ভবত বারংবার খরা আর অনাবৃষ্টির কবলে পড়ে। সব মিলিয়ে এখানকার বাসিন্দাদের জীবন
অনেকটা রবিনসন ক্রুসোর জীবনের মতো করেই কাটে।
এদের ঘরবাড়ি খুব সরল গড়নের। কাঠের খুঁটির
ওপরে ঘাসপাতার ছাউনি দিয়ে গড়া। জঙ্গলে বুনো শুয়োর আর ছাগল মেলে। তাই শিকার করে
লোকজনের অনেকটা সময় কাটে। চাষবাস বিশেষ নেই। মাংস বলতে প্রধানত কচ্ছপ। দু’দিন
শিকার করলে পাঁচদিন ধরে খাবার মতো কচ্ছপের মাংস জড়ো করা যায় এখানে। তবে হ্যাঁ। এখনও
কচ্ছপের সংখ্যা এখানে অনেক হলেও আগের চাইতে তা বেশ খানিক কমেছে। কয়েক বছর আগে একটা
জাহাজ এখানে এসে নোঙর করে একবেলায় দুশোটা কচ্ছপ মেরে নিয়ে গিয়েছিল। এখন যেখানে
এদের বসতি, আগে সেখানটায় অসংখ্য কচ্ছপের আস্তানা ছিল। এখনও যা আছে তাতে মিস্টার
লসনের অনুমান আরও কুড়ি বছর ওই খেয়েই হেসে খেলে কেটে যাবে দ্বীপের বাসিন্দাদের।
ভদ্রলোক জানালেন, কাছেই জেমস দ্বীপে (জেমস কথাটা এখনও ব্যবহার হয়। ওর স্প্যানিশ
বিকল্প হল সান্টিয়াগো। -লেখক) একটা নুনের খনি আছে। তাই সেখানে তিনি একটা দল পাঠিয়েছেন
কচ্ছপের মাংস নুনে জারিয়ে আনবার জন্য। তার দরকারও আছে। কারণ কচ্ছপগুলো আয়তনে
বিশাল। কখনও কখনও একেকটার থেকে প্রায় দুশো পাউন্ডের বেশি মাংসও পাওয়া যায়। তিনি
নাকি একবার একটা কচ্ছপ পেয়েছিলেন যেটাকে মাটি থেকে তুলতে ছ’জন জোয়ান হাঁফিয়ে
গিয়েছিল। দু’জন মানুষ মিলে জোর লাগিয়েও নাকি সেটাকে চিৎ করতে পারেনি।
এই বিরাট প্রাণীগুলো বয়সেও বেশ প্রাচীন।
১৮৩০-এ একটা কচ্ছপ মিলেছিল, যেটাকে নৌকোয় তুলতে ছ’জন মানুষ লেগেছিল। দেখা গিয়েছিল
সেটার খোলের গায়ে বেশ কয়েকটা তারিখ খুদে রাখা আছে। তার মধ্যে একটা তারিখ হল ১৭৮৬।
সে সময় সেটা ধরা পড়েও প্রাণ হারায়নি কেন সে বিষয়েও একটা ব্যাখ্যা দিলেন মিস্টার
লসন। বলেন, সে সময় তিমিশিকারি জাহাজ থেকে পাড়ে শিকারে আসবার যে নৌকো আসত তাতে দু’জন
করে লোক থাকত। সম্ভবত কচ্ছপটা সে সময়েও এতটাই বড়ো ছিল যে দু’জন মানুষ মিলে তাকে
নৌকোয় তুলতে পারেনি।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____
বাহ্.. প্রতি বারের মতই ভালো
ReplyDelete