গল্পের ম্যাজিক:: বেলজিয়ামের অজানা আতঙ্ক - দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী


বেলজিয়ামের অজানা আতঙ্ক
দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

সেবার সেলেস যেতে হয়েছিল সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার বেলজিয়ামে আমাদের এই কেসের তদন্তেই প্রথমবার আসা স্যার, তিমিবাবু আর আমি তিনজন একত্রে অভিযান আগে কখনও তিনজন একসঙ্গে যাইনি আসলে ব্যাপারটাই ছিল এমনি গুরুতর মিস্টার থমাসের বাড়িতে উঠেছিলাম আমরা
সন্ধেবেলা স্টোম্প আর ওয়াটারজুল খেতে খেতে কথা হচ্ছিল তিমিবাবু অবশ্য প্রত্যেকটা খাবার শুঁকে শুঁকে দেখছিলেন, আর জিজ্ঞেস করছিলেন, “এটাতে কী আছে? ওটা কী দিয়ে তৈরি?
মিস্টার থমাস শান্তভাবে হেসে জবাব দিচ্ছিলেন “ম্যাশড পটেটো আর ক্যারট দিয়ে তৈরি স্টোম্প, আর ওয়াটারজুল হল এখানকার চিকেন ব্রথ ফিশ দিয়েও তৈরি হয়।”
স্যার বললেন, “চিন্তা কোরো না তিমির, ওতে কুমীর বা কাঁকড়া নেই।”
তিমিবাবু নাকি একবার দক্ষিণ আমেরিকায় কুমীরের মাংস খেয়ে ফেলে সারারাত হেঁচেছিলেন

আচ্ছা তোমরা যারা আমাদের কথা এখনও জানো না তাদের বলে দিই আমি অপরাজিতা নন্দী প্যারাসাইকোলোজি নিয়ে রিসার্চ করছি আর তিমিবাবুর পুরো নাম তিমির বরণ তলাপাত্র উনি আমার সতীর্থ আমাদের গাইড হলেন আমাদের স্যার; ভূত তত্ত্ব, প্রেত, পিশাচ তত্ত্ব, তন্ত্রবিদ্যা আদি যিনি গুলে খেয়েছেন সেই জে জে, ডক্টর জানকী মোহন জোয়ারদার সেলেসের রাস্তা থেকে অদ্ভুতভাবে গায়েব হয়ে যাচ্ছে মানুষজন সেই বিষয়েই তদন্ত করতে আমাদের থমাসের বাড়িতে আসা
থমাস বেশ দীর্ঘদেহী শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠস্বর স্যারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে একটা সেমিনারে উইচ ক্র্যাফট মানে ডাইনী বিদ্যা নিয়ে থমাসের একটা বই আছে সেটা পড়েই স্যার অভিভূত হয়ে গেছেন থমাস ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “আমার কিন্তু মনে হয় এই রাতবিরেতে লোক উধাও হওয়ার পেছনে কোনও অশরীরী শক্তি বা মন্ত্রতন্ত্রের প্রভাব আছে।”
“হ্যাঁ,” স্যার উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “যারা উধাও হয়েছে তাদের চিৎকার আর রাস্তায় তাদের রক্তের দাগ দেখা গেছে কিন্তু তাদের দেহের কোনও চিহ্ন, এমনকি কঙ্কালটুকুও পাওয়া যায়নি।”
“আমি তোমাদের একজনের কথা বলতে পারি আমার প্রতিবেশী জোসেফ খুব ধর্মপ্রাণ লোক ছিল কোনও ঝুটঝামেলায় থাকত না ভায়োলিন বাজাত চমৎকার সেদিন জোসেফ গাড়ি নিয়ে কোথায় একটা বেরিয়েছিল বেরোনোর আগে রাস্তায় আমার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল বলল একটা জরুরি কাজ আছে। তার পরদিন সকালে জোসেফের গাড়িটা পাওয়া গেল কিন্তু জোসেফ উধাও গাড়ির সিটে ছিল রক্তের দাগ।”
তিমিবাবু খুব গম্ভীর হয়ে শুনছিলেন। বললেন, “কোথায় পাওয়া গিয়েছিল গাড়িটা?
“কবরখানার সামনে।”
“সেখানে কী জরুরি কাজ থাকতে পারে? আমি জিজ্ঞেস করলাম
থমাস বলল, “এক বছর আগে ওঁর স্ত্রী গত হয়েছে ওখানেই কবর দেওয়া হয়েছিল সেই শোকেই মর্মাহত হয়ে থাকত আমাকে বলেছিল ইদানীং কোনও একটা সিক্রেট সোসাইটির সদস্য হয়েছে মিস মার্থা নামের একজন সেটা চালান আমার ধারণা মিস মার্থা ব্ল্যাক ম্যাজিক, ডাইনি বিদ্যা ইত্যাদির চর্চা করেন এর পেছনেও সিক্রেট সোসাইটির কিছু অবদান থাকতে পারে।”
থমাসকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা হোটেলের পথ ধরলাম
গাড়িতে যেতে যেতে বলব না ভেবেও বলে ফেললাম, “আজ থমাসের বাড়ির জানালায় বাগানের দিকে দুটো জ্বলন্ত চোখ আমাদের ওপর নজর রাখছিল।”
তিমিবাবু হেসে বললেন, “আমি দেখেছি কালো বেড়াল সত্যি অপরাজিতা, আমরা কোথায় একটা ভয়ঙ্কর কিছুর কথা ভাবছি, আর তুমি কিনা কালো বেড়াল দেখেই...”
“কালো বেড়ালদের সঙ্গে কিন্তু ডাইনিদের সম্পর্ক রয়েছে,” আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম

পরের দিন জোসেফের বাড়ি খুঁজে সিক্রেট সোসাইটির সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেল আর মার্থার ঠিকানা
ক্রুপেট জায়গাটা ভারী সুন্দর আমরা বিকেলের দিকে পৌঁছে গেলাম মার্থার বাড়ি এত বড়ো একটা বাড়িতে মনে হল মার্থা একাই থাকে বড়ো বড়ো ভাসা ভাসা নীল চোখ ঈষৎ ঝুলে যাওয়া চামড়া আর কোঁচকানো ধূসর চুল ঠোঁট দুটো খুব সরু আর আশ্চর্য রকম লাল এরকম মহিলাদেরই বোধহয় ডাইনি সন্দেহে আগেকার দিনে পুড়িয়ে মারা হত কী অন্তর্ভেদী দৃষ্টি! সারা শরীরে একটা শিরশিরে অনুভূতি হয় মার্থার চোখে চোখ পড়লে
আমরা যেন অনেকদিনের চেনা এমনভাবে মার্থা আমাদের দিকে তাকিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে বাইরের ঘরের সোফায় বসাল ঘরটা বইয়ে ঠাসা সবই জাদুটোনা, মন্ত্রতন্ত্রের বই
স্যার আমাদের আর নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “আমরা একটা বিষয়ে একটু খোঁজখবর নিতে এসেছি।”
মার্থা ঠোঁটের কোণে মৃদু হেসে বলল, “সে হবে’খন আগে আমার তৈরি চকোলেট কেকটা খান।”
এর মধ্যেই দেখলাম মার্থা তিনজনের জন্য কেক নিয়ে এসেছে
তিমিবাবু আমতা আমতা করে বললেন, “আমি চকোলেট খাই না গন্ধ লাগে।”
স্যার তো কেকটা সঙ্গে সঙ্গেই খেতে শুরু করেছেন দেখাদেখি আমিও কিন্তু তিমিবাবু ছুঁলেন না পর্যন্ত
মার্থা আমাদের সামনে বসে বলল, “আমি সব জানি আপনারা কে, কেন এসেছেন, কী করে আমার সম্পর্কে জানলেন সব।”
“আপনি নিশ্চয়ই ক্লেয়ারভয়েন্স প্র্যাকটিস করেন? তাই তো?
“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন কিছু কিছু সময় ইলুরোম্যান্সি, যেটা বেড়ালের সাহায্যে হয়।”
অমনি একটা কুচকুচে কালো বেড়াল এসে মার্থার কোলে লাফিয়ে পড়ল
“এই হল মনিকা আমার সাধের বেড়াল,” লম্বা ধারালো নখের আঙ্গুলগুলো দিয়ে বেড়ালের গায়ে আদর করতে করতে বলল মার্থা
আমি তিমিবাবুর দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচালাম
তিমিবাবু গম্ভীর হয়েই আছেন কোনও কথা বলছেন না
স্যার বললেন, “বুঝলাম কিন্তু আপনি যখন সবই জানেন তখন আমাদের কোনও সাহায্য করতে পারবেন কী?
মার্থা বলল, “নিশ্চয়ই করব কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে আমার একটা সিক্রেট সোসাইটি আছে জানেন তো? আমাদের কোনোরকম প্র্যাকটিসের ব্যাপারে কাউকে কিছু জানানো চলবে না আসুন আপনাকে কিছু জিনিস দেখাই।”
মার্থা ভেতরের ঘর থেকে একটা রুমাল দিয়ে ঢাকা জিনিস নিয়ে এল রুমালটা তুলতেই আঁতকে উঠলাম একটা মানুষের মাথার খুলি কিন্তু তার দাঁতের গঠন মানুষের মতো নয় ঠিক ভ্যাম্পায়ারের যেরকম থাকে সেরকম
মার্থা বলল, “ঠিকই ভাবছেন, এরা ঠিক মানুষ নয় এরা হচ্ছে শয়তান এই শয়তানের বংশকে শেষ করাই আমাদের সিক্রেট সোসাইটির উদ্দেশ্য আমি আপনাদের একটা জায়গায় নিয়ে যাব সেলেসে, যাবেন? তবে আজ রাতে নয় রাতের অন্ধকারে শয়তানরা শক্তি ফিরে পায় কাল সকালে চলুন।”
ফেরার পথে বুঝলাম তিমিবাবুর মনে এখনও সন্দেহ, বলছেন, “ওই মহিলাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে!”

পরের দিন সকালে মার্থার সঙ্গে আমরা রওনা দিলাম সঙ্গে আরও দু’জন লোককে ডেকেছে মার্থা এরা মনে হয় সেই সিক্রেট সোসাইটির লোক সেলেস-এর এক প্রান্তে একটা বিশাল জায়গা জুড়ে গোরস্থান সেখানে ঢুকে দিনের বেলাতেও গা কেমন ছমছম করে উঠল মার্থা মাটিতে ঝুঁকে পড়ে কী সব দেখছিল তারপর একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম, একটা জায়গায় ফিকে বেগুনি রঙের সব কবরের চারদিকে অনেক ক্রস সাজানো আছে মার্থা সেগুলো দেখিয়ে বলল, “এখানে সব শয়তানদের কবর দেওয়া হয়েছিল অনেকদিন আগে আমার পূর্বপুরুষরাই দিয়েছিল কিন্তু এখন এরা আবার নতুন করে জেগে উঠছে আর মানুষদের রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করছে এই দেখো তার নমুনা।” মার্থার কথামতো ওই দু’জন কবর খুঁড়ে ফেলল পাশাপাশি দুটো কঙ্কালগুলো এখনও অক্ষত রয়েছে তাদের শ্বদন্তে লেগে রয়েছে টাটকা রক্ত ওদের হাড়ের মধ্যে দেখলাম অনেকগুলো ফুটো করা আছে
স্যার সেটা পরীক্ষা করে বললেন, “ভ্যাম্পায়ারদের যখন কবর দেওয়া হত তখন এরকম হাড়ে ফুটো করে শিক ঢুকিয়ে মাটির সঙ্গে আটকে দেওয়া হত আর মুখের মধ্যে রেখে দেওয়া হত এক খন্ড পাথর এইসব করা হত যাতে তারা ফিরে আসতে না পারে।”
মাথা নাড়ল মার্থা, “কিন্তু এখন দেখুন, কেউ তাদের মুক্ত করে দিয়েছে ওরা রাতের অন্ধকারে চলেফিরে বেড়াচ্ছে আমরা অনেক চেষ্টা করেও এদের আটকাতে পারছি না, এরা দিন দিন এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।”
স্যার বললেন, “দেখা যাক, আমি কিছু করতে পারি কিনা।”

রাত্রে হঠাৎ একটা ফোন পেলাম থমাসের ভয়ার্ত গলা বলল, “তোমরা চলে যাওয়ার পর থেকে কারা যেন রোজ আমার জানালায় এসে হাজির হয় আমার ওপর নজর রাখে।”
পরের দিনই থমাস নিখোঁজ শুধু ওর বিছানায় লেগে রয়েছে চাপ চাপ রক্তের দাগ
স্যার বললেন, “নাঃ, এভাবে হবে না ওদের নিরস্ত করতে গেলে যখন ওরা জেগে ওঠে তখনই করতে হবে ঠিক সেই মুহূর্তেই আমাদের কবরখানায় একটা রাত থাকতে হবে।”

রাতে সমস্ত বন্দোবস্ত করা হল আমি, তিমিবাবু আর স্যার ছাড়াও মার্থা আর ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা অনেকটা সময় পার হয়ে গেল শুধু তিমিবাবুর হাঁচির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায়নি স্যার বললেন, “তিমিরের হাঁচি খুব খারাপ, বিপদের সংকেত দেয়।”
রাত দশটায় শুকনো পাতায় একটা খচমচ আওয়াজ পাওয়া গেল দেখলাম আপাদমস্তক আলখাল্লার মতো কালো পোশাক পরে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে শয়তানদের কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে তারপর তার ঝোলা থেকে আস্তে আস্তে একটা জিনিস বার করল দেখলাম সেটা একটা মালার মতো জিনিস আর একটা বই সেটা সামনে তুলে ধরে সে বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াতে শুরু করল
স্যার মার্থাকে বললেন, এই সুযোগ মার্থার নির্দেশে সিক্রেট সোসাইটির বাকি সদস্যরা ধরে ফেলল সেই ছায়ামূর্তিকে ততক্ষণে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে কঙ্কালের দল তাদের একটা ছুটে এসে তিমিবাবুর হাতে একটা কামড় বসাল তিমিবাবু একটা চাপা আর্তনাদ করে ছিটকে গেলেন
মার্থা সেই জপের মালাটা নিয়ে ছিঁড়ে দিল আর একটা লাইটার ধরিয়ে পুড়িয়ে দিল সেই বইটা
দেখলাম, একে একে ধুপধাপ করে কঙ্কালগুলো মাটিতে পড়ে গিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল আর সেই কালো পোশাকের ছায়ামূর্তিটাও নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল
দেখলাম সে আর কেউ নয়, থমাস!
তিমিবাবু দেখি নড়ছেন না এক্কেবারে মার্থা সেই দিকে তাকিয়ে বলল, “ওহ গড এদের কামড়ে মানুষ বাঁচে না আর বেঁচে গেলেও অভিশপ্ত জীবন কাটায় যদি না সেই ব্যক্তি কখনও কোনও সরীসৃপের মাংস খেয়ে থাকে।
আমি আর স্যার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম

পরদিন সকালে থমাসের জ্ঞান ফিরেছে সে এসবের প্রায় কিছুই জানে না কী কুক্ষণে যে একটা দুষ্প্রাপ্য মন্ত্রের শয়তানি বইয়ের খপ্পরে পড়েছিল তখন থেকে বইটাই থমাসকে নিয়ন্ত্রণ করছিল তিমিবাবুরও জ্ঞান ফিরেছে না, তিমিবাবুর কিছুই হয়নি দক্ষিণ আমেরিকায় খাওয়া কুমিরটাই আজ তিমিবাবুকে বাঁচিয়ে দিল
_____

6 comments:

  1. বাপরে.. এত কম শব্দে এরকম গল্প..সবাই পারে না...বেশ ভালো লাগলো

    ReplyDelete
  2. ব্যাপক হয়েছে। কুমিরের মাংসের ব্যাপারটা যেভাবে গল্পের রেজলিউশনে ঢুকল, সেটা দুরন্ত লাগল।

    ReplyDelete
  3. দারুণ। এটা আমার প্রিয় সিরিজ। তবে রহস্যটা আরেকটু ঘনালে আরও জমত ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thanks :) hya etaa diye novella o kora jeto ichhe korle

      Delete