Showing posts with label সহেলী রায়. Show all posts
Showing posts with label সহেলী রায়. Show all posts

গল্প:: মুড়োডিহির ঠাকুমা ও একটি ভূতের গল্প - সহেলী রায়


মুড়োডিহির ঠাকুমা ও একটি ভূতের গল্প
সহেলী রায়

হুলো ঘুমিয়ে কাদা। এই সুযোগ। হুলোর ঠাকুমা ঝপ করে উঠে পড়লেন। পাতলা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে সটান দোর খুলে উঠোন পেরোলেন। হাঁটা দিলেন মাঠের দিকে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার থইথই করছে। চাঁদটাও যেন মেঘের কোলে মুখ লুকিয়েছে। আকাশের গায়ে যেটুকু আলো আছে, সেটুকুতেই অভ্যাসের পথ পার হলেন ঠাকুমা। গন্তব্যে পৌঁছে বিস্ময়ে তাঁর চোখ কপালে ঠেকল। এত অন্ধকারেও নিমতলায় যেন একটুকরো আলো দোল খাচ্ছে। সেই দোলনাতে লোকটাও শূন্যে দুলছে। এই আলোর জোরেই তাহলে ঠাকুমা জানলা দিয়ে লোকটাকে দেখতে পেতেন? টানটান শুয়ে থাকত লোকটা। তবে এমন দুলতে দেখেননি কখনও। নিশ্চয়ই দড়ি ঝুলিয়ে দোলনা বেঁধেছে গাছে। আঁধারি আলোয় ঠাকুমা ধরতে পারছেন না।
উইইই! ঘোড়া নিমগাছ। একফালি মাঠ ঢেকে জন্মযুগ ধরে দাঁড়িয়ে। ওখানেই দু-দিন দেখা গেছে লোকটাকে। সন্ধে হব-হব। গাছটাতে আঁধারকালে যেন ঝিমুনি পোকা ধরে। লোকটা রোজ গাছে হেলান দিয়ে পা টেনে বসে। যতদূর দেখা যায়, তার মতিগতি যেন বাপ-ঠাকুরদার আমলের উত্তরাধিকারে পাওয়া পালঙ্কে শুয়ে সে!
হুলোর ঠাকুমা দু-দিন তাকে দেখেছেন। সূর্য ডুবলেই গাঁয়ে যুদ্ধবিরতি হয়। যে যার ঘরে সেঁধিয়ে যাও। কী দরকার, বাপু! কেউ কি জানে, কোথায় কোন অপদেবতা বাসা বেঁধে আছে? যদিও এ-গাঁয়ের তেমন বদনাম নেই।
রোজ সন্ধেবেলা কলতলা থেকে রোদে উপুড় হাঁড়িকলসি কুড়িয়ে দু-পাক দেন ঠাকুমা। দোরের সামনেই ঘোরাঘুরি। কাজেই, আলো নিভে এলেও চিন্তা নেই। বহুদিনের অভ্যেস। হজমের সমস্যা কিনা। জাঁতা ঘুরিয়ে না দিলে খাবার-দাবার পেষাই হয় না। কলতলা থেকে স্পষ্ট দেখা যায় গাছতলাটা। গোধূলি বেলা নামলে, লোকটাকেও।
ঠাকুমা বেজায় ধন্দে পড়েন। গাঁয়ে আবার চোর-ছ্যাঁচড়ের আমদানি হল না তো? দূর থেকে লোকটার যেমন গড়ন ঠাউর হয়, এ-গাঁয়ে অমন কেউ আছে বলে মনে পড়ে না ঠাকুমার। সারাদিন জোয়াল টেনে পেটপুরে-খাওয়া হাট্টাকাট্টা মরদ সব। ছোটো গাঁ। গুটিকয়েক ঘর। কেউ অচেনা নয়।
এমনকি, আত্মীয়-পরিজন এলেও সে খবর ছড়িয়ে পড়ে বেলাবেলি। বিদেশ-বিভুঁইয়ে আত্মীয় এসে ভরসন্ধেয় এমন আচরণ করবেই বা কেন? গাঁয়ের একটা নিয়ম-দস্তুর আছে তো নাকি?
হুলো স্কুল থেকে ফিরে নেড়িটাকে নিয়ে আহ্লাদ করছিল। নেড়িটা হুলোর বড়ো ন্যাওটা। ঠাকুমা বলবেন কি বলবেন না ভেবেও বলেই ফেললেন কথাটা, “তুই যে জানলা খুলে পড়তে বসিস, কাউরে দেখিস?”
হুলো ঘাড় নেড়ে বলে, “হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা! অঙ্ক পিরিয়ডের মধু মাস্টারকে। পাটিগণিতের উত্তর না মিললে ডাস্টার ছুড়ে মারেন। টিপ খারাপ, তাই চোট লাগে না। মধু মাস্টারের মুখটা মনে করতে করতে একটা আঁক পাঁচবার কষি।”
হুলোর জবাব শুনে ঠাকুমা গেলেন দমে। ছেলেটার কথা শোনো! ঠাকুমা যে একখানা দুশ্চিন্তার কথা বললেন, তা পাত্তাই দিলে না। নিজের ফিরিস্তি খুলে বসলে। কী সর্বনাশ! লোকটাকে কি তবে শুধু তিনি একাই দেখতে পাচ্ছেন? গাঁয়ের কেউ তো কিছু বলছে না। ঠাকুমার কি সরষেফুলের অসুখ হল? হুলোর বাপ জানতে পারলেই ধরেবেঁধে হাসপাতালে ভরবে। সুঁচ দিয়ে টেনে রক্ত নেবে আহাম্মকেরা। ভাবলেই ঠাকুমার বুক শুকিয়ে যায়।
ঠাকুমা যে খুব ভীতু প্রকৃতির, তেমন নয়। এখন না হয় শরীর শুকিয়েছে। এককালে যেমন তেজি, তেমন পরিশ্রমী ছিলেন। গাঁয়ের যে-কোনো বাড়িতে পাত পড়লেই একাই পঞ্চাশ-ষাট জনের রান্না রেঁধে ফেলতেন। কারোর অসুখ-বিসুখ শুনলে ঠাকুমা হাজির সর্বাগ্রে। চোর-ডাকাত, ভূত-ব্রেহ্মদত্যি, ঠগবাজ-ডাইনি কাউকেই ডরান না তিনি। তবু, মানুষ তো? ‘ভয়’ শব্দকে তো মান্যি করতে হয়? ডাক্তার-বদ্যি, সুঁচ-রক্তকেই বেছে নিয়েছেন ঠাকুমা ভয় পাওয়ার জন্য।
ঠাকুমা বুঝে গেলেন, একথা পাঁচকান করা যাবে না। হুলোকেও না। ওদিকে দিনের পর দিন যায়। সন্ধে নামলেই ঘোড়ানিম যেন সিংহাসন হয়ে যায়। লোকটা সেখানে দিব্য আরাম করে। তবে আশেপাশে কোনো অপ্রীতিকর খবর নেই। মানে, ওই চুরি-টুরি বা অন্যকিছু।
শোরগোল নেই। ঠাকুমার চিন্তা আরও দু-গুণ বাড়ে। ভুল দেখার ব্যামো হল? “মা বিপত্তারিণী, রক্ষে করো! হে রাধামাধব, রক্ষে করো! মহাপ্রভু, বিপন্মুক্ত করো।” তেত্রিশ কোটি দেবদেবীকে দিনরাত ডেকেই চললেন ঠাকুমা। ছুরি-কাঁচি ছাড়াই যেন তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হয়।
ইদানীং রাতেও ভালো ঘুম হয় না ঠাকুমার। হুলো আর ঠাকুমা যে-ঘরে শোয়, তার দক্ষিণদিকের জানলা দিয়ে দৃষ্টি সোজাসুজি ধাক্কা খায় নিমগাছটায়। ঘরের সব আলো নেভানো থাকলেও ছোট্ট একটা পিদিম জ্বেলে শোয় ঠাকুমা। ইলেকট্রিকের আলো এসেছে তো এই সেদিন।
ঠাকুমার শরীর দিন-দিন জবাব দেয়। সামান্য জল খেলেও পেট ঢাকের মতো ফুলে যায়। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়। হুলোর মা তো বলেই ফেললেন, “একবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চলুন দেখিয়ে আসি।”
ভয় পেলেও ঠাকুমা জেদ ধরে রইলেন। হুলোর মাকে বললেন, “দু-দিন একটু গ্যাঁদালের ঝোল খেয়ে দেকি বউমা, তারপর না হয় যাওয়া যাবে।”
ঠাকুমা এককথার মানুষ। তাঁর কথা কাটবে, এমন সাহস কারও নেই। এদিকে নিজের মনটা যে নেড়ির মতো পাকিয়ে আছে, তা কে বুঝবে? যা করার, দুই দিনের মধ্যেই করতে হবে। নইলে কপালের অখণ্ড লিখন কেউ খণ্ডাতে পারবে না। এ ব্যাপারে ঠাকুমা নিশ্চিত।
গাঁ-গঞ্জে রাত আটটার পরেই ঘরে-ঘরে দোর পড়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া সেরে ন’টার মধ্যে শুয়ে পড়ে লোকজন। আজকাল হুলো অনেক রাত পর্যন্ত লেখাপড়া করে। ঠাকুমা বোঝেন, এসবই অঙ্কস্যারের গুঁতো। সূয্যি জাগার আগেই গ্রামের লোকজন সচল হয়ে ওঠে। গোয়ালঘরে গোরু-বাছুর ডাকে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওঠে আকাশপানে। চাষের জমিতে নেমে পড়ে কৃষক। কর্মব্যস্ততার ছবি স্পষ্ট হয় গ্রাম জুড়ে।
সময় কম। ঠাকুমা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। রাতে হুলো ঘুমোলেই জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন ঠাকুমা। যদি উবে যায় লোকটা? তাহলে ঠাকুমার রোগটাও গায়েব হবে নিশ্চিত। কিন্তু, কই? লোকটা যেন ঘোড়ানিমাগাছটার নীচে সংসার পেতে ফেলেছে। এসব ভাবনাচিন্তার ফাঁকে একটা দিন বেরিয়ে গেল ঠাকুমার হাত থেকে। পড়ে রইল হাতে গোনা একটিই দিন। ঠাকুমা মন শক্ত করলেন। যা করার, এই এক রাতেই তাঁকে করতে হবে।
হুলোর মাকে ঠাকুমা আশ্বস্ত করলেন, তাঁর শরীর কিঞ্চিৎ ভালো ঠেকছে। খামোখা কেউ যেন হইচই না তোলে এই নিয়ে। সজাগ রইলেন সারাদিন। কীভাবে এর বিহিত করবেন, কিছুতেই ভেবে কূল পেলেন না। ভাবলেন, হুলোকে যদি সঙ্গী করেন? পরক্ষণেই বাতিল করলেন এই চিন্তা। হুলোর যা স্বভাব! শুনেই গোলমাল জুড়ে দেবে।
ঝুম হল। হুলো বাতি জ্বেলে খসখস করে খাতাপত্র ভরতে লাগল।
“আজ একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পড় না, বাছা?”
ঠাকুমার আবদার শুনে হুলো চোখ পাকাল।
“কেন? মধুস্যারকে কি কাল নেমন্তন্ন করেছ?”
হুলোর এহেন কথায় ঠাকুমা অবাক।
“ওমা, ও আবার কী কথা? নেমন্তন্ন করব কেন?”
হুলো চোখ নাচিয়ে বলে, “তুমি ঘুমোও, নেমন্তন্ন থাকলে না হয় বুঝতুম, কাল স্যার স্কুল কামাই দেবেন। তার যখন আশা নেই, তখন অঙ্কগুলো কষেই যাই।”
ঠাকুমা ভাবেন, ‘বাপ রে! এ দেখি, তাঁর সুঁচের ভয়ের চেয়েও কঠিন। সত্যি বাবা, পৃথিবীতে কত রকমের ভয় আছে, কে জানে!’ যতক্ষণ হুলো জেগে রইল, ঠাকুমা কাঠ হয়ে পড়ে রইলেন একধারে। অপেক্ষা করতে থাকলেন ঘরে আঁধার নামার। একসময়ে সে মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হল। হুলোর ঘুম গাঢ় হলেই ঠাকুমা কাজে নামলেন।
“কে গো তুমি, বাছা? কার বাড়ির?”
ঠাকুমা সাহস করে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন। লোকটা ঝুপ করে হনুমানের মতো নীচে পড়ল। বৃষ্টিভেজা কাকের মতো ঝটপট করে ঝেড়ে ফেলল গা-হাত-পা। যতটুকু ঠাউর হয়, ঢ্যাঙা লম্বা, সরু সরু হাত-পা লোকটার। তার লম্বাটে গালভাঙা মুখ থেকে চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অদ্ভুত বদন। পরনে ময়লা ধুতি আর গায়ে একটা চাদর।
“এক হপ্তা হয়ে গেল, এদ্দিনে চোখে পড়ল বুঝি?”
কথা শুনে ঠাকুমার চক্ষু চড়কগাছ। একে বলা নেই, কওয়া নেই, গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়া; তার আবার এত চোপা? বলি, ভয়ডর বলে কিছু নেই নাকি? এক্ষুনি গাঁ জড়ো হলে এইটুকু হাড়ে জড়ানো চামড়ার অস্তিত্বই যে আর থাকবে না, তা লোকটা বুঝছে না?
“সে কৈফিয়ত তোমায় কেন দেব, বাপু? একে তো রোজ এসে নিমতলা দখল নিচ্ছ, তার উপর এত প্রশ্ন কীসের? ভাগ্যি ভালো, আমি ছাড়া আর কারও চোখে পড়েনি। তাই বেঁচে আছ।”
ঠাকুমার কথা শুনে লোকটা বিশ্রীভাবে হেসে উঠল।
“বেঁচে আছি? তবে হ্যাঁ, ভারি চিন্তেয় ছিলুম, জানেন? আমার ক্ষ্যামতা কি লোপ পেলে? একজনও আমায় টের পেলে না? আজ আমি খুব খুশি। নাহ্‌, কিছুই শেষ হয়নি।”
হাবিজাবি কথা শুনে ঠাকুমা গেলেন রেগে।
“এত হেঁয়ালি কীসের তোমার? ভালোয় ভালোয় বলবে, নাকি লোকজন ডাকব?”
লোকটার মুখে আবার সেই গা-জ্বালানো হাসি।
“ডাকুন না! সবাই আপনাকে পাগল ঠাউরে হাসপাতালে ভরে দেবে। ঠিক হবে তখন।”
ঠাকুমা শিউরে উঠলেন। লোকটা তার ভয়ের কথা জানলে কী করে? কোনো সাধু-সন্ন্যেসী-জ্যোতিষবাবা নয় তো? কিংবা, যা তিনি ভাবতে চাইছেন না, তেমন কিছু? না বাবা! রাগ-টাগ করে কাজ নেই। একটু সমঝেই কথা বলতে হবে লোকটার সঙ্গে।
“আমি কী তা বললুম? দেখো বাছা, অল্প কয়েক ঘর নিয়ে আমাদের গাঁ। মিলেমিশে থাকি সব। হুট করে অচেনা লোক এলে জানতে হয় বই-কি। এ-গাঁয়ে কোনো ঝগড়া-অশান্তি নেই, চোর-ডাকাতের ভয় নেই, এমনকি কোনো অপদেবতার কথাও কেউ শোনেনি।”
ঠাকুমার কথায় যেন কিছুটা কাজ হল। লোকটা শান্ত হয়ে বসল গাছতলায়।
“ওইজন্যই তো এলুম এখানে। চারদিকে যা ভিড়ভাট্টা! দিনদিন আমাদের সংখ্যা বাড়ছে। দু-দণ্ড কোথাও শান্তি পাই না। আলো ফুটলে না হয় এদিক-ওদিক গা ঢাকা দেওয়া যায়। লোকের চোখে পড়ি না। কিন্তু অন্ধকারে তো এ অবয়ব লুকোনো যায় না। প্রকট হয়েই যায়। তখন একটু আশ্রয়ের দরকার হয় কিনা, বলুন। তাছাড়া দিনের বেলায় পুকুরের মাছটা, গাছের ফলপাকুড়টা, গৃহস্থের এঁটোকাঁটাটা জোগাড় করতে হয়। তারও একটা ধকল আছে নাকি? দিনে ঘুমুনো, রাতে জাগা—এ-ই আমাদের কাজ। তবে আমার হয়েছে মুশকিল। মনিষ্যি স্বভাবটা গেল না কিছুতেই। একটু নিরিবিলি বিশ্রাম, রাত হলেই আমায় পেয়ে বসে।”
ঠাকুমা অবাক হয়ে শোনেন লোকটার কথা। কতকটা বোঝেন, আবার বেশিরভাগ বোঝেনও না। কেন জানি না, ভারি মায়া হয় ঠাকুমার। লোকটা বুঝি খুব দুখি।
“তা ভায়া, কোত্থেকে এলে বলোই না! আমি সক্কলকে বলে তোমার না হয় একটা ব্যবস্থা দেখব। আমায় গাঁয়ে খুব মানে-টানে।”
ঠাকুমার কথা শুনে লোকটা যেন আরও মুষড়ে পড়ল।
“দূর বাবা! তখন থেকে এক কথাই বলছেন দেখছি। আমি অত জানলে কী আর জায়গা খুঁজে বেড়াতাম? এ পৃথিবীর সীমে-মুড়ো বলে কিছু আছে নাকি? কবে থেকে ঘুরেই যাচ্ছি। পৃথিবী আর শেষ হয় না। তা, এ গাঁয়ের নাম কী?”
এ তো আশ্চয্যির কথা। লোকটা কোথায় এসেছে জানে না, কোথা থেকে এসেছে জানে না। পাগল-টাগল নাকি?
“দ্যাখো বাবা, বয়স্ক মানুষের সঙ্গে অমনধারা করতে নেই। এ গাঁয়ের নাম ‘মুড়োডিহি’।”
ঠাকুমার মুখে গাঁয়ের নাম শুনে লোকটা খুব মজা পেল।
“এখেনেই কি তবে পৃথিবীর শুরু? ‘মুড়ো’ মানে মাথা। মাথা যখন পেয়েছি, ল্যাজাও পাব। কী বলেন? আপনি আমায় খুব শান্তি দিলেন। কথা দিলাম, আমায় কেউ না ঘাঁটালে আমিও কারোর কিছু ক্ষতি করব না। ক-দিন বিশ্রাম নিয়ে আবার কোথাও পাড়ি দেব। আপনিও পাঁচকান করে খামোখা নিজের বিপদ ডাকবেন না। মাঝেমধ্যে অস্তিত্ব পরখ করতে যদি একটু বেগড়বাঁই করেও ফেলি, তা নিয়ে অত চিন্তার কিছু নেই। শত হোক, ভূত তো? একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে তো থাকা যায় না। আমাদের জাতপাত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আরে বাবা! আমাদেরও জবাবদিহি করতে হয়। আমি একটু আলাদা, এমনিই সবাই সন্দেহ করে। ভূতও ভূতের ঘাড় মটকায়, জানেন তো। মারামারি, কাটাকাটি আমাদের সমাজেও আছে। ওইজন্যিই মাঝেমধ্যে পরীক্ষা দিতে হয়। তবে এখেনে এখন আমি একাই আছি। অন্য কেউ এসে না পড়া পর্যন্ত চিন্তা নেই।”
ভূত? ঠাকুমা দু-পা পিছিয়ে গেলেন। না, এ বিষয়ে ভয় আগে কখনও পাননি ঠাকুমা। ভূত বললে ভয়ংকর কোনো চেহারার কথাই মাথায় আসে। ভূত বুঝি এমন হয় দেখতে? এ আবার কেমনধারা ভূত, যাকে দেখে ভয়ের উদ্রেকই হয় না! কেমন যেন কষ্টে-ভোগা নিরীহ প্রাণী।
“তা তুমি যে সত্যিকারের ভূত, আমি বুঝব কেমন করে?”
ঠাকুমার সন্দেহ হচ্ছে দেখে লোকটির চিন্তা হল। প্রমাণ না দিলে যদি আকাশে-বাতাসে খবর ছড়িয়ে যায়, তবে অন্য ভূতেরাও ছুটে আসতে পারে। সকলেই নতুন নতুন জায়গা খুঁজছে। এক জায়গা বেশিদিন ভূতেদের সয় না। খাবার-দাবার জোটে না, বন-জঙ্গলে উৎপাত করলে মানুষের দল এসে জঙ্গল কেটে সাফ করে দেয়। নির্জন পোড়ো বাড়িগুলোও আজকাল সরকারের হাতে তুলে দিয়ে সব সাফসুতরো করে ফেলছে ওরা। এত ভূত যাবে কোথায়?
তাছাড়া একসঙ্গে অনেকজন থাকা মানেই ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি। গাছ নিয়ে, পুকুরের মাছ নিয়ে, এমনকি উড়ে বেড়াবার খেজুর গাছের ঝাড়ুপাতা নিয়েও। সে নিজেও একজনের ঝাড়ু চুরি করে তবে পালিয়ে এসেছে।
“দেখবেন? তবে আপনার যদি দাঁতে দাঁত লেগে যায় বা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, আমায় কিছু বলতে পারবেন না।”
ঠাকুমা লোকটাকে কথা দিলেন, অমন কিছুই তাঁর হবে না। শুনে লোকটা চোখের পলক ফেলার আগেই হুট করে নিমগাছের মাথায় উঠে গেল। ঠাকুমা লক্ষ করে দেখলেন, তার মাথাটা নিমগাছের মাথা ছাড়িয়েছে, কিন্তু পা ঠেকে আছে মাঠেই।
“রাম, রাম, রাম, রাম…” ঠাকুমা রামনাম জপতে শুরু করলেন।
“আরে, করেন কী? আপনিই তো দেখতে চাইলেন। এখন আমায় তাড়াবার মতলব? বললাম তো, চলে যাব ক’দিন পরেই। কী সুন্দর গ্রাম আপনাদের! একটু না হয় শান্তিতে দু-দিন জিরোলাম?”
লোকটা আবার স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যে চলে এসেছে। চোখেমুখে মিনতির ছাপ। ঠাকুমা থেমে গেলেন এবং দোনোমোনোয় পড়লেন। ভূতকে কি থাকতে দেওয়া উচিত? গাঁ তো আর ঠাকুমার একার নয়। কেউ যদি আপত্তি তোলে? আহা, বেচারি একটু শান্তি চায়। কারও যদি কোনো ক্ষতি না হয়, অসুবিধে কোথায়? বরং সারারাত গ্রামটাকে ও পাহারা দেবে। তাছাড়া বলছেই তো, ক’দিন পর আবার চলে যাবে। তাড়াবেই বা কী করে?
রাত কয় প্রহর, কে জানে। ফিনফিনে একটা হাওয়া দিচ্ছে। অন্ধকার মাঠে একটি আলোকবিন্দুর সামনে অপেক্ষমান এক বৃদ্ধা। ভূত ভাবছে, বুড়ি চেঁচামেচি করলেই খবর ছড়িয়ে অন্যদের কানে যাবে। বাতাসেই ওদের কান। ঠাকুমা ভাবছেন, ভূতেদের কি বিশ্বাস করা যায়?
হঠাৎ দুজনারই সমস্ত চিন্তাভাবনা ভেঙে একটি নতুন বিপদ উদয় হল। গ্রামের শেষ রাস্তার পরে পাকা পথ পেরিয়ে রেললাইন শুরু হয়েছে, সেদিক থেকে যেন কারা এগিয়ে আসছে। হাতে ছোটো ছোটো লন্ঠন। এত রাতে কারা? ঠাকুমার অস্বস্তি দেখে ভূত আবার শরীরটা লম্বা করে চোখ দুটো পিছনের দিকে টর্চলাইটের মতো এগিয়ে দিল।
“এ তো চাঁদু ডাকাতের দল। এই গাঁয়ে আসার আগে যেখানে থাকব বলে স্থির করেছিলুম, সেখানে এদের জন্যই তো থাকতে পারলুম না। পৌঁছে দেখি, গ্রামের লোকজন হাহাকার করছে। আগের রাতেই ডাকাত পড়েছিল। চাঁদু সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছিল ওদের। আমি আবার মানুষের দুঃখকষ্ট সইতে পারি না। ও জায়গা ছাড়লুম তাই। ওইজন্যই তো ভূতেরা আমায় সন্দেহ করে।”
ডাকাত? সর্বনাশ! কিছুদিন আগেই নবান্ন গেছে। গোলায়-গোলায় ধান-শস্য ভর্তি ঘরে-ঘরে। বেচাবেচি করে টাকাপয়সাও কম নেই কারও ঘরে। পরিশ্রমের ফল, ও দিয়েই পেট চলে।
“শোনো, বাছা…”
ঠাকুমা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। ভূতবাবাজি ঠাকুমাকে থামিয়ে দিলে।
“জানি জানি। এখন চুপ করে এই গাছের তলায় লুকিয়ে পড়ুন দেখি। আমি দেখছি, কী করা যায়।”
ভূতের কথামতো ঠাকুমা লুকিয়ে পড়লেন। দেখলেন, ঢ্যাঙা ভূত সজোরে একটা ফুঁ দিল। প্রবল একটা ঝড় উঠল যেন। এমন ধুলোর ঝড়, ডাকাতের দল এগোতেই পারে না। লন্ঠনগুলো নিভে যাচ্ছে হাওয়ায়। ডাকাতদের চোখে কাঁকড়-বালি উড়ে পড়ছে। ওরা তাকাতেই পারছে না। তার মধ্যেই কে যেন “ব্রেহ্মদত্যিইইই” বলেই অজ্ঞান হয়ে গেল। ঠাকুমা দেখলেন, ঘোড়ানিমতলার ভূতটা আকাশ-সমান হয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ওদের দিকে এগোচ্ছে। তাকে দেখে কেউ জ্ঞান হারাচ্ছে, কেউ আবার পালাচ্ছে।
হট্টগোল শুনে ঘরে-ঘরে দোর খুলে লাঠিসোঁটা নিয়ে মত্ত পুরুষের দল বেরোল। ঝড় তখন থেমে গেছে। সহজেই ধরা পড়ল ডাকাতের দল। তাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে থানায় খবর দিতে গেল একদল। এত কাণ্ডকাখানার মাঝে ভূত গেল উধাও হয়ে। এই তো ছিল এখানে! লোকজন দেখে পালিয়ে গেল নাকি?
“হ্যাঁ গা! গেলে কই, বাছা? তুমি কি শুনতে পাচ্ছ আমার কথাখানা? তোমার যতদিন ইচ্ছে করে, থাকো তুমি; কেউ কিচ্ছুটি বলবে না তোমায়। কষ্ট করে তোমায় খাবার খুঁজতেও হবে না। সবাই ঘুমুলে আমি দিয়ে যাব রাতে খাবার। বেশি করেই দোব। দু-বেলা চলে যাবে ঠিক। তুমি কী খেতে ভালোবাসো গো?”
সাড়া না পেয়ে ঠাকুমার মনটা খারাপ হল। গুটিগুটি ফিরে গেলেন ঘরের দিকে। গোটা গ্রাম তখন জেগে। কাজেই কেউ প্রশ্ন করলে না কিছু। সূর্য উঠলে থানা থেকে লোক এল দফায়-দফায়। সবার মুখেই এককথা, ডাকাতের দল নাকি ভূত দেখেছে। দিনটা যেন অন্যরকম লাগছে। ঠাকুমার শরীরটাও সুস্থ হয়ে গেছে। ছেলেপুলেদের সেদিন পড়াশুনোয় মন নেই। সারাদিন ধকলের পর সবাই রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোল। ঠাকুমা জানলা খুলে দেখলেন, ঘোড়ানিমতলা অন্ধকারে মুড়ে আছে।
ঠাকুমা বেরিয়ে গেলেন মাঠে। হাতে একটা থালায় সাজানো মাছ-ভাত।
“আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলুম। দু’টি খেয়ে নিয়েই আমি রওনা দেব।”
লোকটা কোথা থেকে যেন দৃশ্যমান হল। ঠাকুমা তার কথা শুনে অবাক হলেন।
“থাকো না বাপু, কেউ তোমায় কিছু বলবে না। কাল কত বড়ো উপকার করলে তুমি!”
একনিমেষে সব খাবার সাবাড়। মুখ নয়, চোখ দিয়ে গিলেছে যেন। একটা ইয়া ঢেকুড় তুলে লোকটা বললে, “ভূতেদেরও মাথায় ভূত চাপে, জানেন? আমার এখন উপকার করার ভূত চেপেছে। যাই দেখি, কোথাও আবার কেউ বিপদে আছে কিনা। মানুষবেলায় হয়নি এসব। কাল আপনাদের উপকার করে খুব শান্তি পেয়েছি।”
ঠাকুমার চোখে জল এল। আঁচলের খুঁটে চোখ মুছে বললেন, “আবার এসো।”
একটা সাদা বক পতপত করে উড়ে গেল। যাওয়ার সময়ে কে যেন ফিশফিশ করে বললে, “নেব নাকি সুঁচ দিয়ে রক্ত টেনে?”
ঠাকুমা ভেংচি কেটে বললেন, “তবে রে হতচ্ছাড়া!”
হিক হিক করে হেঁচকি তোলার মতো একটা হাসির শব্দ মুড়োডিহি গ্রাম পেরোচ্ছে তখন। গতরাতের বিপদের সমস্ত চিহ্ন মুছে একটা স্নিগ্ধ সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। নিমফুলের সুবাস।
----------
ছবি: এ আই (নির্মাণ: দ্বৈতা গোস্বামী)

গল্প:: সোনাদাদুর মায়া-বেহালা - সহেলী রায়


সোনাদাদুর মায়া-বেহালা
সহেলী রায়

রূপাইরা খবর পাওয়া মাত্রই রওনা হয়ে গেছে। পথ তো কম নয়। অন্যান্যবার গাড়ির জানলা দিয়ে এই রাস্তাখানা রূপকথার গল্পের মতো দেখায়। মসৃণ চকচকে, ঠিক যেন রাজপথ। পথের দু-ধারে সবুজ ধানী জমি এমন সুন্দর বর্গাকারে সাজানো রূপাইয়ের মনে হয় ড্রইং খাতার পাতার মতো কেউ স্কেল দিয়ে টেনে দিয়েছে তাদের মার্জিন। বেশ কিছুটা পেরোনোর পর শুরু হয় জঙ্গল। শাল সেগুনের বুক চিরে সরু গাড়ি রাস্তা। রূপাই কান পেতে থাকে। গাছেদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে। ভেতরে কোন পোড়ো বাড়িতে আজও অশীতিপর বৃদ্ধা যাদুবলে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের ছাগল, ভেড়া, গরু বানিয়ে দিচ্ছে যেন কিংবা এই গাছের গর্ভেই তাদের বন্দি করে রাখছে। শেষ পথটুকু সকলেই ঝিমোতে থাকে। রূপাই উত্তেজনায় সজাগ থাকে সবসময়।
তবে আজ চিত্রটা একেবারে উলটো। পথ শেষ হতেই চায় না। রূপাইরা যাচ্ছে রূপাইয়ের মায়ের মামা অর্থাৎ সোনাদাদুর বাড়ি। গড়জঙ্গলে শ্যামারূপা মন্দিরের কাছে বিরাট জমিজায়গা নিয়ে সোনাদাদুদের বাড়ি। জ্ঞান হওয়া থেকেই রূপাই এই বাড়িটির প্রতি আসক্ত, বলা ভালো সোনাদাদুর ভারি ন্যাওটা সে। রূপাইয়ের মা এই বাড়িতেই মানুষ। রূপাইদের ছুটিছাটা, উৎসব অনুষ্ঠান মানেই, সোনাদাদুর বাড়ি। ভোররাতের দিকে বাড়িতে খবরটা আসে।
দাদুর বাড়ির সবচাইতে পুরোনো কাজের লোক লাল্টুর চ্যাঁচামেচিতে সবার ঘুম ভেঙে যায়। লাল্টু কলঘরে যাবে বলে ঘুম চোখে উঠে দেখে বাড়ির সদর দরজা হাঁ করে খোলা। চোর ডাকাতের আক্রমণ ভেবে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে সোনাদাদুর ঘরের দিকে যখন ছুটে যায়, তখন দেখে সোনাদাদুর ঘরের দরজাও খোলা আর সোনাদাদু কোথাও নেই। আশেপাশে কোথাও গেছে ভেবে লাল্টু টর্চ নিয়ে বাড়ির চারপাশে প্রথমে, পরে বাইরে বেরিয়ে সম্ভাব্য যেসব জায়গায় সোনাদাদু যেতে পারেন বলে লাল্টুর মনে হয়েছিল আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকে। কোথাও কোনো হদিশ না পেয়ে বাড়ি ফিরে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। লোকজন আগেই উঠে বাড়ির সব জায়গায় খুঁজছিল। তারাও হতাশ। আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। রূপাইয়ের মা খবর শুনে বিচলিত হন। তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রূপাইরা সপরিবারে বীরভূম যাবে।
সোনাদাদুর জন্য রূপাইয়ের ভারি মন খারাপ। যদিও সোনাদাদুর পক্ষে এমন কাণ্ড ঘটানো আশ্চর্যের কিছু নয়। সোনাদাদু একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী। নানা বিস্ময়কর গবেষণা, দেশ বিদেশে গবেষণার কাগজ পড়তে যাওয়া, কাজের জন্য ঘুরে বেড়ানো - তাঁর নেশা। তবে এমনভাবে মাঝরাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে আগে কখনও উনি যাননি। কাজ করতে করতে একটু বেখেয়ালি আচরণ করলেও উনি মানুষের মন নিয়ে খুব সচেতন। রূপাইকেও কতবার বলেছেন, “জানিস রূপোদাদু, একা কোথাও সমস্যায় পড়লে সবার আগে নিজের মনকে প্রশ্ন করবি, দেখবি মন ঠিক সমাধান দেবে, অনেকগুলো লম্বা সুতো দিয়ে মন তৈরি, দেখিস না কুমুমাসি যখন সোয়েটার বোনে, উলের গোলা কেমন জট পাকিয়ে যায়। তেমনই মনের সুতোগুলো জট পাকিয়ে গেলেই যত ঝামেলা বুঝলি? মনখারাপ, শরীর খারাপ। ঐজন্যই মনটাকে খুব আদরে রাখতে হয় যে।” রূপাই কল্পনায় ‘মন’ নামক এক চরিত্র বানিয়ে ফেলে অবাক হয়ে জানতে চাইত, “মনকে কী করে আদর করব সোনাদাদু?”
“খেলবি, ঘুরবি, বাগান করবি, পাখিদের সঙ্গে কথা বলবি, এমন কত কী আছে করার, বড়োরা বড়োদের মতো করবে আর ছোটোরা ছোটোদের মতো।”
সোনাদাদুর বাড়ি এইজন্যই প্রিয় রূপাইয়ের, এখানে এলে যা খুশি তাই করার অধিকার মেলে। মন নিয়ে গবেষক দাদু কখনও কাউকে দুশ্চিন্তায় ফেলবেন, এ আশা করা যায় না। সবাই উদ্বিগ্ন। বাড়ির পেছনে বিরাট পুকুর। জেলে নামানো হয়েছে, যদি কিছু পাওয়া যায়। সবার মনে আগে দুশ্চিন্তাগুলোই আসে। সোনাদাদুর বয়স সাতষট্টি। শরীরে, মনে এখনও বেশ যুবক, কারও বিশ্বাসই হচ্ছে না এমন একটা মানুষ রাতারাতি উধাও হয়ে যাবেন। রূপাইয়ের অন্য মাসি, মামারাও হাজির, সবমিলিয়ে বাড়ি একেবারে জমজমাট। রূপাই বাকি ভাইবোনেরদের সঙ্গে পুকুরপাড়ে বসে আছে। সকলেরই মুখে চোখে চিন্তার ছাপ। কিন্তু না, পুকুর ঘেঁটে তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। শুধুমাত্র একটি বেহালার কাঠামো ছাড়া। বেহালাতে কোনো তার বাঁধা নেই। বেহালাটিকে সোনাদাদুর খামখেয়ালিপনার নিদর্শন ভেবে সবাই এড়িয়ে গেল, তবে রূপাইয়ের চোখ কিন্তু ওতেই আটকাল। রূপাই ছুটে গেল দেখতে, পেছনে রূপাইয়ের মাসতুতো, মামাতো ভাই বোন - পিঙ্কি, সাজু, সানি সবাই হাজির।
রূপাই ঝুঁকে পড়ল বেহালাটার ওপর।
“তখন থেকে কী দেখছিস বল তো রূপাইদাদা?”
সানি কৌতূহল চাপতে পারে না। রূপাই এখন ক্লাস সিক্স। পড়াশোনায়, বুদ্ধিতে সে তুখোড়। অন্তত সোনাদাদু তেমনই বলতেন - ‘রূপোদাদু আমার কার্বন কপি’। কথাটায় বারবার রূপাইও খুব উৎসাহ পায়, সেও বিজ্ঞানী হতে চায় যে।
“সোনাদাদু আমায় একটা গল্প বলেছিল, শুনবি?”
গল্পের কথা শুনে সকলেই ঝটপট বসে পড়ল রূপাইকে ঘিরে। সম্মতি মিলতেই রূপাই শুরু করল।
“অনেকদিন আগে স্কটল্যান্ডের একটি গ্রামে রোরি নামে একটা ছেলে ছিল। রোরি ছোটো থেকে গান গাইত দেখে ওর বাবা-মা ওকে পিয়ানো শেখাতে শুরু করেন। রোরির আঙুলে সত্যি জাদু ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই ও নাম করে ফেলে। বিভিন্ন জায়গায় বাজানোর জন্য ওকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হত। রোরির ভালো লাগত না, কিন্তু বাবা-মা যদি দুঃখ পায় তাই সে কখনোই কোথাও যেতে আপত্তি করত না। রোরির নাম গ্রাম থেকে শহরেও ছড়িয়ে পড়ল। সে শহরেও আসাযাওয়া শুরু করল। গ্রাম ছেড়ে শহরে থাকতে রোরির খারাপ লাগত, সেখানে সব কিছু যান্ত্রিক, আন্তরিকতার লেশমাত্র নেই। একটা সময় সে খুব বিরক্ত অনুভব করে। একবার শহরে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে সে মাঝরাতে বেরিয়ে পড়ে। আসলে রোরি বুঝতে পারছিল না সে জীবনে ঠিক কী চায়? অন্ধকার শহরে গলিঘুঁজি ঘুরতে ঘুরতে একটা কিছুর সঙ্গে সে ধাক্কা খায়। এতটাই জোর ধাক্কা যে রোরি হুড়মুড়িয়ে সামনে পড়ে যায়। কয়েক মুহূর্ত সব অন্ধকার দেখলেও নিজেকে সামলে নিয়ে যখন চোখ খুলে তাকায়, দেখে, সে একটা ঘরের ভিতর রয়েছে, ঘর না বলে দোকান বলা ভালো, দোকানটিতে নানারকম বাদ্যযন্ত্র আছে মানে পিয়ানো, গিটার এরকম অনেক কিছু। রোরি উঠে দাঁড়ায়। দেখে ঘরের কোনায় একটি টেবিল চেয়ারে এক বয়স্ক রোগা ভদ্রলোক বসে আছেন। উনি রোরিকে দেখে এগিয়ে আসেন এবং অনেকক্ষণ রোরিকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন।”
এটুকু বলতে বলতে রূপাই অন্যমনস্ক হয়, সোনাদাদু রিভলভিং চেয়ারে চোখ বন্ধ করে গল্পটা বলছিলেন, রূপাইয়ের মনে পড়ে যায়।
“তারপর?” পিঙ্কি ছটফট করে বাকিটা শোনার জন্য।
“ভদ্রলোক রোরির হাত ধরে টেনে চেয়ারে বসান, তারপর একটা বাক্স নিয়ে আসেন। সেটি খুলে কাপড়ে জড়ানো একটি জিনিস বের করেন। কাপড় সরাতেই বেরিয়ে আসে একটা বেহালা। লোকটি রোরির হাতে বেহালাটি তুলে দিয়ে জানান, এটি যে-সে বেহালা নয়, ‘মায়া-বেহালা’। উনি নাকি রোরির অপেক্ষাতেই ছিলেন। বেহালাটির সুরের যাদু, পীড়িত মানুষকে সুস্থ করে তুলবে। তবে বেহালাটিতে শুধুমাত্র নিজের তৈরি করা সুর বাজানো যাবে, অন্য কোনো অনুকরণ করা সুর বাজালে বেহালাটি আর কাজ করবে না। রোরির মনে হয়, রোরি যা খুঁজছিল তাই পেয়ে গেছে। এরপর সে নিজে সুর বানাতে থাকে, সেই সুর শুনে মানুষ এত মোহিত হয়ে পড়ত যে অনেক অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করতে রোরির ডাক পড়তে লাগল। একটা সময় রোরির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।”
গল্পটা বলে রূপাইয়ের নিজের মনটাই ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। সকলকেই একটা নীরবতা ঘিরে ফেলল। ঠিক তখনই সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে রূপাই উঠে দুদ্দাড় করে সোনাদাদুর ছাদের ঘরে সবাইকে নিয়ে হাজির হল। রূপাইয়ের মনে পড়ছিল, সোনাদাদু চোখ বন্ধ করে বলছেন, ‘আহ! অমন একটা মায়া বেহালা যদি পেতুম, সব্বার মন ভালো করে দিতুম রে দাদু।’
রূপাই যা ভেবেছিল ঠিক তাইই। সোনাদাদুর ঘরে যত্রতত্র শুধু বেহালার নানা কাঠামো ছড়ানো ছিটোনো। প্রচুর কাগজ, যার মধ্যে সুরের স্বরলিপি কাটাকুটি করা। সোনাদাদু তার মানে অমন একটা বেহালা নিয়েই গবেষণা করছিলেন যার সুরে মানুষের মনের অসুখের মুক্তি ঘটবে। এরজন্যই কি দাদুকে যেতে হল? তাই যদি হয় এভাবে যাবেন কেন? না না, হিসেব কিছুতেই মিলছে না।
মনখারাপ নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে গেল রূপাই। হোঁচট খেয়ে উলটে পড়ল দরজার কাছে। পিঙ্কিরা তাকে তুলে বসায়। সামনে কিছুই নেই অথচ সে হোঁচট খেল কীভাবে? অনুভব করল তার পায়ে কিছু যেন একটা আটকে গেছিল। কথাটা মনে হতেই তার গোড়ালির সামনে পায়ের পাতার উপরে জ্বালা করে উঠল, দেখল রক্ত বেরোচ্ছে জায়গাটা থেকে। খুব সূক্ষ্ম কোনো তার বা সুতোয় কেটে গেলে যেমন লম্বা চিরে যায় ঠিক তেমনই সরু ক্ষত। রক্ত দেখে সানি চ্যাঁচাতেই যাচ্ছিল, পিঙ্কি সময়মতো ওর মুখ চেপে ধরে।
“এখন কাউকে ডাকিস না সানি, সবাই এমনিতেই চিন্তায় আছে।”
সোনাদাদুর যা নামডাক একটু পরেই পুলিশ, মিডিয়া এসে পড়বে। তখন হয়তো এঘরে কাউকে ঢুকতে দেবে না। একেবারে সময় নষ্ট করা যাবে না। হাত দুটো মেঝেতে বোলাতে থাকল রূপাই। একটা ফিনফিনে সাদা তারের মতো নাইলনের সুতো, খালি চোখে প্রায় দেখাই যায় না, রূপাইয়ের হাতে ঠেকল। রূপাই সুতোটা একটু একটু করে টানতে লাগল। বেশ খানিকটা টানার পর সুতোটা যখন টান টান হয়ে গেল তখন একটা খড়খড় শব্দ পাওয়া গেল। শব্দের সূত্র ধরে রূপাইরা একটা পরিত্যক্ত আলনার পেছনে পৌঁছোল। এটা কী? রেডিও? হ্যাঁ একটা রেডিও থেকেই আওয়াজটা আসছে। রূপাই কান ঠেকাল, বোতামগুলো এদিক ওদিক ঘোরাল। এক জায়গায় কিছু অস্পষ্ট আওয়াজ শোনা যাচ্ছে যেন। রূপাই এদিক ওদিক করে রেডিওর কাঁটা স্থির করল জায়গাটায়।
“হ্যালোওও!”
‘পুকুর…।’ রূপাইয়ের জোরে হ্যালো বলাতে শুধুমাত্র একটা শব্দই ভেসে এল। গলার স্বরটা যে সোনাদাদুর তা বুঝতে বাকি রইল না। আর কিছু শোনা গেল না। রূপাইরা দৌড়োল পুকুর থেকে তোলা বেহালাটির কাছে। বেহালাটিকে নেড়েচেড়ে দেখে মনে হল ভিতরে কিছু নড়াচড়া করছে। বেহালার যেখানে তার বাঁধা হয় সেই বোতামগুলো ধরে এদিক ওদিক ঘোরাতেই বেহালাটি একটি বাক্সের মতো দু-ভাগ হয়ে খুলে গেল।
একটি চার ভাঁজ করা কাগজ পাওয়া গেল বেহালার খোলটার ভেতর। বেশ কিছু সরগম লেখা, যার প্রতিটি স্বরের পাশে ‘ডোপামিন’, ‘এন্ড্রোফিন’, ‘অক্সিটোসিন’ এমন অনেক শব্দ লেখা কাগজটায়। রূপাই এ বাড়ি এলেই সোনাদাদুর দেশ বিদেশের সায়েন্স জার্নালগুলোয় চোখ বোলাত। কত নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যায়। সোনাদাদুই ধরিয়েছিল এই নেশা। রূপাই জানে এগুলো হ্যাপি হরমোনের নাম। কাগজের শেষ পাতায় স্টার চিহ্ন দিয়ে ছোটো ছোটো করে একটা নোট লেখা, রূপাইরা ঝুঁকে পড়ল কাগজটার ওপর।
‘ওরা জেনে গেছে, সিগন্যাল পাঠাচ্ছে, আমায় নিয়ে যেতে চায়, আমার গবেষণার সুর দিয়ে ওরাও মন… ওরা এসে গে…!’
অসম্পূর্ণ লেখাটির সঙ্গে একটা স্পেসশিপের স্কেচ।
সোনাদাদুর সামনে টেস্টটিউবে অনেক রকমের হরমোন। উনি মায়া-বেহালা বাজাচ্ছেন, মাপছেন, দৈত্যাকার টাচস্ক্রিনে লিখছেন হরমোনের ওঠানামা। এলিয়েনরা আশ্চর্য চোখে ঘিরে আছে সোনাদাদুকে, ওরা বুঝে গেছে অমরত্বের জন্য শরীর নয়, মনই গুরুত্বপূর্ণ। সমস্ত হরমোন ও মায়া-বেহালার সুর প্রয়োগ করে ওরা অমরত্ব চায়। তবেই সোনাদাদুর মুক্তি।
রূপাই হাঁ করে আকাশটা দেখল। একটা বাদামি ধোঁয়ার রেখা চলে গেছে। পুকুরেও গোলাকার একটা ছায়া পড়েছে যেন। সোনাদাদু কি পারবে ওদের যান্ত্রিক জীবনে মন জুড়ে দিতে? তারপর এই আকাশপথ দিয়েই কি ফিরবে? অজস্র কৌতূহলের চাদরে মুড়ে নিচ্ছে রূপাই নিজেকে।
সোনাদাদুর মায়া-বেহালার সুর ছুঁয়ে ফেলেছে মহাকাশ।
----------
ছবি - সুকান্ত মণ্ডল