বিজ্ঞান:: একটা খারাপ দাঁড়িপাল্লা - সূর্যনাথ ভট্টাচার্য


একটা খারাপ দাঁড়িপাল্লা
সূর্যনাথ ভট্টাচার্য

 - নেদো মল্লিক পুকুরচুরি শুরু করেছে, দারোগাবাবু মাথা চুলকে বললেন, কিন্তু ঠিক কী যে কচ্ছে বুইতে পারছি না।
নন্দ মল্লিকের পিতা পরাণ মল্লিক ছিল নিখাদ সৎ ব্যবসাদার। নিজে ঠকে যেত কিন্তু তার কাছ থেকে জিনিষ কিনে আর কারুকে কখনও ঠকতে হয়নি। বরং পরাণ নিজে বহু লোকসান খেয়েছে।
তার সুপুত্র নন্দ বাপের মতো মুখ্যু নয়, পেটে বিদ্যে আছে। রীতিমত ম্যাট্রিক ফেল। বাপের ছোট্ট মুদিখানার ভোল পালটে চাল-গমের আড়তখানা করে তুলেছে। অবশ্য বাপ তার ছেলের বৈভব দেখে যেতে পারেনি।
গ্রামের সাদাসিধা মানুষ বুঝতে পারে না, হঠাৎ এতো বোলবোলা কী করে হল। সবার মনে সন্দেহ, নেদো বাপের মতো ধম্মপুত্তুর নয়। কিন্তু কোনও অনাছিস্টি করতে তাকে কখনও দেখা যায় না। বরং সুযোগ পেলেই সে নিজের সততার সাতকাহন করতে ছাড়ে না। বলে, সন্ত বাপের ব্যাটা আমি, অসৎ হতে পারবো না। গ্রাহককে ঠকিয়ে কি আর মা লক্ষ্মীকে পাওয়া যায়?
বাপের ওপর তার গভীর শ্রদ্ধা। পরাণের আমলের সেই পেল্লাই দাঁড়িপাল্লাখানা এখনও ব্যবহার করে চলেছে। বারকয়েক সারাই-ঝালাই করেছে, তবু নতুন পাল্লা কিনবে না। এখন তো এমন হয়েছে, খালি চোখেই দেখা যায় — পাল্লার দুটো দিক সমান নয়। কাঁটাটা মাঝখান থেকে বেশ খনিকটা সরে গেছে। তবু তাই দিয়েই কাজ চালাবে।
বললে বলে, অমন পয়মন্ত পাল্লা খুড়ো। তা কি ফেলতে পারি? হ্যাঁ, জানি ওর কাঁটা সরে গেছে। কি করি বল, হারু কামারকে দিয়েই তো সারালাম। তা তাড়ির ঝোঁকে ব্যাটা অ্যাত্তোবড় ছ্যাঁদা করে দিলে। কিন্তু আমিও বাপের সুপুত্তুর, তায় লেকাপড়া শিখেছি খুড়ো। আর যাই করি, গ্রাহককে তার প্রাপ্য থেকে ঠকাবো না। পাল্লার দু’দিকে ওজন করে তার মাঝামাঝি ওজন কষেই বিক্কিরি করি। কারুর লোসকান নেই। শুদু দেবতুল্লি বাপের ব্যাভার করা জিনিসটে ফেলতে বোলো নি।
কথাটা সত্যি। প্রত্যেক গ্রাহককে ঘটা করে পাল্লার দুইদিকে ওজন করেই সে জিনিস বেচে। দু'দিকের ওজনে বেশ খানিকটা ফারাক থাকে বটে। কিন্তু তার গড় বার করে তার ওপরেই দাম নেয় নন্দ। কারুর কিছুটি বলার নেই।
কিন্তু দিন দিন পাল্লা আরও খারাপ হচ্ছে। পাড়ার লোকেদের মনে অসন্তুষ্টি বাড়ছে — ক্রমেই যেন ওজনে জিনিস কম পাওয়া যাচ্ছে। অথচ কিছু বলার নেই, দুদিকের ওজনের গড় করেই নন্দ কারবার করে।
অবশেষে হালে পানি না পেয়ে কয়েকজন মিলে দারোগাবাবুর কাছে গিয়ে দরবার করেছে তিনি যেন একটু সরেজমিন করেন।
তা দারোগাবাবুকে খাতিরের ত্রুটি করেনি নন্দ। কিন্তু অভিযোগ কবুল করেনি। কানে হাত দিয়ে জিব কেটে বলেছে, ছি ছি ছি দারোগাবাবু, আমি পরাণ মল্লিকের ব্যাটা, আমি লোক ঠকাবো? এ জম্মে ঐ কাজটি হবে না স্যার। আপনি নিজে সাক্ষী থাকুন, স্বচক্ষে দেখে যান আমি কতোখানি সৎ ভাবে ওজন করি।
এই বলে চা-শরবৎ-পান-দোক্তা যোগানোর ফাঁকে সে দারোগাবাবুকে দেখিয়েছে কিভাবে সে পাল্লার দুদিকে ওজন করে, সেই দুই ওজনের গড় ওজন ধরেই সে কারবার করে। আর পাঁচটা অসৎ ব্যবসায়ীর মতো বেশি ওজনে বেচে না।
আপ্যায়নে দারোগাবাবু খানিকটা ভিজে গেছিলেন। তার ওপর নন্দের কোনও কারসাজি তাঁর চোখে পড়েনি। কিন্তু কীভাবে পাড়ার লোককে ঠাণ্ডা করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। আসলে নিজের বপুখানির মানানসই তাঁর মস্তিষ্কটিও খুব সূক্ষ্ম নয়। তায় এই সব আঁক কষা-টসা কবে ভুলে মেরে দিয়েছেন। ব্যাটা নেদো কী করে গড় কষেছে তা আর তাঁর পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তিনিও বিরূপাক্ষ দারোগা, হার মানেননি। নন্দকে ধমকে একটা কাগজে সব লিখিয়ে নিয়ে মাষ্টারমশাই-এর কাছে নিয়ে এসেছেন আঁকটা ঠিক আছে কিনা দেখিয়ে নিতে।
কাগজটায় একটু চোখ বুলিয়েই মাষ্টারমশাই বললেন, গড় করতে কিছু ভুল করেনি নন্দ। দু’দিকে ওজন করে সে পেয়েছে আটাশ কিলো আর সাড়ে বেয়াল্লিশ কিলো। তার অ্যাভারেজ হল পঁয়ত্রিশ কিলো আর আড়াইশো গ্রাম — কোনও ভুল নেই।
— এই সওয়া পঁয়ত্রিশ কিলোরই দাম নিচ্ছে নন্দ, দারোগাবাবু হৃষ্টচিত্তে বললেন, তাহলে তো আর কোনও গোলমাল নেই, কী বলেন মাষ্টারমশাই? পাড়ার লোকগুলোও হয়েছে এক ভুষিমাল। বিদ্যের জাহাজ সব — আচ্ছা, নিজে আঁক কষতে পারবি না, তাই বলে একটা লেখাপড়া জানা ছেলেকে দুষবি?
দেখলাম মাষ্টারমশাই-এর মুখে মিটিমিটি হাসি। পল্টুও কোত্থেকে এসে হাজির হয়েছে। দেখি সেও মাষ্টারমশাই-এর দিকে চোখ গোল গোল করে চেয়ে আছে।
— নন্দ কিন্তু লোক ঠকাচ্ছে দারোগাবাবু, মাষ্টারমশাই এবার মুখ খুললেন, ঐ সওয়া পঁয়ত্রিশ কিলোর দাম নিয়ে ও আসলে কত মাল দিল জানেন কি?
   কতো?
   প্রায় দেড় কিলো কম।
— বলেন কী? তবে যে বললেন আঁক কষতে কোনও ভুল নেই? বিরূপাক্ষ দারোগার চোখ কপালে উঠেছে।
— আঁকটা ঠিকই আছে, মাষ্টারমশাই ধীরেসুস্থে বললেন, কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়িপাল্লায়। অসমান পাল্লায় দু’দিকে যে ওজন পাওয়া যায়, সঠিক ওজন তার গড়ের চেয়ে কম হয়! কিঞ্চিৎ বিজ্ঞান ও অঙ্ক জানা থাকলেই বুঝতে অসুবিধে হয় না এই কথা।
মাষ্টারমশাই বলেছিলেন বাংলাতেই, কিন্তু দারোগাবাবুর মুখের ভাব দেখে মনে হল তিনি বুঝি গ্রীক কিংবা হিব্রু শুনছেন। কয়েক সেকেন্ড ধরে গোটা চারেক ঢোক গিললেন। দেখেই বোঝা গেল বিজ্ঞান ও অঙ্কের সঙ্গে বর্তমানে তাঁর আলোকবর্ষের দূরত্ব। ব্যাপারটা তাঁর 'প্রখর' মস্তিষ্কে ঢুকতে ব্যর্থ হল। তিনি বেশিক্ষণ আর সে চেষ্টা না করে হাল ছেড়ে দিলেন। মাষ্টারমশাই বলছেন যখন তখন তাতে নিশ্চয়ই ভুল নেই। কিন্তু তিনি যে কিছুই বুঝে ওঠেননি তাও আবার প্রকাশ করা চলে না। তাই তাড়াতাড়ি একটা গ্রামভারি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন, ওঃ হো, তাই তো। প্রথমটা ধরতেই পারিনি, কিন্তু আপনি হিন্টটা দিতেই এখন একেবারে জলের মতো সহজ হয়ে গেল। তারপর চোখ কটমট করে বললেন, ব্যাটা নেদোটা তো আচ্ছা ধড়িবাজ! দেখুন কান্ড! ও ব্যাটার পেটে পেটে যে অ্যাতো তা কে জানতো?
সব বুঝে গেছেন অভিনয় করলেও, নেদোকে কি করে শায়েস্তা করবেন তা ভেবে পেলেন না দারোগাবাবু। দু'চার বার হনহন করে পায়চারি করে অবশেষে বলেই ফেললেন, ব্যাটাকে একটা যুতসই প্যাঁচে ফেলতে হবে, বুইলেন? আপনিই একটা কড়া দেখে দাবাই বাৎলান তো মাষ্টারমশাই, ঐ নেদোর মুখে এক্কেরে ঝামা ঘষে দিয়ে আসি।
— পাল্লার দুটো দাঁড়ি সমান করিয়ে দিন দারোগাবাবু, তা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই — মাষ্টারমশাই মুখ টিপে একটু হেসে বললেন - নন্দ কিন্তু আপত্তি করবে। তাকে কায়দা করতে পারবেন তো?
এবার দারোগাবাবুর আঁতে ঘা লাগল। একে সমস্যার কিছুই তিনি বোঝেননি, মাষ্টারমশাই যা বলছেন তাতে ফল হবে কিনা তাও তিনি জানেন না। কিন্তু তাই বলে সরাসরি তাঁর পৌরুষ নিয়ে কটাক্ষ! তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লেন বিরূপাক্ষ দারোগা। একটা ক্রূর হাস্য দিয়ে বললেন, কি যে বলেন মাষ্টারমশাই? বলে কত গভীর জলের মাছ খেলিয়ে তুললাম, আর এতো—কালকেই নেদোর বাপের নাম জিজ্ঞেস করে নেবেন। দেখবেন পরাণের বদলে হারাণ বলছে... হে হে হে...।
দারোগা চলে যেতেই পল্টু বলে উঠল, কী করে বুঝলেন মাষ্টারমশাই?
— খুব সহজেই পল্টুবাবু, মাষ্টারমশাই একটু মুচকি হেসে বললেন, ফিজিক্সে পড়নি — অসমান দাঁড়িপাল্লার দু’দিকের ওজন গড় করে প্রকৃত ওজন পাওয়া যায় না? যেটা করতে হবে তা হল, দুটো ওজন গুণ করে তার বর্গমূল বার করা। সেইটে আসল ওজন।
পল্টুর আক্কেল গুড়ুম! আমারও বেশ খটকা লাগছে। বললাম, মানে অ্যারিথমেটিক মীন না নিয়ে জিওমেট্রিক মীন নিতে হবে?
— ঠিক তাই, মাষ্টারমশাই একটা কাগজ তুলে নিয়ে খসখস করে কী লিখতে লিখতে বললেন, খুব সহজ, এই দেখুন — স্কুল ফিজিক্স —


মাষ্টারমশাই-এর লেখাটা দেখেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল। লিভারের টর্ক-ব্যালান্স ফর্মুলা। পল্টুরও দেখি মুখ উজ্জ্বল হয়ে এল, মানে সেও বুঝেছে — W প্রকৃত ওজন আর a এবং b পাল্লার দুই অসমান দাঁড়ি। কিন্তু তার পুরো ধাঁধা কাটেনি। বলল, মানে নন্দ দুটো ওজনের অ্যারিথমেটিক মীনের দাম নিচ্ছিল। আর জিনিষ দিচ্ছিল জিওমেট্রিক মীনের সমান। কিন্তু জিওমেট্রিক মীন কি অ্যারিথমেটিক মীনের চেয়ে কম?
— সর্বদা। পজিটিভ সংখ্যার জন্যে। এ হল অসমীকরণের বিখ্যাত এএম-জিএম সূত্র। মাষ্টারমশাই আর একটা কাগজে চটপট কিছু লিখে নিয়ে বললেন, এটা অঙ্ক, কিন্তু শক্ত কিছু নয়। দেখো তো পল্টুবাবু —


মাষ্টারমশাই-এর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে খানিক দেখেই পল্টু উল্লসিত হয়ে উঠলো — বুঝেছি, দু'টো সংখ্যার বিয়োগফল হল হোলস্কোয়্যার অর্থাৎ পজিটিভ, মানে প্রথম সংখ্যাটা দ্বিতীয়ের চেয়ে বড়!
আমিও দেখলাম, এক লাইনের প্রমাণে কোনও ভুল নেই। সংখ্যাদ্বয় যতক্ষণ অসমান, তাদের এ-এম অর্থাৎ অ্যারিথমেটিক মীন, জি-এম অর্থাৎ জিওমেট্রিক মীন অপেক্ষা বড়। মাষ্টারমশাই এবার সেটাই বললেন, একটা জিনিষ কি খেয়াল করেছ পল্টুবাবু? দুটো সংখ্যা যখন সমান তখন তাদের অ্যারিথমেটিক আর জিওমেট্রিক মীন কিন্তু একই হয়ে যায়, ঐ সংখ্যাদু'টোর সমান। তাই না? কিন্তু নন্দর পাল্লায় দুটো ওজন সমান পাওয়া যাবেই না, কাজেই নন্দের লাভ থাকবেই। দুটো ওজন কাছাকাছি হলে লাভ কম। তাই নন্দের পাল্লার কাঁটা ক্রমশ সরে যাচ্ছিল। কিছুই বলা যায় না, হারু কামারকে ভাং খাইয়ে ও ইচ্ছে করেই কাঁটা অনেকটা সরিয়ে নিয়েছিল কিনা।
   নন্দ এতসব জানল কী করে? ওর তো এতদূর গড়াবার কথা নয় — আমি শুধোই।
— তত্ত্বকথা ওর জানবার কথা নয়, মাষ্টারমশাই হাসি চেপে বললেন, তবে কোনওভাবে জেনেছে এই পদ্ধতিতে ওর লাভ থাকবে। বোধহয় কিছুদিন ইস্কুলে গিয়েছিল বলেই। তাহলে দেখলে তো পল্টুবাবু, একটুকরো বিজ্ঞান আর অঙ্ক জানা থাকলে ঠকে যাবার হাত থেকে বাঁচা যায়।
পল্টু হাতের কাগজ দু'টো দেখিয়ে বলল, এইটা বিজ্ঞানের টুকরো আর এইটা অঙ্কের। কিন্তু তাই দিয়েই নন্দ লোকও ঠকায়।
   তাতে অঙ্ক বিজ্ঞানের কোনও দোষ নেই পল্টু, ওটার জন্যে দায়ী পাজি নন্দ —
   আর একটা খারাপ দাঁড়িপাল্লা — বলেই লাফাতে লাফাতে পালাল পল্টু।
_____

No comments:

Post a comment