বিজ্ঞান:: নোবেল কথা - দীপা দাস


নোবেল কথা
দীপা  দাস


নোবেল পুরস্কার শুরুর মূলে কিন্তু ছিল রসায়নের একটি গবেষণাসে কথায় আসার আগে নোবেল পুরস্কার নিয়ে কটা কথা বলিআমার মনে হয় তোমরা সে সব জানো, তবু একটু ঝালিয়ে নেওয়া, এই আর কী।

নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হয় ১৯০১ সালে। ঐ বছর থেকে আজ পর্যন্ত সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্যসাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল।
মোট ছয়টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিষয়গুলো হল পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তি। নোবেল পুরস্কারকে এ সকল ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তদের ইংরেজীতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইলের মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। নোবেল মৃত্যুর পূর্বে উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান। শুধুমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় নরওয়ের অসলো থেকে। বাকি ক্ষেত্রে স্টকহোম, সুইডেনে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।  পুরস্কার সাধারণত মৃত কাউকে দেয়া হয় না। কিন্তু এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। নোবেল পুরস্কার কেবল একটি পুরস্কার নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। প্রতিটি জাতি নিজের নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে গর্ববোধ করে থাকে। এমনকি জাতির সভ্যতা ও অগ্রসরতার মানদণ্ড নির্ধারিত হয় নোবেল বিজয়ীদের সংখ্যার উপর। নোবেল বিজয়ীরা শুধু নিজের ক্ষেত্রেই নয়, অন্য যে কোনও ক্ষেত্রে তাদের মতামত দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন আন্তর্জাতিক বিশ্বে। এবং যে কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ফোরামে তাদের মতামত গুরুত্বের সাথেই গৃহীত হয়ে থাকে। পৃথিবীর যে কোনও দেশেই তাদের রয়েছে অবাধ প্রবেশের অধিকার।

নোবেল বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানিত পুরস্কার হলেও এটি সর্বোচ্চ বিতর্কিত বিষয়ও বটে। এমনকি রয়েছে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও। নিন্দুকেরা এমনও বলে থাকেন, সব সময় সঠিক ব্যক্তি নোবেল লাভ করেন না। বিভিন্ন সময়েই এই পুরস্কার বিজয়ীদের নিয়ে নানা বিতর্ক উত্থাপিত হয়েছে। আলোচনা সমালোচনার ঝড়ও বয়ে গেছে। নোবেলের আরেকটি অন্ধকার দিক আছে। অনেকেই বলেন, নোবেল পুরস্কার প্রদানের পেছনে কাজ করে রাজনীতি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মহাশক্তিধর দেশগুলো কিংবা অনেক সময় বৃহৎ বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। একটা সময় ছিল, যখন ঔপনিবেশিক স্বার্থ বিবেচনায় নোবেল দেওয়া হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশে নোবেল বিজয়ীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে এখনও অনেক কম।
তবে সত্যি কথা বলতে কী, নোবেল বিজয়ী যে কোনও দেশেরই অহংকার। এই পুরস্কারকে এ সব ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রত্যেক বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেকে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক কিছু পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। নোবেল পুরস্কারের বর্তমান অর্থমূল্য ১ কোটি সুইডিশ ক্রোনার বা ১০ লাখ ৭০ হাজার ইউরো বা ১৪ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।

এবার সেই গল্পে আসি যা দিয়ে শুরু করেছিলাম ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। এটি ছিল সে সময় ব্যবহৃত বারুদের চেয়ে উচ্চ মাত্রার বিস্ফোরক আলফ্রেড ছিলেন একজন বিখ্যাত সুইডিশ রসায়নবিদ ও উদ্ভাবক। তখনকার দিনে পাহাড়ি অঞ্চলে রাস্তা ও রেলপথ তৈরি করতে হলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পাথর কেটে তা তৈরি করতে হত। এ কাজ ছিল দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ও ক্লান্তিকর। পাহাড় ফাটাবার জন্য তখন একমাত্র বিস্ফোরক পদার্থ ছিল ‘বারুদ’ কিন্তু বারুদের ক্ষমতা সীমিত। সর্বক্ষেত্রে বারুদকে কাজে লাগানো যেত না। অবশ্য আর একটা তীব্র বিস্ফোরক পদার্থ তখন সবে আবিষ্কৃত হয়েছিল। নাম তার ‘নাইট্রোগ্লিসারিন’, ফিকে হলুদ রঙের তরল পদার্থ। একটু নড়াচড়া বা গরম করলেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে যায়। কাজেই নাইট্রোগ্লিসারিন ব্যবহার করা তখন নিরাপদ ছিল না। একদিন গবেষণাগারে নোবেলের এক সহকর্মী নাইট্রোগ্লিসারিনের বোতল বিদেশে পাঠাবার জন্য প্যাক করছিলেন। হঠাৎ তাঁর হাত ফসকে একটি বোতল মেঝেতে পড়ে গেল। মেঝেতে ছড়ানো ছিল এক বিশেষ ধরনের মাটি, যা প্যাকিং-এর কাজে লাগত। বিস্ফোরকপূর্ণ বোতলটা পড়ল গিয়ে সেই মাটির ওপর। তাই না দেখে গবেষণাগারের সবাই তো ভয়ে অস্থির! এই বুঝি বিস্ফোরণ ঘটে আর কীআলফ্রেড নোবেলও একটু দূরে দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলেন। কিন্তু কী আশ্চর্য ব্যাপার, বিস্ফোরণ ঘটল না। আলফ্রেড ঐ মাটিসমেত নাইট্রোগ্লিসারিন সাবধানে তুলে এনে পরীক্ষা করে দেখলেন যে, নাইট্রোগ্লিসারিনের বিস্ফোরণ ক্ষমতা একটুও কমেনি, কিন্তু মাটির সঙ্গে মিশে জমাট বেঁধে কঠিন হয়ে গেছে বলে নাড়াচাড়া করবার পক্ষে জিনিসটা বেশ নিরাপদ হয়েছে। এই আকস্মিক পরিবর্তন আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাকে অপ্রত্যাশিতভাবে পূর্ণ করে দিল। তিনি নাইট্রোগ্লিসারিনকে নিরাপদে ব্যবহার করার একটা উপায় খুঁজে পেলেন। আরও পরীক্ষা চালিয়ে নোবেল ‘কিসেলগার’ নামে একরকম সূক্ষ্ম ছিদ্রবিশিষ্ট বেলেপাথর নাইট্রোগ্লিসারিনের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে দেখলেন যে, তাতে মিশ্রণটা বেশ কঠিন ও টেঁকসই হয়। তাছাড়া নাইট্রোগ্লিসারিনের বিস্ফোরণ শক্তিও কমে না অথচ তা নিরাপদে নাড়াচাড়া করা যায়। নোবেল এরই নাম দিলেন ‘ডিনামাইট’

১৮৬৭ সালে ডিনামাইট আবিষ্কৃত হল। নিরাপদে ও সহজে পাহাড় ফাটাবার ও পাহাড়ে সুড়ঙ্গ করবার উপায় খুঁজে পেল মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে নোবেলের খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। ডিনামাইট বিক্রি করে নোবেল অগাধ সম্পত্তির মালিক হলেন। অর্থ আর যশ কিন্তু নোবেলের বৈজ্ঞানিক প্রতিভাকে প্রভাবিত করতে পারল না। তিনি বিস্ফোরক সম্পর্কে আরও গবেষণা চালিয়ে যেতে লাগলেন। শেষে ১৮৮৫ সালে আবিষ্কার করলেন আর একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরক পদার্থ, নাম তার ‘ব্যালিস্টাইট’ সেই প্রথম ধূম্রবিহীন বিস্ফোরক পদার্থ আবিস্কৃত হল।
সারাজীবন বিস্ফোরক পদার্থ নিয়ে গবেষণা করে গেলেও নোবেল মনে প্রাণে চাইতেন যে বিস্ফোরক পদার্থ যেন ধ্বংসের অস্ত্ররূপে ব্যবহৃত না হয়ে মানুষের কল্যাণকর কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই তিনি শান্তির জন্যও নোবেল পুরস্কারের ব্যবস্থা করে যান।  নোবেল তাঁর পেটেন্ট কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। কেউ অবৈধ ভাবে ডিনামাইট উৎপাদন করলে দ্রুত তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করতেন। এরপরেও যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ব্যবসায়ী কিছুটা ভিন্ন উপায়ে ডিনামাইট উপাদন করে তার পেটেন্ট নিয়েছিল।

১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইল-এর মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। নোবেল তার মৃত্যুর আগেই এক উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান।


২০১৬ সালে রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী — ফ্রান্সের জ্যঁ পিয়েরে সাভেজ, যুক্তরাজ্যের স্যার জে ফ্রেজার স্টোডার্ট এবং নেদারল্যান্ডসের বার্নার্ড এল ফেরিঙ্গা। এই তিন বিজ্ঞানীর মধ্যে পুরস্কার ভাগ হবে। সুইডিশ নোবেল কমিটির বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্বের ‘সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম যন্ত্র’ ন্যানো মেশিন বা মলিকিউলার মেশিন তৈরির জন্য তিনজন যৌথভাবে এ পুরস্কার জিতেছেন। সুইডেনে একটি সংবাদ সম্মেলনে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বিজয়ী এই তিন বিজ্ঞানী ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২০০ জনের তালিকায় যুক্ত হলেন।
তারা তাদের গবেষণায় অণু সমতুল্য ক্ষুদ্রতম যন্ত্রের নকশা ও সংশ্লেষণ করেছেন। তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্রাণু ভবিষ্যতে খুদে রোবট, এমনকি কৃত্রিম অঙ্গ সঞ্চালনে কৃত্রিম পেশি হিসেবে কাজ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তির ইতিহাসে এই গবেষণা নতুন একটি মাত্রা যুক্ত করেছে। তাদের অবদান রসায়নশাস্ত্রকে ভিন্নতর উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
ন্যানোবট নামের এই অণুমেশিন আলো বা তাপমাত্রার পরিবর্তনের মতো উদ্দীপকের সাড়ায় যান্ত্রিক ঘূর্ণন উৎপন্ন করতে সক্ষম এসব ন্যানোমেশিন বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রোবট নিজের আকৃতির বহুগুণ বড় বস্তু সরাতে বা নাড়াতে সক্ষম

আজ এখানেই থাক। বিজ্ঞানের অন্য শাখায় যেসব নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সে সব নিয়ে আবার কোনোদিন শোনাব।
_____

No comments:

Post a comment