গল্প:: সুমেন্দু লেকে লুকোচুরি খেলা - রম্যাণী গোস্বামী


সুমেন্দু লেকে লুকোচুরি খেলা
রম্যাণী গোস্বামী

(১)

আজ বেলা বারোটার মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে একটা বড়ো দল বেড়াতে চলে এল মিরিকে। এইমাত্র দুটো পেল্লাই গাড়ি থেকে বোঁচকা বুচকি সমেত নামতে দেখা গেল বাবা-মা, জেঠা-জেঠি, কাকা-কাকি আর একপাল খুদেদের একটা গ্রুপকেএই, তোমরা মিরিক জায়গাটার নাম শুনেছ তো? এমা, শোনোনি? আচ্ছা বেশ, দার্জিলিং-এর নাম তো শুনেছ নিশ্চয়ই। মিরিক নামের ছোট্ট গ্রামটা ঐ দার্জিলিং পাহাড়ের কাছেই। এবার তাকিয়ে দেখো বড়ো দলটার দিকে। সবার আগে টিকালো নাক লম্বা গড়নের জেঠু তার পাশে বাবা তারপরে বড়োকাকাছোটকা। তারও পরে জেঠিমা মা কাকিমারা। ওদের মাঝে কিচিরমিচির করতে করতে যাচ্ছে ছোটোদের দলনতুন জায়গায় বেড়াতে এসে সবার মনে ফুর্তি আর ধরছে না।
আর সকলের শেষে ধীরেসুস্থে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশটা মন দিয়ে দেখতে দেখতে চলছে ঐ যে শ্যামলা রং-এর ঝাঁকড়া চুল ভাবুক ছেলেটা? দেখতে পাচ্ছ ওকে? ওর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে যে এত ভালোবাসা আর মায়াভরা এই পৃথিবীতে ও যেন ভারি দুঃখী। অবশ্য মন খারাপের যথেষ্ট কারণ আছে মানছি। এখন অক্টোবর মাসের শেষ। দুগ্গা পুজো শেষ। লক্ষ্মী পুজোও শেষ। মানে আনন্দপনার যা যা বাকি ছিল তার প্রায় সবই ফুরিয়ে গেল। একমাত্র কালী পুজোটা বাকি। সে আর কতদিন? তারপর? তারপর আসবে দুটো বিভীষিকা। পরপর হাতে হাত ধরে। নেচে নেচে আর কী। প্রথমটা হল পরীক্ষা। আর দ্বিতীয়টা হল রেজাল্ট! উফ, পরেরটাই বেশি আতঙ্কের। রেজাল্টের ঠিক আগের রাতটা একফোঁটা ঘুমোতে পারে না ছেলেটা। বিছানায় শুয়ে খালি ছটফট ছটফট। কেবলই এপাশ ওপাশ। সবশেষে খাটে বসে জানলা দিয়ে দূরের ওই কাঁঠাল গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভোরের আলো ফুটতে দেখানিজেকে তখন মনে হয় ঠিক যেন ফাঁসির আসামিশেষ বারের মতন যেন মন ভরে আকাশের রঙ বদলটা দেখে নিচ্ছে।
শ্যামলা ছেলেটার নাম যা খুশি হতে পারে। ইচ্ছেমতো বসিয়ে নাও তোমরারন্টু, তীর্থ, বাসব অথবা মিলন, বা অন্য কিছু তোমাদের পছন্দমতোজানো, ছেলেটা কিন্তু বড্ড কোমল মনেরপশুপাখি ভালোবাসে ও ভীষণ। পাড়ার কুকুরগুলো ঝড় বৃষ্টির রাতে আর অন্য কোথাও যায় না আশ্রয়ের খোঁজে। সোজা চলে আসে মল্লিক বাড়ির উঠোনে। কেননা ওরা জানে যে সেখানে ওদের জন্য শুধু মাথার উপরে শেড থাকবে এমন নয়, থাকবে এক টিন লেড়ো বিস্কুট থাকবে পুরোনো কটা কাঁথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে গেলেও দিব্যি ওম হয় যেগুলোতে! আর খুব শীতবৃষ্টির রাতে ওদের জন্য থাকে আরও একটা জিনিস কী তা? এক মালসা কাঠকয়লার আগুন ওটাকে ঘিরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শোয়ার যে কী মজা! ওই সবের আয়োজন করে রাখে এই শ্যামলা ছেলেটা বাড়িতে সাবেক আমল থেকে একজন খুব বুড়োমতো থুরথুরেমতো খুরখুরেমতো কাজের লোক আছে তাকে ওই ছেলে ডাকে টিটি বলে কেন যে এমন নাম দিয়েছে তা কেউই জানে না টপ সিক্রেটওর স্কুলের বন্ধুরাও জানে না তা সেই টিটি আর সে মিলে বড়োদের কারোকে কিছু না জানিয়ে, না ঘাঁটিয়ে এতকিছুর ব্যবস্থা করে নিজের পকেট মানি বাঁচিয়ে। সেজন্যই তো ছেলেটার মাঝে মাঝেই হোমওয়ার্ক মিস হয়ে যায় স্কুলে পড়া ধরার সময় ওকে বেঞ্চের উপরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অঙ্ক খাতার পাতাগুলো ফাঁকা থেকে যাওয়ায় বিভূতি স্যারের লিকলিকে বেতের ছড়ি ফটাস ফটাস করে এসে পড়ে ওর নরম হাতের তালুতে লাল গোলাপি দাগ বসিয়ে দেয় ক্লাশের ফার্স্ট সেকেন্ড বয়রা মুচকি মুচকি হাসে কিন্তু ছেলেটা কাঁদে না একফোঁটাজানলা দিয়ে বাইরে দূরের ওই একঢ্যাঙা তাল গাছের ডালে বাবুই পাখির বাসা বানানো দেখে মন দিয়ে।
     
এখন দলটা বেশ হালকা হয়ে এসেছে দেখা যাচ্ছে। আসলে সবাই ছুটেছে রিসর্টে নিজের নিজের রুম দেখতে। আজ রাতটা এই চমৎকার জায়গাতেই কাটানো হবে কিনা। শুধু যায়নি ওই ছেলেটা। রুম নিয়ে ওর কোনো আগ্রহ নেই বরং ও এখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সুমেন্দু লেকের দিকে। হ্যাঁ, মিরিকে গেলে যে বিশাল লেকটিকে দেখতে পাবে ওরই নাম এটা। চারপাশে নিবিড় পাইন গাছ দিয়ে ঘিরে রাখা অপূর্ব সেই লেক। সারিবদ্ধ গাছের ছায়া পড়ে লেকের জলটাকে দেখায় যেন গাঢ় সবুজ। ওরা যখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে চা বাগান আর নদী আর জঙ্গল পেরিয়ে এখানে উঠে এল তখন ঝকঝকে রোদে ঝলসে যাচ্ছিল পাহাড়ের গায়ের লিলিপুটদের বাড়ির টিনের চাল। আর এখন মাত্র এই আধঘন্টার ফারাকে কোথা থেকে রাশি রাশি মেঘ আর কুয়াশা এসে পাইন গাছগুলোর গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ছে আদুরে বাচ্চাদের মতন আবদার করছে তাদের গল্প শোনানোর।
বিশাল লেকটার উপরে রয়েছে একটা বাঁকানো সাঁকো। সাঁকোর রেলিঙে দড়ি দিয়ে টানটান করে আটকানো গোলাপি নীল হলুদ সাদা সবুজ রংবেরং-এর কাপড় পতাকার মতো উড়ছে দমকা বাতাসে। গুটিগুটি পায়ে ছেলেটা এসে দাঁড়াল লেকের মাঝ বরাবর পুলের ঠিক মধ্যিখানে। তখনই হঠাৎ এমনিভাবে কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরল সাঁকোটাকে যে সামনে পিছনে আর কিছুই দেখা গেল না। যেন জগতে শুধুই একখণ্ড অসম্পূর্ণ সাঁকো আর ও। আর ওর পায়ের নিচে লেক। কী অদ্ভুত না? ঠিক এমনি সময় ফিসফিস করে কে যেন ছেলেটার নাম ধরে ডাকল। সত্যিই! শুনে প্রথমে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলেও পরমুহূর্তেই অন্যরকম ভালোলাগায় ভরে গেল ওর মন তারপর আবারও মনটা খারাপ হল। ইস, যদি এখানে দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দেওয়া যেত বাকি জীবনটা। পরীক্ষা দিতে হত না। রেজাল্টও আউট হত না। ম্যাথস, ফিজিক্স, বায়ো, ধুর ধুর...

(২)

এখানে মধ্যাহ্ন ভোজনের এলাহি ব্যবস্থা। চিকেন মাটন ফিশফ্রাই আইসক্রিম, কী চাও? ওদের রিসর্টটা পাহাড়ের গা লাগোয়া। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় নিচের ঐ লেক। লেকের বুকে বোটিং চলছে। এত উঁচু থেকে মনে হয় যেন রাজহংসের দল নিথর জলরাশিকে কেটে কেটে তিরের মতো এগিয়ে চলেছে। লেকের চারপাশে ছোট্ট টাট্টু ঘোড়ায় সওয়ারি করছে পর্যটকের দল। কী মজাই না লাগছে দেখতেবিরাট ওপেন টেরাসে গোল রংবেরং-এর ছাতার তলায় পেতে রাখা আছে সুন্দর সুন্দর চেয়ার টেবিল। এখানেই ব্রেকফাস্ট থেকে আরম্ভ করে ডিনার সার্ভ করা হয়। ওরা ছাড়া আজ অন্য কারও বুকিং নেই। খুদেরা তাই খুব দামাল হয়ে উঠেছে। শুধু এই ছাদটাই নয়, গোটা পাহাড়টাই আজ ওদের। নিচের লেকটাও, লেকের ধারের চমৎকার ওই ফুলের বাগান, আর ওই যে ঘোড়াগুলো? হ্যাঁ, সব। সব।
“আজ বিকেলে আমরা এখানকার বিখ্যাত বোকার মনেস্ট্রিটা দেখে আসব। মিরিকের সবচাইতে উঁচু জায়গায় আছে ওই মনেস্ট্রি। আর বাচ্চারা কে কে লেকের ধারে হর্স রাইডিং করবে, হাত তোলো...”
ছোটোকাকুর প্রস্তাবে হুল্লোড় উঠল ছোটোদের মধ্যে। শুধু ওই শ্যামলা ছেলেটা কিচ্ছু বলেনি। ও রেলিঙের কাছে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল নিচের লেকের দিকে। কিন্তু একটু পর থেকেই দেখা গেল ওয়েদার খারাপ হয়ে গেছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। তাই সকলকে ঘরের ভিতরে এসে ঢুকতে হল।
“কুছ পরোয়া নেই। পাহাড়ের বৃষ্টি। একটু পরেই কমে যাবে। বউদি, চটপট একটু চায়ের অর্ডার দিয়ে দাও তো
বড়োরা এক ঘরে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে কাচের স্লাইডিং জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছে আর চা পকোড়া খাচ্ছে জমিয়ে। ছোটোরা যে যার মতো অর্ডার করেছে। কেউ পছন্দ করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কেউ বা পনির টিক্কা, আবার কেউ চিকেন মোমো। চেটেপুটে সব সাবাড় করে এখন সকলে মিলে জুটেছে পাশের ঘরে। ল্যাপিতে জোরে জোরে গান বাজছে বিটিএস-এর। এখন এটাই হট ফেভারিট। কেউ কেউ আবার মোবাইলে গেম খেলতে ব্যস্ত। ওদিকে খাওয়াদাওয়ার হুল্লোড়ের মাঝেই সবার নজর এড়িয়ে রিসর্ট থেকে টুক করে বেরিয়ে পড়ল সেই শ্যামলা ছেলেটা। আসলে এখানে আসার পর থেকেই সওয়ারি পিঠে বহন করা ওই পুঁচকে ঘোড়াগুলোকে দেখে ভারি কষ্ট হয়েছে তার। মানুষের ওজন টেনে টেনে কেমন বেঁকে গিয়েছে ওদের শরীর। আচ্ছা, ওরা কি মারও খায়? নয়তো ওদের পিঠে কেন শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতের দাগ? যা দেখলেই বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে কান্নায়।
বৃষ্টিটা এখন ফিসফিস করে পড়ছে। গায়ে লাগে না এমন। যদিও জেঠু অথবা বাবা ওর একা একা বৃষ্টি মাথায় বেরোনোর কথা জানতে পারলে কান টেনে ছিঁড়ে দেবে। প্রতিবার রেজাল্ট বেরোনোর পর যেমন চেঁচায়, তেমনি করে চেঁচাবে ওরা। বলবে - বাঁদর ছেলে একটা, পড়াশোনায় মন নেই, খালি খাওয়া শোওয়া আর রাজ্যের নোংরা কুকুরগুলোকে বাড়ি অবধি টেনে আনা। বলি উঠোনটা কে ধোবে? অথচ কী আশ্চর্য! ও আর টিটি মিলে তার আগেই শলার ঝাড়ু দিয়ে ভালো করে বারান্দা ধুইয়ে দিয়েছে, সেটা জেনেও বড়োরা খালি চেঁচায়। বাকি দাদা দিদি ভাই বোনেরা তুখোড় রেজাল্ট করে ফি বছরসেটাও কি ওর দোষ? কে বলেছে ওদের এত পড়াশোনা করতে? ও নিজে সারাদিন পড়বেই তো নাড়ু গোল্লা বিনু শান্তিদের কে দেখবে, কে আদর যত্ন করবে শুনি?
লেকের গা ঘেঁষে গোল করে ঘিরে আছে পায়ে হাঁটা পথ। হুডি চাপানো মাথা হেঁট করে জ্যাকেটের পকেটে হাত দুটো ঢুকিয়ে ছেলেটা হেঁটে যাচ্ছে সেই রাস্তা দিয়ে। ইতিমধ্যেই রাস্তাটা ভিজে বেশ পিছল হয়ে উঠেছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে মুখ তুললেই দেখা যেত কাঞ্চনজঙ্ঘা। এখন যা মেঘে মেঘে ঢাকা। কিন্তু মেঘের ওপাশে সে তো দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপটি করেওকে ছেড়ে যায়নি কোথাও। শুধু লুকিয়ে আছে। এই যা। তাই ওর মন খারাপ হয় না একটুও একসময় নাকে ঘোড়ার গায়ের আর পথের ধারে ধারে পড়ে থাকা ঘোড়ার পটির দমচাপা জোরালো গন্ধ ভেসে আসতেই ছেলেটা বুঝে গেল যে ও এসে পড়েছে আস্তাবলের দিকটায়। বেশ। এই তাহলে বেচারি দুঃখী ঘোড়াদের ঘরবাড়ি। সন্তর্পণে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল ছেলেটা। খচমচ করে উঠল একটা পুরু কাগজের খামগেলবার জন্মদিনে উপহার পাওয়া টাকাগুলো, সব ও সঙ্গে করে এনেছিল মূলত পাহাড়ের নাড়ু গোল্লাদের জন্যইকিন্তু এখানে এসে মন কেঁদে উঠল ঘোড়াগুলোকে দেখে। এবার সহিসদের খোঁজ করতে হবে। টাকাগুলো বিলিয়ে দিতে হবে সবার মধ্যে। কিন্তু কোথায় কে? আশেপাশে যে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির জন্য জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা আর থমথমে অন্ধকার। একটু দূরে ঝাপসা হয়ে ফুটে রয়েছে একটা পরিত্যক্ত কন্সট্রাকশন। হঠাৎ সেখান থেকে চার-পাঁচটা ছায়ামূর্তি লাফিয়ে চলে এল ওর ঠিক সামনে।
চমকে উঠল ছেলেটা। ও এক ঝলক দেখেই বুঝতে পেরেছে যে লোকগুলো খারাপ। যদিও কতটা খারাপ তা ওর ধারণাতেও নেই। হিংস্র চাহনির লাল চোখ লোকগুলো বারবার তাকাচ্ছে ওর পকেটের দিকে। হাতদুটো মুঠো করে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে এক পা এক পা করে পিছিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। না। কিছুতেই দেবে না। এ টাকা নাড়ু গোল্লা বিনুদের। মরিয়া হয়ে লোকগুলোও এগোচ্ছে। একবার ধরতে পারলে খামটা কেড়ে নিয়ে ওকে ছুঁড়ে লেকের জলে ফেলে দেবে এমন ভাব। কিন্তু না, তার আগেই ঝড়ের মতন কেউ একজন এসে বদমাইশগুলোর থেকে আড়াল করে দাঁড়াল ছেলেটাকেগায়ে তার সেনার পোশাক। ছোটো ছোটো করে ছাঁটা চুল। অবাক হয়ে গেল শ্যামলা ছেলেটা। এখানে কি তবে কাছাকাছি কোনো সেনা ছাউনি আছে? ছোটকাকে জিজ্ঞেস করতে হবে তো! কিন্তু ও হরি! এ যে দেখি একটা মেয়ে! অনেকটা ওর কাছাকাছি বয়সিই হবে। মেরেকেটে ষোলো সতেরোতার বেশি নয়। অথচ লোকগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ওরা যেন ভূত দেখছে। মেয়েটার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই লাল চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে এল। তারপর কাটা কলাগাছের মতো ঝপঝপ করে মাটিতে পড়ে গেল ওরা। আর নড়ল না।

(৩)

শ্যামলা ছেলেটা যখন রিসর্টে ফিরে এল তখন ছোটকা ঘরের ভিতরে ছোটোদের নিয়ে কুইজের আসর বসিয়েছে। অত হইচইয়ের মাঝে ওকে সেভাবে কেউ লক্ষও করল না। দরজার কাছের বেতের চেয়ারে বসতেই ও শুনতে পেল ছোটকার গলা, “আচ্ছা, এবার একটা কঠিন প্রশ্ন। দেখি তো কে এটা বলতে পারে। বল তো এখানকার লেকের উপরে যে বাঁকানো ব্রিজটা দেখেছিস সেটার নাম কী? কার নামেই বা তৈরি হয়েছে ওটা? বলতে পারলে এই বড়ো ক্যাডবেরি বারটা পাবি কিন্তু নিজে নিজে বলতে হবে। কোনো হেল্প ছাড়া। অ্যাই বান্টি, গুগল করলে কিন্তু খেলা থেকে আউট বলে দিলুম...”
ঘরের ভিতরে পিন ড্রপ সাইলেন্স। শুধু জীবনে এই প্রথমবার নড়ে উঠল শ্যামলা ছেলেটার ঠোঁট। সাধারণত কুইজ জাতীয় জিনিসপত্র সে সযত্নে এড়িয়ে চলে হেরে যাওয়ার ভয়ে। কিন্তু আজ যেন ও অন্য মানুষ। সবাই শুনল ছেলেটা দৃঢ় গলায় বলছে, “আমি জানি ছোটকা। ব্রিজটার নাম ইন্দ্রেনি পুল। শহীদ ইন্দ্রেনি থাপা’র নামে
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল ছোটকা, “কারেক্ট! কিন্তু এটা কি বলতে পারবি যে কে ছিলেন এই ইন্দ্রেনি?”
“পারবপ্রায় আমারই বয়সি টিনএজার একটা মেয়ে। আমার চাইতে দু-তিন বছরের বড়ো হবে খুব জোর। তবে আমার মতো ভীতু নয়। দারুণ সাহসী একজন ফ্রিডম ফাইটার ছিল ইন্দ্রেনি ওই বয়সেই নেতাজির দলে যোগ দিয়েছিল। নিজের গায়ে মাইন বেঁধে ব্রিটিশদের ট্যাঙ্ক জ্বালিয়ে দিয়ে শহীদ হয়েছিল দেশকে ভালোবেসে হাসিখুশি মেয়েটা হয়ে গেল একটা হিউম্যান বম্ব!”
ছোটকা আর কী বলবে, এত অবাক সে জীবনেও হয়নি। বাকিদের হিংসে হিংসে চোখের সামনে দিয়ে ক্যাডবেরির প্যাকেটটা এগিয়ে দিল সে ছেলেটার দিকে। সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, “বেশ বেশ। জিকে পড়ছিস খুব? তাই না জিজো?”
ওহ হ্যাঁ, ছেলেটার নাম জিজো। এতক্ষণ বলা হয়নি তোমাদের। জিজোও একটা কথা বলতে পারবে না কাউকে। না, ভাইবোনেদের নয়, স্কুলের বন্ধুদেরও নয়। কী কথা? ওই যে, সে তো এতক্ষণ ইন্দ্রেনিদির সঙ্গেই লেকের ধারে আর পুলের উপরে মেঘ কুয়াশার মাঝে লুকোচুরি খেলেছে জমিয়ে। থাক। এটাও ওর জীবনের একটা সিক্রেট হয়েই থাক।
বৃষ্টিটা ধরেছে। টেরাসে এসে রেলিঙের ধারে দাঁড়াল জিজো। সন্ধ্যা নেমেছে। এখনও উড়ে চলেছে ইন্দ্রেনি পুলের ঝলমলে রঙিন পতাকাগুলো। সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল ও, ‘মিস ইউ দিদি। প্রমিস করছি আর কখনও ভয় পাব না। লাইফে যাই আসুক তাকে হাসিমুখে ফেস করব’ তারপরই হাতের ক্যাডবেরিটার দিকে চেয়ে মনটা খুশিতে ডগমগ হয়ে গেল ওর। ইস, নাড়ু গোল্লা বিনু শান্তিরা ক্যাডবেরি খেতে কী যে ভালোবাসে!
----------
ছবি - দেবপ্রিয় হোড়, উইকিমিডিয়া কমনস

4 comments: