Showing posts with label রম্যাণী গোস্বামী. Show all posts
Showing posts with label রম্যাণী গোস্বামী. Show all posts

গল্প:: সাপের ভাষা সাপের শিস - রম্যাণী গোস্বামী


সাপের ভাষা সাপের শিস
রম্যাণী গোস্বামী


“এখানে বুঝলেন না দিদিমণি? মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে আর সাপের উপদ্রব বাড়ছে। তবে ভয় নেই। ওরা সচরাচর কাটে না। শুধু থাকে আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। হুম, যার যেমন কর্মফল সে তাই ভোগ করবে এই তো প্রকৃতির নিয়ম
জগদীশবাবু নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কথাটা বলে একটা শ্বাস ফেলে কড়ে আঙুল দিয়ে নিজের বাম কান খোঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু আমি কি ঠিক শুনলাম? সাপ? উনি সাপই বললেন? টের পেলাম ওঁর কথায় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা গলন্ত আইসক্রিমের মতো কী যেন সড়সড় করে নিচের দিকে নেমে চলে গেল। হাতের থিন অ্যারারুট হাতেই ধরা থাকল। ওটা চায়ে ডুবোতে ভুলে গিয়ে আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম জগদীশবাবুর ভাঙাচোরা মুখের দিকে। সেদিকে খেয়াল হতেই উনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
“আরে রে, এই দেখুন কাণ্ড! চা যে জুড়িয়ে গেল। নিন নিন। ভারী ব্যস্ত হাতে উনি কাপসমেত প্লেটটা তুলে ধরলেন আমার সামনে। বিগলিত মুখে বললেন, ফার্স্টক্লাস চা বুঝলেন? বিশুর দোকান থেকে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে আনানো বিশেষ অতিথি-টতিথিদের জন্য। তা ইয়ে আপনারা হলেন গিয়ে শহরের মানুষ। পাড়াগাঁয়ের সামান্য যত্নআত্তিতে কি আপনাদের মন পাওয়া যায়? কী? দিদিমণির সাপে ভয় আছে মনে হচ্ছে?
ভাঙাচোরা মুখখানা আরও কিছুটা কুঁচকে ভদ্রলোক মিটিমিটি হাসলেন আমার বিস্ফারিত চোখের দিকে তাকিয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের ঘন অন্ধকারের আড়াল থেকে নাম না জানা কোনো পাখির বিচিত্র এক ডাক আমার কানের পর্দা ভেদ করে বুলেটের মতো ঢুকে পড়ল মস্তিষ্কে। একটু কেঁপে উঠতেই হাতের বিস্কুট আলগা হয়ে খসে পড়ে মাটিতে।
প্রথমটা দারুণ লজ্জিত হলাম আমি। তারপর একটু ঝুঁকে ভাঙা টুকরোগুলো তুলতে যেতেই হাঁ হাঁ করে ওঠেন জগদীশবাবু।
“আহা করেন কী? এমন দুমদাম করে যখন তখন মেঝেতে হাত-ফাত দেবেন না যেন। আগে ভালো করে দেখে নেবেন। সকালে ঘুম ভাঙার পর বিছানা ছাড়ার সময় ফস করে মাটিতে পা দেবেন না। দেখে-টেখে নিয়ে তারপর। হ্যাঁ? খুউব সা-ব-ধা-ন!”
শেষের শব্দদুটোয় অস্বাভাবিক জোর এনে ভদ্রলোক বলেন, “সর্বত্র তেনাদের বাস। ঘরে দুয়ারে বাইরে পুকুরঘাটে বাজারহাটে, কোথাও গিয়ে একটু শান্তি নেই। সরু মোটা লম্বা বেঁটে কালো ধলা পাটকিলে, রংবেরং-এর সব। বুঝলেন না? যত দিন যাচ্ছে ওরা দলে খালি বাড়ছে
ঘন সর পড়া দুধ চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে টের পেলাম যে আমার জিভ কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। শাড়ির তলায় পা দুটো কাঁপছে তিরতির করে। ভয়ার্ত চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে একবার মনে হল পা দুটো তুলে চেয়ারে বাবু হয়ে বসার কথা। তারপর সেটা এই পরিবেশে একেবারেই মানানসই হবে না ভেবে চুপ করে বসে থাকলাম। কিন্তু দু’পায়ের হাঁটুতে ডান হাতের তালু চেপে ধরেও ওই কাঁপুনিটাকে বাগে আনা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে আমার কাছে।
“বাইরে ওটা কার ডাক ছিল?” জগদীশবাবুর ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা চুল আর ভাঙাচোরা মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম।
“ওটা? ওহ,” উনি নড়েচড়ে বসলেন আর মুখটাকে অবিকৃত রাখার চেষ্টা করতে করতে বললেন, “ও কিছু না। হুতোম প্যাঁচা ডাকছে। বটগাছের কোটরে বাস ওদের। নাহ, রাত অনেক হল। সাড়ে ন’টা। আমি বরং ভেতরে গিয়ে দেখি আপনার খাবারের ব্যবস্থা কতদূর কী হল। আমার স্ত্রী একা মানুষ। একটা মেয়ে হয়েছিল। বেঁচে থাকলে তা এই আপনার বয়সিই হত... টুকটাক রান্নাবান্না, ঘরের কাজে সে তার মাকে একটু সাহায্য করতে পারত। বসেন। আমি দেখে আসি। আপনি ইয়ে, পা-টা তুলেই বসেন দিদিমণি
শেষ বাক্যটার উপরে বেশ খানিকটা জোর দিয়ে জগদীশবাবু বসবার ঘরের দরজার পর্দা ঠেলে ভিতরে চলে যান। আমার চোখ তখন ঘোরাফেরা করে বেড়ায় ঘরের ভিতরের আসবাবগুলোর উপর। মলিন একটা তক্তপোশএককালে ধবধবে ছিল, চিকনের কাজ করা, একটা না-সাদা ঢাকনায় মোড়া নড়বড়ে সেন্টার টেবিল। দুটো ঘুণে ধরা চেয়ার। যার একটায় আমি বসে রয়েছি এখন হাঁটু মুড়ে। টেবিলের উপরে হ্যারিকেনটা দপদপ করছে। মনে হচ্ছে ওটার তেল ফুরিয়েছে। ওর কাচে ময়লা জমেছে। পরিষ্কার করা হয়নি দীর্ঘদিন। আলোটা তাই অদ্ভুত গাঢ় এক বিষণ্ণতার জন্ম দিয়েছে গোটা ঘরটায়।
জগদীশবাবু এই অঞ্চলের একজন মাতব্বর স্থানীয়। আমি যে নিশিগঞ্জ জুনিয়র হাই স্কুলে ভূগোলের প্যারা টিচারের কাজ নিয়ে এসেছি, উনি সেই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার। স্কুলের মাঠের পাশেই আমার থাকার ব্যবস্থা করেছে ম্যানেজিং কমিটির লোকজন। সঙ্গে ক্লিকস স্টোভ, ব্যাগে চাল ডাল আলু আর খুদে প্রেশার কুকারটাও আছে। রাতে খিচুড়ি জাতীয় কিছু বানিয়ে ফেলাই যেত, কিন্তু এই জগদীশবাবুই জোরজার করে টেনে আনলেন আমাকে নিজের ডেরায়। একা একটি তরুণীকে পাড়াগাঁয়ে চাকরি করতে আসতে দেখে উনি হয়তো স্তম্ভিত। আসলে সত্যিই একা আসার কথা ছিল না আমার। মা আসবে সঙ্গে সব ঠিকঠাক লাস্ট মোমেন্টে বাবলুটার জ্বর এল। অমনি আটকে গেল মায়ের আসা। যদিও মায়ের পক্ষে বেশিদিন ভাইকে ফেলে আমার কাছে পড়ে থাকা সম্ভব নয়। ওর তো স্কুল পড়াশোনা খেলাধুলো আছে, তাই না? এই দুটো মানুষের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই তো মাস্টার্স করেই একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে...
হঠাৎ একটানা শোঁ শোঁ শব্দে আমার মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি কেঁপে উঠল। অদ্ভুত ওই শব্দটা আসছে জানলার বাইরে ডোবার দিকটা থেকে। এ কেমন শব্দ? ঝড় উঠলে যেমন হয়। কিন্তু মাটির বুকে কি এমন ঝড় ওঠে? এ যে অসম্ভব!
“ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আরে ও কিছু না। জোড়া সাপের আনশান কাণ্ড আর কী!”
চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি জগদীশবাবু কখন এসে তাকিয়ে আছেন সটান আমারই দিকে। হ্যারিকেনের স্তিমিত আলোয় ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। কী যেন বলতে চায় তারা। বেশীক্ষণ সেই চাহনির দিকে তাকিয়ে থাকলে কেমন অসোয়াস্তি হয়। আমি চোখ সরিয়ে নিয়ে বললাম, “জেঠিমাকে একটু তাড়াতাড়ি দিতে বলুন না। এতটা পথ ফেরা আবার, সেই তো আপনাকে কষ্ট দেওয়া... আচ্ছা, এখানে কি সন্ধ্যায় প্রায়ই এমন পাওয়ার কাট হয়?”
জগদীশবাবু আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। দেখলাম যে তাঁর দৃষ্টি এখন ঘুরে গেছে জানলার দিকে। ডোবার আঁধারের দিকে তাকিয়ে উনি বিড়বিড় করছেন। বাইরের সেই ঝড় বলে ভ্রম হওয়া শব্দটা এখন কিছুটা ম্রিয়মাণ। সে আওয়াজ ছাপিয়ে আমার কানে ভেসে এল জগদীশবাবুর ভাঙা গলার স্বর, “সাপের ভাষা, সাপের শিস, ফিসফিস ফিসফিস... সাপের ভাষা, সাপের শিস, ফিসফিস ফিসফিস...”
কোথায় যেন শুনেছি না এই লাইনটা? ছোটোবেলায় পড়া কোনো গল্পে? হ্যাঁ ঠিক। ঠিক। আহ্‌, কোথায় যেন? আমি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে যত মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম ততই যেন গল্পটা হাত ফসকে আরও দূরে পালাতে থাকল আমার কাছ থেকেমাথার মধ্যে শুধু জেগে রইল ওই শোঁ শোঁ শব্দ। আর সব ফাঁকা।


গতরাতে খাওয়াটা নেহাত মন্দ হয়নি। জগদীশবাবুর স্ত্রী খুব যত্ন করে থালায় চার-পাঁচটা আইটেম সাজিয়ে এনেছিলেন। সব নিজে হাতে রেঁধে এনেছেন। বাইরের ফরমায়েশি রান্না নয়। পুকুরের মাছ। এ খাবারের স্বাদই আলাদা। তেল কই আর বাটা মাছের সর্ষে রসা দিয়ে ভাত মেখেই আমার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সমস্যা হল নিজের আস্তানায় ফিরে এসে রাতে ঘুমের। নতুন জায়গায় এটা হবে আমি জানতাম। তাই ব্যাগে করে দু-তিনটে গল্পের বই নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু মোমের আলোতে বেশিক্ষণ বই পড়া যায় না এক। দুই, কেন যেন রাতে আমি কিছুতেই বইয়ের পাতায় মন দিতে পারছিলাম না। একটা বিজাতীয় শিসের শব্দ - কখনও ঘরের টালির চালে, কখনও বাইরে কুয়োপাড়ে। যা আমাকে এক মুহূর্ত স্বস্তি দেয়নি। সমস্ত রাত বিনিদ্র কাটিয়ে ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল।
ঘুম যখন ভাঙল তখন ঘড়িতে ন’টা কুড়ি। ইস, কী ভয়াবহ! আজ না আমার জয়েনিং? মা তো কাছে নেই যে ডেকে দেবে। তাড়াতাড়ি মাথায় জল ঢেলে তৈরি হয়ে নিলাম। স্টোভ জ্বেলে ইনস্ট্যান্ট নুডলস বানিয়ে কোনোমতে গিলে ফেলে এসে হাজির হলাম স্কুল চত্বরে।
ছোট্ট স্কুল। নির্ঝঞ্ঝাট। পাঁচ জন মাত্র মেল টিচার। দু’জন নন টিচিং। আমিই একমাত্র ফিমেল স্টাফ। তাই বেশ আলাদা রকমের খাতির। স্টুডেন্ট বলতে খুদে খুদে ক’টা ফুটফুটে শিউলি ফুল। হাঁ করে অবাক হয়ে দেখছে শহুরে দিদিমণিকে। ওদের সঙ্গে ভাব জমাতে আমার লাগবে ঠিক পনেরো মিনিট। মেজাজটা বেশ ফুরফুরেই ছিল, কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না একটা কারণে।
এমন এক বীভৎস দৃশ্য দেখলাম যা দেখার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ বাকিদের কোনো হেলদোল নেই। গা সওয়া কেমন। আশ্চর্য! কী দেখলাম সেটা বলি। ওই স্কুলবাড়ির পিছন দিকটায় একটা সরু নালা। তারপরেই জঙ্গল ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা পতিত জমি। স্টাফরুমে আমি যেদিকটায় বসেছি সেই জানলা দিয়ে জমিটার বেশ কিছুটা ফাঁকা অংশ স্পষ্ট দেখা যায়। ফাইভের সিলেবাসে চোখ বোলাতে বোলাতে একটা শব্দে ঘাড় তুলে ওই অংশটার দিকে তাকিয়েই আমার শরীরে যেন লক্ষ ভোল্টের বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে গেল। দেখলাম চারটে মিশমিশে কালো দীর্ঘকায় সাপ দুটো দলে ভাগ হয়ে হাঁ করে পরস্পরকে আক্রমণ করেছে। প্রচণ্ড হিসহিস শব্দে মাথা তুলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ওরা বীভৎস কামড়াকামড়ি করছে। মাঝে মাঝে অবসন্ন হওয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে থপ করে বসে পড়ছে জমিতে। পর মুহূর্তে ফোঁস করে শরীর মুচড়িয়ে ছিটকে উঠছে। সে যে কী ভয়ানক গা গুলিয়ে ওঠা দৃশ্য! তার সঙ্গে চলছে তীব্র ফোঁসফোঁসানি। আমার পেটের ভিতরে সকালের নুডলসগুলোও মনে হল নড়াচড়া করছে। কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে টেবিলের উপরে মাথা রেখে আমি প্রায় অচেতন হয়ে পড়লাম। দিব্যি টের পেলাম যে স্টাফরুমে উপস্থিত দু-একজন শিক্ষকের কৌতূহলী দৃষ্টি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমায়। কিন্তু প্রথম আলাপের সংকোচ কাটিয়ে উঠে তাঁরাও কিছু বলতেও পারছেন না। যদিও তখন সে সব নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না।
তখনই মনে মনে স্থির বুঝেছিলাম যে এখানে চাকরি করা অসম্ভব আমার পক্ষে। নো, নেভার। ফের কঠিন সংগ্রাম লেখা আছে আমার ভাগ্যে।
ওভাবে কতটা সময় কেটে গিয়েছে জানি না। মাথায় কারোর নরম হাতের ছোঁয়া পেয়ে আমি মুখ তুলে তাকালাম। দেখলাম একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন আমার পাশেশিশুর মতো সরল দৃষ্টি তাঁরপুরোনো কিন্তু পরিষ্কার সাদা থান পরনে। টেবিলের উপরে রাখা ছোট্ট এক চায়ের কেটলি, কয়েকটা মাটির খুরি। কাচের বয়ামে বিস্কুট। পরে জানতে পেরেছিলাম যে উনি এক সম্ভ্রান্ত বংশের গৃহবধূ। ওই সময়ের ম্যাট্রিক পাশ। অবস্থার ফেরে এখন নাতির সঙ্গে স্কুল বাড়িতে আর স্টেশন চত্বরে চা ফেরি করেন। সকলেই তাঁকে ভালোবাসে। আমিও এক দেখাতেই ভলোবেসে ফেললাম চা দিদাকে।
গ্রীষ্মের সেই দুপুরটা আজও আমার মনে আছে। উনি স্নেহের সুরে বললেন, “এই বোকা মেয়ে, ভয় কী? ওই যে জমিটা দেখছিস, ওখানে শরিকি বিবাদ চলছিল কাকাতো ভাইয়েদের মধ্যে। চার ভাইয়ের মধ্যে দুটো দলে ভাগ হয়ে লড়াই। সে কী কুচ্ছিত ঝগড়া ঝামেলা রোজ রোজ। অতিষ্ঠ হয়ে যেত পাড়ার সকলে। বিষ, ভয়ানক বিষে ভরে গেছল ওদের মন। তারপর এক মোরগ ডাকা ভোরে হঠাৎ চারজনই উধাওকেউ বলে বাইরের কোনো শত্রুর কাজ। জমির লোভ কার নেই বল তো? মেরে পদ্মদিঘির পাঁকে পুঁতে দিয়েছে। অত বড়ো দিঘি, কে যাবে খুঁজতে? আবার কেউ বলে, না, ওরা শহরে চলে গিয়েছে। কিন্তু আমি জানি আসল কারণটা” এবার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন চা দিদা, “চার-চারটে জ্বলজ্যান্ত ছেলে একসঙ্গে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে? হয় এটা?
“তাহলে?” আমার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল প্রশ্নটা। তারপরেই ধাঁ করে মনে পড়ে গেল গতকাল রাতে বৃদ্ধ জগদীশ মুখুজ্জের বলা কথাগুলো - সাপের ভাষা, সাপের শিস! খগম! হ্যাঁ পড়েছিলাম তো গল্পটা কোন ছোটোবেলায়।
হুড়মুড় করে আরও মনে পড়ে গেল - এই এলাকায় মানুষের সংখ্যা কমছে আর সাপের সংখ্যা বাড়ছে। কর্মফল। কীসের কর্মফলের কথা বলতে চাইছিলেন জগদীশবাবু?
উফ, কী অবাস্তব সব ভাবনা আসছে আমার মনে? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?
চা দিদা তখনও বলে যাচ্ছেন নরম স্বরে, “সে কী রে পোড়ামুখী? তুই কালিয় নাগের গল্প জানিস না? সে তো আসলে মানুষ ছিল রে। এক মস্ত রাজা। উশী নগরের রাজা বিষদর্ব্বি দারুণ অহংকারী সেকুটিল বিষে ভরে গিয়েছিল ওর মনটা। এত বিষ কি মানুষ জন্ম ধারণ করতে পারে রে মা? তখন একজন পরম বৈষ্ণবঠাকুর ওকে শাপ দিলেন যে তুই পরের জন্মে নাগ হয়ে জন্মাবি। বিষের পুঁটুলি ভরা বিশাল নাগ
আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল চা দিদার কথা শুনতে শুনতে। বাইরে তখন নিস্তব্ধ এক গ্রাম্য দুপুরবেলা ঘুঘুপাখির বুকের মতো উষ্ণতা মেখে পড়ে আছে অলস হয়েচা দিদার মুখে জর্দা পানের মিষ্টি গন্ধে ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসছে আমার চেতনা। ছোটোবেলায় ঠাকুমার মুখে শোনা মহাভারতের, পুরাণের ঘুমিয়ে থাকা কাহিনিগুলো যেন আড়মোড়া ভেঙে ভেঙে সত্যি হয়ে জেগে উঠছিল ক্রমশ।
পরের মাসে বাড়ির কাছাকাছি একটা উঠতি নার্সিং হোমে ক্লারিকাল পোস্টে জব পেয়ে যাওয়ায় নিশিগঞ্জ ছেড়ে চলে আসি। আর কখনও ফেরা হয়নি ওই সরল মানুষগুলির মধ্যে। বুকের ভিতরে পুরাণকথার প্রাসাদটাকে জিইয়ে রেখে ছোট্ট গঞ্জটা হয়তো এখনও তেমনিভাবেই পড়ে আছে। হয়তো সেখানে কমে এসেছে আরও কিছু মানুষের সংখ্যা। কে বলতে পারে? চারপাশে যেভাবে কিলবিলিয়ে উঠছে ক্ষমতা আর লোভের বিষ, কিছুই বলা যায় না।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গল্প:: সুমেন্দু লেকে লুকোচুরি খেলা - রম্যাণী গোস্বামী


সুমেন্দু লেকে লুকোচুরি খেলা
রম্যাণী গোস্বামী

(১)

আজ বেলা বারোটার মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে একটা বড়ো দল বেড়াতে চলে এল মিরিকে। এইমাত্র দুটো পেল্লাই গাড়ি থেকে বোঁচকা বুচকি সমেত নামতে দেখা গেল বাবা-মা, জেঠা-জেঠি, কাকা-কাকি আর একপাল খুদেদের একটা গ্রুপকেএই, তোমরা মিরিক জায়গাটার নাম শুনেছ তো? এমা, শোনোনি? আচ্ছা বেশ, দার্জিলিং-এর নাম তো শুনেছ নিশ্চয়ই। মিরিক নামের ছোট্ট গ্রামটা ঐ দার্জিলিং পাহাড়ের কাছেই। এবার তাকিয়ে দেখো বড়ো দলটার দিকে। সবার আগে টিকালো নাক লম্বা গড়নের জেঠু তার পাশে বাবা তারপরে বড়োকাকাছোটকা। তারও পরে জেঠিমা মা কাকিমারা। ওদের মাঝে কিচিরমিচির করতে করতে যাচ্ছে ছোটোদের দলনতুন জায়গায় বেড়াতে এসে সবার মনে ফুর্তি আর ধরছে না।
আর সকলের শেষে ধীরেসুস্থে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশটা মন দিয়ে দেখতে দেখতে চলছে ঐ যে শ্যামলা রং-এর ঝাঁকড়া চুল ভাবুক ছেলেটা? দেখতে পাচ্ছ ওকে? ওর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে যে এত ভালোবাসা আর মায়াভরা এই পৃথিবীতে ও যেন ভারি দুঃখী। অবশ্য মন খারাপের যথেষ্ট কারণ আছে মানছি। এখন অক্টোবর মাসের শেষ। দুগ্গা পুজো শেষ। লক্ষ্মী পুজোও শেষ। মানে আনন্দপনার যা যা বাকি ছিল তার প্রায় সবই ফুরিয়ে গেল। একমাত্র কালী পুজোটা বাকি। সে আর কতদিন? তারপর? তারপর আসবে দুটো বিভীষিকা। পরপর হাতে হাত ধরে। নেচে নেচে আর কী। প্রথমটা হল পরীক্ষা। আর দ্বিতীয়টা হল রেজাল্ট! উফ, পরেরটাই বেশি আতঙ্কের। রেজাল্টের ঠিক আগের রাতটা একফোঁটা ঘুমোতে পারে না ছেলেটা। বিছানায় শুয়ে খালি ছটফট ছটফট। কেবলই এপাশ ওপাশ। সবশেষে খাটে বসে জানলা দিয়ে দূরের ওই কাঁঠাল গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভোরের আলো ফুটতে দেখানিজেকে তখন মনে হয় ঠিক যেন ফাঁসির আসামিশেষ বারের মতন যেন মন ভরে আকাশের রঙ বদলটা দেখে নিচ্ছে।
শ্যামলা ছেলেটার নাম যা খুশি হতে পারে। ইচ্ছেমতো বসিয়ে নাও তোমরারন্টু, তীর্থ, বাসব অথবা মিলন, বা অন্য কিছু তোমাদের পছন্দমতোজানো, ছেলেটা কিন্তু বড্ড কোমল মনেরপশুপাখি ভালোবাসে ও ভীষণ। পাড়ার কুকুরগুলো ঝড় বৃষ্টির রাতে আর অন্য কোথাও যায় না আশ্রয়ের খোঁজে। সোজা চলে আসে মল্লিক বাড়ির উঠোনে। কেননা ওরা জানে যে সেখানে ওদের জন্য শুধু মাথার উপরে শেড থাকবে এমন নয়, থাকবে এক টিন লেড়ো বিস্কুট থাকবে পুরোনো কটা কাঁথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে গেলেও দিব্যি ওম হয় যেগুলোতে! আর খুব শীতবৃষ্টির রাতে ওদের জন্য থাকে আরও একটা জিনিস কী তা? এক মালসা কাঠকয়লার আগুন ওটাকে ঘিরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শোয়ার যে কী মজা! ওই সবের আয়োজন করে রাখে এই শ্যামলা ছেলেটা বাড়িতে সাবেক আমল থেকে একজন খুব বুড়োমতো থুরথুরেমতো খুরখুরেমতো কাজের লোক আছে তাকে ওই ছেলে ডাকে টিটি বলে কেন যে এমন নাম দিয়েছে তা কেউই জানে না টপ সিক্রেটওর স্কুলের বন্ধুরাও জানে না তা সেই টিটি আর সে মিলে বড়োদের কারোকে কিছু না জানিয়ে, না ঘাঁটিয়ে এতকিছুর ব্যবস্থা করে নিজের পকেট মানি বাঁচিয়ে। সেজন্যই তো ছেলেটার মাঝে মাঝেই হোমওয়ার্ক মিস হয়ে যায় স্কুলে পড়া ধরার সময় ওকে বেঞ্চের উপরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অঙ্ক খাতার পাতাগুলো ফাঁকা থেকে যাওয়ায় বিভূতি স্যারের লিকলিকে বেতের ছড়ি ফটাস ফটাস করে এসে পড়ে ওর নরম হাতের তালুতে লাল গোলাপি দাগ বসিয়ে দেয় ক্লাশের ফার্স্ট সেকেন্ড বয়রা মুচকি মুচকি হাসে কিন্তু ছেলেটা কাঁদে না একফোঁটাজানলা দিয়ে বাইরে দূরের ওই একঢ্যাঙা তাল গাছের ডালে বাবুই পাখির বাসা বানানো দেখে মন দিয়ে।
     
এখন দলটা বেশ হালকা হয়ে এসেছে দেখা যাচ্ছে। আসলে সবাই ছুটেছে রিসর্টে নিজের নিজের রুম দেখতে। আজ রাতটা এই চমৎকার জায়গাতেই কাটানো হবে কিনা। শুধু যায়নি ওই ছেলেটা। রুম নিয়ে ওর কোনো আগ্রহ নেই বরং ও এখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সুমেন্দু লেকের দিকে। হ্যাঁ, মিরিকে গেলে যে বিশাল লেকটিকে দেখতে পাবে ওরই নাম এটা। চারপাশে নিবিড় পাইন গাছ দিয়ে ঘিরে রাখা অপূর্ব সেই লেক। সারিবদ্ধ গাছের ছায়া পড়ে লেকের জলটাকে দেখায় যেন গাঢ় সবুজ। ওরা যখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে চা বাগান আর নদী আর জঙ্গল পেরিয়ে এখানে উঠে এল তখন ঝকঝকে রোদে ঝলসে যাচ্ছিল পাহাড়ের গায়ের লিলিপুটদের বাড়ির টিনের চাল। আর এখন মাত্র এই আধঘন্টার ফারাকে কোথা থেকে রাশি রাশি মেঘ আর কুয়াশা এসে পাইন গাছগুলোর গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়ছে আদুরে বাচ্চাদের মতন আবদার করছে তাদের গল্প শোনানোর।
বিশাল লেকটার উপরে রয়েছে একটা বাঁকানো সাঁকো। সাঁকোর রেলিঙে দড়ি দিয়ে টানটান করে আটকানো গোলাপি নীল হলুদ সাদা সবুজ রংবেরং-এর কাপড় পতাকার মতো উড়ছে দমকা বাতাসে। গুটিগুটি পায়ে ছেলেটা এসে দাঁড়াল লেকের মাঝ বরাবর পুলের ঠিক মধ্যিখানে। তখনই হঠাৎ এমনিভাবে কুয়াশা এসে জড়িয়ে ধরল সাঁকোটাকে যে সামনে পিছনে আর কিছুই দেখা গেল না। যেন জগতে শুধুই একখণ্ড অসম্পূর্ণ সাঁকো আর ও। আর ওর পায়ের নিচে লেক। কী অদ্ভুত না? ঠিক এমনি সময় ফিসফিস করে কে যেন ছেলেটার নাম ধরে ডাকল। সত্যিই! শুনে প্রথমে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলেও পরমুহূর্তেই অন্যরকম ভালোলাগায় ভরে গেল ওর মন তারপর আবারও মনটা খারাপ হল। ইস, যদি এখানে দাঁড়িয়েই কাটিয়ে দেওয়া যেত বাকি জীবনটা। পরীক্ষা দিতে হত না। রেজাল্টও আউট হত না। ম্যাথস, ফিজিক্স, বায়ো, ধুর ধুর...

(২)

এখানে মধ্যাহ্ন ভোজনের এলাহি ব্যবস্থা। চিকেন মাটন ফিশফ্রাই আইসক্রিম, কী চাও? ওদের রিসর্টটা পাহাড়ের গা লাগোয়া। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় নিচের ঐ লেক। লেকের বুকে বোটিং চলছে। এত উঁচু থেকে মনে হয় যেন রাজহংসের দল নিথর জলরাশিকে কেটে কেটে তিরের মতো এগিয়ে চলেছে। লেকের চারপাশে ছোট্ট টাট্টু ঘোড়ায় সওয়ারি করছে পর্যটকের দল। কী মজাই না লাগছে দেখতেবিরাট ওপেন টেরাসে গোল রংবেরং-এর ছাতার তলায় পেতে রাখা আছে সুন্দর সুন্দর চেয়ার টেবিল। এখানেই ব্রেকফাস্ট থেকে আরম্ভ করে ডিনার সার্ভ করা হয়। ওরা ছাড়া আজ অন্য কারও বুকিং নেই। খুদেরা তাই খুব দামাল হয়ে উঠেছে। শুধু এই ছাদটাই নয়, গোটা পাহাড়টাই আজ ওদের। নিচের লেকটাও, লেকের ধারের চমৎকার ওই ফুলের বাগান, আর ওই যে ঘোড়াগুলো? হ্যাঁ, সব। সব।
“আজ বিকেলে আমরা এখানকার বিখ্যাত বোকার মনেস্ট্রিটা দেখে আসব। মিরিকের সবচাইতে উঁচু জায়গায় আছে ওই মনেস্ট্রি। আর বাচ্চারা কে কে লেকের ধারে হর্স রাইডিং করবে, হাত তোলো...”
ছোটোকাকুর প্রস্তাবে হুল্লোড় উঠল ছোটোদের মধ্যে। শুধু ওই শ্যামলা ছেলেটা কিচ্ছু বলেনি। ও রেলিঙের কাছে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল নিচের লেকের দিকে। কিন্তু একটু পর থেকেই দেখা গেল ওয়েদার খারাপ হয়ে গেছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। তাই সকলকে ঘরের ভিতরে এসে ঢুকতে হল।
“কুছ পরোয়া নেই। পাহাড়ের বৃষ্টি। একটু পরেই কমে যাবে। বউদি, চটপট একটু চায়ের অর্ডার দিয়ে দাও তো
বড়োরা এক ঘরে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে কাচের স্লাইডিং জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছে আর চা পকোড়া খাচ্ছে জমিয়ে। ছোটোরা যে যার মতো অর্ডার করেছে। কেউ পছন্দ করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কেউ বা পনির টিক্কা, আবার কেউ চিকেন মোমো। চেটেপুটে সব সাবাড় করে এখন সকলে মিলে জুটেছে পাশের ঘরে। ল্যাপিতে জোরে জোরে গান বাজছে বিটিএস-এর। এখন এটাই হট ফেভারিট। কেউ কেউ আবার মোবাইলে গেম খেলতে ব্যস্ত। ওদিকে খাওয়াদাওয়ার হুল্লোড়ের মাঝেই সবার নজর এড়িয়ে রিসর্ট থেকে টুক করে বেরিয়ে পড়ল সেই শ্যামলা ছেলেটা। আসলে এখানে আসার পর থেকেই সওয়ারি পিঠে বহন করা ওই পুঁচকে ঘোড়াগুলোকে দেখে ভারি কষ্ট হয়েছে তার। মানুষের ওজন টেনে টেনে কেমন বেঁকে গিয়েছে ওদের শরীর। আচ্ছা, ওরা কি মারও খায়? নয়তো ওদের পিঠে কেন শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতের দাগ? যা দেখলেই বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে কান্নায়।
বৃষ্টিটা এখন ফিসফিস করে পড়ছে। গায়ে লাগে না এমন। যদিও জেঠু অথবা বাবা ওর একা একা বৃষ্টি মাথায় বেরোনোর কথা জানতে পারলে কান টেনে ছিঁড়ে দেবে। প্রতিবার রেজাল্ট বেরোনোর পর যেমন চেঁচায়, তেমনি করে চেঁচাবে ওরা। বলবে - বাঁদর ছেলে একটা, পড়াশোনায় মন নেই, খালি খাওয়া শোওয়া আর রাজ্যের নোংরা কুকুরগুলোকে বাড়ি অবধি টেনে আনা। বলি উঠোনটা কে ধোবে? অথচ কী আশ্চর্য! ও আর টিটি মিলে তার আগেই শলার ঝাড়ু দিয়ে ভালো করে বারান্দা ধুইয়ে দিয়েছে, সেটা জেনেও বড়োরা খালি চেঁচায়। বাকি দাদা দিদি ভাই বোনেরা তুখোড় রেজাল্ট করে ফি বছরসেটাও কি ওর দোষ? কে বলেছে ওদের এত পড়াশোনা করতে? ও নিজে সারাদিন পড়বেই তো নাড়ু গোল্লা বিনু শান্তিদের কে দেখবে, কে আদর যত্ন করবে শুনি?
লেকের গা ঘেঁষে গোল করে ঘিরে আছে পায়ে হাঁটা পথ। হুডি চাপানো মাথা হেঁট করে জ্যাকেটের পকেটে হাত দুটো ঢুকিয়ে ছেলেটা হেঁটে যাচ্ছে সেই রাস্তা দিয়ে। ইতিমধ্যেই রাস্তাটা ভিজে বেশ পিছল হয়ে উঠেছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে মুখ তুললেই দেখা যেত কাঞ্চনজঙ্ঘা। এখন যা মেঘে মেঘে ঢাকা। কিন্তু মেঘের ওপাশে সে তো দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপটি করেওকে ছেড়ে যায়নি কোথাও। শুধু লুকিয়ে আছে। এই যা। তাই ওর মন খারাপ হয় না একটুও একসময় নাকে ঘোড়ার গায়ের আর পথের ধারে ধারে পড়ে থাকা ঘোড়ার পটির দমচাপা জোরালো গন্ধ ভেসে আসতেই ছেলেটা বুঝে গেল যে ও এসে পড়েছে আস্তাবলের দিকটায়। বেশ। এই তাহলে বেচারি দুঃখী ঘোড়াদের ঘরবাড়ি। সন্তর্পণে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল ছেলেটা। খচমচ করে উঠল একটা পুরু কাগজের খামগেলবার জন্মদিনে উপহার পাওয়া টাকাগুলো, সব ও সঙ্গে করে এনেছিল মূলত পাহাড়ের নাড়ু গোল্লাদের জন্যইকিন্তু এখানে এসে মন কেঁদে উঠল ঘোড়াগুলোকে দেখে। এবার সহিসদের খোঁজ করতে হবে। টাকাগুলো বিলিয়ে দিতে হবে সবার মধ্যে। কিন্তু কোথায় কে? আশেপাশে যে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টির জন্য জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা আর থমথমে অন্ধকার। একটু দূরে ঝাপসা হয়ে ফুটে রয়েছে একটা পরিত্যক্ত কন্সট্রাকশন। হঠাৎ সেখান থেকে চার-পাঁচটা ছায়ামূর্তি লাফিয়ে চলে এল ওর ঠিক সামনে।
চমকে উঠল ছেলেটা। ও এক ঝলক দেখেই বুঝতে পেরেছে যে লোকগুলো খারাপ। যদিও কতটা খারাপ তা ওর ধারণাতেও নেই। হিংস্র চাহনির লাল চোখ লোকগুলো বারবার তাকাচ্ছে ওর পকেটের দিকে। হাতদুটো মুঠো করে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে এক পা এক পা করে পিছিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। না। কিছুতেই দেবে না। এ টাকা নাড়ু গোল্লা বিনুদের। মরিয়া হয়ে লোকগুলোও এগোচ্ছে। একবার ধরতে পারলে খামটা কেড়ে নিয়ে ওকে ছুঁড়ে লেকের জলে ফেলে দেবে এমন ভাব। কিন্তু না, তার আগেই ঝড়ের মতন কেউ একজন এসে বদমাইশগুলোর থেকে আড়াল করে দাঁড়াল ছেলেটাকেগায়ে তার সেনার পোশাক। ছোটো ছোটো করে ছাঁটা চুল। অবাক হয়ে গেল শ্যামলা ছেলেটা। এখানে কি তবে কাছাকাছি কোনো সেনা ছাউনি আছে? ছোটকাকে জিজ্ঞেস করতে হবে তো! কিন্তু ও হরি! এ যে দেখি একটা মেয়ে! অনেকটা ওর কাছাকাছি বয়সিই হবে। মেরেকেটে ষোলো সতেরোতার বেশি নয়। অথচ লোকগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ওরা যেন ভূত দেখছে। মেয়েটার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই লাল চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে এল। তারপর কাটা কলাগাছের মতো ঝপঝপ করে মাটিতে পড়ে গেল ওরা। আর নড়ল না।

(৩)

শ্যামলা ছেলেটা যখন রিসর্টে ফিরে এল তখন ছোটকা ঘরের ভিতরে ছোটোদের নিয়ে কুইজের আসর বসিয়েছে। অত হইচইয়ের মাঝে ওকে সেভাবে কেউ লক্ষও করল না। দরজার কাছের বেতের চেয়ারে বসতেই ও শুনতে পেল ছোটকার গলা, “আচ্ছা, এবার একটা কঠিন প্রশ্ন। দেখি তো কে এটা বলতে পারে। বল তো এখানকার লেকের উপরে যে বাঁকানো ব্রিজটা দেখেছিস সেটার নাম কী? কার নামেই বা তৈরি হয়েছে ওটা? বলতে পারলে এই বড়ো ক্যাডবেরি বারটা পাবি কিন্তু নিজে নিজে বলতে হবে। কোনো হেল্প ছাড়া। অ্যাই বান্টি, গুগল করলে কিন্তু খেলা থেকে আউট বলে দিলুম...”
ঘরের ভিতরে পিন ড্রপ সাইলেন্স। শুধু জীবনে এই প্রথমবার নড়ে উঠল শ্যামলা ছেলেটার ঠোঁট। সাধারণত কুইজ জাতীয় জিনিসপত্র সে সযত্নে এড়িয়ে চলে হেরে যাওয়ার ভয়ে। কিন্তু আজ যেন ও অন্য মানুষ। সবাই শুনল ছেলেটা দৃঢ় গলায় বলছে, “আমি জানি ছোটকা। ব্রিজটার নাম ইন্দ্রেনি পুল। শহীদ ইন্দ্রেনি থাপা’র নামে
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল ছোটকা, “কারেক্ট! কিন্তু এটা কি বলতে পারবি যে কে ছিলেন এই ইন্দ্রেনি?”
“পারবপ্রায় আমারই বয়সি টিনএজার একটা মেয়ে। আমার চাইতে দু-তিন বছরের বড়ো হবে খুব জোর। তবে আমার মতো ভীতু নয়। দারুণ সাহসী একজন ফ্রিডম ফাইটার ছিল ইন্দ্রেনি ওই বয়সেই নেতাজির দলে যোগ দিয়েছিল। নিজের গায়ে মাইন বেঁধে ব্রিটিশদের ট্যাঙ্ক জ্বালিয়ে দিয়ে শহীদ হয়েছিল দেশকে ভালোবেসে হাসিখুশি মেয়েটা হয়ে গেল একটা হিউম্যান বম্ব!”
ছোটকা আর কী বলবে, এত অবাক সে জীবনেও হয়নি। বাকিদের হিংসে হিংসে চোখের সামনে দিয়ে ক্যাডবেরির প্যাকেটটা এগিয়ে দিল সে ছেলেটার দিকে। সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, “বেশ বেশ। জিকে পড়ছিস খুব? তাই না জিজো?”
ওহ হ্যাঁ, ছেলেটার নাম জিজো। এতক্ষণ বলা হয়নি তোমাদের। জিজোও একটা কথা বলতে পারবে না কাউকে। না, ভাইবোনেদের নয়, স্কুলের বন্ধুদেরও নয়। কী কথা? ওই যে, সে তো এতক্ষণ ইন্দ্রেনিদির সঙ্গেই লেকের ধারে আর পুলের উপরে মেঘ কুয়াশার মাঝে লুকোচুরি খেলেছে জমিয়ে। থাক। এটাও ওর জীবনের একটা সিক্রেট হয়েই থাক।
বৃষ্টিটা ধরেছে। টেরাসে এসে রেলিঙের ধারে দাঁড়াল জিজো। সন্ধ্যা নেমেছে। এখনও উড়ে চলেছে ইন্দ্রেনি পুলের ঝলমলে রঙিন পতাকাগুলো। সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল ও, ‘মিস ইউ দিদি। প্রমিস করছি আর কখনও ভয় পাব না। লাইফে যাই আসুক তাকে হাসিমুখে ফেস করব’ তারপরই হাতের ক্যাডবেরিটার দিকে চেয়ে মনটা খুশিতে ডগমগ হয়ে গেল ওর। ইস, নাড়ু গোল্লা বিনু শান্তিরা ক্যাডবেরি খেতে কী যে ভালোবাসে!
----------
ছবি - দেবপ্রিয় হোড়, উইকিমিডিয়া কমনস