গল্পের ম্যাজিক:: আল্পসের অলপ্পেয়ে - তন্ময় ধর


আল্পসের অলপ্পেয়ে
তন্ময় ধর

ভোর রাতে অদ্ভুত এক তুষারমানবের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙেছিল। যেন বরফের রাজ্যে এক পাষাণমূর্তি হয়ে বন্দি হয়ে রয়েছি। কথা বলার চেষ্টা করছি, মুখ দিয়ে শব্দ বার হচ্ছে না। অদৃশ্য কোন এক বস্তুর অদ্ভুত সুবৃহৎ ছায়া এসে পড়ছে মুখের ওপর। ঘুম ভেঙে বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম
‘নাহ, আর দেরি করলে চলবে না। খেয়ে-দেয়ে চটপট তৈরি হয়ে নিতে হবে। জীবনে প্রথমবার ইউরোপ যাচ্ছি। ভিসার ঝামেলায় কাল রাত্রি পর্যন্ত যাত্রা নিয়ে সংশয়ে ছিলুম। একটু আগে আগেই এয়ারপোর্ট যেতে হবে’ নিজের মনে কত কথা বলতে বলতে জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিলাম।
বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলাম সময়ের আগেই। দুপুরের মিলানগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ঘন নীল আকাশের বুক চিরে উড়ে চলল জাগ্রোস-পীরেনিজ পর্বতের উপর দিয়ে, কৃষ্ণ সাগর-কাস্পিয়ান সাগরের নীল জলের উপর দিয়ে। কিন্তু বলকান সমুদ্রের পারে গিয়ে সে পড়ল ঘন কুয়াশা আর আগ্নেয়গিরির ছাইভরা মেঘের মধ্যে। রাডারের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হল। বিমানসেবিকা এবং পাইলটেরা অনেক সান্ত্বনা দিলেও শেষে চরম সত্যটা জানাতে বাধ্য হলেন, বিমানকে জোর করে অবতরণ করাতে হবে। ইতালি-অস্ট্রিয়া সীমান্তে কোন এক পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ নাকি রয়েছে। শুধু চোখে দেখে, চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে পাইলট নাকি সেখানেই নামাবেন।
তারপরে কী হল, তা আর স্মৃতিতে নেই। জ্ঞান হারিয়েছিলাম বোধ হয়জ্ঞান যখন ফিরল, তখন সামনে শুধু বরফ আর বরফ। দুর্বল শরীরেই উঠে দাঁড়ালাম। গায়ে এই চামড়ার আলখাল্লাটা কোথা থেকে এল বুঝছি না। আমার সঙ্গে কারা ছিল, তারা কোথায়, আমি কোথায় যাব, কীভাবে যাব – কিচ্ছু বুঝছি না, কিছু মনেও পড়ছে না। নিষ্প্রভ এক সূর্যের আলো কুয়াশা আর বরফে পড়ে অন্যরকম একটা পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। যতদূর চোখ যায়, কোনও জনপ্রাণী তো দূর অস্ত, একটা গাছ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। এগোব কোন দিকে? কোনটা কোন দিক? কোন দিকে পথ? বোঝার কোনও উপায় নেই। একবার চিৎকার করলাম। গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা ঘড় ঘড় শব্দ বার হল।
বহুক্ষণ চলার পর পথের মতো একটা কিছু পাওয়া গেল। তার দু’পাশেও শুধু বরফ আর পাহাড়হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তিতে খিদেয় কেমন একটা অদ্ভুত ঝিমুনি আসছিল। হঠাৎ পেছন থেকে জলদগম্ভীর স্বর শুনে চমকে উঠলাম - ‘সাবধান, ডান দিকে চোরা খাদ রয়েছে’। তাকিয়ে দেখি, প্রৌঢ় এক ইউরোপীয় মানুষ। দাড়ি-গোঁফ আর বাদামি রঙের প্রাচীন পোশাকে চেহারাটা যেন প্রাচীন তুষারমানবের মতো লাগছে। ভদ্রলোক আমার চিন্তা কীভাবে যেন ধরতে পেরে বললেন, “কী, তুষারমানব মনে হচ্ছে? নাকি ভিনগ্রহী মনে হচ্ছে?”
আমার মুখ দিয়ে একটা ঘড় ঘড় শব্দ বেরিয়ে এল আবার। আমি কি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি নাকি?
“ভয়ের কিছু নেই। আপনার স্মৃতিশক্তি, বাকশক্তি সব ফিরে আসবে। তবে সবার আগে কনফিডেন্স ফেরাতে হবে। এই জায়গাটা একটা ডেথ সার্কল। এখানে ঢুকলে কেউ বেরোতে পারে না। আর এই জায়গাটার আশেপাশেই বারবার ভিনগ্রহী মহাকাশযান দেখা গিয়েছে, প্রত্নমানব ওট্‌জির অভিশাপে মারা যাওয়া মানুষদের দেখা গিয়েছে এবং বহু মানুষ জাস্ট উবে গিয়েছেএখানে খুব কাছেই একটা শিলালেখ আছে। দু’হাজার বছরের পুরোনো রোমান শিলালিপি। ওখানেই এই ভয়ঙ্কর জায়গা সম্পর্কে প্রাচীনতম উল্লেখ আছে। বেরিয়ে যাওয়ার পথনির্দেশ আর ম্যাপ আছে। সেটা খুঁজে পেলে এখান থেকে বের হওয়া যাবে। কিন্তু...”
“কিন্তু কী?”
“কিন্তু তাতে রহস্যগুলো রয়েই যাবে। আমি প্রায় এক মাস ধরে এখানে ঘুরছিসঙ্গের রসদ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে সব রহস্য সমাধান করে বেরোতে না পারলে...”
“এক মাসেও যা পারেননি, তিন-চার দিনে তা পারবেন? আর আগে তো নিজে প্রাণে বাঁচুন, তারপর রহস্য সমাধান করবেন...”
“ইয়ং ম্যান, নিজের প্রাণে বাঁচার প্রশ্ন নয়। আই হ্যাভ লস্ট মাই ওনলি চাইল্ড অ্যান্ড ওয়াইফ হিয়ার। প্রায় এক বছর আগে ক্রিসমাসের ছুটিতে আইস স্কেটিং করতে এসে ওরা এখানে হারিয়ে যায়। ওরা যে এখানে বেঁচে আছে, তার বহু প্রমাণ আমি পেয়েছি
“আমি দুঃখিত। আপনার স্ত্রী-পুত্র হারানোর কথা না জেনে আপনাকে আঘাত করে ফেলেছি বলে...”
“ঠিক আছে। অজ্ঞাত ভুলে অপরাধ হয় না। এনিওয়ে, এতক্ষণে পরিচয়টাই করা হয়নি। আমার নাম অ্যামেদিয়াস গিৎজি। পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। শখ অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে। সেই শখই কাল হল...”
“আমি ঋতবান গোস্বামীকাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সপ্লোরেশন জিওলজির গবেষক। রহস্য-রোমাঞ্চে আমার চিরকালের আকর্ষণ। পুরাতত্ত্বেও...”
“তাহলে আর দেরি কেন? এই ম্যাপটা দেখুন, অনেক কষ্ট করে বানিয়েছি। আর চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখুন কোনও অস্বাভাবিক পাথর দেখতে পাচ্ছেন কিনা? আমরা খুব কাছাকাছি আছি। বাকি সব জায়গা তল্লাশি হয়ে গিয়েছে। যা আছে, এখানেই আছে...”
সূর্যের আলোর তেজ কমে এল।
“এখানেই তাঁবু খাটাতে হবে রাত কাটানোর জন্য,” অ্যামেদিয়াস পিঠের ব্যাগ নামিয়ে বরফ সামান্য খুঁড়েই চমকে উঠলেন, “ইউরেকা। ইউরেকা। এই তো সেই শিলালেখ পেয়েছি” বরফ সাফ করে তরতর করে পড়তে শুরু করলেন, “এখান থেকে দু’কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে একটি রাস্তা ডান দিকে গিয়েছে। ভয়ঙ্কর দুর্গম ওই রাস্তার শেষে এক নগরীর ধ্বংসাবশেষ আছে। সেখানেই অতীত-ভবিষ্যতের অনেক সমস্যার সমাধান আছে। এই মৃত্যুবৃত্ত থেকে বেরোনোর পথও আছে” প্রাচীন রোমক ভাষালিপি আমাকে বোঝাতে বোঝাতে থেমে গেলেন, “ব্যস, আর কিছু লেখা নেই। একটা দুর্বোধ্য নকশা আঁকা আছে
“দেখি!” ভালো করে দেখে আমি চমকে উঠলাম, “এত নভশ্চর, মহাকাশযান, গ্রহমন্ডলী - সব অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল নকশায় ভর্তি!”
“আমিও তো তাই দেখছি। এই শিলালেখের কথা একজন পুরাতত্ত্ববিদই বলেছিলেন। বাট হি মিসড দিস ড্রয়িং। নাকি ইচ্ছে করেই চেপে গিয়েছেন? নাকি কোনও কারণে কোনও ভয়ে?”
“এখনও তো আলো আছে। দু’কিলোমিটার হেঁটে ওই নগরীর ধ্বংসাবশেষে পৌঁছোবেন নাকি?”
“দু’কিলোমিটার নয়। দু’কিলোমিটার দূরের ঐ বেন্ড থেকেই ভয়ঙ্কর রাস্তা শুরু হচ্ছে। বাট এগিয়ে থাকা ভালো। খাবার একদম ফুরিয়ে এসেছে। আর এখন থেকে দু’জনকে খাবার শেয়ার করতে হবে। আমার সঙ্গে অবশ্য বন্দুক আছে। পাখি বা খরগোশ শিকার করা যাবে। বাট দে আর রেয়ার ইন দিস সার্কল। গত এক মাসে মাত্র চার বার...”
“আমি দুঃখিত যে আমি আপনার এই দুঃসময়ে আপনার বোঝা হয়েছি
“না। আপনি আমায় উদ্ধার করতেই এসেছেন। আমার হৃদযন্ত্রে সমস্যা আছে, শ্বাসটানের সমস্যা আছে। কেউ সঙ্গে না থাকলে মুশকিল,” অ্যামেদিয়াস আরও কী একটা বলতে গিয়েও যেন থেমে গেলেন। তারপর বললেন, “না। বলছি যখন, সবটা বলেই ফেলি। গত এক মাসে বেশ কয়েকটা রাত্রে আমার মনে হয়েছে, কেউ যেন আড়াল থেকে আমায় দেখছে। আমার ওপর হামলারও চেষ্টা হয়েছে বার কয়েক। অনেক চেষ্টা করেও হামলাকারীর টিকিটিও দেখতে পাইনি...” আমার মুখের দিকে চেয়ে ফ্যাকাশে-মুখ দেখে বললেন, “ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? চিন্তা নেই, আমার হাতে যতক্ষণ বন্দুক আছে, সব হামলা আটকে দেব। শ্বাসটান শুরু হলেও আমার হাত ঠিক থাকে। তবে আজকাল বয়সের দোষে অনেক কিছু খেয়াল করতে পারি না। আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ রাখবেন। বেগড়বাই কিছু দেখলেই...
কথা বলতে বলতে আমরা দুই পাহাড়ের কাছাকাছি চলে এসেছি। দুর্গম এক চিলতে খাড়াই পথের ওপর অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় ঝুলে রয়েছে পাথর। ভূতত্ত্বের গবেষক হিসেবে দেশ-বিদেশের অনেক বিপজ্জনক গিরিখাত দেখেছি, কিন্তু এমন ঝুলন্ত পাথর, এমন ইনস্টেবিলিটি কখনও দেখিনি। যেন এই মুহূর্তেই সব কিছু ভেঙে পড়বে মাথায়।
“কোনোক্রমে এটা পেরিয়েই আমরা তাঁবু খাটাব। তাহলেই নিশ্চিন্তি,” অ্যামেদিয়াস মুখে সামান্য হাসি ফোটালেন।
কীভাবে নিশ্চিন্ত হচ্ছেন বুঝলাম না। চারপাশের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, ভয়ঙ্কর কিছু যেন ওত পেতে রয়েছে। পথ চলতে বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। শেষে আমি থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম, “মিস্টার গিৎজি, বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, আমাদের একটানা কেউ দেখে চলেছে আড়াল থেকে। ব্যাপারটা অত্যন্ত অস্বস্তিকর...”
“মিস্টার গোস্বামী, আই অ্যাম গোয়িং থ্রু সেম কন্ডিশন কনস্ট্যান্টলি ফর লাস্ট ওয়ান মান্থ। এখানে এসে আরেকটু বেশি অস্বস্তি হচ্ছে, মাথার শিরাগুলো দপ্‌দপ্‌ করছে,” বলতে বলতে ব্যাগ থেকে পিস্তল বার করলেন, “চারদিকে ভালো করে নজর রাখুন
গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে আমরা সেই পিচ্ছিল খাড়াই পথে এগিয়ে চলেছি। সূর্যের আলো একেবারে কমে গিয়েছে। হু-হু করে প্রবল ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। এমন পাহাড়ি পথে চড়া তো দূরের কথা, কল্পনাও করিনি আগে। প্রবল ধকলে হৃদ্‌পিন্ডের ধুকপুক এত বেড়ে গিয়েছে, এত জোরে শ্বাস নিতে হচ্ছে, পায়ের পেশীতে এমন ব্যথা চিড়িক দিয়ে উঠছে যে বলতে বাধ্য হলুম, “মিস্টার গিৎজি, দু’মিনিট বসতে হবে আমায়। আর পারছি না” রাস্তার বরফ-মাখা পাথরের ওপরই বসে পড়ে দীর্ঘশ্বাস টানতে শুরু করলাম।
অ্যামেদিয়াসও হাঁফাচ্ছেন, “আরও অন্তত আধ ঘন্টা হাঁটতে হবে মনে হচ্ছে। এই খাড়াই থেকে না নামলে তাঁবু খাটানোর উপযুক্ত জায়গা পাওয়া যাবে না
একেবারেই ছোট্ট একটা উপত্যকায় তাঁবু খাটানো হল। আগুন জ্বালিয়ে দ্রুত ফ্ল্যাট ব্রেড বানানো শুরু হল। শক্ত চীজ ভেঙে গরম ব্রেড দিয়ে তাই খাওয়া হল। রাত বাড়তেই জ্বর এল অ্যামেদিয়াসের। ওষুধপত্র কিচ্ছু নেই, খাবার এবং জল তলানিতে ঠেকেছে। মহা চিন্তায় পড়ে গেলামজ্বরের ঘোরে কিনা কে জানে, অ্যামেদিয়াস প্রলাপ বকতে শুরু করলেন, “আর বোধহয় কিছু হবে না। পাঠক, আমার সঙ্গে আপনি কেন এলেন? আপনার অন্য রাস্তায় চলে যাওয়া উচিত ছিল। ওট্‌জির ভাগ্যই লেখা আছে আমাদের কপালেবরফে ঢাকা পড়ে যাব আমরা। লেটস স্টার্ট, ভবিষ্যৎ-পৃথিবীর জন্য কিছু লিখে যাই চলুন, কিছু নকশা এঁকে যাই চলুন...”
কথায় বিরক্ত হয়ে তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই চোখে পড়ল ব্যাপারটা। ক্যাম্পফায়ারের প্রায় নিভে যাওয়া আগুনে দেখলাম, মাত্র কয়েক হাত দূরে কারও পায়ের চাপে বরফ গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ নেই, অথচ বরফ ভেঙে যাচ্ছে পায়ের চাপে। প্রথমে মনে হয়েছিল কোনও ইঁদুরজাতীয় প্রাণী বুঝি। কিন্তু কাঠের আগুন ছুঁড়ে দিতেই একটা চাপা চিৎকার করে যে অদৃশ্য প্রাণীটা সরে গেল তার আকৃতি প্রায় মানুষের মতোই হবে।
তাঁবু থেকে অ্যামেদিয়াস কখন যেন পিস্তল হাতে বেরিয়ে এসেছেন, “ইয়েস, আমিও অংশত দেখেছি। উত্তেজনায় জ্বর পালিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, এটাই সেই ভয়ঙ্কর প্রাণী যার কথা ওই পুরাতত্ত্ববিদ বলেছিলেন। তার মানে ওই নগরীর ধ্বংসাবশেষ খুব কাছাকাছিই আছে...”
“ছাড়ুন তো নগরীর কথা। আগে এই অদৃশ্য শত্রুকে সারা রাত কীভাবে আটকাবেন, সেটা ভাবুন...”
অ্যামেদিয়াস আমার হাত ধরে তাঁবুর ভেতর টেনে নিয়ে এলেন, “চুপ। বেশি চেঁচামেচি করবেন না। শত্রু জানে না, আমাদের হাতে কী কী অস্ত্র আছে। আমাদের কতটা শক্তি, তাও জানে না। ভাষাও বোঝে না। কাজেই আমরা যে ভয় পেয়েছি, সেটা বুঝতে দেওয়া চলবে না। বরং আমরা যে খুব সতর্ক রয়েছি, সেটা জানান দিতে হবে।”
“বেশ। কিন্তু একটা জিনিস আমার মাথায় ঢুকছে না। আপনি তখন ভিনগ্রহ, তুষারমানবের অভিশাপ, মৃত এবং নিরুদ্দিষ্ট মানুষের বহু রহস্যের সমাধানের কথা বললেন। আর এখানে এসে সেটা এক ভয়ঙ্কর অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি দাঁড় করাল...”
“এই অদৃশ্য শত্রুই সব রহস্যের প্রাণভোমরা। ও এই মৃত নগরীর অধিপতি। আমি পুরোপুরি শিওর নই। তবে রোমান আমলেরও অনেক আগে প্রত্নপ্রস্তর যুগ থেকে এই ভিনগ্রহী ভুলভুলাইয়া তৈরি হয়ে রয়েছে এখানে। লোক পথ ভুলে এই নগরীতে আসে। আর ফিরতে পারে না। কাঁচপোকা যেমন অ্যানেস্থেশিয়া করে পোকাদের বন্দি করে রাখে তেমনই। সেই বন্দিরা জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে এক অদ্ভুত অবস্থায় থাকে। ওই অধিপতি বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করে ওদের ওপর। বাইরের পৃথিবীতে শুধু ওই বন্দি মানুষগুলোর চিৎকার পৌঁছায়। সেটা শুধু অচেনা আগন্তুককে ভুলিয়ে আনার জন্য। একা মানুষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে একদল মানুষ এসে বন্দি হয়েছে এই জালে। আপনি বিভূতিভূষণের লেখা ‘অভিশপ্ত’ গল্পটা পড়েছেন?”
চমকে উঠলাম। বিভূতিভূষণের গল্প এই ইতালিয়ান পড়ল কী করে?
উনিই মুখের ভাব দেখে সন্দেহ নিরসন করলেন, “আগে আপনাকে বলা হয়নি। দেশ-বিদেশের সাহিত্য পড়ার ভীষণ শখ আমার। বিশেষ করে ছোটো গল্প। ‘অভিশপ্ত’ গল্পটা এত ভালো লেগেছিল যে ভারত-বাংলাদেশে পুরাতত্ত্ব পরিদর্শনের সময় আমি চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে পুরোনো দুর্গের অবশেষ খুঁজেছিলাম। এনিওয়ে, রাতের আর চার ঘন্টা বাকি। চলুন, পালা করে ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। নইলে শরীরের ক্লান্তি কাটবে না। আপনি পিস্তল চালাতে জানেন তো?”
মাথা নাড়লাম।
“নো ইস্যু,” অ্যামেদিয়াস অল্প হাসলেন, “কোনও কিছু নড়তে দেখলে টর্চ আর পিস্তল তাক করে চেঁচালেই হবে। আমার ঘুম পাতলা, আমি জেগে যাব।”
পাঁচ মিনিটেই নাক ডাকাতে শুরু করলেন মিস্টার গিৎজি। আমায় কেমন একটা অস্বস্তি আর ভয় চেপে ধরল। খালি মনে হচ্ছে, তাঁবুর আশেপাশে ওই অদৃশ্য শত্রুর পায়ের ক্ষীণ শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনের ভুল একটু পরেই ভেঙে যাচ্ছে। আবার একটু পরেই মনে হচ্ছে, শব্দ আসছে। ঘুম হয়নি বলে চোখও জ্বালা করতে শুরু করেছে। দু’ঘন্টার অ্যালার্ম বাজার আগেই অ্যামেদিয়াস উঠে পড়লেন। “আপনি এবার ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নিন, মিস্টার গোস্বামী।” একবার বলা মাত্রই আমি শুয়ে পড়লাম।
অদ্ভুত একটা শব্দে ঘুম ভাঙল। উঠে দেখি, ভোরের আলো বেশ তেজের সঙ্গে তাঁবুতে প্রবেশ করছে। অ্যামেদিয়াসের দিকে তাকালাম। ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় চুপ করতে বললেন, ফিসফিসিয়ে বললেন, “অদ্ভুত শব্দ আসছে।” হাতে পিস্তল তুলে নিলেন। “আমি তাঁবুর বাইরে উঁকি দিয়ে দেখছি। আপনি লম্বা ছুরিটা হাতে রাখুন।” মাথা বাইরে বার করলেন।
টেনশনে কাটল অনেকটা সময়। তারপর বাসি রুটি আর চীজ খেয়ে মালপত্তর গুটিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু হল। ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পর একটা তুষারশেয়ালকে অনুসরণ করে আমরা সেই রহস্য-নগরীর ধ্বংসাবশেষে পৌঁছোলাম। অ্যামেদিয়াস নগরের ভগ্নপ্রাচীর পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। “খুবই প্রাচীন গঠন। মেসোপটেমিয়া-সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে বেশ মিল। যেটা এখানে অস্বাভাবিক। পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল। কোনও সংগঠিত জনজাতি থাকা এবং পরিকল্পিত নগরী তৈরি এক কথায় অসম্ভব।”
প্রাগিতিহাসের কচকচানি ভালো লাগছিল না। শরীরে ভীষণ ক্লান্তি, মনে ভয় আর অস্বস্তি। খিদেও পেয়েছে। একটু বিরক্তিই প্রকাশ করলাম, “সবই তো হল। কিন্তু যে সবের গল্প আপনি বলেছিলেন, তারা কই? এ তো নিষ্প্রাণ নগরী!” হতাশ মুখে বললাম, “মিস্টার গিৎজি, আমি অত্যন্ত অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষ। কিন্তু এই টেনশন, এই ভয়, এই শূন্যতা ঠিক নিতে পারছি না। কিছুই তো নেই। সব গাঁজাখুরি গল্প মনে হচ্ছে।”
অ্যামেদিয়াস কোনও জবাব দিতে না পেরে ঢোঁক গিললেন। আর ঠিক তক্ষুনি নগরীর দেয়ালের একটা অংশ ভেঙে প্রায় আমাদের গায়ের ওপর পড়ল। কন্টকিত দেহে তাকিয়ে আমরা বুঝলুম, অদৃশ্য এক ভয়ঙ্করদেহী জীব পাঁচিলের ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে গুলি চালিয়ে দিলেন অ্যামেদিয়াস। অদৃশ্য জীব যে ক্ষিপ্রগতিতে পাশে সরে গেল তা বোঝা গেল, পাঁচিলের আরও পাথর খসে পড়ায়। আমার হাত-পা কাঁপছে। শক্ত করে ধরে রয়েছি ছুরিটা। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে পর পর দু’বার গুলি ছুঁড়লেন অ্যামেদিয়াস। তাতে কী কাজ হল, বোঝা গেল না। অদৃশ্য জীব অনেক সতর্ক হয়ে গিয়েছে। তার অবস্থান আর বোঝা যাচ্ছে না। একটা স্নানাগারের ধ্বংসাবশেষের পাশে একটা ছোট্ট ঘর ছিল। তাতে দ্রুত ঢুকে গেলাম আমরা।
কিন্তু শত্রু কোন দিক থেকে আসবে? তার ধাক্কায় এত পুরোনো দেওয়াল কতক্ষণ টিকবে? এসব ভাবনায় এক একটা মুহূর্ত এক একটা যুগের মতো কাটছে। আমি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, “মিস্টার গিৎজি, আমরা সেধে-যেচে এসে এই শত্রুর পাল্লায় কেন পড়লাম, বন্দি মানুষদের উদ্ধার কী করে হবে, এক বা একাধিক ভিনগ্রহীর সঙ্গে আমরা দু’জন অমন একটা প্রায়-খেলনা পিস্তল নিয়ে কীভাবে যুঝব – কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি।”
“ধৈর্য্য ধরুন। এই সব সমস্যার ভেতর দিয়েই সব খুঁজতে হবে। প্রতি মুহূর্তে ওঁত পেতে থাকা মৃত্যুর সামনে থেকে জীবন ছিনিয়ে আনতে হবে বার বার।”
“আমি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছি। এভাবে পারা যায় নাকি? অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে কখনও জেতা যায় নাকি? বন্দি মানুষেরা আদৌ বেঁচে আছে কিনা, তারা আমাদের সাপোর্ট করবে কিনা, কিচ্ছু জানি না। যদি সব কিছু আমাদের বিরুদ্ধে যায়...”
“এত নেগেটিভ ভাবছেন কেন? আমি যথেষ্ট খবর জোগাড় করে, পজিটিভ মাইন্ড নিয়ে এখানে এসেছি। আসল খেলা শুরু হল বলে। একটু ধৈর্য্য ধরুন,” অ্যামেদিয়াস এখনও হাসছেন। “আমার কাছে কী কী অত্যাধুনিক যন্ত্র রয়েছে, আপনার ধারণা নেই। রাশিয়ায় তৈরি লাইফ ডিটেকশন ইনসট্রুমেন্ট রয়েছে, প্রায় ৩০০ মিটার দূর থেকে জীবনের সামান্য লক্ষণ, কারও অতি ক্ষীণ হৃদ্‌স্পন্দন ধরতে পারে সেটা। আর প্রচুর যন্ত্রপাতি আমি আশেপাশে ছড়িয়ে রেখেছি। স্যাটেলাইট আর ড্রোন-বেসড যন্ত্রপাতি।” এরপরে আসল বোমা ফাটালেন, “ইন ফ্যাক্ট, আমার স্ত্রী-পুত্রের হারিয়ে যাওয়াটা কোনও দুর্ঘটনা নয়। ইট ওয়াজ আ পার্ট অফ দ্য মিশন। ওদের শরীরে বহু যন্ত্রপাতি লাগানো আছে...”
আমি অজানা এক আশঙ্কায় আঁতকে উঠলাম, “সর্বনাশ। আপনি আমাকে কোনও গিনিপিগ বানাননি তো?”
অ্যামেদিয়াসের হাসি আরও চওড়া হল, “ইয়েস। ইয়েস। শুধু আপনি নন, আমিও গিনিপিগ। উই অল আর পার্ট অফ দ্য গেম। আপনি আমি যা যা খেয়েছি, সব কিছুর মধ্যেই বিশেষ কিছু ইন্ডিকেটর কেমিক্যাল আছে...”
“আমার তো এখন মনে হচ্ছে, ভিনগ্রহী তুষারমানব ইত্যাদি সব মিথ্যে। আপনি অন্য কোনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত...”
“এই ভুল-বোঝাবুঝির জন্যই এতক্ষণ বলিনি। যাই হোক, সামনে এখন যুদ্ধ। আপনার সন্দেহ নিরসনের জন্য সময় নেই। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি থেকে সংকেত আসতে শুরু করেছে। আপনি ঠিক আমার পেছনে গা ঘেঁষে দাঁড়ান। অদৃশ্য মানুষের আক্রমণে এবার দেওয়াল ভেঙে পড়তে পারে। এক্ষুনি ইম্প্রোভাইজড ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে।”
বিস্ফোরণ শুরু হল। আর ওই তুমুল ধোঁয়া-ধুলোর মধ্যে আমায় টানতে টানতে এক পাতাল কক্ষের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে থাকলেন অ্যামেদিয়াস, “এখানেই সেই ল্যাবরেটরি। এখানেই ওই অদৃশ্য ভিনগ্রহী যুগ-যুগান্ত ধরে একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে। কেউ বলে, ওটজির জীবাশ্ম নাকি এখানেই বানানো...”
“এখনও আপনি আজগুবি কথা ছাড়বেন না। ভিনগ্রহী হোক আর যাই হোক, সে কি হাজার-হাজার বছর বাঁচতে পারে?”
“পারে। তার দেহ বস্তুময় নয়, শক্তিময়। সেই শক্তিময় দেহে বয়সের কোনও প্রভাব নেই। ফোটন কণার কি কখনও বয়স হয়? যেসব মানুষকে বন্দি করা হয়েছে, তাদেরও শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। তাই তাদেরও মৃত্যু হয়নি। হাজার-হাজার বছর তারা একইভাবে আছে। তারা বহির্জগতের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারে।” কথা বলতে বলতে বিশাল এক পাতালঘরের মধ্যে আমরা চলে এসেছি। কেমন একটা চাপা গুঞ্জনধ্বনি যেন বাতাসে। অ্যামেদিয়াস আমার চোখে অদ্ভুত একটা চশমা পরিয়ে দিলেন, “দেখুন এবার আপনার আশেপাশে।”
চমকে উঠলাম। অমন অদ্ভুত জিনিস আমি আগে কখনও দেখিনি। অজস্র রঙবেরঙের শক্তিতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে, গুটিয়ে যাচ্ছে, আবার ছড়াচ্ছে। অ্যামেদিয়াস এবার হেডফোনের মতো রিসিভার লাগিয়ে দিলেন কানে।
“এবার শব্দ শুনুন। সমস্ত গুঞ্জনের অনুবাদ শুনুনওয়েলকাম টু মাই ওয়ার্ল্ড। এতক্ষণ আপনাকে যে সব গল্প বলেছি সব মিথ্যে। এই ল্যাবরেটরি আসলে আমার। ভিনগ্রহী-ট্রহী সব মিথ্যে। আমিই এখানে মানুষের দেহকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে হাজার-হাজার বছর বাঁচিয়ে, থুড়ি, অমর করে রাখার এক্সপেরিমেন্ট করছি। গল্প ফেঁদে আশেপাশের অঞ্চল থেকে আগন্তুকদের আমিই এখানে আনি। নাউ ইট ইজ ইয়্যোর টার্ন...”
আমি দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে পেছন ঘুরে দৌড়োনোর চেষ্টা করলাম ঐ চশমা, হেডফোন পরেই। সঙ্গে সঙ্গে অজস্র তার যেন আমাকে পেঁচিয়ে ধরল। সেই রঙবেরঙের তরঙ্গগুলো প্রবল চাপে আমাকে পেঁচিয়ে ধরে ঝাঁকাতে লাগল। নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুতেই ছাড়াতে পারছি না। শ্বাস নেওয়ার প্রবল চেষ্টা করছি। প্রাণপণে দৌড়োচ্ছি। পেছন থেকে শুধু ভেসে আসছে অ্যামেদিয়াসের অট্টহাস্য, “পালাতে আপনি পারবেন না। আপনি বন্দি হয়ে গিয়েছেন। আমি, আমিই সেই অজর অমর ভিনগ্রহী। আপনিই আমার নতুন গিনিপিগ।” চারপাশে প্রত্ননগরীর দুরূহ সব কোণ থেকে জ্বলে উঠেছে অজস্র আলো। চালু হয়ে গিয়েছে উদ্ভট সব যন্ত্র। আর আমি দৌড়োতে পারছি না। শ্বাস নিতে পারছি না। মুখ থুবড়ে পড়লাম।
অনেক চেষ্টা করে যখন চোখ খুলল, দেখলাম, সাউথ টাইরলের হাসপাতালে শুয়ে আছি। ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন বিমান দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ার অবিশ্বাস্য কাহিনি।
“কিন্তু আপনি কি জানেন, আমি স্বপ্নে এক ভয়ঙ্কর মানুষের খপ্পরে পড়েছিলাম?” উত্তেজিত হয়ে আমি বলতে থাকি। ডাক্তার শুনে মৃদু মৃদু হাসেন, যেন সবটাই তিনি জানেন।
“আপনি হাসছেন কেন?”
“আমারই নাম অ্যামেদিয়াস গিৎজি। আমি ডাক্তার। আমার বংশে তো দূরস্থান, গিৎজি কমিউনিটিতে কেউ কখনও পুরাতত্ত্ব বা ভিনগ্রহ বা এনার্জি ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করেনি। কিন্তু ঠিক এই অঞ্চলেই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা মানুষগুলো এই একই স্বপ্ন কেন দেখে, কে জানে? আপনাকে নিয়ে সতেরো জন হল।”
_____
ছবিঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

No comments:

Post a comment