গল্পের ম্যাজিক:: বন্ধ বাড়ির রহস্য - অঙ্কন রায়


বন্ধ বাড়ির রহস্য
অঙ্কন রায়

।। এক।।

পিসতুতো ভাই দেশাই বলল, “বুবকা, এ বছর পুজোয় কোথাও যাওয়া হচ্ছে না রে। ডিসেম্বরে টেস্ট। সামনেই মাধ্যমিক। তোর তো তেমন চাপ নেই এ বছর। ইলেভেন সবে। চলে আয় না আমাদের বাড়ি। একসঙ্গে কয়েকটা দিন মজা করব, ঘুরব
ফোনে কথা হচ্ছিল দেশাইয়ের সঙ্গে। ওর ভালো নাম অবশ্য দেশাই নয়। ডাকনামও নয়। ওর নাম হল চিরদীপ। বাড়িতে সবাই ডাব্বু বলে ডাকেওর জন্মদিন ঊনত্রিশে ফেব্রুয়ারিঅর্থাৎ লিপ ইয়ারে চার বছর পর পর ওর জন্মদিন আসে। ভারতের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের মতোতাই আমি ওকে মোরারজি মোরারজি বলে খ্যাপাতাম আগে। রাগ করত খুব, কারণ নামটা ওর একেবারেই পছন্দের ছিল না। পরে গত বছর একসঙ্গে সাউথে বেড়াতে গিয়ে যখন আমাদের বন্ধুত্ব গভীর হয় তখন মোরারজি নামটার বদলে দেশাই বলা শুরু করি। এটা ওর মতে ‘তবুও ভালো’আমার কথাও থাকল, ওরও তেমন খারাপ লাগল না।
দেশাইয়ের আহ্বানে উৎসাহ পেলাম। মাকে বললাম, “যাবে নাকি, মা? পুজোর ক’টা দিন ঘুরে আসি পিসিমণিদের বাড়ি থেকে?
মা বললেন, “সে তো যাওয়াই যায়। তোর বাবাকে বল। আমার আজকাল আর এই মহানগরের পুজোর ভিড়-গ্যাঞ্জাম একেবারে সহ্য হয় না। ক’টা দিন ঘুরে এলে ভালোই আনন্দ হবে।”
মার কাছে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া মানে বাবার কোনও অমতের ব্যাপারই নেই। বাবার কাছে মা’র হ্যাঁ মানেই হ্যাঁ। সুতরাং রাতে বাবাকে প্রাথমিকভাবে আমাদের প্ল্যানটা জানিয়েই নিজের ঘরে চলে গিয়ে ফোন লাগালাম দেশাইকে। “দেশাই, আসছি রে। বাবা প্ল্যান শুনেই ল্যাপটপে টিকিট বুকিংয়ের কাজে লেগে পড়েছে। আমরা তিন জন প্লাস তোরা তিন জন। দারুণ এনজয় করব পুজোর চারটে দিন। কী বল?
দেশাই টগবগ করে ফুটছে “ইউরেকা! জমে যাবে পুজোটা। জানিস বুবকা, এ বছর আমাদের পাড়ার প্রথম দুর্গাপুজো। বাবা নতুন পুজো কমিটির সেক্রেটারি।”
আমাদের এই দারুণ আনন্দের রেশের মধ্যে একটাই ছোট্ট কষ্ট মাঝে মাঝে বুকে খোঁচা মারছে। সেটা হল, আমি দেশাইয়ের চেয়ে বয়সে আর ক্লাসে এক বছরের সিনিয়র হলেও ব্যাটাচ্ছেলে দিব্যি আমায় নাম ধরে ডাকে। দাদা বলে না!

।। দুই।।

মহাপঞ্চমীর দিন সকাল দশটা দশের শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। এই ট্রেনটা বোলপুর পর্যন্ত যাওয়ার জন্য বেস্ট ট্রেন। ওটাই লাস্ট স্টপেজ এই সুপারফাস্ট ট্রেনটার। আর হাওড়া থেকে ছাড়ার পর মাঝে মাত্র দুটো স্টপেজ। বর্ধমান আর গুসকরা। তাই বাড়তি প্যাসেঞ্জারের ভিড় থাকে না ট্রেনে। আমাদের অবশ্য এসিতে রিজার্ভেশন। সুতরাং বাড়তি লোকজন দেখার তেমন স্কোপও নেই।
কামরায় ঢুকে নির্দিষ্ট সিটে গিয়ে জানালার ধারটা আমি দখল করলাম। এই নিয়ে মা’র সঙ্গে একপ্রস্থ ঝগড়াই হয়ে গেল। মা’র বরাবরই জানালার পাশে বসার একটা দুর্বলতা আছে। আগেও কোথাও যাওয়ার সময় আমার সঙ্গে এ নিয়ে ঝামেলা করেছে। আমি ছোটো বলেও ছেড়ে দিতে রাজি হত না। আমি রীতিমতো লড়ে জায়গাটা নিতাম। মা ছেলেমানুষের মতো রাগ করে হাঁড়িমুখ নিয়ে বসে থাকত। আজও সেরকমই হল কিছুটা। বাবার এসবে তেমন ভ্রূক্ষেপ নেই। কোথাও একটা বসলেই হল। আজও মা মাঝে আর বাবা করিডোরের দিকে।
জানালা দিয়ে প্লাটফর্মে লোকজনের যাওয়া আসা দেখতে দেখতে নির্দিষ্ট সময়েই দেখলাম ট্রেন নড়ে উঠলআর ট্রেন ছাড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হুড়মুড়িয়ে একটা ফ্যামিলি আমাদের কামরায় উঠে এলদরজার দিকে তাকিয়ে দেখি এ তো রীতিমতো চমক! আমার স্কুলের বন্ধু দেবলীনা আর ওর মা। বালিগঞ্জে ও আমাদের বাড়ির চার-পাঁচটা বাড়ি পরেই থাকে। ছোটোবেলায় বন্ধুত্ব অনেকটাই বেশি ছিল ওর সঙ্গে। যাওয়া আসা লেগেই থাকত দু’বাড়িতে। মায়ে মায়েও ভাব ছিল প্রবল। এখনও আছে, তবে যেহেতু ইলেভেন থেকে আমাদের স্ট্রিমটা আলাদা হয়ে গেছে আর যার যার পড়ার চাপ, টিউশনির চাপও বেড়ে গেছে, আমাদের যোগাযোগ, দেখাসাক্ষাতগুলো কমে গেছে। আজ ওকে দেখতে পেয়েই লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে বললাম, “আরে দেবু, কোথায় যাচ্ছিস তোরা?
দেবলীনাও আমায় দেখে প্রথমে চমকে উঠে তারপর দারুণ খুশি হয়ে গেল। বলল, “দাঁড়া, সিটটা খুঁজে ব্যাগ রেখে এসে বলছি।”
আমাদের সিটের দুটো সারি আগেই ওরা সিট পেয়েছে। ব্যাগ রেখেই ছুটে চলে এল দেবু। “চল চল বুবকা, আমাদের সঙ্গে বসবি চল। কাকিমা, মাকে এখানে পাঠিয়ে দেব? আমি আর বুবকা গল্প করতে করতে যাব। তোমরা নিশ্চয়ই দেশাইদের বাড়ি যাচ্ছ? ওরা তো প্রান্তিকে থাকে। জানো, আমাদেরও ওখানে একটা বাড়ি হচ্ছে। প্রান্তিকেই। তোমাদের বলা হয়নি। সেটাই দেখতে যাচ্ছি আমি আর মা। পুজোর ক’টা দিন ওখানেই থাকববাবাও পরশু অফিস ছুটি হলে চলে আসবে।”
একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে দেবু দম নিল। আমি ওর কথার ফাঁকেই উঠে গিয়ে মাকে জানালার ধারটা ছেড়ে দিলাম। মা তো এতেই দারুণ খুশি। আহ্লাদী গলায় দেবুকে বলল, “নন্দিনীকে পাঠিয়ে দে তো। কতদিন আমাদের গল্প হয়নি।”
কিছু পরের সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্টটা এইরকম। মা জানালার ধারে, নন্দিনী কাকিমা মাঝে আর বাবা যথারীতি করিডোরের দিকে। আমি দু’সিট এগিয়ে একই দিকে জানালার ধারে, আর আমার পাশে দেবু একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে কারণ, ওর পাশে আর কেউ এসে বসেনি।
ট্রেন ছুটছে দুর্বার গতিতে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে আমাদের গল্পের গতি। বহুদিন পরে এক জায়গায় দুই বন্ধুর দেখা হলে যা হয়। বকবকানির সিংহভাগ দায়িত্ব অবশ্য দেবুই নিয়েছে। ছোটো থেকেই মেয়েটা দারুণ বখতিয়ার। আমরা স্কুলে ওকে যা খুশি একটা টপিক দিয়ে দিতাম বকার জন্য আর ও বকে মরতঅবশ্য আমরাও কম ছিলাম না কিছু।
বর্ধমান ছাড়ার পর আর মোটামুটি এক ঘন্টা। কথায় কথায় কখন যে সময় পেরিয়ে গেছে কেউই বুঝতে পারিনি। মাঝে একবার মা ডেকে আমাদের কেক আর ঝুরিভাজা দিয়েছে। দেবু উঠে গিয়ে নিয়ে এসে বলেছে, “ওদিকেও দারুণ গপ্পো জমেছে।”
তারিয়ে তারিয়ে ঝুরিভাজা খেতে খেতে বললাম, “হ্যাঁ রে দেবু, তোরা প্রান্তিকে কেন বাড়ি বানাচ্ছিস? কলকাতা ছেড়ে ওখানে গিয়ে থাকবি নাকি?
দেবু বলল, “তুই তো সেই বোকার হদ্দই রয়ে গেলি। শুধু থাকার জন্যই বুঝি লোকে বাড়ি বানায়? বেড়াতে যাওয়ার জন্যও তো বানিয়ে রেখে দিতে পারে! আর শান্তিনিকেতন বা প্রান্তিকে এমন অনেক বাড়ি আছে যার মালিক বাইরে থাকে, মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে। ছুটি কাটাতে আসে।”
আমার কিছু বলার ছিল না এর উত্তরে। মনে মনে ভাবছিলাম, মোটামুটি একটা বৈভব না থাকলে শখে বেড়াতে আসার জন্য কেউ বাড়ি বানাতে পারে না। তবে আমারও এরকম একটা ইচ্ছে আছে। বড়ো হয়ে ভালো চাকরি-টাকরি পেলে বানাবস্রেফ বেড়াতে যাবার জন্য বানাবশান্তিনিকেতনে নয়। সাঁওতাল পরগণার পাহাড়ি জঙ্গুলে পরিবেশে। দুমকা, দেওঘর অঞ্চলে। ওদিকটা আমার ভীষণ প্রিয় রহস্যময় আর নিরিবিলি পরিবেশের জন্য।

।। তিন।।

ট্রেনটা বোলপুর পর্যন্তই। এরপর আর যাবে না। একটা দশে হাওড়ার দিকে ফিরবে। আমাদের গন্তব্য প্রান্তিক। অর্থাৎ বোলপুরের পরের স্টেশন। তাই বোলপুরে নেমে আমরা একটা বড়ো গাড়ি ভাড়া করলাম। এখান থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়াটা কোনও সমস্যাই নয়। স্টেশনের বাইরে কাতারে কাতারে টোটো, ট্যাক্সি, ছোটা হাতি, উইঙ্গার ও আরও ছোটো-বড়ো নানান গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। চালকদের মধ্যে রীতিমতো কম্পিটিশন চলে। ভালো ট্যুরিস্ট পার্টি দেখলে লাফিয়ে এসে ঘিরে ধরে প্রায় কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে। আমাদের দেখেও সেরকমই করছিল কয়েকজন টোটো আর ট্যাক্সিওয়ালা। বাবা ওদের বুঝিয়ে দিলেন আমরা ট্যুরিস্ট নই। প্রান্তিক যাব। পাঁচ জন আছি। বড়ো গাড়িই লাগবে।
পাঁচ জনের জন্য একটা মারুতি ভ্যান ঠিক করা হল। যদিও এই গাড়িটা আমার খুব একটা পছন্দের নয়, তবুও এতজন একসঙ্গে বসার প্রশ্নে রাজি হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পিসিমণিদের মানা করা হয়েছিল স্টেশনে আসতে। বাবা বলেছিল, “শুধু শুধু অমলবাবুকে অফিস কামাই করে গাড়ি নিয়ে আসতে হবে না। আমাদের তো চেনা জায়গা। আর স্টেশনে গাড়িও অজস্র। আমরা নিজেরাই চলে যাব।”
বাবার অমলবাবু বা আমার পিসেমশাই চাকরি করেন ইলামবাজারে। ওদের একটা অলটো গাড়ি আছে। সেটা নিয়েই রোজ যাতায়াত করেন। ঘরে দেশাই আর পিসিমণিব্যাটাচ্ছেলে আজ বেশ সারপ্রাইজড হবে। ও জানে না দেবলীনা আসছে। দেবুদের যে ওদের পাড়ায় বাড়ি হচ্ছে সেটাও ও জানে না। দেবুরা এখনও পর্যন্ত কাউকে খবর দেয়নি। আর দেশাই যখন কলকাতায় আগে বেড়াতে যেত, ওকে নিয়ে রোজই দেবুদের বাড়ি বেড়াতে যেতাম। ওরাও ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিল।
জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে উত্তেজিত ভঙ্গীতে দেবু চেঁচাল, “মা মা, ওই দেখো পোস্ট আপিসের মোড়ে সিংকাকু দাঁড়িয়ে।”
ওর মা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, “হাত ভেতরে ঢোকাও। এখনই অত লাফানোর কিছু হয়নি। বাড়ি চলো। স্নান-ঘুম সেরে বিকেলে তৈরি হবে বেরোবে সব বন্ধুতে। তখন সিংকাকুর ভূতের বাড়ি দেখিয়ে এনো বন্ধুদের।”
‘সিংকাকুর ভূতের বাড়ি’ কথাটা মনের মধ্যে কৌতূহল জাগিয়ে তুললতবে এখনই কিছু বললাম না। পরে যথাসময়ে তো জানতে পারবই। এখন বরং জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখি। একটু পরেই শ্যামবাটি পেরিয়ে ক্যানেলের পাশ দিয়ে প্রান্তিকের রাস্তা ধরল আমাদের গাড়ি। এই জায়গাটা আমার ভীষণ প্রিয়। বিশেষ করে রাস্তার ডানপাশে সমান্তরালভাবে চলে যাওয়া ক্যানেল আর তার ওপারে ঘন সবুজের সমারোহ আমায় দারুণভাবে টানে। যখনই এদিকে এসেছি, মনে হয়েছে ওই জঙ্গলটার মধ্যে গাছবাড়ি বানিয়ে থাকব অরণ্যদেবের মতো।
এগিয়ে চলেছে মারুতি। খানিকটা পরেই বাঁদিকে রাস্তা বেঁকে যাওয়ায় চোখের সামনে থেকে ক্যানেল আর জঙ্গল ভ্যানিশ। এবার শুরু হল ডানপাশে সোনার তরী হাউসিং কমপ্লেক্স। এই কমপ্লেক্সটা ভারি সুন্দর। উঁচু উঁচু ইটের জঙ্গল নয়। প্রশস্ত রাস্তার মাঝে মাঝে বাংলো টাইপ বা বড়োজোর দোতলা কি তিনতলা সাদা ধবধবে সুদৃশ্য বাড়ি আর বাগান। অনেকটা জায়গা জুড়ে এই সোনার তরী। আরেকটু এগিয়ে ডান হাতে বেঁকে সোজা রাস্তায় প্রান্তিক স্টেশন। আমাদের গন্তব্য অতদূর নয়। তার আগেই বাঁদিকে ঢালুতে নেমে যাওয়া একটা মোরামের রাস্তা। সেই রাস্তায় নেমে দু-চারটে বাঁক ঘুরতেই দেবলীনা গাড়ি থামাল“ওই তো, আমাদের বাড়ি এসে গেছে। ওই মাঠের মাঝে দেখ, ইনকমপ্লিট একতলা বাড়িটা। এখন আমাদের থাকার মতো ব্যবস্থা হয়েছে। একটা রুম, কিচেন, জল, ইলেক্ট্রিসিটি রেডি। বাকি কাজ চলছে।”
আমি হাঁ করে দেখছিলাম চারদিকটা। দেবুদের নির্মীয়মাণ বাড়ির পিছনে বেশ ঘন একটা গাছগাছালির বন। ভরদুপুরেও গাটা ছমছম করে উঠল। ওরা নেমে গেল। নন্দিনী কাকিমা বলল, “তোমরা এগোও। বিকেলে আসছি ওদের বাড়ি। দেখা হবে।”
দেবুরা দুপুরের মতো খাবার সঙ্গে নিয়েই এসেছে। ট্রেনে আসতে আসতেই কোনও এক সময় বলেছিল। তাই সে নিয়ে চিন্তা নেই। আমার একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সিংকাকুর ভূতের বাড়ি। এটা কোথায়? দেশাই কি জানে এই বাড়ির কথা? ভূতের বাড়ি কেন? দেবুর সঙ্গে ওই সিংকাকুর চেনাই বা হল কবে? ওরা তো এখানে নতুন। আগেও কি থেকে গেছে দেবুরা?

।। চার।।

দেশাই তো আমায় পেয়ে কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ওর মামা-মামিকে প্রণাম করেই আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল ওর দোতলার নিজের ঘরে। এখানেই ওর পড়াশোনা, খেলাধুলো, বলতে গেলে সব কিছুর জগৎও গল্পের বইয়েরও পোকা আমার মতোই। আমি ওর জন্য দুটো কিশোর উপন্যাসের সংকলন নিয়ে এসেছি। একটা অশোক বসুর, আরেকটা বিমল করের। এ দুটো ওর পড়া নয় বলেছিল। ঘরে ঢোকার আগে ছাদে নিয়ে এসে দেশাই দেখাল ওদের দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলটা। বাড়ির পাশেই ছোটো একটা ফাঁকা জমিতে প্যান্ডেল। ছোটোখাটো ছিমছাম সাজানো। মূর্তি এখনও আসেনি। কাল ষষ্ঠীর সকালে প্রতিষ্ঠা হবে। এবার প্রথমবার, আর পাড়ার লোকসংখ্যাও খুব বেশি নয়, তাই ছোটো করেই করা হচ্ছে।
দেশাই বলল, “বিকেলে দেখবি পাড়ার সবাই এইখানে এসে জড়ো হবে। অনেকরকমের কাজ আছে না? আজ বাবাও তাড়াতাড়ি ফিরবে ইলামবাজার থেকে। বাবা সেক্রেটারি তো, তাই অনেক দায়িত্ব বাবার মাথায়। কাল থেকে দশমী অবধি বাবার অফিস ছুটি।”
আমি বললাম, “দেশাই, তোর জন্য বিকেলে একটা সারপ্রাইজ আছে। একজন আসবে এখানে বিকেলে। তুই ভাবতেও পারবি না কে আসবে।”
দেশাই আমার হাত ধরে টানাটানি করতে করতে বলল, “বল না, বল না কে আসবে এখনি বল! আমার তর সইছে না। বল
আমি একটুক্ষণ চুপ থেকে ওকে বললাম, “তার আগে তুই বল, সিংকাকু বলে তোদের এই পাড়ায় কেউ থাকে? তার কি একটা ভূতের বাড়ি আছে?
দেশাই হঠাৎ চমকে উঠে বলল, “তুই জানলি কী করে? এটা তো রিসেন্ট ঘটনা! তোকে বলিওনি। তোরা দু’বছর আগে এখানে লাস্ট এসেছিলি। কী করে জানলি, কে বলল, বল আমায়। কী রে, বল বল।”
আমি তবুও চুপ করে আছি দেখে স্বগতোক্তির মতো করে ও বলল, “ওই তো মেইন রোড থেকে আমাদের বাড়ি আসার আগেই যে পাড়াটা পড়ে, ওখানে ফাঁকা একটা জমির মধ্যে নতুন একটা একতলা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। এখনও প্লাস্টার বাকি। সেই বাড়িটার পিছন দিয়ে খানিকটা গেলেই গাছগাছালি ঘেরা একটা জঙ্গুলে জায়গায় আছে একটা পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ি। ওই বাড়িটায় কেউ থাকে না। শুধু সিংকাকু বলে একজন সিকিউরিটি গার্ড নতুন বহাল হয়েছে ওই বাড়িতে। তিন-চারমাস হবে। কে বহাল করেছে তাও জানি না। শুনতে পাই, লোকটা আসার পর থেকেই বাড়িটায় ভৌতিক ক্রিয়াকলাপ শুরু হয়েছে।”
আমি ওর মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে শুনছিলাম। বললাম, “কীরকম?
দেশাই বলল, “ওই বাড়িটার বাগানে অনেকগুলো পুরোনো স্ট্যাচু আছে। যাদের বাড়ি, একসময় তারা দারুণ শৌখিন ছিল বোঝা যায়। সেই স্ট্যাচুগুলো বাগানের বিভিন্ন পজিশনে সেট করা। ইদানীং শুনছি রাতের অন্ধকারে ওরা জীবন্ত হয়ে ওঠে। এপাশ ওপাশ ঠাঁই বদল করে। সিংকাকু নিজের চোখে সে সব দেখেছে। দারুণ সাহসী লোক, তাই কোথাও পালিয়ে যায়নি। বলে, ওরা তো আমার কোনও ক্ষতি করেনি। ওরা থাক ওদের মতো, আমি থাকি আমার মতো। বোঝ কাণ্ডটা
আমি হতভম্ব হয়ে খানিকক্ষণ চিন্তামগ্ন থাকলাম। তারপর দেশাইকে বললাম, “ওই নতুন বাড়িটা কাদের জানিস, যার পিছনে জঙ্গুলে ভূতের বাড়ি?
দেশাই বলল, “না রে। ওটা কাদের বাড়ি জানি না। কাউকে ওখানে কোনওদিন যেতে আসতে দেখিনি। শুধু মিস্ত্রিরা কাজ করে।”
আমি বললাম, “ওটা যাদের বাড়ি, তারাই বিকেলে আসবে এখানে। তোর খুব চেনা। কিছুক্ষণ কৌতূহলটা থাকুক। চল, নিচে খেতে ডাকছে। দেরি দেখলে মা, পিসিমণি দু’জনেই ক্ষেপে যাবে।”

।। পাঁচ।।

বিকেলে ঘুম ভাঙতেই বাইরের গেটে শব্দ। দেশাই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে জানালার কাছে দেখতে গেল। আমি মনে মনে হাসছি। ব্যাটা দারুণ চমকাবে। আর ঠিক। চমকাল এমন যে আমারই পিলে চমকে দিল। উত্তেজিত হয়ে এত জোরে চেঁচিয়েছে যে বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদেরও হার্টবিট বেড়ে না গিয়ে উপায় নেই। “আরে! দেবলীনাদি আর কাকিমা! তোমরা কীভাবে এলে এখানে? কী আশ্চর্য!” তারপর ছুটতে ছুটতে নেমে গেল নিচে।
কিছুক্ষণ পরে আমরা সবাই দুর্গা-মণ্ডপের সামনে। পিসেমশাইও চলে এসেছেন ইলামবাজার থেকে। একটু একটু করে পাড়ার অনেকেই জড়ো হচ্ছে মণ্ডপেদেবলীনা দেশাইকে বলল, “দেখলি, কেমন চমকে দিলাম তোদের? তোদের বাড়ির কাছেই বাড়ি বানিয়ে ফেলছি। হি হি হি
দেশাই বলল, “আমি এখনও জাস্ট ভাবতে পারছি না, দেবলীনাদি। স্বপ্ন দেখছি না তো?
আমি দেশাইয়ের একটা হাত টেনে ধরে বললাম, “অ্যাই ব্যাটা, ওকে দেবলীনাদি-দেবলীনাদি করে যাচ্ছিস আর আমার বেলায় শুধু বুবকা? আমি দাদা হই না?
ও হাসতে হাসতে বলে, “কী আমার দাদা রে! মোটে তো এগারো মাসের বড়োএক বছরও পুরো নয়।”
আমি বললাম, “আর দেবু? ও বুঝি অনেক বড়ো?
দেশাই দুষ্টুমি করে গলা টেনে বলল, “অনে-ক। দেবলীনাদি আমার থেকে একবছর দু’মাসের বড়োহা হা হা।” বলেই আমার হাতের গাঁট্টা খাওয়া থেকে বাঁচতে ছুট্টে চলে গেল মণ্ডপের পিছনদিকে
ওদিকে বাবা আর পিসেমশাই মিলে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সঙ্গে আরও পাঁচ-ছ’জন পাড়ার কাকু-জেঠুরা। অল্পবয়সিদের দল বলতে তেমন কেউ নেই। মা, পিসিমণিদের ব্যাচের কয়েকজন মহিলা পুজোর আয়োজনে দুর্গাবেদির কাছে জড়ো হয়ে কী সব গুছোচ্ছে।
দেবুর মা মানে নন্দিনী কাকিমা দুপুরে গাড়িতে আসতে আসতে দেবুকে বলেছিলেন বিকেলে সিংকাকুর ভূতের বাড়ি আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে। দেবু তো কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। আমিই কথাটা পাড়লাম, “দেবু, আমাদের ভূতের বাড়িতে নিয়ে যাবি না?
দেশাই আবার ফিরে এসেছে লাফাতে লাফাতে। আমার কথাটা ওর কানেও গেছে। ও লাফিয়ে উঠে আগ বাড়িয়ে বলল, “ক্ষেপেছিস? এখন এই সন্ধেবেলায় কেউ ওসব জায়গায় যায়? একবার তেনাদের পাল্লায় পড়ে গেলে প্রাণটি নিয়ে আর বাড়ি ফিরতে হবে না।”
দেবু মৃদু আপত্তি তুলে বলল, “তেমন কিছু নয়, দেশাই। আমাদের বাড়ির পিছনেই তো ওই পোড়ো বাড়িটা। একটু জঙ্গলে ঢুকেই। আর সিংকাকু খুবই ভালোমানুষ। এর আগে একবার এসে আমরা চার-পাঁচদিন ছিলাম। তখন ওর সঙ্গে আমার ভাব হয়। কত গল্প করেছি। আমাকে ওই বাড়ির বাগানে নিয়ে গিয়ে স্ট্যাচুগুলো পর্যন্ত দেখিয়েছে কাকু। ভয়ের কিচ্ছু নেই। তবে হ্যাঁ, রাতে না যাওয়াই ভালো। দিনে দিনে বেড়িয়ে এলে কোনও রিস্ক নেই।”
দেশাই হঠাৎ গলায় অভিমানের সুর টেনে বলল, “আগে একবার এসে চার-পাঁচদিন থেকে যাওয়া হয়েছে? অথচ আমরা কিছু জানিই না! বুবকা, তুই জানতিস ওদের এখানে বাড়ি বানানোর কথা?
সত্যি বলতে কী আমিও জানতাম না, কারণ মাধ্যমিকের পর দেবুর সঙ্গে আমার যোগাযোগটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। তবুও আমি দেবুকে বাঁচানোর জন্য বললাম, “আমি জানতাম রে। অনেকদিন আগেই জানতাম। তোকে ভালো মতন চমকে দেওয়ার জন্যই ব্যাপারটা এত দিন চেপে রেখেছিলাম। কী রে দেবু, বল ওকে।”
দেবু ঠোঁট চেপে হাসিমুখে বলল, “হুম

।। ছয়।।

সন্ধে হয় হয় নিঝুম প্রান্তিকের গাছবাড়িতে ফিরে আসছে দিন-বেড়ানো পাখির দল। তাই সমস্ত আবহ জুড়ে ওদের কিচিরমিচির আশ্চর্য এক শব্দের আবহ তৈরি করেছে দেশাইদের পাড়ায়। এ-পাড়ায় ঘনবসতি নেই। বেশ কিছুটা দূরে দূরে অনেকটা করে জায়গা জুড়ে বাগান আর বাড়ি। বাড়িগুলো বেশিরভাগই বাংলো প্যাটার্নের। আর লোকজনও সব বাড়িতে থাকে না। ট্রেনে গল্প করতে করতে দেবলীনা একসময় বলেছিল, “শুধু থাকার জন্যই বুঝি লোকে বাড়ি বানায়? এই অঞ্চলটার জন্য দেবলীনার কথা একেবারে সঠিক। থাকার কারণে অনেকেই বা বলা যায় বেশিরভাগ বাড়ি-মালিকরাই এখানে বাড়ি বানাননি। মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসার জন্য বানিয়ে রেখে দিয়েছেন। দেশাইদের মতো কিছু ফ্যামিলি তার মধ্যে ব্যতিক্রম। সেই কারণেই এই দুর্গাপুজোর আয়োজনে এত বড়ো অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাড়িঘরের মধ্যে মাত্র কয়েক ঘর পরিবারই পুজোয় যুক্ত।
আর একটু পরেই অন্ধকার নেমে যাবে। পাখিদের কূজন শেষ হয়ে আসবে, আর শুরু হবে ঝিঁঝিঁর ডাক। পিসেমশাইরা মণ্ডপের সামনে দুটো হ্যালোজেন লাইট লাগিয়েছেন। তাই এই জায়গাটা চতুর্দিকের অন্ধকার পরিবেশের মধ্যেও উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। কমিটির লোকজন আর মা-পিসিমণিরা সবাই পুজোর আয়োজনে ব্যস্ত।
দেবলীনা আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, “সিংকাকুর ভূতের বাড়ি দেখতে যাবি? এখনও কিন্তু পুরো অন্ধকার হয়নি।”
আমি তো রাজি। বললাম, “গেলেই হয়। দেশাইকে জিজ্ঞেস করি।”
দেশাই প্রস্তাব শুনেই একটু কেঁপে উঠে বলল, “এখন? রাত নামতে বেশি বাকি নেই তো। কাল সকালে গেলে হয় না?
দেবলীনা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ধুস। চল তো। কাকু খুব ভালো। তোদের আলাপ করিয়ে আনি।”
আমরা তিন জন বড়োদের চোখ এড়িয়ে যেন পায়চারি করছি এমন ভঙ্গি করে এগিয়ে যেতে যেতে স্পিড নিলাম হাঁটায়। দেবুদের বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখলাম, ওদের রাজমিস্ত্রিরা বাইরের চাপা কলে হাতমুখ ধুচ্ছে। দেবুকে দেখে একজন বলল, “কী গো দিদিমণি, ফিরে এলে এত তাড়াতাড়ি?
দেবু বলল, “না কাকু, বন্ধুরা এসেছে তো, তাই আমাদের বাড়ি দেখাতে এনেছি।”
মিস্ত্রিকাকু বলল, “আমরা আজ চললাম। কাল থেকে চার দিন আসব না। পুজোর ছুটি। আবার একাদশী থেকে কাজ আরম্ভ হবে। শুধু তোমার বাবা এলে একবার দেখা করে যাব।”
এরপর ওদের যাওয়া পর্যন্ত বাড়ির আশেপাশেই ঘুরলাম আমরা। পিছনে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছি দেখতে পেলে ওরা মানা করতে পারে।
সবাই চলে গিয়ে জায়গাটা আরও নিঝুম করে দিল। আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম জঙ্গলের দিকে। দেশাই আমার হাতটা খামচে ধরে আছে। দেবুর ওসব ভয়ডর নেই। গটগট করে এগিয়ে চলেছে সামনে।
একটু পরেই কয়েকটা শাল আর সোনাঝুরি গাছের আড়ালে দেখা গেল মস্ত লোহার ফটক। পুরোনো। আধো আলো-আঁধারিতে গেটের রংটা বোঝা যাচ্ছে না। একটা দিক একটু খোলা। আমরা ঢুকতে ইতস্তত করছি দেখে দেবু একাই গেটের ফাঁক দিয়ে ঢুকে গলা তুলে ডাকল, “সিংকাকু! তুমি আছ?
গেটের ডান পাশে ছোটোমতো সিকিউরিটি গার্ডের ঘর। সেখান থেকে আওয়াজ এল, “কে?
তারপর ছোটোখাটো চেহারার মোটা গোঁফওলা একটা লোক বেরিয়ে এল। আমি আর দেশাই ততক্ষণে দেবুর পিছনে। লোকটি দেবুকে দেখে চমকে গিয়ে বলল, “এখন এসেছ? রাত হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে ওরা কারা?
দেবু বলল, “সিংকাকু, ওরা আমার বন্ধু।” তারপর আমাকে দেখিয়ে বলল, “ও হল উন্মন, কলকাতায় থাকে আমাদের পাড়াতেই। এক ক্লাসে পড়ি।”
দেশাইকে দেখিয়ে দেবু বলল, “ওকে তো চেনো নিশ্চয়ই, কাকু। ও এখানেই থাকে। ও আমার এখানকার বন্ধু, চিরদীপ। ওরা দু’জন ভাই।”
সিংকাকু আমাদের দু’জনের সঙ্গেই হ্যান্ডশেক করে বলল, “খুব খুশি হলাম তোমাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে। এখানে তো লোকজন দেখার জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকি। দেবলীনা এলে আমার খুব ভালো লাগে। তোমাদেরও ভালো লাগছে। কিন্তু বাবু, এখন তো দেরি হয়ে গেল অনেক। ওই স্ট্যাচুদের জ্যান্ত হবার সময় হয়ে এলএখন কেউ না এলেই ভালো করতে। দেবলীনা, তুমি তো জানো সবই। কাল আসবে। এখন চলে যাও। কিছু মনে কোরো না, বাবুরা।”
আমি বললাম, “না না, মনে করব কেন? আমরা বিপদে পড়ি তা আপনি চান না বলেই তো যেতে বলছেন। চল চল, দেশাই। দেবু চল, আমরা কাল সকালের দিকে আসব।”
দেবু যেন অনিচ্ছা নিয়ে ফেরার রাস্তায় পা ঘোরালদেশাই আমার হাতটা খপ করে ধরে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, চল শিগগিরি। তখন আমিই তোদের মানা করেছিলাম।”
আমরা তিন জন নিশ্চুপে সিংকাকুকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ফিরে আসতে লাগলাম দেবুর বাড়ির পাশ দিয়ে পুজো-মণ্ডপের দিকে। অন্ধকার নেমে আসা প্রান্তিকে ঝিঁঝিঁর ডাক ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে।

।। সাত।।

ষষ্ঠীর সকালটা বেশ আলো ঝলমলে। দেশাইদের পুজো-প্যান্ডেলে মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। মণ্ডপের আকারের সঙ্গে মানানসই ছোটো একচালা প্রতিমা। পাড়াপড়শি ভিড় করে আছে চারদিকে। অঞ্জলি হবে একটু পরে। দেশাই নিজের দোতলার ঘর থেকে ওর মিউজিক সিস্টেমে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দিয়ে সাউন্ড বক্সটার মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে প্যান্ডেলের দিকে। অল্প শব্দে সুন্দর হয়ে উঠেছে পরিবেশটা। এই মুহূর্তে গান বাজছে ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে...’
একটু পরেই দেবলীনা ওর মা’র সঙ্গে এসে পৌঁছোল পুজো-মন্ডপে। আমাকে দেখতে পেয়ে ও ডাকল হাতছানি দিয়ে। কাছে গিয়ে দেখি সুন্দর একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে, কিন্তু সারা মুখে রাতজাগা ক্লান্তির ছাপ। পুজোবাড়িতে নতুন তো পরতেই হয়। আমিও পরেছি। দেশাইও পরেছে। কিন্তু আমরা ঘুমিয়ে উঠে যতটা ফ্রেশ, ওকে ততটাই উলটো দেখাচ্ছে। আমায় নিচু গলায় বলল, “মা এখানে থাক। তুই একবার আমার বাড়ি যাবি? অনেক কথা আছে। এখানে বলা যাবে না।”
আমি বললাম, “কী হয়েছে রে? তোর তো মনে হচ্ছে শরীর খারাপ।”
দেবু জবাবে বলল, “শরীর ঠিক আছে। রাতে ঘুমোইনি, তাই এরকম ক্লান্ত দেখাচ্ছে। দেশাইকে নিয়ে চল আমাদের বাড়ি। ও নাহলে খুঁজবে তোকে।”
আমি দেশাইকে ডেকে নিয়ে চললাম দেবুদের বাড়ি। দেশাই বলল, “কী ব্যাপার, দেবলীনাদি? পুজো ছেড়ে আমরা এখন যাচ্ছি কেন?
আমি বললাম, “চুপচাপ চল না ব্যাটা। গিয়েই শুনবি।”
দেশাই আর উচ্চবাচ্য করেনি।
বাড়ির তালার চাবি দেবুর কাছেই ছিল। গ্রিল খুলে, দরজা খুলে ঘরের ভেতরে গিয়ে বসলাম খাটে। ও কী বলবে শোনার জন্য ধৈর্য হারাচ্ছিলাম। দেবু আমাদের সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে বসে আরম্ভ করল, “শোন তোরা। কাল রাতে আমার এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হয়েছে। বুবকা তো জানিস, ছোটোবেলা থেকেই আমার ভয়ডর বলে তেমন কিছু নেই। তাই বলে আশ্চর্য হব না কোনও কিছুতে, তা তো নয়! কাল আমি এতটাই আশ্চর্য হয়েছি রাতের ঘটনায় যে আমার ঘুম উড়ে গেছে।”
আমি বললাম, “বল না ঘটনাটা। আর ধৈর্য নেই।”
দেবু বলল, “কাল মা ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত বারোটায় আমি বেরিয়েছিলাম চুপি চুপি। চলে গিয়েছিলাম ওই ভূতের বাড়িটার কাছে।”
আমার আর দেশাইয়ের দু’জনেরই চোখ গোল গোল। দেশাই ঢোঁক গিলে বলল, “বলো কী দিদি!”
আমি ওকে বললাম, “চুপ করে শোন।”
দেবু বলে চলল, “আমার ডেসপারেট স্বভাবের কথা তো জানিসই, বুবকা। সিংকাকুর বাড়ির বাগানে স্ট্যাচুদের ঘোরাফেরার রহস্য জানতে আমি অধীর হয়ে পড়েছিলাম। আর দিনের বেলা তো কিছু বোঝা যাবে না। তাই রাতের অন্ধকার ছাড়া দেখার উপায় ছিল না।
“গেলাম গুটি গুটি গেটের একপাশে। দেখি ভেতরে গেটের দিকে পিছন ফিরে একটা চেয়ারে স্থির হয়ে বসে আছে সিংকাকু। ওখান দিয়ে ঢোকা যাবে না। বাইরে বাইরে পাঁচিলের গা ঘেঁষে বাড়ির পিছনদিকে প্রায় চলে আসছিলাম, চোখে পড়ল এক জায়গায় ফাটল। ফাটলটা বিশেষ চওড়া নয়, কিন্তু ওর গায়ে একটা চোখ সাঁটিয়ে রাখলে বাগানটা পুরো দেখা যাবে বুঝলাম। পা দুটো ওখানেই থমকে গেল। চোখ সাঁটালাম ফাটলের গায়ে। তারপর...”
দেবু এবার নিজেই একটা ঢোঁক গিলল মনে হল। তারপর নতুন দম ভরে নিয়ে বলতে শুরু করল, “বাগানের ভেতরে যা দেখলাম, বিশ্বাস করা কঠিন। দেখি, প্রায় সাড়ে ছ’ফুট হাইটের বনমানুষের মতো বড়ো বড়ো লোমওলা একটা মানুষ বাচ্চাদের মতো সারা বাগান ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে আর ওই ভারী ভারী স্ট্যাচুগুলোকে খেলাচ্ছলে এক জায়গা থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় সাজাচ্ছে। ওর তোলা দেখে মনে হচ্ছিল স্ট্যাচুগুলো যেন পাথরের নয়, শোলার তৈরি হালকা পুতুল। কোনও জোর খাটাতে হচ্ছিল না। লোকটার গায়ে কোনও পোষাক নেই। সমস্ত শরীরটাই লোমশ, গরিলাদের মতো। শুধু মুখটা আবছা আলোয় আন্দাজ করেছি, ওটা মানুষেরই।
“সেই থেকে আমার চোখে ঘুম নেই। কোনোরকমে বাড়ি ফিরে এসে শুয়েছি। মা টের পায়নি, কিন্তু আমি সারা রাত এপাশ ওপাশ করেছি। এ আমি কী দেখে এলাম? ওটা কী? কোনও মানুষ? জন্তু? নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী? তোদের না বলা অবধি ভেতরটা আনচান করছিল। এবার পরবর্তী কাজ হবে সিংকাকুর কাছে সঠিকভাবে ব্যাপারটা জানা। এভাবে বাড়ির পাশে ওরকম একটা অলৌকিক কাণ্ড ঘটতে থাকলে আমরা কোনোদিন এসে থাকতে পারব এখানে? আজ সিংকাকু ভূত বলে আটকে রেখেছে ব্যাপারটাকে। কাল সবাই জানলে কার ক্ষতি হবে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”
এক নাগাড়ে বলে দেবু চুপ করল। আমার গলা ভেতর থেকে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। দেশাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ওরও একই অবস্থা। আলাদা বলতে ওর চোখ দুটো আরও বেশি মাত্রায় বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে।
একটু পরে আস্তে আস্তে বললাম দেবুকে, “এখন চল পুজো-মণ্ডপেঅঞ্জলির সময় পেরিয়ে গেলে প্রচুর দুর্ভোগ কপালে নাচবে। দুপুরের দিকে আসব সিংকাকুর সঙ্গে দেখা করতে।”

।। আট।।

মণ্ডপের কাছাকাছি আসতেই দেখি অঞ্জলি শুরু হয়ে গেছে। মা এদিক ওদিক চেয়ে বোধহয় আমাদের খুঁজছে। কাছে যেতেই ছোটো ধমক। “কী রে, কোনদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিস তোরা? শিগগির ওখানে ফুল নিয়ে গিয়ে দাঁড়া।”
আমি কোনওক্রমে “হ্যাঁ মা” বলে চলে এলাম পুজোর বেদিটার কাছে। আমার দেখাদেখি দেশাই আর দেবুও চলে এলপাশে সিংকাকু দাঁড়িয়ে আছে হাতে অঞ্জলির ফুল নিয়ে। আমাদের দেখে মৃদু হাসল
একটু পরে বাইরে এসে দেখি পিসেমশাই দেশাইকে খুঁজছেন। দেখতে পেয়ে উনিও ওকে এক ধমক দিলেন, “অ্যাই, গান চালানোর দায়িত্ব নিয়েছ, পুজো শুরু হবার সময় বন্ধ করবার দায়িত্ব নিতে হয় জানো না? আমি ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে সব কাজ ফেলে দোতলায় ছুটলাম গান বন্ধ করতে!”
দেশাই চুপ মেরে গেল। আমরা দু’ভাই বকা খেয়ে এক পাশে গিয়ে দাঁড়াতে ভেতর থেকে দেবু বেরিয়ে আমাদের কাছে এল। “তোদের বকা-টকা খাওয়া হল তো? এবার শোন। সিংকাকুর সঙ্গে কথা বললাম। দুপুরে আমরা তিন জন ওর কাছে যাব বলে দিয়েছি। আজ ভূতের বাড়ির রহস্যটা জানার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। তোরা তৈরি থাকিস।”
আমাদের দুপুরে সিংকাকুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে বাড়িতে একটু মিথ্যে বলতে হল। মিথ্যের প্ল্যানটা দেবুরই। ওর মা আর ওর আজ দুপুরে আমার পিসিমণি মানে দেশাইদের বাড়িতেই থেকে যাওয়ার কথা। আমাদের দুপুরে কোথাও বেরোনোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই আমি বড়োদের উদ্দেশে কথাটা ছাড়লাম, “আজ দুপুরে টোটো নিয়ে একটু বোলপুরের পুজো দেখে আসি। বিকেল বিকেল ফিরে আসব। সন্ধে থেকে পাড়ার পুজোতেই থাকব
পিসেমশাই, বাবা সবাই রাজি হলেন আমাদের যেতে দিতে। শুধু মা বলল, “আজই আলাদা যাওয়ার কী দরকার? আমরা তো সবাই মিলে একসঙ্গে এক দিন যাবই।”
এই প্রথম বাবাকে দেখলাম মার বিপক্ষে গিয়ে বলছে, “যাক না ওরা। এখন তো অনেক বড়ো হয়েছে। প্রান্তিক স্টেশনে অসংখ্য টোটো দাঁড়িয়ে থাকে। একটায় চাপবে আর ঘুরে আসবে। ওদের তো এখন ছাড়ারই বয়স। যা রে, তোরা ঘুরে আয়।”
মা একটু রেগে বলল, “যা ভালো বোঝো করো।”
পিসিমণি বলল, “ঠিক আছে, যাও। তবে সন্ধের আগেই ফিরে আসবে, অন্ধকার করবে না। মনে থাকবে?
আমরা সুবোধ বালক-বালিকার মতো মাথা নেড়ে বড়ো করে ‘হ্যাঁ’ বলে গুটি গুটি বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে।

।। নয়।।

দুপুরের পুজো-মণ্ডপ একেবারে ফাঁকা। শুধু দুর্গাপ্রতিমার সামনে গুটিসুটি মেরে পুরুতঠাকুর শুয়ে আছেন। মনে হয় ওঁর ঘুম আসছে। আমরা পায়ে পায়ে এগোতে এগোতে চলে এলাম দেবুদের বাড়ির সামনে। আজ ওদের বাড়িটাও নিঝুম। মিস্ত্রিরা ছুটিতে গেছে। পাশ দিয়ে লাল কাঁকড়ের রাস্তা, যেটা চলে গেছে পিছনের জঙ্গলের দিকে সে পথে এগোতে এগোতে দেশাই বলল, “আমার কিন্তু হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। স্ট্রোক-ফ্রোক হয়ে যাবে না তো ভয়ে?
আমার ধমক, “বাজে কথা রাখ তো! দেবলীনাদিকে দেখে শেখ সাহস কাকে বলে। কাল রাতে একা চলে গেল রহস্য ভেদ করতে।”
দেশাই হঠাৎ ভয়ের গলা পালটে হেসে উঠে বলল, “দ্যাখ বুবকা, তোকেও মানতে হল যে ও দেবলীনাদি। সাহসে ও আমাদের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। কী রে, মানছিস তো?
আমি কিছু উত্তর দেবার আগেই দেখি দেবু খিক খিক করে হাসছে। আমারও বুকটা একটু ঢিপ ঢিপ করছিল, তাই চুপ করেই থাকলাম।
ভূতের বাড়ি চলে এসেছে। পুরোনো লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে দেবু বলল, “এই বাড়িটার ভেতরে কোনোদিন সিংকাকু কাউকে ঢুকতে দেয় না। বাড়িটা বন্ধই থাকে সারাদিন। কাকু শুধু বাগানের স্ট্যাচুদের কথাই বলে। আসল রহস্য নিশ্চয়ই বন্ধ বাড়িটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।”
আমরা কথা বলছি না। বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দটা লুকোনোর চেষ্টা করছি শুধু। গেটের ডান পাশে সিংকাকুর ঘর। একবার ডাকতেই কাকু বেরিয়ে এসে আমাদের বলল, “চলে এসেছ তোমরা? ভেতরে এসো, ভেতরে এসো। খুব জানার ইচ্ছা তাই না, এই বাড়ির ভূতের কথা?
দেবু সিংকাকুর খাটে বসে পড়ে আমাদের দিকে ফিরে বলল, “তোরাও বস। আজ আমি পুরোটা না শুনে যাব না। সিংকাকু, তুমি আজ সবটা বলো। এই বন্ধ বাড়িটায় কে থাকে? তুমি কাকে পাহারা দাও? আমি গতবার এসে কত জিজ্ঞেস করেছি। তুমি বলেছ, কেউ থাকে না। তাহলে গভীর রাতে বাগানের স্ট্যাচুদের কে ওলটপালট করে? তুমি করো? তোমার অত শক্তি? তুমিই কি রাতে ভূত হয়ে যাও?
সিংকাকু মানুষটাকে আমার প্রথম থেকেই দেখে খারাপ লাগেনি। বরং মনে হয়েছিল একটু অসহায় আর গোবেচারা গোছের মানুষ। বেঁটেখাটো চেহারা। মোটা গোঁফটা রেখেছে ও যে সিকিউরিটির লোক, সেটা বোঝানোর জন্য।
কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ করে রইল মানুষটা। তারপর বলল, “এই বাড়িতে একটা অশরীরী প্রেতাত্মা থাকে গো ওই প্রেতাত্মারই কাজ স্ট্যাচু ওলট-পালট করা। আমি তো আগেও বলেছিলাম তোমাকে।” বলে দেবুর দিকে তাকিয়েছে সিংকাকু
দেবু সিংকাকুর চোখে চোখ রেখে বলল, “মিথ্যে কথা এটা। কাকু, তোমার এই বন্ধ বাড়িতে কোনও অশরীরী প্রেত থাকে না। বরং অনেক বড়োসড়ো শরীরী কোনও জীব বাস করে। তুমি রাতে তাকে বাগানে বের করে আনো। সে ওই স্ট্যাচু নিয়ে পুতুল খেলে। ওর গায়ে গরিলার মতো বড়ো বড়ো লোম। কী? ঠিক বলছি তো?
সিংকাকুর চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে। দেবুর মুখের দিকে অবাক বিস্ময়ে অপলক তাকিয়ে রয়েছে। ঢোঁক গিলছে। প্রচণ্ড নার্ভাসকথা সরছে না মুখে। দেবু সিংকাকুর খাটের পাশেই রাখা জলের বোতলটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “জল খাও, কাকু। তারপর পুরোটা বলো আমাদের।”
সিংকাকু ঢক ঢক করে জল খেয়ে মুখটা একবার মুছে গলার স্বর বের করল“তুমি এত কিছু জানলে কী করে?”
দেবু বলল, “কাল রাতে আমি নিজে এসে সব দেখে গেছি পাঁচিলের ওপাশ থেকে। তাই আমায় আর মিথ্যে বলে ভোলাতে পারবে না, কাকু।”
সিংকাকু দ্বিগুণ অবাক। বলল, “তুমি রাতে একা একা চলে এসেছিলে? ও যদি তোমায় দেখে ফেলত, আজ তুমি থাকতে না গো! এমন সাহস তোমার? এই কাজ কেউ করে?
দেবু বলল, “যখন দেখেইনি, যখন আমি থেকেই গেলাম আজ, তখন তোমায় বলতেই হবে কাকু। বলো বলো ও কে কাকে তুমি দিনভর পাহারা দিয়ে এই বন্ধ বাড়িটাতে আগলে রাখো?”
সিংকাকুর মন মনে হল এবার নরম হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কিছু ভাবছে। তারপর মুখটা ঈষৎ তুলে বলতে আরম্ভ করল, “নাছোড়বান্দা তোমরা। শুনবেই যখন, তো শোনো। এই গল্পের শুরুটা বছর খানেক আগের। তোমরা তো বলো এটা সিংকাকুর ভূতের বাড়িপাড়ার সবাই তাই জানে। কিন্তু এ-বাড়িটা আমার নয়। এখানে আমি চাকরি করি মাত্র। আমার বেশিদূর পড়াশোনা নয়তবে যেটুকু যা পড়েছি তাতেই মানবেন্দ্রবাবুর আমাকে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল ওঁর পি.এ. হিসেবে।
“কলকাতার নামকরা ল-ইয়ার শ্রী মানবেন্দ্র চট্টরাজ। আমি ওঁর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে অনেক বছর কাজ করেছি। ভোম্বল তখন কত ছোটো!শুধু মাথায় লম্বা। মানব স্যারের ছোটো ছেলে। ছেলেটা বরাবরই বহির্মুখী। একটু বড়ো হতেই আয়ুর্বেদচর্চা করবে বলে উত্তর ভারতের পাহাড়ে পাহাড়ে চলে যেত। গুরু পেয়েছিল একজনকে হরিদ্বারে। সেই গুরু মাঝে মাঝে স্যারের কলকাতার বাড়িতেও আসতেন।
“একবছর আগে একদিন ওই গুরুর সঙ্গেই অনেকদিনের জন্য কোথাও চলে গেল ভোম্বল। বাড়ি ফেরার নামগন্ধ নেই। ওর বাবা, মা, পরিবার, বন্ধুবান্ধব সবাই খুব চিন্তিত। অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গোয়েন্দা-পুলিশ লাগিয়ে ছেলেকে তো উদ্ধার করা হল। সে তখন অন্য দেশে। মালয়েশিয়ার জঙ্গলে।
“বাড়ি ফিরে সে ছেলে অন্য মানুষ। গায়ে-হাতে-পায়ে লোমগুলো অসম্ভব বেড়ে গেছে। দাড়ি এত্ত লম্বা। ঠিক যেন এক জংলি সাধুবাবা। ছেলেটা ফিরে আসার পর ওর পুঁটলিতে কোনও গাছগাছড়া বা জড়িবুটি নয়, একটা ডায়েরি পাওয়া গিয়েছিল যেটাতে ভোম্বলবাবা কয়েক মাস আগে অবধি নিয়ম করে লিখত। সেই ডায়েরি পড়ে তো মানব স্যার আর পরিবারের লোকজনের চোখ মাথায়। আমাকেও সে ঘটনা জানতে হয়েছিল, কারণ ভোম্বলবাবার ভবিষ্যতের দায়িত্ব এরপর আমার ওপরেই বর্তাতে চলেছে।”
আমি মৃদুভাবে জানতে চাইলাম, “ডায়েরিতে কী লেখা ছিল?
“সেটাই তো বলছি। শোনো, আমি তো বেশি লেখাপড়া জানা মানুষ নই। যেটুকু বুঝেছি বলছি। মালয়েশিয়ায় এক ধরনের মাশরুম পাওয়া যায়, তার নাম প্রোটেনজি। এই মাশরুমের গুণ হল মানুষের শরীরের শক্তি বাড়িয়ে তোলে বহুমাত্রায়। আয়ুর্বেদে এর গুণাগুণ সমস্ত বিশ্বের লোক জানেন। কিন্তু যেটা কেউ জানেন না তার হদিশ পেয়েছিলেন ভোম্বলের গুরুদেব। তিনি শিষ্যকে নিয়ে সেই মালয়েশিয়ার জঙ্গলেই ঘুরে ঘুরে খোঁজ পেলেন এমন এক মাশরুমের যা প্রোটেনজির থেকে কয়েকশো গুণ শক্তিশালীসেই মাশরুম সব জায়গায় পাওয়া যায় না। দুর্গম এক পর্বত গুহায় পৌঁছে মাত্র কিছু সংখ্যক সেই আশ্চর্য মাশরুমের সন্ধান পান গুরুদেব। আর তার প্রয়োগ শুরু করেন শিষ্যের ওপর। কিছুদিন নিয়মিত সেবনে ভোম্বলের শরীরে আসতে শুরু করে অদ্ভুত এক পরিবর্তন। সারা দিন ঘুম পায়। ঝিমোতে থাকে সে। আর সন্ধে গড়িয়ে অন্ধকার ঘন হলেই সব ঘুম উবে যায় কোথায়। তখন ও ছেলেমানুষের মতো ওই পাহাড়ি গুহার আশেপাশে ছুটে বেড়ায় আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বড়ো বড়ো পাথরের চাঁইগুলোকে নিমেষে দু’হাত দিয়ে তুলে লোফালুফি খেলতে শুরু করে।
“ওর এই কাণ্ড দেখে গুরুদেব রীতিমতো ভয় পেয়ে যান। ইতিমধ্যে ভোম্বলের গায়ে লোমগুলো জন্তুদের মতো বড়ো হতে শুরু করে। একদিন সকালে ঘুমের আগে যেন ক্ষীণ কন্ঠে ও শুনেছিল গুরুদেব বলছেন, তোমাকে সঙ্গে রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তুমি ক্রমেই বিপজ্জনকভাবে শক্তিধর হয়ে উঠছএদিকে তোমার বুদ্ধি দিন কে দিন শিশুদের মতো হয়ে যাচ্ছে। কবে আমায় বল ভেবে বড়ো পাথর ছুড়ে মেরে ফেলবে তার ঠিক নেই। তাই এখন থেকে তুমি একাই থাকো। আমি চললাম।
“এই পর্যন্ত ভোম্বল তার ডায়েরিতে লিখেছিল। তারপর মনে হয় ঘুমিয়ে উঠে গুরুদেবকে আর দেখতে না পেয়ে মনের দুঃখে দিন কাটাচ্ছিল একা একা। এরপর ওর স্মৃতি ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে বলে অনুমান করা হয়।
“উদ্ধারকারীরা ভোম্বলবাবার ঘুমন্ত শরীরটাকে তুলে নিয়ে এসে বড়ো খাঁচা-ভ্যানে পোরে। কারণ ওকে দেখতে এমন বীভৎস হয়েছিল যে ওঁরা আশংকা করেছিলেন জেগে উঠে এই অতিকায় মানুষটা সাংঘাতিক কিছু কাণ্ড ঘটাতে পারে। ওঁদের অনুমান যে ভুল নয় তার প্রমাণ পরে পেয়ে যতদিন না পরিবারের হাতে তুলে দিতে পারছে, ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে রাখা হত ভোম্বলবাবাকে সকাল বিকেল। বাড়িও ফিরেছিল ও ঘুমন্ত অবস্থাতেই।
“ডায়েরি পড়ে তো এরপর সবার চোখ কপালে। ছেলেকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রেখে দেবার প্ল্যান করলেন মানব স্যার। এছাড়া আর কোনও উপায়ও তো ছিল না। এই প্রান্তিকের বাড়িটা আগে ছিল স্যারদের বেড়াতে আসার বাড়ি। পরে হয়ে গেল ভোম্বলবাবাকে বন্দি করে রাখার স্থায়ী ঠিকানা। আমি থেকে গেলাম পাহারায়। আর কেউ এ-বাড়িতে আসে না। ক্রমে এটা পরিত্যক্ত বাড়ি হয়ে গেল। আমি নিজেই ভোম্বলবাবাকে বাগানের স্ট্যাচুদের সঙ্গে খেলতে শেখালাম। ছেলেটা এখন একদম শিশুর মতো। কিন্তু ওর গায়ের শক্তি এতটাই যে ও কখন কাকে কী করে বসবে নিজেই জানে না।”
আমাদের সবার গলা শুকিয়ে কাঠ। জলের বোতল খুঁজে এক ঢোঁক জল খেয়ে দেবু বলল, “সিংকাকু, ও এখন ওই বন্ধ বাড়িটার ভেতরে ঘুমোচ্ছে? ও খায় কী? দুপুরে খায় না?
সিংকাকু বলল, “ওর খাওয়াদাওয়া অল্পই। বরং বেশিই অল্প। এই সন্ধের পরে যখন জেগে ওঠে, একবার দুধভাতে কলা-সন্দেশ মাখিয়ে খাইয়ে দিই একবাটি। ব্যস, ওর খাওয়া হয়ে যায়। তারপর খেলতে বেরোয়। নিজের মনে বাগানের স্ট্যাচুদের নিয়ে পুতুল ভেবে খেলে। আবার ভোর হবার আগেই ঘুমোতে চলে যায় বাড়ির ভেতরে। আমাকে খুব ভালোবাসে, তাই কিছু করে না। কিন্তু বাইরের লোক দেখে যদি খেলাচ্ছলেই কিছু ভারী জিনিস ছুড়ে মারে, তাহলে কী হবে ভাবতে পারছ? তাই আমি কোনও মানুষকে এ-বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষতে দিই না। ভূতের কথা সেই কারণেই চাউর করে দিয়েছি।”
আমি বললাম, “এখন তো দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আরও কিছু সময় বাকি আছে সন্ধে নামার। আমরা কি একবার ভোম্বলবাবাকে চোখের দেখা দেখে যেতে পারি?
দেবু আর দেশাইয়ের চোখেও একই আগ্রহ। সিংকাকু একটুক্ষণ মাথা নিচু করে কিছু ভেবে বললেন, “দেখবে? তাহলে এক ঝলক দেখেই বেরিয়ে আসতে হবে ও টের পাওয়ার আগে। একটু পরেই আমি খাবার নিয়ে ওর ঘরে ঢুকবতোমরা দূরে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ওকে দেখেই সোজা বেরিয়ে গেট পেরিয়ে চলে যেও। না হলে বিপদ হতে পারে।”
আমরা রাজিএরকম একটা অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকার সুযোগ কেই বা হারাতে চায়? সিংকাকু আমাদের জন্য কিছু আনতে গেল। আমরা মানা করছিলাম, শুনল না।
বসে আছি চুপ করে ওর ছোটো সিকিউরিটি রুমে। একটু পরে কাকু একটা প্লেটে কয়েকটা রসগোল্লা আর তিনটে পেয়ারা নিয়ে এল। “এই ছিল আমার স্টকে আজ খেয়ে নাও। এরপর কবে আসবে, আর দেখা হবে কিনা, সে সব তো জানি না।”
দেবু বলল, “দেখা হবে না বলছ কেন, কাকু? আমাদের তো এখানেই বাড়ি তৈরি হচ্ছে। যখনই আসব, তখনই দেখা হবে।”
সিংকাকুর মুখটা কেমন বিষণ্ণ দেখালবলল, “সে তো ঠিকই তোমরা আসবে যাবে। কিন্তু সত্যি বলি? তোমাদের সব বলে দিলাম বলেই বলছি। এই জিন্দেগি আমার আর ভালো লাগছে না। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।”
আমাদের মুখ থেকে কোনও উত্তর বেরোচ্ছে না। সিংকাকু ভোম্বলবাবাকে ভালোবাসে - খুবই ভালোবাসে, এটা সত্যি হলেও ওর জীবনটা যে অসহনীয় সে কথা আরও বেশি করে সত্যি। কিন্তু আমরা কী সমাধান দেব এর?
বাইরে সন্ধে হয়ে আসছে। দেবু বলল, “সিংকাকু, ভোম্বলবাবার খাওয়ার সময় হয়ে এলআমাদেরও বাড়ি ফিরতে হবে। আমরা ওঁকে একটু দেখে যাই তাহলে?
সিংকাকুকে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল। কিছু ভাবছিল যেন। হঠাৎ চমকে উঠে মাথাটা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমরা এসো আমার সঙ্গে।”
আমি, দেবু আর দেশাই সিংকাকুর পিছন পিছন এগিয়ে চললাম মূল বন্ধ বাড়ির দরজায়। বড়ো একটা তালা খুলে ভেতরে নিয়ে গেল কাকু আমাদের। বিরাট বাঁধানো উঠোনের চারদিকে সারি সারি ঘর। তার সঙ্গে টানা বারান্দা। একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল কাকু। সেই ঘরের দরজায় বেশ মোটাসোটা একটা লোহার চেন পেঁচিয়ে তালা লাগানো আছে। কাকু আমাদের একটু তেরছা করে দাঁড়াতে বলল ওই দরজাটার সামনে। তারপর বলল, “তোমরা যাকে দেখবে এখন, কথা দাও বাইরে বেরিয়ে তার কথা কাউকে কোনোদিন বলবে না। অনেক কষ্টে এতদিন আমি ওকে বাঁচিয়ে রেখেছি লোকজনের হাত থেকে। আর লোকজনও বেঁচেছে ওর হাত থেকে, সেটাও সত্যি। তোমরা কথা দিচ্ছ তো?
আমরা মৃদু গলায় তিনজনেই বললাম, “হ্যাঁ, কাকু। আমরা কথা দিচ্ছি, ওঁর কথা কেউ জানবে না।”
সিংকাকুকে আশ্বস্ত মনে হল। বলল, “ঠিক আছে তোমরা একটু দাঁড়াও। আমি ওর খাবার নিয়ে আসি।”
তারপর বারান্দার অন্য পাশে হন হন করে গিয়ে কোত্থেকে এক বাটি দুধভাত কলা ইত্যাদি মাখানো খাবার নিয়ে এসে এক হাতে দরজার শিকল থেকে তালা খুলতে লাগলআমরা দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। হার্টবিটের শব্দ এত জোরে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে যেন তিন জনই তিন জনের বুকের ধুকপুকুনি শুনতে পাচ্ছি।
দরজার পাল্লা অল্প খুলতেই ঘরের ভেতরে এক ঝলক যা দেখলাম তা সত্যিই হার্টফেল হবার মতো দৃশ্য। অবিকল একটা গরিলা যেন মেঝের ওপর থেবড়ে বসে আছে যার মাথাটা মানুষের মতো। বাচ্চা ছেলের মতো ঘ্যানঘ্যানে নাকি কান্নার সুরে সে সিংকাকুকে বলছে, “এত দেরি করলে কেন, কাকুমণি? আমার কখন থেকে খিদে পেয়েছে!” তারপর পা দাপাচ্ছে।
সিংকাকু বাচ্চাদের যেমন করে আহ্লাদ করা হয় সেই সুরে বলছে, “খেয়ে নাও, সোনা। তারপর তো খেলতে হবে। কত্ত মজা হবে। রাগ করো না।”
এরপর মনে হয় ও খাওয়ায় মন দিয়েছে। আমরা তিন জন চোখের ইশারা করে পা টিপে টিপে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির বাইরে। তারপর গেটের বাইরে পর্যন্ত কোনও শব্দ না করে বেরিয়ে এসেই যেন নিঃশ্বাস ছাড়লাম সকলে। দেশাই বলল, “এই অভিজ্ঞতাটা সারা জন্মের। এবার চল তাড়াতাড়ি পা চালাই। বোলপুরের পুজো দেখে ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন বলে খুঁজতে বেরিয়ে পড়বে সবাই।”
আমরা নিশ্চুপে ফিরছি আধো আলোছায়ার রাস্তায় পুজো-মণ্ডপের দিকে। ঝিঁঝিঁর ডাক প্রবল হচ্ছে ক্রমশ।

শেষটুকু

পুজোর ক’টা দিন বেশ ভালোই কাটল সবার। আমরা তিন জন শুধু কাউকে বুঝতে দিইনি এর মাঝে কী ভয়ানক এক অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে আমাদের।
পুজোর পরে কলকাতা ফিরে দেবুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ আবার বেড়ে গিয়ে আগের মতো হয়ে গেছে। এখন আমরা দু’জন এক জায়গায় বসে আড্ডা দিলেই দেশাইকে ফোন করি। তিন জন মিলেই তুমুল বকবক চলে।
সেদিন দেশাই দিল মর্মান্তিক খবরটা। সিংকাকু সেই বন্ধ বাড়ির ভেতরে গ্যাসের সিলিন্ডার ফেটে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। কিন্তু ওখানকার স্থানীয় লোকেরা বুঝতে পারছে না সিলিন্ডারটা রান্নাঘর ছেড়ে একটা অন্য ঘরে কীভাবে গেল। আর সিংকাকু ছাড়াও পুড়ে ছাই হওয়া আরেকজন মানুষের অবয়ব পাওয়া গেছে সেই ঘরেই। সেই মানুষটা কে!
_____
ছবিঃ সুমিত রায়

1 comment:

  1. এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম আপনার "বন্ধ বাড়ির রহস্য "! ছোটদের তো ভালো লাগবেই; আমরা যারা বড়রা তারাও বেশ উপভোগ করবে বলেই আমার বিশ্বাস ! রহস্যে ঘেরা বাড়ির আসল কারণ জানার জন্য বড়দেরও মন ব্যকুল হয়ে ওঠে ! বেশ ভালো লাগলো !অতিমানব হয়ে ওঠার কারনটিও কিছুটা বিঞ্জান সম্মত বলা যায় !

    ReplyDelete