গল্পের ম্যাজিক:: ভারি মজা - রেনে গসিনি; অনুবাদঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


ভারি মজা
রেনে গসিনি
অনুবাদঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী

সেদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়ে পথে অ্যালেকের সঙ্গে দেখা। আমায় দেখতে পেয়েই সে বলল, “এই নিকোলাস, ধর যদি আমরা আজ স্কুলে না যাই?” আমি বললাম, “ওরে বাবা! সে খুব দুষ্টুমির ব্যাপার হবে। স্কুলের স্যার তো রেগে যাবেনই, তাছাড়া বাবা আমাকে বলে, জীবনে বড়ো হতে গেলে, ভালো চাকরি-বাকরি পেতে হলে কঠোর পরিশ্রম করতেই হবে। মা’ও এসব শুনলে পরে খুব দুঃখ পাবে আর মিথ্যে কথা বলা যেহেতু পাপ, কাজেই সেটাও করা যাবে না।” অ্যালেক নাছোড়বান্দা। সে এত কিছু শোনার পরেও বলল, “আজ কিন্তু পাটিগণিতের ক্লাস আছে, মনে রাখিস।” অগত্যা আমায় তার প্রস্তাবে রাজি হতেই হল, স্কুলের পথে আর সেদিন গেলামই না দু’জনে।
বরং আমরা স্কুলের ঠিক উলটোমুখে টেনে ছুট দিলাম। অ্যালেক একটু পরেই হ্যা হ্যা করে হাঁপাতে হাঁপাতে স্টিম ইঞ্জিনের মতো ভসভসিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগল। ছুটতে গিয়ে খালি পিছিয়ে পড়ছিল। ওহ, বলা হয়নি, অ্যালেক নামে আমার এই বন্ধুটা বেশ গোলগাল, নাদুসনুদুস। ব্যাটা সবসময় কিছু না কিছু খেয়েই চলেছে। ফলে, দৌড়োদৌড়িতে সে খুব একটা কম্মের নয়। এদিকে আমি আবার চল্লিশ গজ দৌড়ে রীতিমতো ওস্তাদ। চল্লিশ গজ মানে আমাদের স্কুলের মাঠ যতটা লম্বা আর কী!
আমি তাড়া লাগাই ওকে, “আরে জলদি ছোট, অ্যালেক!”
“আমি এর চেয়ে জোরে আর পারব না রে!” এই কথা বলে অ্যালেক আরও কিছুটা হাঁপিয়ে-টাপিয়ে একেবারে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি ওকে যতই বলি এখানে এভাবে দাঁড়ানোটা ঠিক না। যে কোনও সময়ে আমাদের মা-বাবারা দেখে ফেললেই কেলেঙ্কারির একশেষতারপর আর আমাদের লোভনীয় পুডিংও খেতে দেবে না, ওদিকে সেই ভয়ানক স্কুল পরিদর্শক মশাই ধরতে পারলে আমাদের নির্ঘাত জেলে পুরবে। তারপর কেবল শুকনো রুটি আর জল খেয়েই দিন কাটাতে হবে। ঐসব খাওয়ার কথা শুনেই কিনা কে জানে, অ্যালেক ব্যাটা এমন জোরে দৌড়াতে লাগল, যে এবার আমিই ওর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলাম না।
বেশ খানিকটা ছুটে মা যেই দোকান থেকে আমার প্রিয় স্ট্রবেরি জ্যামটা কেনে, ঠিক সেই মুদি দোকানটা পেরিয়ে গিয়ে আমরা থামলাম“এখানে আমরা নিরাপদ, কী বলিস!” অ্যালেক বলল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে পকেট থেকে কিছু বিস্কুট বের করে খেতে আরম্ভ করল। কারণ, তার মতে নাকি, ভাত খাওয়ার পর ছুটোছুটি করলেই তার ভীষণ খিদে পেয়ে যায়।
“মতলবটা ভালোই ফেঁদেছিস অ্যালেক! যখনই ভাবছি বাকিরা সব এখন স্কুলে বসে কঠিন কঠিন পাটিগণিতের অঙ্ক কষছে, হাসতে হাসতে আমার পেটে প্রায় খিল ধরে যাচ্ছে।”
“আমারও রে”, অ্যালেক বলল। আমরা দু’জনে মিলে আরও একচোট হাসলাম। হাসি-টাসি থামলে অ্যালেককে জিজ্ঞেস করলাম, “এবার কী করা যায় বল তো?”
“কিচ্ছু মাথায় আসছে না,” একটু থেমেই ফের অ্যালেক বলল, “সিনেমা দেখতে যাবি?”
খাসা বুদ্ধি। তবে মুশকিল একটাই, সিনেমা দেখার পয়সা আমাদের কাছে ছিল না। দু’জনের পকেট ঝেড়েঝুড়ে সাকুল্যে কয়েকটা সুতো, মার্বেলের গুলি, দুটো গুলতির ফিতে আর ক’টা চিনেবাদাম বেরোল। চিনেবাদামগুলো বলাই বাহুল্য অ্যালেকের পকেটে ছিল আর সে পত্রপাঠ সেগুলো গলাধঃকরণ করল। আমি বললাম, “আচ্ছা বেশ, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সিনেমা নাই বা দেখা হল, তবু বাকি সবার চেয়ে আমরা আজ ঢের মজায় আছি।”
“সে আর বলতে! যাই হোক, এমনিতেও আমার ঐ পবনচাঁদের প্রতিশোধ দেখার খুব একটা শখ ছিল না।”
“যা বলেছিস, আমারও ইচ্ছে ছিল না। মানে, কী সব বস্তাপচা সিনেমা, ছোঃ!” আমিও অ্যালেকের কথায় সায় দিলাম।
তারপর আমরা গটগটিয়ে সিনেমা হলের সামনে দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলাম। দেয়ালের পোস্টারগুলোর মধ্যে একটা জনপ্রিয় কার্টুন সিনেমার বিজ্ঞাপনও ছিল বটে, তবে সেদিকে আমরা আর তাকালাম না।
“আচ্ছা, ঐ গোল বাগানটায় গেলে কেমন হয়? কাগজের বল বানিয়ে বেশ খেলা যাবে,” আমি প্রস্তাব দিলাম। অ্যালেক বলল, “মন্দ বলিসনি। তবে সেখানেও একটা সমস্যা আছে। বাগানের টহলদার লোকটা আমাদের দেখে ফেললে যদি জিজ্ঞেস করে আমরা স্কুলে না গিয়ে ওখানে কী করছি, তখন তো ধরা পড়ে যাব। তারপর আমাদের সেই কোন একটা ছোট্ট ঘরে তালাচাবি দিয়ে বন্দি করে রেখে দেবে, আর স্রেফ রুটি-জল খেতে দেবে।” ঐ পরিস্থিতির কথা ভেবেই অ্যালেক ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ল। ব্যাগের ভিতর থেকে একটা চিজ স্যান্ডউইচ বের করে গপগপিয়ে খেতে খেতেই হাঁটতে শুরু করল। রাস্তা ধরে চুপচাপ অনেকটা চলে আসার পর অ্যালেকের স্যান্ডউইচ খতম হল, তখনই সে বলল, “আচ্ছা স্কুলে বাদবাকি ছেলেগুলো তো তেমন মজা করতে পারছে না, বল?”
“আরে না না। এমনিতেও এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন স্কুলে গেলে নির্ঘাত আমাদের শাস্তি দেবে,” আমি তাকে আশ্বস্ত করি।
সামনে বেশ ক’টা দোকান ছিল। তাদের কাচের জানলার দিকে আমরা একদৃষ্টে চেয়ে ছিলাম। অ্যালেক একটা রেস্তোরাঁর মেনুতে যা যা লেখা ছিল সব দেখে দেখে গড়গড় করে পড়ে শোনাতে থাকল আমায়। তারপর ঐ সুগন্ধী আতর আর প্রসাধনী জিনিসের দোকানের কাচে আমাদের ছায়া দেখে দু’জনেই কিম্ভূতকিমাকার সব মুখ করে নিজেদের ছায়াকেই ভেংচি কাটতে লাগলাম। তবে সেটাও বেশিক্ষণ করতে পারলাম না, কারণ দোকানের ভিতরের লোকগুলো আমাদের কীর্তি বেশ সন্ধিগ্ধ চোখে দেখছিল। তারা অবাকও হচ্ছিল নিশ্চয়ই। ওখান থেকে এগিয়ে গয়নার দোকানের ঘড়িটার দিকে নজর গেল আমাদের। এখনও কিছুই বেলা হয়নি বলতে গেলে
“দারুণ! বাড়ি যাওয়ার আগে এখনও আমাদের হাতে মজা করার অফুরন্ত সময় রয়েছে,” আমি বললাম। সত্যি বলতে, এই হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে আমরা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিলাম, তাই অ্যালেক বলল, “চল না ভাই, কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিই।”
কাছেই একটা পরিত্যক্ত ফাঁকা জমির মতো ছিল, আশেপাশে কাউকে দেখাও যাচ্ছিল নাওখানে বসাই যায়, ভাবলাম। জায়গাটা বেশ ভালোই। এখানে ওখানে নানা বাতিল জিনিস পড়ে আছে। আমরা পাথর, খোলামকুচি কুড়িয়ে ফাঁকা টিনের কৌটোতে টিপ করে ছুঁড়ে মারতে লাগলাম। তবে সে আর কতক্ষণ ভালো লাগে? বসে পড়লাম মাটিতেই। অ্যালেক আবার ব্যাগ থেকে একটা মাংসের পুর দেওয়া স্যান্ডউইচ বের করে খাওয়া শুরু করল। এই মনে হয় ওর শেষ স্যান্ডউইচ, আর নেই। “ওরা সব এখনও পিলে চমকানো অঙ্ক নিয়ে বসে আছে ক্লাসে, হ্যা হ্যা!” মুখভর্তি খাবার নিয়ে অ্যালেক যেই না এই কথা বলেছে, অমনি আমি চিড়বিড়িয়ে প্রতিবাদ করে উঠি, “মোটেও না! এতক্ষণে টিফিন হয়ে গেছে।”
“হুহ! টিফিন হলেই বা কী? টিফিনবেলায় তুই বুঝি খুব মজা করতিস?”
“তা তো বটেই,” বলেই কে জানে কী হল, আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম।
মুখে যাই বলি, এবার তো মানতেই হবে, এই যে আমরা স্কুল পালিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তাতে প্রথমে যতটা ভেবেছিলাম তার কিছুই মজা হচ্ছে না। একে করার মতো তেমন কিছু নেই, তার উপর ধরা পড়ার ভয়ে লোকজনের থেকে লুকিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আর যদি না অ্যালেক হতভাগার সঙ্গে আজ সকালে দেখা হত, আমি তো সোজা স্কুলেই যেতাম, সে যতই পাটিগণিতের ক্লাস থাকুক না কেন। ওর সঙ্গে জুটি বেঁধে না পালালে এতক্ষণে টিফিনবেলায় বাকি বন্ধুদের সঙ্গে আমি হয় মার্বেল গুলি খেলতাম বা চোর পুলিশ খেলতাম।
“আরে অমন ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন?” অ্যালেক বিরক্ত হয়ে বলল।
“সব তোর দোষ! তোর জন্য আমি আজ চোর পুলিশ খেলতে পারলাম না। ভ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ...”
“মানে? আমার দোষ? আমি কি তোকে আমার সঙ্গে আসতে জোর করেছিলাম নাকি?” অ্যালেক খেপে গেল, “বরং তুই যদি না আসতিস তবে আমিও তো আর একা একা কামাই করতাম না আজ! আমিও স্কুল যেতে পারতাম। তাই দোষটা যদি কারও হয়ে থাকে সেটা তোর!”
“ওহ তাই বুঝি?” আমাদের প্রতিবেশী বিলিংস বাবু মাঝেমধ্যে বাবাকে বিরক্ত করলে বাবা যেমন ব্যঙ্গের সুরে ওঁর সঙ্গে কথা বলে, আমি অবিকল সেই সুরটা নকল করে অ্যালেককে বললাম।
“আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই!” কী আশ্চর্য, অ্যালেকও অবিকল বিলিংস বাবুর মতো সুরেই জবাব দিল। তারপর আমাদের মধ্যে একটা বেদম হাতাহাতি হল, বাবা আর বিলিংসবাবুর মধ্যেও প্রায়ই যেমনটা হয়ে থাকে।
আমাদের মারপিট শেষ হতেই বৃষ্টি নামল। তখন আমরা পড়িমরি করে ঐ পরিত্যক্ত জমি ছেড়ে দৌড় দিলাম। কাছাকাছি কোনও একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই হল। বৃষ্টি ভিজলে মা যা রাগ করে! আমি তো আবার মায়ের কথা একটুও অমান্য করি না, মানে প্রায় কখনওই করি না।
অ্যালেক আর আমি সেই গয়নার দোকানের বড়ো জানলাটার তলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে দোকানের বড়ো ঘড়িটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা দু’জন একাই দাঁড়িয়েছিলাম সেখানে। নাহ, সত্যি, তেমন কিছু মজাই হল না আজ। কত কী ভেবেছিলাম, হায়। তবে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়টা না আসা অবধি আমরা বাড়িমুখো হলাম না কিন্তু। অপেক্ষা করলাম সেখানেই।
বাড়ি ফিরতেই মা বলল, আমায় নাকি খুব ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। এতটাই, যে ইচ্ছে করলে আমি পরের দিন স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে বিশ্রামও নিতে পারি। সেটা শুনে যখন আমি সজোরে ‘না’ বললাম, মা বেশ অবাকই হল। স্কুলে যাওয়ার এত ইচ্ছা!
ব্যাপারটা আসলে অন্য। পরদিন স্কুলে গিয়ে অ্যালেক আর আমি যখন বাকিদের বলব ‘গতকাল স্কুল কামাই করে আমরা কী মজাটাই না করেছি’ – আর সেই শুনে তারা সব হিংসায় জ্বলেপুড়ে লাল হয়ে যাবে, সেটা ভারি আমোদের ব্যাপার হবে। তোমরা কী বলো?

------
মূল গল্প – Having Fun; লেখক - রেনে গসিনি
------
সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতিঃ ফরাসী লেখক রেনে গসিনি (১৯২৬ - ১৯৭৭) শিল্পী অ্যালবার্তো ইউদেরজোর সঙ্গে যৌথভাবে জগদ্বিখ্যাত কমিকস চরিত্র অ্যাসটেরিক্সের স্রষ্টা। তিনি একাধারে কমিকস লেখক তথা সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি ছোটোদের জন্য লিখেছেন বেশ কিছু গল্প। Having Fun গল্পটি তাঁর রচিত Nicholas and the gang at school নামে গল্পসংকলন থেকে গৃহীত।
------
ছবিঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী এবং আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment