বিজ্ঞান:: একটা লম্বা সফরের কাহিনি (৫ম পর্ব) - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

আগের পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করো – প্রথম পর্বদ্বিতীয় পর্বতৃতীয় পর্ব, চতুর্থ পর্ব


একটা লম্বা সফরের কাহিনী
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

।। পর্ব পাঁচ ।।

গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে ডারউইনের অভিযানের কথা লিখবার আগে জায়গাটার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। অতএব খানিকক্ষণের জন্য তরুণ বিজ্ঞানীকে ছেড়ে এস আমরা দ্বীপমালার গল্প শুনে নিই।
দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর নামের দেশের উপকূল থেকে প্রায় হাজারখানেক কিলোমিটার ভেতরে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকে দ্বীপের এই দল। তার মধ্যে উনিশটা বড়ো দ্বীপ, আর ছোটোখাটো ভূখণ্ড মিলিয়ে আছে মোট ১২৭টা ভূখণ্ড। তাকে ঘিরে তিনটে মহাসাগরের স্রোত এসে একে অন্যের সঙ্গে মেশে। এখনও তার মধ্যে প্রকৃতির সৃজনকার্য চলেছে। ঘনঘন ভূকম্প আর অগ্ন্যুৎপাত তার সাক্ষ্য দেয়।
গভীর সমুদ্রের মধ্যে একলাটি নির্জনে দাঁড়িয়ে থাকা, তিন মহাসাগরের স্রোতের মিশেলে হওয়ায় অসামান্য জীববৈচিত্র্য আর পৃথিবীমায়ের ঘন ঘন মাথা নাড়ানোর দাপট, এই তিনে মিলে কোটি কোটি বছরের চেষ্টায় এই দ্বীপমালায় এমন সমস্ত জীবের সৃষ্টি করেছে, দুনিয়ার আর কোথাও যাদের দেখা মেলা ভার। স্থলবাসী ইগুয়ানা, দানব কচ্ছপ, রাক্ষুসে আকারের ক্যাকটাস আর অজস্র জাতের ফিঞ্চ যেমন।
দ্বীপগুলোর চারপাশ ঘেরা সমুদ্রের জলে ডুব দিলে চমকে যেতে হয় প্রবাল থেকে হাঙর অবধি অজস্র জীবের বিচিত্র সব প্রজাতির ভিড় দেখে। আর শুধু প্রাণীই নয়। এখানকার সমুদ্রের তলাকার ভূপ্রকৃতির বিচিত্র সব অদ্ভুতুড়ে গড়ণও চমকে দেয়। তিনটে মহাসাগরীয় স্রোতের মতোই তিনটে আলাদা টেকটনিক প্লেট এখানকার সমুদ্রের তলায় এসে একে অন্যকে ছুঁয়েছে। তারা হল, নাজকা প্লেট, কোকোজ প্লেট আর প্যাসিফিক প্লেট।
গ্যালাপাগোসের দ্বীপগুলোর অনেকেই বেশ বড়ো বড়ো হলে কী হয়, বয়সে তারা বেজায় খাটো। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বুড়ি যারা, সেই এসপানোলা আর সান ক্রিস্টোবাল-এর বয়েস মাত্র পঞ্চাশ লক্ষ বছর। আর বয়সে সবচেয়ে ছোটো যারা, ভূপ্রাকৃতিক কাণ্ডকারখানাদের তুলনায় তারা প্রায় সবে জন্মানো শিশু। তাদের নাম ইসাবেলা আর ফার্নান্দিনা। বয়েস দশ লাখ বছর।
কিন্তু এমন নির্জনে, মূল ভূখণ্ড থেকে এত দূরে থাকা নবীন দ্বীপমালার মাটিতে এতসব অদ্ভুত প্রাণী আর গাছগাছড়া এল কোথা থেকে? প্রশ্নটা সেই ডারউইনের গ্যালাপাগোস যাবার পর থেকেই মানুষকে অবাক করেছে। বারো ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী মেলে এখানে যাদের পৃথিবীর আর কোথাও দেখা মেলে না। তার ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদজগতে ১৮০ ধরণের উদ্ভিদ আর প্রায় তিন হাজার প্রজাতির জলজ জীবের মধ্যে সাড়ে পাঁচশো ধরণের জলজ প্রাণী পৃথিবীর আর কোথাও শেকড় ছড়ায়নিতারা এলো কোথা থেকে তবে?
মাত্র চারটে দ্বীপে মানুষ থাকে এই দ্বীপমালায়। পাঁচ নম্বর একটা দ্বীপে আছে শুধু মিলিটারি বেস আর বিমানবন্দর। দ্বীপদের ঘিরে মাথা দোলায় সোয়া লক্ষ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি মেরিন রিজার্ভ বা সংরক্ষিত সমুদ্র বাস্তুতন্ত্র। দুটো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।  বাল্টা আর সান ক্রিস্টোবাল। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাবার জন্য একটা ছোটো বিমানবন্দরও রয়েছে এখানে, ইসাবেলা দ্বীপে। জনসংখ্যা ৩০,০০০। ট্যুরিস্ট আসে বছরে প্রায় দু’লাখ।
গ্যালাপাগোসের কিছু নিজস্ব ম্যাজিক আর মজা আছে। যেমন ধরো, এখানকার যে জীবজানোয়াররা রয়েছে, তারা কোনও অজ্ঞাত কারণে মানুষকে ভয় তো পায়ই না, বরং মানুষের ব্যাপারে তাদের বেজায় কৌতূহল। সুযোগ পেলেই কাছে এসে দেখে। এখন আমরা খানিক সভ্য হয়েছি, তাই তাতে তাদের ক্ষতি কিছু হয় না। কিন্তু কিছুকাল আগে পর্যন্ত ওই কৌতূহলী আর নির্ভীক স্বভাবের জন্য এই দ্বীপমালার কত যে জীব মানুষের হাতে শেষ হয়ে তার খাবার হয়েছে তার লেখাজোখা নেই।


আবার আরেক দিকে, এখানে মানুষ আসবার আগে যত গাছপালা আর জীবজন্তু ছিল তার শতকরা পঁচানব্বই ভাগ এখনও একইরকমভাবে টিকে গেছে। পৃথিবীর আর কোথাও কোনও বাস্তুতন্ত্র এত ভালোভাবে প্রকৃতির পাগলামো আর মানুষের সভ্যতার বিষকে একইসঙ্গে হজম করে টিকে থাকতে পারেনি। মরে গেছে, হারিয়ে গেছে, বদলে গেছে। কিন্তু গ্যালাপাগোসে তারা নির্বিকার। দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে বিবর্তনের ঘড়িটাকে প্রায় থামিয়ে রেখে। কেমন করে? ম্যাজিক!
এবারে গ্যালাপাগোসের আরেক মজার জিনিস বলি শোনো।
এখানে একটা পোস্ট অফিস আছে। বলবে তাতে হলটা কী? সে তো সব জায়গাতেই থাকবে। মানুষ থাকলেই পোস্ট অফিস থাকবে। তাছাড়া যেখানে তিনখানা এয়ারপোর্ট সেখানে তো...
আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, গল্পটা শোনো শুধু। এখানকার ফ্লোরিয়ানা দ্বীপে যে পোস্ট অফিসটা আছে সেখান থেকে দুনিয়াশুদ্ধু চিঠি যায় ডাকটিকিট ছাড়াই। কোনও পিয়ন-টিওন নেই। কমপিউটার নেই, কিচ্ছু নেই। খালি অদ্ভুতুড়ে ডাকবাক্স রয়েছে একখানা।
এই পোস্ট অফিসের জন্ম সপ্তদশ শতাব্দীতেদ্বীপমালায় তখন কোনও মানুষ থাকত না। আশপাশের সমুদ্রে তখন অনেক তিমি শিকারি জাহাজ মাসের পর মাস ডাঙা থেকে দূরে ঘুরে ঘুরে বেড়াত মাঝে মাঝে এই দ্বীপের কাছে এসে নোঙর ফেলত সেই সব জাহাজ, একটু বিশ্রাম নেবার জন্য। হোক না জলা-জঙলা জায়গা। নাই বা থাকল কোনও মানুষ! তবু দু-একদিনের জন্য পায়ের নিচে একটুখানি ডাঙার ছোঁয়া তো!
তা এদের মধ্যেই কোনও এক জাহাজের লোকজন একবার একটা বুদ্ধি করল। তাদের খুব ইচ্ছে বাড়িতে একখানা করে চিঠি পাঠায়। মাসের পর মাস জলে ভাসছে কিনা! বাড়ির লোক কত ভাবছে তাদের নিয়ে কে জানে! তাই তারা করল কী, এই দ্বীপে হাঁফ ছাড়তে নেমে একদিন একটা খালি পিপে এনে দাঁড় করিয়ে দিল শক্তপোক্ত করে। তারপর পিপের ভেতর যার যার বাড়ির ঠিকানা লেখা একগাদা চিঠি রেখে দিয়ে তারা ফের ফিরে গেল সমুদ্রের বুকে।
পিপের গায়ে লেখা রইল একটা অনুরোধ, অন্য কোনও জাহাজ যখন এখানে ভিড়বে, তখন তার নাবিকরা যেন পিপের থেকে চিঠিগুলো বের করে তার ঠিকানা দেখে নেয়। যদি কারও বাড়ির কাছাকাছি ঠিকানা লেখা চিঠি তাতে মিলে যায়, তবে সে যেন সে-চিঠি নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দেয় তার ঠিকানায়।
কায়দাটা এরপর আশ্চর্যভাবে টিকে গেল। শুরু হয়ে গেল বিচিত্র চিঠিচালাচালির পদ্ধতি। এরই মধ্যে কেউ একজন পোস্ট অফিসটার নামও রেখে দিয়েছিল একটা। হ্যাথওয়ে’জ পোস্ট অফিস।
১৮১৩ সালে ডেভিড পোর্টার নামের এক জাহাজি ক্যাপ্টেন প্রথম তাঁর বই ‘জার্নাল অব আ ক্রুজ’-এ এই পোস্ট অফিসের কথা লিখে সবাইকে জানান। সে পোস্ট অফিসের চেহারা ছিল, একটা পিপের মাথায়  পেরেক দিয়ে আঁটা একটা বাক্স আর বাক্সের গায়ে ওই “হ্যাথওয়ে’জ পোস্ট অফিস” কথাগুলো লেখা। আর ভেতরে একগাদা নানান ঠিকানার চিঠি।
এর পঁচিশ বছর বাদে আরেক অভিযাত্রী জানাচ্ছেন, পোস্ট অফিসে আরেক রকমের চিঠি জমা হচ্ছে। বোতলের মধ্যে চিঠি ভরে মুখ ভালো করে আটকে সেখানে রেখে যাচ্ছে লোকজনওতে চিঠি রোদে-জলে ভেজবার ভয় রইল না আর। আশা, পরের কোনও মেছুরের জাহাজ এলে যদি চিঠির সে ঠিকানায় যাবার মতো কোনও নাবিক তাকে নিয়ে যায় সঙ্গে করে।
আসলে নাবিকরা ততদিনে জেনে গেছে, এ জায়গার আশপাশ দিয়ে কোনও জাহাজ গেলে তা এখানে একবার নোঙর করবেই। তার তিনটে কারণ। নিজেদের চিঠি রাখা, অন্যের চিঠি নিয়ে যাওয়া আর, সবচেয়ে লোভের কারণ হল, এখানকার সুস্বাদু দানব কচ্ছপের মাংস। আর এই কারণেই ডারউইন যখন দ্বীপমালায় পা রাখলেন তখন সব দ্বীপের মধ্যে এক এই ফ্লোরিয়ানাতেই তিনি একটাও দানব কচ্ছপ খুঁজে পাননি। সব খেয়ে সাফ করে দিয়েছে তদ্দিনে পোস্ট অফিসে আসা নাবিকের দল।


মজার ব্যাপার হল, দিনকাল বদলালেও এই হোয়াটস অ্যাপ ই-মেইলের যুগেও সে পোস্ট অফিসের কাজ বন্ধ হয়নি। আজও হাজারো চিঠি এই ‘পোস্ট অফিস বে’ হয়ে যাতায়াত করে। বেড়াতে আসা মানুষজন এই দ্বীপে এলে একবার সেই পোস্ট অফিসে ঢুঁ মারেন। তারপর ঠিকানা লেখা ছবির পোস্টকার্ড সেখানকার ব্যারেলে রেখে দিয়ে, সেখান থেকে নিজের দেশের কাছাকাছি এলাকার ঠিকানা লেখা কোনও চিঠি খুঁজে পেলে সেইটে তুলে নিয়ে ফিরে যান। তারপর দেশে গিয়ে তা নির্দিষ্ট ঠিকানায় পোস্ট করে দেন বা হাতে হাতে পৌঁছে দিয়ে আসেন চিঠিটা।
কাঠের ব্যারেলের আয়ু বেশিদিন তো হয় না। কিন্তু তাতে কী? একটা ব্যারেল খারাপ হয়ে গেলে কোনও না কোনও জাহাজি এসে তার বদলে সেখানে আর একটা ব্যারেল ঠিক রেখে দিয়ে যাবেন।
পিপে পোস্ট অফিসের চারপাশে জমে ওঠে ছোটো ছোটো কাঠের টুকরোতার গায়ে লেখা থাকে চিঠির লেনদেনের হাজারো রঙিন গল্প। আর, দ্বীপে ঘুরতে আসা মানুষদের ভালোবাসার স্মৃতিচারণে এমনি করেই রঙিন হয়ে থাকে সেই আজব পোস্ট অফিস।
(ক্রমশ)

No comments:

Post a comment