প্রবন্ধ:: বিশ্ব সাহিত্যে গোয়েন্দাদের বিচিত্র সমাবেশ - পল্লব বসু

বিশ্ব সাহিত্যে গোয়েন্দাদের বিচিত্র সমাবেশ
গোপন গোয়েন্দা সভা
পল্লব বসু

গোয়েন্দা গল্প পড়তে তোমাদের কেমন লাগে? আমার তো বেশ লাগে। তবে কী জানো, সত্যি গোয়েন্দা আর গল্পের গোয়েন্দাতে অনেক ফারাক। পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে যেসব অফিসারেরা আছেন তারা হলেন সত্যিকারের গোয়েন্দা। গল্পে যেসব গোয়েন্দাদের কথা আমরা পড়ি তেমন গোয়েন্দা বাস্তবে বড়ো একটা চোখে পড়ে না।
বিদেশি সাহিত্যে প্রথম জনপ্রিয় ডিটেকটিভ হলেন এডগার অ্যালেন পো’র ‘সি অগাস্টি দ্যুপা’তাঁর প্রথম আবির্ভাব ১৮৪১-এ ‘দ্য মার্ডার ইন রু মর্গ’ গল্পেএই গল্পটিকেই মনে করা হয় সাহিত্যে প্রথম গোয়েন্দা গল্প। সে সময়ে ডিটেকটিভ শব্দটাই ব্যবহার হত না।

‘রু মর্গ হত্যা রহস্য সমাধানে দ্যুপা’ (উৎস – আনন্দমেলার ছবি) (ছবি – ১)

তবে বিশ্বসাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা সম্ভবত স্যর আর্থার কনান ডয়েলের ‘শার্লক হোমস’। বিদেশি রহস্য সাহিত্যে তাঁর প্রবেশ ঘটে ১৮৮৭-তে ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ গল্পে। ২২১ বি, বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় ডাঃ ওয়াটসনের সঙ্গে ঘর ভাগাভাগি করে থাকা, এই লম্বা, রোগা, তীক্ষ্ণ নাসিকা, মুখে পাইপ মানুষটি রহস্য সমাধানের যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলি দেখিয়ে গেছেন, তা আজও সত্যিকারের গোয়েন্দাদের অবশ্য পাঠ্যবিষয়।

শার্লক হোমস (ছবি – ২)

শার্লক হোমস – ‘নৌবাহিনীর চুক্তি গায়েব’ গল্পে (উৎস - আনন্দমেলার ছবি) (ছবি – ৩)

শার্লক হোমসের পরেই জনপ্রিয়তায় যার নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন বেলজিয়ান ডিটেকটিভ আগাথা ক্রিস্টির ‘এরক্যুল পয়রো’। ১৯২০ থেকে ১৯৭৫-এর মধ্যে তাঁর ৩৩টি নভেল ও ৫০টি ছোটোগল্প প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর প্রথম গল্প ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইল’ ১৯২০-তে প্রকাশ পায়। ১৯৭৫-এ তাঁর শেষ গল্প ‘কারটেইন’ প্রকাশ পাওয়ার পর ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রথম পাতায় তাঁকে শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়েছিল।

আগাথা ক্রিস্টির এরক্যুল পয়রো ও মিস মার্পেল (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ৪)

বৃদ্ধা ‘জেন মার্পেল’ সেন্ট মেরি মিডের এক গ্রামে একাকী উল বোনার কাজ করতেন। ঘরে বসে বসেই তিনি ৩২টি রহস্যের সমাধান করেছিলেন। ১৯২৭ সালে তাঁর প্রথম গল্প বের হয় ‘দ্য রয়্যাল ম্যাগাজিনে’ – ‘দ্য ট্যুইসডে নাইট ক্লাব’ নামে। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘দ্য মার্ডার অ্যাট দি ভিকারেজ’ ১৯৩০-এ
গল্পের ডিটেকটিভদের আমরা প্রধানত চারটে দলে ভাগ করতে পারি। ‘শখের গোয়েন্দা’ হলেন মিস মারপেল, ফাদার ব্রাউনের মতো মানুষেরা, গোয়েন্দাগিরি যাঁদের পেশা নয়, নেশা। আবার ‘প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর’-দের কাছে অনুসন্ধানটা জীবিকানির্বাহের উপায়। এই দলে পড়েন হোমস, পয়রো, ফেলুদা এঁরা। গল্পেও ‘পুলিশের গোয়েন্দা’-রা আছেন, যেমন মর্স, ফ্রস্ট, সুশান্ত এবং ঘোষ। শেষ দলে আছেন ‘ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ’ যেমন, থর্ণডাইক, কুইন্সি।
বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বিদেশি গোয়েন্দার নাম না নিলেই নয়, যারা হলেন –
জি কে চেষ্টারটনের ফাদার ব্রাউনের ৫১টি গল্প বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এডওয়ার্ড স্ট্রাটমেয়ারের ন্যান্সি ড্রিউ স্কুলের ছাত্রী সমাধান করেছে বহু রহস্যের। আর অস্টিন ফ্রিম্যান তৈরি করেছিলেন ডাঃ জন থর্ণডাইকের চরিত্রটি।

ফাদার ব্রাউন – উৎস আনন্দমেলা (ছবি – ৫)

কমিকসের জগতে যে সমস্ত চরিত্র অপরাধ দমনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলেন টিনটিন। জর্জেস রেমি, যার ছদ্মনাম হার্জে, ২৪টি টিনটিন কমিক্সের সৃষ্টি করেছেন। ৭০-এর বেশি ভাষায় তা অনূদিত হয়েছে। ১৯২৯-এ বেলজিয়ান রিপোর্টার টিনটিনের অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয় ‘টিনটিন ইন দ্য ল্যান্ড অফ দ্য সোভিয়েত’ দিয়ে, আর শেষ হয় ১৯৮৩-তে অসম্পূর্ণ উপন্যাস, ‘টিনটিন অ্যান্ড আলফা আর্ট’-এ।

টিনটিন, ক্যাপ্টেন হ্যাডক, ক্যালকুলাস, কুট্টুস (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ৬)

কমিকসে আরেকজন বিখ্যাত চরিত্র হলেন অ্যালেক্স রেমণ্ডের রিপ কার্বি। ১৯৪৬ সালে তাঁর আবির্ভাব। তাঁর সহকারী ছিলেন ডেসমণ্ড। তাঁর প্রথম গল্প ‘দ্য চিপ ফ্যারাডে মার্ডার’

রিপ কার্বি ও সহকারী ডেসমণ্ড (উৎস – আনন্দবাজার পত্রিকা - ধারাবাহিক) (ছবি – ৭)

বিদেশি গল্পে কিশোর গোয়েন্দা হিসাবে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ‘ফেমাস ফাইভ’। এনিড ব্লাইটনের হাত ধরে ১৯৪২-এ ‘ফাইভ অন এ ট্রেজার আইল্যান্ড’ নভেলে এদের প্রথম প্রকাশ। জুলিয়ান, ডিক, অ্যানি, জর্জ আর তাদের কুকুর টিমিকে নিয়ে ওরা পাঁচজন বোর্ডিং স্কুলের ছুটিতে বেরিয়ে পড়ত বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চারে।

ফেমাস ফাইভ বা আনন্দমেলায় ধারাবাহিক প্রকাশিত ‘পঞ্চরত্ন’ (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ৮)

বাংলা সাহিত্যে অনেকটা যেন ফেমাস ফাইভের ধাঁচেই পাণ্ডব গোয়েন্দাদের নিয়ে এলেন ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়। বাবলু, বিলু, ভোম্বল, বাচ্চু, বিচ্ছু, আর ওদের কুকুর কানা পঞ্চুর প্রথম দেখা ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে শুকতারার পাতায়। ওঁরই সৃষ্ট আরেকটি কিশোর গোয়েন্দা চরিত্র গোয়েন্দা তাতার ১৯৮৯-এর মে মাসের আনন্দমেলায় তার প্রথম অভিযানের খবর মেলে। সম্ভবত তাকে নিয়ে সর্বমোট চারটি অভিযানের গল্প লিখেছিলেন ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়। শঙ্কু আর দেবু হল তার দুই বন্ধু।

বাবলু ও বিচ্ছু – পাণ্ডব গোয়েন্দা (উৎস – পূজাবার্ষিকী শুকতারা) (ছবি – ৯)

তাতার, দেবু আর শঙ্কু (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ১০)

এদের সঙ্গেই যার নাম মনে আসে, সে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় সমরেশ বসুর সৃষ্টি, গোগোল। বাবা সমিরেশ চ্যাটার্জী রাশিয়ান লেখক নিকোলাই গোগোলের একজন ফ্যান, তাই ছেলের নাম রেখেছিলেন গোগোল। গোগোলের বেশ কিছু গল্পে প্রাইভেট ডিটেকটিভ নৈহাটির অশোক ঠাকুর খুব বড়ো বিপদের হাত থেকে গোগোলকে উদ্ধার করেছেন। ওর বহু গল্পের মধ্যে উল্লেখ্য, ‘ইঁদুরের খুট খুট’, ‘জোনাকি ভূতের বাড়ি’, ‘সোনালি পাড়ের রহস্য’, ‘শিমুলগড়ের খুনে ভূত’, ‘পশ্চিমের ব্যালকনি থেকে’, ‘গোগোল চিক্কুস নাগাল্যান্ডে’, ‘ভুল বাড়িতে ঢুকে’ ইত্যাদি।

গোয়েন্দা গোগোল – ‘পশ্চিমের ব্যালকনি থেকে’ (উৎস – পূজাবার্ষিকী শুকতারা) (ছবি – ১১)

এঁদের সাথেই যার নাম মনে আসে, সেই আরেক কিশোর গোয়েন্দা আনন্দ বাগচির সুধন্য। ওর বাবার বন্ধু কমলেশ পুলিশের বড়কর্তা। আশির দশকের আনন্দমেলায় আবির্ভাব হয়েছিল এই গোয়েন্দার। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প-উপন্যাস – ‘মৃত্যুর টিকিট’, ‘নিখোঁজের খোঁজে’, ‘যেখানে বাঘের ভয়’, ‘রহস্যের আলোছায়া’, ‘আয়না’, ‘একটি প্যাঁচালো রহস্য’ ইত্যাদি।

গোয়েন্দা সুনন্দ – ‘যেখানে বাঘের ভয়’ (উৎস – পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা - ১৯৮৯) (ছবি – ১২)

আমরা সাহিত্যে দেখি, বহু গোয়েন্দারই সিরিজ লেখা হচ্ছে কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর বয়স বাড়ছে না। এক্ষেত্রে অন্যতম ব্যতিক্রম প্রতিভা বসুর গোয়েন্দা অন্তু। ছোট্ট অন্তু বেশ কয়েকটি রহস্যভেদ করেছিল। তারপর অন্তু বড়ো হয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসাবে আরও কিছু রহস্য দক্ষতার সঙ্গে ভেদ করেঅন্তুর সহকারী ছিলেন তাঁর দিদা হৈমন্তী দেবী। তাঁর ভালো নাম অতীন্দ্রিয় মিত্র (আন্তন)। তাঁর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গল্প ‘মাত্র কয়েক ঘণ্টা’

 
অতীন্দ্রিয় মিত্র বা অন্তু (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ১৩, ১৪)

আশাপূর্ণা দেবীর কলমে আমরা পেয়েছিলাম দুই অশিক্ষিত বেকার যুবক ট্যাপা আর মদনাকে, যারা প্রথম জীবনে ছিল চোর, এক মহৎ ব্যক্তিত্ব শ্রী জগবন্ধু বোসের হাত ধরে তাঁরা জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসেছিল। পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় প্রকাশিত ‘ছুটিতে ছোটাছুটি’-তে রাঁচি বেড়াতে গিয়ে জড়িয়ে গেল পাগলের ডাক্তার তালুকদারের অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গেকেয়ারটেকারের কাজ করতে গিয়ে ধরে ফেলল এক বিরাট স্মাগলার চক্রকে ‘কপাল খুলে গেল নাকি’ উপন্যাসে।

গোয়েন্দা ট্যাপা আর মদনা – ‘ছুটিতে ছোটাছুটি’ (উৎস – পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা) (ছবি – ১৫)

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টি পাঁচ কিশোর - পিণ্ডিদা, হোঁৎকা হাবুল, কেবলু, চটপটি আর সোনা এঁরা বেশ কিছু উপন্যাসে সুকৌশলে ধরে ফেলেছিল বেশ বড়ো বড়ো অপরাধীকে। ‘লিডার বটে পিণ্ডিদা’ উপন্যাসে কুখ্যাত ব্যাঙ্ক ডাকাত রাম বাদশাকে ধরে ফেলে দেওঘরে। এক সোনা চোরাচালান চক্রকে বামাল সমেত ধরে ফেলে পাটনায় ‘পিণ্ডিদা - হেভিওয়েট ফুটবল’ উপন্যাসেসংস্কৃত বিশারদ হাবুল হল পিণ্ডিদার মোসায়েব।

পিণ্ডিদা, সোনা, চটপটি, কেবলু, হাবুল – ‘পিণ্ডিদা – হেভি ওয়েট ফুটবল’ (উৎস – পূজাবার্ষিকী শুকতারা) (ছবি – ১৬)

কিশোর গোয়েন্দার জগত কিছুদিনের জন্য আলো করেছিল সুদীপ্ত মুখার্জ্জীর গোয়েন্দা সুধন্য, বিল্টু, আর তাদের ছোটকা। তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘ধোবিপাট’ব্যোমকেশ বক্সির মতো তিনি নিজেকে বলতেন ‘ছিদ্রান্বেষী সুধন্য’ – অর্থাৎ অপরাধীর রেখে যাওয়া ভুলের ছিদ্র দিয়ে তিনি ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোন।

সুধন্য, ছোটকা, বিল্টু – ‘ধোবিপাট’ (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ১৭)

এর সঙ্গেই উল্লেখ করা যায় রঞ্জিত চট্টোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা অভ্রদীপ, ‘সোনার আংটি উধাও’ উপন্যাসে তাঁর বুদ্ধিমত্তার কথা সবার নিশ্চয়ই মনে আছে?

অভ্রদীপ, জিপ নোলান (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ১৮)

সঙ্গে মনে পড়ে যায় সড়ক টহলদার গোয়েন্দা জিপ নোলানের কথা সড়কের বুকে ঘটে যাওয়া বহু অপরাধের দমন ঘটেছিল তাঁর হাতে।
প্রতিষ্ঠিত লেখকদের হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব হয়েছে বেশ কিছু তরতাজা যুবক গোয়েন্দার। তাঁদের মধ্যে জনপ্রিয়তার নিরিখে যার নামটি প্রথম পংক্তিতে আসে সে আঠাশ বছরের ছয় ফুট লম্বা, ফর্সা, বাঁ হাতে তিল, ঠোঁটের কোনায় ঝোলে চারমিনার, শ্রী প্রদোষ সি মিটার, ওরফ ফেলুদা। খুড়তুতো (নাকি মাসতুতো?) ভাই তপেশ রঞ্জন মিত্রের বয়ানে সত্যজিৎ রায়ের এক অমর সৃষ্টিতাঁর গল্পের কমিক রিলিফ হলেন রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু। ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ থেকেই পাঠকের মন জয় করে নিয়েছে ফেলুদা। ‘সোনার কেল্লা’ উপন্যাস থেকে জটায়ু হয়েছেন সঙ্গী।

ফেলুদা ও জটায়ু (ছবি - ১৯) উৎস - পূজাবার্ষিকী দেশ
‘নয়ন রহস্য’ (ছবি - ২০) ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ু; উৎস - পূজাবার্ষিকী দেশ
  
‘শকুন্তলার কণ্ঠহার’ ফেলুদা ও তোপসে; ছবি – ২১, ২২ – ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ (উৎস – এক ডজন গল্প)
সত্যজিৎ রায় ও ফেলুদা – ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’ (উৎস – ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’)(ছবি – ২৩)

সিদ্ধার্থ ঘোষের গোয়েন্দা হলডেন সায়েন্স ক্লাবের সেনাপতি মিহির ঘটক ও সৌমেনের বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও গল্প বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল যার মধ্যে কয়েকটি ‘একটি জলবৎ রহস্য’, ‘ভেরেশাগিনের ছবি’ ইত্যাদি। কলকাতা মিউজিয়ামের জব চার্নক মেমোরিয়াল হল থেকে চুরি যায় উনিশ শতকের রুশ শিল্পী ভেরেশাগিনের সিপাহী বিদ্রোহের পটভূমিতে আঁকা এক দুর্লভ পেইন্টিং তাই নিয়েই উপন্যাস ‘ভেরেশাগিনের ছবি’


গোয়েন্দা মিহির ঘটক ও সহকারী সৌমেন – ‘একটি জলবৎ রহস্য’ (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ২৪)

হিমানিশ গোস্বামীর কলমে উঠে এলেন আরেক গোয়েন্দা, কিট্টু লাহিড়ী। প্রকৃতি, বাঘাকাকাকে নিয়ে তাঁর আবির্ভাব ‘কিট্টুর গুরুলাভ’ উপন্যাসে।

কিট্টু, বাঘাকাকা ও প্রকৃতি – ‘কিট্টুর গুরুলাভ’ (উৎস – আনন্দমেলা) (ছবি – ২৫)

সমরেশ মজুমদারের পাকা হাতে আমরা পেলাম গোয়েন্দা অমল সোম আর তৃতীয় পাণ্ডবকে। ‘খুন খারাপি’ উপন্যাসে আবির্ভাবেই জয় করে নিয়েছিল পাঠকের মন। পরবর্তীকালে অমল সোম নিজেকে গুটিয়ে নিলে অর্জুন একাই বহু রহস্যের জট ছাড়িয়েছেন। তাঁর উপন্যাসে কমিক রিলিফ হয়ে এসেছেন মেজর। ‘সীতাহরণ রহস্য’, ‘লাইটার’, ‘জুতোয় রক্তের দাগ’, ‘বিশ বাঁও জল’ ইত্যাদি গল্পের হাত ধরে জলপাইগুড়ি থেকে অর্জুন পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপ, অ্যামেরিকায়।

অর্জুন – ‘জুতোয় রক্তের দাগ’ (উৎস – পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা) (ছবি – ২৬)

বিমল করের হাতে রিটায়ার্ড ম্যাজিশিয়ান কিকিরা বা কিঙ্কর কিশোর রায় হয়ে উঠেছেন একজন বিশিষ্ট রহস্যভেদী। যদিও তাঁকে গোয়েন্দা বলতে বিমল করের ছিল যথেষ্ট আপত্তি। চন্দন আর তারাপদকে সঙ্গে নিয়ে একে একে বহু রহস্যের সমাধান করেছেন তিনি। তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘যাদুকরের রহস্যময় মৃত্যু’, ‘রাজবাড়ির ছোরা’, ‘কাপালিকরা এখনও আছে’, ‘শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ ও কিকিরা’ ইত্যাদি।
কিকিরার পাশাপাশি আরেক রহস্যভেদী চরিত্রের আমদানি করেছিলেন বিমল কর তাঁর নাম ভিক্টর ঘোষ ‘হারানো ডায়েরির খোঁজে’ ঢাল পাহাড়ির পাহাড়-জঙ্গলে প্রকৃতির কোলে এক নতুন ধরনের রহস্যের আবহ তৈরি হয়েছে।

কিকিরা – ‘যাদুকরের রহস্যময় মৃত্যু’ (উৎস – পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা) (ছবি – ২৭)

মিস মার্পেলের মতোই বাংলা সাহিত্যেও আমরা পেয়েছিলাম প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের সদু-ঠাকুমাকে। তাঁর বিচক্ষণতায় সমাধান হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের।

ভিক্টর ঘোষ ও সদু ঠাকুমা (উৎস – পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা) (ছবি – ২৮)
গোয়েন্দা নাড়ুগোপাল ও সদু (সৌদামিনী) ঠাকুমা, প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত, উৎস আনন্দমেলা (ছবি – ২৯)

অদ্রীশ বর্ধনের গোয়েন্দা ইন্দ্রনাথ ও মৃগাঙ্ক যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিলরাধারমণ রায়ের গোয়েন্দা গণেশ হালদারের বেশ কিছু গল্প শুকতারার পাতায় কিশোর পাঠকের মন ভরিয়েছিল ‘গণেশ হালদারের হেঁয়ালি’ তার মধ্যে অন্যতমআনন্দমেলার পাতায় বেশ কিছু ডিটেকটিভের আবির্ভাব হয়েছিল যাঁদের সামান্য কয়েকটি গল্প পড়ারই সৌভাগ্য হয়েছে তাঁদের মধ্যে মীরা বালসুব্রামনিয়মের পুল্লা রেড্ডি (নন্দীবাড়ির নেকলেস গল্পে), প্রবীর ঘোষের আনন্দবাবু (নিরালম্ববাবা ও আনন্দবাবু গল্পে) এদের কথা বিশেষ উল্লেখ্য

ইন্দ্রনাথ ও মৃগাঙ্ক – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৩০)
গোয়েন্দা গণেশ হালদার – ‘গণেশ হালদারের হেঁয়ালি’ – উৎস – শুকতারা (ছবি – ৩১)
পুল্লা রেড্ডি – ‘নন্দীবাড়ির নেকলেস’ – উৎস আনন্দমেলা – (ছবি – ৩২)
গোয়েন্দা আনন্দবাবু – ‘নিরালম্ববাবা ও আনন্দবাবু’ – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৩৩)

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে কিশোর উপযোগী আরেক রহস্যসন্ধানী ব্যক্তিত্ব অচিরেই পাঠকের মন জয় করে নিলেন তিনি কাকাবাবু। ভাইপো সন্তু আর তাঁর বন্ধু জোজোকে নিয়ে সমাধান করেছেন অসংখ্য রহস্যের। তার মধ্যে অন্যতম – ‘ভয়ংকর সুন্দর’, ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’, ‘পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক’, ‘ভূপাল রহস্য’, ‘নীল মূর্তি রহস্য’, ‘বিজয়নগরের হিরে’, ‘রাজবাড়ির রহস্য’ ইত্যাদি।
কাকাবাবু – ‘নীল মূর্তি রহস্য’ – উৎস – আনন্দমেলা – ধারাবাহিক – (ছবি – ৩৪)

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ কিশোর সাহিত্যে একজন গোয়েন্দার আবির্ভাব ঘটিয়েছিলেন যিনি রিটায়ার্ড কর্নেল নিলাদ্রি সরকার। সহকারী ও রিপোর্টার জয়ন্তকে নিয়ে বহু রহস্যের সমাধান ঘটিয়েছেন তিনি, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘মড়া যদি জ্যান্ত হয়’, ‘কাকতাড়ুয়া জ্যান্ত হলে’, ‘সবুজ সংকেত’, ‘ব্যা-করণ রহস্য’, ‘লাফাঞ্চু দ্রিদিম্বা রহস্য’, ‘কোদণ্ড পাহাড়ের বা রহস্য’ ইত্যাদি। দুর্লভ অর্কিড ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়। বাড়ির ছাদে একটি বাগান করেছেন, যাকে জয়ন্ত বলেন ‘শূন্যোদ্যান’

কর্নেল নিলাদ্রি সরকার – ‘সবুজ সংকেত’ – উৎস – পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা – (ছবি – ৩৫)

বাংলা সাহিত্যে আরও কয়েকজন বিশিষ্ট গোয়েন্দার নাম এই স্বল্প পরিসরে উল্লেখ না করলেই নয় তাঁরা হলেন - শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী, প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরাশর বর্মা, হেমেন্দ্র কুমার রায়ের বিমল ও কুমার এবং জয়ন্ত ও মানিক, শেখর বসুর চিন্ময় ও কৌশিক, অভ্র রায়ের দেবদত্ত, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের পারিজাত বক্সী, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন মাসি, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গার্গী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা বরদাচরণ, শবর প্রমুখ। বিশ্বসাহিত্যে সিক্রেট এজেন্ট বা স্পাই হিসাবে জেমস বণ্ডের পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছেন নারায়ণ দেবনাথের ‘লৌহমুষ্টি’ কৌশিক বা রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা (কিশোর, মুসা আর রবিন)।

পরাশর বর্মা – উৎস – আনন্দমেলা (ছবি – ৩৬)
 
চিন্ময় ও কৌশিক – উৎস আনন্দবাজার পত্রিকা - রবিবাসরীয় – (ছবি – ৩৭, ৩৮)
দেবদত্ত – উৎস - আনন্দবাজার পত্রিকা – রবিবাসরীয় – (ছবি – ৩৯)
পারিজাত বক্সী – উৎস – শুকতারা – ধারাবাহিক – (ছবি – ৪০)
 
বিমল ও কুমার, স্রষ্টাঃ হেমেন্দ্র কুমার রায় – উৎস – শুকতারা – (ছবি – ৪১, ৪২)
জেমস বন্ড – উৎস পূজাসংখ্যা আনন্দমেলা (ছবি – ৪৩),
কৌশিক – উৎস – শুকতারা – (ছবি – ৪৪)

ছেলেবেলায় আনন্দমেলায় ছাপা আনন্দ পাবলিশার প্রকাশিত বিশিষ্ট লেখকদের কিছু বইয়ের বিজ্ঞাপন আজও মনে গভীর নস্টালজিয়ার সৃষ্টি করে। তারই কিছু স্মৃতিচারণ –

আনন্দ পাবলিশারের ফেলুদার বইয়ের বিজ্ঞাপন – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৪৫)

আনন্দ পাবলিশারের ফেলুদার বইয়ের বিজ্ঞাপন – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৪৬)

আনন্দ পাবলিশারের গোগোলের বইয়ের বিজ্ঞাপন – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৪৭)

আনন্দ পাবলিশারের কিকিরার বইয়ের বিজ্ঞাপন – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৪৮)

আনন্দ পাবলিশারের অর্জুনের বইয়ের বিজ্ঞাপন – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৪৯)

 
আনন্দ পাবলিশারের অর্জুনের বইয়ের ও আগামী আনন্দমেলায় প্রকাশিতব্য উপন্যাসের বিজ্ঞাপন – উৎস – আনন্দমেলা – (ছবি – ৫০, ৫১)

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ  ১) আমার ছেলেবেলার আনন্দমেলা ও শুকতারা, আমার আঁকা এই ছবিগুলোর উৎস। বহুবছর ধরে সংরক্ষিত থেকে পৃষ্ঠা সকল লাল এবং ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছে। বহু আঁকাই কিঞ্চিৎ হালকাও হয়েছে। তবুও আমার ক্লাস ফাইভ, সিক্স, সেভেনের ওই আঁকাগুলো সেভাবেই এখানে সংযোজন করলাম। আমি আনন্দমেলা, আনন্দবাজার পত্রিকা ও শুকতারার কাছে এ-বিষয়ে কৃতজ্ঞ।
২) বেশ কিছু গোয়েন্দার সম্বন্ধে বিবরণের জন্য আমি বিশিষ্ট সাহিত্য গবেষক সমুদ্র বসুর গ্যালারির সাহায্য নিয়েছি এজন্য তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই
_____

No comments:

Post a comment