অনুবাদ গল্প:: প্যাঁচ - ঋজু গাঙ্গুলী


প্যাঁচ
ঋজু গাঙ্গুলী

সেদিন সক্কালবেলা আমাদের ঘরের চেম্বারের বাইরে ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট পোল্টনের ফিসফিসানি শুনতে পেলাম “নিচে এক ভদ্রলোক দেখা করবেন বলে অপেক্ষা করছেন, স্যার। তিনি বড়োই ব্যস্ত, মানে ব্যতিব্যস্ত...”
পোল্টন আর কিছু বলার আগেই সিঁড়ি দিয়ে কাউকে দ্রুত উঠে আসতে এবং অপরিচিত গলায় বলতে শুনলাম, “একটা খুন হয়েছে, ডক্টর থর্নডাইক! আপনি কি এক্ষুনি আমার সঙ্গে আসতে পারবেন?”
“অবশ্যই,” থর্নডাইকের শান্ত গলাটা শুনতে পেলাম, “কিন্তু পুলিশ এটা জানে তো, যে আপনি আমার খোঁজে এসেছেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ,” অপরিচিত গলার মালিক বললেন, “পুলিশই ঠিক করেছে যে আপনি না পৌঁছনো অবধি ওখানে আর কিছুতে হাত লাগানো হবে না
যত দ্রুত সম্ভব আমরা তৈরি হয়ে নিলাম। কাজের জিনিসগুলো গুছিয়ে আমাদের অতিথির ডাকিয়ে আনা ঘোড়ার গাড়িতে বসামাত্র কোচোয়ানের চাবুক ঘোড়াগুলোকে ছুটিয়ে দিল।
“আমার নাম কার্টিস, হেনরি কার্টিস,” নিজের কার্ড আমাদের হাতে গুঁজে দিয়ে প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলেন উত্তেজিত ভদ্রলোক, “আর এই হচ্ছে আমার সলিসিটর মিস্টার মার্চমন্ট-এর কার্ড, যিনি আমাকে আপনাদের কাছে আসতে বলেন। এই মুহূর্তে মার্চমন্ট খুনের জায়গাতেই বসে আছেন, যাতে কেউ কিছু এদিক ওদিক না করে দেয়
“বুদ্ধিমান লোক,” বলে থর্নডাইক, “কিন্তু ব্যাপারটা কী হয়েছে, একটু খুলে বলবেন?”
একটা দম নিয়ে কথা শুরু করেন কার্টিস। “খুন হয়েছে অ্যালফ্রেড হার্ট্রিজ, আমার শালা। মৃত মানুষদের সম্বন্ধে খারাপ কথা নাকি বলতে নেই, কিন্তু এটা আপনাদের থেকে লুকোনোর কোনও মানেই হয় না বলে বলছি, হার্ট্রিজ অত্যন্ত বাজে লোক ছিল ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যে মোটেই ভালো ছিল না এটা আমাদের মধ্যে হওয়া চিঠিচাপাটি থেকেই স্পষ্ট হবে
“তেমনই একটা চিঠি লিখে আমি ওর সঙ্গে আজ সকাল আটটায় দেখা করতে চেয়েছিলাম। ইতিবাচক উত্তর পেয়ে আমি আর মিস্টার মার্চমন্ট ঠিক সকাল আটটায় ওর স্যুটে যাই। বেশ কয়েকবার কলিং বেল বাজাই আমরা। তাতে, এমনকি দরজাটা রীতিমতো পিটিয়েও কোনও সাড়া না পেয়ে আমরা হল-পোর্টারকে ডাকি। সে নিজেও এটা খেয়াল করেছিল যে আগের দিন সারারাত হার্ট্রিজের বসার ঘরের আলোগুলো জ্বলেছিল। তাই কিছু একটা গোলমাল হয়েছে এই আশঙ্কা করে সে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খোলে।
“স্যুটে ঢোকামাত্র সেই ভয়ংকর দৃশ্যটা আমাদের সবার নজরে পড়ে! বসার ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল হার্ট্রিজ। ওকে ছুরি মারা হয়েছিল। খুনি ছুরিটা নিয়ে পালায়নি, সেটা হার্ট্রিজের পিঠেই গেঁথে ছিল
কার্টিস নিজের মুখ মুছে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই আমাদের ব্রুহ্যাম ওয়েস্টমিনস্টার আর ভিক্টোরিয়ার মাঝের একটা ঝিমধরা গলিতে ঢুকে পড়ল।
লাল ইটের একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম আমরা। বাড়িটার নাম, ব্র্যাকেনহার্স্ট চেম্বার্স। আমাদের দেখে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল ইউনিফর্ম পরা হল-পোর্টার।
দোতলায় হার্ট্রিজের স্যুটে যাওয়ার জন্য লিফট নিলাম আমরা। লিফট থেকে বেরিয়েই যে প্যাসেজটা পড়ে, তার শেষপ্রান্তে একটা বড়ো দরজার ওপরে ‘মিস্টার হার্ট্রিজ’ লেখা ছিল। ইনস্পেক্টর ব্যাজার ব্যাজার মুখে আমাদের স্বাগত জানালেন। তবে তাঁর কথা আর ভঙ্গি দেখে আমার মনে হল, থর্নডাইক আসায় উনি আসলে খুশিই হয়েছেন। কারণটা অবশ্য খোলসা হল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
জানালা দিয়ে ঢোকা ঝলমলে রোদেও ঘরের জ্বলে থাকা লালচে আলো, আধখালি গ্লাস, চেয়ারের পাশের খোলা বই এবং মাটিতে পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ শরীরটা একটা শ্বাসরোধী পরিবেশ তৈরি করেছিল।
সামনে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম আমরা। ফায়ারপ্লেসের সামনে দু’হাত ছড়িয়ে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল হার্ট্রিজ। তার বাঁ কাঁধের ঠিক নিচ দিয়ে একটা ছুরির সরু বাঁট বেরিয়ে ছিল। ওইটুকু, আর ঠোঁটে সামান্য রক্তের ছোঁয়া, এছাড়া আর অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ছিল না আমাদের।
কিছুটা দূরে কাচের প্যানেল খোলা একটা সেকেলে ঘড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। তাতে অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য যে চাবি লাগে, তেমনই একটা চাবি পড়েছিল তার নিচেই, হার্ট্রিজের হাতের কাছে।
“বুঝতেই পারছেন,” ব্যাজার বলেন, “ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিচ্ছিল হার্ট্রিজ। খুনি নির্ঘাত তখন তার পেছনে চাবি ঘোরানোর আওয়াজে নিজের পায়ের শব্দ ঢেকে এগিয়ে এসেছিল। ছুরির অবস্থান থেকে এটাও স্পষ্ট, যে খুনি বাঁ হাতি। এই অবধি সরল হলেও এরপর ব্যাপারটা প্যাঁচালো হয়ে গেছে, ডক্টর। খুনি এই স্যুটে ঢুকল কীভাবে? বেরোলই বা কীভাবে?”
ছুরির বাঁটে কোনও আঙুলের ছাপ পাওয়া গেল না। তবে ছুরির মেটাল গার্ডে জড়ানো হরফে খোদাই করা একটা শব্দ ‘ত্রাদিতোরে’ দেখে থর্নডাইকের ভ্রূ কুঁচকে উঠল।
“শব্দটা ইটালিয়ান,” বলল থর্নডাইক, “মানে হল, বিশ্বাসঘাতক। হার্ট্রিজ কি কখনও ইটালিতে ছিল?”
“গতবছরের বেশিরভাগ সময়টাই হার্ট্রিজ ক্যাপ্রিতে কাটিয়েছে,” বলেন কার্টিস।
“এই বিষয়ে আরও কিছু ব্যাপার আমরা জানতে পেরেছি,” গম্ভীর গলায় বলে ব্যাজার, “তবে তার আগে যদি আপনি…”
কথা না বাড়িয়ে বিভিন্ন কোণ থেকে ঘরের ফটো তোলায়, আর একটা স্কেচ ম্যাপ বানিয়ে মৃতদেহ থেকে শুরু করে সবকিছুর অবস্থান চিহ্নিত করায় ব্যস্ত হল থর্নডাইক।
পুলিশ সার্জন ডক্টর এগার্টন এসে মৃতদেহের তাপমাত্রা এবং আরও কিছু লক্ষণ দেখে বললেন, “প্রায় দশ ঘন্টা আগে মৃত্যু হয়েছে
“একবার ছুরিটা ধরে দেখো, জার্ভিস,” বলল থর্নডাইক।
“এ তো পাঁজরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে!” ছুরির বাঁটে হাত দিয়ে বুঝতে পারি আমি।
“কতটা জোর দিয়ে ছুরিটা মারা হয়েছিল ভাবো,” গম্ভীরভাবে বলে থর্নডাইক, “সঙ্গে এটাও ভাবো যে যেখান দিয়ে ছুরিটা ঢুকেছে, সেখানে হার্ট্রিজের শার্টটাও কুঁচকে প্রায় পেঁচিয়ে আছে
“ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠিকই,” বলেন এগারটন, “কিন্তু এতে আমাদের কাজের কি কিছু
ছুরিটা সন্তর্পণে মৃতদেহ থেকে ইঞ্চি দুয়েক মাপে বের করে থর্নডাইক। আমাদের সবার মুখ থেকে বিস্ময়সূচক শব্দগুলো বেরিয়ে আসে আপনা থেকেই।
“অ্যালুমিনিয়ামের ছুরি!” ব্যাজারই আমাদের সবার মনের কথাটা স্পষ্ট করে বলে।
দারুণ গম্ভীর মুখে একটা শক্ত সুতো দিয়ে কিছু মাপজোক করে থর্নডাইক তারপর বলে, “ছুরিটা যেভাবে শরীরে ঢুকেছে বলে আমাদের মনে হয়েছে, শার্টে হওয়া গর্তটা কিন্তু তার সঙ্গে মিলছে না। কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছে যে ছুরিটা শরীরে যতটা ঢুকেছে, শার্টটাও ততটাই কুঁচকে গেছে
ব্যাপারটা আমরা সবাই তখনকার মতো মাথায় ঢুকিয়ে রাখলাম, কারণ ভাববার জন্য একটা প্রকাণ্ড ধাঁধা তো আমাদের চারপাশেই ছিল।
একটা স্যুট, যাতে ঢোকা ও বেরোনোর একমাত্র দরজাটা বন্ধ ছিল, যার জানালাগুলো খোলা থাকলেও মাটি থেকে প্রায় চল্লিশ ফুট উঁচুতে, যার বাইরের দেওয়ালে কোনও রেইন-পাইপ বা পা রাখার মতো কিচ্ছু নেই, যেখানে চিমনি নেইসেখানে খুনি ঢুকল আর বেরোল কীভাবে?
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এবার হল-পোর্টারকে ডাকতে হল।
“কাল রাতে এই স্যুটে কে কে এসেছিল বলতে পার?” জানতে চাইল থর্নডাইক।
“এই বাড়িতে অনেকেই এসেছিল। তাদের মধ্যে ক’জন এই স্যুটে এসেছিল, তা বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, মিস কার্টিস রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ বেরিয়ে গেছিলেন, এটা দেখেছি
“মিস কার্টিস! মানে আমার মেয়ে এডিথ!” কার্টিস যে রীতিমতো চমকে গেছেন সেটা বুঝতে পারি, “ও এখানে এসেছিল, সেটাই তো জানতাম না
“আপনার মেয়ে হার্ট্রিজের কাছে কেন এসেছিল, জানেন?” জিজ্ঞেস করেন ব্যাজার।
“জানি না, তবে আন্দাজ করতে পারি
কার্টিসের উত্তরটা শুনে এতক্ষণ চুপ করে থাকা মিস্টার মার্চমন্ট মুখ খোলেন, “তাহলে এই প্রশ্নের উত্তরে কিচ্ছু বলার দরকার নেই
“আপনি একদম ঠিক বলেছেন মিস্টার মার্চমন্ট,” ঠোঁটের কোণে ঈষৎ ব্যঙ্গ ফুটিয়ে বলেন ব্যাজার, “এটাও বলার দরকার নেই যে মিস কার্টিস বাঁ হাতি কি না
হেনরি কার্টিস-এর একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়াটা আমাদের সবারই চোখে পড়ে।
“যাই হোক,” সদয় ভঙ্গিতে প্রসঙ্গটা তখনকার মতো ছেড়ে দিয়ে হল-পোর্টারের দিকে আবার ফেরেন ব্যাজার, “তুমি যেন ইতালিয়ানদের নিয়ে কী বলছিলে?”
“ব্যাপারটা শুরু হয় হপ্তাখানেক আগে,” বলে হল-পোর্টার। “নিতান্ত সাদামাটা চেহারার একটা লোক এসেছিল প্রথমদিন। লোকটার ইংরেজি যাচ্ছেতাইতার চেয়েও বাজে হাতের লেখায় মিস্টার হার্ট্রিজের নাম লেখা একটা নোংরা খাম ও আমাকে দিয়েছিল যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমি খামটা পোস্ট বক্সে ফেলে দিই।
“পরদিন এক বুড়ি, সেও ইটালিয়ান একথা বলাই বাহুল্য, আমার জীবন অতিষ্ঠ করে দেয়। মেলায় পাখির খাঁচা নিয়ে বসে লোকের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে যারা, এই বুড়িও বোধহয় তেমনই কিছু করে। আমি তাকে যতবার দরজা থেকে তাড়াই, ততবারই সে ফিরে আসে! এই চলেছিল সেদিন পুরো সময়টা জুড়ে।
“তার পরদিন এক আইসক্রিমওয়ালা, হ্যাঁ, এও ইটালিয়ান, সামনের পেভমেন্টে উদয় হয়। রাস্তার যত অপোগণ্ড ছোঁড়াকে ডেকে ডেকে আইসক্রিমের নমুনা চাখিয়ে সে বাড়ির সামনেটা একেবারে নরক করে দেয়।
“পরের দিন আসে এক বাজনাওয়ালা। সঙ্গে তার পোষা বাঁদরটাও ছিল! সারাদিন ধরে সে একের পর এক জগঝম্প সুর বাজায়। আমি লোকটাকে তাড়াতে গেলে বাঁদরটা আমার প্যান্টের ঝুল ধরে
পোর্টারের ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে আমরাও বুঝি যে এই প্রসঙ্গ আর লম্বা না করাই ভালো।
“প্রথমদিনের সেই চিঠিটা দেখলে তুমি চিনতে পারবে তো?” জানতে চান ব্যাজার।
“অবশ্যই,” শুকনো গলায় বলে পোর্টার।
কিছুক্ষণ পর ব্যাজার কয়েকটা চিঠি নিয়ে এসে বলেন, “হার্ট্রিজের ব্রেস্ট-পকেটে এই চিঠিগুলো ছিল। এদের মধ্যে কোনটা... এইটা কি?”
পোর্টার খুঁটিয়ে দেখে, “হ্যাঁ, এটাই সেটা” বলার আগেই আমরা চিনতে পেরেছিলাম নোংরা, অশিক্ষিত হাতে ঠিকানা লেখা খামটাকে।
খাম খুলে ভেতরের চিঠিটা বের করেন ব্যাজার। তাঁর ভ্রূ কুঁচকে ওঠে সেটা পড়ে। চিঠিটা থর্নডাইকের দিকে এগিয়ে দেন তিনি।
থর্নডাইক নিঃশব্দে চিঠিটা পড়ল। তারপর জানালার কাছে গিয়ে পকেট থেকে লেন্সটা বের করে কাগজটা খুঁটিয়ে দেখে সেটাকে মার্চমন্টের দিকে বাড়িয়ে ধরল। সলিসিটর ভদ্রলোকের কাঁধের ওপর দিয়ে আমিও চিঠিটা পড়লাম। সাধারণ নোট পেপারে, ট্যাঁরাবেঁকা হাতে, লাল কালিতে তাতে লেখা ছিলঃ ‘ন্যায্য কাজটা করার জন্য তোমাকে ছ’দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। যদি না করো, তাহলে কী হবে তা ওপরের চিহ্নটা দেখে বুঝে নিও
ওপরের চিহ্ন বলতে ছিল, পাতার মাঝামাঝি জায়গায় বেশ যত্ন করে আঁকা একটা করোটি আর তার নিচে আড়াআড়ি একজোড়া হাড়।
“এইবার বুঝলাম,” চিঠিটা কার্টিসের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন মার্চমন্ট, “কেন হার্ট্রিজ ওর চিঠিতে ওইসব হাবিজাবি লিখেছিল। চিঠিটা আছে না আপনার কাছে?”
নিজের পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে পড়েন কার্টিসঃ ‘আসতে চাইলে আসতে পার। তোমার বাজে হুমকি আর অন্যান্য নাটক দেখে এই ক’দিন অনেক আমোদ পেয়েছি। তুমি নাটকের দল খুলছ না কেন?’
ইনস্পেক্টর আরও দুটো চিঠি পেলেন, যেগুলো স্যাফ্রন হিল থেকে পোস্ট করা হয়েছে। ওই এলাকাটা যেহেতু ইটালি থেকে আসা লোকে ভর্তি তাই সেগুলো খুলে দেখলাম আমরা। একটায় ছিল করোটি আর হাড়ের চেনা কম্বিনেশন, আর একটায় ছিল মাত্র কয়েকটা শব্দঃ ‘সাবধান! ক্যাপ্রি-র কথা যেন মনে থাকে
“আপনার কাজ শেষ হয়ে গেলে আমি এবার বেরোব, ডক্টর,” ব্যাজারের মধ্যে সেই ছটফটানিটা দেখতে পাচ্ছিলাম, যেমনটা দেখা যায় শিকারের গন্ধ পাওয়া হাউন্ডের মধ্যে, “ওই চারটে ইটালিয়ানকে গ্রেপ্তার করে, পোর্টারকে দিয়ে তাদের শনাক্ত করাতে খুব একটা অসুবিধে হবে না। আর তারপরেই খুনির সন্ধান পাওয়া যাবে
“বেরিয়ে যাওয়ার আগে খুনের জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রটা কি আরেকবার দেখাবেন, ইনস্পেক্টর?” সবিনয়ে বলে থর্নডাইক।
ব্যাজারের কাছ থেকে পাওয়া ছুরিটা খুঁটিয়ে দেখে থর্নডাইক তারপর বলে, “আমি আজ অবধি কোনও ছুরিতে অ্যালুমিনিয়ামের ব্লেড, আর গ্রিপের জন্য বইয়ের বাঁধাইয়ে কাজে লাগে এমন মরোক্কো-লেদার দেখিনি
“অ্যালুমিনিয়াম বোধহয় ছুরিটাকে হালকা করার জন্য,” ব্যাজার বলেন, “আর নরম চামড়া, যাতে ছুরিটাকে পকেটের মধ্যে ধরে রাখতে সুবিধে হয়, সেজন্য
হ্যাঁ না কিছু না বলে থর্নডাইক ছুরিটা নিখুঁতভাবে মাপে, আর সেগুলো নোট করে। ব্যাজার অধৈর্য হয়ে পড়লেও সেসবে পাত্তা না দিয়ে ও এরপর একটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়ে চলে যায় “আচ্ছা, মাঠের ওপাশের বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের সঙ্গে একটু কথা বলা যায়? তাঁরা হয়তো কিছু দেখেছেন
কথাটা যে যুক্তিসঙ্গত এটা আমরা সবাই মেনে নিই। বড়োজোর তিরিশ ফুট লম্বা, ঘাস আর বুনোফুলে ছাওয়া একফালি জমির ওপাশেই একসার বাড়ি দেখা যাচ্ছিল, যেখান থেকে উজ্জ্বল আলোয় ভরা এই স্যুটের ভেতরের দৃশ্য কেউ দেখে থাকতেই পারে।
“আপনি ঠিক বলেছেন, তবে তাঁরা কেউ কিছু জানলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই হয় আমাদের নইলে প্রেসের কাউকে ধরতেন,” বলে ব্যাজার।

ব্যাজার আমাদের সবাইকে স্যুট থেকে বের করে তালা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর মার্চমন্ট জানতে চাইলেন, এই কেসের ব্যাপারে আমাদের কিছু জিজ্ঞাস্য আছে কি না।
থর্নডাইক জিজ্ঞেস করল, “এমন কেউ কি আছে যে হার্ট্রিজের মৃত্যু কামনা করতে পারে?”
“আছে,” সহজ ভঙ্গিতে বলেন মার্চমন্ট, “তার নাম লিওনার্ড উলফ
“সে কে?” চমকে বলি আমি কারণ, ব্যাজারের মতো আমিও ভেবেছিলাম যে কার্টিস বা তাঁর পরিবারের কেউ হয়তো হার্ট্রিজের মৃত্যুতে লাভবান হবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মার্চমন্ট বলেন, “হার্ট্রিজরা ছিলেন দুই ভাই। ছোটোভাইয়ের স্ত্রীই হলেন হেনরি কার্টিস-এর বোন। বড়োভাই হিসেবে যাবতীয় সম্পত্তি পেয়েছিলেন অ্যালফ্রেড হার্ট্রিজ। কিন্তু ছোটোভাই চার্লস-এর অকালমৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী এবং ছোটো ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার জন্য তিনি একটি পয়সাও ব্যয় করেননি। ওই পরিবারটি ভেসে যেত, যদি না হেনরি কার্টিস ও তার পরিবার তাদের পাশে দাঁড়াত। হার্ট্রিজ বরং একের পর এক কুকীর্তিতে জড়িয়ে পড়েন, যাদের নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো। তাঁর সেইসব কুকীর্তিতে অন্যতম সঙ্গী ছিল লিওনার্ড উলফ। এখন হার্ট্রিজের উইল-মাফিক তার কিছু হলে তার সমস্ত সম্পত্তি পাবে উলফ।
হার্ট্রিজের ভাইপো এডওয়ার্ড সৎ, বুদ্ধিমান ও কর্তব্যনিষ্ঠ। মাসখানেক হল একটি ল’ ফার্ম তাকে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে সুযোগ দিতে রাজিও হয়েছে। আমি আর হেনরি হার্ট্রিজকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, যাতে সে আজ অবধি নিজের কোনও দায়িত্ব পালন না করলেও এডওয়ার্ডের শিওরিটি বন্ডের টাকাটা অন্তত জমা করেআজকের সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্যও ছিল ওকে রাজি করানো। আমার ধারণা, এবং নিঃসন্দেহে হেনরিও তেমনটাই ভাবছে, মিস কার্টিস আলাদাভাবে হার্ট্রিজের সঙ্গে এই নিয়েই কথা বলতে এসেছিলেন। কারণ, তাঁর সঙ্গে এডওয়ার্ডের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে
“এই লিওনার্ড উলফ লোকটির সম্বন্ধে আর কিছু জানাতে পারেন আমাদের?” জিজ্ঞেস করে থর্নডাইক।
“আমি লোকটাকে মাত্র একবার দেখেছি,” কার্টিসের মুখে বিতৃষ্ণা প্রকট হয়, “বেঁটে, রোগা, ফর্সা, দাড়িগোঁফ নেই, আর বাঁ হাতের মাঝের আঙুলটা নেই
“এ তো একেবারে দাগি অপরাধীর চেহারা,” আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় কথাটা, “নির্ঘাত জাল-জুয়াচুরি করেই লোকটা দিন কাটায়?”
“উঁহু,” মাথা নাড়েন কার্টিস, “লোকটি অত্যন্ত দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং নিজের হাতে যন্ত্রপাতি বানানোয় দক্ষ। জুয়ার নেশায় লোকটা শেষ হয়ে গেছে। ওই জুয়াখেলার সুবাদেই ওর আর হার্ট্রিজের একেবারে প্রাণের বন্ধুত্ব হয়েছিল
“বাব্বা!” থর্নডাইকের গলাতেও এবার বিস্ময় ফোটে, “এই গুণী মানুষটি কোথায় থাকে বলতে পারেন?”
“মর্টন গ্র্যাঞ্জ, এলথ্যাম, কেন্ট,” সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে মার্চমন্ট আর কার্টিস আমাদের হাত ঝাঁকিয়ে কিছু জানতে পারলেই তাঁদের জানানোর প্রতিশ্রুতি আদায় করে বিদায় নিলেন।
“ইন্টারেস্টিং কেস,” গম্ভীর মুখে বলল থর্নডাইক, “ইনস্পেক্টর ব্যাজার বুনোহাঁসের পেছনে ধাওয়া করেছেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন
কথাটা শেষ না করে হন্তদন্ত হয়ে হল-পোর্টারের দিকে এগোলো থর্নডাইক।
“এই উলটোদিকের বাড়িগুলোতে কারা থাকে?”
থর্নডাইকের প্রশ্নের উত্তরে পোর্টার জানাল যে ওগুলো সবই অফিস, যাতে ঢোকার রাস্তা কারমেন স্ট্রিটের দিক দিয়ে।
হল-পোর্টারকে হার্ট্রিজের স্যুটের জানালার নিচের ঝোপঝাড়ে একটা পাতলা গোল ধাতুর পাত, যার মধ্যে আবার একটা ষড়ভুজ আকারের ছিদ্র আছে, খুঁজতে বলে থর্নডাইক বেরিয়ে পড়ল।
“আচ্ছা,” থাকতে না পেরে আমি জানতে চাইলাম, “ওরকম একটা অদ্ভুত জিনিস তুমি পোর্টারকে হঠাৎ খুঁজতে বললে কেন?”
উত্তর না দিয়ে শুধু মুচকি হেসে থর্নডাইক কারমেন স্ট্রিটের অফিসগুলোর সামনে পৌঁছল। তারপর কীসব হিসেব কষে, আর নিচের লেটার-বক্সের গায়ের নামগুলোকে দেখে একটা বিশেষ অফিসকে বেছে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল ওআমিও পিছু নিলাম।
হাঁপাতে হাঁপাতে চারতলার ছ’নম্বর অফিসটার সামনে যখন পৌঁছলাম তখন থর্নডাইক চুপচাপ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে কিছু শোনার চেষ্টা করছিল। আমিও আড়ি পাতলাম। ভেতরে পা ঘষটানোর কিছু শব্দ ছাড়া কিছু শুনলাম না। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল থর্নডাইক।
“মিস্টার বার্লো যে অফিসে নেই, এটা বুঝতেই পারছি,” ফাঁকা অফিসঘরে একটা ছেলে একা একা জাগলিং অভ্যাস করছিল বলে থর্নডাইকের এই ঘোষণার কারণটা আমিও বুঝলাম, “তিনি আসবেন কখন?”
“আজ তিনি আসবেন না,” ছেলেটা ঢোঁক গিলে বলে, “একটা নোট লিখে গেছেন
স্পষ্ট, গোটা গোটা হরফে লেখা নোটিসটা দেখে থর্নডাইকের মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর ও বলে, “এই কমিশন এজেন্ট থমাস বার্লো আমার পরিচিত ভেবে দেখা করতে এসেছিলাম। আচ্ছা, উনি রোগা, লম্বা, আর শ্যামলা তো? বাঁ হাতে চোটও ছিল, অন্তত শেষ যখন দেখা হয়েছিল
“রোগা বটে,” ছেলেটা নির্বিকারভাবে বলে, “তবে লম্বা নন, শ্যামলা তো ননই। বাঁ হাতে চোট আছে কি নেই, তা জানি না, কারণ উনি সবসময় দস্তানা পরে থাকেন
“আমি কি ওঁর জন্য একটা নোট লিখে যেতে পারি?” বলে থর্নডাইক।
ছেলেটা হন্তদন্ত হয়ে একটা কাগজ আর স্টাইলাস এনে দেয়। লাল রঙের কালির দোয়াতে স্টাইলাস চুবিয়ে অন্য নাম ব্যবহার করে নোটটা লেখার পর কী ভেবে থর্নডাইক শেষ অবধি সেটা পকেটে ভরে বলে, “থাক, বরং আমিই পরে এসে খোঁজ নেব
ছেলেটার মতো আমিও ব্যাপার কিছুই না বুঝে থর্নডাইকের পিছু নিলাম। চারতলা থেকে নেমে ও সোজা গেল এই অফিসগুলোর হাউস-কিপারের কাছে। গাম্ভীর্য আর সহজ ভাবের মিশ্রণে কীভাবে কথা বের করতে হয় এটাও যে ওর থেকে শেখা যায় সেটাই আমি বুঝলাম, যখন আমরা থমাস বার্লোর সম্বন্ধে একগাদা খবর পেয়ে গেলাম হাউস-কিপারের কাছ থেকে।
পাশের রাস্তায় ঘোড়ার গাড়িগুলোর দাঁড়ানোর জায়গার দিকে যাওয়ার সময় আমি থর্নডাইককে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এই বার্লোকে সন্দেহ করছ কেন?”
“সন্দেহ নয়,” মুচকি হেসে বলে থর্নডাইক, “লোকটার চেহারার বিবরণ তো শুনেইছিলে। তার সঙ্গে যখন জানলাম যে লোকটা এখানে এসেছে মাত্র কিছুদিন আগে, আজকে একেবারে ভোর হতেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, এমনকি অত ভোরে তাকে বেরোতে দেখে হাউস-কিপার নিজেও ভাবছে যে লোকটা কাল রাতে এই বাড়িতেই ছিল, তখন আর সন্দেহের অবকাশ থাকে কি?”
“কিন্তু এই অফিসঘরে বসে লোকটার পক্ষে কী করা সম্ভব?” আমি জানতে চাই।
“লোকটার সঙ্গে কী লাগেজ ছিল, সেটা শুনেও এই প্রশ্ন করছ?” ঈষৎ বিরক্ত গলায় বলে থর্নডাইক।
লোকটার সঙ্গে ছিল একটা চৌকো, আর একটা সরু, ফুট পাঁচেক লম্বা বাক্স। এই তথ্য কীভাবে এই মামলার কাজে লাগানো যায় সেটা ভেবে আকুল হলাম। তবে আমার অবাক হওয়ার তখনও অনেক কিছু বাকি ছিল।
অক্সফোর্ড স্ট্রিট পৌঁছে থর্নডাইক যেসব জিনিস কিনল, সেগুলো মেকানিক বা এমন কারও ওয়ার্কশপের সঙ্গেই মানানসই। তাদের মধ্যে ছিল ড্রইং বোর্ড, নিখুঁত পরিমাপের কাজে লাগে এমন জিনিসপত্র, টুল স্টিলের একটা পাত, এমনকি সদ্য কেনা একটা পুরনো রাইফেল! যথারীতি ওসব দিয়ে কী হবে তার কোনও স্পষ্ট উত্তর ওর কাছ থেকে পাওয়া গেল না।
চেম্বারে ফিরে আমি রিপোর্ট বানানোয় মনোনিবেশ করলামথর্নডাইক কিন্তু পোল্টনের সঙ্গে ওর নতুন কেনা জিনিসপত্র নিয়ে কিছু একটা তৈরি করতে লেগে পড়ল।

সেদিন সন্ধ্যায় যখন কয়েকটা কাজ সেরে আমাদের চেম্বারে ফিরেছি, তখনই সিঁড়িতে ধুপধাপ আওয়াজ, আর তারপরেই হেনরি কার্টিসের উত্তেজিত গলার আওয়াজ পেলাম। হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে দেখলাম, কার্টিস আর মার্চমন্ট হাত-পা নেড়ে থর্নডাইককে কিছু বোঝাচ্ছেন। আমাকে বেরোতে দেখে থর্নডাইক মুচকি হেসে বলল, “যা আশঙ্কা করেছিলাম সেটাই হয়েছে, জার্ভিস
“আপনার মেয়ে” আমার মুখ থেকে কথাটা বেরিয়েই যায়।
“আপনি ভাবুন!” কার্টিস একেবারে ফেটে পড়েন, “এডিথকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে! ইনস্পেক্টর ব্যাজার কিছুক্ষণ আগেই আমাদের বাড়িতে এসে ওকে নিয়ে গেছেন
আমি উত্তরে কিছু বলার আগেই সদর দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পেলাম।
ইনস্পেক্টর ব্যাজার ঘরে ঢুকলেন
পরিস্থিতি এতটাই অস্বস্তিকর ছিল যে মার্চমন্ট কার্টিসের হাত চেপে ধরে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। শেষ অবধি অবশ্য ব্যাপারটা আর বেশিদূর গড়াল না। ব্যাজার আর কার্টিস দু’জনেই গম্ভীর মুখে বিদায় নেওয়ার অনুমতি চাইলেন। কার্টিসকে বিদায় দিলেও ব্যাজারের উদ্দেশে থর্নডাইক বলল, “যাবেন না, ইনস্পেক্টরএকটা বিশেষ জিনিস আপনাকে দেখানোর জন্যই আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। মিস্টার মার্চমন্ট, আপনিও থাকুন। আর মিস্টার কার্টিস, আপনি ঘন্টাখানেক পরে একবার আসুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তার মধ্যেই কিছু একটা ঘটবে। এমন কিছু, যেটা এডিথ এবং আপনাদের সবার পক্ষে ভালো
ঘরের পরিবেশ একটু স্বাভাবিক হলে থর্নডাইক ব্যাজারকে একটু কড়া সুরেই বলল, “আপনি কেসটা নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন, ইনস্পেক্টর?”
“তাড়াহুড়ো!” ব্যাজার আকাশ থেকে পড়ার ভাব করেন, “আরে, এ তো জলের মতো সহজ কেস! এতে অকারণে দেরি করার কোনও মানেই হয় না! আমরা ওই চার ইটালিয়ানকে খুঁজে বের করেছি। তারা স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে পাতলা নেট দিয়ে মুখ ঢাকা, টুপি আর গাউন পরা এক মহিলা তাদের পয়সা দিয়ে ওইসব নাটক করিয়েছিল। এডিথ, মানে মিস কার্টিস এই কাজ করেই থাকতে পারেন। তিনি বাঁ-হাতি। এডওয়ার্ড হার্ট্রিজের আর্থিক দুরবস্থার জন্য অ্যালফ্রেড হার্ট্রিজের ওপর রাগ হওয়া, আর রাগের বশে ছুরি চালানো তাঁর পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয়
“মিস কার্ট্রিজ খুনটা করার পর স্যুট থেকে বেরোলেন কীভাবে?” জানতে চায় থর্নডাইক।
“সেটা আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি” স্বীকার করেন ব্যাজার।
“এটা বোঝাই গেছে যে ছুরিটা শরীরে যতটা গভীরে গেঁথে গেছে, তার জন্য অমানুষিক জোর দরকার। মিস কার্টিসের গায়ে কি অতটা জোর আছে?” থর্নডাইক প্রশ্ন চালিয়ে যায়।
“আরে আপনি জানেন না, মহিলারা রেগে গেলে কতটা” উত্তর দিতে গিয়েই যে ব্যাজারের গলাটা লো-ভোল্টেজ হয়ে যাচ্ছে, সেটা শুধু আমরা নয়, উনি নিজেও বুঝে চুপ করে যান।
“আপনি কি সত্যিই এই খুনটা কীভাবে হল এবং কে করল, তা জানতে চান?” নিষ্করুণ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে থর্নডাইক।
মুখ না খুলে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝান ব্যাজার।
থর্নডাইক বলে, “খুনের জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, খুনের সময় খুনি ওই স্যুটে উপস্থিত ছিল না। খুন হওয়ার মুহূর্তে হার্ট্রিজের মুখ ছিল গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের দিকে। সেই অবস্থায় ছুরিটা ওর শরীরে ঢোকে, একটু কোনাকুনিভাবে অর্থাৎ ছুরিটা এসেছিল জানালার দিক থেকে
“কিন্তু জানালাটা তো মাটি থেকে প্রায় চল্লিশ ফুট উঁচুতে,” ব্যাজারের আগে আমিই কথাটা বলে ফেলি।
“সেইজন্যই তো,” বলে থর্নডাইক, “এই খুনে অস্ত্রটাই হল সবচেয়ে বড়ো এভিডেন্স! আর পুলিশের কাছে আসল অস্ত্রটা থাকলেও আজ আমি আর পোল্টন মিলে তার একটা প্রতিলিপি বানিয়েছি। জিনিসটা কেমন হয়েছে বলে আপনাদের মনে হয়?”
থর্নডাইক আমাদের সামনে যে ছুরিটা রেখেছিল সেটা দেখে আমরা, বিশেষ করে ইনস্পেক্টর ব্যাজার স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে এই ছুরিটা সর্বার্থে আসল অস্ত্রের নকল। কিন্তু সারা দুপুর ধরে এটা বানিয়ে থর্নডাইক কী করতে চাইছে এটা যখন আমি ভাবছি, তখনই দরজায় আবার কড়া নাড়ার আওয়াজ পেলাম।
দরজা খুলে আমি রীতিমতো চমকে গেলাম, কারণ আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ব্র্যাকেনহার্স্ট চেম্বার্স-এর হল-পোর্টার। ঈষৎ কুন্ঠিত গলায় সে থর্নডাইককে বলল, “আপনি যেটা খুঁজতে বলেছিলেন, সেটা পেয়েছি স্যার
আমাদের সামনের টেবিলে সে যেটা রাখে তার অবিকল বর্ণনা আমি থর্নডাইকের মুখে শুনেছিলাম - একটা পাতলা গোল ধাতুর পাত, যার মাঝখানে রয়েছে একটা ষড়ভুজাকার ছিদ্র।
আমাদের কাছে ব্যাপারটা ক্রমেই আরও দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে এটা বুঝেই থর্নডাইকের কাছ থেকে বকশিশ নিয়ে হল-পোর্টার চলে যাওয়ার পরেই ও আবার কথা শুরু করল।
“এই মামলায় আসল জিনিস ছিল দুটো। প্রথম জিনিস হল খুনের জন্য ব্যবহৃত ছুরিটা। ব্যাজার, আপনি ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন যে ছুরিটার গায়ে খোদাই করা এই শব্দটাও আসলে বাকি সব তথাকথিত ইটালিয়ান ব্যাপারের মতো করে আমাদের ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা। ওটাকে বাদ দিয়ে ছুরিটা খুঁটিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন, কোনও কারখানায় এটা তৈরি হয়নি, বরং কোনও মেকানিক এটা আলাদাভাবে তৈরি করেছেযাতে এটাকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অবধি সরলরৈখিক পথে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেজন্য এটার ধারালো অংশটা তৈরি করা হয়েছে অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে। কিন্তু যাতে সেটা হাওয়ায় বেশি বেঁকে না যায়, সেজন্য বাঁটটা তৈরি হয়েছে টুল স্টিল দিয়ে।
“এটা যাতে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুঁচালো দিকটা সামনে রেখেই ছুটে যেতে পারে, সেজন্য এর ধারালো ব্লেড আর বাঁটের সংযোগস্থলে একটা ওয়াশার দিতেই হত, তাই এই পাতলা ধাতুর পাতটা ব্যবহার করা হয়েছিল। আমি হিসেব করেছিলাম যে ফায়ার করার পরেই এটা খসে পড়বে, তাই পোর্টারকে এটা খুঁজতে
আমাদের সবার সমস্বর কথার তোড়ে থর্নডাইক থেমে যেতে বাধ্য হয়।
মার্চমন্টই কথাটা গুছিয়ে বলেন, “আপনি বলতে চাইছেন ছুরিটা মারা, এমনকি ছোড়া হয়নি, ফায়ার করা হয়েছিল?”
“একটা ছুরি কোনও বন্দুক থেকে ফায়ার করা আদৌ সম্ভব?” প্রায় গুলির মতোই ব্যাজারের মুখ থেকে প্রশ্নটা বেরিয়ে আসে।
“হ্যাঁ, আমি বলতে চাইছি যে ছুরিটা একটা বন্দুক থেকে ফায়ার করা হয়েছিল,” খুব ধীরে, একটু বোকাসোকা ছাত্রদের বোঝানোর মতো করে বলে থর্নডাইক, “ব্লেড বাদ দিলে এর বাকি অংশটার ব্যাস ঠিক সেই বন্দুকের ক্যালিবারের সঙ্গে মেলে, যেটা এখন লন্ডন শহরে খুব সহজেই পাওয়া যায় - পুরনো ফরাসি চেসপট রাইফেল। সবচেয়ে বড়ো কথা, এর বাঁটের ওপর নরম চামড়ার একটা আস্তরণ রয়েছে, স্রেফ যাতে এটা বন্দুকের নলে ফিট করানো যায়
“এটা থিওরি হিসেবে বলা সহজ,” আমি প্রায় বাধ্য হয়ে বলি, “কিন্তু বাস্তবে
“একদম ঠিক,” রীতিমতো খুশিয়াল হয়ে ওঠে থর্নডাইক, “আর সেজন্য আমি হাতে-কলমে আপনাদের সামনে ব্যাপারটা করে দেখাতে চাই
এরপর কীভাবে আমাদের সবার সামনে নিচের হলে প্রায় বত্রিশ ফুট দূরত্ব থেকে একটা ডামির পিঠ আর কাঁধের মাঝখানে থর্নডাইক একটা পুরনো চেসপট রাইফেল থেকে অ্যালুমিনিয়ামের ছুরিটা ‘ফায়ার’ করে নিজের থিওরিকে সত্যি বলে প্রমাণ করল এবং সেটা করার ফাঁকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং যে কত ভালো বিদ্যা সেই নিয়ে আমাদের কত জ্ঞান দিল, সেই প্রসঙ্গে আর যাচ্ছি না। মোদ্দা কথা হল, ব্যাজার একথা মেনে নিতে বাধ্য হন যে হার্ট্রিজ খুন হয়েছিল দূর থেকে উড়ে আসা একটা ছুরির মাধ্যমেই।
“কিন্তু এই কাজ কে করতে পারে?” ব্যাজার জানতে চান।
“এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমি আপনাদের সবাইকে ওই তথাকথিত ইটালিয়ান চিঠিগুলো ভালো করে, দরকার হলে লেন্স দিয়ে দেখতে বলব। চিঠিগুলো লেখা হয়েছে সাধারণ নোট পেপারে। খামগুলোও সাধারণ। কিন্তু কালি হিসেবে যেটা ব্যবহৃত হয়েছে সেটা ড্রেপারের ডাইক্রয়েক ইংক, ড্রাফটসম্যানদের পছন্দের কালি। পেন হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে মেকানিকের স্টাইলাস। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, করোটি আর হাড়গুলো আঁকা হয়েছে দস্তুরমতো স্কেল-পেন্সিল দিয়ে মেপে! তাহলে এই চিঠিগুলো কে লিখে থাকতে পারে?”
“কোনও মেকানিক!” উত্তরটা আমাদের সবার মুখ থেকে একসঙ্গে বেরোতে পারে।
মাথা দুলিয়ে থর্নডাইক বলে চলে, “এবার আসি হার্ট্রিজের প্রায়-প্রতিবেশী মিস্টার বার্লোর কথায়। কমিশন এজেন্টের অফিসে যা যা থাকার কথা নয়, তেমন বেশ কিছু ছিল তাঁর অফিসে। ছিল ড্রাফটসম্যানদের কাজে লাগে এমন স্কেল, পেন্সিল, ইরেজার। ছিল সেই বিশেষ লাল কালির একটা পট, ঠিক যেমনটা আমরা দেখতে পাচ্ছি এই চিঠিগুলোয়। আর তাছাড়া,” প্রায় ম্যাজিকের মতো নিজের পকেট থেকে থর্নডাইক বের করে আনে সকালে ছেলেটার দেখানো নোটটা, “মিস্টার বার্লো এই নোটটা লিখতেও সেই স্টাইলাসটাই ব্যবহার করেছেন মনে হচ্ছে, যেটা কাজে লেগেছিল এই চিঠিগুলো লিখতে
“তাহলে তো এই বার্লোই!” চেঁচিয়ে ওঠেন মার্চমন্ট, “কিন্তু কে সে?”
“একটা বড়ো বাক্স, যেটা লাগে নানা মেকানিকাল জিনিসপত্র রাখতে,” ধীরলয়ে বলে থর্নডাইক, “আর একটা সরু লম্বা বাক্স, যাতে একটা রাইফেল থাকার সম্ভাবনাই বেশি, নিয়ে আজ খুব সকালে হাউজকিপার ওই অফিসবাড়ির সদর দরজার তালাটা খুলে দেওয়ার পরেই মিস্টার বার্লো কোথাও পালিয়েছেন। তবে মানুষটি রোগা, ফর্সা, বেঁটে এবং বাঁ হাতে দস্তানা পরেন। তাই
মার্চমন্ট প্রায় চিৎকার করে লিওনার্ড উলফের ঠিকানাটা এরপর ব্যাজারকে শুনিয়ে দেন।

না। লিওনার্ড উলফ ধরা পড়েনি। পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলার মুহূর্তেই নিজের বাড়িতে চেসপট রাইফেলের আর একটা গুলি নিজের ওপর প্রয়োগ করেছিল সে।
এডিথ ছাড়া পাওয়ার এবং কোর্টের আদেশে এডওয়ার্ড হার্ট্রিজের আর্থিক অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি হওয়ার খবরটা আমাদের কাছে পৌঁছে দেন কার্টিস আর মার্চমন্ট
অনেক ধন্যবাদ-টন্যবাদ শুনে নিজেদের চেম্বারে ফিরে আমি থর্নডাইককে বলি, “এত প্যাঁচালো কেস তুমি এত সহজে বুঝে ফেললে কী করে বলো তো?”
“প্যাঁচ থেকে,” মুচকি হেসে বলে থর্নডাইক, “ছুরিটা বের করার সময় আমরা সবাই দেখেছিলাম যে শার্টটা পেঁচিয়ে ছুরির সঙ্গেই হার্ট্রিজের শরীরের ভেতর ঢুকে গেছিল। এটা একমাত্র তখনই সম্ভব, যদি ছুরিটা শরীরে ঢোকার সময়েও ঘূর্ণায়মান অবস্থায় থাকে, যেমনটা হয় বন্দুক থেকে বেরিয়ে আসা গুলির ক্ষেত্রে। একবার এটা বুঝে ফেলার পর বাকিটা ছিল সরল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, যার অর্থ…”
এরপরের কথাগুলো আমি শুনিনি, আপনাদেরও শোনাতে চাই না।

[রিচার্ড অস্টিন ফ্রিম্যান-এর লেখা “দ্য অ্যালুমিনিয়াম ড্যাগার” গল্পটি পিয়ারসনস ম্যাগাজিনের মার্চ ১৯০৯ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রায় প্রতিটি ‘লকড রুম মিস্ট্রি’ সঙ্কলনের অন্তর্ভুক্ত এই গল্পটি প্রথম গ্রন্থাকারে সঙ্কলিত হয়েছিল ১৯০৯ সালেই লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘জন থর্নডাইক’স কেসেস’ নামের বইয়ে।]
_____
অলঙ্করণঃ সুমিত রায়

No comments:

Post a comment