প্রবন্ধ:: গোয়েন্দার গোয়েন্দাগিরি - রুমেলা দাস


গোয়েন্দার গোয়েন্দাগিরি
রুমেলা দাস

চরিত্র আর চিত্রায়ন - দুটো বিষয় একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। কারণ, চরিত্রের সঠিক চিত্রায়ন ঘটলে অন্তত এই ঘোর প্র্যাকটিক্যালের যুগে পাবলিসিটি মেলে গল্পের চরিত্রের। সেক্ষেত্রে বাঙালি ও বাংলার গোয়েন্দা ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটির মাথায় মাথা মিলিয়ে জেমস বন্ড, শার্লক হোমস গোয়েন্দার উঠোনে রীতিমতো কালজয়ী রূপ ধারণ করেছেন। তাই আপাতত বাঙালি পাঠক ও দর্শক হয়ে একটু বিদেশি চরিত্রের আপাদমস্তক কলম চালনায় সচেষ্ট হলাম।
জেমস বন্ডের মতো শার্লক হোমসও বাস্তব ব্যক্তিবিশেষেরই কাহিনি, এ তো অনেকেরই জানা। আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন শিল্পী মানুষ। তাই পেশাদারী ডাক্তারির পাশাপাশি ১৮৮৬ সালের মার্চ মাস থেকেই রহস্যে মন দেন। প্রথম উপন্যাস ‘A Tangled Skin, প্রধান চরিত্র শেরিনফোর্ড হোমস। কিন্তু নামটা কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে। পরিবর্তন প্রয়োজন। ঘটলও তাই। একসঙ্গে উপন্যাস, পেশা, এমনকি চরিত্রের নাম পরিবর্তনে সচেষ্ট হলেন লেখক।
শেরিনফোর্ড থেকে শার্লক হোমস।
কিন্তু বেমালুম নাম পরিবর্তনে পাঠকমন জয় করা যাবে না - একথা জানতেন কোনান ডয়েল। একটি স্বগতোক্তিতে বলেন, “চরিত্র সৃষ্টি করার সময় আমি বারবার আমার পুরনো শিক্ষক যোসেফ বেলের কথাই ভেবেছিলাম। তাঁর ঈগল পাখির মতো চোখমুখ, কৌতূহলোদ্দীপক চলাফেরা, যে কোনও বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের অদ্ভুত ক্ষমতা - এসবই আমার চরিত্রের সঠিক কাঠামো।”
বাস্তব অভিজ্ঞতাও কিছুটা কাজে লাগে। কারণ, কোনান-সাহেব এডিনবরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে ডাক্তার বেলের সহকারী হিসাবে কাজ করতেন। অধিকাংশ সময়েই রোগীদের হিস্ট্রি লিখতেন। তাই হাতেকলমে অনেকটা পরিচিতি হয়েছিল ডঃ বেলের সঙ্গে। রোগী দেখেই তৎক্ষণাৎ রোগ নির্ধারণ ও তার অতীতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এমনভাবে মেলে ধরতেন যাতে বিষয়ের দক্ষতা অবগত হত সহজেই।
১৮৯২ সালের ৪ঠা মে কোনান গুরুদক্ষিণার পূর্ণ সহানুভূতি সমেত একটি চিঠি লেখেন বেলকে।
‘আপনাকে দেখেই আমি শার্লক হোমস-এর চরিত্র সৃষ্টি করেছি। হোমস-এর বিশ্লেষণী ক্ষমতা কোনও বানানো অতিরঞ্জিত ব্যাপার নয়। আমি নিজে যা প্রত্যক্ষ করেছি, তাই আমার কলম বলেছে।’
কোনান হোমস-কে নিয়ে চারটি উপন্যাস ও ছাপ্পান্নটি ছোটোগল্প লিখেছেন।
প্রথম কাহিনিঃ ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ (১৮৮৭)।
দ্বিতীয় কাহিনিঃ ‘দ্য সাইন অব দা ফোর’ (১৮৯০)।
এরপর ‘দ্য স্ট্যান্ড’ ম্যাগাজিনে ছোটোগল্পের সিরিজ শুরু হয়। ১৯২৭ সালে হোমস-কে নিয়ে একগুচ্ছ ছোটোগল্পের সিরিজ ও আরও দুটি ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। হোমস-এর পটভূমির সময়কাল ১৮৮০ থেকে ১৯০৭ সাল।
শার্লক হোমস-এর জনপ্রিয়তা যে কোনও চিত্রনাট্যের জনপ্রিয় নায়কের তুলনায় অনেকাংশে বেশি। ২২১/বি, বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় আজও সপ্তাহে গড়ে ৫০-৭০খানা চিঠি আসে। কোনানের সহকারী ওয়াটসন এখন অতীত। উত্তর পাওয়া যায় হোমস সোসাইটির পক্ষ থেকে। বলা হয় – ‘আমরা দুঃখিত। হোমস এখন গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে মৌমাছি পালনে ব্যস্ত।’
সাহিত্যের জগতে এ সফলতা সত্যিই অদ্ভুত। রোমাঞ্চকর এমন অনুভূতিতে মনে হয়, সত্যিই একটা খাম না হয় হোক না হোমস-নামা।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment