গল্পের ম্যাজিক:: মায়া সংকেত - বিভাবসু দে


মায়া সংকেত
বিভাবসু দে


ঘড়িতে তখন রাত আটটা কুড়ি। নিজের প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা শেষ করে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছিলেন ডাঃ বসু। ডাঃ সমীর কুমার বসু, এ রাজ্যের বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। হঠাৎ এক ভদ্রলোক আচমকাই এসে ঘরে ঢুকলেন, সঙ্গে একটি বছর সাতেকের বাচ্চা মেয়ে আর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রমহিলা। ডাঃ বসু বেশ অবাকভাবেই তাকালেন ওদের দিকে। তিনজনের মুখগুলোই কেমন যেন থমথমে, কী একটা বিপদের ছায়া যেন ঘিরে রয়েছে ওদের চারপাশে।
"ডাক্তারবাবু,আমরা খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে.........", আগন্তুক ভদ্রলোক কথা শেষ করে ওঠার আগেই পেছন থেকে প্রায় তাদের ঠেলে এসে ভেতরে ঢুকল ডাঃ বসুর অ্যাসিস্ট্যান্ট।
"দেখুন না স্যার, এনারা কোনও কথা না শুনেই সোজা ভেতরে ঢুকে এলেন। আগে থেকে কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্টও নেননি।"
ডাঃ বসু দু’পক্ষের দিকেই একবার চোখ বুলিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্টকে বললেন, "আচ্ছা ঠিক আছে পরেশ, আমি দেখছি। তুমি যাও।"
"বসুন আপনারা।" ডাঃ বসুর কথায় সামনে এসে বসলেন তিনজনেই। মেয়েটি ভারী মিষ্টি দেখতে। কিন্তু তার চোখেও যেন অজানা ভয়ের একটা কালো ছায়া।
আগন্তুক ভদ্রলোক বললেন, "ধন্যবাদ স্যার। আসলে আমরা খুব একটা বিপদে আছি। অনেক ডাক্তারের কাছেই ছুটেছি, কোনও সমাধান হয়নি। কেউ কোনও জবাব দিতে পারেননি। অনেক আশা নিয়ে এসেছি আপনার কাছে।"
"ঠিক আছে, আপনি শান্ত হয়ে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলুন।"
ভদ্রলোক একটু থেমে যেন শ্বাস নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, "আমাদের একমাত্র মেয়ে বৈদেহী, আমরা বিনিই ডাকি। ওকে নিয়েই আমরা খুব ভয়ে আছি ডাক্তারবাবু। এতদিন সবকিছু ঠিকই ছিল। আর পাঁচটা এই বয়েসি বাচ্চা যেমন হেসেখেলে বেড়ায় বিনিও তেমনটাই ছিল। কিন্তু একমাস আগে একটা দুর্ঘটনার পর সব বদলে যায়।"
"দুর্ঘটনা?" ডাঃ বসু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন।
"হ্যাঁ। স্কুলের সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে যায় বিনি, মাথায় বেশ চোট লাগে। প্রায় একদিন জ্ঞান ফেরেনি ওর। তারপর ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাচ্ছিল, চোটটাও ভালো হয়ে গেছিল। কিন্তু সেই ঘটনার দু'সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হয় সে সব। রোজ রাতে সেই একই ঘটনা। মেয়েটা ঘুমোতে পারছে না স্যার, আমরাও ভয়ে দু'চোখের পাতা এক করতে পারি না।"
"আমার একটা মাত্র মেয়ে ডাক্তারবাবু, ওকে বাঁচান প্লিজ। ওর জন্য আমরা সব করতে রাজি," ডুকরে উঠলেন ভদ্রমহিলা।
"এমন কী ঘটে রোজ রাতে?" ডাঃ বসু জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর কপালের ভাঁজগুলো বেশ গভীর হয়ে ফুটে উঠেছে।
ভদ্রলোক কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "স্বপ্ন ! রোজ রাতে একটা স্বপ্ন দেখে বিনির ঘুম ভেঙে যাচ্ছে।"
এবার একটু বিরক্ত চোখে তাকালেন ডাঃ বসু। "স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায় বলে এত চিন্তার কী আছে ?"
"না ডাক্তারবাবু, শুধু ওইটুকু কারণ হলে এভাবে পাগলের মতো হন্যে হয়ে আপনার কাছে ছুটে আসতাম না আমরা। ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর বিনি চিৎকার করতে থাকে। একটা আজব ভাষায়। সেই ভাষা আমরা কেউ কোনোদিন শুনিনি। আর তার চেয়েও যেটা ভয়ের, ওই সময় ওর গলার স্বর ঠিক কোনও পরিণত পুরুষের মতো হয়ে যায়। যেন অন্য কেউ কোনও অজানা ভাষায় কথা বলছে বিনির গলা দিয়ে। আর তারপর একসময় চিৎকার করতে করতে প্রায় অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে বিনি।" একটু ঢোঁক গিললেন ভদ্রলোক। "আর ঠিক সেই মুহূর্তে ওর হাতে ফুটে ওঠে কতগুলি চিহ্ন। এই দেখুন।" বলে মেয়েটির হাতটা ডাঃ বসুর দিকে এগিয়ে দিলেন ভদ্রলোক।
ডাঃ বসু এতক্ষণ বেশ অবাক হয়েই শুনছিলেন। তাঁর সাতাশ বছরের কেরিয়ারে এমন কেস এর আগে কখনও শোনেননি। মেয়েটির হাতদুটো ভালো করে দেখলেন তিনি। সারা হাত জুড়ে কতগুলো অদ্ভুত চিহ্ন, যেন ছোটো ছোটো কিছু ছবি। কেউ যেন গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে এঁকে দিয়েছে এগুলো।
জীবনে অনেক ধরণের মানসিক রোগ আর রোগী দেখেছেন ডাঃ বসু, অনেককেই সারিয়েও তুলেছেন, কিন্তু আজ এই বাচ্চা মেয়েটির সঙ্গে ঘটে চলা ঘটনাগুলো যেন সব হিসেব এলোমেলো করে দিচ্ছে তাঁর। মনোরোগের কোনও সংজ্ঞার সঙ্গেই যেন ঠিক মেলাতে পারছেন না ব্যাপারটাকে।
একটু সময় চুপ করে রইলেন ডাঃ বসু। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, "তোমার নাম তো বিনি। কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?"
"ক্লাস টু-তে," সরল এক চিলতে মুখখানা মেয়েটির।
"আচ্ছা বিনি, তুমি রোজ রাতে কী স্বপ্ন দেখ মনে আছে তোমার?"
"হ্যাঁ, মনে আছে তো ডাক্তার কাকু। রোজই দেখি সেই স্বপ্নটা।"
"বেশ। তাহলে এবার ঠিক করে ভেবে বল তো তুমি কী দেখতে পাও। ভালোভাবে মনে করে বলবে কিন্তু। কিচ্ছু যেন বাদ না যায়। তাহলে আমি কাল তোমাকে একটা চকলেট দেব।"
চকলেটের কথায় বেশ একটুকরো হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল বিনির ঠোঁটে। "আমি দেখতে পাই একটা বন। চারিদিকে সবুজ ঘাস, জঙ্গল আর ছোটো ছোটো পাথরের বাড়ি। আর ঠিক মাঝখানে একটা অনেক উঁচু বাড়ি। সেটাও পাথরের। ওটার গায়ে কীসব যেন মূর্তি।"
"বাড়িটা দেখতে কেমন?"
"উঁচু। আর নিচ দিকটা অনেক চওড়া। তার ওপরটা একটু কম চওড়া। তার ওপর আরেকটু কম। আর একদম ওপরটা বেশ সরু আর চ্যাপ্টা। ওই বাড়িটার মাঝখান দিয়ে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। আমি সেই সিঁড়িটা বেয়ে ওপরে উঠে যাই। অনেক ওপরে। সেখানে অনেকগুলো লোক থাকে। মাথায় পালকের মুকুট, হাতে কতগুলো অস্ত্র; নাম জানি না সেসবের। একটা পাথরের চেয়ারের ওপর একজন বসে থাকে। তার মাথাতেও একটা পালকের মুকুট। আর সামনে একটা পাথরের টেবিলের মতো। একটা লোককে বেঁধে রাখা হয় সেখানে। তারপর আরেকটা খুব মোটা লোক আসে। তার হাতে একটা ভারী লোহার লাঠির মতো কী যেন।"
"তারপর কী হয় বিনি?"
"তারপর সেই মোটা লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে 'ইৎজাম্না' বলে তিনবার চিৎকার করে আর সেই লাঠিটা দিয়ে ওই বেঁধে রাখা লোকটার মাথায় মারতে শুরু করে। রক্ত বেরোতে থাকে।"
"তারপর কী দেখ?"
"আর কিছু মনে থাকে না আমার। সব অন্ধকার হয়ে যায়। যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখি সকাল হয়ে গেছে। মা তুলে দেয় ঘুম থেকে, স্কুলে যাবার জন্য। স্কুল একদম ভাল্লাগে না আমার।"
একটু হাসলেন ডাঃ বসু। "তাই বুঝি? আমারও ছোটোবেলা স্কুল একদম ভালো লাগত না। তাহলে তো তোমার সঙ্গে আমার খুব ভালো ফ্রেন্ডশিপ হবে।" বিনির মুখেও একগাল হাসি ভেসে উঠল।
"কী বুঝলেন ডাক্তারবাবু?" চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন বিনির বাবা।
"বলছি। কিন্তু আপনাদের নামটাই তো জানা হল না?"
"ওহ, হ্যাঁ! আমার নাম রণজয় সেন, আর ইনি আমার স্ত্রী অমৃতা সেন। আমরা দুজনেই কলেজে পড়াই।"
"গ্রেট। মিসেস সেন, আপনি যদি কাইন্ডলি বিনিকে নিয়ে একটু বাইরে অপেক্ষা করেন।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।" ভদ্রমহিলা বিনিকে নিয়ে বাইরে ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলেন।
"আচ্ছা মিস্টার সেন, বিনি যে জায়গাগুলোর কথা বলছে এরকম কোথাও কি কখনও ওকে নিয়ে বেড়াতে গেছেন আপনারা?"
"না। আমরা এরকম কোথাও কোনোদিন যাইনি।"
"ওকে। আরেকটা প্রশ্ন। স্বপ্ন দেখার পর ওর ঘুম ভাঙে সোজা সকালে, তাহলে ওই পুরুষের গলায় চিৎকার আর হাতে দাগগুলো?"
"হ্যাঁ, ওগুলো কিছুই বিনির মনে থাকে না। শুধু স্বপ্নের কথাটাই ওর মনে থাকে।" একটু ইতস্তত করে রণজয়বাবু বললেন, "আচ্ছা ডাক্তারবাবু একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
"হ্যাঁ, শিওর। বলুন।"
"মানে আমরা কেউই বিশ্বাস করি না, কিন্তু মানে ভূত বা প্রেতাত্মা কিছু কী?"
"না না,মিস্টার সেন। কিছু জটিল মানসিক অবস্থায় এরকম সম্পূর্ণ আলাদা কণ্ঠস্বর বেরোতে পারে। এমন অনেক কেস আমি দেখেছি। গ্রামের মানুষরা না বুঝে এগুলোকেই ভূতে ধরা ভাবে। ওসব কিছু নয়।"
"আর বিনির হাতের ওই চিহ্নগুলি?"
একটু সময় চুপ করে রইলেন ডাঃ বসু। তারপর বললেন, "দেখুন আপনাকে শুধু শুধু মিথ্যে ধোঁয়াশায় রাখতে চাই না। ওই চিহ্নগুলোর আপাতত কোনও ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। সত্যি কথা বলতে গেলে বিনির কেসটা বেশ আলাদা।"
"আমার মেয়েটা ঠিক হয়ে যাবে তো ডাক্তারবাবু?" দু'চোখ যেন একটু ছলছল করে উঠল রণজয়বাবুর।
"আমি গ্যারান্টি দিতে পারব না মিস্টার সেন। তবে আপনাকে এটুকু কথা দিতে পারি যে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। বিনির কেসটা আমার কাছেও একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।"
"অনেক অনেক ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু।"
"হুম। আর এই একটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি, আজকে খাইয়ে দেখুন যদি কোনও উপকার হয়।"
প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে একবার দেখলেন রণজয়বাবু। নার্ভ রিল্যাক্স করার ওষুধ। "ঠিক আছে। আজ তবে উঠি ডাক্তারবাবু। আপনার ফিজ-টা?"
"এখন থাক, সে সব পরে হবে'খন। আপনাদের ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা একটু দিয়ে যান, আমি কাল রাতে একবার আপনাদের বাড়ি যাব। নিজের চোখে একবার দেখতে চাই যে রাতের বেলা বিনির সঙ্গে ঠিক কী কী হয়।"


পার্ক স্ট্রীটের রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন ডাঃ বসু। পাশের সিটে বসে আছেন তাঁর ছোটোবেলার বন্ধু অনির্বাণ। প্রফেসর অনির্বাণ দত্ত, প্যারাসাইকোলজির নামকরা অধ্যাপক ও গবেষক।
"সবই তো শুনলি অনি। তোর প্যারাসাইকোলজির নলেজ এ ব্যাপারে কী বলে?"
কিছুক্ষণ গাড়ির জানালা দিয়ে আনমনে বাইরে তাকিয়ে রইলেন প্রফেসর দত্ত। "না রে, কিছুই মিলছে না সমু। তুই যা ডেস্ক্রিপশন দিলি তাতে বেশ গোলমেলে ঠেকছে ব্যাপারটা। আর সবচেয়ে যেটা শকিং তা হল ওই......."
"হাতের চিহ্নগুলো তো?" ডাঃ বসু বললেন।
"হ্যাঁ। সেটাই। সেখানেই কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না।" বলতে বলতে গাড়ির এ. সি-টা একটু বাড়িয়ে দিলেন প্রফেসর দত্ত।
"এছাড়াও আমার আরও অনেক জায়গায় বাধছে। তোদের প্যারাসাইকোলোজিতে কী বলে আমি জানি না, তবে আমার সাইকিয়াট্রিক নলেজে একটু জানি যে বাস্তবের কোনও ঘটনা মনের ওপর খুব গভীর দাগ কাটলে তবেই ওভাবে বারবার সেই ছবি স্বপ্ন হয়ে ভেসে উঠতে পারে। কিন্তু বিনির কেসটায় ও এমন কোনও জায়গায় কোনোদিনই যায়নি, এমন কোনও ঘটনাও ওর জীবনে ঘটেনি।"
"হুম। এগুলোর ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি। বারবার ভেসে ওঠা ওই একই স্বপ্ন মেয়েটির পাস্ট লাইফের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে। ওই অজানা পুরুষকণ্ঠস্বর মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসর্ডার থেকে আসতে পারে। কিন্তু এখানেই সমস্যাটা। এতকিছু একসঙ্গে কারও জীবনে আজ অবধি ঘটতে দেখিনি আমি। আর ওই চিহ্নগুলো। নো এক্সপ্লানেশন মাই ফ্রেন্ড!" একটু থেমে প্রফেসর দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা, তুই কি নিজে দেখেছিস যে ওই চিহ্নগুলি আপনাআপনি মেয়েটির হাতে ফুটে ওঠে? মিডিয়ার নজরে আসার জন্যে বুজরুকিও তো হতে পারে। আজকাল তো কত কিছুই হয় !"
"সন্দেহটা আমার মনেও ছিল। তাই তো বিনিদের বাড়ি যাচ্ছি আজকে, নিজের চোখে দেখতে চাই ব্যাপারটা। আর সেজন্যই তোকেও সঙ্গে নিলাম।"
"হুম। যদি সত্যি হয় তবে এটা প্যারাসাইকোলোজির ক্ষেত্রে একটা দারুণ কেস হতে চলেছে।"

রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ বিনির বাড়ি গিয়ে পৌঁছলেন ডাঃ বসু, সঙ্গে প্রফেসর দত্ত। বিনিই ছুটে এসে দরজা খুলল।
"এইতো মিস বিনি। কেমন আছেন?"
"খুব ভালো। তুমি কেমন আছ ডাক্তারকাকু?"
"একদম ফিট এন্ড ফাইন। এই দেখ আজ আরেকজন কাকুকে নিয়ে এসেছি। অনি কাকু।" প্রফেসর দত্তের সঙ্গে ছোট্ট হাত বাড়িয়ে একটা হ্যান্ডশেক করল বিনি।
"এই নাও তোমার চকলেট।" ডাক্তারকাকুর কাছ থেকে চকলেট পেয়ে বিনি তো বেজায় খুশি। হাসিভরা মুখে চকলেট নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল সে।
তারপর ডাঃ বসু আর প্রফেসর অনির্বাণের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল সেন দম্পতির। রাতের খাওয়া সেরে উঠতে উঠতে তখন প্রায় এগারোটা। ডাঃ বসু বিনির হাতের চিহ্নগুলি একটা ডাইরিতে এঁকে নিলেন আর সঙ্গে প্রতিটা চিহ্নের নিচে মার্ক করে দিলেন বিনির হাতে। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়বে বিনি। আজকে জানতেই হবে সত্যিটা কী।
বারোটা পঁচিশ। বিনি বেশ গভীর ঘুমে। বিছানার পাশে হালকা হলুদ একটা আলো জ্বলছে। বিছানার একপাশে বসে আছেন মিস্টার সেন আর অন্যপাশে চেয়ারে বসে তীব্র উৎকণ্ঠায় বিনির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন ডাঃ বসু। এ. সি লাগানো ঘর, তবু উত্তেজনায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমতে শুরু করেছে প্রফেসর দত্তের কপালে। ঘরের বাতাসটা যেন এক রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ভারী হয়ে আছে। এক অজানা উত্তেজনায় বারবার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে ডাঃ বসুর। একটু পরে প্রফেসর দত্ত ইশারা করলেন, বিনির চোখদুটো নড়ছে; ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ডাঃ বসু পাশের টেবিলে রাখা অডিও রেকর্ডারটা হাতে তুলে নিলেন, অন করে দিলেন সুইচটা। ভিডিও ক্যামেরা আগেই জায়গা মতো অন করে রাখা ছিল। সময়ের সঙ্গে উত্তেজনার পারদ চড়তে লাগল। বিনির চোখের পাতার নড়াচড়া বেড়েই চলেছে, হাত-পা গুলোও নড়ে নড়ে উঠছে।
হঠাৎ এক ঝটকায় উঠে বসল বিনি। দু'চোখ খোলা, তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, স্থির অপলক দৃষ্টি। চুলগুলো এসে নেমেছে মুখের ওপর। হাতের আঙ্গুলগুলো কাঁপছে, বেশ টের পাচ্ছেন ডাঃ বসু। তীব্র ভয় আর উত্তেজনায় কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে প্রফেসর দত্তের। কিন্তু তারপর যা ঘটল, ভয়ে প্রায় সিঁটিয়ে গেলেন দুজনেই। একটা অচেনা অশরীরী গলায় কোনও এক অজানা ভাষায় চিৎকার করে উঠল বিনি। ওর গলা ঠেলে বেরিয়ে আসছে এক প্রৌঢ় কণ্ঠস্বর। অদ্ভুত এক ভাষা। যেন বিনির শরীর দিয়ে অন্য কেউ কথা বলছে। ভয়ে চেয়ার আঁকড়ে বসে আছেন ডাঃ বসু। চোখের তলায় ঘাম জমছে তাঁর, ভিজে যাচ্ছে সাদা শার্টটা শরীরের ভাঁজে ভাঁজে জমে ওঠা ঘামে। এমন কিছুই ওঁরা কেউ কোনোদিন চোখের সামনে ঘটতে দেখেননি।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে এল ওই অশরীরী কণ্ঠ। তিনবার 'ইত্জাম্না' বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে পড়ল বিনি।
ভয়ে প্রায় আটকে আসা শ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে এল প্রফেসর দত্তের। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদের সামলে নিলেন তাঁরা। বিনির হাতটা ভালোভাবে দেখতে লাগলেন ডাঃ বসু। কব্জির গোড়ায় হঠাৎ চোখ পড়ল তাঁর, একটা নতুন চিহ্ন, মার্ক করা নেই ওটা। দেখতে ঠিক যেন একটা পাখির মতো। মুহূর্তে এক ঝলক মুখ চাওয়াচাওয়ি হয়ে গেল ডাঃ বসু আর প্রফেসর দত্তের মধ্যে। দু’জনের চোখেই একটা গাঢ় বিস্ময়ের ছাপ।

সকাল সাতটা বাজে। এককাপ কফি হাতে বিনিদের বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন ডাঃ বসু, সঙ্গে প্রফেসর দত্ত। দুজনেই ঘুমোতে পারেননি কাল সারারাত।
"সবই তো আমাদের চোখের সামনেই ঘটল। কিছু বুঝতে পারছিস অনি?"
"না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি যে প্রকৃতির কোনও এক অজানা শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।"
"মানে? তুইও কি তবে ওই ভূত-প্রেত বলেই চালাতে চাস ব্যাপারটাকে?"
"না রে। সেটা বলছি না। প্রকৃতি নিজেই অনেক অজানা অলৌকিকতায় ভরা। পারলৌকিক জগত শুধু তার একটা অংশমাত্র হতে পারে, কিন্তু পুরোটা কখনোই নয়। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে হারিয়ে যাওয়া জাহাজ, বিমান কিংবা আমেরিকার গম খেতে ভেসে ওঠা অতিকায় চক্রাকার নকশাগুলো, কোনোটারই কিন্তু কোনও ব্যাখ্যা নেই আজ পর্যন্ত। এই সৃষ্টিতে এমন অনেক অন্ধকার গলিপথ এখনও রয়েছে যার কিছুই আমরা জানি না। এই মেয়েটির মধ্য দিয়ে আমরা তেমনই কোনও এক অতিপ্রাকৃতের সম্মুখীন হতে চলেছি; আমার মন বলছে।" একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে প্রফেসর দত্ত আবার বলতে লাগলেন, "কাল রাতে চোখের সামনে যা যা দেখলাম তার সঠিক কোনও ব্যাখ্যা আমার প্যারাসাইকোলোজিতেও নেই আর তোর সাইকিয়াট্রিতেও নেই। সেটা তুই নিজেও ভালোভাবেই জানিস।"
"হুম, এ বিষয়ে আমিও একমত। আচ্ছা, তোর কী মনে হয়, কোনও অজানা শক্তি বিনির মধ্য দিয়ে কিছু বলতে চাইছে?"
"হতেই পারে। আমাদের হাতে তিনটে সূত্র আছে; ওর স্বপ্ন, ওই অজানা ভাষায় বলা কথাগুলো আর হাতে ফুটে ওঠা চিহ্নগুলো।"
"স্বপ্নে বিনি রোজ দেখে পাথরের একটা উঁচু বাড়ি। নিচদিকে চওড়া, আর যত ওপরে উঠেছে ধাপে ধাপে সরু হয়ে গেছে। মাঝখানে সিঁড়ি, আর আশেপাশে সবুজ বন।"
"চওড়া থেকে ওপর দিকে সরু হয়ে গেছে? পিরামিড?" ভুরু কুঁচকে বললেন প্রফেসর দত্ত।
"আমার মাথাতেও এসেছিল, কিন্তু মিশরে কোথাও পিরামিডের আশেপাশে সবুজ বন নেই।"
ততক্ষণে মিসেস সেন এসে দাঁড়িয়েছেন ব্যালকনির দরজার সামনে। "আপনাদের ব্রেকফাস্ট রেডি। চলুন খেয়ে নেবেন।"
"হ্যাঁ, চল অনি, ব্রেকফাস্টটা সেরে নিই আগে।" ডাঃ বসু এগিয়ে গেলেন ডাইনিং রুমের দিকে। পেছনে প্রফেসর দত্ত। খাওয়ার টেবিলে গিয়ে বসলেন দুজনেই। মিস্টার সেনও এসে বসেছেন। বিনি সবে উঠেছে, ব্রাশ করছে। রান্না ঘর থেকে ভেসে আসছে লুচি-ঘুঘনির দারুণ গন্ধ। মিসেস সেন ডাকলেন, "মায়া, প্লেটগুলো নিয়ে আয়।"
আনমনে খবরের কাগজটা একটু নাড়ছিলেন ডাঃ বসু, হঠাৎ চমকে উঠলেন। প্রসেফর দত্তের হাত চেপে ধরে উত্তেজিত গলায় বলে উঠলেন, "পেয়ে গেছি অনি, পেয়ে গেছি। উফফ, এটা যে কেন এতক্ষণ মাথায় আসছিল না!"
"কী পেয়ে গেছি ?"
"মায়া!"
সেন দম্পতি বেশ অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন ডাঃ বসুর দিকে। মিসেস সেন জিজ্ঞেস করলেন, "কী হল ডাক্তারবাবু? মায়া তো আমাদের কাজের মেয়ের নাম।"
"জানি। কিন্তু যে মায়ার কথা আমি বলছি সে বহু হাজার বছর আগের। মায়া সভ্যতা।"
প্রফেসর দত্তের চোখেও সমান বিস্ময়। "ঠিক বলেছিস সমু। মায়া সিভিলাইজেশন। ওরাও তো পাথরের পিরামিড বানাত, মাঝ বরাবর সিঁড়ি থাকত তাতে। আর মেসো-আমেরিকান অঞ্চল তো সবুজ বনে ভরা। নরবলিও প্রচলিত ছিল মায়া সভ্যতায়, যেমনটা বিনি দেখতে পায়।"
"আপনারা কী বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না।" রণজয়বাবুর গলায় কিছুটা ভয়, কিছুটা বিস্ময়ের মিশেল।
"সব বলব মিস্টার সেন, আগে বিনিকে একটু ডেকে দিন।" ডাঃ বসু বললেন।
একটু পরেই বিনি এল। ততক্ষণে ল্যাপটপ খুলে বসেছেন ডাঃ বসু। "গুড মর্নিং বিনি।"
একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এল বিনি। "গুড মর্নিং ডাক্তারকাকু।"
"আচ্ছা বিনি, তুমি স্বপ্নে যে জায়গাটা দেখতে পাও তার ছবি দেখালে চিনতে পারবে?"
"হ্যাঁ, পারব।"
ডাঃ বসু ল্যাপটপে এক এক করে মায়া সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক শহর আর পিরামিডগুলোর ছবি দেখাতে লাগলেন। তিনি স্ক্রল ডাউন করে যাচ্ছেন, আর স্ক্রিনে একে একে ভেসে উঠছে লামানাই, কোবা, কারাকোল, কোপানের মায়া-মন্দিরগুলো। হাজার হাজার বছর আগের মায়া স্থাপত্য আজও বেঁচে আজে এই জায়গাগুলোতে। এগোতে এগোতে হঠাৎ একটা ছবি দেখে চমকে উঠল বিনি। ডাঃ বসুর হাত ধরে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল এটাই সেই উঁচু বাড়িটা যেটা সে স্বপ্নে দেখে।
"গাউতেমালা রেইন ফরেস্ট," স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলে উঠলেন প্রফেসর দত্ত।
"বাহ, গুড জব বিনি। তুমি এখন এস। পরে দরকার পড়লে আবার ডেকে নেব।" ডাঃ বসুর কথায় ওর পুতুলটা হাতে নিয়ে বিনি ঘরে চলে গেল।
একটা লম্বা শ্বাস বুকে টেনে নিয়ে রণজয়বাবুর দিকে তাকালেন ডাঃ বসু। "আমি জানি আপনাদের মনে অনেকগুলো প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের কাছে সব কিছুর উত্তর নেই এখনও, কিন্তু যেটুকু বুঝেছি সেটাই বলছি।" একটু থেমে আবার বলতে লাগলেন, "বিনি স্বপ্নে যেই জায়গাটা দেখে সেটা মায়া সভ্যতার একটি বহু পুরোনো দ্রষ্টব্য স্থান, গাউতেমালা রেইন ফরেস্ট।" ল্যাপটপটা রণজয়বাবুর দিকে এগিয়ে দিলেন ডাঃ বসু। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ছবিতে একবার চোখ বুলিয়ে রণজয়বাবু বললেন, "কিন্তু এখানে তো আমরা কোনোদিন যাইনি। এর সঙ্গে বিনির কী সম্পর্ক?"
"তার উত্তর এখনও আমাদের কাছে নেই মিস্টার সেন। তবে মায়া সভ্যতা সম্পর্কে দুয়েকটি কথা বলে রাখি আপনাদের দু’জনকেই। পৃথিবীর অনেক পুরোনো সভ্যতাগুলির একটি এই মায়া সভ্যতা। মেক্সিকো, সেন্ট্রাল আমেরিকা আর ব্রাজিলের কিছুটা জুড়ে ছিল সেই লোকেদের বাস। ভৌগোলিকভাবে একে মেসো-আমেরিকা অঞ্চল বলে। প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে এই সভ্যতার শুরু হয়; ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে গড়ে ওঠে এই উঁচু পিরামিড আকারের মন্দিরগুলি। অনেক বছর এই সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। তারপর ১৫১১ সালের পরে স্প্যানিশ আক্রমণে একটু একটু করে ধ্বংস হয়ে যায় এই মায়া সভ্যতা।"
"আপনার মেয়ের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক আমাদের জানা নেই, কিন্তু বিশ্বাস রাখুন রণজয়বাবু, আমরা যখন এখান অবধি বুঝতে পেরেছি তখন আমার মন বলছে যে খুব শিগগির পুরোটাই বুঝে ফেলব। আপনার বিনি আবার নিজের সুস্থ জীবন ফিরে পাবে।" প্রফেসর দত্ত বললেন।
সেন দম্পতির চোখে তখনও এক অজানা আতঙ্কের ছায়া। হাজার হাজার বছর আগের সমুদ্র পারের এক অচেনা সভ্যতা, ইতিহাসের সীমানা পেরিয়ে আজ কীভাবে এসে জড়িয়ে গেল তাঁদের ছোট্ট বিনির জীবনে? কোনও উত্তর নেই। শুধুই এক মায়াবী রহস্য আর না-বলতে-পারা ভয় ঘিরে আছে তাঁদের চারপাশে।
দু'হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরে চলে গেলেন মিসেস সেন। রণজয়বাবুর চোখেও সেই একই ব্যথা, শুধু জলটুকু নেই।


"কী ব্যাপার, হঠাৎ জরুরি তলব যে? কিছু পেলি নাকি?" বলতে বলতে ডাঃ বসুর ফ্ল্যাটের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন প্রফেসর দত্ত। ডাঃ বসু সোফায় বসে ছিলেন; সামনে কিছু কাগজ রাখা, উলটেপালটে দেখছিলেন সেগুলোই।
"আয় বোস। অনেক কিছুই পেয়ে গেছি।" ডাঃ বসুর ঠোঁটে হালকা একটা হাসির রেখা।
"তাই নাকি! খুলে বল তো তবে কী এমন পেলি কেসটার ব্যাপারে।"
চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে একটু হেলান দিয়ে বসলেন ডাঃ বসু। "অনি, তোর তপুর কথা মনে আছে?"
"তপু? মানে তপোধীর মুখার্জি? ওই যে আমাদের সঙ্গে স্কুলে পড়ত রোগা-পাতলা মতন ছেলেটা, তার কথা বলছিস?"
"হ্যাঁ রে। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিল, তারপর তো বহু বছর আর কোনও যোগাযোগ নেই। কিছুদিন আগে অনেক খুঁজেপেতে ওর নম্বর আর ইমেইল আইডি জোগাড় করলাম। এখন সে লন্ডনে আর্কিওলজি নিয়ে রিসার্চ করছে। জানতাম, পারলে তপুই পারবে এ বিষয়ে সাহায্য করতে। আসলে সেদিন বিনিদের বাড়ি থেকে ফেরার পরেই কথাটা মাথায় আসে। হয়তো শুধুই অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢিল ঠিক নিশানায় লেগেছে।"
"হেঁয়ালি না করে পুরো ব্যাপারটা খুলে বল।"
"বলছি বলছি, সব বলছি। বিনি স্বপ্নে যেই জায়গাটা দেখতে পায় সেটা মায়া সভ্যতার গাউতেমালা রেইন ফরেস্ট অঞ্চল। সেখান থেকেই আইডিয়াটা মাথায় আসে। বিনির হাতে ফুটে ওঠা ওই চিহ্নগুলো আর রাতের বেলা পুরুষের গলায় বিনির ওই কথার অডিও ক্লিপ মেইল করেছিলাম তপুর কাছে। আজ প্রায় পাঁচদিন পর মেইলের জবাব এল। যেটা আঁচ করেছিলাম ঠিক সেটাই।"
"কী?" টেবিলের ওপর ঝুঁকে বেশ উত্তেজিতভাবে জিজ্ঞেস করলেন প্রফেসর দত্ত।
"হায়রোগ্লিফ। ওগুলো আসলে মায়া সভ্যতার হায়রোগ্লিফ। মায়া লোকেরাও মিশরীয়দের মতো ছবির ভাষা ব্যবহার করত।"
"বলিস কী? এ যে কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। সাত বছরের একটা বাচ্চা মেয়ের গায়ে ফুটে উঠছে মায়া সভ্যতার হায়রোগ্লিফ !"
"হ্যাঁ রে। তপু যেটা বলল, এই চিহ্নগুলো যে মায়া-হায়রোগ্লিফস সেটা সে দেখামাত্রই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু সেগুলো এলোমেলো ভাবে থাকায় ঠিক সাজাতে পারছিল না কিছুতেই। তারপর সেই অডিও ক্লিপটা শুনতে গিয়ে চমকে উঠে তপু। ওই ভাষাটাও প্রায় ২০০০ থেকে ১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মায়া ভাষা। সেখানেই হঠাৎ খটকা লাগে ওর মনে। অডিও ক্লিপের কথাগুলোর সঙ্গে ওই চিহ্নগুলোকে একটু একটু করে মেলাতে শুরু করে সে। আর সেখানেই কেল্লা ফতে! একদম খাপে খাপে মিলে যায় সব।"
"মানে তুই বলছিস বিনির গায়ে ফুটে ওঠা চিহ্নগুলো ঠিকঠাক ভাবে জুড়ে দিলে যা হয় সেটাই পুরুষকণ্ঠে ভেসে আসে বিনির গলা দিয়ে।"
"একদম ঠিক। তপু ওই কথাগুলোর যতটা সম্ভব কাছাকাছি একটা বাংলা মানে লিখে আজ মেইল করে পাঠিয়েছে। এই দেখ।" টেবিলে রাখা কাগজগুলো প্রফেসর দত্তের দিকে এগিয়ে দিলেন ডাঃ বসু।
কতগুলো খাপছাড়া হেঁয়ালির মতো কথা। প্রফেসর দত্ত পড়তে লাগলেন, "স্বর্গের অভিশাপ নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। ইতিহাস মুছে যায় রক্তধারায়। তবু থেকে যায় স্বর্গের দুধ, চারটি কলসে ঢালা। তিনটি পূর্ণ, একটি অর্ধেক ভরা। পূর্ণ করো তারে।" এইটুকু পড়ে থামলেন প্রফেসর দত্ত। "এসবের মানে কী সমু? আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না।"
"কোনও সাংকেতিক অর্থ নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে, সেটাই বুঝতে হবে। খেয়াল করে দেখ, প্রথম দুটো লাইন, 'স্বর্গের অভিশাপ নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। ইতিহাস মুছে যায় রক্তধারায়'। এখানে স্প্যানিশদের সঙ্গে যুদ্ধে মায়া সভ্যতার ধ্বংসের কথাই লেখা আছে।"
"কিন্তু বাকি কথাগুলো? স্বর্গের দুধ!"
"ওটাও কোনও একটা রূপক। ভাবতে হবে অনি। ভালো করে কথাগুলোকে তলিয়ে ভাবতে হবে। স্বর্গের দুধ... একটা অর্থে অমৃত বোঝাতে পারে কি?"
"হ্যাঁ, হতেই পারে। কিন্তু পৃথিবীতে চার কলস অমৃত রয়েছে !"
"উহু। আরেকটু গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। আমার মন বলছে অর্থটা এত সোজা হতে পারে না। আচ্ছা, পৃথিবীতে এমন কী আছে যা মানুষকে অমর করতে পারে?"
কিছুক্ষণ চোখ বুজে ভাবতে লাগলেন প্রফেসর দত্ত। তারপর দু'দিনের না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়িতে বার দুয়েক হাত বুলিয়ে বললেন, "তেমন কিছুই তো মাথায় আসছে না রে। তবে চিরকালই তো শুনে এসেছি জ্ঞান মানুষ অমর ক.........."। বলতে বলতে হঠাৎ থমকে গেলেন তিনি।
"কি রে, কী হল ?" অবাক চোখে তাঁর দিকে তাকালেন ডাঃ বসু।
"পেয়ে গেছি। কোডেক্স !" উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করে উঠলেন প্রফেসর দত্ত।
"কোডেক্স ?"
"হ্যাঁ রে। বুঝিয়ে বলছি। জ্ঞান মানুষকে অমর করে। আর জ্ঞান সাধারণত কীভাবে পাওয়া যায়?"
"বই পড়ে।"
"একজ্যাক্টলি। আমি এই ক'দিন ধরে মায়া সভ্যতার ওপর অনেকগুলো বই পড়ে ফেলেছি। তারই একটা বইয়ে এই ব্যাপারটা পাই। মায়া সভ্যতার কয়েক হাজার বই স্প্যানিশ সৈন্যরা আর ক্যাথলিক চার্চ মিলে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এখন তার মধ্যে শুধু চারটে বই টিকে আছে। মাদ্রিদ কোডেক্স, ড্রেসডেন কোডেক্স, প্যারিস কোডেক্স। এই তিনটে সম্পূর্ণ। আর গ্রলিয়ের কোডেক্সের শুধুমাত্র কয়েকটি পাতাই পাওয়া গেছে।"
"আর এই তাহলে সেই অর্ধেক ভরা চতুর্থ কলস। সাব্বাশ অনি।" প্রফেসর দত্তের কাঁধে হালকা চাপড় মেরে বললেন ডাঃ বসু।
"কিন্তু এই বইয়ের বাকি পাতাগুলো খুঁজব কোথায়?"
"সেটারও সংকেত আছে। পরের পাতায় দেখ। আরেকটা হেঁয়ালি লেখা আছে।"
পাতা উলটে আবার পড়তে লাগলেন প্রফেসর দত্ত। "সংহারকের নগর। মৃত্যু আগুন হয়ে জ্বলে। শত বর্ষের জীর্ণ শরীর। পাতার ফাঁকে পাতা, পূর্ণ করো শূন্য খাতা। কলস যদি না ভরে, রক্তে শোধ হবে ব্যর্থতা। ইৎজাম্না, ইৎজাম্না, ইৎজাম্না।"
প্রফেসর দত্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সুযোগ না দিয়েই ডাঃ বসু বললেন, "জানি তুই কী জিজ্ঞেস করবি; ইৎজাম্না কী বস্তু। তাই তো ?"
"হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস। প্রথমদিন থেকেই শব্দটা শুনছি।"
"ইৎজাম্না মায়া মাইথোলজির একজন দেবতা। সৃষ্টিকর্তা। আমাদের যেমন ব্রহ্মা, তেমনি মায়া সভ্যতায় ছিল ইৎজাম্না।"
"আচ্ছা। কিন্তু এই বাকি হেঁয়ালিটার মানে কী?"
ডাঃ বসু একটু হেসে বললেন, "এটা কিন্তু আমি কিছুটা ধরতে পেরেছি। 'সংহারকের নগর। মৃত্যু আগুন হয়ে জ্বলে'। বল তো সংহারক কে ?"
"কে?"
"সংহার, মানে প্রলয়। তার দেবতা শিব। আর শিবের নগর মানে?"
"কাশী। বেনারস। কিন্তু শিওর কীভাবে হলি যে এখানে হিন্দু ধর্মের সংহারক দেবতার কথাই বলা হয়েছে?"
"দ্বিতীয় লাইনটা খেয়াল কর। 'মৃত্যু আগুন হয়ে জ্বলে'। বেনারসে শ্মশানের ছড়াছড়ি, সেখানে চিতার আগুন কখনও নেভে না।" ডাঃ বসুর কথা শেষ হতেই হঠাৎ তাঁর মোবাইলটা বেজে উঠল। মিস্টার সেনের ফোন।
"হ্যালো........" কথা বলতে বলতে মুখটা থমথমে হয়ে উঠল ডাঃ বসুর।
"সমু, কী বললেন মিস্টার সেন?"
বেশ চিন্তিত গলায় ডাঃ বসু বললেন, "খবর ভালো না। বিনি একটু আগেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যায়। ধনুষ্টঙ্কারের খিঁচুনির মতো বেঁকে যেতে থাকে ওর শরীর। হাতের ওই চিহ্নগুলো থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরোচ্ছে অনবরত।"
"সে কী! তাহলে তো এখনই একবার যেতে হয়।"
"ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আপাতত একটু স্টেবল, কিন্তু রক্ত পড়া থামেনি। জ্ঞানও ফেরেনি এখনও।"
"কোন হাসপাতাল? চল একবার, যেতে হবে তো।"
"না অনি। এখন এসবের সময় নেই। শেষের লাইনটা ভেবে দেখ। 'কলস যদি না ভরে, রক্তে শোধ হবে ব্যর্থতা'। রক্ত ঝরতে শুরু করেছে অনি। যদি আমরা ওই গ্রলিয়ের কোডেক্সের হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলো খুঁজে না আনতে পারি তবে বিনিকে আর বাঁচান যাবে না।"
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে প্রফেসর দত্ত বললেন, "কিন্তু কোথায় খুঁজবি ওগুলো ?"
"বেনারসে। আমি এখনই যাব। হাতে আর সময় নেই অনি। বিনিকে আমি এভাবে মরতে দেব না।" উঠে দাঁড়ালেন ডাঃ বসু। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তাঁর।
"তুই একা যাবি কেন? আমিও যাব তোর সঙ্গে। যখন একসঙ্গে শুরু করেছি তখন একসঙ্গেই এর শেষ দেখে  ছাড়ব।"


প্রায় আঠারো ঘন্টার ট্রেন জার্নি। অমৃতসর এক্সপ্রেসে সকাল আটটা নাগাদ কাশী স্টেশনে এসে নামলেন ডাঃ বসু আর প্রফেসর দত্ত। স্টেশন থেকে একটু এগিয়েই গঙ্গা নদী। বেনারসের বিখ্যাত বিশ্বনাথ মন্দিরও খুব বেশি দূরে নয় এখান থেকে।
"বেনারস তো পৌঁছে গেলাম সমু, কিন্তু বইয়ের পাতাগুলো কোথায় খুঁজবি কিছু ঠিক করলি?" স্টেশন থেকে বেরোতে বেরোতে প্রফেসর দত্ত জিজ্ঞাসা করলেন।
"কাল সারারাত ঘুমোতে পারিনি রে। ওই হেঁয়ালির কথাগুলো আর বিনির মুখটাই শুধু মাথায় ঘুরছিল।"
ডাঃ বসুর কাঁধে হাত রাখলেন প্রফেসর দত্ত। "কিচ্ছু হবে না বিনির। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
ম্লান একটা হাসি ভেসে উঠল ডাঃ বসুর মুখে। "তাই যেন হয়।"
স্টেশন থেকে বেরিয়ে দুজনেই একটা রিকশায় উঠলেন। "নদী-কিনারে লে চলো ভাইয়া।"
"শোন অনি, আমি মাঝের ওই লাইন দুটো নিয়ে অনেকবার ভেবেছি। 'শত বর্ষের জীর্ণ শরীর',আমার যা মনে হচ্ছে এখানে কোনও বৃদ্ধ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে।"
"হুম। কিন্তু আস্ত বেনারসে তো এমন কত বৃদ্ধ আছে। কার কার কাছে গিয়ে খুঁজব?"
"বৃদ্ধ অনেক আছে, কিন্তু 'শত বর্ষ', মানে একশো বছর পেরিয়ে গেছে এমন লোকের সংখ্যা হাতে গোনাই হবে।"
ততক্ষণে রিকশা এসে গঙ্গার ঘাটের সামনে দাঁড়িয়েছে। নেমে পড়লেন দুজনেই।
"লিজিয়ে ভাইয়া, আপকা পয়সা।... আচ্ছা ভাইয়া, ইধার একসো সাল সে উপর উমার-ওয়ালে কিতনে লোগ হ্যায়?"
একটু মাথা নেড়ে রিকশাওয়ালা বলল, "সবকা তো মুঝে পতা নেহি বাবু, পার উধার মণিকর্ণিকা ঘাটকে পাস এক বাঙালি বাবা রাহতে হ্যায়। একসো তেরা সাল উমার হ্যায় উনকা।"
"ঘাট মে মিল জায়েঙ্গে অভি?"
"হা বাবু। ওহি রহতে হ্যায় উও বাবা।"
"ঠিক হ্যায় ভাইয়া। ধন্যবাদ।"
রিকশাওয়ালা চলে গেলে দু’জনে এগোতে লাগলেন মাণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে। "একজনের সন্ধান তো পাওয়া গেল। এঁকে দিয়েই শুরু করা যাক।" ডাঃ বসু বললেন।
নদীর বাঁধানো পাড় বরাবর সোজা অল্প হাঁটা দূরত্ব। বেশিক্ষণ লাগল না তাঁদের পৌঁছতে। রিকশাওয়ালা ভুল বলেনি। ঘাটের সিঁড়িতেই বসে আছেন জরাজীর্ণ এক বৃদ্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল ইনিই সেই 'বাঙালি বাবা'। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বয়সের গাছ-পাথর নেই। মাথার চুল সব কবেকার ঝরে গেছে, মুখভর্তি ধবধবে সাদা দাড়ি। গায়ে কাপড় বলতে হাঁটু অবধি জড়ানো ময়লা একখানা ধুতি। দুই হাঁটুর মাঝে মাথা ঝুলিয়ে সিঁড়ির একপাশে বসে ছিলেন বৃদ্ধ। ডাঃ বসু এগিয়ে গিয়ে বসলেন তাঁর সামনে। পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন প্রফেসর দত্ত।
"বাবাজি প্রণাম।" ডাঃ বসুর কথায় আস্তে আস্তে মাথা তুলে চাইলেন বৃদ্ধ। সারা মুখ জুড়ে বলিরেখা, চোখদুটো ঘোলাটে, সাদা ভুরু এসে নেমেছে চোখের ওপর। কাঁপা কাঁপা গলায় বৃদ্ধ বললেন, "বাংলায় বলতে পারো, জন্মসূত্রে আমিও বাঙালি।"
বেশ অবাক হলেন ডাঃ বসু। "আপনি কীভাবে বুঝলেন যে আমি বাঙালি?"
"আমার বয়স একশো পেরিয়ে গেছে, অভিজ্ঞতাও। মুখ দেখে অনেককিছুই বুঝতে পারি।"
"বাবাজি, আমরা একটা বিপদে পড়েই বেনারস এসেছি। আমরা এমন এক পুরোনো বইয়ের পাতা খুঁজছি যা ভারতীয় কোনো ভাষায় লেখা নয়। মানে যাতে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা আছে শুধু। এমন কিছু কি আছে আপনার কাছে? বা এমন কোনও ব্যক্তি যার কাছে থাকতে পারে বলে আপনি জানেন? যদি একটু সাহায্য করেন, বড্ড উপকার হয়।"
ঘোলাটে চোখদুটো ছোটো করে একবার ডাঃ বসুর দিকে তাকালেন বৃদ্ধ। "কী এমন বিপদ যেটা অজানা ভাষায় লেখা কিছু বইয়ের পাতায় সমাধান হবে?"
"সে অনেক কথা বাবাজি। সবকিছু হয়তো আমরাও বুঝিয়ে বলতে পারব না। কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়ের জীবন বিপন্ন হয়ে গেছে ওই বইয়ের জন্য। বিশ্বাস করুন, আমাদের এখানে কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।" বেশ কাতর শোনালো ডাঃ বসুর গলাটা।
বৃদ্ধ আরেকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন দু’জনের দিকে। তারপর আস্তে আস্তে পেছনে রাখা ছেঁড়া-খোঁড়া একটা ঝোলার ভেতর থেকে বেশ পুরোনো সুতোয় বাঁধা তুলোট কাগজের একটা পুঁথি বের করে ডাঃ বসুর দিকে এগিয়ে দিলেন। "তোমাদের দেখে খারাপ লোক বলে মনে হয়নি আমার, তাই বিশ্বাস করলাম। আজ প্রায় একশো বছর ধরে এই জিনিস আমার কাছে আছে। কাউকে দেইনি।"
প্রথমে ঝোলা থেকে পুঁথিটা বার করতে দেখে বেশ খুশি হলেও হাতে নিয়ে একটু দমে গেলেন ডাঃ বসু। "বাবাজি, এটা তো সংস্কৃত বই। 'রুদ্রপুরাণ'।"
"বাইরে থেকে দেখে কি সব উত্তর পাওয়া যায়? ভেতরে যেতে হয়।" কেঁপে কেঁপে ওঠা গলায় বৃদ্ধ বললেন। ততক্ষণে প্রফেসর দত্তও ঝুঁকে পড়েছেন বইটা দেখার জন্য। ডাঃ বসু খুব সাবধানে বইটা খুললেন। পাতাগুলো হলুদের যুগ পেরিয়ে খয়েরি হয়ে গেছে। চার-পাঁচটা পাতা উলটেই চমকে উঠলেন ডাঃ বসু; মায়া হায়রোগ্লিফিকে লেখা প্রায় পনেরোখানা পাতা। আনন্দে আর উত্তেজনায় হাত দুটো কাঁপছিল ডাঃ বসুর। প্রফেসর দত্ত বললেন, "এই তবে সেই হেঁয়ালির অর্থ। পাতার ফাঁকে পাতা !"
ডাঃ বসু সেই বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললেন, "অসংখ্য ধন্যবাদ বাবাজি। কিন্তু এগুলো আপনি কোথায় পেলেন?"
বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন, "এগুলো কী আমি জানি না। আমার প্রপিতামহ ছিলেন চন্দননগরের বড়ো ব্যবসায়ী। তিনি এগুলো এক স্প্যানিশ নাবিকের কাছ থেকে জোগাড় করেন। তাঁর কাছ থেকে পান আমার ঠাকুরদা আর পরে আমি। বারো বছর বয়সে যখন সন্ন্যাস নিয়ে এখানে চলে আসি তখন সঙ্গে করে শুধু এটাই নিয়ে এসেছিলাম।" একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বৃদ্ধ আবার বললেন, "আমার অনেক বয়স হয়েছে। শরীর আর বেশিদিন টিকবে না। তোমরা নিয়ে যাও এই পুঁথি। আমার সঙ্গে চিতায় পুড়ে নষ্ট হওয়ার চেয়ে যদি কারও কোনও উপকারে লাগে সে বরং অনেক ভালো।"
কৃতজ্ঞতায় দু'চোখ ভরে এল ডাঃ বসুর। বৃদ্ধকে প্রণাম করে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন তাঁরা। সঙ্গে সেই  গ্রলিয়ের কোডেক্সের হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলো। বিনির জীবন আটকে আছে যার পাতায় পাতায় আঁকা অজানা সংকেতে।


ডাঃ বসুর ফ্ল্যাট। সোফায় বসে আছেন প্রফেসর দত্ত। পাশে একটা বেশ সুন্দর রঙিন কাগজে মোড়া গিফট।
দু’কাপ কফি হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ডাঃ বসু। "নে। কফিটা খেয়েই বেরোনো যাক।" একটা এগিয়ে দিলেন প্রফেসর দত্তের দিকে।
আজ বিনির জন্মদিন। সেখানেই যাওয়া হবে একটু পরে। বেশ সুন্দর একটা টেডি বিয়ার কিনে এনেছেন প্রফেসর দত্ত।
সেই ঘটনার পর প্রায় পাঁচ মাস কেটে গেছে। বিনি এখন পুরোপুরি সুস্থ, হাতের চিহ্নগুলোও মিলিয়ে গেছে একটু একটু করে। সেই স্বপ্নটাও আর দেখে না বিনি। গ্রলিয়ের কোডেক্স এখন সম্পূর্ণ; স্বর্গের দুধে ভরে গেছে চতুর্থ কলস! বেনারস থেকেই ওই পাতাগুলো তপুর কাছে পাঠিয়ে দেন ডাঃ বসু। তাঁর সাহায্যেই সেগুলো যথাস্থানে পৌঁছনো সম্ভব হয়, জুড়ে দেওয়া হয় গ্রলিয়ের কোডেক্সের বাকি অংশের সঙ্গে।
ধোঁয়া ওঠা কফিতে হালকা চুমুক দিয়ে প্রফেসর দত্ত বললেন, "এখনও ভাবলেই কেমন যেন গায়ে কাঁটা দেয়। পাঁচটা মাস পেরিয়ে গেল। বিনি এখন একেবারে সুস্থ, সাত পেরিয়ে আজ আটে পা দিচ্ছে। আমাদের জীবনের দারুণ একটা কেস ছিল, কী বলিস?"
ছোট্ট একটা হাসি খেলে গেল ডাঃ বসুর ঠোঁটে। "বিনি নিজের সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছে, এটাই সবচেয়ে আনন্দের। কিন্তু কেস? সেটা তো এখনও অধরাই রইল। একটা কেনরও কি উত্তর আছে তোর কাছে?"
বুক ঠেলে বেরিয়ে আসা একটা দীর্ঘনিশ্বাস যেন বুকে নিয়েই চুপ করে রইলেন প্রফেসর দত্ত। ডাঃ বসু আবার বলতে লাগলেন, "হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটা সভ্যতা, হাজার হাজার মাইল দূরের কিছু স্থাপত্য কেন ভেসে ওঠে একটা সাত বছরের বাচ্চার স্বপ্নে? কোন শক্তি হাজার হাজার বছর পুরোনো মায়া ভাষায় কথা বলে ওঠে একটা বাঙালি মেয়ের মুখ দিয়ে? কীভাবে একটা বাচ্চা মেয়ের গলা দিয়ে ভেসে আসে ওই পুরুষকণ্ঠ? কোন অলৌকিক শক্তি বিনির হাতে এঁকে দিত মায়া ভাষার চিত্রলিপি? কীভাবে সেই মায়া-সংকেত আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল বেনারসের সেই বাঙালি বাবার কাছে? আর কেনই বা প্রায় দেড়শো কোটি লোকের ভারতে শুধু বিনিকেই বেছে নিল সেই অলৌকিক শক্তি? আছে কোনও উত্তর আমাদের কাছে? নেই! আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা, তোর রিসার্চ সব যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে প্রকৃতির এই অলৌকিক খেলার সামনে। শুধুই একগাদা প্রশ্নচিহ্ন, কিন্তু কোনও উত্তর নেই !"
কাপটা নামিয়ে রাখলেন প্রফেসর দত্ত। নিশ্বাসটা এবার আর বাঁধ মানল না। "ঠিকই বলেছিস সমু। কত অজানা অলৌকিক রহস্যের অন্ধকার জগত আজও ঘিরে আছে আমাদের চারপাশে। যার কিছুই আমরা জানি না। সেই অচেনা জগতের আলো-আঁধারির পথে আমরা আজও বড়ো অসহায় !"
_____

14 comments:

  1. রহস্যময় গল্পটি বড় টানটান উত্তেজনায় শেষ হল

    ReplyDelete
  2. Uff asadharon
    Anekdinpor erakom golpo porlm

    ReplyDelete
  3. Uff asadharon
    Anekdinpor erakom golpo porlm

    ReplyDelete
  4. Science ended in philosophy....ashadharon bondhu....darun laglo

    ReplyDelete
  5. Bhai....chorom likhli note. Gaye kata diye gelo ekrokom

    ReplyDelete
  6. দুর্ধর্ষ লিখেছো ভাই! দারুণ!

    ReplyDelete
  7. Khub sundar golpo likechis bhi,ek kathay blbo romoharshak

    ReplyDelete
  8. Ami jantam maya sabhbhotar lokera likhte janto na . Ora kipu babohar korto. Kipu hochche rangin sutote git deoa.

    ReplyDelete
  9. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
    Replies
    1. মায়া সভ্যতা সংক্রান্ত তথ্যগুলি আমি উইকিপিডিয়া পেজ থেকে নিয়েছি। গল্পে যেই চারটে বইয়ের উল্লেখ আছে সেগুলোও সেখান থেকেই নেওয়া।
      আসলে মায়া সভ্যতা অনেক পুরোনো এবং ষোড়শ শতকের কাছাকাছি স্প্যানিশ আক্রমণের আগ অব্দি টিকে ছিল। প্রথম দিকের মায়া সভ্যতায় হত লেখার প্রথা ছিল না, কিন্তু পরবর্তী যুগে তারা হাইরোগ্লিফিকে লিখতে শুরু করেছিল।
      আপনি চাইলে একবার মায়া সভ্যতার উইকি পেজটা দেখে নিতে পারেন, তাতে আরও অনেক বিস্তারিতভাবে তথ্যগুলো পেয়ে যাবেন।

      Delete
  10. সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।😊😊😊😊

    ReplyDelete
  11. ভালো যোগসূত্র দেওয়া লেখা, ভালো লাগলো, এই গল্পটা পড়ে দেখতে পারেন ইচ্ছে হলে, Mayan civilization নিয়ে আগের বছর এর https://joydhakweb.com/পুজোর-উপন্যাসকুকুলকানের/

    ReplyDelete