বিজ্ঞান:: শীতঘুমের ঘোরে - সৌম্যকান্তি জানা

শীতঘুমের ঘোরে
সৌম্যকান্তি জানা

“ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি যেয়ো
বাটা ভরে পান দেবো গাল ভরে খেয়ো”
এমন কোনও মা এই বাংলায় মনে হয় নেই যিনি তাঁর শিশুকে এই ঘুমপাড়ানি ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়াননি। আসলে ছোটো-বড়ো সবার জীবনে ঘুমের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বাঁচার জন্য জল, খাবার আর বাতাসকে অবশ্য প্রয়োজনীয় তিনটি শর্ত বলে সবাই মানলেও চতুর্থ শর্ত হিসেবে সমান গুরুত্বপূর্ণ আর একটি শর্ত হল ঘুম। সুস্থভাবে জীবনধারণের জন্য যে ঘুমের প্রয়োজন তা মানুষ তো বটেই, মনুষ্যেতর প্রাণীমাত্রেই জানে। ঘুম মানেই শরীরের বিশ্রাম। আরও ভালো করে বললে, মস্তিষ্কের বিশ্রাম। সমস্ত প্রাণীর শরীরের সমস্ত অঙ্গকে সারাদিন কত কাজ করতে হয়। আর সব কাজ পরিচালনা করার মুখ্য দায়িত্ব পালন করে মস্তিষ্ক বা ব্রেন। তাই মানুষের মস্তিষ্ককে সারা দিনে অন্ততঃ ছয় থেকে আট ঘন্টা বিশ্রাম নিতেই হয়। অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ের হেরফের হতে পারেকিন্তু ঘুম মাস্ট। সারাদিন মস্তিষ্ক কাজ করার সময় বেশ কিছু ক্ষতিকর বর্জ্যপদার্থ উৎপন্ন করে। ঘুমের সময় সেইসব বর্জ্য পদার্থগুলো মস্তিষ্ক থেকে অপসারিত হয়। ফলে ঘুম ভাঙার পর মস্তিষ্ক আবার তরতাজা অবস্থায় থাকে। ঘুম যদি নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে কম হয় তবে নানা বিপত্তি। সারাদিন মাথা ভার হয়ে থাকা, কাজে মনোযোগ না আসা, থেকে থেকে ঝিমুনি আসা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া – এসব উপসর্গের সঙ্গে আমরা কম-বেশি পরিচিত। আর দীর্ঘদিন ঘুমের এমন সমস্যা হলে তো আরও বিপদ – উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ বা স্থূলত্ব হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
এতক্ষণ যে ঘুমের কথা বললাম সেই ঘুমের একটা বৈশিষ্ট্য হল ঘুমের মধ্যে শরীরের অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, বৃক্ক, পরিপাকতন্ত্র, নার্ভ ইত্যাদি পূর্ণ সক্রিয় থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে এমন কিছু ঘুম আছে যার স্থায়ীত্ব টানা কয়েকদিন থেকে কয়েকমাস পর্যন্ত হতে পারে, আর সেই ঘুমের সময় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর সক্রিয়তা খুব কমে যায়। এমন ঘুম দু’ধরণের ঋতুতে দেখা যায়। প্রচন্ড ঠান্ডার সময় এই ধরণের ঘুমকে বলে শীতঘুম বা হাইবারনেশন, আর প্রচন্ড গরমের সময় গ্রীষ্মঘুম বা এস্টিভেশন। তবে শীতকালে শীতঘুমের রকমফের আছে। যদি কিছু সময় পর পর ঘুম ভেঙে যায় ও সেই সময় খাওয়া-দাওয়া ও মলমূত্র ত্যাগের মতো দরকারি কাজ খুব কম সময়ের মধ্যে সেরে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়া যায় তবে তা প্রকৃত শীতঘুম নয় – একে পরিভাষায় বলে টোর্পর (Torpor), বাংলায় বলতে পারি অক্রিয়তা।
শীত এলেই বেশিরভাগ মানুষের খুব মজা! শীতকাল মানেই তোমাদের কাছে পিকনিক, জয়নগরের মোয়া আর পিঠে-পুলি। শীতকালে লেপের ওম নিতে পছন্দ করে না এমন মানুষ একটাও পাবে না। ঘাম বেরোয় না বলে শারীরিক কষ্ট হয় কম। তাই কাজের এনার্জিও থাকে অপেক্ষাকৃত বেশি। এই সময় বাজার নানা সবজির সম্ভারে সেজে ওঠে। কী নেই! ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলো, পালং, বিট, গাজর, শিম, বরবটি, বিন, টমাটো, মটরশুঁটি, পেঁয়াজকলি আরও কত কী! বাহারি ফুলে সেজে ওঠে গৃহস্থের একচিলতে বাগানও। তাই বেশিরভাগ মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ঋতু শীত। কিন্তু অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে শীত হল সমস্যার ঋতু। পরিবেশের উষ্ণতা অনেক কমে গেলে অনেক প্রাণীর জীবনধারণ করা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। কারণ এই সময় খাবার-দাবারের খুব অভাব হয়। খাবার থেকে পাওয়া যায় বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় শক্তি। তাই খাবার না পেলে ওরা বাঁচবে কী করে? যে সব জায়গায় বছরের বেশিরভাগ সময় খুব ঠান্ডা থাকে সেখানের প্রাণীদের ক্ষেত্রে জীবনধারণ করা আরও কষ্টের। তা সে যতই কষ্টকর হোক বাঁচার চেষ্টা করে সমস্ত প্রাণী। কীভাবে? যখন আবহাওয়া অনুকূল থাকে তখন খাবার-দাবারের প্রাচুর্যও থাকে। তখন ওরা বেশি বেশি করে খাবার খেয়ে নেয়। ফলে শরীরে বাড়তি চর্বি জমে যায়। এই জমানো চর্বি শীতকালে ওদের বাঁচার শক্তি জোগায়। আবার যে সব অঙ্গের কার্যকারিতার জন্য প্রাণধারণ সম্ভব হয় সেগুলোর সক্রিয়তাও ওরা কমিয়ে দেয় যাতে শক্তির খরচ কমে যায়। ফলে শীতের প্রতিকূলতাকে ওরা অতিক্রম করতে পারে স্বচ্ছন্দই। আজ তোমাদের এমনই দশটি বিস্ময়কর প্রাণীর সঙ্গে পরিচয় করাব

v সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালি (Arctic Ground Squirrel Spermophilusparryii)


যদিও নামের শুরুতে সুমেরু রয়েছে তবে এদের বাস মূলতঃ উত্তর কানাডা, উত্তর ব্রিটিশ কলম্বিয়া, আলাস্কা ও সাইবেরিয়া অঞ্চলে। যেহেতু মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে এরা বাসা বানায় তাই বালিযুক্ত অঞ্চলই এদের পছন্দ। গ্রীষ্মকালে এরা প্রচুর পরিমাণে ঘাস-পাতা, ফল, বীজ খেয়ে শরীরে চর্বির পরিমাণ অনেকটাই বাড়িয়ে নেয়। তারপর পুরুষ কাঠবিড়ালি মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে খাবার জমা করতে থাকে। শীত শুরু হলে ওরা আশ্রয় নেয় বাসার ভেতর। মাটির নিচে এদের গর্ত হয় ভারি অদ্ভুত! শোবার ঘর, খাবার মজুত রাখার ঘর, এমনকি মল-মূত্র ত্যাগ করার ঘরও হয় আলাদা। কাঠবিড়ালিরও টয়লেট, ভাবা যায়! এদের স্ত্রী কাঠবিড়ালিরা আগস্ট মাসের শুরুর দিক থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত আর পুরুষরা সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিক থেকে এপ্রিল মাসের প্রথমের দিক পর্যন্ত ওই গর্তের ভেতর শীতঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ভেবে দেখো, তিন-চার মাস খেয়ে আট-ন’মাস ঘুমিয়ে কাটায়! এই সময় এদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (৩৭ সেন্টিগ্রেড) কমে হয়ে যায় প্রায় মাইনাস তিন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আর হৃৎস্পন্দন কমে হয়ে যায় মিনিটে এক বার! তবে সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালি কিন্তু একটানা শীতঘুমে কাটায় না। দু’তিন সপ্তাহ পরপর ওরা একবার করে জেগে ওঠে ১২ থেকে ২৪ ঘন্টার জন্য। এই সময় ওরা কিছু খেয়ে নেয় ও মল-মূত্র ত্যাগ করে। তারপর আবার শীতঘুমে ডুব দেয়। এভাবেই কেটে যায় আট-ন’মাস। একটানা না ঘুমিয়ে এরকম পর্যায়ক্রমিক নিদ্রা ও জাগরণকে হাইবারনেশন না বলে বলে টোর্পর (Torpor) বা অক্রিয়তা। সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির এই অক্রিয়তার জন্য মস্তিষ্কে একপ্রকার রাসায়নিক দায়ী। এর নাম অ্যাডিনোসিন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলকভাবে অক্রিয় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির রক্ত নিয়ে সক্রিয় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির দেহে প্রবেশ করিয়ে দেখেছেন সক্রিয় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালিও শীতঘুমে বা অক্রিয়তায় ডুবে যায়।


v কেঠো ব্যাঙ (Wood Frog Rana sylvatica)


মনে করো তুমি শীতকালে আলাস্কায় বেড়াতে গিয়ে কোনও ডোবার ধারে শুকনো পাতার গাদার মধ্যে একটা ব্যাঙ দেখতে পেলে। তার গায়ে বরফের কুচি জমে গিয়েছে। ভাবতে পার, ব্যাঙটা কতদিন মরে পড়ে আছে কে জানে! হাতে তুলে দেখতেও পার। প্রবল ঠান্ডায় এক্কেবারে জমে কাঠ। কিন্তু তাজ্জব হয়ে যাবে, যদি দেখো ওই ‘মরা’ ব্যাঙটাই কিছুদিন পর থপ থপ করে লাফাতে লাফাতে ঝাঁপ দিল ডোবার জলে! ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার বলে ভাবতেই পার। কিন্তু, এমন ব্যাঙ কিন্তু সত্যিই রয়েছে – উড ফ্রগ অর্থাৎ কেঠো ব্যাঙ। একটা পূর্ণাঙ্গ কেঠো ব্যাঙ আমাদের চেনা কুনো ব্যাঙের সাইজের হয়। শীতকালে এদের হৃৎস্পন্দন পুরোপুরি থেমে যায়! থেমে যায় রক্ত প্রবাহ ও শ্বাস-প্রশ্বাস। শরীরের প্রায় তিনভাগ রক্ত জমে বরফ হয়ে যায়। রক্তের তাপমাত্রা মাইনাস এক থেকে তিন ডিগ্রিতে নেমে আসে। আর এভাবে ওরা সাতমাস কাটিয়ে দেয়। এই সময় কোনও কেঠো ব্যাঙের পা টেনে যদি সোজা করতে চাও তো ওর পা ভেঙে যাবে! কিন্তু ব্যথা পেয়ে সাড়া দেবে না। এই অবস্থাকে শীতঘুম না বলে জীবন্মৃত অবস্থা বললে বেশি মানানসই হবে। শীত কেটে গিয়ে বসন্তকাল এলে ওরা ওই জীবন্মৃত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর সোজা লাফ দেয় জলে। কারণ হাতে সময় মাত্র পাঁচ মাস। এর মধ্যেই তাদের প্রজনন ঘটাতে হবে এবং তার ছানা-পোনাদের বেড়ে ওঠার সময় দিতে হবে।
কেঠো ব্যাঙরা কীভাবে সাত মাস ধরে এভাবে জীবন্মৃত অবস্থায় থাকতে পারে তার সব ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। তবে এটুকু জানা গেছে যে শীতঘুমের সময় ওদের কোষে গ্লুকোজের মাত্রা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। এর ফলে কোষের ভেতরে জলের পরিমাণ কমে না। আর ওই গ্লুকোজের জারণক্রিয়া থেকে উৎপন্ন ন্যূনতম শক্তি কেঠো ব্যাঙকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। বসন্ত ও গ্রীষ্মের পাঁচ মাসে ওরা প্রচুর পরিমাণে খাওয়া-দাওয়া করে লিভারে গ্লাইকোজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে নেয়। ওই গ্লাইকোজেন থেকে তৈরি হওয়া গ্লুকোজ কোষের মধ্যে এসে জমা হয়। দেখা গেছে ওরা মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও দিব্যি শীতঘুমে কাটিয়ে দিতে পারে। রবিঠাকুরের লেখা ‘জীবিত মৃত’ গল্পে কাদম্বিনী মরে প্রমাণ করেছিল যে সে আগে মরেনি। কেঠো ব্যাঙও ছয় থেকে আট বছর মরে গিয়ে প্রমাণ করে যে আলাস্কার প্রবল শীতেও সে মরেনি।


v হ্যামস্টার (Hamster –Mesocricetus auratus)


প্রাণীজগতের আর এক ‘কাদম্বিনী’-র কথা যদি বলতে হয় তাহলে কেঠো ব্যাঙের কাছাকাছিই থাকবে সিরিয়ার হ্যামস্টার বা গোল্ডেন হ্যামস্টার। এরা আসলে ধেড়ে ইঁদুরজাতীয় (Rodent) প্রাণী। অনেক দেশেই আজকাল হ্যামস্টার পোষ্য প্রাণী। তবে সিরিয়ার বন্য হ্যামস্টার নিয়েই এই আলোচনা। ওরা গর্তবাসী ও নিশাচর। ওদের এলাকায় গড় উষ্ণতা ১৮ সেন্টিগ্রেড। মে থেকে অক্টোবর মাস জুড়ে সিরিয়ার আবহাওয়া খুব গরম থাকে। জানুয়ারি মাসে তাপমাত্রা ৪–৬ সেন্টিগ্রেডে নেমে এলে হ্যামস্টারেরা পাড়ি জমায় ঘুমের রাজ্যে। ওবশ্য তার আগে ওরা গর্তের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার মজুত করে নেয়। যদি কোনও কারণে খাবার মজুত করতে কিছু দেরি হয় তবে শীতঘুমে যেতেও দেরি হয়। তবে এদের কিন্তু প্রকৃত শীতঘুম হয় না। এদেরও অক্রিয়তা (Torpor) দেখা যায় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির মতো। আট থেকে দশ দিন ওরা একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকে। তারপর জেগে উঠে কিছু খেয়ে নেয়। আবার পাড়ি দেয় ঘুমের রাজ্যে। অক্রিয় থাকার সময় ওরা এক্কেবারে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। এ সময় পা গুলো বেশ শক্ত ও টানটান হয়ে যায়। অক্রিয়তা চলাকালীন ওদের দেহের বিপাকক্রিয়ার হার মাত্র পাঁচ শতাংশে নেমে আসে বলে দেহের তাপমাত্রা অনেকটা কমে যায়। এই সময় হৃৎস্পন্দন কমে মিনিটে চার হয়ে যায়, আর দু’মিনিটে মাত্র একবার শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। ফলে অক্রিয় হ্যামস্টারকে মৃত বলে ভুল করা স্বাভাবিক। এজন্য হ্যামস্টারকে নিয়ে লোকমুখে নানা ভুতুড়ে গল্প প্রচলিত আছে। মৃত ভেবে হ্যামস্টারকে মাটির তলায় পুঁতে দেওয়ার পর সেই হ্যামস্টারকে নাকি মাটি ফুঁড়ে উঠে এসে বাগানে ঘুরতে দেখা যায়! আসল রহস্যটা যে কী তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


v কাঁটাচুয়া (Hedgehog – Erinaceuseuropaeus, Ateierixalbiventris, Paraechinusmicropus)


প্রধাতঃ মরু অঞ্চলের এই প্রাণীটিকে দেখে অনেকেই মনে করতে পারে সজারুর কোনও এক জাতভাই। কাঁটাচুয়া নাম হয়েছে পিঠের ওপর সজারুর মতো কাঁটা রয়েছে বলে। আসলে এদের পেট বাদে সারা শরীরেই কাঁটা ভর্তি। তবে এ কাঁটার প্রকৃতি সজারুর মতো নয়। বিপদ বুঝলে কাঁটাচুয়া পুরোপুরি কেন্নোর মতো কুন্ডলী পাকিয়ে যায়, আর কাঁটাগুলো খাড়া হয়ে যায়। তখন দেখে মনে হবে ঠিক যেন একটা কাঁটার বল। নানা দেশে কাঁটাচুয়া দেখা যায়। লেজ বাদে ছ’সাত ইঞ্চি লম্বা স্তন্যপায়ী প্রাণীটার ইংরেজিতে নাম হেজহগ হওয়ার কারণ এদের ঝোপের মধ্যে বেশি দেখা যায়, আর মুখটা শূকরের মতো সূচালো। দিনের বেলা এরা গর্তে থাকে, আর সন্ধ হলে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে আসে। ভারতের কাঁটাচুয়ারা শীতঘুম দেয় কিনা জানা না গেলেও ইউরোপের কাঁটাচুয়ারা শীত এলে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এদের শীতঘুমের স্থায়ীত্ব আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। এদের শীতঘুম তাই কয়েক সপ্তাহ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। এই সময় ওদেরও দেহের তাপমাত্রা ২ সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত নেমে আসতে পারে এই সময় হৃৎস্পন্দনও স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পায়। তবে তাপমাত্রা এর নিচে নেমে এলে ওরা জেগে ওঠে। তখন হৃৎস্পন্দন হার আবার বেড়ে যায়, আর দেহও কিছুটা গরম হয়ে যায়। দেহের তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টিগ্রেডে পৌঁছোলে তারপর আবার কাঁটাচুয়া পাড়ি জমায় শীতঘুমে।


v পুওরউইল (Poorwill – Phalaenoptilusnuttallii)


পুওরউইল বাংলায় তো নয়ই, ভারতেও পাওয়া যায় না। সুতরাং ভারতীয় কোনও ভাষাতে এর স্থানীয় নাম নেই। পশ্চিম আফ্রিকা, উত্তর মেক্সিকো, ব্রিটিশ কলম্বিয়া আর দক্ষিণ-পূর্ব অ্যালবার্তায় এদের পাওয়া যায়। পাখিদের দুনিয়ায় একমাত্র পাখি হল এই পুওরউইল যাদের প্রকৃত শীতঘুম দেখা যায়। ছোটো পেঁচার মতো দেখতে এই পাখির প্রজাতি পেঁচার মতোই নিশাচর। এরা উড়ন্ত পোকামাকড় ধরে খায়, আর রাতে শিকার ধরার সুবিধার জন্য এদের পালক কালো, সাদা, ধূসর, বাদামী ছিটযুক্ত হয়। ছোট্টো-খাট্টো পাখিগুলোর চেহারাও ভারী অদ্ভুত। পা আর চঞ্চু খুব ছোটো, কিন্তু চোখ দুটো খুব বড়ো। লম্বায় হয় ৭-৮ ইঞ্চি, আর ওজনে মাত্র ৪২-৫৮ গ্রাম।
শীতপ্রধান অঞ্চলের অধিকাংশ পাখি প্রবল শীতের সময় অপেক্ষাকৃত উষ্ণ স্থানে পরিযান করে। কিন্তু এই পুওরউইল পরিযান করে না। বরং শীতকালটা কষ্ট করে শীতঘুমে কাটিয়ে দেয়। এদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৪১ সেলসিয়াস হলেও শীতঘুমের সময় তা ৪. থেকে ১৮.৩ সেলসিয়াসে নেমে আসে। শ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমে যায় প্রায় ৯০ শতাংশ। তখন বুকের কাছে বা নাকে হাত দিয়ে জীবিত না মৃত বোঝা মুশকিল। হৃৎস্পন্দনের স্বাভাবিক হার যেখানে মিনিটে ১৩০ সেখানে তা কমে হয়ে যায় মিনিটে মাত্র দশ। সাধারণতঃ ফাঁপা হয়ে যাওয়া কোনও গাছের গুঁড়ির ভেতর বা ঘাসের গাদার ভেতর এরা শীতঘুম দেয়। শীতঘুমে যাওয়ার আগে এরা প্রচুর পোকামাকড় খেয়ে শরীরে সঞ্চিত চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে নেয়। এলাকাভেদে শীতের প্রকৃতি অনুযায়ী পুওরউইলদের শীতঘুম এক সপ্তাহ থকে কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। পরিযান না করে যে পাখি কষ্টদায়ক শীতঘুম যাপন করে তাকে তো poor বা বেচারা বলাই যায়। আর প্রতিকূলতাকে জয় করতে গেলে সংকল্প বা প্রবল ইচ্ছাশক্তি, অর্থাৎ ইংরেজিতে will থাকা চাই। সুতরাং পুওরউইল নামটা বেশ সার্থক, তাই না?


v  কলাবাদুড় ও চামচিকা (Fruit bat and Insect bat – Megachiropterasp and Microchiroptera sp)


“আদুড়-বাদুড় চালতা-বাদুড় কলাবাদুড়ের বে/ টোপর মাথায় দে/ দেখতে যাবে কে?/ চামচিকিতে ঢোলক বাজায় খ্যাংরা কাঠি দে।” বাদুড়-চামচিকা নিশাচর প্রাণী হওয়ায় তাদের চোখে দেখা সবসময় সম্ভব না হলেও ছড়ার মধ্যে দিয়ে শৈশব থেকেই ওদের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটে যায়। কলাবাদুড় হল বড়ো বাদুড়, আর চামচিকা হল ছোটো বাদুড়। কলাবাদুড় খায় মূলতঃ ফল, আর চামচিকারা খায় পতঙ্গ। তবে শীতঘুমের ব্যাপারে কলাবাদুড়ের থেকে চামচিকারা বেশি পারদর্শী। চামচিকাদের অধিকাংশ প্রজাতি শীতকালে শীতঘুম দেয়। অবশ্য শীতের তীব্রতাভেদে কখনও তাদের গভীর শীতঘুম, আবার কখনও অক্রিয়তা (Torpor) দেখা যায়। কলাবাদুড়ের কয়েকটি মাত্র প্রজাতিই শীতঘুমে যায়। সাধারণতঃ বেশি উচ্চতাযুক্ত অঞ্চলের কলাবাদুড় বা চামচিকাদের মধ্যেই শীতঘুম হয়, কারণ বেশি শীতপ্রধান এলাকায় শীতকালে পতঙ্গের সংখ্যা খুব কমে যায়। এই খাদ্যাভাবের জন্য কলাবাদুড় বা চামচিকাদের শীতঘুমে যেতেই হয়। সাধারণতঃ গাছের কোটরে, গুহা, পরিত্যক্ত খনি, পরিত্যক্ত কুয়ো বা চিলেকোঠায় এদের প্রজাতিভেদে এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে শীতঘুম দিতে দেখা যায়। আবার শীতের তীব্রতার উপর নির্ভর করে শীতঘুমের স্থায়ীত্ব কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে। দলবদ্ধ শীতঘুমের সময় অসংখ্য চামচিকাকে এক স্থানে জট পাকানো অবস্থায় দেখা যায়।
শীতঘুমে অভ্যস্ত অন্যান্য প্রাণীদের মতো কলাবাদুড় বা চামচিকারা শীতঘুমের আগে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করে না। ফলে খুব বেশি চর্বিও দেহে সঞ্চিত হয় না। আবার এরা খাবার-দাবার সঞ্চয় করতেও পারে না। আর তাই অক্রিয় থাকার সময়, এমনকি শীতঘুমের মাঝেও কখনও কখনও জেগে উঠে সামান্য খাবারের সন্ধান করতে হয়। খাবার পেলে ভালো, নইলে কষ্ট করে হলেও এরা নিজেদের কোনওমতে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। মাত্র কয়েক গ্রাম চর্বি সঞ্চয় করে এরা তাই দিয়ে একটানা ছ’মাস পর্যন্ত শীতঘুমে কাটিয়ে দিতে পারে। তবে এই চর্বি হল বাদামি চর্বি বা ব্রাউন ফ্যাট। এই চর্বির বিশেষত্ব হল এটি খুব ধীরে ধীরে জারিত হয়। বাদুড় ও চামচিকার পিঠে এই চর্বি সঞ্চিত হয়। এরা উষ্ণ রক্তের প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও যখন শীতঘুমে থাকে তখন ওরা দেহের তাপমাত্রা প্রচন্ড কমিয়ে দেয়, থেকে ৬পর্যন্ত নেমে আসতে পারে তাশ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনের হারও বিস্ময়করভাবে কমে যায়ওদের স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন যেখানে মিনিটে ৩০০ থেকে ৪০০ বার, সেখানে তা কমে হয়ে যায় মিনিটে ১০ বার! আর একবার দম নেওয়ার পর এক ঘন্টার বেশি সময় দম না নিয়ে থাকতে পারে। ভাবা যায়! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওদের একপ্রকার হরমোন (Hibernation Specific Protein) উৎপন্ন হয় যা ওদের দেহে বিপাকের হার কমিয়ে দেয়। আর তার ফলেই ওদের কম দরকারী অঙ্গগুলো কাজ বন্ধ করে দেয়, আর ওরা ঘুমিয়ে পড়ে।
শীতঘুম বা অক্রিয়তা চলার সময় ওদের স্বাভাবিকভাবে মাঝে মাঝে জেগে উঠতে হয় মূত্রত্যাগ করা ও কিছু খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু শীতঘুম চলাকালীন যদি ওদের কোনও বিপদ আসে তবে ওদের পক্ষে নিজেকে রক্ষা করা বেশ মুশকিল, কারণ প্রতিক্রিয়া দিতে অনেকটা দেরি হয়। জেগে ওঠা মানেই বাড়তি শক্তিক্ষয়। আর তাই কিছু খাবার খাওয়া আবশ্যক। কিন্তু খাবার না পেলে? সত্যিই জীবনের ঝুঁকি থেকে যায়।


v লেডিবাগ (Ladybugs/ Ladybirds)


চামচিকাদের মতো জোটবেঁধে শীতঘুম জমায় লেডিবাগরা। এরা হল একরকমের কীট। পোকার নাম লেডি, সাথে আবার বাগ বা বার্ড দেখে ভ্রূ কুঁচকে ওঠা স্বাভাবিক। আসলে এরা কক্সিনেলিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত অপূর্ব সুন্দর দেখতে একপ্রকার কীট। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এদের নানা প্রজাতির দেখা মেলে। নামে ‘বাগ’ (Bug) থাকলেও এরা মোটেই ছারপোকা জাতীয় প্রাণী নয়, এরা হল বিটল (Beetle) জাতীয় কীট। বেশিরভাগ প্রজাতির রঙ লাল আর তার উপর হলুদ, কালো ছিট। প্রজাতিভেদে লম্বা হয় মাত্র ০.৮ থেকে ১৮ মিমি। মা মেরীকে বলা হয় Our Ladyতা থেকেই এসেছে লেডি। মা মেরীর গায়ে থাকে লাল রঙের সুন্দর গাউন। আর এই কীটের রঙও সাধারণত লাল। এসব থেকেই নাম হয়েছে লেডিবাগ বা লেডিবার্ড। আমেরিকায় লেডিবাগ নাম বেশি প্রচলিত। আর ব্রিটেনসহ পৃথিবীর সর্বত্র লেডিবার্ড নামের প্রচলন। কৃষিবিজ্ঞানীদের কাছে এই কীটের মূল্য অপরিসীম, কারণ ওরা ফসলের ক্ষতিকর অ্যাফিড ও স্কেল ইনসেক্ট খেয়ে চাষির খুব উপকার করে।
লেডিবার্ডদের ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ হতে সময় লাগে মাত্র একমাস। ফলে ওদের প্রায় এক বছরের আয়ুর বেশিরভাগ সময়টাই পরিণত অবস্থায় কাটে। শীতের সময় এরা বাকলের তলায়, পাতার নীচে, গাছের কোটরে, পাথরের খাঁজে, চিলেকোঠায় বা ছাদের নীচে একসঙ্গে জোট বেঁধে নিশ্চল হয়ে যায়। শীতঘুম দেওয়ার উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেলে ওরা ফেরোমন নামক একপ্রকার উদ্বায়ী হরমোন নিঃসরণ করে আরও লেডিবার্ডকে ওই স্থানে আসতে সংকেত পাঠায়। জোটবেঁধে শীতঘুম দেওয়ার ফলে ওরা বেশ কিছুটা তাপ সংরক্ষণ করতে পারে। ওরা শীতঘুমে যায় প্রধাণতঃ শীতকালে ওদের খাবারের অভাব হয় বলে। শীতঘুম চলাকালীন কোনওভাবে যদি পরিবেশের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেওয়া হয় তবে ওদের শীতঘুম কেটে যায়। তখন ওদের খাবারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যদি খাবার অর্থাৎ অ্যাফিড না পায় তবে খিদের জ্বালায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে দেখা গেছে।


v ভালুক (Bear – Ursussp)


ভালুকের কথা শুনলেই অলস প্রকৃতির, একটা নাদুস-নুদুস চেহারার ও হেলে-দুলে হেঁটে চলা প্রাণীর ছবি মনে ভেসে ওঠে। ভালুকের নাদুস-নুদুস চেহারার কারণ শরীরে চর্বির সঞ্চয়। আর তা দিয়েই ওরা প্রবল শীতের সময় শীতঘুম দেয়। অবশ্য প্রকৃত শীতঘুম (Hibernation) ওদের হয় না, ওদের অক্রিয়তা (Torpor) দেখা যায়। সব ভালুক নয়, ব্ল্যাক বিয়ার, ব্রাউন বিয়ার আর গ্রিজলি বিয়ারদের মধ্যে অক্রিয়তা দেখা যায়। তবে শীতের হাত থেকে বাঁচতে এরা মোটেই অক্রিয় হয় না, খাদ্যাভাবের জন্যই অক্রিয় হয়। যদিও অক্রিয় থাকার সময় এদের বিপাকীয় হার খুব বেশি কমে না, তবুও যা চর্বি সঞ্চয় করে তা দিয়ে দিব্যি ১০০ দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে। ব্ল্যাক বিয়ারকে তো সাড়ে সাত মাস পর্যন্ত না খেয়ে অক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
অক্রিয় থাকার সময় এদের বেশ আকর্ষণীয় কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন দেহের তাপমাত্রা ৫ থেকে ৮ সেন্টিগ্রেড কমে যায় আর হার্টবিট মিনিটে ৫০ বার থেকে কমে ১০ পর্যন্ত নেমে যায়। অক্রিয় থাকার সময় আরও অনেক প্রাণীর মতো ভালুক জল পান করে না বা মল-মূত্র ত্যাগ করে না, আবার জমিয়েও রাখে না মল-মূত্র দেহে পুনঃশোষিত হয়ে যায়। এই সময় জমানো চর্বি থেকে বাঁচার রসদ সংগ্রহ করে বলে দেহের ওজন ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু অভিনব ঘটনা হল এরা মূত্রের প্রধান উপাদান ইউরিয়ার নাইট্রোজেন ব্যবহার করে প্রোটিন সংশ্লেষ করে যা দিয়ে পেশিকো ও বিভিন্ন অঙ্গের কলাকোষের ক্ষয় পূরণ করে। আরও একটা আশ্চর্য ঘটনা হল, যদি স্ত্রী ভালুকের চামড়ার নীচে পুরো শীতকাল কাটানোর মতো যথেষ্ট চর্বি সঞ্চিত না থাকে তবে নিষেকের ফলে উৎপন্ন ভ্রূণ জরায়ুতে রোপিত (Implantation) হয় না। ভ্রূণ জরায়ুতে পুনঃশোষিত হয়ে যায়। অর্থাৎ বাচ্চার জন্মই আর হয় না! তবে গর্ভবতী ভালুক অক্রিয় থাকাকালীন বাচ্চার জন্ম দিতেই পারে। আর অক্রিয় থাকা অবস্থাতেই তখন সন্তানকে লালন করে। শেষ একটা মজার কথা বলি। ভালুক অক্রিয় অবস্থা কাটিয়ে জেগে ওঠার পর ঝিমুনি কাটাতে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে দেয়। এই সময় ওরা চলাফেরা করে ঠিকই, কিন্তু সাবলীলতা থাকে না। দেখে মনে হতেই পারে মাতাল হয়ে টাল খেতে খেতে হাঁটছে।


v প্রেইরি কুকুর (Prairie Dog – Cynomyssp)


আমেরিকার প্রেইরি তৃণভূমির বাসিন্দা হল প্রেইরি কুকুর। তবে এর নামে একটা মজা আছে – এদের নামের সঙ্গে ‘ডগ’ কথাটা থাকলেও এরা মোটেই কুকুর নয়। এরা হল একপ্রকার ধেড়ে ইঁদুর (Rodent) এদের ডাক অনেকটা কুকুরের মতো বলেই এমন নাম। প্রজাতিভেদে এরা ১২ থেকে ১৬ ইঞ্চি লম্বা হয়। আর ওজন হয় ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি। কানাডা ও মেক্সিকোর তৃণভূমিতেও এদের পাওয়া যায়। তবে এদের বাসস্থান মূলতঃ তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়াযুক্ত স্থান। সাধারণতঃ ২০০০ থেকে ১০,০০০ মিটার উঁচু জায়গায় যেখানে গরমকালে তাপমাত্রা ৩৮ সেন্টিগ্রেডে এবং শীতে মাইনাস ৩৭ সেন্টিগ্রেডে পোঁছে যায়। শিলাবৃষ্টি, তুষারঝড়, বন্যা, খরা, দাবানল ইত্যদির মতো তীব্র প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এদের সহ্য করতে হয়। অবশ্য সব প্রেইরি কুকুরের প্রজাতির শীতঘুম বা অক্রিয়তা দেখা যায় না। সাদা লেজওয়ালা প্রেইরি কুকুরদের শীতঘুম হয়। আর কালো লেজওয়ালাদের হয় অক্রিয়তা। দিনের বেলা এরা ঘাস, ফল, মূল, মুকুল ইত্যদি খায় আর রাত্রিবেলা গর্তে থাকে। শীতঘুম হোক বা অক্রিয়তা, প্রেইরি কুকুর গর্তের মধ্যেই সম্পন্ন করে।


v স্কাঙ্ক (Skunk – Mephitis mephitis, Conepatusleuconotus, Spilogale putorius)


উত্তর আমেরিকা, উত্তর মেক্সিকো ও দক্ষিণ কানাডার এক অদ্ভুত স্তন্যপায়ী প্রাণী হল এই স্কাঙ্ক। বেশ লোমশ হয় এরা। বেশিরভাগ প্রজাতির গায়ে সাদা-কালো ডোরা থাকে। তবে সব প্রজাতির পিঠ বরাবর ডোরা থাকবেই। এরা নিশাচর। এদের ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তি অসামান্য। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি খুব কম। দশ ফুট দূরের জিনিসও ভালোভাবে দেখতে পায় না। আর এজন্যই অনেক স্কাঙ্ক রাতে গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। কিছুটা গন্ধগোকুল বা ভাম বেড়ালের মতো দেখতে এই প্রাণীরা গাছের কোটর, পরিত্যক্ত গর্ত ইত্যদির মধ্যে বাস করে।
স্কাঙ্কদের শীতঘুম না হয়ে অক্রিয়তা (Torpor) হয়। শীতের কবল থেকে বাঁচার জন্য নয়,ওই সময় খাবারের অভাবের জন্য ওরা অক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়। স্কাঙ্করা সর্বভূক হলেও বোলতা, মৌমাছি ইত্যাদি পতঙ্গ ওদের খুব প্রিয়। অক্রিয় থাকার জন্য ওরা আলাদা বাসার খোঁজ করে বা নিজেরাই গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। তারপর বাসার মুখ ঘাস-পাতা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। পুরুষ স্কাঙ্করা একা একা অক্রিয় থাকলেও স্ত্রী স্কাঙ্করা ১০-১২ জন মিলে জড়াজড়ি করে ঘুমোয়। এই সময় ওদের দেহের তাপমাত্রা প্রায় ২০ সেন্টিগ্রেড কমে যায়। স্কাঙ্করা ১০০ দিন পর্যন্ত অক্রিয় অবস্থায় থাকতে পারে।
শেষে স্কাঙ্কদের সম্বন্ধে একটা মজার তথ্য দিই। ওদের পায়ুর দু’পাশে দুটো ছোটো গ্রন্থি থাকে। ওই গ্রন্থিতে বিশেষ একপ্রকার উৎপন্ন হয়। বিপদ বুঝলে ওরা ওই গ্রন্থি থেকে পিচকিরির মতো রস নিঃসরণ করে। রস ১০ ফুট দূর পর্যন্ত ছিটকে যেতে পারে। এই রস তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত হয়। গায়ে পড়লে জ্বালা করতে পারে। চোখে পড়লে সাময়িক দৃষ্টিশক্তি হারানোও অসম্ভব নয়। এই জন্য ভয়ে নেকড়ে, শেয়াল ইত্যাদি খাদক প্রাণীরা স্কাঙ্কদের এড়িয়ে চলে। এই রসের দুর্গন্ধের তীব্রতা এতটাই বেশি যে আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে এর দুর্গন্ধ আমরা অনুভব করতে পারি। আর নাকে এর গন্ধ পৌঁছোলে বমিও হয়ে যেতে পারে।
শুধু এই কয়েকটি প্রাণী নয়, জীবজগতের আরও অসংখ্য প্রাণী শীতের তীব্রতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে কিংবা খাবারের স্বল্পতা বা অলভ্যতার মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে শীতঘুম বা অক্রিয়তার শরণাপন্ন হয়। উল্লেখিত প্রাণীগুলি ছাড়াও এই তালিকায় শামুক, মৌমাছি, কেঁচোর মতো অমেরুদন্ডী প্রাণী যেমন আছে তেমনই অসংখ্য উভচর ও সরীসৃপ প্রাণী আছে। সৌভাগ্যবশতঃ মানুষের শীতঘুম নেই। সবাই যদি কুম্ভকর্ণ হয়ে যেতাম সভ্যতার চাকা থমকে যেত। তাই না?
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a Comment