Showing posts with label সৌম্যকান্তি জানা. Show all posts
Showing posts with label সৌম্যকান্তি জানা. Show all posts

বিজ্ঞান:: দুধে মঙ্গল - সৌম্যকান্তি জানা


দুধে মঙ্গল
সৌম্যকান্তি জানা

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”। তার মানে, দুধ আর ভাত জুটলেই কেল্লা ফতে! আর কিছু না হলেও চলে। ওতে পেট তো ভরবেই, মিলবে অফুরা পুষ্টি। সুস্থ থাকতে হলে, বাচ্চাদের বুদ্ধির গোড়ায় সার দিতে হলে দুধের বিকল্প নেই। তাই তো “দুধ না খেলে হবে না ভালো ছেলে” – চন্দ্রবিন্দু বাংলা ব্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় গানটি কিছুদিন আগেও অনেকের মুখে মুখে ফিরত। যে বীরেন্দ্র শেহবাগ গ্লেন ম্যাকগ্রা, শোয়েব আখতার, শন পোলক, শেন বন্ডের গোলার মতো ডেলিভারিকে অনায়াস দক্ষতায় বাউন্ডারির ওপারে ফেলে দিতেন তার রহস্য কিন্তু রয়েছে ওই দুধেই। শেহবাগ নিজেই বহুবার বলেছেন যে তাঁর প্রিয়তম পানীয় হল দুধ। ১৯৮৩-র ক্রিকেট বিশ্বকাপ উঠেছিল যাঁর হাতে সেই অবিসংবাদী অলরাউন্ডার কপিলদেবেরও প্রিয় পানীয় ছিল দুধ। বিশ্বকাপ জেতার পর লর্ডসের ব্যালকনিতে শ্যাম্পেনের অভাবে ভারতীয়রা বোতল থেকে দুধ ছিটিয়েই আনন্দে মেতেছিলেন। কারণ ভারতীয় ড্রেসিংরুমে দুধ থাকত পর্যাপ্ত। শোনা যায় কপিলদেব নাকি প্রতিদিন ৫ লিটার দুধ খেতেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো থাকতে হলে দুধ যে সেরা পানীয় এ কথা দাদু-ঠাকুরমা-দিদিমাদের মুখ থেকেও সবাই শুনে এসেছি। তবে এ দুধ বলতে সাধারণতঃ গোরুর দুধকেই বোঝানো হয়েছে। আর হবে না-ই বা কেন, পৃথিবীর ৯০ শতাংশ মানুষ তো গোরুর দুধই পান করে। গোরুর দুধ যে মানুষের উপকারি পানীয় এ ধারণা কবে থেকে তৈরি হল? সত্যিই কি গোরুর দুধ পুষ্টিগুণে অনন্য? কী আছে এতে? গোরুর দুধের ভালো দিক কিছু আছে কি? খারাপ দিক? এসো, এসব নিয়ে একটু খোঁজ খবর করে দেখি।

ইতিহাসের পাতা থেকেঃ

প্রত্নতাত্বিকদের মতে, প্রায় ১০,০০০ বছর আগে নতুন প্রস্তর যুগের মানুষ কৃষিকাজ শুরু করার সময়েই গবাদি পশুপালন শুরু করে। যাযাবর মানুষ যখন কৃষিকাজ করতে শুরু করল তখন থেকে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করল। সঙ্গে শুরু করল পশুপালন। খ্রিস্টের জন্মের ৮০০০ বছর আগেকার মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় গবাদি পশুপালনের প্রমাণ মিললেও পানীয় হিসেবে দুধ গ্রহণ করার প্রমাণ মেলে না। তবে খ্রিস্টের জন্মের ৩০০০ বছর আগে দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ায় সুমেরিয় সভ্যতায় দুধের জন্য যে প্রথম গবাদি পশু হিসেবে গোরু, ভেড়া ও ছাগল পালন করা শুরু হয় তার প্রমাণ মেলে খননকার্যে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক মৃৎপাত্র পরীক্ষা করে তার ভেতর লিপিডের অবশেষ মেলায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় যে খ্রিস্টের জন্মের ৩০০০ বছর আগে দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ায় গবাদি পশুর দুধপান প্রচলিত ছিল। তবে প্রথম প্রথম ভেড়ার দুধই ছিল বেশি প্রচলিত। চতুর্দশ শতক থেকে গোরুর দুধ মানুষের কাছে বেশি আদরনীয় হয়ে ওঠে। দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়া থেকে দুধপ্রদায়ী গবাদি পশুপালনের রীতি ধীরে ধীরে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তারলাভ করে। খ্রিস্টের জন্মের ৪০০০ বছর আগে মধ্য আরব অঞ্চলে দুধের জন্য উটপালনও প্রচলিত হয়। প্রাচীন গ্রিক, রোমান, সুমেরিয়, মিশরীয়, মোঙ্গলীয় বা ভারতীয় সভ্যতায় দেবতার খাবার হিসেবে দুধকে স্থান দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুধকে শ্রেষ্ঠ খাদ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ৩০০০ বছর আগে মিশরীয়দের মধ্যে দুধপানের যে বহুল প্রচলন ছিল তার প্রমাণ উপাসনালয়গুলোর দেয়ালে উৎকীর্ণ অসংখ্য চিত্র। তখন গোরুকে মিশরীয়রা সত্যিই দেবতার আসনে স্থান দিয়েছিল। তারা গোরুকে হাথর নামে এক দেবীর মর্যাদা দেয় যে জমির উর্বরতা বজায় রাখে। স্বভাবতই যে প্রাণীকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে, তার দুধও মহার্ঘ্য। তাই দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য আর কেউ পাক না পাক রাজপরিবারের সদস্য, পুরোহিত ও ধনী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হত ভারতে গোরুকে গৃহিপালিত জীব হিসেবে পালনের ইতিহাস আর্যদের আগমনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ২০০০ বছর আগে আর্য সভ্যতায় গোরু ও গোজাত দ্রব্যের উপর মানুষ অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিল। সম্ভবতঃ এই কারণেই আর্যরাও গোরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কথিত আছে, সুমেরিয় রাজারা নিজেদের বলশালী ও অমর করে তোলার জন্য নিয়মিত দুধ পান করতেন। প্রাচীনকালে গ্রিকরা দুধকে ওষুধ হিসেবে জ্ঞান করত। এজন্য অলিম্পিক খেলোয়াড়েরা প্রাচীনকাল থেকে নিয়মিত দুধ পান করত নিজেদের সুস্থ রাখার জন্য। শোনা যায় রোম সম্রাট নেরো-এর স্ত্রী স্ট্যাশিলিয়া মেসালিনা এবং মিশরীয় সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা নিজের রূপ ধরে রাখতে নিয়মিত দুধ দিয়ে স্নান করতেন। স্ট্যাশিলিয়া নাকি এজন্য ৫০০ গাধাও পুষেছিলেন। আর ক্লিওপেট্রার স্নানপাত্র নাকি সবসময় গাধার দুধে পূর্ণ থাকত। জুলিয়াস সিজারের নাকি বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে সেল্ট ও জার্মানদের বড়সড় চেহারা হয়েছে গবাদি পশুর দুধ ও মাংস খেয়ে। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে অন্ততঃ পঞ্চাশ জায়গায় দুধ বা দুগ্ধজাত দ্রব্যের গুণগান করা হয়েছে। তবে বাইবেলে গোরু বা মোষের দুধ নয়, ভেড়া ও ছাগলের দুধের কথা উল্লেখ রয়েছে।
চতুর্দশ শতক থেকে মানুষ গোরুর দুধের প্রতি পক্ষপাত দেখাতে শুরু করলেও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতকে। এই সময় ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের প্রচলন না থাকায় পুকুর, নদী ইত্যাদির জল পান করে প্রচুর মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ত। আর তাই জলের থেকে মদে মানুষের আগ্রহ ছিল বেশি। দুধের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এই সময় মদের জনপ্রিয়তায় ভাগ বসায়।
তবে প্রাচীনকালে গোরুর দুধ খাওয়ানোর প্রচলন ছিল কেবল বাচ্চাদের। কারণ বড়োরা দুধ খেয়ে হজম করতে পারত না। দুধে থাকা ল্যাকটোজ নামক শর্করা হজম করার জন্য দরকার যে এনজাইম তার নাম ল্যাকটেজ। প্রাচীনকালে মানুষের পরিপাকনালীতে এই এনজাইম তৈরি হত না। তখন মানুষ দুধকে দইতে রূপান্তরিত করে খেততাতে দুধে থাকা ল্যাকটোজ কমে যেত। আর তাই প্রাচীনকালে দুধের থেকে দই খাওয়ার প্রচলন ছিল বেশি। কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে ইউরোপ অঞ্চলে হঠাৎই মিউটেশনের মাধ্যমে মানুষের ডি এন এ-তে ল্যাকটেজ এনজাইম উৎপাদক জিনের আবির্ভাব ঘটে। আর তার পর থেকে যে সব মানুষের মধ্যে এই জিনটি থাকে সে দুধের ল্যাকটোজ হজম করতে সক্ষম হয়। আর তারপর থেকেই সব বয়সের মানুষের মধ্যে দুধ খাওয়ার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ একটা ধারণা গড়ে ওঠে যে যে-সব মহিলা গোরুর দুধ দোহন করে তাদের গুটি বসন্ত হয় নাএই প্রচার ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনারকে কৌতূহলী করে তুলল। তিনি জানতেন গোরুর গোবসন্ত রোগ হয়। তাহলে কি ওই দোহনকারী মহিলারা গো-বসন্তে আক্রান্ত হন বলে গুটি বসন্তের আক্রমণ থেকে রেহাই পান? পরীক্ষা করার জন্য ১৭৯৬ সালে তিনি আট বছরের একটি ছেলে জেমস ফিপস-কে বেছে নিলেন। তিনি বাচ্চাটার শরীরে প্রথমে গোবসন্তের জীবাণু ইনজেক্ট করে দিলেন। এর কয়েকদিন পর তিনি বাচ্চাটার শরীরে গুটি বসন্তের জীবাণু ইনজেক্ট করে দেখলেন যে তার গুটি বসন্ত হল না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি নিজের সন্তানসহ মোট তিনটে বাচ্চার ওপর একই পরীক্ষা করলেন। ফল হল একই। এভাবে আবিষ্কৃত হল প্রথম টিকা – গুটিবসন্তের টিকা। 

স্তনগ্রন্থি ও দুধের সৃষ্টিঃ

দুধ হল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের স্তনগ্রন্থি থেকে ক্ষরিত এক প্রকার পুষ্টিগুণসম্পন্ন সাদা রঙের তরল যা সন্তানকে পুষ্টি জোগায় ও বিভিন্ন রোগজীবাণুর সংক্রমণ থেকে প্রতিরক্ষা দেয়। প্রাণীজগতের লক্ষ লক্ষ প্রাণীর লক্ষ লক্ষ বৈশিষ্ট্যের মধ্য থেকে অষ্টাদশ শতকে সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস স্তনগ্রন্থি আর দুধ – এই দুটি বৈশিষ্ট্যকে আলাদা করে চিহ্নিত করে একটা প্রাণীগোষ্ঠী তৈরি করলেন যাদের বলা হল স্তন্যপায়ী বা ম্যামালস (Mammals)এ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যা অন্য কোনও প্রাণীগোষ্ঠীর নেই। পোকামাকড় থেকে শুরু করে মাছ, উভচর, সরীসৃপ, পাখি – সব প্রাণীর ডিম ফুটে বাচ্চার জন্ম হয়। ডিমের মধ্যে থাকে কুসুম। ভ্রূণের পরিস্ফুরণের সময় ওই কুসুমই ভ্রূণকে পুষ্টি জোগায়। আর ডিমের বাইরে থাকে শক্ত একটা খোলক যা ডিমের ভেতরে থাকা ভ্রূণকে শুকিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু স্তন্যপায়ীদের ডিমে অর্থাৎ ডিম্বানুতে শক্ত খোলক ও কুসুম কোনওটাই থাকে না। তাছাড়া তারা ডিমও পাড়ে না। সুতরাং সদ্যোজাতর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধের জন্য বিবর্তনের পথ ধরে সৃষ্টি হয়েছে স্তনগ্রন্থি আর তা থেকে নিঃসৃত পদার্থ দুধ। বিজ্ঞানীদের মতে, ঘর্মগ্রন্থিই রূপান্তরিত হয়েছে স্তনগ্রন্থিতে, আর ঘর্মগ্রন্থির ক্ষরণ পরিবর্তিত হয়েছে দুধে।
তবে স্তন্যপায়ীদের সাম্রাজ্যে যে ‘দুধের কারখানা’ গড়ে উঠেছে তার ভিত্তি কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্তন্যপায়ীদের আবির্ভাবের অনেক আগে, এমনকি ডাইনোসোরদেরও আগে। প্রায় ৩১ কোটি বছর আগে স্তন্যপায়ীদের কিছু বৈশিষ্ট্যযুক্ত পূর্বপুরুষ সাইন্যাপসিডদের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওদের ডিমের খোলক ছিল বেশ পাতলা। ফলে ডিমের ভেতর থেকে জল সহজেই উবে যেত। এজন্য সাইন্যাপসিডরা তাদের ডিমকে সিক্ত রাখার জন্য ত্বকের গ্রন্থি থেকে একরকম জলীয় পদার্থ নিঃসরণ করত। ২১ কোটি বছর আগে ট্রায়াসিক যুগের শেষের দিকে আদিমতম স্তন্যপায়ীরা পাতলা খোলকযুক্ত ডিম পাড়ত, ডিমের ভেতর থেকে জলীয় অংশ উবে যেত, নিজের আকারের তুলনায় অনেক ছোটো ডিম পাড়ত, ভ্রুণের বিকাশ খুব দ্রুত হত, এবং শিশুর দাঁত অনেক দেরিতে উঠত। এই সময় তাদের ত্বকের গ্রন্থি থেকে যে তরল ক্ষরিত হত তাতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসসমৃদ্ধ প্রোটিন থাকত। এই তরল যেমন ডিমের খোলককে শক্ত করতে সাহায্য করত, তেমনই ভেতরে থাকা ভ্রূণকে পুষ্টি জোগাত ও শুকিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করত। তারপর জুরাসিক যুগে ১৭ কোটি বছর আগে আদিম স্তন্যপায়ীদের ডি এন এ থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করল কুসুমে থাকা প্রোটিন উৎপাদনের জন্য দায়ী ভাইটেলোজেনিন জিন। বর্তমানের সমস্ত সরীসৃপ ও পাখির ডি এন এ-তে তিনটে ভাইটেলোজেনিন জিন সক্রিয় থাকলেও ডিম পাড়া প্রাচীন স্তন্যপায়ী হংসচঞ্চুর ডি এন এ-তে কেবল একটি ভাইটেলোজেনিন জিন সক্রিয় আছে। আর সব স্তন্যপায়ীর ডি এন এ-তে তিনটে ভাইটেলোজেনিন জিনই নিষ্ক্রিয়। তাহলে ভ্রূণ বা সদ্যোজাতের পুষ্টির কী হবে? তখন ভ্রুণের বিকাশের জন্য জরায়ুর মধ্যে সৃষ্টি হল অমরা (Placenta), আর সদ্যোজাতের পুষ্টির জন্য স্তনগ্রন্থি থেকে সৃষ্টি হল দুধ, যেখানে রয়েছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন কেসিন।
এতসব কথার প্রমাণ কী? আসলে হংসচঞ্চুরা ছাড়া তো তেমন কোনও জীবন্ত প্রমাণ আজ আর টিকে নেই। সরীসৃপ থেকে স্তন্যপায়ীর বিবর্তনের সন্ধিক্ষণের প্রায় সব প্রাণীই বিলুপ্ত। তবে কিছু কিছু পাখি (যেমন পায়রা, ঘুঘু, ফ্ল্যামিঙ্গো ও এম্পারার পেঙ্গুইন) তার সন্তানকে গলার ভেতরে থাকা গ্রন্থি থেকে একপ্রকার গাঢ় পুষ্টিকর তরল ক্ষরণ করে খাওয়ায়। আবার এক জাতের আরশোলা (Diploptera punctata) তার ভ্রূণের পুষ্টির জন্য দুধের মতো প্রোটিন সমৃদ্ধ একপ্রকার তরল ক্ষরণ করে। এ থেকে নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে যে দুধ তৈরির পরিকল্পনা স্তন্যপায়ীদের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই নেওয়া ছিল!


দুধের উপাদানঃ

দুধের প্রধান তিনটে উপাদানের একটা হল প্রোটিন। গোরুর দুধে লিটার প্রতি ৩০-৩৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে, আর এই প্রোটিনের ৮০ শতাংশ হল কেসিন। এই প্রোটিনটি ক্যালসিয়াম ফসফেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং কয়েক হাজার প্রোটিন অণু একসঙ্গে জুড়ে থেকে মিসেল নামে বৃহৎ কণা গঠন করে। কেসিন ছাড়াও অপর গুরুত্বপূর্ণ দুগ্ধ-প্রোটিন হল ল্যাকটোগ্লোবিউলিন।
দুধের দ্বিতীয় প্রধান উপাদান হল ল্যাকটোজ। এটি একটি দ্বিশর্করা। দুধের মিষ্টি স্বাদের জন্য এই ল্যাকটোজই দায়ী। গোরুর দুধ থেকে প্রাপ্ত ক্যালোরির ৪০% আসে এই ল্যাকটোজ থেকে। এছাড়াও গ্লুকোজ, গ্যালাকটোজ ও অন্য কিছু শর্করা থাকে।
তৃতীয় প্রধান উপাদান হল ফ্যাট। দুধে যে ফ্যাটের কণা থাকে তা ফসফোলিপিড ও প্রোটিনের সূক্ষ্ম আবরণে আবৃত দানা আকারে থাকে। দুধে থাকা ফ্যাটের ৯৭-৯৮ শতাংশ হল ট্রাইগ্লিসারাইড। এছাড়া সামান্য মনো ও ডাই গ্লিসারাইড থাকে। তবে এই ফ্যাটের পরিমাণ ও ফ্যাট অণুর ব্যাস গোরুর প্রজাতি, ভ্যারাইটি, খাদ্য ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। দুধে ফ্যাট ছাড়া সামান্য কোলেস্টেরলও আছে। আর আছে ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে।
এসব ছাড়াও গোরুর দুধ হল বিভিন্ন খনিজ মৌল যেমন ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম ইত্যাদি এবং ভিটামিন এ, বি৬, বি১২, সি, ডি, ই, কে, থিয়ামিন, রাইবোফ্ল্যাভিন, বায়োটিন, ফোলিক অ্যাসিড ও প্যান্টোথেনিক অ্যাসিডের সমৃদ্ধ উৎস।
দুধে থাকা বড়ো বড়ো ফ্যাটের দানা আর কেসিনের মিসেল দৃশ্যমান আলোর সব তরঙ্গকে সম্পূর্ণ প্রতিফলিত করে। সেই প্রতিফলিত রশ্মি আমাদের চোখে পৌঁছোলে দুধকে সাদা দেখি।
যদিও গোরুর দুধই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের পছন্দ, তবে কোথাও কোথাও অন্য গৃহপালিত প্রাণীর দুধও যথেষ্ট জনপ্রিয়। এশিয়ার উঁচু মালভূমি অঞ্চলের যাযাবর অধিবাসী এবং পূর্ব ইউরোপের মানুষের মধ্যে ঘোড়ার দুধ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এশিয়ার উঁচু মালভূমির লোকেদের মধ্যে চামরী গাভীর দুধও জনপ্রিয়। পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে ভেড়ার দুধ খাওয়ার প্রবণতা বেশি এস্কিমোরা তো বল্গা হরিণের দুধ পান করে। পশ্চিমবঙ্গের কথা বাদ দিলে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে গোরুর দুধের চাহিদা মেটায় মোষের দুধ।
বিভিন্ন গবাদি পশুর দুধের উপাদান ও তার পরিমাণ এক নয়। প্রোটিনের উপাদান, শর্করা, প্রোটিন ও ফ্যাটের অনুপাত, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ লবনের পরিমাণ এক এক প্রজাতির দুধে এক এক রকম। আবার বিভিন্ন ব্রিডের গোরুর ক্ষেত্রে এই পরিমাণের কিছু পরিবর্তন হতে পারে। নীচের সারণিতে দেখে নেওয়া যাক গোরু, ভেড়া, ছাগল ও মোষের দুধে পুষ্টিকর উপাদানের পরিমাণ।

সারণিঃ ১ – গোরু, ছাগল, ভেড়া ও মোষের দুধের প্রধান উপাদান
উপাদান
একক
গোরু
ছাগল
ভেড়া
মোষ
জল
গ্রাম
৮৭.৮
৮৮.৯
৮৩.০
৮২.১
প্রোটিন
গ্রাম
৩.২
৩.১
৫.৪
৪.৫
ফ্যাট
গ্রাম
৩.৯
৩.৫
৬.০
৮.০
শর্করা
গ্রাম
৪.৮
৪.৪
৫.১
৪.৯
ক্যালশিয়াম
মাইক্রোগ্রাম
১২০
১০০
১৭০
১৯৫
শক্তি
কিলো ক্যালোরি
২৭৫
২৫৩
৩৯৬
৪৬৩


দুধের দোষ-গুণঃ

খাবার কিংবা পানীয় হিসেবে দুধ খুবই গুণী খাবার। আর গুণীর কদর কে না করে? তামাম বিশ্বের সমস্ত মানুষ তাই দুধকে সবার সেরা খাবার হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তাই সত্যিই দুধ না খেলে হবে না ভালো ছেলে বা মেয়ে। এসো দেখে নিই, দুধের মঙ্গলকর রূপ।
Ø দুধে উপস্থিত পুষ্টি উপাদানগুলো এমন অনুপাতে রয়েছে যে একজন মানুষের যথোপযুক্ত পুষ্টির জন্য তা প্রায় কার্যকরী। এজন্য একজন মানুষ সারাজীবন কেবল দুধ খেয়েই কাটিয়ে দিতে পারে।
Ø দুধের অ্যাম্ফোটেরিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, অর্থাৎ দুধ অ্যাসিড ও ক্ষার উভয় ধর্মই প্রকাশ করে। অম্ল মাধমে এলে দুধ ক্ষার হিসেবে কাজ করে, ফলে অম্লত্ব প্রশমিত হয়। অথচ কোনও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া হয় না ও দুধের মানেরও পরিবর্তন হয় না। এজন্য অম্বলের রোগীকে ডাক্তারেরা দুধ খেতে পরামর্শ দেন। অ্যান্টাসিড খেলে পেটে গিয়ে তা তাপ সৃষ্টি করে, কিন্তু দুধের বেলায় সেই সম্ভাবনা নেই।
Ø দুধে প্রচুর ক্যালশিয়াম ও ফসফরাস থাকায় তা হাড় ও দাঁতের গঠনে সাহায্য করে। তাই বাচ্চাদের দুধ খাওয়া একান্ত দরকার। প্যাকেটজাত দুধে আবার ভিটামিন-ডি সংযোজন করা থাকে বলে তা হাড় ও দাঁতের বৃদ্ধিতে আরও উপকারী হয়ে ওঠে।
Ø দুধে যথেষ্ট পরিমাণে পটাশিয়াম রয়েছে যা রক্তবাহের প্রসারণে সাহায্য করে। এর ফলে রক্তচাপ বাড়ে না, আর তাই হৃদরোগের সম্ভাবনাও কমে।
Ø দুধে থাকা ভিটামিন-ডি কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এর ফলে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা কমে। কারণ কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের ফলে ক্যানসার হয়।
Ø এক গ্লাস দুধ খেলে অনেকক্ষণ ক্ষিধে পায় না, কারণ দুধে থাকে প্রচুর প্রোটিন যা থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় শক্তির অনেকটাই পাওয়া যায়। আর তখন আমাদের ক্যালোরি সমৃদ্ধ অন্য খাবার বার বার খাওয়ার দরকার পড়ে না। এতে স্থূলতার সম্ভাবনা কমে।
Ø দুধে থাকা বিভিন্ন উপাদান রক্তে ইনসুলিন হরমোনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আর তাই যারা নিয়মিত দুধ পান করে তাদের ডায়াবেটিস মেলিটাস বা ব্লাড সুগার হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
Ø দুধে থাকা ভিটামিন-ডি মস্তিষ্ক থেকে সেরোটোনিন নামক হরমোনের ক্ষরণে সাহায্য করে। এই হরমোনটি আমাদের মানসিক আবেগ, ক্ষুধা ও নিদ্রা নিয়ন্ত্রণ করে। সতরাং মানসিক রোগ নিয়ন্ত্রণেও দুধের ভূমিকা রয়েছে।
Ø দুধে রয়েছে সমস্ত অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড সমৃদ্ধ উচ্চ গুণমানের প্রোটিন। এই প্রোটিন পেশির বৃদ্ধিতে দারুণ সাহায্য করে। তাই শিশু ও কিশোর-কিশোরদের বড়ে ওঠার সময় দুধ খাওয়া একান্ত জরুরি।
Ø বয়স্ক ব্যক্তিদের একটা সাধারণ রোগ হল হাঁটুতে আর্থারাইটিস। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অস্টিও আর্থারাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে দুধপান জরুরি।

দুধ খাওয়া যে জরুরি তা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু কতটা খাওয়া জরুরি? নীচের সারণিতে দেখে নেওয়া যাক
সারণিঃ২ – কোন বয়সে কতটা দুধ খাওয়া দরকার
বয়স
নিরামিষাশী
আমিষাশী
৩-৬ বছর
৩০০ গ্রাম
২০০ গ্রাম
৭-১৮ বছর
২৫০ গ্রাম
২০০ গ্রাম
১৯ বছর ও তার ঊর্ধ্বে
২০০ গ্রাম
১৬০ গ্রাম

যদিও দুধের গুণরাশির তুলনায় দোষের পরিমাণ অনেক কম তাও সেগুলো উল্লেখ করা দরকার। যেমন –
Ø গোপালকরা আজকাল বেশি দুধের জন্য গোরুকে হরমোন ইঞ্জেকশন দেন। ফলে দুধে ওই হরমোনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই দুধ বেশিদিন পান করলে প্রস্টেট, স্তন ও কোলন-মলাশয়ে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত।
Ø দুধে সম্পৃক্ত ফ্যাট থাকায় বেশি দুধ খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে পারে। আর তা থেকে হৃদরোগের সম্ভাবনা। অবশ্য মাখন তোলা বা স্কিমড মিল্ক খেলে সে-ভয় আর থাকবে না।
Ø অনেক মানুষ আছে যাদের দুধ হজম হয় না। এদের পরিপাকনালিতে দুধের ল্যাকটোজ পরিপাকের জন্য ল্যাকটেজ এনজাইম উৎপন্ন হয় না। আর তাই এরা দুধ খেলে পেটে গ্যাস, বদহজম, ডায়েরিয়া, আচ্ছন্নতা ইত্যাদি হতে পারে। অনেকদিন দুধ না খেলে অনেক সময় ল্যাকটেজ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বহুদিন পর দুধ খেলে অনেক সময় পেটে গ্যাস হয়।
Ø দুধের প্রোটিন থেকে কারও কারও অ্যালার্জি হতেও পারে।

শ্বেত বিপ্লবঃ

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর প্রধান যে সমস্যা দেশের সামনে হাজির হয়েছিল তা হল খাদ্যাভাব। খাদ্যাভাবের হাত ধরেই আসে অপুষ্টি, রোগ ও মহামারি। স্বাধীন দেশের সরকার তাই নজর দিয়েছিল খাদ্যশস্য ও দুধ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে। দুটি বিশাল প্রকল্প গৃহীত হল – সবুজ বিপ্লব এবং শ্বেত বিপ্লব। ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (NDDB) ১৯৭০ সালে গ্রহণ করল বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডেয়ারি উন্নয়ন প্রকল্প – অপারেশন ফ্লাড (Operation Flood) এটিই শ্বেত বিপ্লব (White Revolution) নামে পরিচিতি পায়। লক্ষ্য, দুধ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন। বলতে গর্ব হয়, যে ভারতে ১৯৭০ সালের আগে দুধ উৎপাদনে ঘাটতি হত, বর্তমানে উদ্বৃত্ত তো হয়ই, বিশ্বের মধ্যে দুধ উৎপাদনে ভারতের স্থান এখন প্রথম। বিশ্বের মোট দুধের ১৭% উৎপাদিত হয় আমাদের দেশেই।
শুধু দুধ উৎপাদন নয়, মাথাপিছু দুধ গ্রহণের পরিমাণও বেড়েছে। ১৯৯০-৯১-তে যেখানে মাথাপিছু ১৭৬ গ্রাম দুধ লভ্য ছিল, সেখানে এখন তা ৩০০ গ্রামের বেশি। তথ্যের খাতিরে হয়তো বলাই যায় যে দেশে কোনও মানুষের দুধের অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তব কি তাই বলে? দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা ক’জন দুধ খাওয়ার সুযোগ পান? আসলে দুধ উৎপাদনে প্রথম হলে ক হবে, মাথা পিছু আয়ের নিরিখে বিশ্বে ভারতের স্থান ১৩৯ নম্বরে! বিশ্ব ব্যাঙ্কের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভারতের ২২ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় ৮০ টাকার কম। এঁদের কাছে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত যেখানে আকাশের স্বর্গ হাতে পাওয়ার সমান সেখানে দুধের কথা তাঁদের স্বপ্নেও আসে কি? যতদিন অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট থাকবে ততদিন দুধ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের পানীয় হয়েই থাকবে। আর অপারেশন ফ্লাডে ভেসে যাবে দেশের গরিব মানুষ, অথচ এক ফোঁটাও পেটে পড়বে না।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

বিজ্ঞান:: একটি গাছ ও একটি ছত্রখুনের গপ্পো - সৌম্যকান্তি জানা

একটি গাছ ও একটি ছত্রখুনের গপ্পো
সৌম্যকান্তি জানা

জর্জি ইভানভ মারকভ। জন্মসূত্রে বুলগেরিয়ার খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার। প্রথম জীবনে একটি কারিগরি শিক্ষার স্কুলে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরি গ্রহণ করলেও সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ তাঁর সহজাত। ১৯৬২ সালে তাঁর “Men” উপন্যাস বুলগেরিয়ার বর্ষসেরা উপন্যাসের স্বীকৃতি পায়। এরপর তিনি চাকুরি ছেড়ে সাহিত্যচর্চাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। “A Portrait of my Double” (১৯৬৬) এবং “The Woman of Warsaw” (১৯৬৮) গল্পগুচ্ছদুটি তাঁকে বুলগেরিয়ার সেই সময়ের সবচেয়ে প্রতিভাবান সাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি এনে দেয়। তবে তিনি ছিলেন তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধী। বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট শাসনের তীব্র বিরোধিতা করার ফলে তিনি স্বদেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। আর তাই চলে আসেন লন্ডনে। মারকভ সেখান থেকেই বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতে থাকেন। লন্ডনে থাকার সময়েই তিনি সাংবাদিক হিসেবে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দেন। হঠাৎ মারকভকে নিয়ে আমাদের কেন এত আগ্রহ তা এবার বলছি।
সেদিন ছিল ১৯৭৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। বিবিসি-র দপ্তরে যাবার জন্য বাস ধরবেন বলে মারকভ টেমস নদীর উপর ওয়াটারলু ব্রিজে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ ডান পায়ের ঊরুর পেছনে একটা পিন ফোটানোর যন্ত্রণা অনুভব করলেন। পেছন ঘুরতেই দেখেন ঠিক পেছনে একটা মোটাসোটা লোক মাটি থেকে একটা ছাতা কুড়িয়ে নিচ্ছে। মারকভ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটি তড়িঘড়ি রাস্তা পার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্যাক্সিতে উঠে চম্পট দিল। মারকভ ব্যাপারখানা কী বুঝে উঠতে পারলেন না। যন্ত্রণাটা যেন একটু একটু করে বাড়ছে। কোনও ছারপোকা কি কামড়াচ্ছে? হতে পারে। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে তো আর প্যান্ট খুলে দেখা সম্ভব নয় কী হয়েছে। দপ্তরে পৌঁছে প্যান্ট খুলে যন্ত্রণার জায়গাটা দেখলেন। জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে গেছে। যন্ত্রণাটা ক্রমশঃ সহ্যের বাইরে চলে যেতে লাগল। সন্ধ্যের দিকে বেশ জ্বর এল। বাধ্য হয়েই সহকর্মীরা তাঁকে সেন্ট জেমস হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। চিকিৎসকেরা বুঝে উঠতে পারলেন না কী থেকে তাঁর এমন অসুস্থতা? অবস্থা ক্রমশঃ চিকিৎসকদের আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে লাগল। চার দিন পর, অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর মারকভ মাত্র ৪৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
রহস্যজনক এই মৃত্যুর কারণ খুঁজতে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বেশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করল। মারকভের মৃতদেহের অটোপসি রিপোর্টে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। মারকভের ঊরুর ক্ষতস্থানে পাওয়া গেছে আলপিনের মাথার সাইজের ছোট্টো একটা ধাতব বড়ি। ওই বড়িটা ৯০ শতাংশ প্লাটিনাম ও ১০ শতাংশ ইরিডিয়াম দিয়ে তৈরি। বড়িটার মধ্যে রয়েছে ইংরেজি এক্স অক্ষরের মতো একটা গর্ত। আর সেই গর্তের মধ্যে পাওয়া গেল সামান্য পরিমাণ রিসিন। রিসিন কী সে কথায় পরে আসছি। শুধু এটুকু বলি যে এটা একটা প্রাণঘাতী বিষ। ওই বড়ির বাইরে ছিল একটা আবরণ যা দেহে প্রবেশ করার পর দেহের স্বাভাবিক উষ্ণতায় (৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) গলে যায়। তখন বড়ির ভেতর থেকে রিসিন বেরিয়ে এসে রক্তে মেশে। মারকভের মৃত্যুর আগে যদি রিসিনের উপস্থিতি প্রমাণিত হত তাতেও তাঁকে বাঁচানো যেত কিনা সন্দেহ, কারণ রিসিনের বিষক্রিয়া প্রতিহত করার কোন পদ্ধতি তখনও চিকিৎসকদের অজানা ছিল। তদন্তে জানা যায় যে বিশেষ ধরণের এক ছাতায় কম্প্রেসড (Compressed) গ্যাস ব্যবহার করে গুলির মতো ওই বিষপূর্ণ ধাতব বড়ি নিক্ষেপ করা হয়েছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দার সন্দেহ, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি ওই বড়ি ও ছাতা সরবরাহ করেছিল, কারণ বুলগেরিয়াতে বা ব্রিটেনে নাকি ওই সময় ওই প্রযুক্তি অজানা ছিল। মারকভের এই হত্যা লন্ডন স্ট্রিট হত্যা নামেও পরিচিতিলাভ করে। ২০০৬ সালে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেনে একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয় যার নাম “The Umbrella Assassination”ভাবলে অবাক লাগে, খ্যাতনামা সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আজ থেকে ৮৫ বছর আগে তাঁর ব্যোমকেশ সিরিজের ‘পথের কাঁটা’ উপন্যাসে আততায়ীকে যে কৌশলে খুন করতে দেখিয়েছিলেন যেন তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম ৪০ বছর আগে মারকভ হত্যা রহস্যে। ‘পথের কাঁটা’-তে বন্দুক হিসেবে সাইকেলের ঘন্টি ও গুলি হিসেবে গ্রামোফোনের ধাতব পিন ব্যবহৃত হয়েছিল, আর মারকভ হত্যায় ছাতা ও প্ল্যাটিনাম বড়ি।



শুধু মারকভই যে রিসিন নামক বিষের প্রথম শিকার হয়েছিলেন তা নয়। এই ঘটনার মাত্র ১০ দিন আগে বুলগেরিয়ার দলত্যাগী নেতা ভ্লাদিমির কোসতভকেও একই উপায়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোসতভের সৌভাগ্য যে বড়িটি দেহে প্রবেশের আগে তার আবরণের অনেকটাই কোনওভাবে গলে গিয়েছিল, ফলে অনেকটা রিসিন বাইরে বেরিয়ে যায়। কোসতভের সামান্য জ্বর ছাড়া সে যাত্রা আর কিছু হয়নি। কোসতভ অবশ্য মারকভের মতো কোনও ছাতাওয়ালাকে দেখেননি, তবে কাছে একজন ব্যাগ-বাহককে দেখেছিলেন। ১৯৭১ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার ঐতিহাসিক, ঔপন্যাসিক ও ছোটো গল্পকার আলেকজান্দার সোলঝেনিৎসিনও মারকভের মতো একইভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন তবে তিনিও সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন।
যদিও বিষ হিসেবে রিসিনের কার্যকারিতা জনসমক্ষে এসেছে এই সময়েই, কিন্তু মার্কিন সেনাবিভাগ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে জৈব অস্ত্র হিসেবে রিসিন ব্যবহার করা যায় কিনা তা নিয়ে গবেষণা করেছেন তাঁরা অবশ্য যুদ্ধের সময় রিসিনকে গুঁড়ো হিসেবে ও বুলেটের আবরণ হিসেবে প্রয়োগ কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। তবে হেগ চুক্তির বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁরা রিসিন প্রয়োগ করতে পারেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা আবার জৈব অস্ত্র হিসেবে রিসিন প্রয়োগ করার পরিকল্পনা করে। এবার গুচ্ছ বোমার সাথে রিসিন মিশিয়ে প্রয়োগ করলে কতটা কার্যকরী হয় তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে বহুল ব্যবহৃত ফসজিন গ্যাসের তুলনায় রিসিন প্রয়োগ ব্যয়বহুল হওয়ায় জৈব অস্ত্র হিসেবে রিসিন ব্যবহারের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়। শোনা যায়, সোভিয়েত রাশিয়ার কাছেও সেই সময় জৈব অস্ত্র হিসেবে রিসিন ছিল, কিন্তু তা প্রয়োগ করেনি।
এবার দেখা যাক মারকভের মৃত্যুর জন্য দায়ী রিসিন (Ricin) কী। রিসিন হল আমাদের অতি পরিচিত রেড়ি (Castor bean) গাছের বীজ থেকে প্রাপ্ত একপ্রকার রাসায়নিক। এটা সেই রেড়ি গাছ যে গাছের বীজ থেকে রেড়ির তেল (Castor oil) তৈরি হয়। পৃথিবীর বিষাক্ততম রাসায়নিক হল এই রিসিন। দেহের প্রতি কেজি ভরে মাত্র ২২ মাইক্রোগ্রাম বিষ ইঞ্জেকশন হিসেবে বা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে রক্তে মিশলে মৃত্যু ডেকে আনবে। বিশুদ্ধ রিসিনের পাউডারের কয়েকটা দানাই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। আর কোনও পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি যদি রেড়ির আটটা বীজ খেয়ে ফেলে তাতেও ওই রিসিনের প্রভাবে মারা যেতে পারে।
দেখা যাক রিসিন কীভাবে দেহে বিষক্রিয়া ঘটায়। রিসিন কোষের মধ্যে প্রবেশ করে প্রোটিন সংশ্লেষ (ট্রান্সলেশন) প্রক্রিয়াটিকে বিপর্যস্ত করে দেয়। আমাদের বেঁচে থাকা হাজার হাজার রাসায়নিক বিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। এই সব বিক্রিয়াগুলো ঘটায় হাজার হাজার এনজাইম। কোন বিক্রিয়া কখন ঘটাতে হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন হরমোন সমস্ত এনজাইম ও অধিকাংশ হরমোন প্রকৃতিগতভাবে প্রোটিন। তার মানে, রিসিন এনজাইম ও হরমোন উৎপাদন প্রক্রিয়াটাকেই খান-খান করে দেয়। কোষের মধ্যে থাকা রাইবোজোম হল ওই প্রোটিন সংশ্লেষ পদ্ধতির মূল কারিগর – অনেকটা পাকাবাড়ি নির্মাকারী রাজমিস্ত্রির মতো। বাড়িটা যদি হয় প্রোটিন তবে ইট হল অ্যামাইনো অ্যাসিড। অ্যামাইনো অ্যাসিড জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় প্রোটিন। রাইবোজোম নির্দিষ্ট অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলিকে পর পর জুড়ে জুড়ে প্রোটিন তৈরি করে। রিসিন রাইবোজোমকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে প্রোটিন সংশ্লেষ বাধাপ্রাপ্ত হয়। রাজমিস্ত্রিকে কাজ করতে না দিলে যতই ইট-বালি-সিমেন্ট থাক বাড়ি তৈরি হতে পারে কি? কাজেই, দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয় রিসিনের বিষক্রিয়ায়। সাধারণতঃ দেহে প্রবেশ করার ২ থেকে ৫ দিনের মধ্যে এর বিষক্রিয়ার প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠে। রিসিন বেশি আক্রান্ত করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি, বৃক্ক ও যকৃতকে। মানব শরীরে রিসিনের বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক আজও আবিষ্কৃত হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের সেনাবিভাগের পক্ষ থেকে রিসিনের প্রতিষেধক আবিষ্কার করা হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছে তা মানব শরীরের ওপর পরীক্ষিত হয়নি, কেবল ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে। সুতরাং আজও রিসিনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হলে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোনও উপায় চিকিৎসকদের হাতে নেই।
যে গাছের বিষ নিয়ে এত কাণ্ড সেই রেড়ি গাছটা কিন্তু আমাদের যথেষ্ট পরিচিত এবং বেজায় নিরীহ প্রকৃতির গাছ। এটি ইউফোরবিয়েসি গোত্রের একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। বিজ্ঞানসম্মত নাম Ricinuscommunis. ভারতসহ পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল হল এর আদি বাসভূমি। আমরা এই গাছটিকে প্রায়শই ট্রেন ও বাস রাস্তার পাশে এবং পতিত জমিতে দেখতে পাই। পাতাগুলো চওড়া কিন্তু অনেকটা ঢেঁড়স পাতার মতো খাঁজকাটা। কচি পাতার রঙ সাধারণতঃ লালচে-বেগুনি হলেও পরিণত পাতা সবুজ। সবুজ বা লালচে-বেগুনি রঙের ডিম্বাকৃতি ফলের গায়ে ধুতরা ফলের মতো কাঁটা থাকে। ফলের মধ্যে থাকা বীজের রঙ ভারি সুন্দর – কালো, খয়েরি, ফিকে সাদা ছোপ ছোপ। কিন্তু এই সুন্দর বীজেই রয়েছে ভয়ঙ্কর বিষ রিসিন। অবশ্য শুধু বীজে নয়, গোটা গাছের সব অংশেই রিসিন রয়েছে। তবে বীজে রিসিনের পরিমাণ অনেক বেশি। রিসিনের জন্য আমরা যতই রেড়িকে দোষারোপ করি না কেন, এটা কিন্তু রেড়ির একপ্রকার আত্মরক্ষার উপায়। ওই রিসিনের বিষক্রিয়ার জন্য গোরু-ছাগল বা পোকামাকড় রেড়ি গাছ এড়িয়ে চলে।


রেড়ি গাছ রিসিনের জন্য যতই অভিযুক্ত হোক না কেন তার বীজ থেকে প্রাপ্ত তেলের জন্য হাজার হাজার বছর আগে থেকে মানুষের কাছে রেড়ি সমাদৃত। প্রাচীন কাল থেকে মানুষ রাতের অন্ধকার দূর করতে রেড়ির তেলে বাতি জ্বালিয়েছে। প্রমাণ মিলেছে, ৪০০০ বছর আগেও মিশরের মানুষ আলো জ্বালাত রেড়ির তেলে। এই তেল ধীরে ধীরে পোড়ে বলে জ্বালানী তেল হিসেবে মানুষের কাছে সমাদৃত ছিল। ভারতে ২০০০ বছর আগে রেড়ির তেলে প্রদীপ জ্বালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। রেড়ি বীজ উৎপাদনে বিশ্বে ভারতের স্থান বর্তমানে প্রথম। ভারতে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি মতে রেড়ির তেল বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে আজও বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ানাশক এবং ওষুধ প্রস্তুতিতে রেড়ির তেল ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বিকল্প জ্বালানী তেল হিসেবে বায়োডিজেলের গুরুত্ব আজ সর্বজনবিদিত। তবে স্বস্তির কথা, প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তেলে বা ঔষধে বা প্রসাধনীতে রিসিন থাকে না। আর তাই রেড়িকে কুনজরে দেখার কোনও কারণ নেই। শুধু রেড়ি নয়, আরও অনেক উদ্ভিদেই রয়েছে প্রাণঘাতী বিষ। কিন্তু তা বলে গুণের কথাটা ভুলে গেলে চলবে না। মানবসভ্যতা রেড়ির কাছে বিরাটভাবে ঋণী।
_____

বিজ্ঞান:: শীতঘুমের ঘোরে - সৌম্যকান্তি জানা

শীতঘুমের ঘোরে
সৌম্যকান্তি জানা

“ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি যেয়ো
বাটা ভরে পান দেবো গাল ভরে খেয়ো”
এমন কোনও মা এই বাংলায় মনে হয় নেই যিনি তাঁর শিশুকে এই ঘুমপাড়ানি ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়াননি। আসলে ছোটো-বড়ো সবার জীবনে ঘুমের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বাঁচার জন্য জল, খাবার আর বাতাসকে অবশ্য প্রয়োজনীয় তিনটি শর্ত বলে সবাই মানলেও চতুর্থ শর্ত হিসেবে সমান গুরুত্বপূর্ণ আর একটি শর্ত হল ঘুম। সুস্থভাবে জীবনধারণের জন্য যে ঘুমের প্রয়োজন তা মানুষ তো বটেই, মনুষ্যেতর প্রাণীমাত্রেই জানে। ঘুম মানেই শরীরের বিশ্রাম। আরও ভালো করে বললে, মস্তিষ্কের বিশ্রাম। সমস্ত প্রাণীর শরীরের সমস্ত অঙ্গকে সারাদিন কত কাজ করতে হয়। আর সব কাজ পরিচালনা করার মুখ্য দায়িত্ব পালন করে মস্তিষ্ক বা ব্রেন। তাই মানুষের মস্তিষ্ককে সারা দিনে অন্ততঃ ছয় থেকে আট ঘন্টা বিশ্রাম নিতেই হয়। অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ের হেরফের হতে পারেকিন্তু ঘুম মাস্ট। সারাদিন মস্তিষ্ক কাজ করার সময় বেশ কিছু ক্ষতিকর বর্জ্যপদার্থ উৎপন্ন করে। ঘুমের সময় সেইসব বর্জ্য পদার্থগুলো মস্তিষ্ক থেকে অপসারিত হয়। ফলে ঘুম ভাঙার পর মস্তিষ্ক আবার তরতাজা অবস্থায় থাকে। ঘুম যদি নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে কম হয় তবে নানা বিপত্তি। সারাদিন মাথা ভার হয়ে থাকা, কাজে মনোযোগ না আসা, থেকে থেকে ঝিমুনি আসা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া – এসব উপসর্গের সঙ্গে আমরা কম-বেশি পরিচিত। আর দীর্ঘদিন ঘুমের এমন সমস্যা হলে তো আরও বিপদ – উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ বা স্থূলত্ব হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
এতক্ষণ যে ঘুমের কথা বললাম সেই ঘুমের একটা বৈশিষ্ট্য হল ঘুমের মধ্যে শরীরের অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, বৃক্ক, পরিপাকতন্ত্র, নার্ভ ইত্যাদি পূর্ণ সক্রিয় থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে এমন কিছু ঘুম আছে যার স্থায়ীত্ব টানা কয়েকদিন থেকে কয়েকমাস পর্যন্ত হতে পারে, আর সেই ঘুমের সময় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর সক্রিয়তা খুব কমে যায়। এমন ঘুম দু’ধরণের ঋতুতে দেখা যায়। প্রচন্ড ঠান্ডার সময় এই ধরণের ঘুমকে বলে শীতঘুম বা হাইবারনেশন, আর প্রচন্ড গরমের সময় গ্রীষ্মঘুম বা এস্টিভেশন। তবে শীতকালে শীতঘুমের রকমফের আছে। যদি কিছু সময় পর পর ঘুম ভেঙে যায় ও সেই সময় খাওয়া-দাওয়া ও মলমূত্র ত্যাগের মতো দরকারি কাজ খুব কম সময়ের মধ্যে সেরে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়া যায় তবে তা প্রকৃত শীতঘুম নয় – একে পরিভাষায় বলে টোর্পর (Torpor), বাংলায় বলতে পারি অক্রিয়তা।
শীত এলেই বেশিরভাগ মানুষের খুব মজা! শীতকাল মানেই তোমাদের কাছে পিকনিক, জয়নগরের মোয়া আর পিঠে-পুলি। শীতকালে লেপের ওম নিতে পছন্দ করে না এমন মানুষ একটাও পাবে না। ঘাম বেরোয় না বলে শারীরিক কষ্ট হয় কম। তাই কাজের এনার্জিও থাকে অপেক্ষাকৃত বেশি। এই সময় বাজার নানা সবজির সম্ভারে সেজে ওঠে। কী নেই! ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলো, পালং, বিট, গাজর, শিম, বরবটি, বিন, টমাটো, মটরশুঁটি, পেঁয়াজকলি আরও কত কী! বাহারি ফুলে সেজে ওঠে গৃহস্থের একচিলতে বাগানও। তাই বেশিরভাগ মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ঋতু শীত। কিন্তু অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে শীত হল সমস্যার ঋতু। পরিবেশের উষ্ণতা অনেক কমে গেলে অনেক প্রাণীর জীবনধারণ করা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। কারণ এই সময় খাবার-দাবারের খুব অভাব হয়। খাবার থেকে পাওয়া যায় বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় শক্তি। তাই খাবার না পেলে ওরা বাঁচবে কী করে? যে সব জায়গায় বছরের বেশিরভাগ সময় খুব ঠান্ডা থাকে সেখানের প্রাণীদের ক্ষেত্রে জীবনধারণ করা আরও কষ্টের। তা সে যতই কষ্টকর হোক বাঁচার চেষ্টা করে সমস্ত প্রাণী। কীভাবে? যখন আবহাওয়া অনুকূল থাকে তখন খাবার-দাবারের প্রাচুর্যও থাকে। তখন ওরা বেশি বেশি করে খাবার খেয়ে নেয়। ফলে শরীরে বাড়তি চর্বি জমে যায়। এই জমানো চর্বি শীতকালে ওদের বাঁচার শক্তি জোগায়। আবার যে সব অঙ্গের কার্যকারিতার জন্য প্রাণধারণ সম্ভব হয় সেগুলোর সক্রিয়তাও ওরা কমিয়ে দেয় যাতে শক্তির খরচ কমে যায়। ফলে শীতের প্রতিকূলতাকে ওরা অতিক্রম করতে পারে স্বচ্ছন্দই। আজ তোমাদের এমনই দশটি বিস্ময়কর প্রাণীর সঙ্গে পরিচয় করাব

v সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালি (Arctic Ground Squirrel Spermophilusparryii)


যদিও নামের শুরুতে সুমেরু রয়েছে তবে এদের বাস মূলতঃ উত্তর কানাডা, উত্তর ব্রিটিশ কলম্বিয়া, আলাস্কা ও সাইবেরিয়া অঞ্চলে। যেহেতু মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে এরা বাসা বানায় তাই বালিযুক্ত অঞ্চলই এদের পছন্দ। গ্রীষ্মকালে এরা প্রচুর পরিমাণে ঘাস-পাতা, ফল, বীজ খেয়ে শরীরে চর্বির পরিমাণ অনেকটাই বাড়িয়ে নেয়। তারপর পুরুষ কাঠবিড়ালি মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে খাবার জমা করতে থাকে। শীত শুরু হলে ওরা আশ্রয় নেয় বাসার ভেতর। মাটির নিচে এদের গর্ত হয় ভারি অদ্ভুত! শোবার ঘর, খাবার মজুত রাখার ঘর, এমনকি মল-মূত্র ত্যাগ করার ঘরও হয় আলাদা। কাঠবিড়ালিরও টয়লেট, ভাবা যায়! এদের স্ত্রী কাঠবিড়ালিরা আগস্ট মাসের শুরুর দিক থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত আর পুরুষরা সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিক থেকে এপ্রিল মাসের প্রথমের দিক পর্যন্ত ওই গর্তের ভেতর শীতঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ভেবে দেখো, তিন-চার মাস খেয়ে আট-ন’মাস ঘুমিয়ে কাটায়! এই সময় এদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (৩৭ সেন্টিগ্রেড) কমে হয়ে যায় প্রায় মাইনাস তিন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আর হৃৎস্পন্দন কমে হয়ে যায় মিনিটে এক বার! তবে সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালি কিন্তু একটানা শীতঘুমে কাটায় না। দু’তিন সপ্তাহ পরপর ওরা একবার করে জেগে ওঠে ১২ থেকে ২৪ ঘন্টার জন্য। এই সময় ওরা কিছু খেয়ে নেয় ও মল-মূত্র ত্যাগ করে। তারপর আবার শীতঘুমে ডুব দেয়। এভাবেই কেটে যায় আট-ন’মাস। একটানা না ঘুমিয়ে এরকম পর্যায়ক্রমিক নিদ্রা ও জাগরণকে হাইবারনেশন না বলে বলে টোর্পর (Torpor) বা অক্রিয়তা। সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির এই অক্রিয়তার জন্য মস্তিষ্কে একপ্রকার রাসায়নিক দায়ী। এর নাম অ্যাডিনোসিন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলকভাবে অক্রিয় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির রক্ত নিয়ে সক্রিয় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির দেহে প্রবেশ করিয়ে দেখেছেন সক্রিয় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালিও শীতঘুমে বা অক্রিয়তায় ডুবে যায়।


v কেঠো ব্যাঙ (Wood Frog Rana sylvatica)


মনে করো তুমি শীতকালে আলাস্কায় বেড়াতে গিয়ে কোনও ডোবার ধারে শুকনো পাতার গাদার মধ্যে একটা ব্যাঙ দেখতে পেলে। তার গায়ে বরফের কুচি জমে গিয়েছে। ভাবতে পার, ব্যাঙটা কতদিন মরে পড়ে আছে কে জানে! হাতে তুলে দেখতেও পার। প্রবল ঠান্ডায় এক্কেবারে জমে কাঠ। কিন্তু তাজ্জব হয়ে যাবে, যদি দেখো ওই ‘মরা’ ব্যাঙটাই কিছুদিন পর থপ থপ করে লাফাতে লাফাতে ঝাঁপ দিল ডোবার জলে! ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপার বলে ভাবতেই পার। কিন্তু, এমন ব্যাঙ কিন্তু সত্যিই রয়েছে – উড ফ্রগ অর্থাৎ কেঠো ব্যাঙ। একটা পূর্ণাঙ্গ কেঠো ব্যাঙ আমাদের চেনা কুনো ব্যাঙের সাইজের হয়। শীতকালে এদের হৃৎস্পন্দন পুরোপুরি থেমে যায়! থেমে যায় রক্ত প্রবাহ ও শ্বাস-প্রশ্বাস। শরীরের প্রায় তিনভাগ রক্ত জমে বরফ হয়ে যায়। রক্তের তাপমাত্রা মাইনাস এক থেকে তিন ডিগ্রিতে নেমে আসে। আর এভাবে ওরা সাতমাস কাটিয়ে দেয়। এই সময় কোনও কেঠো ব্যাঙের পা টেনে যদি সোজা করতে চাও তো ওর পা ভেঙে যাবে! কিন্তু ব্যথা পেয়ে সাড়া দেবে না। এই অবস্থাকে শীতঘুম না বলে জীবন্মৃত অবস্থা বললে বেশি মানানসই হবে। শীত কেটে গিয়ে বসন্তকাল এলে ওরা ওই জীবন্মৃত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর সোজা লাফ দেয় জলে। কারণ হাতে সময় মাত্র পাঁচ মাস। এর মধ্যেই তাদের প্রজনন ঘটাতে হবে এবং তার ছানা-পোনাদের বেড়ে ওঠার সময় দিতে হবে।
কেঠো ব্যাঙরা কীভাবে সাত মাস ধরে এভাবে জীবন্মৃত অবস্থায় থাকতে পারে তার সব ব্যাখ্যা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। তবে এটুকু জানা গেছে যে শীতঘুমের সময় ওদের কোষে গ্লুকোজের মাত্রা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। এর ফলে কোষের ভেতরে জলের পরিমাণ কমে না। আর ওই গ্লুকোজের জারণক্রিয়া থেকে উৎপন্ন ন্যূনতম শক্তি কেঠো ব্যাঙকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। বসন্ত ও গ্রীষ্মের পাঁচ মাসে ওরা প্রচুর পরিমাণে খাওয়া-দাওয়া করে লিভারে গ্লাইকোজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে নেয়। ওই গ্লাইকোজেন থেকে তৈরি হওয়া গ্লুকোজ কোষের মধ্যে এসে জমা হয়। দেখা গেছে ওরা মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও দিব্যি শীতঘুমে কাটিয়ে দিতে পারে। রবিঠাকুরের লেখা ‘জীবিত মৃত’ গল্পে কাদম্বিনী মরে প্রমাণ করেছিল যে সে আগে মরেনি। কেঠো ব্যাঙও ছয় থেকে আট বছর মরে গিয়ে প্রমাণ করে যে আলাস্কার প্রবল শীতেও সে মরেনি।


v হ্যামস্টার (Hamster –Mesocricetus auratus)


প্রাণীজগতের আর এক ‘কাদম্বিনী’-র কথা যদি বলতে হয় তাহলে কেঠো ব্যাঙের কাছাকাছিই থাকবে সিরিয়ার হ্যামস্টার বা গোল্ডেন হ্যামস্টার। এরা আসলে ধেড়ে ইঁদুরজাতীয় (Rodent) প্রাণী। অনেক দেশেই আজকাল হ্যামস্টার পোষ্য প্রাণী। তবে সিরিয়ার বন্য হ্যামস্টার নিয়েই এই আলোচনা। ওরা গর্তবাসী ও নিশাচর। ওদের এলাকায় গড় উষ্ণতা ১৮ সেন্টিগ্রেড। মে থেকে অক্টোবর মাস জুড়ে সিরিয়ার আবহাওয়া খুব গরম থাকে। জানুয়ারি মাসে তাপমাত্রা ৪–৬ সেন্টিগ্রেডে নেমে এলে হ্যামস্টারেরা পাড়ি জমায় ঘুমের রাজ্যে। ওবশ্য তার আগে ওরা গর্তের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার মজুত করে নেয়। যদি কোনও কারণে খাবার মজুত করতে কিছু দেরি হয় তবে শীতঘুমে যেতেও দেরি হয়। তবে এদের কিন্তু প্রকৃত শীতঘুম হয় না। এদেরও অক্রিয়তা (Torpor) দেখা যায় সুমেরুর মেঠো কাঠবিড়ালির মতো। আট থেকে দশ দিন ওরা একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকে। তারপর জেগে উঠে কিছু খেয়ে নেয়। আবার পাড়ি দেয় ঘুমের রাজ্যে। অক্রিয় থাকার সময় ওরা এক্কেবারে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। এ সময় পা গুলো বেশ শক্ত ও টানটান হয়ে যায়। অক্রিয়তা চলাকালীন ওদের দেহের বিপাকক্রিয়ার হার মাত্র পাঁচ শতাংশে নেমে আসে বলে দেহের তাপমাত্রা অনেকটা কমে যায়। এই সময় হৃৎস্পন্দন কমে মিনিটে চার হয়ে যায়, আর দু’মিনিটে মাত্র একবার শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। ফলে অক্রিয় হ্যামস্টারকে মৃত বলে ভুল করা স্বাভাবিক। এজন্য হ্যামস্টারকে নিয়ে লোকমুখে নানা ভুতুড়ে গল্প প্রচলিত আছে। মৃত ভেবে হ্যামস্টারকে মাটির তলায় পুঁতে দেওয়ার পর সেই হ্যামস্টারকে নাকি মাটি ফুঁড়ে উঠে এসে বাগানে ঘুরতে দেখা যায়! আসল রহস্যটা যে কী তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


v কাঁটাচুয়া (Hedgehog – Erinaceuseuropaeus, Ateierixalbiventris, Paraechinusmicropus)


প্রধাতঃ মরু অঞ্চলের এই প্রাণীটিকে দেখে অনেকেই মনে করতে পারে সজারুর কোনও এক জাতভাই। কাঁটাচুয়া নাম হয়েছে পিঠের ওপর সজারুর মতো কাঁটা রয়েছে বলে। আসলে এদের পেট বাদে সারা শরীরেই কাঁটা ভর্তি। তবে এ কাঁটার প্রকৃতি সজারুর মতো নয়। বিপদ বুঝলে কাঁটাচুয়া পুরোপুরি কেন্নোর মতো কুন্ডলী পাকিয়ে যায়, আর কাঁটাগুলো খাড়া হয়ে যায়। তখন দেখে মনে হবে ঠিক যেন একটা কাঁটার বল। নানা দেশে কাঁটাচুয়া দেখা যায়। লেজ বাদে ছ’সাত ইঞ্চি লম্বা স্তন্যপায়ী প্রাণীটার ইংরেজিতে নাম হেজহগ হওয়ার কারণ এদের ঝোপের মধ্যে বেশি দেখা যায়, আর মুখটা শূকরের মতো সূচালো। দিনের বেলা এরা গর্তে থাকে, আর সন্ধ হলে খাবারের খোঁজে বেরিয়ে আসে। ভারতের কাঁটাচুয়ারা শীতঘুম দেয় কিনা জানা না গেলেও ইউরোপের কাঁটাচুয়ারা শীত এলে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এদের শীতঘুমের স্থায়ীত্ব আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। এদের শীতঘুম তাই কয়েক সপ্তাহ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। এই সময় ওদেরও দেহের তাপমাত্রা ২ সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত নেমে আসতে পারে এই সময় হৃৎস্পন্দনও স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পায়। তবে তাপমাত্রা এর নিচে নেমে এলে ওরা জেগে ওঠে। তখন হৃৎস্পন্দন হার আবার বেড়ে যায়, আর দেহও কিছুটা গরম হয়ে যায়। দেহের তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টিগ্রেডে পৌঁছোলে তারপর আবার কাঁটাচুয়া পাড়ি জমায় শীতঘুমে।


v পুওরউইল (Poorwill – Phalaenoptilusnuttallii)


পুওরউইল বাংলায় তো নয়ই, ভারতেও পাওয়া যায় না। সুতরাং ভারতীয় কোনও ভাষাতে এর স্থানীয় নাম নেই। পশ্চিম আফ্রিকা, উত্তর মেক্সিকো, ব্রিটিশ কলম্বিয়া আর দক্ষিণ-পূর্ব অ্যালবার্তায় এদের পাওয়া যায়। পাখিদের দুনিয়ায় একমাত্র পাখি হল এই পুওরউইল যাদের প্রকৃত শীতঘুম দেখা যায়। ছোটো পেঁচার মতো দেখতে এই পাখির প্রজাতি পেঁচার মতোই নিশাচর। এরা উড়ন্ত পোকামাকড় ধরে খায়, আর রাতে শিকার ধরার সুবিধার জন্য এদের পালক কালো, সাদা, ধূসর, বাদামী ছিটযুক্ত হয়। ছোট্টো-খাট্টো পাখিগুলোর চেহারাও ভারী অদ্ভুত। পা আর চঞ্চু খুব ছোটো, কিন্তু চোখ দুটো খুব বড়ো। লম্বায় হয় ৭-৮ ইঞ্চি, আর ওজনে মাত্র ৪২-৫৮ গ্রাম।
শীতপ্রধান অঞ্চলের অধিকাংশ পাখি প্রবল শীতের সময় অপেক্ষাকৃত উষ্ণ স্থানে পরিযান করে। কিন্তু এই পুওরউইল পরিযান করে না। বরং শীতকালটা কষ্ট করে শীতঘুমে কাটিয়ে দেয়। এদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৪১ সেলসিয়াস হলেও শীতঘুমের সময় তা ৪. থেকে ১৮.৩ সেলসিয়াসে নেমে আসে। শ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমে যায় প্রায় ৯০ শতাংশ। তখন বুকের কাছে বা নাকে হাত দিয়ে জীবিত না মৃত বোঝা মুশকিল। হৃৎস্পন্দনের স্বাভাবিক হার যেখানে মিনিটে ১৩০ সেখানে তা কমে হয়ে যায় মিনিটে মাত্র দশ। সাধারণতঃ ফাঁপা হয়ে যাওয়া কোনও গাছের গুঁড়ির ভেতর বা ঘাসের গাদার ভেতর এরা শীতঘুম দেয়। শীতঘুমে যাওয়ার আগে এরা প্রচুর পোকামাকড় খেয়ে শরীরে সঞ্চিত চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে নেয়। এলাকাভেদে শীতের প্রকৃতি অনুযায়ী পুওরউইলদের শীতঘুম এক সপ্তাহ থকে কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। পরিযান না করে যে পাখি কষ্টদায়ক শীতঘুম যাপন করে তাকে তো poor বা বেচারা বলাই যায়। আর প্রতিকূলতাকে জয় করতে গেলে সংকল্প বা প্রবল ইচ্ছাশক্তি, অর্থাৎ ইংরেজিতে will থাকা চাই। সুতরাং পুওরউইল নামটা বেশ সার্থক, তাই না?


v  কলাবাদুড় ও চামচিকা (Fruit bat and Insect bat – Megachiropterasp and Microchiroptera sp)


“আদুড়-বাদুড় চালতা-বাদুড় কলাবাদুড়ের বে/ টোপর মাথায় দে/ দেখতে যাবে কে?/ চামচিকিতে ঢোলক বাজায় খ্যাংরা কাঠি দে।” বাদুড়-চামচিকা নিশাচর প্রাণী হওয়ায় তাদের চোখে দেখা সবসময় সম্ভব না হলেও ছড়ার মধ্যে দিয়ে শৈশব থেকেই ওদের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটে যায়। কলাবাদুড় হল বড়ো বাদুড়, আর চামচিকা হল ছোটো বাদুড়। কলাবাদুড় খায় মূলতঃ ফল, আর চামচিকারা খায় পতঙ্গ। তবে শীতঘুমের ব্যাপারে কলাবাদুড়ের থেকে চামচিকারা বেশি পারদর্শী। চামচিকাদের অধিকাংশ প্রজাতি শীতকালে শীতঘুম দেয়। অবশ্য শীতের তীব্রতাভেদে কখনও তাদের গভীর শীতঘুম, আবার কখনও অক্রিয়তা (Torpor) দেখা যায়। কলাবাদুড়ের কয়েকটি মাত্র প্রজাতিই শীতঘুমে যায়। সাধারণতঃ বেশি উচ্চতাযুক্ত অঞ্চলের কলাবাদুড় বা চামচিকাদের মধ্যেই শীতঘুম হয়, কারণ বেশি শীতপ্রধান এলাকায় শীতকালে পতঙ্গের সংখ্যা খুব কমে যায়। এই খাদ্যাভাবের জন্য কলাবাদুড় বা চামচিকাদের শীতঘুমে যেতেই হয়। সাধারণতঃ গাছের কোটরে, গুহা, পরিত্যক্ত খনি, পরিত্যক্ত কুয়ো বা চিলেকোঠায় এদের প্রজাতিভেদে এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে শীতঘুম দিতে দেখা যায়। আবার শীতের তীব্রতার উপর নির্ভর করে শীতঘুমের স্থায়ীত্ব কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে। দলবদ্ধ শীতঘুমের সময় অসংখ্য চামচিকাকে এক স্থানে জট পাকানো অবস্থায় দেখা যায়।
শীতঘুমে অভ্যস্ত অন্যান্য প্রাণীদের মতো কলাবাদুড় বা চামচিকারা শীতঘুমের আগে প্রচুর খাওয়া-দাওয়া করে না। ফলে খুব বেশি চর্বিও দেহে সঞ্চিত হয় না। আবার এরা খাবার-দাবার সঞ্চয় করতেও পারে না। আর তাই অক্রিয় থাকার সময়, এমনকি শীতঘুমের মাঝেও কখনও কখনও জেগে উঠে সামান্য খাবারের সন্ধান করতে হয়। খাবার পেলে ভালো, নইলে কষ্ট করে হলেও এরা নিজেদের কোনওমতে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। মাত্র কয়েক গ্রাম চর্বি সঞ্চয় করে এরা তাই দিয়ে একটানা ছ’মাস পর্যন্ত শীতঘুমে কাটিয়ে দিতে পারে। তবে এই চর্বি হল বাদামি চর্বি বা ব্রাউন ফ্যাট। এই চর্বির বিশেষত্ব হল এটি খুব ধীরে ধীরে জারিত হয়। বাদুড় ও চামচিকার পিঠে এই চর্বি সঞ্চিত হয়। এরা উষ্ণ রক্তের প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও যখন শীতঘুমে থাকে তখন ওরা দেহের তাপমাত্রা প্রচন্ড কমিয়ে দেয়, থেকে ৬পর্যন্ত নেমে আসতে পারে তাশ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনের হারও বিস্ময়করভাবে কমে যায়ওদের স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন যেখানে মিনিটে ৩০০ থেকে ৪০০ বার, সেখানে তা কমে হয়ে যায় মিনিটে ১০ বার! আর একবার দম নেওয়ার পর এক ঘন্টার বেশি সময় দম না নিয়ে থাকতে পারে। ভাবা যায়! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওদের একপ্রকার হরমোন (Hibernation Specific Protein) উৎপন্ন হয় যা ওদের দেহে বিপাকের হার কমিয়ে দেয়। আর তার ফলেই ওদের কম দরকারী অঙ্গগুলো কাজ বন্ধ করে দেয়, আর ওরা ঘুমিয়ে পড়ে।
শীতঘুম বা অক্রিয়তা চলার সময় ওদের স্বাভাবিকভাবে মাঝে মাঝে জেগে উঠতে হয় মূত্রত্যাগ করা ও কিছু খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু শীতঘুম চলাকালীন যদি ওদের কোনও বিপদ আসে তবে ওদের পক্ষে নিজেকে রক্ষা করা বেশ মুশকিল, কারণ প্রতিক্রিয়া দিতে অনেকটা দেরি হয়। জেগে ওঠা মানেই বাড়তি শক্তিক্ষয়। আর তাই কিছু খাবার খাওয়া আবশ্যক। কিন্তু খাবার না পেলে? সত্যিই জীবনের ঝুঁকি থেকে যায়।


v লেডিবাগ (Ladybugs/ Ladybirds)


চামচিকাদের মতো জোটবেঁধে শীতঘুম জমায় লেডিবাগরা। এরা হল একরকমের কীট। পোকার নাম লেডি, সাথে আবার বাগ বা বার্ড দেখে ভ্রূ কুঁচকে ওঠা স্বাভাবিক। আসলে এরা কক্সিনেলিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত অপূর্ব সুন্দর দেখতে একপ্রকার কীট। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এদের নানা প্রজাতির দেখা মেলে। নামে ‘বাগ’ (Bug) থাকলেও এরা মোটেই ছারপোকা জাতীয় প্রাণী নয়, এরা হল বিটল (Beetle) জাতীয় কীট। বেশিরভাগ প্রজাতির রঙ লাল আর তার উপর হলুদ, কালো ছিট। প্রজাতিভেদে লম্বা হয় মাত্র ০.৮ থেকে ১৮ মিমি। মা মেরীকে বলা হয় Our Ladyতা থেকেই এসেছে লেডি। মা মেরীর গায়ে থাকে লাল রঙের সুন্দর গাউন। আর এই কীটের রঙও সাধারণত লাল। এসব থেকেই নাম হয়েছে লেডিবাগ বা লেডিবার্ড। আমেরিকায় লেডিবাগ নাম বেশি প্রচলিত। আর ব্রিটেনসহ পৃথিবীর সর্বত্র লেডিবার্ড নামের প্রচলন। কৃষিবিজ্ঞানীদের কাছে এই কীটের মূল্য অপরিসীম, কারণ ওরা ফসলের ক্ষতিকর অ্যাফিড ও স্কেল ইনসেক্ট খেয়ে চাষির খুব উপকার করে।
লেডিবার্ডদের ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ হতে সময় লাগে মাত্র একমাস। ফলে ওদের প্রায় এক বছরের আয়ুর বেশিরভাগ সময়টাই পরিণত অবস্থায় কাটে। শীতের সময় এরা বাকলের তলায়, পাতার নীচে, গাছের কোটরে, পাথরের খাঁজে, চিলেকোঠায় বা ছাদের নীচে একসঙ্গে জোট বেঁধে নিশ্চল হয়ে যায়। শীতঘুম দেওয়ার উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেলে ওরা ফেরোমন নামক একপ্রকার উদ্বায়ী হরমোন নিঃসরণ করে আরও লেডিবার্ডকে ওই স্থানে আসতে সংকেত পাঠায়। জোটবেঁধে শীতঘুম দেওয়ার ফলে ওরা বেশ কিছুটা তাপ সংরক্ষণ করতে পারে। ওরা শীতঘুমে যায় প্রধাণতঃ শীতকালে ওদের খাবারের অভাব হয় বলে। শীতঘুম চলাকালীন কোনওভাবে যদি পরিবেশের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেওয়া হয় তবে ওদের শীতঘুম কেটে যায়। তখন ওদের খাবারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যদি খাবার অর্থাৎ অ্যাফিড না পায় তবে খিদের জ্বালায় মৃত্যু পর্যন্ত হতে দেখা গেছে।


v ভালুক (Bear – Ursussp)


ভালুকের কথা শুনলেই অলস প্রকৃতির, একটা নাদুস-নুদুস চেহারার ও হেলে-দুলে হেঁটে চলা প্রাণীর ছবি মনে ভেসে ওঠে। ভালুকের নাদুস-নুদুস চেহারার কারণ শরীরে চর্বির সঞ্চয়। আর তা দিয়েই ওরা প্রবল শীতের সময় শীতঘুম দেয়। অবশ্য প্রকৃত শীতঘুম (Hibernation) ওদের হয় না, ওদের অক্রিয়তা (Torpor) দেখা যায়। সব ভালুক নয়, ব্ল্যাক বিয়ার, ব্রাউন বিয়ার আর গ্রিজলি বিয়ারদের মধ্যে অক্রিয়তা দেখা যায়। তবে শীতের হাত থেকে বাঁচতে এরা মোটেই অক্রিয় হয় না, খাদ্যাভাবের জন্যই অক্রিয় হয়। যদিও অক্রিয় থাকার সময় এদের বিপাকীয় হার খুব বেশি কমে না, তবুও যা চর্বি সঞ্চয় করে তা দিয়ে দিব্যি ১০০ দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে। ব্ল্যাক বিয়ারকে তো সাড়ে সাত মাস পর্যন্ত না খেয়ে অক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
অক্রিয় থাকার সময় এদের বেশ আকর্ষণীয় কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন দেহের তাপমাত্রা ৫ থেকে ৮ সেন্টিগ্রেড কমে যায় আর হার্টবিট মিনিটে ৫০ বার থেকে কমে ১০ পর্যন্ত নেমে যায়। অক্রিয় থাকার সময় আরও অনেক প্রাণীর মতো ভালুক জল পান করে না বা মল-মূত্র ত্যাগ করে না, আবার জমিয়েও রাখে না মল-মূত্র দেহে পুনঃশোষিত হয়ে যায়। এই সময় জমানো চর্বি থেকে বাঁচার রসদ সংগ্রহ করে বলে দেহের ওজন ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যায়। কিন্তু অভিনব ঘটনা হল এরা মূত্রের প্রধান উপাদান ইউরিয়ার নাইট্রোজেন ব্যবহার করে প্রোটিন সংশ্লেষ করে যা দিয়ে পেশিকো ও বিভিন্ন অঙ্গের কলাকোষের ক্ষয় পূরণ করে। আরও একটা আশ্চর্য ঘটনা হল, যদি স্ত্রী ভালুকের চামড়ার নীচে পুরো শীতকাল কাটানোর মতো যথেষ্ট চর্বি সঞ্চিত না থাকে তবে নিষেকের ফলে উৎপন্ন ভ্রূণ জরায়ুতে রোপিত (Implantation) হয় না। ভ্রূণ জরায়ুতে পুনঃশোষিত হয়ে যায়। অর্থাৎ বাচ্চার জন্মই আর হয় না! তবে গর্ভবতী ভালুক অক্রিয় থাকাকালীন বাচ্চার জন্ম দিতেই পারে। আর অক্রিয় থাকা অবস্থাতেই তখন সন্তানকে লালন করে। শেষ একটা মজার কথা বলি। ভালুক অক্রিয় অবস্থা কাটিয়ে জেগে ওঠার পর ঝিমুনি কাটাতে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে দেয়। এই সময় ওরা চলাফেরা করে ঠিকই, কিন্তু সাবলীলতা থাকে না। দেখে মনে হতেই পারে মাতাল হয়ে টাল খেতে খেতে হাঁটছে।


v প্রেইরি কুকুর (Prairie Dog – Cynomyssp)


আমেরিকার প্রেইরি তৃণভূমির বাসিন্দা হল প্রেইরি কুকুর। তবে এর নামে একটা মজা আছে – এদের নামের সঙ্গে ‘ডগ’ কথাটা থাকলেও এরা মোটেই কুকুর নয়। এরা হল একপ্রকার ধেড়ে ইঁদুর (Rodent) এদের ডাক অনেকটা কুকুরের মতো বলেই এমন নাম। প্রজাতিভেদে এরা ১২ থেকে ১৬ ইঞ্চি লম্বা হয়। আর ওজন হয় ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি। কানাডা ও মেক্সিকোর তৃণভূমিতেও এদের পাওয়া যায়। তবে এদের বাসস্থান মূলতঃ তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়াযুক্ত স্থান। সাধারণতঃ ২০০০ থেকে ১০,০০০ মিটার উঁচু জায়গায় যেখানে গরমকালে তাপমাত্রা ৩৮ সেন্টিগ্রেডে এবং শীতে মাইনাস ৩৭ সেন্টিগ্রেডে পোঁছে যায়। শিলাবৃষ্টি, তুষারঝড়, বন্যা, খরা, দাবানল ইত্যদির মতো তীব্র প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এদের সহ্য করতে হয়। অবশ্য সব প্রেইরি কুকুরের প্রজাতির শীতঘুম বা অক্রিয়তা দেখা যায় না। সাদা লেজওয়ালা প্রেইরি কুকুরদের শীতঘুম হয়। আর কালো লেজওয়ালাদের হয় অক্রিয়তা। দিনের বেলা এরা ঘাস, ফল, মূল, মুকুল ইত্যদি খায় আর রাত্রিবেলা গর্তে থাকে। শীতঘুম হোক বা অক্রিয়তা, প্রেইরি কুকুর গর্তের মধ্যেই সম্পন্ন করে।


v স্কাঙ্ক (Skunk – Mephitis mephitis, Conepatusleuconotus, Spilogale putorius)


উত্তর আমেরিকা, উত্তর মেক্সিকো ও দক্ষিণ কানাডার এক অদ্ভুত স্তন্যপায়ী প্রাণী হল এই স্কাঙ্ক। বেশ লোমশ হয় এরা। বেশিরভাগ প্রজাতির গায়ে সাদা-কালো ডোরা থাকে। তবে সব প্রজাতির পিঠ বরাবর ডোরা থাকবেই। এরা নিশাচর। এদের ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তি অসামান্য। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি খুব কম। দশ ফুট দূরের জিনিসও ভালোভাবে দেখতে পায় না। আর এজন্যই অনেক স্কাঙ্ক রাতে গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। কিছুটা গন্ধগোকুল বা ভাম বেড়ালের মতো দেখতে এই প্রাণীরা গাছের কোটর, পরিত্যক্ত গর্ত ইত্যদির মধ্যে বাস করে।
স্কাঙ্কদের শীতঘুম না হয়ে অক্রিয়তা (Torpor) হয়। শীতের কবল থেকে বাঁচার জন্য নয়,ওই সময় খাবারের অভাবের জন্য ওরা অক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়। স্কাঙ্করা সর্বভূক হলেও বোলতা, মৌমাছি ইত্যাদি পতঙ্গ ওদের খুব প্রিয়। অক্রিয় থাকার জন্য ওরা আলাদা বাসার খোঁজ করে বা নিজেরাই গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। তারপর বাসার মুখ ঘাস-পাতা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। পুরুষ স্কাঙ্করা একা একা অক্রিয় থাকলেও স্ত্রী স্কাঙ্করা ১০-১২ জন মিলে জড়াজড়ি করে ঘুমোয়। এই সময় ওদের দেহের তাপমাত্রা প্রায় ২০ সেন্টিগ্রেড কমে যায়। স্কাঙ্করা ১০০ দিন পর্যন্ত অক্রিয় অবস্থায় থাকতে পারে।
শেষে স্কাঙ্কদের সম্বন্ধে একটা মজার তথ্য দিই। ওদের পায়ুর দু’পাশে দুটো ছোটো গ্রন্থি থাকে। ওই গ্রন্থিতে বিশেষ একপ্রকার উৎপন্ন হয়। বিপদ বুঝলে ওরা ওই গ্রন্থি থেকে পিচকিরির মতো রস নিঃসরণ করে। রস ১০ ফুট দূর পর্যন্ত ছিটকে যেতে পারে। এই রস তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত হয়। গায়ে পড়লে জ্বালা করতে পারে। চোখে পড়লে সাময়িক দৃষ্টিশক্তি হারানোও অসম্ভব নয়। এই জন্য ভয়ে নেকড়ে, শেয়াল ইত্যাদি খাদক প্রাণীরা স্কাঙ্কদের এড়িয়ে চলে। এই রসের দুর্গন্ধের তীব্রতা এতটাই বেশি যে আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে এর দুর্গন্ধ আমরা অনুভব করতে পারি। আর নাকে এর গন্ধ পৌঁছোলে বমিও হয়ে যেতে পারে।
শুধু এই কয়েকটি প্রাণী নয়, জীবজগতের আরও অসংখ্য প্রাণী শীতের তীব্রতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে কিংবা খাবারের স্বল্পতা বা অলভ্যতার মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে শীতঘুম বা অক্রিয়তার শরণাপন্ন হয়। উল্লেখিত প্রাণীগুলি ছাড়াও এই তালিকায় শামুক, মৌমাছি, কেঁচোর মতো অমেরুদন্ডী প্রাণী যেমন আছে তেমনই অসংখ্য উভচর ও সরীসৃপ প্রাণী আছে। সৌভাগ্যবশতঃ মানুষের শীতঘুম নেই। সবাই যদি কুম্ভকর্ণ হয়ে যেতাম সভ্যতার চাকা থমকে যেত। তাই না?
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল