ভ্রমণ:: বোরাসুর বাঁকপথে - ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়


বোরাসুর বাঁকপথে
ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়

।। প্রথম পর্ব ।।

বারোই জুন যাত্রা শুরু
রাতে দুন এক্সপ্রেসে উঠে খবর পেলুম আজ আর কাল বিহার বন্ধ৷ অনেক হিসেব করে দেখা গেল ট্রেন বিহারের সীমানা পেরোচ্ছে সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ৷ জানি না, কী হবে! আমরা - মানে, আমি আর বুড়োদা একটা কামরায়, দুটো লোয়ার বার্থ৷ তাপস আর জয়া পাশের কামরায়৷ সন্দীপ আমাদের সঙ্গে ভিড়বে দেরাদুনে৷
আজ সারাদিন খুব দৌড়োদৌড়ি গেল৷ ট্রেকিং-এর জিনিসপত্র কেনা, সেগুলো গুছোনো, পুলিশের চিঠি আনা, শেষমুহূর্তে গ্লু-কন-ডি আর স্টোভের পিন কেনা সব মিলিয়ে দিনটা যা গেল! আমার আর এক বন্ধু, এও সন্দীপ, যার উৎসাহে আমার প্রথম ট্রেকিং-এ হাতেখড়ি, এসেছিল স্টেশনে৷ আমাদের ট্রেন আবার থামে চন্দননগরে৷ তাই মা আবার রুটি-তরকারি করে পার্থর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিল৷ ট্রেনের দুলুনি, অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে আলোর ফুটকি দেখা যাচ্ছে... খাওয়াদাওয়া শেষ, ঘুম ঘুম পাচ্ছে; শুয়ে পড়লেই হয়৷

তেরোই জুন ট্রেনের ঝুটঝামেলা
গতরাতে বার কয়েক ঘুম ভেঙেছে৷ স্টেশন এলেই কেন জানি ঘুম ভেঙে যায়৷ ভোর চারটে নাগাদ বার্থে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি, বাইরে তখনও আধো অন্ধকার৷ ভোর হবার আগের আবছা আলোয় ট্রেন একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে৷ ঘুম ভেঙেছে, কিন্তু বার্থ ছেড়ে তখনও উঠিনি৷ কিছু পরে মনে হল যে একটু যেন বেশি সময় দাঁড়িয়ে আছে ট্রেন৷ ধড়মড়িয়ে উঠে বুঝলুম ট্রেনের এই স্থিতাবস্থা সিগনালের জন্য নয়৷ সামনেই শ’খানেক মিটার দূরে একটা স্টেশন, বেশ কিছু লোকজন লাল ঝাণ্ডা লাইনের মাঝে পুঁতে বসে পড়েছে – বিহার বন্ধের একটা ছোট্টো নমুনা৷ আমাদের ভাগ্য এত ভালো যে দুন এক্সপ্রেস-ই প্রথম ট্রেন যে এই বন্ধের কবলে পড়ল! তবু ভালো, কাছেই গোটা দুয়েক গভীর কুয়ো; অন্তত জলের সমস্যা তো মিটল৷ কিন্তু খাদ্যসমস্যা যে প্রকট৷ এদিকে আমাদের সামনের বার্থে বসে একজন প্রচণ্ড মোটা ভদ্রমহিলা অনবরত খেয়ে চলেছেন আর খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ঘুমিয়ে নিচ্ছেন৷ বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামে ধূ ধূ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন থেকে একটা দারুণ সূর্যোদয় আমাদের মনে কোনো ছাপ ফেলতে পারল না ট্রেন ছাড়ার অনিশ্চয়তার জন্য৷
ট্রেন থেকে নেমে তাপসের কামরায় যাওয়া, জল আনা, সূর্যের উদয় থেকে মধ্যগগনে যাওয়া, পুরোনো ট্রেকিং-এর গল্প কোনোরকমে সময় কাটানো আর কি৷ প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ, ঠিক ছ’ঘন্টা পরে, অবরোধকারীদের দয়ায় অবশেষে ট্রেন ছাড়ল৷ স্টেশন ছাড়িয়ে যাবার সময় নামটা দেখলুম চিচাকী৷ বেশ কয়েকজন লোক লাঠি-সোঁটা-বল্লম নিয়ে আর গাদাখানেক পুলিশ সং সেজে দাঁড়িয়ে আছে৷
বিকেলে মোঘলসরাই আর সন্ধের মুখে বেনারস৷ ট্রেনের জানলা দিয়ে বেনারসের গঙ্গার ঘাট; পুরোনো স্মৃতি ভেসে এল সেই নৌকাবিহার, সন্ধেবেলায় আরতি, আর রাত পর্যন্ত ঘাটে বসে আড্ডা, সেই আড্ডায় সেদিন সন্দীপও ছিল... ওর সঙ্গে আবার কতদিন পরে দেখা হবে...

চোদ্দই জুন - অবশেষে দেরাদুন
ভোর রাতে লক্ষ্ণৌ, বিকেলে হরিদ্বার পেরিয়ে ট্রেন যখন দেরাদুনের পথে যেতে শুরু করল, তখনই প্রথম মনে হল আমরা আবার ট্রেকিং-এ যাচ্ছি, এতক্ষণের একঘেয়েমি যেন একটু কাটল৷ একটাই লাইন, ট্রেন থেকে মুখ বার করে দেখলে বোঝা যায় সোজা চলেছে রেললাইন, মাঝে মাঝে একটু ওপরদিকে উঠে গেছে৷ স্টেশনগুলোর নাম বড়ো মিষ্টি৷ রাইওয়ালা হয়ে কাঁসো স্টেশনে থামল৷ ছবির মতো ছোট্টো সুন্দর৷ নিচু প্লাটফর্ম৷ দু’পাশে অল্প জঙ্গল৷ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় ট্রেন থেকে নেমে পড়ার লোভ সামলাতে পারলুম না৷ পরের স্টেশন দইওয়ালা৷ হর্‌‌রাওয়ালা স্টেশন ছাড়িয়ে দেরাদুনে ট্রেন থামল তখন সন্ধে সাতটা৷ গতবারের মতো এবারও থাকা হল ভিকটোরিয়া হোটেলে৷
দেরাদুন শহর কোনোদিনই ঘোরা হয়নি৷ তবু মনে হল, অনেক কিছুই এক রয়ে গেছে৷ সাঁকরির বাস ছাড়বে মীডো হোটেলের সামনে রাজীব ট্রান্সপোর্ট থেকে৷ সন্দীপের সঙ্গে দেখা হোটেলে ঢোকার মুখেই৷ রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ, শুয়ে পড়লেই হয়৷ কাল খুব ভোরে উঠতে হবে৷ গতবারের অভিজ্ঞতা বলে ভোর পাঁচটা থেকে সাঁকরির বাসে উঠে জায়গা রাখতে হবে৷

পনেরোই জুন আজ যাব সাঁকরি
ঠিক ছ’টায় বাস ছাড়ল৷ ঘন্টাখানেক বাস চলেছে কি চলেনি, দাঁড়িয়ে রইল প্রায় আধঘন্টা৷ একটু বাস চলে তো আবার কিছুক্ষণ থামে৷ এইরকম করতে করতে পুরলায় এসে থামল, দুপুর গড়িয়ে গেছে৷ টায়ারে আবার গণ্ডগোল এর মধ্যে৷ ফলে দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না টায়ার ঠিক হয়৷ আরও কিছুক্ষণ পরে বাস ছাড়ল৷ বাসের ড্রাইভার, কণ্ডাকটার, সবাই বেশ নির্বিকারচিত্ত৷ কারুর জীবনে কোনো তাড়া নেই৷ মৌরি, নেটোয়ার হয়ে সাঁকরি পৌঁছল ছ’টা বেজে গেছে৷ কাছাকাছি দোকান থেকে চাল, ডাল ইত্যাদি রেশন কিনে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লুম তালুকার জীপে৷ এখন সাঁকরি থেকে তালুকা পর্যন্ত জীপ যাচ্ছে, সাঁকরি জায়গাটা বেশ বড়ো হয়েছে, অনেক নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে, ট্রেকিং করতে গেলে টাকা দিতে হয়, পোর্টারদের ইউনিয়ন হয়েছে, সভ্যতা হই হই করে এগিয়ে চলেছে৷
বাস থেকে নামতেই সুলুকরামের সঙ্গে দেখা৷ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল৷ আবহাওয়া বাদ না সাধলে আর আমাদের সব্বার শরীর ঠিক থাকলে বোরাসু যাওয়া বোধহয় অসম্ভব হবে না৷ তালুকা পৌঁছলুম সাড়ে সাতটা বেজে গেছে৷ অনেকখানি রাস্তা৷ এখানে এখন গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের বিরাট রেস্ট হাউস তৈরি হয়েছে৷ ডর্মিটরিতে একটা বেড পঞ্চাশ টাকা৷ সাঁকরির মতোই এখানেও অনেক নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে৷ প্রায় সবই কাঠের বাড়ি৷ রাতে পনেরো টাকায় রুটি-ডাল-সবজি, যত খুশি খাও৷ এখানে এখনও বিশেষ ঠাণ্ডা লাগছে না৷ রাতে একটা লেপেই হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে৷ ডর্মে মোট পাঁচটা বিছানা - অর্থাৎ গোটা ডর্মটাই আমাদের৷

ষোলোই জুন তমসা নদীর তীরে
আজ থেকে আমাদের ট্রেকিং শুরু৷ সুলুকরামের ঠিক করা পোর্টার দু’জন আজ সকালে আসবে ওসলা থেকে৷ যাতে দেরি হয়ে না যায়, তাই সন্দীপ, বুড়োদা আর জয়া এগিয়ে গেল৷ আমি আর তাপস পোর্টারদের সঙ্গে যাব বলে থেকে গেলুম তালুকায়৷ আটটা পর্যন্ত একজন মাত্র পোর্টার এল বাহাদুর সিং৷ তালুকা থেকে আরও দু’জন নেওয়া হল, কারণ না হলে দেরি হয়ে যাবে৷ অবশেষে বেরোনো হল ন’টায়৷ সেই পরিচিত পথ৷ তবু মনে ফুর্তি কম নেই৷ আসলে অনেকদিন পরে আবার আমরা একসঙ্গে আসতে পেরেছি৷ সেই কবে প্রায় পাঁচ বছর আগে গিয়েছিলুম ফাচুকান্দি পাস৷ তারপর মাঝে তো সন্দীপের সঙ্গে কারুর দেখাই হয়নি৷ কিছুটা যাবার পর দূরে স্বর্গারোহিনী দেখতে পেলুম৷ সত্যি, কতদিন পরে আবার বরফঢাকা পাহাড়ের চূড়া দেখতে পেলুম৷ আরও কিছু পরে নদীর ধারে নেমে আসতে হল তমসা নদী আমাদের বাঁ দিকে৷ গতবারে এই জায়গায় তাপসের একটা ছবি তোলা হয়েছিল মাথায় স্কার্ফ পরে৷ চড়াই-উৎরাই করতে করতে এসে পৌঁছোলুম গঙ্গাড গ্রামে৷ ডানদিকে চলে গেছে ফাচুকান্দি পাসের রাস্তা৷ সেই দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বিভোর হয়ে তাকিয়ে রইলুম আমরা৷ আসলে ফাচুকান্দি পাসে যাওয়া ছিল আমাদের কাছে এক স্বপ্নের মতো৷ সুলুকরামের ডাকে সংবিত ফিরে রওনা দিলুম সীমার উদ্দেশে৷
বেশ কিছুটা হেঁটেছি, আকাশ হঠাৎ মেঘে ছেয়ে গেল৷ বৃষ্টি নামবে বলে মনে হচ্ছে৷ তাড়াতাড়ি হাঁটতে হল; বেশ কষ্টকর ব্যাপার৷ চোদ্দো কিলোমিটার পথের শেষটুকু তাড়াহুড়ো করা বেশ ঝামেলার৷ দমে মনে হচ্ছে ঘাটতি পড়েছে৷ যাই হোক, অবশেষে সীমায় এসে পৌঁছোলুম৷ রাকস্যাক কাঁধ থেকে নামাতে না নামাতেই ঝেঁপে বৃষ্টি এল৷ আর একটু দেরি হলেই ভিজতে হত৷ একটা ঘর৷ বেশ বড়৷ কাঠের মেঝে৷ বিছানার সংখ্যা দুই হলেও অসুবিধে নেই, আমাদের সঙ্গে ম্যাট্রেস আছে৷ বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে সামনের দোকান থেকে রুটি-ডাল-সবজি খেয়ে এলুম৷ ছোট্টো দোকানটা আগের মতোই আছে৷
বৃষ্টি ধরল কিছুক্ষণ পর৷ আকাশও পরিষ্কার হল আস্তে আস্তে৷ এর মধ্যে আবিষ্কার করলুম আমার ডান পায়ের হাঁটুতে কোনোভাবে লেগেছে৷ ভোভেরান লাগিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই৷ যে সরু পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে আমরা এলাম, সেটার ডানদিকে আমাদের থাকার জায়গা৷ তার উলটোদিকে অর্থাৎ রাস্তার বাঁদিকে একটু নিচে তমসা নদীর কলকল শব্দ কানে আসছে৷ সোজা চলে গেলে পৌঁছনো যায় রুইসারা তাল৷ আর যদি তুমি সামনে একটু এগিয়ে বাঁদিকের সরু কাঠের পুল পেরিয়ে আবার ডানদিকে ঘুরে যাও, তাহলে অনেক অনেকটা এগিয়ে গেলে পৌঁছে যাবে হর্-কি-দুন৷ আমরা সেদিকে যাব কালকে৷
চারিদিকের সব কিছুই কেমন যেন সুন্দর লাগছে, কেমন এক শান্তির পরিমণ্ডলের মধ্যে এসে পড়েছি আমরা৷ হঠাৎ সন্দীপ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে বলল, “আরে, আকাশ পরিষ্কার, আমি চললুম ওসলায়।”
“আমিও যাব,” বুড়োদা তাই শুনে লাফিয়ে উঠল৷
আমি বসে রইলুম পা ছড়িয়ে। এর মধ্যে ভোভেরানের দৌলতে হাঁটু বেশ জ্বালা করছে। ওরা দু’জনে বেরিয়ে পড়ল ওসলার উদ্দেশে৷
ওসলা গ্রামে থাকে সুলুকরাম, ওসলা হল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম৷ পাহাড়ের গায়ে কোনো এক শিল্পী তুলি দিয়ে একটু একটু করে ফুটিয়ে তুলেছে৷ সামনে বয়ে চলা তমসা নদী পেরিয়ে পাহাড়ের ওপরে ওসলা৷ গ্রামবাসীদের আরাধ্য দেবতা দুর্যোধন৷ গ্রামের মাঝখানে অপূর্ব সুন্দর দুর্যোধনের মন্দির৷ অসাধারণ তার কারুকার্য৷ মন্দিরে দুর্যোধনের মুখের ছাঁচ, বুকের বর্মের মতো কিছু জিনিস আছে৷ কিন্তু এখন মূর্তিটা ওসলায় নেই৷ এই মূর্তি পালা করে কাছাকাছি একুশটা গ্রামে ঘোরে৷ এখন এটা আছে জাখোল গ্রামে৷
আমরা তিনজন, আমি, তাপস আর জয়া এখন রোদে বসে আরাম করার চেষ্টায়৷ বন-বাংলোর চৌকিদার ভজন সিং৷ এখন এখানে নেই, সম্ভবত সাঁকরি গেছে৷ তাই আমাদের সঙ্গে এবার দেখা হল না৷ আগের বার বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিল৷ সন্দীপ আর বুড়োদা এল ছ’টা বেজে গেছে৷ তারপর আর কী, ঘরে বসে আড্ডা৷ রাত পৌনে আটটার সময়ও আকাশে বেশ আলো রয়েছে৷ হাঁটুর ব্যথা বেশ বেড়েছে, ভাঁজ করতে গেলে লাগছে৷
আমাদের ঘরের ঠিক উলটোদিকে রাতের খাবার জায়গা৷ ছোট্ট দোকান৷ কাঠের তৈরি৷ মাথার ওপর একটা কাঠের ফ্রেমের ওপরে পাহাড়ি শুকনো ঘাসের ছাউনি৷ দোকানে ঢুকেই বাঁ দিকে কয়েকটা টুল, কয়েকটা কাঠের, কয়েকটা আবার বেতের মতন কিছু দিয়ে তৈরি৷ তার ওপর ছোটো ছোটো রংবেরঙের আসন পাতা আছে৷ তার পাশে কম্বলের মতো, কিন্তু ঠিক কম্বল নয়, বিছানো রয়েছে৷ দোকানের একদম সামনে মাটির উনুনে কাঠের আগুন জ্বলছে৷ মেনু সেই একই - রুটি-ডাল-সবজি৷ দোকানটা যে কার সেটা বোঝা মুশকিল৷ একজন রুটি করছে; হঠাৎ দেখি বাইরে থেকে আর একজন এসে সেও রুটি করতে শুরু করে দিল৷ আমাদের সঙ্গে শুরু হল তাদের গল্প৷ কত দিনের যেন চেনা৷ সেই আগের বারের কথা বলতেই একজন বলে উঠল, “আরে আমি তো তোমাদের চিনতে পেরেছি৷ আগেরবার তো তোমরা চার জন এসেছিলে৷ এখান থেকে হর্-কি-দুন গিয়ে আবার ফিরে এসে ফাচুকান্দি পাস গিয়েছিলে, তাই না?” আমাদের যে কী ভালো লাগল, বলবার নয়৷ সেই কতদিন আগে এসেছিলাম, সেটা এখনও মনে রেখেছে৷
দোকানে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে৷ সবাই এখানকারই লোক৷ আড্ডা বেশ জমে উঠেছে৷ একজন লোক এরই মধ্যে আমাদের খাবার জোগাড় করতে শুরু করে দিল৷ উনুন থেকে গরম রুটি সোজা আমাদের থালায়, এর স্বাদই আলাদা৷ দোকানের ভেতরটা বেশ গরম৷ অন্ধকারের মধ্যে আগুনের আলোয় এক অদ্ভুত পরিবেশ৷ খেয়েদেয়ে সামনের সরু রাস্তা পেরিয়ে আমাদের ঘরে যেতে গিয়েই ঠাণ্ডায় জমে গেলাম৷ আর কোনো কথা নয়, সোজা কম্বলের তলায়৷ আমাদের ঘরে কম্বল ছিল৷ তাই আর স্লিপিং ব্যাগ বার করতে হল না আজ৷ কাল থেকে আসল ট্রেকিং শুরু৷

সতেরোই জুন - হর্-কি-দুনের সবুজ উপত্যকায়
পাহাড়ে ঘুম ভেঙে যায় তাড়াতাড়ি৷ পায়ের অবস্থা একটু ভালো৷ খেয়েদেয়ে বেরোতে বেরোতে সাতটা বেজে গেল৷ পোর্টার দু’জন এসে গেছে বাহাদুর সিং আর রায় সিং৷ বাহাদুরের গ্রাম ওসলা আর রায় সিং থাকে পোয়ানিতে৷ আগে একবার এসেছি৷ তাই চেনা রাস্তায় হাঁটা শুরু হল হর্-কি-দুন-এর উদ্দেশে৷
তমসা নদী পেরিয়ে কিছুটা চড়াই, তারপর মোটামুটি সোজা রাস্তা৷ একটু এগিয়ে নদীর অন্য পারে দেখা যায় এক সুন্দর ঝরনা৷ আকাশ সকাল থেকেই আজ মেঘে ঢাকা৷ ভয় হয় এই বুঝি বৃষ্টি নামল৷ পথের ধারে প্রচুর ফুল ফুটে রয়েছে৷ হলুদ রঙের ছোট্ট ফুল অজস্র৷ চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সাদা ফুলের ছোটো ছোটো ঝোপ৷ যত সময় যাচ্ছে আকাশ তত পরিষ্কার হচ্ছে৷ সন্দীপ, বুড়োদা অনেক দূর চলে গেছে৷ সামনে পাহাড়ের মাথায় বরফ পড়েছে৷ এ বছর মনে হচ্ছে বরফ বুঝি একটু বেশিই পড়েছে৷ আস্তে আস্তে চোখের আড়ালে চলে গেল তালুকা৷ এই তো আকাশ আবার নীল হচ্ছে৷ সাদা মেঘ রয়েছে অল্প অল্প৷ ডানদিকে নিচে বয়ে চলেছে তমসা নদী৷ নেটওয়ারের কাছে সুপিন নদীর সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে নেমে গেছে কোথাও হয়তো কোনো বড়ো নদীর সঙ্গে মিশবে বলে৷ বাঁদিকে পাহাড়ের গা ঘন সবুজ ভেলভেটের মতো৷ তমসার ঝর ঝর শব্দ, ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা, চারিদিকের রংবেরঙের ফুল দেখতে দেখতে এসে পৌঁছোলুম এক দারুণ ঝরনার ধারে৷ ছবি তুলতে গিয়ে দেখি প্রথম রিল শেষ৷ দ্বিতীয় রিল লাগিয়ে যেই না ঝরনার ছবি তুলতে যাব, ব্যস ঘোর বিপত্তি৷ ক্যামেরার শাটার লক৷ ঝরনার ছবি আর তোলা হল না৷ শুধু তাই নয়, হর্-কি-দুন-এর আগে আর কোনো ছবি-ই তুলতে পারব না৷ যাই হোক, কী আর করা যাবে৷ হর-কি-দুন পৌঁছলুম পৌনে একটা নাগাদ৷
জায়গাটায় যেন ফুলের উৎসব৷ কত রকমের আর কত রঙের ফুল দেখে দেখে চোখের আশ মেটে না৷ রডোডেনড্রনও ফুটেছে বেশ কিছু৷ জি.এম.ভি.এন-এর বাংলোয় উঠলাম৷ খেয়েদেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লুম৷ কোনো উদ্দেশ্য নেই, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো আর কী! সামনে অপূর্ব সুন্দর উপত্যকা সোজা চলে গেছে তমসা নদী ধরে যমদ্বার হিমবাহের দিকে৷ ডানদিকে স্বর্গারোহিনীর চূড়াগুলোর ওপর বরফ পড়েছে, তারা এখন মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে৷ যতদূর চোখ যায় ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে জায়গাটা৷ বেশ দেখেশুনে হাঁটতে হচ্ছে যাতে ফুল না মাড়িয়ে ফেলি৷ পাঁচ বছর আগে এখানে এসেছিলুম, তখন এত ফুল দেখিনি৷ ওটা অক্টোবর মাস ছিল, তাই হয়তো৷ পেছন ফিরে দেখলুম মারিন্দা তালের রাস্তা দেখা যাচ্ছে, কাল আমাদের ওই পথেই যাওয়া৷ এখানে বেশ ঠাণ্ডা লাগছে৷ আসলে বাইরে বেরোলেই ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে লাগছে৷ কাল একটু এগোলেই বোধহয় বরফ পাওয়া যাবে৷ বেশি বরফ থাকলে হয়তো সমস্যা হতে পারে৷ যাই হোক, এখন ভেবে লাভ নেই, যা হবার কাল দেখা যাবে৷ বাংলোর বারান্দায় বসে আমরা৷ সামনে স্বর্গারোহিনী উঁকি দিচ্ছে মেঘের আড়াল থেকে, সূর্যাস্তের লাল আভা তাদের চূড়ায়৷
সন্ধে হল প্রায় আটটা নাগাদ৷ ইতিমধ্যে রায় সিং বেশ কিছু কাঠ জোগাড় করে এনেছে৷ আগুনের ধারে বসে আড্ডা, কালকের প্ল্যান, ডান পায়ের হাঁটুতে ভোভেরান লাগানো এরই মাঝে এল রাতের খাবার৷ তারপর আর কী লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম৷ এখনও পর্যন্ত লেপ পাওয়া যাচ্ছে, কাল থেকে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকতে হবে৷

আঠারোই জুন রাথাডোরে বিপর্যয়
ভোরবেলা উঠে এদিক ওদিক একটু ঘোরাঘুরি করতে করতেই বাজল সাড়ে ছ’টা৷ সঙ্গে আনা ম্যাগি নুডলস্ আর চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লুম৷ আজ যেতে হবে রাথাডোর৷ আকাশ ঝকঝকে নীল৷ ঘড়িতে সাতটা কুড়ি৷ বাংলো থেকে কিছুটা নেমে এসে নদী পেরিয়ে শুরু হল চড়াই৷ বেশ খানিকটা চড়াই ভাঙতে হল৷ এ পথে পড়ল অজস্র রডোডেনড্রন৷ প্রথমে চোখে পড়ল হালকা বেগুনি রঙের, তারপর সাদা আর হালকা হলুদ রঙের রডোডেনড্রনও দেখতে পেলুম৷ চারিদিকে পাহাড়ের গায়ে ছোপ ছোপ রং লেগে রয়েছে৷ পেছনে ঘন নীল আকাশের বুকে স্বর্গারোহিনীর ওপর সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে৷ আস্তে আস্তে ট্রি-লাইন পেরিয়ে এলুম৷ দু’ধারে পাহাড়, যদিও এদের মাথায় সেরকম বরফ নেই৷ আমরা চলেছি মাঝের উপত্যকা দিয়ে৷ ডানদিকে এক নদী বয়ে চলেছে নিচে গিয়ে তমসা নদীর সঙ্গে মিশবে বলে৷ জিজ্ঞেস করে জানলুম এই নদীর নাম মারিন্দা গাড৷ আমাদের সঙ্গে চলেছে স্রোতের শব্দ আর এক ছোট্ট পাখি৷ সেই ছোট্ট পাখি যেন আপন মনে খেলতে খেলতে উড়তে উড়তে ডানার ঝাপটায় সাদা রং ছিটিয়ে দিয়েছে সারা পাহাড়ময়, ছোপ ছোপ বরফ তাদের গায়ে৷ প্রায় ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর দেখি নদীটা একটু চওড়া হয়েছে৷ দু-তিনটে বিরাট পাথর নদীর মধ্যে থাকায় বেশ কিছু জায়গা জুড়ে জল জমে রয়েছে৷ এটাই মারিন্দা তাল৷
তাল হিসেবে এটা বেশ ছোটোই৷ ভাবলুম একটু বিশ্রাম নেব৷ তার কী জো আছে, সুলুকরামের তাড়া, “আরে সাব, ইত্‌‌না ধীরে চলেগা তো সাম হো যায়গা৷ ইধার ভালু হ্যায়।”
আসলে আমরা আজ খুব ধীরে ধীরে হাঁটছি৷ জানি যে আজকের রাস্তা খুব কঠিন নয়, কাল থেকে নাকি যা রাস্তা হবে, বোঝা যাবে কার কত দম! তার ওপর সারা জায়গাটাই নরম রোদ্দুরে মাখামাখি, মাথার ওপর নীল আকাশ৷ কতদিন পরে আবার এইরকম ঘন নীল দেখতে পাচ্ছি৷ আমাদের শহরে এইরকম আকাশ তো দেখাই যায় না৷ তাই যেদিকে তাকাই চোখ ফেরাতে পারি না, তারই ফল সুলুকরামের বকুনি৷
আবার হাঁটা শুরু৷ এতক্ষণ তবু একটা রাস্তা ছিল, এখন তার কোনো চিহ্ন নেই৷ নদীর ধার দিয়ে সোজা হেঁটে যাওয়া৷ এখানে ফুটে আছে নানান রঙের ফুল - হলুদ, বেগুনি, সাদা, লাল, নীল হরেকরকমের৷ বেশ কিছু ফুল আমরা হর্-কি-দুন-এ দেখতে পাইনি৷ একটা গাছ বা ঝোপজাতীয়ও কিছু নেই৷ শুধু ঘাস আর মাটির সঙ্গে লেগে থাকা লতাগুল্ম৷ আকাশ এখনও ঘন নীল৷
প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ পৌঁছোলুম রাথাডোর৷ এখানেই আজ তাঁবু ফেলা হবে৷ খুব সুন্দর জায়গা এই রাথাডোর৷ সামনের আবছা পায়ে চলা রাস্তা বোরাসু পাসের দিকে চলে গেছে৷ পাশেই এক ছোট্ট নদী পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে নিজের মনে৷ তার ওপারে উঁচু পাহাড় উঠে গেছে৷ তার ওপর থেকে নেমে এসেছে পাশাপাশি দুটো বরফের চাদর৷ মাঝে মাঝে সেখান থেকে বরফ খসে পড়ছে, গড়াতে গড়াতে এসে পড়ছে মারিন্দা গাডের জলে৷ কিছু জায়গা ছাড়া সবুজের চিহ্নমাত্র নেই৷
আজ প্রকৃতি আমাদের সঙ্গে৷ চারিদিকে শুধু ভালো লাগা৷ হাঁটছি আমরা মনের আনন্দে৷ একটা জায়গা দেখি একটু ফাঁকা, নরম সবুজ ঘাসে মোড়া৷ মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে কয়েকটা বড়ো বড়ো পাথর৷ এটাই রাথাডোর৷ রাকস্যাক নামিয়ে রেখেছি সবে৷ ভারী স্যাক নামাতে পেরে মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল একটা শব্দ ‘আঃ’৷ একটু ক্লান্ত হলেও শরীর-মন বেশ তাজা৷
সুলুকরাম হাতছানি দিয়ে ডাকল৷ সামনে একটু বাঁ দিকে কোনাকুনি আঙুলের নির্দেশ৷ ‘উয়ো হ্যায় বোরাসু পাস!
লাফিয়ে এসে ঘিরে ধরি আমরা সবাই সুলুকরামকে৷ দূরে, অনেক দূরে একটুখানি দেখা যাচ্ছে বোরাসুর চূড়া৷ তারই একপাশে কোথাও বোরাসু পাস, ঘাপটি মেরে বসে আছে৷ আমাদেরই প্রতীক্ষায়! এক বিহ্বল আবেশে রাথাডোর থেকে দেখলুম প্রথম বোরাসু৷ সূর্যের আলোয় আবছা হওয়া রহস্যময় বোরাসু!
তাঁবু খাটিয়ে ফেলা হল৷ এবার ঠাণ্ডার মধ্যে একটু জমিয়ে কফি না খেলেই নয়৷ স্টোভ আর তার সরঞ্জাম বেরিয়ে এল এদিক ওদিক থেকে৷ তারপরই সর্বনাশ! যাকে বলে একেবারে ঘোর বিপর্যয়! স্টোভের ওয়াশার লাগাতে গিয়ে সেটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল৷ খুঁজে দেখা গেল আর কোনো ওয়াশার নেই৷ আমাদেরই ভুল৷ এই সামান্য জিনিসটার যে এত দাম, সেটা যে কেন আমরা খেয়াল করিনি... এবার কী হবে ভাবতে পারলুম না৷ সেই কথায় আছে যে মানুষ ঠেকে শেখে৷ আর আমরা এমন ঠেকে শিখলুম সারাজীবন মনে থাকবে৷ হয় ফিরে যেতে হবে, আর না হয় খুব ঝুঁকি নিয়ে এগোতে হবে৷ এখানে বা সামনে অন্তত দু’দিন কাঠ পাওয়া যাবে না৷
জয়া কোথা থেকে একটা ছেঁড়া কাপড় জোগাড় করে ওয়াশার তৈরির কাজে লেগে পড়ল৷ আমি পায়চারি করতে শুরু করলুম৷ এতদিন পরে পাহাড়ে এসে বোরাসু পাস কি তাহলে যেতে পারব না? সন্দীপ দূরে একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল৷ বুড়োদা একদৃষ্টিতে পাহাড়ের গায়ে বরফের দিকে চেয়ে রয়েছে৷ বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল৷ অনেকক্ষণের চেষ্টায় জয়া কোনোরকমে একটা ওয়াশার তৈরি করে ফেলল৷ আমরা সব লাফিয়ে উঠলুম যখন স্টোভ জ্বলল৷ একটু নিশ্চিন্ত৷ কফি আর ম্যাগি খেয়ে ভাবতে বসলাম এরপর কী হবে? কারণ এই ভাবে তো সামনের তিনদিন স্টোভ জ্বালানো মুশকিল৷ যদি না জ্বলে তাহলে ঘোর বিপত্তি৷ শুধু শুকনো খাবার, মানে বিস্কুট আর চানাচুর খেয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটব কী করে?
সুলুকরাম আর রায় সিং নিচে নেমে গেল যদি কিছু কাঠ পাওয়া যায়৷ আমরা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি; কী করব কিছু বুঝে পাচ্ছি না৷ মাথায় মাঝে মাঝে কিছু উদ্ভট ভাবনা আসছে, যেগুলো দিয়ে আর যাই হোক ট্রেকিং করা সম্ভব নয়৷ এর মধ্যে বুড়োদার সেই বৈপ্লবিক প্রস্তাব৷
“আরে কোনো ব্যাপার নয়,” বুড়োদার ঘোষণা, “আমার মাথায় একটা ব্যাপক প্ল্যান এসেছে।”
“আবার কী প্ল্যান? তাপসের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি, তারপর আমার দিকে ফিরে, “এত তাড়াতাড়ি অলটি হলে তো মুশকিল!' অলটি মানে অলটিচিউড সিকনেস্৷
“আরে, প্রত্যেকে স্যাকের মাথায় চারটে বড়ো কাঠ বেঁধে নেব৷ পাঁচ জন আছি, পাঁচ দিন চলে যাবে৷ কী বল?
“হ্যাঃ৷ কোনো আইডিয়া আছে? একেকটা কাঠের ওজন প্রায় এক কিলোর ওপর৷ আমাদের স্যাকের ওজন অলরেডি চোদ্দো-পনেরো কিলো হবে৷ তার ওপর আরও পাঁচ কিলো, বইতে পারবে!! আড়চোখে তাকিয়ে তাপসের গম্ভীর মন্তব্য৷
“ওরে বাবা, না না, এমনিতেই বড্ড ভারী লাগছে... তার মধ্যে কী ঠাণ্ডা! বুড়োদার তৎক্ষণাৎ উত্তর৷
পাহাড়ে এলে সন্দীপের মধ্যে মাঝে মাঝে আবার একটু সন্ন্যাসী সন্ন্যাসী ভাব জাগে৷ উদাসভাবে তাকিয়ে রইল৷ ভাবটা যেন ‘কী আর করা যাবে...
ঠাণ্ডা বাড়ছে, সূর্যের তেজও কমছে৷ এই জায়গাটায় যেন একটু বেশি হাওয়া৷ বেশ কিছুক্ষণ পরে রায় সিং ফিরে এল বিরাট লম্বা এক কাঠ নিয়ে৷ ঐকিক নিয়ম দিয়ে আমি আর তাপস বার করে ফেললুম যে অন্তত তিনবার রান্না করা যাবে এই কাঠ দিয়ে৷ তাহলে তিন দিন রান্না করে খাওয়া, আর এক-দু’দিন শুকনো খাবার মনে হয় কষ্ট করে হয়ে যাবে এ যাত্রায়৷ রায় সিং-এর কাছে শুনলাম সুলুকরাম হর্-কি-দুন চলে গেছে ওয়াশারের খোঁজে৷
বিকেল পাঁচটা নাগাদ আবার রান্না চাপাতে হল, কাঠের আগুনে৷ রায় সিং তাঁবুর মধ্যে, বাহাদুর আর আমরা কাঠের আগুন নিয়ে কসরত করছি যাতে আগুন নিভে না যায়৷ সুলুকরাম ফিরে এল কিছু পরে, আরও কিছু কাঠ নিয়ে৷ খিচুড়ি তৈরি৷ এই অবস্থায় খিচুড়ির স্বাদ যেন পোলাও-এর মতো লাগল৷
রাথাডোরে আমরা যেখানে তাঁবু ফেলেছি, তার কাছেই একটা পাথরের ঘর আছে; ঘর মানে স্লেটের মতো পাথরের ওপর পাথর চাপিয়ে একটা পাথরের ইগলু তৈরি করা হয়েছে৷ ইগলুর মতনই হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়৷ বেশ কিছু কাঠ জোগাড় হয়েছে, রাতের খাওয়াও শেষ৷ ঠাণ্ডার প্রকোপও বাড়ছে৷ রান্নার আগুন প্রায় নিভু নিভু হাওয়ার ধাক্কায় কমলা-হলুদ আগুনের ফুলকি উড়ে বেরিয়ে কালো অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে৷ মাথার ওপরে ঘন কালো আকাশে হাজার হিরে ঝকমক করছে৷ সামনের পাহাড়ে সাদা বরফের সেই আচ্ছাদন দু'টো জড়ামুড়ি করে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ গল্প আর ঠিক জমছে না৷ সাঁই সাঁই হাওয়ার শব্দ, দূরে ঝোপঝাড়ের মাঝে মাঝে হয়তো কোনো নিশাচর প্রাণীর গা ঘষার হালকা আওয়াজ৷ পাশে মারিন্দা গাডের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর নেই৷ সে এখন ফিসফিসে স্বরে বলে, ‘এবার শুয়ে পড়ো, সামনের রাস্তা অনেক লম্বা আর কঠিনও কিন্তু৷ ঘুমিয়ে চাঙ্গা হয়ে যেতে হবে সেই বোরাসু গিরিবর্ত্মে, বরফের রাজ্যে...।’
সন্দীপ এতক্ষণে সন্ন্যাসী ভাব ছেড়ে বলে উঠল, “অনেক হয়েছে৷ আমি চললুম পাথরের ঘরে, ভোরবেলার আগে আমাকে কেউ ডাকবে না।” মুহূর্তের মধ্যে সন্দীপ হাওয়া!
সুলুকরাম, রায় সিং আর বাহাদুর রয়েছে একটা ফোর মেন টেন্টে৷ কালকে আমাদের যেতে হবে শ্যাওড়া বীডা৷ জয়া একটু যেন চুপচাপ হয়ে গেছে হঠাৎ! ন্যাকড়া দিয়ে ওয়াশার তৈরি করে ও এখন আমাদের হিরো! তাপসের ভ্রূ কোঁচকানো মনে হচ্ছে! হয়তো কালকের ব্যাপারে চিন্তায় আছে...
সবার শেষে আমি আর বুড়োদা যখন পাথরের ইগ্‌‌লু-কাম-স্যুইটে ঢুকলুম, সন্দীপ ঘুমে কাদা৷
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____
ফোটোঃ তাপস মণ্ডল

ভ্রমণ:: ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮(২য় পর্ব) - আইভি দত্ত রায়

আগের পর্ব এখানে - প্রথম পর্ব

ডোডিতাল-দারোয়া পাস ট্রেক ২০১৮
আইভি দত্ত রায়

।।  দ্বিতীয় পর্ব ।।

সকাল সকাল উঠে বেরোনোর তোড়জোড় শুরু করেও বেরোতে সেই ন’টা বাজতে পাঁচ। আমার কিছুটা উদ্বেগ ছিল, কাল এখান থেকেই উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর হু...ই উঁচুতে একটা গিরিশিরার ঢেউখেলানো অবয়ব দেখিয়ে বিপিন বলেছিল ঐখানে যেতে হবে আমাদের। ওটাই ‘দারোয়া টপ’ আর তার পাশের খাঁজটাই ‘দারোয়া পাস’। সুতরাং, কত উঁচুতে চড়তে হবে, কত সময় লাগবে, রাস্তা কেমন – এইসব ভাবতে ভাবতে হন্টন আরম্ভ করলাম। আমি একটু আস্তে হাঁটি বলে সবার আগে হাঁটা শুরু করতে চেষ্টা করি। রাস্তায় বসি না, হাঁপিয়ে গেলে দাঁড়াই, জল খাই, আবার চলি। প্রথম চার কিলোমিটার রাস্তা ডোডিতালের ফিডার নালার পাশ বরাবর উপরে উঠে গেছে দু’পাশের দু’টো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে। মাঝারি চড়াই। পাথরের উপর দিয়ে কখনও নালা আমাদের ডান পাশে আবার কখনও বাঁ পাশে। যদিও নালার জলধারা খুব চওড়া নয়; নালার খাতের সিংহভাগ জুড়ে আছে বিশাল বিশাল বোল্ডার আর বিরাট বিরাট গাছের দেহাংশ। শুনলাম, ২০১৩ সালের আগে এই নালা নাকি আরও চওড়া ছিল। ২০১৩-য় এই অঞ্চলে হাই অলটিচিউড গ্লেসিয়াল লেকগুলোর ওপর বেশ কয়েকটা মেঘ ভাঙা বৃষ্টির ঘটনা ঘটে। কেদার মন্দির বিপর্যয়ের কথা নিশ্চয় মনে আছে? এর ফলস্বরূপ আশেপাশের প্রায় সব উপত্যকাগুলোতেই নদী-নালাগুলো ফুলেফেঁপে প্রচুর পরিমাণ ডেব্রিস (বিশাল বোল্ডার, পাথর, বড়ো গাছ, ইত্যাদি) নিয়ে নিচে নেমে আসেএই ডেব্রিস আমরা ডোডিতালের ফিডার নালার মুখেও দেখেছি, এমনকি তালের জলের নিচেও জমে থাকতে দেখেছি। ডোডিতালের বিস্তার এবং গভীরতাও বেশ খানিকটা কমে গেছে এর কারণে।
ওহ! এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, উত্তরকাশী পৌঁছে ভাগবতের অফিসে বসে কথাবার্তার সময় একটা খবর পেলাম যে গঙ্গা নাকি গোমুখ থেকে বেরিয়ে তার বয়ে চলার দিক পরিবর্তন করে ফেলেছে। মানে? মানে হল - গঙ্গা গোমুখ থেকে বেরিয়ে গঙ্গোত্রী হিমবাহের বাঁ দিক বরাবর বইত (তপোবনের গিরিশিরার নিচ দিয়ে), কিন্তু এখন সে ঠিক উলটো দিক দিয়ে বইছে (নন্দনবনের গিরিশিরার নিচ দিয়ে)। অর্থাৎ, তপোবন পৌঁছোতে হলে গঙ্গোত্রী হিমবাহ পার হওয়ার জন্য যে দিক দিয়ে হিমবাহের উপর উঠতে হত সেখান দিয়েই গঙ্গা এখন বইছেন। কারণ কী এমন অদ্ভুত ঘটনার? কারণ সেই মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। এটা হয়েছিল মাউন্ট শিবলিংএর গিরিশিরার উপরে অবস্থিত ‘নীল তাল’-এর ওপর। ফলে নীল তাল ফেটে বিপুল পরিমাণ ডেব্রিস নিচে নেমে সোজা সদ্যোজাত গঙ্গায় পড়ে গঙ্গার গতি রুদ্ধ করে দেয়। কিন্তু একমাত্র ৺মহেশ্বর ছাড়া যার গতি আজ অবধি আর কেউ রুদ্ধ করতে পারেনি, সামান্য ‘বোল্ডার’ তার কী করবে? সুতরাং সুরধুনী আপন খেয়ালে নিজের পথ নিজে করে নিলেনআধ কিলোমিটার-তক ঐদিক দিয়ে বয়ে এসে নিজের পুরোনো পথের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। গঙ্গা পার করিয়ে অভিযাত্রীদের তপোবনের নিচে পৌঁছে দেবার জন্য রোপ ওয়ে বসছে সম্ভবতঃ এটা কেবল অভিযাত্রীদের জন্যই হবে, কারণ এই যাত্রাটাও কতটা নিরাপদ হবে সে ব্যাপারে এজেন্সির লোক, গাইড, পোর্টার সকলেই সন্দিহান। এক ঝলক নিজেদের ২০১২-র তপোবনে আসার কথাটা মনে পড়ল। হিমবাহে ওঠার একটু আগে একটা সমতল জায়গা ছিল, দেরি হয়ে গেছিল বলে আমরা ঐখানেই সেই রাতের মতো তাঁবু লাগিয়েছিলাম। সেখান দিয়ে এখন গঙ্গা বইছে!!!

ডোডিতাল ছেড়ে দারোয়া পাসের পথে
যা হোক, স্মৃতি ছেড়ে বাস্তবে ফিরি। সামনে দুটো খচ্চরের পিঠে মাল বোঝাই। আমরা পর পর লাইন দিয়ে পাথরের খাঁজ-ভাঁজের মধ্যে দিয়ে চলেছি – নিজেদের হঠাৎ কেমন প্রাচীন ভিনদেশীয় বণিকদের মতো মনে হচ্ছিল, যারা অনেক দূর দেশ থেকে বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে, কঠিন গিরিবর্ত্ম পেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে সওদা চাপিয়ে বাণিজ্যে আসত। জয়া শুনে বলল, “ঠিকই আছে। আমরা কষ্ট বেচে একটু আনন্দ কিনতে যাচ্ছি – সে বাণিজ্যই তো হোল।” চার কিলোমিটার চলে একটু থামলাম। হালকা খাওয়া-দাওয়া, চা খাওয়া হল। এখান থেকে পাস চোখে পড়ল এখনও দুই কিলোমিটার চলতে হবে, উঠতে হবে আরও খানিকটা উপরে। তবে কোথাওই রাস্তা ভীষণ খাড়া নয়। সারা রাস্তায় ঘাস জমি, ফুল, গাছ রয়েছে। গাছের মধ্যে রডোডেনড্রনই প্রধান হাঁটতে কষ্ট হয় না। এখানেও বুনো ফুল অজস্র ফুটে আছে। বিপিন বলল আর ক’দিন পর এই উপত্যকায় একরকম ফুল ফুটবে যার গন্ধ নাকে গেলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, ঘুমিয়েও পড়তে পারে। নিচের বনে রডোডেনড্রন ফোটা শেষ, কিন্তু এখানে উচ্চতার জন্য অজস্র ফুটে আছে। চললাম টুক টুক করে। কিলোমিটার খানেক বাকি থাকতে আস্তে আস্তে চোখের ডান কোণ দিয়ে ফুটে উঠল প্রথমে ব্ল্যাক পিক, এরপরেই বন্দরপুঞ্ছ ঠিক পাস-এ ওঠার মুখে তিরিশ-চল্লিশ মিটার মতো রাস্তা ঝুরো পাথর মাটির। এই ধরনের রাস্তাতে আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ নই, বড্ড জুতো পিছলে যায়। বিপিন সাহায্য করল। বাবুয়া পিছন থেকে আওয়াজ দিল – ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে চলিতে পারি না’। দিক্‌ গে! আমি তো নির্বিঘ্নে উঠে এলাম পাস-এর ওপর। উফফ্‌! শেষ অবধি পৌঁছোতে পারলাম! বাঁ দিকের ছোট্ট একটা ঢিপি পেরিয়ে উঠে এলাম গিরিপথ-এর মাথার ঢালু ঘাসজমিতে।

ওই ইংরিজি U অক্ষরের মতো দেখতে নিচু জায়গাটাই দারোয়া পাস
পাসে পৌঁছোনোর পথে
উঠেই তাকালাম উত্তর-পূর্ব কোণে, ব্ল্যাক পিক এবং বন্দরপুঞ্ছ এখন আরও পরিষ্কার। পাসে ওঠার ঠিক আগেই ডান দিকে একটা পায়ে-চলা পথ উলটো দিকে চলে গেছে। বিপিন বলল ওটা ‘বামসারু পাস’ যাবার রাস্তা। বামসারু পাসও দারোয়া পাসের মতো গঙ্গা ভ্যালির সঙ্গে যমুনা ভ্যালিকে জুড়েছে। ঘড়ি বলছে একটা কুড়ি। যাক্‌, খুব একটা খারাপ হাঁটিনিনিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়ালাম। এবার পুজোটা সেরে নেবার পালা। আলাদা করে কাজু, কিশমিশ, আঞ্জীর, চকোলেট এনেছিলাম, ডোডিতালের মন্দিরের পূজারির থেকে একটু ধুনো-ধূপও চেয়ে আনা হয়েছিল। ওখানে দেখলাম একটা নরম মাটির গোলাকার জায়গায় গোছা গোছা হলুদ ফুল ফুটে আছে। আমার মনে হল এইরকম একটা জায়গার পাশেই প্রসাদটা রেখে ধুনো-ধূপ জ্বালিয়ে দিলে আর আলাদা করে ফুল তুলতে হবে না। সেইমতো পুজো সারা হল, প্রসাদ বিতরণও হল। বিপিন ওখান থেকেই খানিকটা নিচে আমাদের ‘কানসার বুগিয়াল’ দেখাল। ওইখানেই তাঁবু লাগাতে হবে। কানসার হল যমুনা উপত্যকার একটি পরিচিত বুগিয়াল। অন্য বুগিয়ালগুলোর মধ্যে ‘বায়াংকুলা’, ‘সীমা’ – এরাও নামী। দারোয়া টপের উত্তর দিকের ঢালে দারোয়া পাস আর কানসার টপের উত্তর দিকের ঢালে কানসার বুগিয়াল। বুগিয়ালের জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে গিরিখাতের দিকে। খাতের উলটো দিকেই বিশাল বন্দরপুঞ্ছ পর্বতপুঞ্জ। শৃঙ্গগুলির পিছন দিকটা দেখা যায় এখান থেকে। আর দেখা যায় ভয়ংকর খাড়াই ঢালগুলো। বেশিটাই পাথুরে ঢাল, মধ্যের খাঁজগুলোতে বরফ জমে আছে।

পাসের ওপর
বিপিনের তাড়ায় ঢাল বেয়ে নেমে চলতে লাগলাম ক্যাম্পসাইটে। এও প্রায় এক-দুই কিলোমিটার মতো পথ। নিচের ভ্যালি থেকে মেঘ উঠে আসছিল, তাই বিপিন চেষ্টা করছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁবু লাগিয়ে ফেলা যায়প্রচণ্ড হাওয়াও চলছিল। এসব জায়গায় আবহাওয়ার কোনো ভরসা নেই, হঠাৎই বিগড়ে যেতে পারে। আমাদের তাঁবু-টাবু গুছিয়ে দিয়ে বিপিন যাবে আমাদের পরদিনের পথ অগ্রিম পরীক্ষা করে আসতে, যেটা কানসার টপ পেরিয়ে গিরিশিরার দক্ষিণ ঢাল বরাবর। ওখানে একটা বড়ো, গভীর নালা আছে। যদি ঐ নালায় বরফ থাকে, তবে সেখান দিয়ে খচ্চর নিয়ে যাওয়া মুশকিল হবে। তখন বিপিনকে বিকল্প রাস্তা দিয়ে আমাদের নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে পথের দৈর্ঘ্য বাড়বে। যেহেতু এই পথে এই মরসুমে আমরাই প্রথম দল, তাই রাস্তার অবস্থা সম্পর্কে আগাম কোনো খবর নেই আমাদের কাছে। কিছুদিন আগে টাটা-র একটা দল বরফের জন্য নালা পেরোতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং আগে থেকে রাস্তা দেখে আসা বা রুট রেইকি করা খুবই জরুরি।
ক্যাম্প সাইট-টা খুব সুন্দরসবুজ ঘাসে মোড়া প্রায়-সমতল একটা চাতাল। ঘাসে বিছিয়ে আছে নীল, হলুদ, গোলাপি ছোট্ট ছোট্ট ফুল। একটু নিচে দু’দিক দিয়ে সরু নালা তিরতির করে বয়ে যাচ্ছেচাতালটার সীমানা বরাবর টানা রডোডেনড্রন ঝোপ - গোলাপি, সাদা। ছোট্ট অফ হোয়াইট রডোডেনড্রনের একটা প্রজাতিও প্রচুর ছড়িয়ে আছে। মধ্যে মধ্যে আবার জুনিপার ঝোপও আছে। পূর্বদিকে পাস-এর দেওয়াল, উত্তরে বিশাল বন্দরপুঞ্ছ, দক্ষিণে দারোয়া টপ-এর গিরিশিরা আর পশ্চিমে ক্রমশঃ ঢালু হয়ে বুগিয়াল নেমে গেছে অনেক নিচে, আর দূরে একটা গিরিশিরার ছোটো ছোটো মাথাগুলো উঁকি দিচ্ছে। যদিও বন্দরপুঞ্ছ-এর মাথায় মেঘ জমেছে, ভালো দেখা যাচ্ছে না, তবুও যা দেখেছি তাতেই আমরা মোহিত। কাল এখানেই বিশ্রাম নেব। আশা করি পরিষ্কার আকাশে একটা দারুণ সূর্যোদয় দেখতে পাব। রোদ থাকতে থাকতে নালার ঠাণ্ডা জলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে নিলাম। গত তিন দিন পায়ে জল লাগেনি, পা-টা ধুয়ে খুব আরাম হল। হালকা স্ন্যাকস নিচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি পশ্চিম দিগন্তে টুকটুকে লাল সূর্যটা ডুব দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সামনের পাহাড়ের সারির পিছন দিকের মেঘগুলো একটা গোলাপি বলয় তৈরি করেছে যেন তাদের মাথার পিছনে। অনবদ্য! ছবি তুললাম। যদিও জানি না যে, সেই লালচে গোলাপি মায়াবি আলোটাকে আমার ফোনের ক্যামেরা ধরতে পারল কিনা ঠিকঠাক। কিন্তু আমার মনের ক্যামেরাতে এ আলো ধরা থাকবে চিরকাল আর আমাকে লোভ দেখাবে বারবার ফিরে আসার জন্য।
আজ বিশ্রাম। তাই ওঠার তাড়া ছিল না। গাইড, খচ্চরওয়ালা, খচ্চর সবাই ক্লান্ত। এই বিশ্রামটা সবারই দরকার ছিল। কাল আবার লম্বা হাঁটা। আমি উঠেছি সকলের আগে। বেরিয়ে গেছি তাঁবু থেকে, যদি সূর্যোদয়টা দেখতে পাই - এই আশায়। কিন্তু আকাশ একটু মেঘলা। উপরন্তু পূর্বদিকে পাস-এর গিরিশিরার আড়াল থাকায় সূর্য একটু উপরে না উঠলে দেখতে পাব না বুঝলাম। একটু পরে আমাদের মাথার ওপরের আকাশ পরিষ্কার হল ঠিকই, সূর্যকেও গিরিশিরার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। কিন্তু বন্দরপুঞ্ছ-এর গিরিশিরা ধোঁয়াশায় ঢাকা। নিচের পশ্চিমাকাশও তাই। কাল যে গিরিশিরাটার পিছনে সূর্যকে অস্ত যেতে দেখেছিলাম সেটাকে দেখতেই পাচ্ছি না। অনেক বেলাতেও দৃশ্যপট পরিষ্কার হল না। বিপিনকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল সম্ভবত আশেপাশের কোনো পাহাড়ের জঙ্গলে আগুন লেগেছে, না হলে এমন ধোঁয়াশা হওয়ার কথা নয়আমাদের স্লিপিং ব্যাগ এবং অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র রোদে দিলাম। ছোটোখাটো কিছু জিনিস ধুয়েও দিলাম। জল বরফগলা, হাত কেটে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। বাবুয়ার ফেঁসে যাওয়া স্লিপিং ব্যাগের কল্যাণে ওর নিজের তো পালক-ছাড়ানো মুরগির মতো অবস্থা, সঙ্গে সারা টেন্ট পালকে ভর্তি হয়ে আছে। ও বসল সেটাকে ঠিক করবে বলে।


আজ আকাশ আর পরিষ্কার হল না। হঠাৎ দেখি কানসার টপের পিছন থেকে মেঘের দল হালকা চালে উপরে উঠছে। আমি দেখলাম হালকা সাদা মেঘ, হাওয়ার সঙ্গে উড়ে যাবে। কিন্তু বিপিন ভ্রু কুঁচকে বলল – আজ তাড়াতাড়ি মেঘলা হয়ে যাবে। আমার ঠিক বিশ্বাস হল না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সত্যিই এরপর থেকে ক্রমাগত মেঘের দল হানা দিতে থাকল। একেকবার তো এমন ছায়া হয়ে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। মাঝে মাঝেই তেড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে তেমন কোনো কাজ নেই, তাই তাঁবুর আশেপাশেই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। জীবনের পথ মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কিন্তু এখানে পথ আক্ষরিক অর্থেই ‘কুসুমাস্তীর্ণ’। সারা বুগিয়ালের ঘাসজমি ছোটো ছোটো বিভিন্ন রঙের ফুলে ছেয়ে আছে, যেন সবুজ ভেলভেটের কাপড়ে চুমকি বসানো। মন না চাইলেও তাদের মাড়িয়েই চলতে হবে। বুগিয়ালের ধার বরাবর রডোডেনড্রনের নেকলেস, সুন্দরী বুগিয়াল যেন জড়োয়া গয়নায় সেজেছে। এখান ওখান দিয়ে জলধারা বয়ে চলেছে – বুগিয়ালের লাইফ লাইন। জলের ধারার পাশ বরাবর বড়ো বড়ো হলুদ ফুল গোছায় গোছায় ফুটে আছে। কঠিন চড়াই, রুখুসুখু প্রান্তর পেরিয়ে আসা অভিযাত্রীর কাছে বুগিয়াল যেন একখন্ড মরূদ্যান। ভেড়াওয়ালারা আষাঢ় মাসের প্রথমে তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে চলে আসবে বুগিয়ালে। মাস তিনেক থেকে শীতের শুরুতে গ্রামে ফিরবে। এই তিন মাস ভেড়াগুলো পর্যাপ্ত কচি ঘাস খেয়ে তাগড়া হবে। আমাদের খচ্চরওয়ালা লব এই ভেবেই আশ্বস্ত যে ভেড়াওয়ালারা আসার আগেই আমরা এসেছি, ওর খচ্চররা ভালো করে খেতে পাবে; নয়তো ভেড়ার পাল চড়তে শুরু করলে একটু ঘাসও বাঁচবে না। আপাতত ও খচ্চরদের একটু দূরে চরাতে নিয়ে গেছে। এই উচ্চতায় পাখির সংখ্যা খুবই কম, যে ক’জন আছে – পুঁচকে পুঁচকে – তারা রডোডেনড্রনের ঝোপেই থাকে। বড়ো পাখির মধ্যে সামান্য কিছু সংখ্যক চৌ আর কিছু দাঁড়কাক হেঁড়ে গলায় ডাকতে ডাকতে বুগিয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা উড়ে বেড়াচ্ছে। ভেড়াওয়ালা, অভিযাত্রী - এদের থেকেই খাওয়াদাওয়া পায় বোধহয়। শীতে হয়তো নিচের দিকে চলে যাবে। ডোডিতালেও প্রচুর দাঁড়কাক দেখেছি। যা হোক, এখানকার পাখিরা পুঁচকে হলেও গলার আওয়াজ কিন্তু বেজায় তীক্ষ্ণ। তাদের কিচিরমিচির সারাক্ষণই শোনা যায়। কাল সারা রাত টংক টংক – নাইটজার-এর ডাক শুনেছি। কয়েকরকম প্রজাপতি দেখছি উড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ ফড়ফড় আওয়াজে পিছনে তাকিয়ে দেখি বিপিনদের তাঁবুর সামনে একটা দাঁড়কাক একটা পলিথিন প্যাকেট নিয়ে টানাটানি করছে। উফফ! ওদের তাঁবুতে কেউ ছিল না, ওখানেই রান্নাবান্না হচ্ছে। সুতরাং সুযোগসন্ধানী দণ্ডবায়স ওখানেই হানা দিয়েছে। আমি উঠে দাঁড়াতেই ওটা প্যাকেট ছেড়ে উড়ে গেল, আর প্যাকেটটা যেহেতু খালি ছিল তাই সেটা হু….স করে গড়িয়ে চলতে লাগল হাওয়ায়। কোনোমতেই প্লাস্টিক উড়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আমি ছুটলাম ওটাকে ধরব বলে। এর মধ্যে জয়া তাঁবু থেকে বেরিয়ে ধরল ওটাকে।
ভেবেছিলাম ব্রেকফাস্ট করে একটু দারোয়া টপের দিকে যাব। কিন্তু ব্রেকফাস্ট দেরিতে হওয়ায় লাঞ্চ-এর তৈয়ারির সময় হয়ে গেল। এখন বিপিন আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলে লাঞ্চ–ও অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই লাঞ্চ সেরে যাওয়াই ঠিক হল। দেড়টা নাগাদ রওনা দিলাম টপের উদ্দেশে। যতদূর পারি যাব। টুক টুক করে উঠতে লাগলাম উপরে, আমি আর জয়া। বাবুয়া আসেনি। কিছুদূর পূব দিকে চলার পর আমাদের ডান দিকে দারোয়া টপের অবয়ব পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠতে লাগল। গিরিশিরায় ওঠার একটু আগে বিপিন আমাদের মুখোমুখি একটা উঁচু হাম্প দেখিয়ে বলল যে ওটা নাকি ‘বেবি দারোয়া টপ’দেখলাম এই ঢিপিটাই ক্রমশ ওপরে গিয়ে একটু ডান দিকে মোচড় মেরে উঁচু হয়ে দারোয়া টপ তৈরি করেছে। যারা কোনো কারণবশতঃ মূল টপ–এ চড়তে পারে না তারা বেবি টপ–এ চড়ে দুধের সাধ ঘোলে মেটায়। আমরা তো এতদূরও চড়তে পারব ভাবিনি। গিরিশিরায় চড়ে বেশ উত্তেজিত লাগল। কিছুটা নিচে বাঁদিকে পাস, যেটা গতকাল পেরিয়ে এসেছি। অনেক নিচে ডোডিতাল এলাকার ছোট্ট একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নিচ থেকে নিয়ে উলটো দিকের পুরো বন্দরপুঞ্ছ রেঞ্জ মেঘে ঢাকা। বোঝা যাচ্ছে পিকগুলোর ওপর স্নো ফল হচ্ছে। রোদ মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়েই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। নাকের নিচটা জ্বালা করতে শুরু করল, বোধহয় ফেটে গেল। এখানেই খানিকক্ষণ বসলাম আমরা। বসে বসে সামনের রাস্তাটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল টপ অবধি চলে যেতে পারবমোটেই চড়াই নয়, কিন্তু রাস্তাটা লম্বা। জয়া বলল, “চল, চলে যেতে পারব, আর তো বেশি চড়াই নেই।” বিপিনকে বলাতে ও বলল, “মুশকিল।” কারণ, তখনই সোয়া দুটো বাজে। ঐ রাস্তা পেরোতে অন্তত আরো তিরিশ-চল্লিশ মিনিট লাগবে। এরপর এতটা নামতেও তো হবে। মেঘ কখন বেশি ঘন হয়ে গিয়ে বর্ষাতে আরম্ভ করবে তার কোনো স্থিরতা নেই। ওর কথায়, “পাহাড় কা মৌসম ওউর মুম্বাই কা ফ্যাশন – কব বদল যায়ে কোই ভরোসা নেহি।” ছোকরা রসিক আছে (খুব হালকা একটা ফাঁকিবাজির ঝোঁকও আছে)অগত্যা নামা শুরু করলাম। ঘাসজমির মধ্যে দিয়ে ট্র্যাভার্স করে অর্থাৎ আড়াআড়ি নামা। তিনটে নাগাদ ফিরে এলাম ক্যাম্পে। এসেই গরম গরম চা, দারুণ লাগল। ঠাণ্ডা হাওয়ায় হাত-মুখ জমে গেছে। ঠিক সাতটায় লাল টুকটুকে সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল পাহাড়ের পিছনে, আমরাও টুক করে তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম। সন্ধে কাটল আড্ডা দিয়ে আর তাস খেলে। সাড়ে ন’টার মধ্যে খেয়ে শুয়ে পড়াকাল গন্তব্য ‘সীমা’। বিপিনের হিসেবে রাস্তা কঠিন নয়, খুব লম্বাও নয় - আট কিলোমিটার, তাও বরফ-টরফ মাঝেমধ্যে থাকতে পারে। সময় বেশি লাগবে। তাই তাড়াতাড়ি রওনা হওয়া দরকার।


ঘুম ভেঙে গেল সকাল পাঁচটা কুড়ি নাগাদ। সূর্য উঠে গেছে, কিন্তু উপত্যকায় আলো আসেনি। বন্দরপুঞ্ছের মাথায় আলোর আভা। ছ’টা নাগাদ হলুদ সূর্যটা চোখের সামনে উঁকি দিল। কিন্তু তুষারশৃঙ্গগুলো আজও ধোঁয়া ধোঁয়া। যা হোক, সব সেরে রওনা হতে ন’টা কুড়ি। প্রথমে হালকা হেঁটে কানসার টপ-এর পাশের নিচু জায়গাটা পেরিয়ে গিরিশিরার দক্ষিণ ঢালে চলে এলামবিপিনের কথায়, “আজ কা রাস্তা - বস্‌ ডাউন ডাউন, অউর বীচ্‌ বীচ্‌ মে সিধা সিধা।” কার্যক্ষেত্রে, সারাদিন পাহাড়ি ছাগলের মতো একটার পর একটা গিরিশিরার গা বেয়ে চললাম আর অসংখ্য স্পার অর্থাৎ উপগিরিশিরা পেরোলাম। রাস্তা খুব কষ্টকর কোথাওই নয়। কিন্তু সারাদিন টং টং করে একই ধরনের স্পার, রিজ, বোল্ডার পেরোনোটা বেশ বিরক্তিকর। তার ওপর একটু উঁচু কোনো জায়গায় উঠলেই সাঁই সাঁই করে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া চলছেহাওয়ার দাপটে মালভর্তি ন্যাপ স্যাক উলটে পড়ে যাচ্ছে। খাবারভর্তি প্যাকেট ধরে না থাকলে উড়ে যাচ্ছে। রোদেরও তেজ নেই, মেঘাচ্ছন্ন। মাঝখানে কয়েকটা বরফ প্রান্তর পেরোলাম। অবশ্যই বিপিনের সহায়তায়। পথের সব বরফ এখনও গলেনি। প্রথম আইস ফিল্ডটা পেরোনোর সময়ই দারুণ একটা ব্যাপার হল। এই প্রথম গোল্ডেন ঈগল দেখলাম। প্রথমে জয়া যখন দেখাল তখন আমি ভাবলাম চৌ। হলদে একটা ঠোঁট-ই দেখেছিলাম শুধু। তারপর ভালো করে দেখি, আরে! তাই তো! এটা আকারে অনেক বড়ো, গলা হলুদ পালকে ঢাকা; ঠোঁট বড়ো, বাঁকা, হলুদ রঙের ও বোধহয় নিরিবিলিতে খাবার খুঁজতে এসেছিল (এখানে প্রচুর pica আছে)। আমরা এসে পড়াতে বিরক্ত হয়ে উড়াল দিল। গলা থেকে পেট সোনালি, কী দারুণ দেখতে! আমাদের মাথার ওপর দুটো চক্কর লাগাল। আমিও এই সুযোগে ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। ছবি তো তুললাম, কিন্তু আলো তেমন না থাকায় রংটা বোধহয় আসবে না ছবিতে। শুনেছি গোল্ডেন ঈগলের দেখা পাওয়া সহজ নয়। বিপিন বলল, এটা ওর এলাকা, নিচে আর একজন থাকে। ফুল তো আছেই সারা রাস্তা জুড়ে।
কানসার গিরিশিরার দক্ষিণ ঢাল বেয়ে নামা থেকে ক্রমাগত পশ্চিম অভিমুখে চলে বেলা প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ একটা গিরিশিরার ওপর থেকে অনেক নিচে ‘সীমা’ বুগিয়ালের প্রথম দর্শন হল। বিপিন বলল, এই বুগিয়ালের দুটো ক্যাম্প সাইট, একটা আপার, একটা লোয়ার সীমা লোয়ার-টাই বেশি ভালো, আর কাল ঐ দিক দিয়েই নামতে হবে, অতএব আজ এই রাস্তাটুকু নেমে থাকলে ভালোই হবে। জয়া প্রথমে এতটা নামতে চায়নি। এতখানি ক্লান্তিকর হাঁটা, খিদে, ঠাণ্ডা - সব মিলিয়ে পরিশ্রান্ত ছিলাম। কিন্তু আমার মনে হল, ঠিকই আছে। এইটুকু নেমে থাকলে কাল সুবিধাই হবে। এই ভেবে জয়াকে বুঝিয়ে নিচে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। বিপিন আর লব মালপত্র সমেত খচ্চর নিয়ে আগে চলে গেল, আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে নামা শুরু করলাম। নামা বলে নামা! পাথুরে রাস্তা দিয়ে ঠাঁই ঠাঁই সোজা নিচে নামা। খাড়াই প্রায় সত্তর ডিগ্রি, রাস্তা প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার। এতটা পথ নামতে হবে বুঝিনি। জলও শেষ হয়ে গেছিল, পৌঁছে যাব বলে আর ভরিনিগলা শুকিয়ে কাঠ। লব মালপত্র রেখে ফিরে এসে মাঝপথ থেকে বাকি রাস্তা আমাদের সঙ্গ দিল। শেষ পর্যন্ত পৌনে পাঁচটায় ক্যাম্প সাইটে পৌঁছোলাম।
পৌঁছেই প্রায় চিৎপাত হয়ে পড়ার মতো অবস্থা, বিপিন চা তৈরি করে রেখেছিল। চা-বিস্কুট খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ভালো করে ক্যাম্প সাইটটা দেখলাম। অপূর্ব সুন্দর, সবুজ ঘাসে ফুল ছড়ানো ঢেউ খেলানো বুগিয়াল। মাঝখানে হৃষ্টপুষ্ট জলের ধারা বইছে। চারপাশের পাহাড়ে বড়ো বড়ো গাছের জঙ্গল। সামনে বিশাল বন্দরপুঞ্ছ - সব মিলিয়ে আঁকা ছবি। আমরা যখন পৌঁছেছি তখন ওখানে একপাল গরু-বলদ চরছিল। বিপিন বলল, গ্রামের লোকেরা এদের এখানে ছেড়ে গেছে চরার জন্য। পাঁচ-ছয় দিন অন্তর একজন এসে খোঁজ নিয়ে যায়গরুরা চরতে চরতে স্বচ্ছন্দে এক বুগিয়াল থেকে অন্য বুগিয়ালে চলে যায়। তবে এখানকার জঙ্গলে লেপার্ড আছে। গরুর পালের মধ্যে কোনো প্রাণহানি হলে, যে লোক খবর নিতে আসে সে গিয়ে গরুর মালিককে খবর দেয়। শুনেছিলাম সীমা থেকে সূর্যাস্ত নাকি দারুণ দেখায়, কিন্তু আমাদের সেই অদ্ভুত সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা হল না। সূর্যাস্তের সময় পশ্চিম দিগন্ত মেঘে ঢাকাকেবল মেঘের পিছন থেকে অস্তরবির রশ্মিচ্ছটা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। আমার অবশ্য সে জন্য কোনো দুঃখ নেই। কানসার বুগিয়াল থেকেই যে অসাধারণ সুন্দর সূর্যাস্ত দেখেছি তার তুলনা নেই।
সন্ধে হতেই বিপিন আর লব কাঠ জড়ো করে বেশ বড়ো আগুন জ্বালাল। তাপও পাওয়া যাবে, রান্নাও হবে, আবার কোনো বন্য জন্তুও কাছে আসবে না। আগুন দেখেই মাথায় একটা জব্বর ফন্দি এল। আমরা ভর্তা খাব বলে বেগুন কিনে এনেছিলাম। ছোটোবেলায় দোলের আগের দিন ন্যাড়াপোড়ায় বুড়ির ঘরে বেগুন, আলু, টমেটো সব দিয়ে আগুন লাগাতাম। তারপর সেই সব পোড়া মেখে জুৎ করে খেতাম। সেটা মনে করেই ওদের বললাম বেগুন, আলু, টমেটো সব আগুনে দিয়ে পোড়াতে। ওরা বেশ অবাক হল, কারণ ওরা এ যাবৎ শুধু আলু পোড়াই খেয়েছে। খাওয়ার সময় সবাই কিন্তু খুব তৃপ্তি করেই পোড়া-মাখা আর রুটি খেলাম। আমাদের ক্যাম্প ফায়ার ভালোই উদ্‌যাপন হল।
রাতে বেশ কিছুক্ষণ আগুনের পাশে বসে আড্ডাও দিলাম এবং কথাবার্তার মধ্যেই বিপিনকে চেপে ধরলাম, “সচ্‌ বাতাও তো, আজ কিতনা রাস্তা চলে হম?” ব্যাটা মহা পাজি, খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল, “কিঁউ? আট কিলোমিটার হি হ্যায়!” কক্ষনও আট কিলোমিটার নয়, হতে পারে না। আমাদের মনে হচ্ছিলই যে, অনেকটা বেশি হেঁটেছি। আবার জিজ্ঞাসা করাতে উলটে আমাদেরই জিজ্ঞাসা করল, “কিঁউ? আপ লোগোকো কিতনা লগ্‌ রহা হ্যায়?” ব্যাটার ঠোঁটের ফাঁকে মিচ্‌কে হাসি। আমরা বললাম, মনে হচ্ছে বারো-তেরো কিলোমিটার, অন্তত বারো-র কম তো কিছুতেই নয়। তখন পাজিটা বলে কিনা, “বারাহ্‌ সে থোড়া হি জেয়াদা হ্যায়।” বলেই কী হাসি! একেবারে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। বোঝো কাণ্ড! আজ বারো কিলোমিটারের উপর হেঁটেছি, অথচ জানতাম না বলে সেই অনুযায়ী খাবার নেওয়া হয়নি সঙ্গে, তাই অত খিদে পেয়ে গেছিল। সত্যিটা বলেই সঙ্গে সঙ্গে ওর যুক্তি – যদি ও হাঁটার শুরুতেই আমাদের বলত যে এতটা পথ হাঁটতে হবে তবে নাকি তখনই আমাদের উৎসাহ কমে যেত, আমরা এত ভালোভাবে হাঁটা শেষ করতে পারতাম না। কী বলব? যাক গে, হাঁটা তো হয়ে গেছে। (জানিয়ে রাখা ভালো, এ পথে না এসে অন্য একটা পথেও কানসার থেকে সীমা আসা যায়, সে পথ ‘বায়াংকুলা’ হয়ে। সে ক্ষেত্রে, গিরিশিরা না পেরিয়ে সোজা কানসার বুগিয়ালের ঢালু পশ্চিমদিক দিয়ে নেমে বায়াংকুলা পৌঁছে সেখান থেকে চড়তে হবে সীমা। যদিও সময় কম লাগবে কিন্তু বায়াংকুলা থেকে সীমার চড়াইটা তীব্র।)
কাল নিচে নামব। কাল কত রাস্তা? কালও ওই বারো কিলোমিটার মতোই হাঁটতে হবে। জয় মহেশ্বর! আকাশে চাঁদের আয়তন বাড়ছে। প্রথমে আকাশ একটু মেঘলা ছিল, পরে সব পরিষ্কার হয়ে গিয়ে ফটফটে জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। সামনেই পূর্ণিমা। সুরক্ষার জৈবিক তাগিদে সব গরুগুলো এসে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা গরু মনে হল কাশছিল মাঝে মাঝে, পরদিন বিপিনকে বলাতে ও বলল যে, ঠাণ্ডা নয়, গরুটা কোনোভাবে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলেছে, সেটা ওর গলার নিচে আটকেছে। ও আর বেশিদিন বাঁচবে না। আমাদের সভ্যতার অবদান! কী মর্মান্তিক মূল্য দিচ্ছে অবলা প্রাণী (যেমন দিল থাইল্যাণ্ডের সমুদ্রতটে ভেসে আসা মৃত তিমি মাছটা, যার পেট কেটে চল্লিশটি প্লাস্টিকের প্যাকেট বেরোল)। জলের আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)
_____
ছবিঃ লেখক

গোলটেবিল:: কমিকস সমগ্র ১ - ময়ূখ চৌধুরী :: আলোচনাঃ রাখী আঢ্য

  

কমিকস সমগ্র – ১ ।। ময়ূখ চৌধুরী
লালমাটি প্রকাশন ।। মুদ্রিত মূল্যঃ ৪০০ টাকা
পাঠ প্রতিক্রিয়া ।। রাখী আঢ্য

ভদ্রলোক ঠিক সময় সামনে এসে না দাঁড়ালে এ যাত্রা পৈতৃক প্রাণটা খুইয়েছিলাম আর কি! সেই কোন ছোটোবেলায় পড়েছিলাম ‘অ-এ অজগর’। কিন্তু সত্যি সত্যি যে জীবটা এতটা বীভৎস হতে পারে তা কল্পনারও বাইরে ছিল। সবে তার এক ভয়ানক পাকসাটে বিশাল দাঁতাল বাঘটার শেষ আর্তনাদ পৃথিবীর বাতাসে মিলিয়ে গেছে কি যায়নি, উৎসাহভরে ঝোপের আড়াল থেকে মুখটা বাড়িয়েই নিজের ভুলটা অনুভব করলাম। মুহূর্তের ব্যবধানে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ভয়াবহ মুখব্যাদান করে ধীরে ধীরে পাকসাট খুলে আমার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল সর্পিল দানবটা। বেশ বুঝতে পারছি এখনই পালাতে হবে। কিন্তু পা দুটো যে কে যেন মাটির সঙ্গে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে। আর হয়তো কিছুক্ষণ... আর ঠিক তখনই ভদ্রলোক যেন আকাশ থেকে উদয় হলেন আমাদের দু’জনের মাঝখানে। দুটো হাত শূন্যে একবার ঘোরালেন। আর কী এক অজানা ইঙ্গিতে মনে হল যেন আমাদের আর অজগরের সামনের ব্যবধানটা ক্রমশ বাড়ছে... বাড়ছে...
“এখন একটু ভালো লাগছে? স্নেহ ভরা গলায় প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের মাঝারি উচ্চতা, শ্যামবর্ণ, রোগা কিন্তু ব্যায়াম করা পাকানো চেহারা। হাতে একটা বিশাল বড়ো তুলি। মুখটা কোথায় যেন দেখেছি দেখেছি, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না।
“হ্যাঁ, বেশ ঠিক লাগছে, বোধহয় কিছুটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। এতক্ষণে ক্লান্তিটা উবে গিয়ে শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। একটা অজানা উত্তেজনায় যেন পেয়ে বসেছে আমাকে।
“কিন্তু আপনি কি জাদুকর?
“না না, আমাকে বরং জাগলার বলতে পারো। রং-তুলি, আঁকা-রেখার জাগলার। আমার নাম শক্তিপ্রসাদ রায়চৌধুরী। আরে কথায় কথায় তো তোমার নামটাও জানা হল না।”
“আমি অর্ক।”
“তা অর্কবাবু, তুমি হঠাৎ এখানে?
“আসলে এবারে পূজার ছুটিতে বাবার কাছে খুব আবদার করেছিলাম একটু নতুন কিছু দেখাতে হবে। একেবারে অন্য জগৎ, অন্য অভিজ্ঞতা। আর বাবা তো সেই মতো সব ব্যবস্থা করেও দিয়েছিলেন। কিন্তু এইভাবে যে বিপদে পড়ব ভাবতে পারিনি। আপনি না এলে কিন্তু্‌...”
কথাটা শেষ হবার আগেই ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। একটু হেসে বললেন, “বেশ তো, বিপদ যখন কেটেই গেছে তখন না হয় তোমায় আজ আমার জাগলিং-এর দুনিয়া থেকেই ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। বলেই ভদ্রলোক আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই চোখের সামনে তার হাতের তুলিটা দিয়ে বাতাসে একটা আঁচড় কাটলেন আর সঙ্গে সঙ্গেই যেন বদলাতে শুরু করল সামনের দৃশ্যপট। ধীরে ধীরে সব মিলিয়ে গিয়ে কোথা থেকে যেন উদয় হল এক বিশাল খরস্রোতা নদী... ঠান্ডা বাতাস... আর জলজঙ্গলময় এক উন্মুক্ত প্রকৃতি। ভদ্রলোক সামনের দিকে পা বাড়ালেন, আর আমিও যেন মোহাচ্ছন্নের মতো এগিয়ে চললাম তার সঙ্গে।
“বুঝলে অর্কবাবু, ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, “এই যে সামনে দেখছ সবুজ বনানী, পাহাড়, এক সময় বিশালাকার রোমশ গন্ডার, দানবীয় ম্যামথ আর বাইসনের পদক্ষেপে ধূলিধূসরিত হয়েছে এই অঞ্চল। ভেবো না যেন রূপকথার গল্প বলছি। কিছুকাল আগেও যা ছিল কল্পনা সেই কোমোডো ড্রাগন কিন্তু এখনও পাওয়া যায়। ভদ্রলোকের বাচনভঙ্গিটা বড়ো অদ্ভুত। বড়ো জীবন্ত। উনি একটা একটা করে বর্ণনা দিচ্ছেন, আর দৃশ্যগুলো যেন ছায়াছবির মতো আমার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বলতে বলতেই ভদ্রলোক হাতের তুলিটা সামনের দিকে তুলে ধরলেন। “ওই দেখ, ওই যে দূরে দেখছ একদল বিশাল বাইসন আর তার পিছনে জেব্রার পাল। সবচেয়ে সামনে যে বাইসনটা দেখছ ওর নাম হল মবোগো। আর জেব্রার দলটিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পেককা। যূথবদ্ধ একটা দলের দলপতির কতটা দায়িত্ববোধ থাকে, মমতাবোধ থাকে দলের প্রতি, তা ওদের থেকে শিখতে হয়। জঙ্গল আর তার বাসিন্দাদের ভালোবাসলে জানতে পারবে এখানকার প্রাচীন নিয়ম হল - জোর যার মুলুক তার। এখানে বীরত্ব আর মৃত্যু পাশাপাশি গা ঘেঁষে চলে।”
বড়ো বড়ো ঘাসের বন আর জড়াজড়ি করে করে বেড়ে ওঠা বিশাল বিশাল প্রাচীন গাছের জঙ্গলকে পাশ কাটিয়ে আমরা দু’জনে এগিয়ে চলেছি। একটা উঁচু টিলা। তার ওপর উঠতেই সামনে খোলা উন্মুক্ত প্রান্তর চোখে পড়ল। আসলে অভ্যাস নেই তো, পা-টা কনকন করছিল। তাই টিলার উপর একটু বসলাম দু’জনে। জঙ্গলের ঘনত্বটা এদিকে একটু কম। দূরে ধ্বংসস্তূপের মতো কিছু একটা চোখে পড়ল।
“আচ্ছা ওটা কী? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“ও হল প্রাচীন ভারতের এক মহান প্রজাবৎসল রাজা মহারাজ রুদ্রদমনের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। মহারাজ মাঝেমাঝেই ছদ্মবেশে রাজ্য ত্যাগ করে নানা রোমাঞ্চকর অভিযানে বেরিয়ে পড়তেন।”
ওনার কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি মানসচক্ষে অনুভব করছি প্রাচীন ভারতের এক বিস্মৃতপ্রায় অধ্যায়কে। দীর্ঘকায়, প্রশস্ত বক্ষ মহারাজ সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সূর্যের আলোতে ঝকঝক করছে তার খোলা তলোয়ার। আর্য সভ্যতার একটা ছোট্ট নিদর্শন যেন আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর আমিও ক্রমশ ডুবে যাচ্ছি ইতিহাসের পাতায়।
“তুমি রবিনহুডের নাম শুনেছ? শেরউড বনের রবিনহুড?
চমকে উঠলাম ভদ্রলোকের প্রশ্নটা শুনে। এতক্ষণ কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। “হ্যাঁ শুনেছি,” একটা ইতিবাচক ঘাড় নাড়লাম আমি, আর তিনিও শোনালেন রবিনহুডের আরও কিছু অজানা কাহিনি।
“চলো, এবার এগোনো যাক।”
ভদ্রলোকের হাত ধরে আমি উঠে পড়লাম। উঁচু টিলাটাকে পিছনে ফেলে ধীরে ধীরে সামনের ধ্বংসস্তূপটা পার করে আমরা এগিয়ে চললাম সামনে। ভদ্রলোকের অননুকরণীয় বাচনভঙ্গিতে বলে চলা গল্পের স্রোত কিন্তু থেমে নেই। ইতিহাস হয়ে কল্পবিজ্ঞান, প্রাগৈতিহাসিক থেকে ভবিষ্যৎ, অনায়াস তার গল্পের বিচরণ। একদিকে বলে চলেছেন অসাধারণ কিছু কাহিনি আর মাঝে মাঝেই হাতে তুলিটা নিয়ে সামনের অদৃশ্য ক্যানভাসে কী যেন আঁকিবুঁকি কাটছেন, আর আমার দৃশ্যপটে থেকে থেকেই ফুটে উঠছে নানা স্বাদের রোমাঞ্চকর কিছু চিত্র কাহিনি। এ কাহিনিতে কখনও রক্তাক্ত বাংলা তো কখনও ভয়ংকর আফ্রিকা। কখনও পরাজিত প্রাণীর অন্তিম জান্তব আর্তনাদ তো কখনও জ্যোৎস্নার বুক চিরে রক্তাক্ত অসির ঝলকানি।
চলতে চলতেই তার কাছ থেকে শুনে নিলাম বীর বাঙালি ভিখু সরদারের একটা মাত্র টাঙ্গি সম্বল করে ভয়ঙ্কর বন্য কুকুরদের সঙ্গে লড়াই-এর গল্প। শুনলাম সাহসী ডাকাত চাঁদ সিং-এর কাহিনি, মারাঠা বীর কাহ্নোজি আংগ্রের মোঘল বাহিনীর হাত থেকে দেশ মুক্তির অমর বীরগাথা, সুদূর ব্রাজিলের বুকে ইতিহাস সৃষ্টি করা বীর বাঙালি কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস আর তার পোষা রয়েল বেঙ্গল টাইগার রঙ্গলাল-এর গল্প, আরও কত কী। আমাকে বললেন, “বুঝলে অর্কবাবু, এই যে তুমি গল্পগুলো শুনছ, এগুলো কিন্তু শুধু শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখো না। মনের খাতায় এঁকে নিও এই সমস্ত বন্যপ্রাণী তথা তাদের ঘিরে থাকা মানুষজন এবং নানা চরিত্রগুলির শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও চলাফেরার ছন্দগুলোকে। ছায়াটাও যেন শরীরের সঙ্গে মিলে যায় নিখুঁতভাবে।” সত্যিই দেশ বিদেশের এত বহু বিচিত্র কাহিনি, তার কতটুকুই বা আমরা জানি? উনি না বললে হয়তো জানতেই পারতাম না ইতিহাসের নানা ভয়ঙ্কর অস্ত্রের জন্মকথা বা ভয়াবহ দ্বৈরথ যুদ্ধের কথা।
গল্প শুনতে শুনতে খেয়ালই করিনি কোথা দিয়ে অনেকখানি সময় পার করে গেছে। ধীরে ধীরে লক্ষ করলাম জঙ্গল ফিকে হয়ে আসছে। দু-একটা ইতি-উতি কুঁড়েঘর, কয়েকটা ছেলে খেলে বেড়াচ্ছে। এতক্ষণে বোধহয় ক্লান্তিটা চেপে ধরল।
“আরে, ওই তো, এসে গেছি। সামনে দেখতে পাচ্ছ ওই যে মস্ত বাড়িটা, ওটা প্রফেসর ত্রিলোকনাথ ত্রিবেদীর বাড়ি। ওখানেই আমরা বিশ্রাম নেব চলো।”
বিশাল লোহার গেটটা পার করে বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকতেই আরও এক আশ্চর্য দুনিয়া। বাড়িটা একটু পুরোনো হলেও বেশ ব্যবহারযোগ্য। একটা সরু রাস্তা গেট থেকে বাড়ির মূল দরজা পর্যন্ত চলে গেছে। দু’পাশে জানা-অজানা নানা গাছপালা, কত অচেনা ফুল ফুটে রয়েছে। প্রফেসর আসলে একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী, আর মানুষটাও বেশ অমায়িক আর মজাদার। খুব যত্ন করে আমাদের বৈঠকখানা ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। বাড়িটায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে শুনছিলাম প্রফেসরের নানা অদ্ভুত কীর্তিকলাপ। উনি কী একটা আশ্চর্য গাছ আবিষ্কার করেছেন যার পাতা খেলেই উনি নিজেকে প্রচন্ড শক্তিশালী অনুভব করেন।
“এই নিন বাবু, এটা খেয়ে নিন,” একজন ভৃত্য গোছের মানুষ একটা রেকাবিতে শরবত এনে দিলেন। সত্যিই খুব তেষ্টা পেয়েছিল। এক চুমুকে শরবতটা খেয়ে নিলাম। নাঃ, একটু বিশ্রামের খুব প্রয়োজন আছে। সোফায় পিঠটা এলিয়ে দিতেই চোখ দুটো ক্লান্তিতে বুজে এল...

  

“অর্ক, এই অর্ক... কী রে...”
বহু দূর থেকে ক্ষীণকণ্ঠে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে... আওয়াজটা আস্তে আস্তে বাড়ছে...
“এই অর্ক, কী রে? এই অবেলায় পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস... সেই কখন থেকে ডেকে যাচ্ছি। বিকেলেও খেলতে গেলি না।”
মায়ের ডাকে সংবিৎ ফিরল। চোখটা খুলে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। পাশেই চোখে পড়ল আধখোলা গল্পের বইটার পাতাগুলো পতপত করে উড়ছে। ময়ূখ চৌধুরীর লেখা কমিকস সমগ্র - প্রথম খন্ড। আর খোলা পাতার ওপর যে ভদ্রলোকের ছবি দেখতে পাচ্ছি তার মুখটা দেখে চমকে উঠলাম। আরে এনার সঙ্গেই তো এতক্ষণ ঘুরছিলাম - শক্তি প্রসাদ মানে ময়ূখ চৌধুরী! তাই মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছিল। তাহলে কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম? আর স্বপ্নে এনার সঙ্গেই কি মানস ভ্রমণ? স্বপ্নও কি এতটা জীবন্ত হয়? মাথাটা এবার আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছে। সত্যি তো, কিছুদিন আগে বাবার কাছে আবদার করেছিলাম যে এবারের ছুটিটা যেন আমার অন্যভাবে কাটে। তাই বাবা গতকাল কলেজ স্ট্রিট থেকে এই বইটা এনে দিয়েছিল। আর আজ দুপুর বেলায় এটা পড়তে পড়তেই...। মায়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে বইটা আবার হাতে তুলে নিলাম। প্রথমে সূচিপত্র, তারপর পাতাগুলো আস্তে আস্তে ওলটাতে লাগলাম। অজগর, জেব্রা, বনবাসী বন্ধু, তলোয়ার, নন্টে ফন্টে, রতনলাল প্রফেসর... এই তো এদের সঙ্গেই তো এতক্ষণ সময় কাটল। যেমন সুন্দর ছাপার হরফ তেমনি বলিষ্ঠ তুলির টান। শুধু রঙিন অলংকরণগুলোই নয়, সাদা-কালো কমিকসগুলোও বড়ো বেশি মনকাড়া। মনের গভীর থেকে উঠে আসা সময়কথন - ছবিতে ছবিতে। সঙ্গে উপরি পাওনা ভূমিকাচ্ছলে লেখক সম্পর্কিত নানা অজানা তথ্য তথা চরিত্র-চিত্রণের ইতিহাস। বইটার প্রতিটা বিভাগই অত্যন্ত যত্ন সহকারে গ্রন্থিত করা হয়েছে।
“হ্যাঁ মা, বইটা আর একটু পড়ে উঠছি। খুব খিদে পেয়ে গেছে। তুমি বরং কিছু খেতে দাও।” আবার ডুবে গেলাম বইটার ভেতর। বাবা বলেছিল, পড়া হয়ে গেলে বইটা একবার দিতে। বাবাও নাকি বইটা পড়ে দেখবে। পড়াচ্ছি তোমাকে দাঁড়াও। আগে তো এর বাকি দুটো খন্ড ম্যানেজ করি। মাথার মধ্যে বদবুদ্ধিটা চাগাড় দিয়ে উঠল। এবারের পূজার ছুটিটা সত্যিই দারুণ কাটবে।

  
_____

গোলটেবিল:: সেই লোকটার খোঁজে - প্রফুল্ল রায় :: আলোচনাঃ নুরজামান শাহ


সেই লোকটার খোঁজে - প্রফুল্ল রায়
প্রকাশকঃ দেজ পাবলিশিং
আলোচনাঃ নুরজামান শাহ

এ সময়ের সাহিত্যে খ্যাতনামা ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়ের নাম অনায়াসে অতি পরিচিত নাম। ‘কেয়া পাতার নৌকা’ খ্যাত এই সাহিত্যিক মূলত বড়োদের সাহিত্যে নিয়মিত কলম ধরলেও শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তিনি নিরলস এবং অক্লান্ত লেখক। শিশু-কিশোরদের কথা ভেবেও অজস্র গল্প, উপন্যাস তিনি লিখেছেন বা লিখে চলেছেন। সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম তাঁর লেখা ‘সেই লোকটার খোঁজে’ সংকলনটি। একটি উপন্যাস ও তিনটি বড়ো গল্প নিয়ে এই সংকলনটি প্রকাশ করেন দেজ পাবলিশিং।

সেই লোকটার খোঁজে
এই উপন্যাসটির প্রধান দুই চরিত্র আঠারো বছর বয়সি রাহুল ও তার মাসতুতো ভাই অয়ন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা প্রবল আগ্রহী। আর আগ্রহ থেকেই জন্ম নেয় একেকটি রহস্য। এক বর্ষার রাতে রাহুলদের বাড়ির পাশের বহুতল ফ্ল্যাটে একটা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে এই উপন্যসের কাহিনি। টান টান রহস্য - রোমাঞ্চকর উপন্যাসটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। খুব ভালো লাগল।

বনের প্রহরী
এটি একটি অলৌকিক গল্প। তবে ভয় নেই। কিন্তু গল্পের প্লট ভালো। পড়তে ভালো লাগল।

মুম্বাইয়ে কাবুল টাবুল
এই মজার গল্পটির চরিত্র কাবুল আর টাবুল দুই ভাই। এই দুটি চরিত্র নিয়ে লেখকের বেশ কয়েকটি গল্প আছে। যারা মজার গল্প ভালোবাসেন তাদের এই দুই চরিত্র বেশ ভালো লাগবে।

মধ্যরাতের কালোয়াত
ঢাকুরিয়ার একটি ছোট্ট পাড়ায় রাত এগারোটা বাজলেই একদল কুকুর উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে, কিন্তু কেন? অ্যাডভেঞ্চার এবং আনন্দ দুইয়ের ছোঁয়াই আছে এই গল্পে।

সব মিলিয়ে পরিশেষে বলব, এই বইয়ে সংকলিত চারটি গল্পই ভিন্ন স্বাদের। প্রত্যেকটি গল্পেই আলাদাভাবে রহস্য-রোমাঞ্চ, ভৌতিক, হাসি-মজা উপভোগ করা যাবে।
_____

ম্যাজিক পেনসিলঃ ছোটোদের নিজস্ব বিভাগঃ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ম্যাজিক পেনসিল
ছোটোদের নিজস্ব বিভাগ

এবারের ম্যাজিক পেনসিল বিভাগে এসে পৌঁছেছে একটি ছড়া এবং একটি ছবি। এসো দেখা যাক সে সব।

(১)

নিচের ছড়াটি পাঠিয়েছে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র প্রবাহনীল

সৌরজগতের মজার গল্প
প্রবাহনীল দাস

সুয্যিমামা ব্যাঙ্ক খুলেছেন,
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বুধ,
একাউনট্যান্ট অসুর গুরু
বাড়ায় ধারের সুদ৷
সিকিউরিটি ধরা ঝিমায়
খেয়েই ধোসা পোঙ্গল,
তাই দেখে যে ব্যাঙ্ক লুটতে
এসেছে ভাই মঙ্গল৷
ভানুর সাথে বৃহস্পতির
নেই যে বনাবনি,
তাঁরই দলে নাম লেখালেন
‘দেব গুরুভাই’ শনি৷
কারণ লাল গ্রহের পরেই
গ্রহাণুদের বেল্ট,
চাঁদ জেনেছে, ‘গলে যাওয়া’
মানেই হল ‘মেল্ট’৷
অসুর গুরুর ঘ্যাম কম নয়,
ইংরাজি নাম ‘ভেনাস’,
গল্প শুনে শুয়েই কাদা
নেপচুন - ইউরেনাস৷
_____

লেখক পরিচিতি
প্রবাহনীল দাস,
পঞ্চম শ্রেণি, একমি একাডেমি, কালনা, পূর্ব বর্ধমান

(২)

এবারে ছবির পালা। নিচের সুন্দর ছবিটি এঁকে পাঠিয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছোট্ট মৌপর্ণা


অঙ্কনশিল্পীর পরিচিতি
মৌপর্ণা বসু
বয়স ৭, দ্বিতীয় শ্রেণী, অক্সিলিয়াম কনভেন্ট স্কুল, দম দম
_____