প্রবন্ধ:: জুল ভার্ন – কল্পবিজ্ঞান থেকে আজকের বাস্তব : রাখী পুরকায়স্থ


জুল ভার্ন – কল্পবিজ্ঞান থেকে আজকের বাস্তব
রাখি পুরকায়স্থ

প্রচণ্ড ঘরকুনো এক লেখক বাড়ির চিলেকোঠায় বসেই লিখে ফেলেছিলেন বিশ্ব মাতানো সব আশ্চর্য কল্পবিজ্ঞান কাহিনি। এরোপ্লেন, রকেট কিংবা সাবমেরিনের বাস্তব ও ব্যবহারিক প্রয়োগের অনেক আগেই কল্পনার ডানা মেলে তিনি মহাকাশে পাড়ি দিয়েছেন, পৌঁছে গিয়েছেন চাঁদে কখনও বা সমুদ্রের তলদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন আশ্চর্য জলযানে চেপে, কিংবা আগ্নেয়গিরির মুখগহ্বর দিয়ে পাতালে নেমে খুঁজে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল! তবে তাঁর সেই বৈচিত্রপূর্ণ কল্পনার সাম্রাজ্যকে শুধুমাত্র নিজের মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি, ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বব্যাপী অগণিত কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী পাঠকের মনেওহ্যাঁ, বলছি সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী কল্পবিজ্ঞান লেখক জুল ভার্নের কথা।
জুল গ্যাব্রিয়েল ভার্ন, আমাদের কাছে অবশ্য তিনি জুল ভার্ন নামেই পরিচিততিনি উনবিংশ শতাব্দীর এক কালজয়ী লেখক, যিনি কল্পবিজ্ঞানের জগতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটিয়েছিলেনUNESCO-এর ২০১৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, সেই ১৯৭৯ সাল থেকে কিংবদন্তি ঔপন্যাসিক ‘দ্য কুইন অব্ ক্রাইমস’ আগাথা ক্রিস্টির পর জুল ভার্নই ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভাষায় অনূদিত’ লেখকের স্থান দখল করে রয়েছেন। তাঁর লেখা বেশ কিছু কাহিনি নিয়ে বিখ্যাত কয়েকটি চলচ্চিত্র নাটক নির্মিত হয়েছে তবে তিনি কিন্তু নিজেকে শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের আঙিনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন একজন রহস্য-রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্প লেখক, কবি ও চিত্রনাট্যকার। তবে কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যিক হিসেবে তিনি যে গগনচুম্বী উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন তা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো ২০০০ সালে প্রকাশিত Science Fiction (The New Critical Idiom) নামক বইটিতে লেখক অ্যাডাম চার্লস রবার্টস কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ইংরেজ লেখক হার্বার্ট জর্জ ওয়েলস এবং মার্কিন সম্পাদক-লেখক হুগো গার্নসব্যাকের সাথে একত্রে, জুল ভার্নকে ‘কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পিতা’ আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে 
পশ্চিম ফ্রান্সের বিস্কে উপসাগরের তীরে এক ব্যস্ত বন্দর শহর নঁত সেই শহরের বুক চিরে ফরাসি দেশের দীর্ঘতম নদী লোয়ার বয়ে চলেছে। সেই নদীর ওপর একটি ছোটো কৃত্রিম দ্বীপ ‘ইল ফিদ্যু’ সেখানেই ১৮২৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন জুল ভার্নপিতা আইনজীবী পিয়ের ভার্ন এবং মাতা সোফি অ্যালোট দে লা ফুউয়ের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি। বন্দরে জাহাজের আসা-যাওয়ার দৃশ্য ছিল জুল ভার্নের শৈশব-কৈশোরের রোজকার সঙ্গী। দিগন্ত প্রসারিত বিপুল জলরাশির মাঝে জলযান চলাচলের এমন দৃশ্যই হয়তো তার ভ্রমণ কল্পনাশক্তিকে ক্রমশ স্ফুরিত ও প্রসারিত করেছিল
মার্গারিট অ্যালোট দে লা ফুউয়ের লেখা Jules Verne, sa vie, son oeuvre এবং জঁ জুল-ভার্নের লেখা Jules Verne: a biography বই দুটিতে রয়েছে জুল ভার্নের শৈশব ও কৈশোরের বহু মজাদার কাহিনি। সেই বই দু’খানি পড়ে জানা যায়, ১৮৩৪ সালে, মাত্র ছয় বছর বয়সে, নঁতে শহরের একটি বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়েছিল জুল ভার্নকে সেই স্কুলের শিক্ষিকা ম্যাডাম স্যাম্বিনের স্বামী, নৌবাহিনীর এক অধিনায়ক, প্রায় ৩০ বছর আগে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেনম্যাডাম স্যাম্বিন প্রায়ই তাঁর ছাত্রদের বলতেন, তাঁর স্বামী একটি জাহাজডুবির ফলে হারিয়ে গিয়েছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কিংবদন্তি চরিত্র রবিনসন ক্রুসোর মতই অনধ্যুষিত ‘নিরাশার দ্বীপ’ (Island of Despair) থেকে তাঁর স্বামী হঠাৎ করে একদিন ফিরে আসবেন তাঁর কাছেশিক্ষিকার এই কথাগুলি জুল ভার্নের মনে প্রগাঢ় ছাপ ফেলে১৭১৯ সালে ইংরেজ লেখক ডেনিয়েল ডিফোর লেখা ‘রবিনসন ক্রুসো’ উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু এভাবেই তাঁর সাথে সারাজীবন থেকে যায় এবং পরবর্তীকালে The Mysterious Island, Second Fatherland, The School for Robinsons সহ, তাঁর লেখা বহু উপন্যাসে সেই সাহিত্যধারাকে আমরা বার বার ফিরে আসতে দেখেছি
১৮৩৬ সালে জুল ভার্নের পিতা পিয়ের ভার্ন অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে লোয়ার নদীর তীরবর্তী সঁৎনে গ্রামে একটি বাড়ি ক্রয় করেছিলেন। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত Memories of Childhood and Youth’ শীর্ষক ভার্নের সংক্ষিপ্ত স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে সেই নদীর প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণের কথা। তিনি লিখেছেন, লোয়ার নদী দিয়ে সুদূরে ভেসে যাওয়া পাল তোলা জাহাজগুলি তাঁর ফেরারি মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত এক অলীক কল্পনার মায়াবী জগতে। এছাড়া ছেলেবেলায় তিনি বহুবার গ্রীষ্মের ছুটি কাটিয়েছেন নঁতের কাছেই ব্রে শহরে সেখানে ছিল তাঁর মামার বাড়ি। মামা প্রুইদঁ অ্যালোট ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত জাহাজের মালিক। তিনি প্রায় সারা বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। মামার কাছে দেশবিদেশের অজানা গল্পগাথা শুনে কত যে আনন্দময় গ্রীষ্মের দুপুর কাটিয়েছেন ছোট্ট জুল ভার্ন, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। তাঁর লেখা বহু কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসে তাঁর মামা এবং স্মৃতিবিজড়িত ছুটির দুপুরে শোনা ভ্রমণকাহিনিগুলি অমরত্ব লাভ করেছে
১৮৩৯ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে Coralie নামে এক তিন-মাস্তুলধারী জাহাজের কেবিন-বয়ের চাকরি নিয়ে গোপনে ইন্ডিজ পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন জুল ভার্নবিদেশ ভ্রমণ করা ছাড়াও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইন্ডিজ থেকে একটি প্রবালের কন্ঠহার এনে তুতো বোন ক্যারোলিনকে উপহার দেবেন কোনও এক সন্ধ্যায় ইন্ডিজের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর আগে জাহাজটি দাঁড়িয়েছিল লোয়ার নদীর দক্ষিণ তীরে Paimbœuf বন্দরেঠিক সময়মতো সেখানে হাজির হন তাঁর পিতাজুল ভার্ন ধরা পড়ে যান পিতার হাতে স্বভাবতই তাঁর আর ইন্ডিজ ভ্রমণ করা হয়ে ওঠেনি। পিতার কাছে ধরা পড়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এবার থেকে তিনি ভ্রমণ করবেন ‘শুধুমাত্র কল্পনার রাজ্যে তাঁর সেই কাল্পনিক অভিযানের রোমাঞ্চ সৃষ্টি হবে কেবল কাগজে-কলমে এভাবেই শুরু হয় কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথে তাঁর অবিস্মরণীয় জয়যাত্রা।
জুল ভার্নের পিতা ছিলেন নঁতে শহরের নামকরা আইনজীবী ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হার্বার্ট লোটম্যানের লেখা ‘Jules Verne: An exploratory biography’ বইটি পড়ে জানা যায়, আইনজীবী পিতার ইচ্ছাপূরণের জন্য ১৮৪৭ সালে তাঁকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয় রাজধানী শহর প্যারিসে কিন্তু প্যারিসে গিয়ে জুল ভার্নের সাহিত্যপ্রেমে যেন আরও দোলা লাগে! পড়াশোনার ফাঁকে জুল ভার্ন আসা-যাওয়া শুরু করেন প্যারিসের বিখ্যাত সাহিত্য-প্রাঙ্গনগুলোতে সেখানে বহু বিখ্যাত সাহিত্যিক, নাট্যকার এবং শিল্পীর সাথে তার বন্ধুত্ব হয় ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত আর্থার ব্রুস ইভান্সের লেখা ‘Jules Verne rediscovered: didacticism and the scientific novelবইটি পড়ে জানা যায়, সেসময় প্রচুর লেখালেখি চালিয়ে গেলেও জুল ভার্নের আইন অধ্যয়নে কিন্তু এতটুকুও ভাটা পড়েনি এবং ১৮৫১ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সাফল্যের সাথে আইনে স্নাতক হন।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি আইন পেশাও চালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন জুল ভার্ন। কিন্তু ১৮৫২ সালের জানুয়ারি মাসে এসে তিনি আর পারলেন না নিজের সাথে মিথ্যাচার করতে। হার্বার্ট লোটম্যানের লেখা ‘Jules Verne: An exploratory biography’ বইটিতে আমরা পাই, পুত্রের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবার লক্ষ্যে নঁতে শহরে নিজের সুপ্রতিষ্ঠিত আইন ব্যবসায় পুত্রকে যুক্ত করবার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁর পিতাকিন্তু পিতাকে লেখা চিঠিতে জুল ভার্ন যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি কেবলমাত্র সাহিত্যের অঙ্গনেই সাফল্য খুঁজে পেতে পারেন তাঁর সাহিত্যজীবন অব্যাহত রাখবার সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ফলে কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী পাঠকেরা উপহার পেলেন কালোত্তীর্ণ কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের এক অফুরন্ত ভান্ডার!
ইতিমধ্যে জুল ভার্ন তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু নিয়ে গভীর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, বিশেষত ভূগোল বিষয়ে অদম্য কৌতূহল ও ভালোবাসা ছিল তাঁর। তাই প্যারিসে অবস্থিত Bibliothèque nationale de France নামে ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে তিনি খুব বেশি সময় কাটাতেন। এমনই একটি সময়ে তাঁর পরিচয় হয় সুপ্রসিদ্ধ ভূগোলবিদ এবং বিশ্ব ভ্রামণিক জ্যাক অ্যারাগোর সাথে, যিনি অন্ধত্বের বাধা সত্ত্বেও ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করতেন। সময়ের সাথে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেসেই সাথে অ্যারাগোর উদ্ভাবনামূলক এবং মজাদার ভ্রমণ বিবরণীগুলি জুল ভার্নকে একটি নতুন ধারার সাহিত্যপথের দিশা দেখাতে শুরু করে। পরবর্তীকালে তাঁর লেখা কল্পবিজ্ঞান নির্ভর উপন্যাসগুলিতে এই সাহিত্যধারার ছাপ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
এসময় থেকেই জুল ভার্ন এক নতুন ধরনের উপন্যাস Roman de la Science অর্থাৎ বিজ্ঞানের উপন্যাস লিখবার চিন্তাভাবনা শুরু করেন, যার মধ্যে জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে সংগ্রহীত বিপুল পরিমাণ তথ্য অন্তর্ভুক্ত করবার সুযোগ থাকবে। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত Memories of Childhood and Youth’ শীর্ষক তাঁর সংক্ষিপ্ত স্মৃতিকথা পড়ে বোঝা যায়, লেখবার জন্য এমন অভিনব বিষয় নির্বাচনের পেছনে বিশ্ব মানচিত্র ও মহান অভিযাত্রীদের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালবাসা সর্বদাই কাজ করেছে। অবশেষে একটি উপন্যাসের খসড়া প্রস্তুত করলেন তিনি - হাইড্রোজেন গ্যাসে ভরা বিশাল আকৃতির বেলুনে চেপে, সেই সময়কার ইউরোপীয়দের কাছে সম্পূর্ণ অজানা এবং রহস্যে ঘেরা আফ্রিকা মহাদেশ ভ্রমণের এক রোমাঞ্চকর কাহিনি, যা পরবর্তীকালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘Five Weeks in a Balloon’ নামে কল্পবিজ্ঞানপ্রেমী পাঠকদের মন চিরদিনের মতো কেড়ে নেবে। তবে সাফল্যের সেই পথে কিন্তু গোলাপের পাপড়ি বিছানো ছিল নাFive Weeks in a Balloonউপন্যাসটির কাহিনি অবাস্তব মনে করে কোনও প্রকাশকই তা প্রকাশ করতে রাজি ছিলেন না ক্ষোভে দুঃখে একদিন সে পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়িয়ে ফেলতেও চেয়েছিলেন তিনি। পরে অবশ্য তার স্ত্রী অনরাইন ভিয়ানে (মরেল) ভার্নের হস্তক্ষেপে তা রক্ষা পায়
১৮৬২ সালে প্রকাশক পিয়ের-জুল হ্যাটজেলের সাথে সাক্ষাতের পরই জুল ভার্নের জীবনের মোড় আচমকা ঘুরে যায় তিনি জুল ভার্নের লেখার সর্বোপরি পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাঁকে আরও লিখতে উৎসাহ জোগান হ্যাটজেলই একমাত্র প্রকাশক যিনি ১৮৬৩ সালের ৩১ জানুয়ারি Five Weeks in a Balloon উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। আর এই উপন্যাসটির জনপ্রিয়তা আজ আর কোনও কল্পবিজ্ঞানপ্রেমীরই অজানা নয়।
প্রকাশক পিয়ের-জুল হ্যাটজেলের সহযোগিতায় জুল ভার্ন লিখতে শুরু করেন নিখুঁত গবেষণালব্ধ কল্পবিজ্ঞাননির্ভর অভিযান উপন্যাসগুলির একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিক, যার নামকরণ করা হয় ‘Voyages extraordinaires’ (অসাধারণ ভ্রমণ) তারপর তাঁর আশ্চর্য কলমের জাদুকরী ছোঁয়ায় যে অমর সাহিত্যের জন্ম হয়েছিল তা কল্পবিজ্ঞানের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে ১৮৬৩ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ‘Voyages extraordinaires’ মূল শিরোনামের অধীনে তিনি ধারাবাহিকভাবে চুয়ান্নটি অসাধারণ কল্পবিজ্ঞাননির্ভর অভিযান কাহিনি লিখেছিলেন। তাঁর লেখা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসগুলি হলঃ ‘The Adventures of Captain Hatteras,Journey to the Center of the Earth,From the Earth to the Moon, ‘Twenty Thousand Leagues under the Sea,Around The Moon’, Around the World in Eighty Days’, ‘The Mysterious Island,Michael Strogoff’, The The Purchase of the North Pole’, ‘Paris in the Twentieth Century প্রভৃতি
নির্ভুলভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশনের পাশাপাশি অদম্য কৌতূহল অন্বেষণ স্পৃহাই ছিল তাঁর অসামান্য লেখনীর মূলমন্ত্র তাঁর কল্পবিজ্ঞান আশ্রিত সাহিত্যধারার এমন কল্পনাতীত জনপ্রিয়তার মূল কারণ হল, তাঁর লেখা উপন্যাসগুলির পাঠকেরা যে কেবলমাত্র কল্পবিজ্ঞানের অলীক জগতে বিচরণের আনন্দ অনুভব করেন তা কিন্তু নয়। সেই সাথে তারা ভূতত্ত্ব, জীববিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীবাষ্মবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অজানা দুর্গম স্থান সেখানকার আশ্চর্য সংস্কৃতির বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে পারেন কল্পবিজ্ঞানের সাথে মিলেমিশে আধুনিক বিজ্ঞানের এমন বিপুল তথ্য ভান্ডার তাঁর উপন্যাসগুলিকে encyclopedic novel হিসেবে আর সকল লেখকের সাহিত্য প্রচেষ্টা থেকে আলাদা করে রেখেছে।
আমরা সবাই জানি কল্পবিজ্ঞানবিজ্ঞাননয়, মূলত কল্পকাহিনি আর জুল ভার্নও বিজ্ঞানী ছিলেন না তবুও তাঁর ‘বিজ্ঞাননির্ভর কল্পনা’ যেন বিজ্ঞানেরই সমতুল্য জুল ভার্নের লেখনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে তাঁর ভবিষ্যৎ দর্শন তাঁর কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের খ্যাতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত একটি বিষয় তাঁকে বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক অগ্রগতির একজন ‘ভবিষ্যদ্বক্তা’ হিসেবে দাবি করা হয়েছে বার বার। কারণ, তাঁর লেখা উপন্যাসগুলিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপাদানগুলিকে কল্পনার মোড়কে মুড়ে যে অভিনব উপায়ে পাঠকের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে, তা তাঁর আমলে কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ তা বাস্তব রূপ পেয়েছে আজ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তিনি দেখতে পেতেন, তাঁর ব্যতিক্রমী কল্পনাশক্তির জোরে তিনি যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা প্রযুক্তি প্রয়োগের কথা কল্পনা করেছিলেন, তা বর্তমানে কমবেশি বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত হয়েছে তাঁর তেমনই কয়েকটি কল্পবিজ্ঞাননির্ভর ধারণা নিয়ে আলোচনা করা যাক, যা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে সফলভাবে বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে


বৈদ্যুতিক সাবমেরিন (Electric Submarine)
ষোড়শ শতক থেকেই বিজ্ঞানীরা ডুবোজাহাজ আবিষ্কারের বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। অবশেষে ১৬২৩ সালে কর্ণেলিস ড্রেবেল একটি মনুষ্যশক্তি চালিত ডুবোজাহাজ বানাতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে বাতাস ও বাষ্পশক্তি দ্বারা ডুবোজাহাজ চালানোর চেষ্টা করা হয়। শেষমেশ ১৮৮৮ সালে প্রথম বৈদ্যুতিক সাবমেরিন তৈরি করে স্প্যানীয় নৌসেনা। কিন্তু জুল ভার্ন, তারও ১৮ বছর আগে, অর্থাৎ ১৮৭০ সালে বৈদ্যুতিক সাবমেরিনের কথা লিখেছেন Twenty Thousand Leagues Under the Sea’ নামক তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় উপন্যাসটিতে সেখানে তিনি একটি ডুবোজাহাজের কথা লিখেছিলেন যাতে চেপে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্যাপ্টেন নিমো সাগরতলে ঘুরে বেড়াতেনক্যাপ্টেন নিমোর সেই তিমিমাছের আকৃতির বিশাল ডুবোজাহাজটির নাম ছিল নটিলাস সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সেই ডুবোজাহাজটি চলত বিদ্যুতের সাহায্যে! এই উপন্যাসটি এমন একটি সময়কালে লেখা যখন সাবমেরিন তো দূরের কথা, বিদ্যুতের সাহায্যে যে কোনও যানবাহন চালানো যেতে পারে এটাও কারোর জানা ছিল না


হেলিকপ্টার (Helicopter)
সেই আদিম কাল থেকে নীল আকাশে পাখিদের উড়তে দেখে মানুষও চেয়েছে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে। দীর্ঘ মানব ইতিহাসজুড়ে আমরা দেখেছি কৃত্রিমভাবে আকাশে উড়বার সেই তীব্র প্রচেষ্টা। ১৫০২ সালে ‘Codex on the Flight of Birds’ শীর্ষক হাতে লেখা পুঁথিতে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পাখিদের ডানার আকৃতি-প্রকৃতির ওপর গবেষণা করে মানুষ্যশক্তি চালিত উড়োজাহাজের নকশা তৈরি করেছিলেন অবশেষে ১৯০৯ সালে মার্কিন ভাতৃদ্বয় উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট প্রথম সফলভাবে যান্ত্রিকশক্তি সম্পন্ন বিমান উদ্ভাবন করেন। তার অনেক পরে, ১৯৩৬ সালে, Focke-Wulf Fw 61 নির্মিত হয়, যা ছিল পৃথিবীর প্রথম সফলভাবে কার্যকরী হেলিকপ্টার। কিন্তু তার বহু আগেই জুল ভার্ন এক ভবিষৎ স্বপ্নের উড়ানের কথা কল্পনা করেছিলেন১৮৮৬ সালে, ‘Robur the Conqueror উপন্যাসে জুল ভার্ন যখন বাতাসের তুলনায় ভারী একটি মোটরচালিত উড়োজাহাজের কথা লিখেছিলেন তখন যান্ত্রিকশক্তি সম্পন্ন উড়োজাহাজের কথা কেউ ভাবতেও পারত না। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রোবার দ্বারা উদ্ভাবিত উড়োজাহাজ ‘আলবাট্রস’ আসলে একটি বিশাল ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, যাকে মাটির সাথে সমান্তরাল ও সারিবদ্ধভাবে সাজানো চালকপাখা বা প্রপেলর দ্বারা মাটি থেকে শূন্যে উত্তোলিত করা হয়। আলবাট্রসকে তাই আধুনিক হেলিকপ্টারের পূর্বপুরুষ বলা হয়ে থাকে


লুনার মডিউলস (Lunar Modules)
১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে অ্যাপোলো ১১ মিশনের সাফল্যের মধ্য দিয়ে প্রথম দুটি মানুষ নীল এল্ডেন আর্মস্ট্রং এবং এডউইন ইউজিন অলড্রিন ‘ঈগল’ নামে লুনার মডিউলে চেপে চাঁদে অবতরণ করেছিলেন মানুষ চাঁদে যাওয়ার অনেক আগে, ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত ‘From the Earth to the Moon’ উপন্যাসে জুল ভার্ন চাঁদে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ যন্ত্রের কথা বর্ণনা করেছিলেন। শঙ্কু-আকৃতির সেই যন্ত্রটি এখনকার রকেটগুলোর মাথায় বাসানো স্পেস ক্যাপস্যুল বা লুনার মডিউলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। জুল ভার্ন যন্ত্রটির নাম রাখেন ‘প্রোজেক্টাইল’, যা পৃথিবী থেকে চাঁদে তিনজন যাত্রী বহনে সক্ষম। এই যন্ত্র চালানোর জন্য জুল ভার্ন পাহাড় চূড়ায় বসানো একটি ৯০০ ফুট লম্বা কামানের কথা কল্পনা করেন, যা এই প্রজেক্টাইলকে অভিকর্ষের বাধা পেরিয়ে মহাকাশে নিক্ষেপ করবে


সৌরপাল (Solar sails)
সৌরপাল একটি যন্ত্র, যার বড়ো বড়ো আয়নায় সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়ে উৎপন্ন বিকিরণ চাপ কাজে লাগিয়ে সৌরশক্তি উৎপাদিত হয়। সেই সৌরশক্তি দ্বারা মহাকাশযান চালানো হয়। ২০১০ সালের ২১ মে Japan Aerospace Exploration Agency (JAXA) প্রথম আন্তগ্রহ সৌর পাল মহাকাশযান ‘IKAROS (Interplanetary Kite-craft Accelerated by Radiation Of the Sun) শুক্রগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে। এটিই সম্পূর্ণরূপে সূর্যালোকে চালিত প্রথম সফল সৌরপাল মহাকাশযান ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত From the Earth to the Moon উপন্যাসে জুল ভার্ন সৌরশক্তি চালিত এমনই একটি কাল্পনিক মহাকাশযানের কথা লিখেছিলেন।


আকাশলিখন (Sky writing)
১৮৮৯ সালে প্রকাশিত ‘In the Year 2889’ নামক ছোটোগল্পে atmospheric advertisement নামে এক বিশেষ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার পদ্ধতির কথা বলেন জুল ভার্ন। আকাশে মেঘের মতো ভেসে বেড়ানো বিজ্ঞাপনের সেই অতিকায় অক্ষরগুলো সবাই মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেজুল ভার্নের কল্পনার সেই আকাশলিখন আজ বাস্তব। এখন অতি সহজেই ছোটো বিমান থেকে নির্গত ধোঁয়ার সাহায্যে আকাশে লিখে ফেলা যায় ছোটোগল্পটি প্রকাশিত হবার প্রায় ২৬ বছর পর ১৯১৫ সালে আমেরিকায় প্রথম আকাশে লেখার খবর পাওয়া যায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আকাশ লিখন শুরু হয় ১৯৩২ সাল থেকে


ভিডিও কনফারেন্স (Video Conference)
In the Year 2889 ছোটোগল্পে জুল ভার্ন ‘phonotelephote’ নামক একটি প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক বা একাধিক মানুষ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে বসে অন্য এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে ‘রিয়েল টাইম’-এ কথা বলতে পারবেন এবং তারযুক্ত একটি সুগ্রাহী আয়নায় তারা পরষ্পরের ছবিও দেখতে পারবেন বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে এই প্রযুক্তিটি অতি সহজলভ্য ‘ভিডিও কনফারেন্স’ নামে পরিচিত অবাক হতে হয়, ছোটোগল্পখানি লেখার প্রায় ১০০ বছর পরে, অর্থাৎ ১৯৯০ এর দশক থেকে ইন্টারনেটের সাহায্যে আমরা ইয়াহু মেসেঞ্জার, স্কাইপি ইত্যাদির মাধ্যমে হামেশাই ভিডিও কনফারেন্সিং করে থাকি নিঃসন্দেহে phonotelephote আজকের ভিডিও কনফারেন্সিং প্রযুক্তির অগ্রদূত


সরাসরি সংবাদ সম্প্রচার (Newscasts)
In the Year 2889 ছোটোগল্পটিতে জুল ভার্ন সংবাদপত্রের একটি বিকল্প বর্ণনা করেছিলেন কাগজে দৈনিক খবর না ছাপিয়ে, প্রতিদিন সকালে Earth Chronicle থেকে একজন প্রতিনিধি খবর পাঠ করবেন এবং বিশ্বের যে কোনও মানুষ চাইলেই সেদিনের খবর শুনতে এবং দেখতে পারবেন। জুল ভার্ন এই কাল্পনিক বর্ণনাটি দেওয়ার প্রায় ৩০ বছর পর প্রথম টেলিভিশন উদ্ভাবিত হয় ১৯২৭ সালে আমেরিকার ফাইলো টেইলোর ফার্নসওয়ের্থ প্রথম বৈদ্যুতিন টেলিভিশন উদ্ভাবন করেন১৯৩৯ সালে মার্কিন সংবাদ পাঠক লোয়েল থমাস প্রথম টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপন করেন


বৈদ্যুতিক শক অস্ত্র (Electroshock Weapon)
১৮৭০ সালে প্রকাশিত ‘Twenty Thousand Leagues Under the Sea’ উপন্যাসে জুল ভার্ন এক আশ্চর্য কাল্পনিক অস্ত্রের কথা লিখেছিলেন, The Leyden Ball Gun। সেই অস্ত্রে ব্যবহৃত হয় অদ্ভূত প্রকৃতির বুলেট, Leyden Ball। সেই বুলেটগুলি আসলে বৈদ্যুতিক শক্তি সঞ্চারিত ক্ষুদ্র ধাতব গোলক যা অনায়াসে শত্রুকে ঘায়েল করতে পারে। জুল ভার্ন প্রদত্ত এই ধারণাটির একটি বৈকল্পিক রূপ আধুনিক Taser Gun ২০০৫ সালে U.S. Department of Homeland Security ভার্নের ধারণার আরও কাছাকাছি একটি বৈদ্যুতিক অস্ত্র Piezer gun নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন২০০৯ সালের ২৭ জুলাই X3 নামে একটি নতুন ধরনের Taser Gun বাজারে মুক্তি পেয়েছে

আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাই, জুল ভার্নের মতো এক ব্যতিক্রমী কল্পনার কারিগরের অনেক কল্পনাই আজ আর কল্পবিজ্ঞান নয়, দৈনন্দিন বাস্তব তাই ১৮৬৩ সালে Five Weeks in a Balloon উপন্যাসটি প্রকাশের পর থেকে আজ অবধি শুধুমাত্র সাহিত্য জগতের রথী-মহারথীদের দ্বারাই নয়, বিজ্ঞান ও ভূগোল শাখার বহু পন্ডিতদের দ্বারা তিনি সমানভাবে সমাদৃত হয়েছেন। তাঁর কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যধারার অনুগামী একদল সম্ভাবনাময় তরুণ লেখক একদিকে যেমন তাঁকে ভালোবেসে গড়ে তুলেছিলেন ‘Jules Verne Cult, তেমনই বিজ্ঞানী এবং অভিযাত্রীরা তাদের আবিষ্কার ও সাফল্যের পেছনে ভার্নের প্রভাবকে স্বেচ্ছায় উল্লেখ করেছেন বার বার উন্নত সাবমেরিন নির্মাণের অগ্রদূত সাইমন লেক দাবী করেছেন, মার্কিন নৌ-বাহিনীর জন্য প্রথম সাবমেরিন নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন জুল ভার্নের লেখা ‘Twenty Thousand Leagues Under the Sea’ উপন্যাসটি পড়ে। ফরাসী সমুদ্রবিজ্ঞানী জ্যাক কাস্টিউ এই বইটিকে ‘জাহাজের বাইবেল’ নামে আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়া, প্রথম সাফল্যের সঙ্গে বিপুল হারে হেলিকপ্টার উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ইগোর সিকোরস্কি প্রথম সফল হেলিকপ্টার আবিষ্কারের পেছনে জুল ভার্নের ‘Robur the Conqueror’ উপন্যাসটিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন জানা যায়, রকেটবিজ্ঞানী কনস্ট্যান্টিন টিয়োলকোভস্কি, রবার্ট গডডার্ড এবং হারমান ওবার্থ প্রত্যেকেই ভার্নের লেখা ‘From the Earth to the Moon’ উপন্যাসটি থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছিলেন অ্যাপোলো ১১ মিশনের মহাকাশচারী নীল এল্ডেন আর্মস্ট্রং এবং এডউইন ইউজিন অলড্রিন ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই সফলভাবে চাঁদের মাটিতে নেমে জুল ভার্নকে বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন।
২০০৬ সালে প্রকাশিত জেমস এডউইন গানের লেখা ‘Inside Science Fiction’ বইটি পড়ে জানা যায়, মার্কিন মেরু অভিযাত্রী রিচার্ড ইভলিন বার্ড প্রথম আকাশপথে দক্ষিণ মেরু পৌঁছে জুল ভার্নের ‘The Adventures of Captain Hatteras’ এবং ‘An Antarctic Mystery’ উপন্যাস দুটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিলেন কিংবদন্তি মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন পাওয়েল হাবল কৈশোরে ভার্নের লেখা উপন্যাস, বিশেষ করে ‘From the Earth to the Moon’ এবং ‘Twenty Thousand Leagues Under the Sea’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে বিজ্ঞান অন্বেষণের পথে যাত্রা করেছিলেন। আধুনিক গুহাবিজ্ঞানের জনক এডওয়ার্ড অ্যালফ্রেড মার্টেল বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক রিপোর্টগুলিতে বার বার উল্লেখ করেছেন, ভার্নের লেখা ‘Mathias Sandorf’ উপন্যাসটি পড়ে গুহাসংক্রান্ত বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহ বেড়েছে আরেক সুপ্রসিদ্ধ গুহা-বিশেষজ্ঞ নর্বার্ট ক্যাস্টেরেটের মতে, যৌবনে ভার্নের লেখা ‘Journey to the Center of the Earth’ উপন্যাসটি পড়ে তাঁর গুহা, ভূগর্ভ এবং ভূগর্ভস্থ নদী বিষয়ে গবেষণা করবার ইচ্ছে জন্মায় মার্কিন রোবটিক্স বিশেষজ্ঞ ডেভিড হ্যানসন জুল ভার্নের স্মরণে তাঁর উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এবং কথোপকথনে সক্ষম যন্ত্রমানব বা রোবটের নাম রেখেছেনজুল
১৮৭০ সালে জুল ভার্নকে ‘Chevalier de la Legion d'honneur’ (Knight of the Legion of Honour) নামে ফ্রান্সের Order of Merit সম্মানে ভূষিত করা হয়। ১৮৯২ সালে তাঁকে ‘Officier de la Legion d'honneur’ (Officer of the Legion of Honour) সম্মানে উন্নীত করা হয় ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ থাকাকালীন ১৯০৫ সালের ২৪শে মার্চ উত্তর ফ্রান্সের আমিয়েন্স শহরে নিজের বাসভবনে তিনি পরলোকগমন করেন মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর আমিয়েন্স শহরে জুল ভার্নের একটি স্মারকসৌধ আছে
ভাবতে অবাক লাগে, উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের প্রায় শৈশবকালে শুধুমাত্র কল্পনা ও গবেষণার ভিত্তিতে লেখা তাঁর অসামান্য কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য আজকের অত্যাধুনিক ডিজিটেল ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও সমান জনপ্রিয়! তবে ভার্নের কালজয়ী সাহিত্যকীর্তিকে শুধু কল্পবিজ্ঞান বললে ভুল বলা হবে তাঁর একেকটি উপন্যাস যেন একেকটি স্বপ্ন, যা আমাদের রোমাঞ্চিত করে, দেখায় আগামীর স্বপ্ন, ভাবতে শেখায় নতুন করে তাঁর প্রতিটি কল্পনার মাঝে উঁকি দেয় আজকের বর্তমান, আর ফেলে আসা দিনের জন্য সোনালি ভবিষৎ প্রকৃত অর্থে জুল ভার্ন একজন সফল কল্পনার পথিকৃত, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, একজন ভবিষ্যতদ্রষ্টা উইলিয়াম বুচারের লেখা ‘Verne's journey to the centre of the selfগ্রন্থটির ভূমিকায় সারা বিশ্বে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ওপর ভার্নের প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক রে ডগলাস ব্র্যাডবারি যথার্থই লিখেছেন, “আমরা সবাই কোনও না কোনওভাবে ভার্নের সন্তান।”
কে জানে, হয়তো বা আমাদের সবার কল্পনার মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে আগামী পৃথিবীর বাস্তব!

_____

No comments:

Post a comment