প্রবন্ধ:: গোঁফ-দাড়ির জঙ্গলে - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ


গোঁফ-দাড়ির জঙ্গলে
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

ম্যাজিক ল্যাম্প তো কিশোরদের জন্য আর কিশোর মানেই তাদের হালকা হালকা গোঁফ-দাড়ির রেখা দেখা দিচ্ছে। অনেকের তো মনটা ছটফট করছে কবে বাবার শেভিং সেটটার দখল নিতে পারবে। গোঁফ-দাড়ি কিন্তু ভারি শখের জিনিস। গোঁফ চুরি গেছিল বলে হেড অফিসের বড়বাবুর যে মাথা খারাপের জোগাড় হয়েছিল তা তো সবাই জান। দাড়ি-গোঁফ কিন্তু সব ছেলের কপালে জোটে না। অনেকের তো দাড়ি-গোঁফ বেরোয়-ই না। বাংলায় তাদের বলে মাকুন্দ। দাড়ি বললেই নিশ্চয় তোমাদের চোখের সামনে কবিগুরুর শ্বেতশুভ্র দাড়িশোভিত মুখমন্ডলটি ভেসে ওঠে আর গোঁফের কথা উঠলেই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির সাথে চার্লি চ্যাপলিনের কথা ভাবোআজ আমি তোমাদের গোঁফ-দাড়ি সংক্রান্ত কিছু মজার তথ্য জানাব।
তোমরা তো ম্যাসিডনের সম্রাট আলেকজান্ডারের নাম সকলেই জানো, কিন্তু একটা খবর কি জানা আছে যে তিনি তাঁর সব সৈনিকদের দাড়ি কামাতে বাধ্য করেছিলেন কারণ তাঁর নিজের দাড়ি খুব একটা দৃষ্টিনন্দন ছিল না! আরও একটা মজাদার কারণ ছিল আলেকজান্ডারের এরকম আদেশের পেছনে। তাঁর ধারণা ছিল যে সৈনিকদের লম্বা দাড়ি থাকলে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা তাদের দাড়ি ধরে কাছে টেনে নিয়ে সহজেই ছুরিকাঘাত করতে পারবে। গ্রিকদের আবার বেশ কোঁকড়ানো ধরনের দাড়ি খুব পছন্দের ছিল। গ্রিকদের কথা বলছি  যখন রোমানদের কথা তো বলতেই হয়। প্রাচীন কালে রোমান দার্শনিকরা আবার প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দাড়ি রাখতেন। এই দাড়ির রকমফের দেখেই বোঝা যেত কে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ভাবো একবার, একটা স্কুল কী কলেজের মাস্টারমশাইরা সবাই একরকম দাড়ি নিয়ে ঘুরছেন, কল্পনা করলেও তো আমার হাসি পাচ্ছে। রোমান সম্রাট প্রথম ফ্রেডরিকের পদবিই ছিল বারবারোসা বা লাল দাড়ি। এবার যাওয়া যাক মমির দেশ মিশরে। তোমরা ভাবো চুলে বিভিন্ন রং করা আধুনিক কালের ফ্যাশন, কিন্তু জানো কী প্রাচীন মিশরের অধিবাসীরা দাড়িতে রং করতে ভীষণ ভালোবাসতেন। তখন তো এত সব ব্র্যান্ডেড কালার ছিল না, তাই হেনা দিয়েই তাঁরা শখ পূরণ করতেন। মিশরীয় রানি হাটসেপশুট পুরুষের বেশে প্রায় একুশ বছর রাজ্য শাসন করেছিলেন। তাঁর ছদ্মবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল একটি নকল ধাতব দাড়ি। রাশিয়ার গল্প আবার আরও মজাদার। রাশিয়ান জার পিটার দ্য গ্রেট দেশের মানুষদের আধুনিক করার উদ্দেশ্যে সকল পুরুষদের দাড়ি কামানো বাধ্যতামূলক করেছিলেন। দাড়ি রাখতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের টাকা দিয়ে তামা অথবা রুপোর টোকেন কিনতে হত। টোকেনের দাম আবার পেশা অনুযায়ী বিভিন্ন হত। বুদ্ধিজীবী এবং সরকারি অফিসারদের জন্য ষাট রুবল, প্রথম সারির ব্যবসায়ীদের জন্য ছিল একশ রুবল। শহরের রাস্তায় কোনও দাড়িওয়ালা লোক গেলেই তাঁকে টোল দিতে হত। দাড়ির জন্য টোল, ভাবা যায়! 1535 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি প্রজাদের দাড়ির ওপরে কর বসান, যদিও তাঁর নিজেরও দাড়ি ছিল। তিনিও পেশার ওপর ভিত্তি করে কর নির্ধারণ করতেন। তাঁর কন্যা প্রথম এলিজাবেথও এই কর বজায় রেখেছিলেনতবে রাশিয়ান জার তৃতীয় আলেকজান্ডার, ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় নেপোলিয়ন, জার্মানির রাজা তৃতীয় ফ্রেডরিক, ভারতবর্ষের মুঘল সম্রাটরা প্রত্যেকেই গোঁফ-দাড়ি রাখতে বেশ পছন্দ করতেন। ভারতবর্ষের মারাঠা শাসকরা আবার বেশ শৌখিন একখানা গোঁফ রাখতেন। নানাসাহেব, পেশোয়া বাজিরাওয়ের ছবি দেখলেই বুঝতে পারবে।


বিভিন্ন খেলোয়াড়দের মধ্যে আবার দাড়ি-গোঁফ নিয়ে মজাদার সব কুসংস্কার আছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য 1976 সালে উইম্বলডনের চারদিন আগে সুইডিশ কিংবদন্তি বিয়র্ন বর্গ হঠাৎ ঠিক করেন যতক্ষণ তিনি টুর্নামেন্টে টিকে থাকবেন ততক্ষণ দাড়ি-গোঁফ কামাবেন না। ফাইনালে আরেক কিংবদন্তি জন ম্যাকেনরোর কাছে হারার পর তিনি গোঁফ-দাড়ি কাটেন। আবার আমেরিকান পেশাদার বেসবল প্লেয়ার ব্রায়ান উইলসন 2010 সালে পণ করে বসেন যতদিন তাঁর টিম সানফ্রানসিস্কো জায়েন্ট ওয়ার্ল্ড সিরিজে টিকে থাকবে ততদিন তিনি দাড়ি-গোঁফ কামাবেন না। ব্রায়ানের দেখাদেখি তাঁর ভক্তকুলও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে শুরু করে। কিছু অত্যুৎসাহী ভক্ত তো আবার নকল দাড়ি-গোঁফ লাগাতে আরম্ভ করে। তোমরা যে বিরাট কোহলির দাড়ি বেশ পছন্দ কর তা আমি বিলক্ষণ জানি।
বিখ্যাত ব্যক্তিদের গোঁফপ্রীতির নানা মজার মজার ঘটনা শোনা যায়। প্রখ্যাত চিত্রকর সালভাদর দালি তাঁর মোম বাঁধানো গোঁফটিকে বলতেন ব্যক্তিগত রেডার। জর্জ বার্নার্ড শ আবার মুখের বসন্তের দাগ লুকোতে দাড়ি রাখতেন। কিউবার প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান ফিদেল কাস্ত্রোকে তাঁর অনুরাগীরা আদর করে এল বাবুর্ড বা দাড়িওয়ালা বলে ডাকেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দাড়িশোভিত চেহারাটি তো সবার পরিচিত। হিটলার আর চার্লি চ্যাপলিনের যে গোঁফ দেখে আমরা অভ্যস্ত তাকে বলে টুথব্রাশ গোঁফ। এই স্টাইলের বিশেষত্ব হল ঠোঁটের মধ্যবর্তী অংশে তিন থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার গোঁফ রেখে বাকি অংশ কেটে ফেলা হয়। ইউরোপের নামি চিত্রকর ভ্যান্ডাইকের দাড়ির মতো দাড়ি আবার ভ্যান্ডাইক দাড়ি নামে খ্যাত। জানা আছে কী গাল ভর্তি দাড়ি যখন কুচো মাংসের মতো দেখতে হয় তাকে বলে মাটন চাপ দাড়ি। একটা হাসির কথা বলি - একরকম পেয়ালা পাওয়া যায়, তাতে অর্ধেক ঢাকনা দেওয়া থাকে যাতে চা পান করার সময় চায়ে গোঁফ না ডুবে যায়। এই পেয়ালাকে গোঁফ পেয়ালা বলা হয়। একটা কথা জেনে রাখো, সকালে দাড়ি কামানোর পর বিকেলে যে আবছা দাড়ি দেখা যায় তাকে বিকেল পাঁচটার ছায়া বলে।
আমার বীরপুরুষ কিশোর বন্ধুরা অনেকেই যে টিকটিকি, আরশোলা দেখলে আতঙ্কে বাড়ি মাথায় কর তা আমি জানি, কিন্তু তোমরা জানো কি অনেক মানুষ দাড়িকে ভয় পান! দাড়িওয়ালা কোনও মানুষ কাছে চলে এলে তাঁদের হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, রীতিমতো অসুস্থ বোধ করেন তাঁরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগের নাম পোগনো ফোবিয়া। গ্রিক ভাষায় পোগনো মানে দাড়ি আর ফোবস মানে ভয়। আবার যাদের অতিরিক্ত গোঁফ-দাড়িপ্রীতি তাদের বলা হয় পোগনোফিলিক।
পৃথিবীতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়, তো গোঁফ-দাড়ি নিয়েও হবে এ আর বিচিত্র কী! 1970 সালে প্রথম দাড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতা হয় উত্তর ইটালিতে তারপর 1990 সালে জার্মানির হফনার বিয়ার্ড ক্লাব দাড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। 2004 সালে তৈরি হয় World beard and Moustache Association 2007 থেকে শুরু হয় World beard and Moustache Championship প্রতি দুবছর অন্তর বসে এই প্রতিযোগিতার আসর। 2013 সালে আবার জার্মানিতে হয়েছিল world Beard and Moustache Championship, এখানে একলা ইউ.এস.এ টিমই দশটি ট্রফি জিতেছিল। গোঁফ, আংশিক দাড়ি, পুরো দাড়ি এই তিন বিভাগের ওপর ভিত্তি করে প্রতিযোগিতা ছিল। মূলত তিনটি বিষয় দেখা হয় - গোঁফ-দাড়ির স্টাইল, ব্যক্তিত্ব আর সামগ্রিক উপস্থিতি। তবে নকল গোঁফ-দাড়ি নৈব নৈব চ। 2017 সালে টেক্সাসের অস্টিনে বসেছিল এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড়ো প্রতিযোগিতা। তেত্রিশটি দেশের মোট 738 জন প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিলেন। 2019 সালে বেলজিয়াম আর 2021 সালে নিউজিল্যান্ডে বসবে এই আসর। তাহলে বন্ধুরা, ইচ্ছে যদি থাকে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার, এখন থেকে লেগে পড়ো গোঁফ-দাড়ির জঙ্গল তৈরি করতে। আমার শুভেচ্ছা রইল তোমাদের জন্য।

_____
ছবি - আন্তর্জাল

মগজাস্ত্র:: এপ্রিল ২০১৮


মগজাস্ত্র
অনন্যা দাশ ও সহেলী চট্টোপাধ্যায়

ম্যাজিক ল্যাম্পের দৈত্য এইবার কিছু প্রশ্ন করবে তোমাদের।

১। ‘ভালোর ভালো বলে এই দুনিয়ায় কিছুই তো নাই। মন্দের ভালোই সত্যিকারের ভালো। তাই নিয়েই খুশি থাকতে হয়’ - এই উক্তি কোন বিখ্যাত রম্যরচনাকারের?
২। পটলা, হোঁৎকা, ফটিক এই চরিত্রগুলো আমরা কোন লেখকের রচনায় পাই?
৩। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় রচিত মজার চরিত্রটির নাম কী?
৪। টেনিদার হাইট কত ছিল?
৫। বীরবলের আসল নাম কী ছিল?

    

৬। কোন রাজার সভা অলঙ্কৃত করেছিলেন হাস্যরসিক এবং কবি তেনালিরামণ?
৭। বোম্বাগড়ের রাজা ছবির ফ্রেমে কী লুকিয়ে রাখত?
৮। লাউ চিংড়ি খাবারের সঙ্গে বাংলার কোন হাস্য রসিকের নাম জড়িয়ে আছে?

    

৯। মজার চরিত্র অবিনাশ বাবুকে আমরা কোন লেখকের রচনায় পাই?
১০। দুটি মিষ্টি মেয়ে মুটকি আর শুঁটকি। এদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে মজার কমিকস হয়েছে অনেক। তোমরা কি বলতে পারবে রচয়িতার নাম?

  

উত্তর
১। হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তী।
শক্তিপদ রাজগুরু।
৩। পিণ্ডিদা।
৪। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি।
৫। মহেশ দাস।
৬। বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেব রায়।
৭। আমসত্ত্ব ভাজা।
৮। গোপাল ভাঁড়।
৯। সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কু’র কিছু গল্পে।
১০। নারায়ণ দেবনাথ।
_____
ছবি - আন্তর্জাল

ভ্রমণ:: টো টো কাহিনি (চতুর্থ পর্ব) - তাপস মৌলিক


টো টো কাহিনি
তাপস মৌলিক

তিরিশ বছর আগের কথা। কলেজে পড়ি, হোস্টেলে থাকি। পড়াশুনো তো ঘন্টা করি! খালি আড্ডা, সিনেমা আর দু’দিন ছুটি পেলেই ক’জন বন্ধু মিলে যেখানে-সেখানে বেরিয়ে পড়া, ঘুরতে। কিন্তু ঘুরব যে, পকেট তো ঢুঢু! প্রধান ভরসা তাই এগারো নম্বর, শোওয়ার জন্য হট্টমন্দির খুঁজি, খাওয়ার জন্য ‘যত্রতত্র’ নামের কোনও হোটেল। সদ্য লায়েক হয়েছি, দুনিয়ার কাউক্কে পরোয়া করি না, যদি কেউ উলটো গায় তো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দি। তখন ভাবতাম হুজুগ, নেশা। এখন বুঝি, নিজেদের অজান্তেই কখন যেন কলেজ ছাড়িয়ে আদি ও অকৃত্রিম এই পৃথিবীর পাঠশালার ছাত্র হয়ে গেছিলাম...

ওরগ্রাম

“তোর মতলবটা কী বল তো ভাস্কর? শেষকালে ডোবাবি না তো!” শুভজিৎ বলল।
নিরুপমের গানের তালে তালে ট্রেনের কাঠের সিট বাজাতে বাজাতে ভাস্কর বলল, “আরে না রে বাবা, রিল্যাক্স। তুই আমাকেও ভরসা করতে পারছিস না? রবীন্দ্রনাথ কী বলে গেছেন মনে নেই? মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।”
সকালের বর্ধমান লোকাল। পাঁচজন ওরগ্রাম যাব বলে বেরিয়েছি। আমি, ভাস্কর আর শঙ্কর আগেও একবার গেছি সেখানে। এবারে সঙ্গে জুটেছে শুভজিৎ আর নিরুপম। গতকাল থার্ড ইয়ারের টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই হোস্টেলে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। কোথাও একটা ঘুরে আসতে হবে। কিন্তু চিরকালীন সেই সমস্যা – হাতে পয়সাকড়ি একদম নেই। বর্ধমান যাওয়ার একটা সুবিধে হল ভাস্কর সঙ্গে থাকলে টিকিট কাটার পয়সাটা লাগে না, কোনও না কোনও উপায়ে ভাস্কর প্রতিবার ম্যানেজ করে ফেলে। এবারও ভাস্কর বলেছে, “টিকিটের চিন্তা নেই। ওটা আমার ওপর ছেড়ে দে।” তবু সবার মনেই একটু টেনশন আছে। শুভজিৎ সেটা ভাষায় প্রকাশ করে ফেলেছে, এই যা!
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধে হয়। বর্ধমান লোকালে টিটিই-র দেখা পাওয়া সুন্দরবনে বাঘের দেখা পাওয়ার চেয়েও দুর্লভ। অথচ কিনা আজই এই ভোরবেলা, পরের স্টেশন থেকেই একজন কালো কোট টিটিই আমাদের কামরায় উঠে এলেন। ভাস্করের ইঙ্গিতে আমাদের গানবাজনা চালু রইল। কিন্তু ভবি ভুললে তো! এদিক ওদিক একটু ঘুরে টিটিই সটান হাজির আমাদের সামনে, “ভাই, তোমাদের টিকিটগুলো?”
ভাস্কর ‘টিকিট আমার কাছে’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে ওপরের বাঙ্ক থেকে ওর কাপড়ের ব্যাগটা নামাল। তারপর তার ভেতর থেকে বার করল একটা ছোটো স্বচ্ছ পলিথিনের প্যাকেট। সেই প্যাকেটের ভেতর দেখি অল্প একটু কেমন হলদেটে রঙের একটা তরল পদার্থ, আর ভিজে ন্যাতা হয়ে যাওয়া কতগুলো টিকিট।
“দাদা, হাওড়া স্টেশনে টিকিটগুলো ইউরিনালে পড়ে গিয়ে ভিজে গেছিল, তাই এই প্লাসটিকটায় ভরে রেখেছি। বার করে দেখাব?”
টিটিই ভদ্রলোকের মুখটা দেখলাম ঘেন্নায় কেমন একটা হয়ে গেল। “অ্যাঃ, না না বার করতে হবে না, ঠিক আছে,” বলে উনি কার্ল লিউইসের চেয়েও বেশি স্পিডে উলটোদিকে চলে গেলেন।
ভাস্কর অম্লানবদনে ফের পলিথিনের প্যাকেটটা ব্যাগে ভরে রাখছে দেখে শুভজিৎ আর থাকতে না পেরে বলল, “ওগুলো আবার ব্যাগে ঢোকাচ্ছিস!”
ভাস্কর চাপা গলায় বলল, “ঢোকাব না তো কী? এসব আমার অস্ত্রশস্ত্র। তুই কি ভেবেছিস সত্যি? আরে দূর! টিকিটগুলো সব এক বছর আগের। আর লিকুইডটা প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল দুধছাড়া র’ চা। মাঝে মাঝে লিকুইডটা শুধু রিপ্লেনিশ করতে হয়।”

বর্ধমান বাসস্ট্যান্ডে পেটপুরে লুচি তরকারি খেয়ে গুসকরা যাওয়ার একটা বাসের ছাদে উঠে বসলাম। বাসটা ওরগ্রাম হয়ে যাবে। ভেতরে অকথ্য ভিড়, তাই ভেতরে ঢোকার চেয়ে ছাদে বসা অনেক আরামের। ছাদে অবশ্য প্রচুর লোক। তাছাড়া আছে একগাদা ঝাঁকা, আলুর বস্তা, কতগুলো মুরগি ইত্যাদি ইত্যাদি। মার্চ মাসের প্রথম দিক। গরম খুব একটা নেই, শীতও কমে গেছে। বাস ছাড়তেই তারস্বরে আমাদের গান শুরু হল। শহর ছাড়িয়ে যেতে রাস্তার দু’পাশে শুরু হয়েছে সারি দিয়ে লাগানো গাছ আর তার পেছনে আদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত। রাস্তার ধারের গাছগুলোর কিছু কিছু ডালপালা বিপজ্জনকভাবে নিচু। একটু অন্যমনস্ক হলেই মাথায় ডালের ঝাপটা লাগার সম্ভাবনা। রিফ্লেক্সটা এখানে খুব জরুরি। মাথা বাঁচিয়ে আর ঝাঁকা-বস্তা জড়িয়ে বিস্তর ঝাঁকানি খেতে খেতে গেয়ে চলা আমাদের গানগুলো অনায়াসে উচ্চাঙ্গ সংগীত হয়ে যাচ্ছিল। ছাদে বসা আমাদের সহযাত্রীরা বেশ মজা পেয়ে গেলেন। সবাই বর্ধমানের বাজার ফেরত গ্রাম্য লোক। দু-একজন গলা মেলাতে শুরু করলেন আমাদের সঙ্গে। তারপর একজন একটা পল্লীগীতি ধরলেন, শেষ হওয়ার পর আরেকটা, তারপর আরও একটা, গেয়েই চললেন। ভালোই চলছিল, এমন সময় বাসটা এক জায়গায় দাঁড়াল, আর বেরসিক কন্ডাকটরটা ‘টিকিট’ ‘টিকিট’ করতে করতে ছাদে উঠে এল।
ভাস্কর বলল, “আমরা পাঁচজন আছি, ক’জনের টিকিট কাটতে হবে?”
“ক’জনের মানে? পাঁচটা টিকিট হবে।”
“পাঁচটা কেন? আমরা তো আর বাসের ভেতরে ঢুকিনি। ছাতে উঠেছি। এখানে তো হাফ টিকিট হয়। পাঁচের অর্ধেক আড়াই, মানে দু’জনের টিকিট হবে।”
“বাসের ভেতরে আর ছাতে একই টিকিট। ছাতে উঠতে কে বলেছিল? ভেতরে ঢোকেননি কেন?”
“ভেতরে ঢোকার জায়গা আছে নাকি? মুড়ির টিনের মতো তো ঠেসেছেন! ভেতর থেকে পাঁচজনকে ছাতে পাঠিয়ে দিন, আমরা ভেতরে যাচ্ছি।”
তর্কাতর্কি চলল। শেষে রাগের মাথায় কন্ডাকটর বলল, “আপনাদের টিকিট-ফিকিট কাটার দরকার নেই, যাওয়ারও কোনও দরকার নেই, বাস থেকে নেমে যান।” অপ্রত্যাশিতভাবে এবারে আমাদের পক্ষ নিলেন আমাদের সহযাত্রীদল। তাঁরা বললেন, আমরা নেমে গেলে তাঁরাও নেমে যাবেন। এতক্ষণ যে সবাই মিলে গান গাইলাম তার কি কোনও দাম নেই? আমাদের অভয় দিয়ে বললেন, “পেছনেই আরেকটা বাস আসছে, বাকিটা ওটার ছাদে চড়ে চলে গেলেই হবে।” ছাদ প্রায় ফাঁকা হবার জোগাড়। বেগতিক দেখে কন্ডাকটর দুটো টিকিটেই রাজি হয়ে গেল।

ওরগ্রামে নেমে পিচরাস্তা ছেড়ে ডানদিকে গ্রামের ভেতর ঢুকে যাওয়া কাঁচা রাস্তা ধরলাম। আধমাইল হাঁটলেই ফরেস্ট বাংলো। বেলা প্রায় একটা বাজে। বাংলোর কেয়ারটেকার সোহরাব আলি তখন খেয়েদেয়ে আরাম করে তাঁর ঘরে খাটে আধশোওয়া হয়ে একটা বই পড়ছেন। ভাস্কর ‘কী চাচা, কেমন আছ’ বলে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। সোহরাব চাচা আমাদের পূর্বপরিচিত, আগের বার যখন এসেছিলাম তখন চাচাই কেয়ারটেকার ছিলেন। কী বই পড়ছেন কৌতূহল হওয়ায় বইটা খুলে দেখি, যা ভেবেছি তাই – কালকূট। ভদ্রলোক সমরেশ বসুর সাংঘাতিক ভক্ত। ওরগ্রামের এই বাংলোতে একা একা পড়ে আছেন। নিজেই বাজার করেন, নিজেই রান্নাবান্না করেন। তা সত্ত্বেও প্রচুর সময়। লোকজন তো বড়ো একটা আসে না এখানে, এক মাঝে মাঝে সরকারি অফিসাররা ছাড়া। তাই বলে আলস্যে সময় নষ্ট করার লোক সোহরাব চাচা নন। গ্রামে একটা লাইব্রেরি আছে। প্রতিদিন বিকেলে সেখানে যাওয়া চাচার বাঁধা। ওখানে অনেক খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন পড়া যায়। আর বাংলোয় আছে লাইব্রেরি থেকে আনা কালকূট।
ওরগ্রাম ফরেস্ট বাংলোর বুকিং হয় বর্ধমানের জেলা পরিষদ থেকে। আমাদের কোনও বুকিং-টুকিং নেই। হুট করে চলে এসেছি চাচার ভরসায়। কিন্তু চাচা খুব একটা ভালো খবর শোনাতে পারলেন না। বললেন আজ সন্ধেবেলাতেই ফরেস্ট রেঞ্জার সাহেবের এখানে আসার কথা। উনি এলে বাংলোয় বুকিং নেই এমন কাউকে থাকতে দেওয়া সম্ভব নয়। চাচার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।
মুশকিল! একতলা বাংলোটায় মাত্র দুটো ঘর। অবশ্য সে ঘর দুটো যথেষ্ট বড়ো বড়ো। দুটোর ভেতরেই একটা ছোটো বসার জায়গা, চারটে করে খাট, কিচেন, বাথরুম সব আছে। আমাদের পাঁচজনের একটা ঘরেই অনায়াসে হয়ে যাবে। কিন্তু রেঞ্জার সাহেবের নাকি ফ্যামিলি আর আত্মীয়স্বজন নিয়ে আসার কথা, দুটো ঘরই তাঁর চাই। সাহেবের অবশ্য আসতে দেরি আছে, সেই সন্ধেবেলা। তাই চাচা একটা ঘর আমাদের জন্য খুলে দিলেন। বললেন একটু সাবধানে থাকতে, ঘর-টর অগোছালো না করতে। তবে সন্ধের আগেই অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে, নতুবা বর্ধমান ফেরত।
ভাস্কর বলল, “চল, আগে তো আরাম করে স্নান-টান সেরে নিই, তারপর দেখা যাবে।”
নিরুপম বলল, “তারপর? ব্যাক টু বর্ধমান? শেষে তোদের বাড়িতে থাকতে হবে নাকি?”
ভাস্করের বাড়ি বর্ধমান। বলল, “আরে দেখি না! এসে যখন পড়েছি, ব্যবস্থা কিছু একটা হবে।”

পেল্লায় বাথরুম। শাওয়ার খুলে ঠান্ডা জলে ইচ্ছেমতো স্নান করলাম। শরীর জুড়িয়ে গেল। সঙ্গে খিদেটাও চাগাড় দিয়ে উঠল। দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। এখন এই বেলা দুটোর সময় চাচাকে রান্না করতে বলার কোনও মানে হয় না। তাছাড়া বাজার-টাজার কিছু করা আছে কিনা জানা নেই। তাই সবাই মিলে বেরিয়ে পড়লাম। বড়ো রাস্তার মোড়ে এসে দেখলাম দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। ভাগ্যটা সত্যিই খারাপ মনে হচ্ছে। একটা মুদি দোকান খোলা আছে দেখে পাঁচশো মুড়ি আর একটু সরষের তেল কেনা হল। তারপর মুড়িমাখা দিয়েই লাঞ্চটা সারতে হল।
খেয়েদেয়ে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে ভাস্কর বলল, “চল এবার বশিরের খোঁজে যাওয়া যাক।”
এখানে বশির আর আনসার বলে ভাস্করের দুই বন্ধু থাকে। গতবার একদিনের জন্য এসে আলাপ হয়েছিল। বশিরদের বাড়িটা বাসস্টপ থেকে বর্ধমানের দিকে প্রায় হাফ কিলোমিটার, বাসরাস্তার ধারেই। বিশাল তিনতলা সাদা বাড়ি। ইংরিজী ‘ইউ’ অক্ষরের মতো তিনদিকে ঘোরানো, ইউ-এর ল্যাজদুটো পেছন দিকে, দুটো ল্যাজের ফাঁকে একটা বিশাল পুকুর। বশিরের দাদা এখানকার পঞ্চায়েত প্রধান, বেশ বড়ো নেতা।
বশির বাড়িতে থাকলেও ওর সঙ্গে দেখা করা মানে প্রায় গেছোদাদার সঙ্গে দেখা করার মতো। প্রথমে কাউকে বলতে হবে বশিরের খোঁজে এসেছি। সে গিয়ে ভেতরবাড়িতে খবর দেবে। ভেতরবাড়ির লোক বলবে আগে বাইরের বাড়িতে খুঁজে দেখ। বাইরের বাড়ির লোক বলবে, না ভেতরবাড়িতে থাকার চান্সই বেশি। তারপর ভেতরবাড়ির লোক তিনটে তলার অগুন্তি ঘরে ঘরে খুঁজে এসে বলবে, না পাওয়া গেল না। তখন বাইরের বাড়ির লোক বাইরের বাড়ির তিনটে তলার অগুন্তি ঘরে খুঁজতে শুরু করবে, আর এর ফাঁকে বশির বাইরে এসে বলবে, “আরে, তোরা এখানে? কখন এলি? কী খবর?”
প্রায় পনেরো মিনিট পর বশির ঘুমচোখে নিচে নেমে এল। আমাদের দেখেই উৎসাহে ওর ঘুম-টুম উধাও হয়ে গেল, “আরে! তোরা? কী ব্যাপার? ঘুরতে? থাকবি তো আজ? ফরেস্ট বাংলোতে উঠেছিস? চল, আমিও যাই সেখানে।”
“ফরেস্ট বাংলোতেই তো উঠেছি, কিন্তু কেস গড়বড় আছে। চাচা ঝামেলা করছে।”
রেঞ্জার সাহেবের ব্যাপারটা বশিরকে ব্যাখ্যা করা হল। বশির শুনে বলল, “এতে অসুবিধের কী আছে? আমার এখানে চলে আয়। এত বড়ো বাড়ি রয়েছে।”
“তোদের অসুবিধে নেই জানি। আমাদের আছে। মানে, এখানে থাকার তো কোনও অসুবিধেই নেই, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটাও নিশ্চিন্ত, কিন্তু ঠিক হৈ-হল্লা করা যাবে না। কাল সবে পরীক্ষা শেষ হল, এলাম ফরেস্ট বাংলোয় একটু গা-হাত-পা মেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকব, ঘোরাঘুরি করব, খাব-দাব। কারও বাড়িতে থাকলে ঠিক সেই মজাটা হয় না।”
“তাও ঠিক। তাহলে আরেকটা কাজ করলে হয়। রেঞ্জার সাহেবকেই না হয় আমাদের বাড়ি থাকতে বলব। দাঁড়া, দাদাকে গিয়ে বলি।”
আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে বশির আবার ভেতরে চলে গেল। মিনিট দশেক পর ফিরে এসে বলল, “তোদের কে বলেছে রেঞ্জার সাহেব আজ এখানে আসছে?”
“কেন? সোহরাব চাচা!”
“দূর! দাদাকে গিয়ে বলাতে দাদা তো অবাক হয়ে গেল। বলল, সে কী, আমাকে তো রেঞ্জার সাহেব আজই বর্ধমানে ডেকে পাঠিয়েছেন। দাদা তো একটু পরেই বেরোচ্ছে।”
বোঝা গেল রেঞ্জার সাহেবের প্ল্যান নিশ্চয়ই চেঞ্জ হয়েছে। আমাদের ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। এবার তবে ফিরে গিয়ে পুরো বাংলোটার দখল নিতে হয়। বশিরও আমাদের সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু চাচা কিছুতেই বিশ্বাস করে না! বলে, “হতেই পারে না, উনি নিজে বুকিং করেছেন। এই একটু পরেই এসে পড়লেন বলে। আপনারা আপনাদের ব্যাগ-পত্তর সরান, ঘর খালি করে দিন।”
ঠিক হল, সন্ধে অবধি দেখা যাক অপেক্ষা করে। তারপর যা করার করা যাবে। বশির বলল, “চল তাহলে এখন আনসারের কাছে যাই। ওকেও ধরে নিয়ে আসি।”
ঘর খালি করে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে আমরা ফের বেরিয়ে পড়লাম সবাই মিলে।

ফরেস্ট বাংলো থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে ‘সমন্বয়ী প্রকল্প’ বলে একটা কো-অপারেটিভ আছে। গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে তারপর একটা পিচ রাস্তায় উঠে আমরা চললাম সেদিকে। আনসার সেখানে দরজির কাজ করে, থাকেও সেখানে। খুব ছোটোবেলাতেই আনসারের বাবা-মা মারা গেছেন। তারপর আনসার আর তার দুই দিদি এই সমন্বয়ী প্রকল্পেই বড়ো হয়েছে। বশির ওর স্কুলের বন্ধু। বন্ধুত্ব ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। বড়োলোকের সুখী ছেলে বশিরের সঙ্গে আনসারের বন্ধুত্বের কেমিস্ট্রিটা কী কে জানে!
সমন্বয়ী প্রকল্পের কথা আগেরবার শুনেছিলাম, দেখা হয়নি। চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা। ভেতরে প্রচুর গাছপালা। লোহার গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকে-বাঁদিকে সারি সারি ঘর। সব ঘরেই নানারকম কাজকর্ম চলছে। কোনও ঘরে তাঁত বসানো আছে, কাপড় বোনা হচ্ছে। কোনও ঘরে মেয়েরা শাড়িতে জরির বা সুতোর কাজ করছে। আবার কোনও ঘরে আচার-আমসত্ত্ব তৈরি হচ্ছে, মাদুর-চাটাই বোনা হচ্ছে, হাতপাখা বানানো হচ্ছে, চটের ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। একদিকের একটা ঘরে কয়েকজন কাঠের মিস্তিরি কাজ করছে, ছোটো ছোটো টুল, জলচৌকি, ঠাকুরের আসন তৈরি হচ্ছে। তার পাশের ঘরটা দরজিদের। সেখানে পাঞ্জাবি-পাজামা, কুর্তা, ফতুয়া ইত্যাদি সেলাই হচ্ছে। আনসারকে সেখানেই পাওয়া গেল। প্রকল্পের ভেতরটা আনসারই আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল।
ভেতরদিকে একপাশে সারি সারি ফলের বাগান। পেয়ারা বাগান, আমবাগান, কলাবাগান ইত্যাদি। এসব বাগান থেকে ফল চলে যায় বিক্রির জন্য বাজারে, আবার ভেতরের আচার-আমসত্ত্ব তৈরিতেও কাজে লাগে। পড়ে যাওয়া বা কেটে ফেলা গাছের কাঠ লাগে ছুতোর মিস্তিরিদের। অন্যদিকে পর পর তিন-চারটে বড়ো বড়ো পুকুর। কোনও পুকুরে চিংড়ি মাছের চাষ হয়, কোনওটায় চারাপোনার, জিওল মাছের, তেলাপিয়ার। বাগানে আর পুকুরেও অনেক লোক কাজ করছে। প্রকল্পের ভেতরে পুরো জায়গাটাই পরিষ্কার ঝকঝক করছে। এমনকি ফলবাগানগুলোতেও গাছের নিচের জমি সাফসুতরো করে ঝাঁট দেওয়া, একটাও ঝরা পাতা পড়ে নেই। অজস্র পাখি ডাকছে গাছে। চারদিকে সবকিছু এমন সুশৃংখল মসৃণভাবে হয়ে যাচ্ছে, কোনও কোলাহল নেই, তাড়াহুড়ো নেই, হাঁকডাক নেই - দেখে খুব আশ্চর্য হলাম। এরকম অজ পাড়াগাঁয়ে এমন আধুনিক পেশাদারী কায়দায় পরিচালিত কো-অপারেটিভ সোসাইটি কল্পনাই করতে পারিনি।
সমন্বয়ী প্রকল্প সরকারেরই একটি প্রকল্প। গ্রাম পঞ্চায়েত তার খবরাখবর নিলেও এটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর, স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রকল্প। বশিরের কাছে শুনলাম এটা লাভজনকও বটে। বিপদে-আপদে কিংবা কাঁচামাল কেনার জন্য আগাম লোন হিসেবে সরকার থেকে গ্রান্ট অবশ্যই পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকল্পের জিনিস বাজারে বেচেই ওতে যারা কাজ করে তাদের মাইনে দেওয়া হয়, তারপরেও লাভ থাকে। এককালে এই ওরগ্রামের লোকেদের প্রধান জীবিকা ছিল চুরি-ডাকাতি। এখন গ্রামের অর্ধেকের বেশি মেয়ে-পুরুষ সমন্বয়ীতেই কাজ করে। বাকিরা চাষবাস বা ব্যাবসা করে। বাপ-ঠাকুরদার পেশা ডাকাতি এরা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে। প্রকল্পের ভেতরে কিছু লোকের এবং কিছু অনাথ ছেলেমেয়ের থাকার ব্যবস্থাও আছে। আনসার সেখানেই থাকে। সে অবশ্য বাসস্ট্যান্ডে একটা দরজির দোকানও খুলেছে। সমন্বয়ীতে কাজ করতে হয় সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি। এর আগে-পরে আনসার নিজের দরজির দোকানে বসে। পয়সা জমিয়ে গ্রামে একটা বাড়ি তুলতে চায় আনসার। সমন্বয়ীতে তো সারাজীবন থাকা যাবে না, কেননা তাহলে বিয়ে-শাদি করা যাবে না।

সমন্বয়ী থেকে ফরেস্ট বাংলো ফিরতে সন্ধে গড়িয়ে সাতটা বেজে গেল। দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল যে রেঞ্জার সাহেবের কোনও পাত্তা নেই। দেখি সোহরাব চাচা গালে হাত দিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছে। শঙ্কর বলল, “কী এত ভাবছ চাচা, সাহেব আর আসবেন না।”
চাচা বললেন, “এত এত বাজার করলাম, মুরগি আনলাম, সেগুলো কী হবে এখন?”
“আরে সে জন্য তোমার চিন্তা? আমরা আছি কী করতে? মুরগির ঝোল লাগিয়ে দাও। বশির আর আনসারও এখানেই খাবে আজ। দুটো ঘরই খুলে দাও শিগগির।”
চাচা খুশিমনে চলে গেলেন রান্নাবান্নার জোগাড় করতে, আর একটা ঘর খুলে হই হই করে ঢুকে পড়লাম আমরা। এরপরে যা আরম্ভ হল সেটাকে দক্ষযজ্ঞ, নরক গুলজার, হনুমানের লঙ্কাদহন পর্ব, স্বর্গে মত্ত হস্তীর হানা ইত্যাদি ইত্যাদি নানা উপমায় অলংকৃত করা যায়। আমাদের সাতজনের সমবেত অত্যুচ্চাঙ্গ সংগীতের কনসার্টের ঠেলায় সারা পাড়া সচকিত হয়ে উঠল। ঘরের কিচেনে অনেক বাসনপত্র রাখা ছিল। কেউ যদি মনে করেন এখানে এসে নিজেরাই বাজার করে রান্না করে খাবেন, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা। বশির কতগুলো বড়ো বড়ো ডেকচি আর হাঁড়ি-কলসি কিচেন থেকে বার করে আনল। তারপর হাতা আর খুন্তি দিয়ে শুরু হল সেগুলো পেটানো, উচ্চাঙ্গসংগীতের সঙ্গত হিসেবে। সঙ্গত কারণেই চাচা একবার হাঁ হাঁ করে ছুটে এল ডাকাত পড়েছে কিনা দেখতে। তাকে মিষ্টি করে ফেরত পাঠাল ভাস্কর, “আরে তুমি এখানে কেন আবার! রান্না ফেলে এমন করে আসতে নেই, নুন-টুন কম পড়ে গেলে কী হবে?”
ন’টার সময় ভাত-ডাল বেগুনভাজা আর মুরগির ঝোল দিয়ে এলাহি খাওয়া সারার পর বশির চলে গেল বাড়ি। আনসারও রওনা দিল সমন্বয়ীর দিকে, দশটার সময় সেখানে গেট বন্ধ হয়। আমাদের কনসার্ট তারপরও চলল বেশ কিছুক্ষণ। রাত বারোটার সময় আলো নিভিয়ে সবাই শুয়ে পড়ার পর আমি আর শংকর বেরিয়ে এলাম বাইরে। ওরগ্রামের তখন মাঝরাত। ফরেস্ট বাংলোটা মোটেই জঙ্গলের মধ্যে নয়, বরং একেবারে গ্রামের মধ্যে। শীতের শেষের নিঝুম রাতে আবছা চাঁদের আলোয় তখন চারপাশের মাঠঘাটে কুয়াশার চাদর নেমে আসছে। দূর থেকে শেয়ালের দলের ডাক ভেসে আসছে। ওদের কনসার্ট তখনও শেষ হয়নি।
(এরপর আগামী সংখ্যায়)

_____
ছবিঃ লেখক

মুখোমুখি (ভিডিও) :: এপ্রিল ২০১৮ :: চুমকি চট্টোপাধ্যায় ও রূপা মজুমদার

মুখোমুখি (ভিডিও)

ম্যাজিক ল্যাম্প পত্রিকার তরফ থেকে ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে এবার আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম বাংলা শিশুকিশোর সাহিত্যের এই সময়ের দু'জন অভিভাবকস্থানীয় এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের। একজন কিশোর ভারতী পত্রিকার সহ-সম্পাদিকা এবং লেখিকা শ্রীমতী চুমকি চট্টোপাধ্যায়, অন্যজন শুকতারা এবং নবকল্লোল পত্রিকার সম্পাদিকা শ্রীমতী রূপা মজুমদার। দু'জনেই আমাদের খুব কাছের মানুষ, ম্যাজিক ল্যাম্পের চলার পথে দু'জনেই নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়ে চলেছেন আমাদের। এখানে তুলে দেওয়া হল সেই আকর্ষণীয় আলাপচারিতা।

নিচের ভিডিও-তে ক্লিক করলেই দেখা যাবে সেই সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শ্রী সৌম্যকান্তি দত্ত
ক্যামেরায় সৌরদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মুখোমুখি চুমকি চট্টোপাধ্যায় এবং রূপা মজুমদার


_____

গোলটেবিল::জীবরামের গল্প – হিমানীশ গোস্বামী :: আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত


জীবরামের গল্প – হিমানীশ গোস্বামী
আলোচনাঃ সৌগত সেনগুপ্ত

পান্ (Pun) বা শব্দ নিয়ে কথার খেলায় অদ্বিতীয় ছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। যিনি নিজেকে শিব্রাম চকরবরতি বলতে বা লিখতে পছন্দ করতেন। তাঁর লেখা হর্ষবর্ধনের হাসির গল্প তোমরা সবাই পড়েছ। তরুণ হিমানীশ গোস্বামী একবার সেই শিবরামের হর্ষবর্ধন চরিত্রটিকে নিয়ে একটা গল্প লেখেন যার নাম ছিল চেঞ্জে গেলেন হর্ষবর্ধন। শিবরাম সেই লেখাটি পড়ে এতটাই খুশি হন যে তাঁর পরবর্তী গল্পসঙ্কলনে হিমানীশের গল্পটিকে স্থান দেন।
ম্যাজিক ল্যাম্পের এই হাসি স্পেশাল সংখ্যায় আজ সেই হিমানীশ গোস্বামীর একটা বই নিয়ে তোমাদের বলব। ১৯২৬ সালে অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুরে তাঁর জন্ম। বাবা পরিমল গোস্বামী ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত লেখক। শিবরাম চক্রবর্তীর সান্নিধ্যে এসে তিনি অনুপ্রাণিত হন হাস্যরসাত্মক লেখায়। এছাড়া রহস্য ও রম্যরচনা ছাড়াও ভ্রমণকাহিনি ও কার্টুনও এঁকেছেন তিনি। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও প্রধানত আনন্দবাজার সংস্থার সঙ্গেই তিনি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন।
২০১২ সালের ১৪ই মার্চ তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। বিভিন্ন সংস্থা থেকে তাঁর একাধিক বই থাকলেও পূর্ণাঙ্গ রচনাসমগ্র প্রকাশ করার প্রয়াসে এগিয়ে আসেননি কোনও প্রকাশকই। অনেক বই এখন দুষ্প্রাপ্য।  সূর্য পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত জীবরামের গল্প বইটার কথা আজকে বলব। বইমেলা ১৪১২ বা ২০০৬-র শুরুর দিকে বইটি প্রকাশিত হয়। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে ছিলেন প্রণবেশ মাইতি। এই বইতে সঙ্কলিত হয়েছে জীবরামকে নিয়ে লেখা ১৭টি গল্প। যথাক্রমে,
·        জীবরাম কি বোকা ছিল?
·        চি চি চি চি চি
·        চোর চারু চরে জীবরাম
·        আত্মারাম খাঁচা ছাড়া
·        জীবরামের শেষ যাত্রা
·        ফৌজদাড়ি মামলায় জীবরাম
·        জীবরামের ম্যালেরিয়া মাসি
·        তাল-বেতালের গল্প
·        আগে মেসোর সঙ্গে মেশো
·        বনসাগর স্কুলের বনভোজন
·        কথা নিয়ে ঝামেলা
·        জীবরামের বিপদ
·        মামাদের মামাবাড়িতে জীবরাম
·        নরনারায়ণের খিদে নেই
·        পঞ্চবঁটি
·        কচুর মোরব্বা
·        জীবরামের ঘোড়াই ভ্রমণ
এই গল্পগুলো মূলত আনন্দমেলা ও কিশোর ভারতী পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৫ - ২০০৩ সালের মধ্যে। শুকতারা, টগবগ এবং নবকল্লোল পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয় একটা করে গল্প। কয়েকটি গল্পের প্রকাশকাল দেওয়া নেই।
এবার দেখা যাক জীবরাম আসলে কে? লেখকের কথায় শিবরাম চক্রবর্তী আবার ফিরে এসেছেন জীবরাম চকরবরতি নামে। মাঝে মাঝে শিব্রামের অনুকরণে তার নাম ডাকা হয়েছে জীব্রাম বলে। কিছু গল্পে লেখক নিজেও একটা চরিত্র। জীবরামকে লেখক ডাকে হিম্বাবু বলে, আর তাঁর স্ত্রীকে হিম্বিবি! জীবরাম প্রথমে পড়ত বনসাগর স্কুলে। সেটা গ্রাম বা মফস্বলের দিকে। পরের দিকে তাকে কলেজে পড়তে ও কলকাতা শহরে থাকতে দেখা গেছে। স্কুল থেকে কলেজে এসেও তার কথা নিয়ে খেলা বন্ধ হয়নি।
বিভিন্ন গল্পে জীবরামের বিভিন্ন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাদের নামগুলোও দারুণ মজাদার। চর্যাপদ ধর, নরনারায়ণ, হরিনারায়ণ, চিরঞ্জীব, মনিটর পাঁচু। বনসাগর হাই স্কুলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন দুর্গতিহরণ বাবু। দারোয়ান ছিল দুখিরাম। এদেরকেও কথার প্যাঁচে নাজেহাল করে তুলত জীবরাম। সেসব লেখা পড়লেই বুঝতে পারবে প্রায় সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ নিয়ে কী দারুণ খেলাই না দেখিয়েছেন হিমানীশ বাবু।
বিভিন্ন গল্পে জীবরামের বেশ কিছু মামা, মামী, পিসি-পিসেমশায় এমনকি মাসি-মেসোর উল্লেখ আছে। অনেক বন্ধুবান্ধবদেরও কাকা মামা মেসোমশায়রাও জীবরামকে চেনে। এই বইয়ের শেষ গল্পে জীবরামের মায়ের উল্লেখ আছে। সেখানে কথার খেলায় জীবরাম তার মাকেও নাস্তানাবুদ করেছে।
সূর্য পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত জীবরামের গল্প বইটার প্রথম সংস্করণের মূল্য ছিল ৫০ টাকা। মূল্য পরিবর্তন সাপেক্ষ। বইটির ISBN No. 81-89710-03-6.
উৎসর্গ পত্রেও লেখক তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কথার খেলা থেকে বেরোতে পারেননি। সেটা তোমাদের জন্য এখানে তুলে দিচ্ছি।
....“এই বইটি যাদের হাতে দিচ্ছি তাঁরা সকলেই আমার সমসাময়িক, তাঁরা প্রত্যেকেই আমারই মতো গত শতাব্দীর লোক, যদিও এঁদের বয়স আমি ছাড়া কারোরই এগারো বছরের বেশি নয়।
এঁদের ডাক নামঃ ঋততোষ, গোডো, জোজো, বিষ্টু এবং বুনি।
এঁদের তোলা নামঃ ঈশাদৃতা, ঋষি, শ্রীজন, অর্ণব এবং তাতার।
এঁদের পদবিঃ গুহ, লাহিড়ি, বন্দ্যোপাধ্যায়, চক্রবর্তী এবং মুখোপাধ্যায়।
এঁদের বাসস্থানঃ সিঁথি, বসুপুকুর, বিধাননগর, পণ্ডিতিয়া (বালিগঞ্জ) এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড।
একটা কথা বলার আছে – কোন ডাক নাম, তোলা নাম এবং বাসস্থান কার কার সেটা ঠিক মনে পড়ছে না। এইটে একটা ধাঁধা – আমার কাছে এবং যাঁদের নাম ওপরে দেওয়া হল, তাঁদের কাছেও। এই ধাঁধাটির সঠিক উত্তর পরবর্তী সংস্করণে দেওয়া হবে (যদি সেটি প্রকাশিত হয়)।....”
এবারে তোমাদের কাজ হল বইটা খুঁজে জোগাড় করে পড়ে ফেলা আর ম্যাজিক ল্যাম্পকে জানানো কেমন লাগল আর যদি উপরের ধাঁধার সমাধান খুঁজে পাও তাহলে সেটাও আমাদের জানাতে ভুলো না, কেমন?

প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট পি. কে. এস. কুট্টি-র তুলিতে হিমানীশ গোস্বামী
_____

গোলটেবিল::পিন্ডিদা সমগ্র - আশুতোষ মুখোপাধ্যায় :: আলোচনাঃ সহেলী চট্টোপাধ্যায়


পিন্ডিদা সমগ্র - আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
আলোচনাঃ সহেলী চট্টোপাধ্যায়

প্রেমেন্দ্র মিত্রের যেমন ঘনাদা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ে যেমন টেনিদা, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ে তেমন পিন্ডিদা। নাম শুনলেই পিলে চমকে উঠছে তো! পিন্ডিদার আসল নাম প্রদীপ নারায়ণ দত্ত। সংক্ষেপে পি এন ডি, তা থেকে হয়েছে পিন্ডি। ফুটবলের বিখ্যাত স্টার বিদেশে নাকি তিনি পিন্ডি নামেই বিখ্যাত। তবে কতটা সত্য আছে পিন্ডিদার এই কথায় তা তোমরাই বুঝে নিও।
তার গল্প বলার ক্ষমতা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। খুবই বুদ্ধিমান এবং করিৎকর্মা এক যুবক। তবে মুখ না চললে ব্রেন কাজ করে না। এক কথায় ভীষণ পেটুক। পিন্ডিদা এমনিতে ভীষণ ভালো এবং সাহসী এক যুবক। পরের আপদে বিপদে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এত হাসির মধ্যেও পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মন উদাস হয়ে যায়। এই রকম বেপরোয়া হাসিখুশি চরিত্রের ছেলেরা আজ কোথায় গেল?
পিন্ডিদার অনুচরদের মধ্যে কেবলু, চটপটি, হাবুল, কার্তিক আর সোনা। সবাই হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে। কেবলু সংস্কৃতে দুবার ব্যাক পেয়েছে, তাই মাঝে মাঝেই সংস্কৃতে কথা বলে নিজের রাগ ঠাণ্ডা করে। প্রত্যেকটা চরিত্র-ই খুব সুন্দরভাবে চিত্রিত। নিজেদের হাজার সমস্যা থাকলেও এরা সবসময় হাসি ঠাট্টায় মেতে থাকে। হাবুল পিন্ডিদার অন্ধ ভক্ত। বাকিরা একে খুব একটা পছন্দ করে না। সব সময় একটা টক্কর চলে
কার্তিক সব চেয়ে ঠান্ডা। কথা কম বলে।
চটপটি আর সোনার খুব বন্ধুত্ব। সোনার সঙ্গে পিন্ডিদার রেষারেষি ভালোই চলে। সোনা প্রতিবারই হেরে যায় এবং পিন্ডিদা সমেত গোটা দলকে খাওয়াতে বাধ্য হয়। বিনোদের দোকানের চপ কাটলেট নিজের বন্ধুদের খাওয়াবার জন্য মাঝে মাঝে ঠাকুমার হাত বাক্স সাফ করে। উপস্থিত বুদ্ধি আছে প্রচুর। একবার উপস্থিত বুদ্ধির জোরে নিজের দলবলকে ভয়ানক এক ডাকাতের কবল থেকে বাঁচায়। পিন্ডিদার সমস্ত গল্পের কথক সোনা অর্থাৎ তার জবানিতেই সমস্ত কাহিনি শুরু হয়েছে।
মোট পনেরোটা গল্প আর একটা উপন্যাস আছে পিন্ডিদা সমগ্রে। এছাড়াও  আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ে উপন্যাস ফয়সালা এবং অন্য কিছু ছোটোগল্প স্থান পেয়েছে এই সঙ্কলনের দ্বিতীয় অংশে। অর্থাৎ এক মলাটের মধ্যে দুটো বই পড়ার মজা আছে। বেশির ভাগ গল্প কিশোর ভারতী এবং দেব সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত শুকতারা ও বিভিন্ন পূজাবার্ষিকীতে স্থান পেয়েছে। তোমরা মজার গল্প যারা পড়তে ভালোবাসো তাদের অবশ্য-ই পিণ্ডিদা এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কীর্তিকলাপ পড়া উচিত।

পিন্ডিদা সমগ্র, দেজ পাবলিশিং
প্রচ্ছদঃ রঞ্জন দত্ত; অলংকরণঃ দেবাশিস রায়
দামঃ ৪০০ টাকা
_____

ম্যাজিক পেনসিলঃ ছোটোদের নিজস্ব বিভাগঃ এপ্রিল ২০১৮

ম্যাজিক পেনসিল
ছোটোদের নিজস্ব বিভাগ

এবারের ম্যাজিক ল্যাম্পের ম্যাজিক পেনসিল বিভাগে বেশ কিছু দারুণ দারুণ মজাদার ছবি এসে পৌঁছেছে। এসো দেখা যাক সে সব।

(১)

নিচের মজার ছবিদুটো এঁকে পাঠিয়েছে রুদ্রনাভ
মজার ছবি১
মজার ছবি২
অঙ্কনশিল্পীর পরিচিতি

রুদ্রনাভ মন্ডল

বয়সঃ ৯ বছর +

চতুর্থ শ্রেণী, রানি ইন্দ্রদেবী শিক্ষাসদন, ঝাড়গ্রাম

(২)

এই ছবিটা স্বাতন্ত্রীর আঁকা
নন্টে ফন্টেঃ হোলি হ্যায়
অঙ্কনশিল্পীর পরিচিতি

স্বাতন্ত্রী অধিকারী

বয়স - ৯ বছর ৬ মাস

চতুর্থ শ্রেণী, ওয়েল্যান্ড গোউল্ডস্মিথ স্কুল

(৩)

শুভায়ু পাঠিয়েছে এই দুটো দুর্দান্ত ছবি
ছোটা ভীম ১
ছোটা ভীম ২
অঙ্কনশিল্পীর পরিচিতি

শুভায়ু ব্যানার্জী

বয়সঃ ৮ বছর

দিল্লি পাবলিক স্কুল, হায়দরাবাদ
_____