Showing posts with label অণুগল্প. Show all posts
Showing posts with label অণুগল্প. Show all posts

অণুগল্প:: দেবদোল - রাজর্ষি গুপ্ত


দেবদোল
রাজর্ষি গুপ্ত

সকাল ন’টায় হরিনাম জাগানো শুনতে শুনতে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বিরাজকৃষ্ণ ভট্টাচার্য খুব মনমরা গলায় ট্রাস্টি বোর্ডের প্রেসিডেন্ট অশোক মান্নাকে বলছিলেন, “কাল বড়ো অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম শ্যামসুন্দরকেই দেখলাম তিনি বলছেন, ‘ওরে, দোলের পুজোই যদি করবি তো আমায় রং দিতে এত কার্পণ্য কেন তোদের?’ তারপর নিজেই হাত নেড়ে বললেন, ‘তোদের দ্বারা হবে না, আমাকেই ব্যবস্থা করতে হবে’”
আজ দোল হরিসভার আশপাশের চত্বরটুকু মেতে আছে মিঠেরাধে রাধাগোবিন্দ বলোনামগানে প্রতি বছর দোলে তিনদিনব্যাপী অষ্টপ্রহর নামসঙ্কীর্তনের আসর বসে শ্যামসুন্দরের নাটমন্দিরের সামনে তুলসীমঞ্চের আঙিনায় ম্যারাপ খাটিয়ে পুজোও হয় তেমনই ধুমধামে গৌরনিতাই আর রাধারানিকে নিয়ে শ্যামসুন্দর নাটমন্দির থেকে তুলসীতলায় ভক্তজনের মাঝে নেমে আসেন
অশোকের একটা ভুরু কপালে উঠে গেল
দশ রঙের মোট পাঁচ কেজি আবির আমি নিজে কিনে দিয়েছি আর ওই ঠাকুরের সামনে থালায় চুড়ো করে সাজিয়ে রেখেছেন আপনি নিজে এর পরেও রং নিয়ে খুঁতখুঁতুনি থাকে কী করে ঠাকুরের? কাল রাতে আপনার ধোকার ডালনাটা বেশি হয়ে গিয়েছিল বোধহয়
বিরাজকৃষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন
ঠিক সেই সময় বাচ্চু আর রঞ্জুর সঙ্গে তুলসীতলার সামনে দাঁড়িয়ে টুনাই খুব গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিল বাচ্চু বলল, “এত আবির, কিন্তু কেউ ঠাকুরদের গায়ে দেবে না কী স্যাড!”
রঞ্জু বলল, “শুধু পায়ে ঠাকুররা বড়ো কিনা
টুনাই তড়বড়িয়ে উঠল, “ছাড় দিকি! বড়ো তো কী? ছোটকা কত বড়ো, তবু বাঁদুরে রং মাখে না? বড়োদের যত্ত ইন্তিড়ি ব্যাপার! কৃষ্ণঠাকুর যথেষ্ট ইয়াং, গৌরনিতাইদাদাও তাই ওদের রং মাখতে নিশ্চয় ইচ্ছে করেওই দাদুগুলো মাখতে দেয় না ওদের
সত্যভামা গার্লসের ক্লাস ফোরের ফার্স্ট গার্ল ত্রিনেত্রা সেন ওরফে বাবুপাড়ার দুরন্ত সম্রাজ্ঞী টুনাইকে তার বন্ধুরা রীতিমতো সমঝে চলে, একজন বাদে তাও রঞ্জু মিনমিন করে কী একটা বলতে গেল বলা হয়ে উঠল না, কারণ তার আগেই টুনাইয়ের মুখের উপর পিছন থেকে অতর্কিতে নেমে এসেছে একজোড়া সবুজ হাত, কষে পাঁচ বার ঘষে দিয়েছে তার মুখ-মাথা টুনাই হাঁই হাঁই করে উঠে যখন ভূতের মতো মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল তখন ম্যারাপের বাঁশের উপর থেকে আর একটা ভূত সাদা চোখ আর দাঁত বের করে তাকে ভ্যাংচাচ্ছে
রত্নাবলী মিত্র ওরফে রুপু ক্লাস ফোরের সেকেন্ড গার্ল এবং টুনাইয়ের প্রাণের দোস্ত, এবং পাড়ায় টাইফুন কুমারী নামে পরিচিত
দাঁড়া তুই!” হুঙ্কার ছেড়ে টুনাই বাঁশের উপর লাফিয়ে পড়া মাত্র রুপু লাফ মেরে পাশের বাঁশটা ধরে ঝুল খেয়ে ঝাঁপ মেরে পড়ল মাটিতে হরিসভায় রং মেখে দোল খেলতে ঢোকা সখৎ বেয়াদবি, নামগান চলাকালীন হুটোপুটি করা তো আরওই! চারদিকে একটা হই হই রব উঠল অশোকবাবু সভয়ে দেখলেন দুটো লাল-কালো টাইফুন ম্যারাপের বাঁশগুলো জিগজ্যাগ করে কাটিয়ে ছুটে আসছে তুলসীতলা পেরিয়ে নাটমন্দিরের দিকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুপুর গোঁত্তায় সোফার মধ্যে হতভম্ব বিরাজকৃষ্ণের পাশে সেঁধিয়ে গেলেন তিনি
টুনাই চিলচিৎকার করে তাড়া করে আসছিল, রুপুকে তুলসীতলার সামনে দাঁড়াতে দেখে হঠাৎ ডাইনে বাঁক মেরে দৌড়ে চলে গেল মন্দির চত্বরের কিনারায়
হল কী? এত সহজে হেরে যাওয়ার মেয়ে তো সে নয়
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চত্বরের বাইরে রং খেলতে থাকা ছেলেদের রংজলের বালতিতে হাত ডুবিয়ে সে তুলে এনেছে দুটো রংজল-ভরা বেলুন পরক্ষণেই সাঁ-সাঁ করে কামানের গোলার মতো সেগুলো ছুটে গেল রুপুকে লক্ষ করে পিছন-পিছনইয়াআআআআআআচিৎকার করে ধেয়ে চলল গোলন্দাজ, তার হাতে খাবলে তোলা বাঁদুরে রং
কিন্তু রুপুর হরিণের রিফ্লেক্স চট করে মাথা নিচু করে বসে পড়ল সে
আর রংজলের গোলাদুটো লক্ষ্যভেদ করতে না পেরে সটান গিয়ে আছড়ে পড়ল গৌরনিতাইয়ের বুকের উপর তাঁদের গৌরতনু মুহূর্তে লাল পরমুহূর্তেই যুদ্ধের ট্যাঙ্কের মতো রুপুর ঘাড়ে এসে পড়ল টুনাই একটা হুলুস্থুলু রব উঠল চারদিকে আর তার মধ্যেই দু’জনে জড়ামড়ি করতে করতে গিয়ে পড়ল শ্যামসুন্দরের সামনে রাখা আবিরের থালার উপর চতুর্দিক লালে লাল, সবুজে সবুজ, নীলে নীল নামগান থামিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পল্লব গোস্বামী শ্রীখোল তুলে পালাবে কিনা ভাবছে
এমন সময় কফিনে শেষ পেরেক পড়ল রুপুর হাতের ধাক্কা লাগল শ্যামসুন্দরের ময়ূরপাখা লাগানো মুকুটে, তিনি মুখ থুবড়ে পড়লেন নীল আবিরের থালায় আর টুনাইয়ের হাতের বাঁদুরে রং তাঁর একটা চোখকে রাঙিয়ে দিল
হুলুস্থুল করতে থাকা ভিড়টা এইবার মারমুখী হয়ে উঠল মেয়েগুলো ভেবেছে কী? এতটা দস্যিপনা! দোলের দিন এই ঝামেলা! এ কী অকল্যাণ!
আধমরাই হয়ে যেত হয়তো টুনাই-রুপু কিন্তু ভিড় ঠেলে চিৎকার করতে করতে ছুটে এলেন এক বৃদ্ধ
ওরে দাঁড়া দাঁড়া! ওদের কিছু বলিসনি রে, কিচ্ছু করিসনি ওদের! ওরা ঠাকুরের মান রেখেছে রে ঠাকুরের বন্ধু ওরা—”
গনগনে মুখগুলো স্তম্ভিত হয়ে বিরাজকৃষ্ণের দিকে তাকাল বৃদ্ধ বলে চললেন
ঠাকুর নিজে ওদের সঙ্গে দোল খেলতে চেয়েছেন সত্যিই তো, আমরা বুড়োরা কি আর তাঁর মতো পিচকিরি নিয়ে দোল খেলতে পারি? তিনি তাঁর সখাদের নিয়ে যেমন বুঝেছেন তেমন খেলেছেন এই কৃষ্ণসখারাতোরা চল, বাল্যভোগের মঠ-ফুটকড়াই দেব তোদের
টুনাই-রুপু বুঝতে পারছিল না কিছু যেখানে তাদের হাড়মাস আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা সেখানে গম্ভীর হরিসভাদাদু এমন প্রাণখোলা হাসতে হাসতে কেন তাদেরকে মঠ-ফুটকড়াই খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে?
যাগ্গে, অত ভেবে লাভ নেই দু’জনে শ্যামসুন্দর আর গৌরনিতাইকে তুলে দাঁড় করিয়ে নিজেরা উঠে দাঁড়াল গৌরনিতাই সারা গায়ে রং মেখে আনন্দে নাচছেন বিরাজকৃষ্ণের মনে হল শ্যামসুন্দরের রঙে-লাল চোখখানা দিয়ে হাসি ঠিকরোচ্ছে যেন আর তাঁর গায়ের ফরসা চাদরটা রাঙিয়ে উঠে তার রংটা যেন অনেকটা পাশে দাঁড়ানো রাধারানির বেনারসীটার মতো হয়ে গিয়েছে
প্রভাতফেরির দল গলির মোড় থেকে বেরিয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে। সামনের সারির ছেলেমেয়েগুলো গান ধরেছে — “আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে…”
----------
ছবি - আন্তর্জাল

অণুগল্প:: বন্ধু - কৃশানু কুন্ডু


বন্ধু
কৃশানু কুন্ডু

প্লেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাটিতে পা রাখতে বিশেষ সময় লাগল না। এবার নেমেছি একটা ছোট্ট গ্রামের মধ্যে। এই নানান বিপদের তেপান্তরে, বন্ধু খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। মাটিতে নেমেই খুঁজতে হবে অস্ত্র আর ওষুধ। এ দুটো ছাড়া এখানে বাঁচা সম্ভব নয়। কাছের বাড়িটাতে খুঁজে দেখলে হয়নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই, অঙ্ক পরীক্ষার বেলের চেয়েও দ্রুত ধেয়ে আসবে অজ্ঞাত আততায়ী। ছুট লাগালাম বাড়িটার দিকে। খুঁজতে কিছু সময় তো লাগবেই। আমাদের বাংলাদেশের বাড়ি তো নয়, সুইস কটেজ। সোজা দোতলায় গেলাম, আর যা ভেবেছি ঠিক তাই। যোদ্ধাদের রাজা, ওয়ারিয়র কিং-কে হারানো কি অতই সহজ! হুঁ হুঁ বাবা, পেয়ে গিয়েছি ম্যাজিক বক্স। বক্স খুলেই আরেক চমক, ভিতরে একটা স্কার রাইফেল, মিনিটে ৩৬৬ রাউন্ড, আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে তার মসৃণ নল থেকে। এবার দেখি কে দাঁড়ায় আমার সামনে?
বাড়িটা থেকে বেরোতেই শাঁই করে কী একটা উড়ে গেল কানের পাশ দিয়ে। পাশের দেয়াল থেকে ছিটকে উঠল এক টুকরো কাঠ আর এসে লাগল কপালে। প্রথম আঘাত, আর দুটো বাকি। প্রাণ হাতে করে দৌড়োলাম পাথরের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে, কিন্তু কপাল খারাপ। এ বারের হিটটা ৫০ ক্যালিবারের মোক্ষম মারণাস্ত্র থেকে। হাতের স্কার রাইফেল বিষোদ্গার করলেও শেষ রক্ষা হল না। ৫০ ক্যালিবার খান খান করে দিয়েছে পাথর। তারই একটা ভেঙে পড়েছে আমার উপর। আমি প্রমাদ গুনলাম। শেষ সুযোগ। আমি বিফল হলে শুধু আমি নয়, হেরে যাবে পুরো এশিয়া মহাদেশ
সংবিৎ ফিরে পেতেই দেখলাম আমার উপর ছড়িয়ে পড়েছে নীল আলো। এ আলোর একটাই মানে। সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত টি৯০০। কাঁধের উপর রাখা ৫০ ক্যালটাই শেষ করে দিয়েছিল আমার দ্বিতীয় জীবন। পালানোর উপায় নেই, পিছনে বড়ো বড়ো পাথরের দেয়াল তৈরি করেছে অলঙ্ঘ্য প্রাচীর আর সামনে নিশ্চিত, স্থির লক্ষ্যে এগিয়ে আসছে লাল চোখ আর নীলাভ ধাতুর দৈত্য। কান্না পেয়ে গেল এবার। কেউ নেই যে আমাকে বাঁচাবে? সবাই আমাকে ফেলে এগিয়ে গেছে? টি৯০০ আমাকে আর সুযোগ দিল না। সামনে এসেই ওর ধাতব হাত থেকে বেরিয়ে আসা ফলাটা বাগিয়ে ধরলএবার নেমে আসবে শেষ আঘাত। ভয়ে চোখ বুজে ফেললাম আমি
ধড়াম! ঢং! দুটো কানফাটানো আওয়াজ। চমকে চোখ খুলে যা দেখলাম তাতে চোখ ডাবুদের মাঠের মরা তালগাছের টঙে। টার্মিনেটরের চোখের লাল আলো নিভে গেছে, কঠিন বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে অখণ্ড ভাইব্রেনিয়ামের শিল্ড। ধাতুর কংকাল এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন আমেরিকা ওরফে স্টিভ রজার্স ওরফে আমার বন্ধু রুকু। হাত ধরে আমায় টেনে তুলেই বলল, “দাঁড়িয়ে থাকিস না, মুভ। আমেরিকান ওয়ার গ্রুপ ঘিরে ফেলেছে আমাদের” আমার তখন চোখে জল। বললাম, “আই অ্যাম সরি রুকু, তুই কাল ব্যাটটা চাইলি, আমি দিলাম না। জানি তোর কাল ম্যাচ ছিল” রুকু বলল, “কুছ পরোয়া নহি, দোস্ত হি দোস্তকে কাম আয়েগা। তুই আমায় ব্যাট দিবি না হতেই পারে না। আমি জানি তুই আজ আমায় নিজেই দিবি, আজও তো খেলা আছে” আমার হাতটা ধরে এক টান দিল ও আর কয়েক ফোঁটা জলে ভিজে গেল আমার গাল
বোজো, আমার ল্যাব্রাডোর গাল চাটছে। ঘুমটা ভেঙে গেল এক নিমেষে। ভিডিও গেমের স্বপ্ন থেকে ধড়মড়িয়ে উঠেই চিল চিৎকার জুড়ে দিলাম আমি। “মা, ও মা, আমার ব্যাটটা কোথায় গো?

----------
ছবি - আন্তর্জাল

অণুগল্প:: প্র-বাদ - মধুমিতা রায়


প্র-বাদ
মধুমিতা রায়
 
মুখ গোমড়া করে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল টিপু।
আজ আবার অঘটন। এই নিয়ে বেশ কয়েকবার বিপদে পড়তে হল তাকে।
কিছুদিন আগেই টিপুর মা আর বাবা একই জিনিস দুটো আলাদা দোকান থেকে কিনেছিল আর বুড়িপিসি দেখে বলেছিল, “কোয়ালিটি উনিশ আর বিশ
টিপু ওর দাদার কাছে জানতে চাওয়ায় সে বলেছিল, “দুটো একই বোঝাতে ওরকম বলে, যেমন - যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন
সেই দুটোই আজ খাতায় লিখে কী হল! কেটে শূন্য বসিয়ে দিয়েছে।
ব্যাজার মুখেই ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসে টিপু দেখল ওর মা এক হাতে দুধের গ্লাস আর অন্য হাতে ওষুধ নিয়ে আসছে।
“খেয়ে নাও,” বলে টিপুর বাঁ হাতটা টেনে নিতেই “আঃ!” করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল টিপুর মুখ থেকে, ব্যথাটা এখনও আছে।
“যেমন কর্ম তেমন ফল
বুড়িপিসির গলা, কখন ঘরে ঢুকেছিল খেয়াল করেনি টিপু, শুনল ওর মা হাতে ওষুধ মাখিয়ে দিতে দিতে বলছে, “প্রবাদ না প্রহসন!”
নাহ্, টিপু আর এসবের মানে বুঝতে যাবে নানিজের হাতের দিকে একবার তাকাল সে এখনও ফুলে আছে, তবে ঘা-টা শুকিয়ে গেছে। এটাও ঐ প্রবাদের প্রভাবেই হয়েছে, বুড়িপিসি সেদিন কী কারণে যেন বলেছিলেন, “তিল থেকে তাল”, আর তাতেই টিপুর ধারণা হয়েছিল তার হাতের ঐ কালো তিলটা থেকে আস্ত একটা তাল বেরোবে। ও দাদার কাঁটাকম্পাসটা নিয়ে খোঁচাতেই ঘা হয়ে গেছে।
দুধ খেয়ে, কার্টুন দেখে পড়ার টেবিলে এসে বসল টিপু। আর তখনই চারিধার অন্ধকার হয়ে গেল।
“লোডশেডিং
“ঠিক ঠিক ঠিক” - কোথায় যেন একটা টিকটিকি ডেকে উঠল।
একটা মোমদানির উপর জ্বলন্ত মোমবাতি বসিয়ে ঘরে রাখতে এসে বুড়িপিসি বলে গেল, “দেখো, পড়ে যায় না যেন, তোমরা অপকর্ম করবে আর দোষ হবে আমার, যত দোষ নন্দ ঘোষ
টিপু অমনি টিপ্পনি কাটল, “পিসি, নন্দ ঘোষ কে?
“জানি না বাপু, আর জানলেও তোমাকে বলব না তুমি তো আবার উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাবে!” পিসি চলে গেল।
টিপু টেনে নিল আঁকার খাতাটা, দুটো ছবিই অসমাপ্ত।
ওর দাদাও পাশে বসেই পড়ছিল। ‘জিন’, ‘পরিবেশ’ শব্দগুলো কানে আসছিল টিপুর।
আচ্ছা জিনেরা তো বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে, তাই না?
ভাবতে না ভাবতেই টিকটিকিটা থপ করে পড়ল খাতার ওপর।
ঠিক্ ঠিক্ ঠিক্
তিনবার বলে চোখ তুলে তাকাল টিপুর দিকে।
প্রথমটা ভয়ে আঁতকে উঠলেও পলকে নিজেকে সামলে নিল টিপু
এটা কি জিন?
“তুমি যা ভাবছ তাই
“ওমা! বলে কী! সত্যিই তুমি জিন?
“বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর - শোননি?
“তুমিও প্রবাদ বলো?
“বলিই তো, নাও এখন হুকুম করো কী করতে হবে
বেশ মজা লাগল টিপুর, কী করতে বলা যায়...
“আচ্ছা, আমার এই ছবি দুটো এঁকে রং করে দাও
“বেশ” - বলে টিকটিকিটা ল্যাজ দিয়ে পেনসিলটা পেঁচিয়ে নিমেষে সম্পূর্ণ করে ফেলল ছবি দুটো।
“টিপু-উ...”
এই রে! দাদা দেখছে নাকি! ডাকল কে?
টিকটিকি এখন রং করছে, মন দিয়ে রং-এর শেড দিচ্ছে।
“এই টিপু, হঠাৎ পিঠে একটা ধাক্কা খেতেই আলোয় চোখটা ধাঁধিয়ে গেল টিপুর।
“আরে, কারেন্ট চলে এসেছে?
“হ্যাঁ, তাই তো ডাকছি, বসে বসেই ঘুমোচ্ছিস?
মোমবাতিটা খানিক দপ দপ করেই নিভে গেল টিপুর খেয়াল হল টিকটিকিটা নেই তো, এদিকে ওদিকে চোখ বোলাতেই টিপু লক্ষ করল, একটা সরু কালো কেঁচো দরজার পাশের ছোট্ট গর্তটায় ঢুকে গেল
আরে! জিন কি আবার রূপ বদলাল?
টিপু একটা কাঁটা নিয়ে গর্তটার পাশে বসে সবে খোঁচাতে যাবে, শুনতে পেল ঘর থেকে দাদা বলছে, “টিপু, এই অন্ধকারে বসে দারুণ ছবি এঁকেছিস তো, রং-এর শেডটাও হয়েছে জব্বর
ছবি! নাহ্, সে তো আঁকেনি, ওটা তো...
“এই যে বাছা
বুড়িপিসির গলা পেয়ে টিপুর ভাবনায় ছেদ পড়ল, সে শুনতে পেল বুড়িপিসি বলছে, “বেশি খোঁচাখুঁচি কোরো না বাপু, শেষে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়বে
----------
ছবি - আন্তর্জাল

অণুগল্প:: অমলবাবুর বন্ধু - সিদ্ধার্থ পাল


অমলবাবুর বন্ধু
সিদ্ধার্থ পাল

এ কী!
চমকে উঠলেন অমলবাবু। তাঁর চোখ আটকে রয়েছে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো কামরূপ এক্সপ্রেসের এস১৩ কামরার দিকে। সামনের দরজা থেকে পাঁচটা জানালা পিছিয়ে এলে গরাদের ফাঁক দিয়ে যে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে, তাকে তিনি চেনেন। বাম গালের কুৎসিত জরুল, ভুরুর ওপরে কাটা দাগ, টিয়াপাখির ঠোঁটের মতন খাড়া নাক আর কোটরাগত দুটো চোখ। সবই মিলে যাচ্ছে। সমরেশ-কে চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয় তাঁর। চকিতে নিজেকে গুটিয়ে বেঞ্চের পিছনে, প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন তিনি। ট্রেনটা না যাওয়া পর্যন্ত এখানে লুকিয়ে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
মাঝেমধ্যে ভরদুপুরে জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে এসে বসে থাকেন অমলবাবু। এখানে বেশিরভাগ সময় ঝ্যাং-ক্ল্যাং শব্দ করে মালগাড়িগুলো আসে। দু-একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ালেও বোতলে জল ভরার প্রয়োজন না থাকলে প্ল্যাটফর্মে কেউই সাধারণত নামে না। মিনিট পাঁচেকের হইচইয়ের পরেই শান্ত হয়ে যায় চারিদিক। ওভারব্রিজের মাথা ডিঙিয়ে রোদ্দুর মাখা আকাশে মনখারাপের ঘুড়ি যখন একলা একলা পাক খায় তখন চকচকে রেল লাইনগুলো যে কী লোভনীয় লাগে তা কেবলমাত্র অমলবাবুই বোঝেন। আজও তাঁর মন ভালো নেই। সকালে ভাড়াটে আর পাড়ার গুণ্ডারা মিলে দেদার গালিগালাজ, গলাধাক্কা উপহার দিয়েছে। দলিল না দিলে রাস্তায় ফেলে মারবে এরপরে। এমন নিঃসঙ্গ অসহায় পরিস্থিতিতে মানুষ বন্ধু খোঁজে। অথচ অমলবাবু বার বার মাথা ঝাঁকালেন। সমরেশ-কে তাঁর বেজায় ভয়। মা বলতেন, সে এলে বিপদ আরও বাড়ে।
ওকে শেষ দেখেছিলেন বছর চল্লিশ আগে। তিনসুকিয়া ছেড়ে চলে আসার সময় বাসস্ট্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ টিপেছিল। অমলবাবুর বাবার চাকরি ছিল ডিগবয়ে। সেই সূত্রেই নর্থ আসামে বসবাস। মিশনারি স্কুলে চলত পড়াশোনা। কিন্তু কেউই মিশত না ওনার সঙ্গেবরং রাস্তাঘাটে ছেলেপুলেরা পিছনে লেগে অকারণে দুঃসহ করে তুলত বিকেলগুলো। সেই ঘরকুনো আঁধারেই একদিন হঠাৎ ছাদের সিঁড়িতে আলাপ হয়েছিল সমরেশের সঙ্গেএকেবারে বিপরীত স্বভাবের ছেলে। যত্রতত্র বেয়াড়াপনা করতে তার উৎসাহের কখনও ঘাটতি হত না। অবশ্যি এই চারিত্রিক বৈপরীত্যের জন্যেই হয়তো ওদের সখ্যতা এত গাঢ় হয়েছিল।
গোলমাল হল সেখানেই। তিনি যা পারতেন না, ও নিঃশব্দে সেরে আসত তা অবলীলায়। তাঁর কোনো বারণই কানে তুলত না সমরেশ। তবে ওর সকল দুষ্টুমির দায় অদ্ভুত ভাবে এসে পড়ত ওনার কাঁধেই। কঠিন সাজা পেয়েও মুখ খুলতেন না তিনি। স্থানীয় উপজাতি নেতার ছেলে দারুক বোরা একদিন ঢিল মেরে অমলের কপাল ফাটিয়ে দিল। তার দিন সাতেক পরেই কে যেন ছেলেটাকে পিছন থেকে বস্তায় পুরে জম্পেশ পেটাল টিঙরাই নদীর চরায়। স্বাভাবিকভাবেই ওরা দুষল কিশোর অমলকে। দাঙ্গা প্রায় বাঁধে বাঁধে। বেদম ঠ্যাঙানি খাওয়ার ভয়ে প্রথমবার বন্ধুর নাম ফাঁস করেছিলেন তিনি, কিন্তু কেউ সমরেশ-কে চিনল না। উলটে ডাক্তারজেঠু ওকে বললেন, ‘প্যাথলজিকাল লায়ারবাবা তাঁকে জলপাইগুড়িতে মামারবাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। তারপরে বহু বছর কেটেছে। ঘুমিয়ে, ঝিমিয়ে মুছে গেছে অবশিষ্ট মেরুদণ্ড। বিস্মৃতির আড়ালে নিখোঁজ হয়েছে সমরেশও।
ঘন-ঘন দুবার হুইসেল দিয়ে ইঞ্জিন ড্রাইভার জানান দিল যে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে। আবার হারিয়ে যাবে সমরেশ। তাকে শেষবারের মতো দেখবার আশায় অমলবাবু বেঞ্চের পিছন থেকে উঁকি দিলেন। আর তাতেই ওঁর বুক ধড়াস করে উঠল। জানালার রডে মুখ লাগিয়ে সোজাসুজি এইদিকেই চেয়ে রয়েছে সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিতে প্রচ্ছন্ন রয়েছে লুকোচুরির কৌতুক।
পড়িমরি করে দৌড়ে নিকটস্থ শৌচালয়ে ঢুকে, দরজার আড়ালে দাঁড়ালেন অমলবাবু। ধরা পড়ে গেছেন তিনি। তবে দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকা হৃদস্পন্দনের সঙ্গে তিনি অনুভব করলেন, মন খারাপ আর নেই। উলটোদিকে, আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছায়াতে রোজের মতো মুষড়ে পড়লেন না। দেখলেন, ফিরে এসেছে গর্তে ঢোকা চোখের উজ্জ্বলতা। বাম গালের জরুলটাকেও কুৎসিত দেখাচ্ছে না আর। সমরেশ নেমে পড়েছে প্ল্যাটফর্মে। এবারে নিশ্চিন্তি।।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

অণুগল্প:: কান্তিবাবুর ক্যামেরা - সম্বিতা


কান্তিবাবুর ক্যামেরা
সম্বিতা

তখন অনেক রাত। কান্তিবাবু হোটেলের রিসেপশনে বসে বসে রেডিও শুনছিলেন। হঠাৎ জনৈক ভদ্রলোক এসে হাজির তার হোটেলে। লম্বা, গায়ের রঙ মাঝারি, চোখে চশমা, বেশ ভারি গোঁফ। তিনি বললেন, “আমি অবিনাশ মল্লিক। রাতের শেষ ট্রেনটা মিস করেছি। কলকাতায় ফেরার ট্রেন আবার কাল আছে। আজ রাতে থাকার মতো ঘর পাওয়া যাবে?”
কান্তিবাবু তার মোটা ফ্রেমের চশমার ফাঁক দিয়ে দেখে একটু হেসে বললেন, “নমস্কার, আমি কান্তি বোস। হ্যাঁ, পাওয়া যাবে। চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি।
করিডোর দিয়ে যেতে যেতে কত মানুষের ছবি দেয়ালে সাজানো দেখে অবিনাশ খুব অবাক হয়ে গেল। এরা কারা? কেন এত মানুষের ছবি দেয়ালে ঝোলানো? অবিনাশ বলল, “রেজিস্টার দিন, সই করে নিই।
কান্তিবাবু বললেন, “তার দরকার নেই। আমাদের এখানে অন্য নিয়ম আছে।
মানে?
এখানে যারা যারা আসে তারা কেউ সই করেন না। তাদের ছবি তুলে রাখা হয়। আমার আবার খুব ছবি তোলার সখ। আর তাদের স্মৃতিও থাকে
ওহ! তাই বুঝি এত ছবি দেয়ালে।
কান্তিবাবু শুধু হাসলেন, কিছু বললেন না। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির পাশের একটি ঘরের চাবি খুলে দিয়ে কান্তিবাবু বললেন, “রাতে অড়হর ডাল, ইলিশ মাছের ঝোল আর ভাত হয়েছে। আপনি হাত মুখ ধুয়ে বিশ্রাম নিন। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার নিয়ে আসছি
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর অবিনাশ বেশ আরাম করে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ অনেক মানুষের কথাবার্তা তার কানে এল। খুব ভালো করে শুনলে বোঝা যায় কারা যেন বলছে, “চলে যান এখান থেকে, যদি বাঁচতে চান তো পালিয়ে যান।কথাগুলো ভেসে আসছে ঘরের বাইরে থেকে। অবিনাশ বেশ ভয় পেয়ে গেল। ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দেখল কেউ নেই ঘরেসব আবার চুপ। সে আবার শুয়ে পড়ল, কিন্তু আলো বন্ধ করে দিলেই কারা যেন একই কথা বলে উঠছে বার বার। সে দরজা খুলে এবার বাইরে এসে দেখল, কান্তিবাবু তার হাতে একটা বড়ো ক্যামেরা নিয়ে তার ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছেন। অবিনাশ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কান্তিবাবু বাধা দিয়ে বললেন, “আপনার ছবিটা তুলতে ভুলে গেছিলাম। চলুন তুলে নিই এখন
এত রাতে? কাল তুললে হয় না? আমি অন্য কারণে বাইরে এসেছিলাম।
না হয় না, সময় বড়ো কম, চলুন পাশের ঘরে, দু-মিনিটের তো ব্যাপার।
অগত্যা অবিনাশ কান্তিবাবুর সঙ্গে চলে এল পাশের ঘরে। সেই ঘরের দেয়ালে ঝোলানো অনেক ফাঁকা ফটো ফ্রেম। অবিনাশকে পুরোনো একটা চেয়ারে বসতে বলে কান্তিবাবু তার ক্যামেরাটা চোখের সামনে ধরলেন। সেটা খুব পুরোনো আমলের একটা অ্যান্টিক বললে বেশি বলা হবে না। কান্তিবাবু বললেন, “রেডি? থ্রি... টু... ওয়ান...” হঠাৎ ক্লিক আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঝলসে উঠল, আর অবিনাশ খেয়াল করল সে একটা কাচের ঘরে বন্দি। হাত-পা নাড়তে চাইছে, কিন্তু পারছে না। কথা বলতে পারছে না। সে এখন সেই ঘরের একটা দেয়ালের কিছুটা উপরে একটা ফ্রেমের ভেতর। সে ‘কান্তিবাবু’ ‘কান্তিবাবু’ বলে অনেক ডাকল, কিন্তু কেউ কিছু শুনতে পেল না। ঘরের আলো জ্বললে সেই ফটো ফ্রেমের কাচ ভেদ করে কোনো শব্দ বাইরে আসে না।
রাত তখন বারোটা, কান্তিবাবু হোটেলের রিসেপশনে বসে বসে মশা মারছিলেন। এমন সময় একজন ভদ্রমহিলা এসে হাজির। তিনি বললেন, “আমার গাড়িটা খারাপ হয়েছে কিছু দূরে, এত রাতে কোথায় যাব? এখানে আজ রাতের মতো থাকার ঘর হবে?”
কান্তিবাবু একটু হেসে বললেন, “হ্যাঁ, হবে, চলুন আমার সঙ্গে
কান্তিবাবুর ঠোঁটে হাসি, চশমার ফাঁক দিয়ে তার চোখ চকচক করে উঠল।

----------
ছবি - আন্তর্জাল