প্রবন্ধ:: কার্টুনের প্রাণপুরুষ - প্রকল্প ভট্টাচার্য


কার্টুনের প্রাণপুরুষ
প্রকল্প ভট্টাচার্য

ঈশ! খুব দেরি হয়ে গেছে!!
ছোট্ট মেয়েটা দৌড়ে আসতে গিয়ে আর একটু হলে একজন সাইকেল চালকের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিল। তিনি ধমকে বললেন, “দেখে চলতে পারো না?”
একগাল হেসে মেয়েটা বলল, “স্যরি কাকু! আসলে খুব দেরি হয়ে গেছে তো!” সাইকেল চালক হেসে ফেলে বললেন, “কী নাম তোমার?”
“পিঙ্কি। আর আমার এই বন্ধুর নাম কুটকুট!” এই বলে সে তার হাতের কাঠবেড়ালিটাকে দেখালসাইকেল আরোহী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, তার মধ্যেই পিঙ্কি দৌড়ে ঢুকে গেল সামনের বাড়িটায়।
সকলেই পৌঁছে গেছিল, তার জন্য অপেক্ষা করছিল। “এই তো পিঙ্কি এসে গেছে!” বললেন এক মধ্যবয়স্কা মহিলা।
“দেখ না, স্বাধীনতা দিবসে এত অনুষ্ঠান হচ্ছে সব জায়গায়, রাস্তায় আসতে দেরি হয়ে গেল। শীলামাসি! কেমন আছ! তোমার ছেলেমেয়েরা কই, আসেনি?”
পিঙ্কির মুখে ‘শীলামাসি’ সম্বোধন শুনে একজন গোঁফওয়ালা বয়স্ক ব্যক্তি বললেন, “ওহো, আপনার নাম শীলা নাকি! আমি তো আপনাকে শ্রীমতীজি নামেই চিনি!”
লাজুক হেসে শীলা বললেন, “হ্যাঁ, যেমন আপনাকে সবাই চেনে চাচা চৌধুরী নামে! আপনার আসল নাম আর কতজনই বা জানে! তবে হ্যাঁ, আপনার শাগরেদ সাবুকে সবাই এক ডাকে চেনে!”
“আর আমাকেও চেনে!” বলে উঠল এক কিশোর।
চাচা হাসলেন। “হ্যাঁ বিল্লু, তোমাকেও আজ সক্কলে চেনে। আর এই সমস্ত কিছুর মূলেই আছেন শ্রী প্রাণ কুমার শর্মা। আমাদের সকলের প্রিয় আঙ্কল প্রাণ। আর আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে সবাই একসঙ্গে শ্রদ্ধা জানাব বলেই তো এখানে জমায়েত হয়েছি!”
পিঙ্কি এদিক ওদিক দেখে বলল, “আচ্ছা, ডাবুকে দেখছি না? আসেনি?”
“না, ডাবু আসতে পারেনি। সাবু-র ভয়ে হয়তো!”
সবাই হেসে উঠল“উফফ, শীলামাসি, তুমি এমন কথা বোলো না!”
চাচা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “অথচ এই ডাবুই হচ্ছে প্রাণের সৃষ্ট প্রথম কার্টুন চরিত্র। ১৯৬০ সালে মিলাপ পত্রিকায় প্রকাশিত। আমাদের জন্ম তাঁর অনেক পরে।”
“১৯৬৮, তাই না? লোটপোট পত্রিকায়।”
“’৬৮ নয়, ‘৬৯। ’৬৮-তে আপনার সৃষ্টি, শ্রীমতীজি! তবে লোটপোট পত্রিকাই।”

“আচ্ছা চাচাজি, আপনাকে একটা প্রশ্ন করব? কিছু মনে করবেন না তো?”
“আরে বিল্লু, মনে করব কেন! বলো কী জানতে চাও।”
“প্রাণ আঙ্কল চাচাকে বানালেন, চাচি বানালেন না কেন?”
সক্কলে হেসে উঠল। শ্রীমতীজি বললেন, “আরে, তোমরা জানো না? উনি চান্নি চাচিও বানিয়েছিলেন! সে আর এক গল্প, পরে বলব তোমাদের। চাচাজি, আপনি বলতে থাকুন।”
“হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। শ্রীমতীজির জন্ম কন্নড় ভাষার সুধা পত্রিকায়। তখন আর এক কন্নড় দৈনিক ‘প্রজাবাণী’-তে রামন চরিত্রের জন্মও দিয়েছেন তিনি।
“রামন! মানে সেই ‘হম এক হ্যায়’ বইটার নায়ক, যেটা ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী আবরণ উন্মোচন করেছিলেন!!”
“বাঃ পিঙ্কি! তুমি তো অনেক খবর রাখো! একদম ঠিক বলেছ।”
পিঙ্কি লাজুক হাসল। “হ্যাঁ চাচা, এটাও জানি যে তোমাকে আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ কার্টুন আর্ট-এ সম্মান দেওয়া হয়েছে!”
সক্কলে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল! লজ্জা পেয়ে চাচাজি বললেন, “আরে, এতে আমার কোনও কৃতিত্বই নেই! প্রাণজিকে বলা হয় ভারতের ওয়াল্ট ডিজনি, জানো! ২০০১ সালে ইণ্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ কার্টুনিস্ট থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মান ছাড়াও ২০১৫ সালে উনি পদ্মশ্রী খেতাব পেয়েছিলেন, সে কি আর এমনি এমনি!”
শ্রীমতীজি বললেন, “ঠিক। ১৯৯৫ সালেই ভারতে কার্টুন শিল্প জনপ্রিয় করবার জন্য লিমকা বুক অফ রেকর্ডসে ওঁর নাম ওঠে। তারপর তো উনি প্রাণস মিডিয়া ইন্সটিটিউট নামের অ্যাকাডেমি খোলেন কার্টুনশিল্পের প্রসার এবং শিক্ষার জন্য।”
“ভারতের কার্টুনজগতের প্রাণপুরুষ তিনি। আর কিছুই বলবার নেই!” আবার সক্কলে হাততালি দিল।
এতক্ষণ দরজার কাছে চুপ করে বসেছিল সাবু। এবার বাইরে কী যেন দেখে বলল, “আচ্ছা সবাই চুপ! প্রাণজি আসছেন! আজ পনেরোই আগস্ট, ওঁর জন্মদিনে আমরা ওঁকে চমকে দিতে চাই। সবাই তৈরি হও!”
সবাই চুপ করে আড়ালে সরে গেল। দরজা ঠেলে তাদের প্রিয় আঙ্কল প্রাণ ঢুকলেই যাতে একসঙ্গে ‘শুভ জন্মদিন!’ বলে চিৎকার করে তাঁকে চমকে দিতে পারে!
তারা নিশ্চিত, আঙ্কল প্রাণ রাগ করবেন না। কারণ নিজের সৃষ্টির কাছে হেরে যাওয়ার চেয়ে বড়ো আনন্দ কোনও স্রষ্টারই থাকে না যে!

_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment