প্রবন্ধ:: খেলনার জাদুকর অরবিন্দ গুপ্তা - শেলী ভট্টাচার্য


খেলনার জাদুকর অরবিন্দ গুপ্তা (পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত)
শেলী ভট্টাচার্য

বহু করতালির স্বতঃস্ফূর্ত শব্দকে ক্রমশ বাড়িয়ে তুলে সাদামাটা ঢিলেঢালা খাদি পাঞ্জাবির সঙ্গে সাদা পায়জামা পড়ে স্টেজে উঠে এলেন মানুষটিতাঁর সদাহাস্যময় মুখে বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি দেখে কেন জানি এমনিতেই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে ষাটোর্ধ বয়সের নির্ভার ক্লান্তিহীন প্রশান্ত চেহারা অচিরেই বিপরীতে বসে থাকা অনেক মানুষের মনকে শান্ত করে দেয় যেন মনে হয় অতি সাধারণের মধ্যেও এক চরম অসাধারণত্ব লুকিয়ে আছে এই মানুষটির মন ও মস্তিষ্কে
নিজের বক্তব্য রাখার শুরুতে উনি দিলেন নিজের ক্ষুদ্র বিনয়ী পরিচয় তারপর হাতে একটি ডেট ক্যালেন্ডার নিয়ে লেগে পড়লেন নিজ মহৎ কাজে ক্যালেন্ডারটিতে বারোটি পাতায় ছকটানা খোপে বড়ো বড়ো করে লেখা আছে বছরের এক একটি মাসের তারিখ, সঙ্গে এক পাশ দিয়ে সাপ্তাহিক দিনের সূচিকা উনি খুব সহজেই এক একটি তারিখের চারপাশের দিনপঞ্জি দিয়ে বোঝাতে লাগলেন এক একটি জটিল অঙ্কের সহজতর সূত্র প্রথমে চার ঘরের ম্যাট্রিক্স দিয়ে, তারপর তা বড়ো হতে হতে বারো ঘরে গিয়ে পৌঁছাল এরপরেও উনি সারাটা মাসের তারিখগুলোকে নিয়ে যোগ আর গুণ করে যেন যাদুবলে সারাটা হলঘরের দর্শকদের নিমেষের মধ্যে বুঝিয়ে দিলেন কঠিন কঠিন সব অঙ্কের মারপ্যাঁচ শেষের দিকে ওঁর প্রশ্নগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গেই হলঘরের সবাই সমোচ্চারে দিচ্ছিল সঠিক উত্তর সে সাফল্যে উনি সহাস্য বদনে বলছিলেন, মাথা ভীষণ দামী একটি স্থান সে জায়গাটাকে অযথা কোনও অপ্রয়োজনীয় তথ্যের ভিড়ে নষ্ট করতে নেই তাকে যুক্তি আর বুদ্ধির জোরে শাণিত করে সংক্ষেপে শেখাতে হয় মেরিট ও মেমরিকে সচল রাখার সূত্রাবলীগুলো, যাতে কোনো কিছু শেখার জন্য ক্ষণিক সময় ব্যয় হয়, কিন্তু শেখাটা হয় শক্তপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী তবেই সেই শিক্ষাটা মস্তিষ্কে আজীবন জীবন্ত থাকে
এরপর দর্শকদের মধ্যে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে ওঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ওঁর এ কাজে অনুপ্রেরণার শুরুটা ঠিক কী ছিল? শ্রদ্ধেয় অবাঙালি প্রফেসর অরবিন্দ গুপ্তা তখন মৃদু হাসিমুখে জানালেন, বিবিধ বিদেশি লেখক ও বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম রবি ঠাকুরের বিখ্যাত রচনা ‘তোতা কাহিনি’-র ক’টা লাইন হিন্দীতে তুলে ধরে সে কাহিনির মূল ভাবটি তিনি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলেন এখানে সেটিকে সুবিধার্থে বাংলায় লিখছি আমি...

‘রাজা বলিলেন, 'একবার পাখিটাকে আনো তো দেখি'
পাখি আসিল সঙ্গে কোতোয়াল আসিল পাইক আসিল ঘোড়সওয়ার আসিল রাজা পাখিটিকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খসখস গজগজ করিতে লাগিল
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণ হাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।’

উনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই রচনার মধ্যে রাজার এক পাখিকে শিক্ষাদানের গল্প শুনিয়েছিলেন, যাকে সোনার খাঁচায় রেখে রকমারি জাঁকজমকে পিষ্ট করে দিয়ে শিক্ষাদানের রুক্ষ প্রকৃতিতে জ্ঞানপাঠ দেওয়ার প্রয়াস চলছিল একের পর এক পুঁথির পাতা পাখিটাকে সবলে গলাধঃকরণ করানো হচ্ছিল, যেন তেন প্রকারেণ জ্ঞানী করে তোলার জন্য কিন্তু আদতে সেই সমস্ত আয়োজনকারীরা কেউ পাখিটার মানসিক বা দৈহিক স্বাস্থ্যের প্রতি কোনো নজর দিতেই পারেনি সবার চোখ ছিল তার পারিপার্শ্বিক উন্নতিসাধনে এই উপমাটির মধ্য দিয়ে কবি সেই সময়েই জনসমক্ষে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এক বৃহৎ সমস্যার সূত্রপাতকে, যে সমস্যা প্রতিটি শিশুর শৈশব হতে ওর বয়সের সমহারে বেড়ে উঠতে থাকে তা হল, মুখস্তনির্ভর শিক্ষার বোঝা, যার ভারবাহক হয়ে সে শিশু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক সময় নুয়ে পড়ে, উন্নত শিরে জ্ঞানেন্দ্রিয় গড়ে সর্বসমক্ষে দাঁড়াতে পারে না অথচ এর কারণ চোখে পড়ে না কারও আমাদের সমাজ বাচ্চাদের শিক্ষিত করতে বড়ো বড়ো বিদ্যালয়ে পাঠায়, বড়োসড়ো সিলেবাসকে বুঝুক না বুঝুক... একরকম জবরদস্তি চেপেচুপে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্যাক করে দেয় তাদের মস্তিষ্কের মূল্যবান মেমরি ব্যাগে তারপর সেই প্যাকিং ব্যাগকে টেনে হিঁচড়ে চলতে চলতে কখনও ভেতরের জিনিসগুলোই নষ্ট হয়ে যায়, আবার কখনও সেই ভারবাহী শিশুটি নুয়ে পড়ে মনে ও শরীরে শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হল শেখানো, বোঝানো, জানানো সেই শিক্ষার ধারা যুক্তিবিহীন বোঝা বাড়ানোতে পরিণত হলে তো শিশু শৈশবের মতো সুন্দর সময়টাকে নষ্ট করেই ফেলবে বিরক্তিতে.... নিরানন্দ জীবনযাপনে
এই  কথাগুলোকে উল্লেখ করে প্রফেসর গুপ্তা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন সম্ভবত ওঁর মনও শিশুদের ব্যথায় ব্যাকুল হয়ে উঠল সেই ক্ষণিক সময় তারপর আবার নিজ আবিষ্কারের যাদু নিয়ে ফিরে এলেন আপন ছন্দে একটি সাধারণ প্লাস্টিক স্ট্র-কে দিয়ে অনায়াসে গড়ে তুললেন একটি বাঁশি, যা হতে সৃষ্ট উঁচু নিচু শব্দের কম্পাঙ্কগুলোকে উনি এক এক করে স্ট্র-টিকে কাঁচি দিয়ে কেটে ছোটো করার সঙ্গে সঙ্গে সহজতম বৈজ্ঞানিক ভাষায় ব্যাখ্যা করতে লাগলেন এইভাবেই একের পর এক সহজ দৃষ্টান্ত তুলে ধরে উনি শেখালেন আরও অনেক সাধারণ খেলনা তৈরির পদ্ধতি, যা আমরা অনায়াসেই আমাদের অব্যবহার্য জিনিস দিয়ে গড়ে তুলতে পারি এমনকি শিশুরাও নিজ হাতে সেগুলো বানিয়ে ফেলতে পারে আনন্দ সহযোগে আর প্রতিটি খেলনা তৈরির পাশাপাশি হাতেকলমে শিখে নিতে পারে এক একটি গুরুগম্ভীর বিজ্ঞানের থিওরিকে

এমনভাবেই শিশুদের সরল শৈশবকে শিক্ষণকার্য ও আনন্দদানের ভারসাম্যে বাঁচিয়ে রাখার পণ নিয়েছিলেন এই মহান ব্যক্তিত্ব অরবিন্দ গুপ্তা ১৯৫৩ সালে চতুর্থ সন্তান হয়ে তাঁর জন্ম হয়েছিল এমন এক পিতা-মাতার ঘরে, যারা কখনও স্কুলের মুখই দেখেননি স্কুলজীবনে অসাধারণ সাফল্যের পর অরবিন্দ গুপ্তা পাঁচ বছরের জন্য IIT কানপুরে শিক্ষালাভ করেন তারপরে সেখানেও তিনি নিজের অসামান্য বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন (১৯৭৫)
অরবিন্দ গুপ্তা জানান, আমি কানপুরে শিক্ষাবস্থায় যতটা না সিলেবাস থেকে শিখেছি, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু শিখেছি আমার বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে তোলা ওয়ার্কিং মডেলগুলো থেকে এই কানপুরে পড়াশুনা করাকালীন, অরবিন্দ গুপ্তা মেসের স্টাফের বাচ্চাদের পড়াতেন তাদের স্কুল যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় অরবিন্দ গুপ্তাকে পেয়ে ওরা আনন্দিত ও উপকৃত হয়েছিল
এরপর উনি পেশাগতভাবে পুনের Telco-র মতো নামি সংস্থায় ট্রাক কনস্ট্রাকশনের প্রোজেক্টে যুক্ত হন কিন্তু দু’বছরের মাথায় উনি পড়াশুনার জন্য এক বছরের ছুটি নিয়ে গ্রাম্য শিশুদের বিজ্ঞানের গোড়ার পাঠ শেখাতে লেগে পড়েন (১৯৭৮) এই উদ্দেশ্যে অরবিন্দ গুপ্তা মধ্যপ্রদেশের হোসাঙ্গাবাদ জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কিছু কম খরুচে বিজ্ঞান শিক্ষার পদ্ধতি নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলেন যে পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয় চার পাশের সহজলভ্য জিনিসপত্র এরপর অরবিন্দ গুপ্তা কেরালা চলে গিয়ে ওঁর পথপ্রদর্শক লাউরিয়া বেকারের সঙ্গে কাজ করেন লাউরিয়া তখন স্থানীয় সহজলভ্য জিনিসপত্রের দ্বারা গরীব মানুষদের জন্য নূন্যতম খরচে মাথার ছাদ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন কেরালা থেকে ফিরে এসে অরবিন্দ পুনরায় Telco-তে যোগদান করেন কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই উনি অনুভব করেন ওঁর জীবনের লক্ষ্য শুধুমাত্র রুটিরুজিগত পেশাদার হওয়া নয় তখনই তিনি কোম্পানিতে পদত্যাগপত্র জমা দেন আর সাগদলে গিয়ে দুনু রায়ের সঙ্গে দু’বছর কাজ করেন ১৯৮৪ সালে উনি দিল্লীতে এসে নিজ কাজের উপর বই লেখা শুরু করেন ওঁর সকল বইতে উনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় ও অব্যবহার্য জিনিসপত্রগুলোকে কীভাবে শিশুদের জন্য বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারায় তৈরি আনন্দদায়ক খেলনায় চক্রাকারে রূপ দেওয়া যায়, তা সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন এই প্রসঙ্গে অরবিন্দ গুপ্তা বিদ্যালয়ের পুঁথিগত শিক্ষাপদ্ধতি আর নিজ হাতে প্রকৃতির কোলে সৃষ্ট সহজ সরল নিগূঢ় শিক্ষাপদ্ধতির তফাৎ বোঝাতে একটি ইন্টারভিউতে বলেন যে, It has been made out to be a bookish affair in our schools - something in which you have to mug up definitions and formulae and spit them out in exams. But this is patently untrue. For children, the whole world is a laboratory. We have forgotten the task of bringing children closer to nature. If you can show them that scientific principles such as the laws of motions, or the principles of geometry exist in familiar daily-use objects around them, then they internalise science better and relate it to their daily lives."
অরবিন্দ গুপ্তার প্রথম লেখা Matchstick models and other science experiments বইটি বিভিন্ন সুনামযুক্ত বিজ্ঞানগোষ্ঠী দ্বারা ১২টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদিত হয়, আর দেশে বিদেশে পাঁচ লাখের বেশি এই বইয়ের কপি বিক্রি হয় কিন্তু অরবিন্দ গুপ্তা এই বই বিক্রির জন্য কোনও রয়ালটি নেননি উনি সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ওঁর জীবনগত দৈনন্দিন চাহিদা স্বল্প, যা উনি নিজেই মিটিয়ে ফেলতে পারবেন সারা ভারতের প্রায় ২০০০টি স্কুলে উনি সহজ পদ্ধতিতে বিজ্ঞান শেখানোর জন্য ওয়ার্কশপ করেন সমাজের যে সমস্ত অন্ধকারাবৃত কোণে শিশুদের কাছে স্কুলের পাঠ পৌঁছায় না, সে সকল জায়গায় গিয়ে অরবিন্দ গুপ্তা নিজের ধ্যানধারণার আলোকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেন দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার মতো হিতকর কাজে অরবিন্দ গুপ্তার ওয়েব সাইটে (http://arvindgupta.com) ছোটো ভিডিও ক্লিপিংসের মধ্য দিয়ে উনি গৃহস্থালির অব্যবহার্য জিনিসের দ্বারা সহজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্য নিয়ে একশোরও বেশি খেলনা তৈরি করার পদ্ধতি ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন। সেই ভিডিওগুলো কপিরাইটের বাধাকে উপেক্ষা করেই সবার দেখার জন্য লোড করে রেখেছেন প্রফেসর গুপ্তা এছাড়াও ওঁর লেখা বইগুলোর পি ডি এফ-ও উনি লোড করে রেখেছেন নিজের এই ওয়েবসাইটে, যাতে বহু লোক উপকৃত হন আর ওঁর সৃষ্টির যাদুর ছোঁয়ায় বহু শিশু বিজ্ঞানকে অনায়াসেই খেলার ছলে আপন করে নিতে পারে
সাদামাটা খাদি পাঞ্জাবি পরিহিত লম্বা বুদ্ধিদীপ্ত সদাহাস্যমুখী মানুষটি এভাবেই পুরানো ক্যামেরার রিলের রোল ক্যান, খালি বাক্স, সাইকেলের ব্যবহৃত টিউব, দেশলাই কাঠি ও বাক্স, পুরানো খবরের কাগজ, বল পেনের রিফিলের মতো সহজলভ্য জিনিসগুলোকে ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে দু’হাতের যাদুবলে খেলনা তৈরি করে ফেলেন সাইকেলের সরু টিউবের সঙ্গে দেশলাই কাঠি সহযোগে উনি সহজে বানিয়ে ফেলেন ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বহুভুজের গঠন পুরানো খবরের কাগজকে ফোল্ড করে মিনিটের মধ্যে উনি বানিয়ে ফেলেন উড়ন্ত পাখি, সাঁতারু মাছ, হেলিকপটার, প্লেন আরও কত কিছু ওঁর এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগগুলোর ছোঁয়া পেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা নিজ হাতে এই খেলনাগুলোকে বানিয়ে নিজেদের শৈশবকে আনন্দময় করে তুলতে পারে অনায়াসেই, আর পাশাপাশি বিজ্ঞানের ছোঁয়া পেয়ে নিজেদের সমৃদ্ধও করতে পারে অরবিন্দ গুপ্তার এই মহৎ উদ্যোগকে সম্মান জানাতে ভারত সরকার ২০১৮ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে ওঁর হাতে তুলে দেন পদ্মশ্রী পুরস্কার আর দেশে ও বিদেশে অরবিন্দ গুপ্তার পরিচয় গড়ে ওঠে টয় মেকার বা টয় ইনভেনটর নামে উনি পুরস্কার প্রাপ্তির পর একটা ইন্টারভিউতে হাস্যমুখে বলেছিলেন, I believe that the best thing that a child can do with a toy is break it and try to see how it works. Encourage the child to break his or her toys.
_____

No comments:

Post a Comment