বায়োস্কোপ:: বাংলা শিশু চলচ্চিত্র: তিন দশকের তিনটি ছবি, একটি আলোচনা - সুগত চক্রবর্তী

        

বাংলা শিশু চলচ্চিত্র - তিন দশকের তিনটি ছবি, একটি আলোচনা
সুগত চক্রবর্তী

বর্তমানে কোথাও শিশু চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে হ্যারি পটার, জঙ্গল বুক বা এই ধরনের কোনও বিদেশী চলচ্চিত্রের নাম, হয়তো এখনকার অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই সব বিদেশী ছবি দেখাতেই বেশি উৎসাহিত করেন। কিন্তু আমাদের ভারতীয় ভাষায়ও একাধিক জনপ্রিয় শিশু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলিও যথেষ্ট উন্নত মানের। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, সেই ভাষাতেও তৈরি হয়েছে একাধিক শিশু কিশোর উপযোগী ছবি। ছোট্ট বন্ধুরা, আজ তোমাদের জানাব সেরকম তিনটি ছবি সম্পর্কে যা তৈরি হয়েছিল আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলাতে।
এখানে আমি বেছে নিয়েছি গত তিন দশকের তিনটি ছবি, সত্তরের দশকের 'চারমূর্তি', আশির দশকের 'ফটিকচাঁদ' এবং দু’হাজারের দশকের 'পাতালঘর'এই তিনটি ছবি বাছার কারণ হল, এই তিনটিই পুরোপুরি সাহিত্যনির্ভর ছবি, বাংলার তিন কিংবদন্তী সাহিত্যিকের উপন্যাস অবলম্বনে ছবি তিনটি তৈরি হয়েছিল। তাহলে আর বেশি দেরি না করে, আলোচনা শুরু করা যাক। ও, তোমরা হয়তো বলবে, যে তোমরা ছবিগুলি দেখবে কী ভাবে? তোমাদের বলি, স্মার্টফোন ও কম্পিউটার তো আজ তোমাদের ঘরে ঘরে। ইউটিউবে কিন্তু ছবিগুলি আপলোড করা আছে। আর তা ছাড়া দূরদর্শনের পর্দায় ছবিগুলি মাঝে মাঝেই দেখায়।
তোমরা তো পটলডাঙার বিখ্যাত টেনিদা ও তার চার সাগরেদের কীর্তিকাহিনী বই-এর পাতায় পড়েইছ। প্রয়াত নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি এই চারমূর্তি। টেনিদা, প্যালা, ক্যাবলা ও হাবুলকে নিয়ে পঞ্চাশের দশকে নারায়ণ বাবু লিখলেন উপন্যাস ‘চারমূর্তি’র তার মৃত্যুর (১৯৭০) পর ১৯৭৮ সালে পরিচালক উমানাথ ভট্টাচার্য এই উপন্যাসকে নিয়ে এলেন সিনেমার পর্দায়। গল্পটা তোমরা অনেকেই পড়েছ, যারা পড়নি তাদের বলি, পরীক্ষার পর এই চারমূর্তি তো ক্যাবলার পিসেমশাই-এর কেনা এক বাংলোয় ঝন্টিপাহাড়ি বলে একটা জায়গায় ক’দিন থাকতে এল। তা সেখানে দমে খাওয়াদাওয়া আর আরাম। কিন্তু হলে কী হবে, সেই বাংলোয় রাত-বিরেতে নাকি ভূতের উপদ্রব, কিন্তু শেষে দেখা গেল কি, কতকগুলো দুষ্টলোক সেখানে জাল নোট ছাপাত আর লোককে ভূতের ভয় দেখাত। ছিল এক ভেকধারী স্বামীজি, এক শেঠজি আর স্বামীজির এক শিষ্য।
যাক, সিনেমাটার কথা বলি। টেনিদার চরিত্রে এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন চিন্ময় রায়, আর প্যালা, ক্যাবলা ও হাবুলের চরিত্রে ছিল যথাক্রমে শিবাজিকৃষ্ণ সাহা আর শম্ভু গাঙ্গুলী। আর বদমাস স্বামীজি ঘুটঘুটানন্দ, শেঠজি ঢুণ্ডুরাম আর শিষ্য গজেস্বরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যথাক্রমে প্রয়াত সত্য বন্দোপাধ্যায়, রবি ঘোষ এবং শম্ভু ভট্টাচার্য। এই তিনজন আজ আমাদের মধ্যে নেই বটে, কিন্তু তাদের অসাধারণ মজার অভিনয় আমাদের বাধ্য করে হাসিতে গড়িয়ে পড়তে। আরে, এরা নেই শুনে মন খারাপ হয়ে গেল নাকিকী আর করবে বল, মানুষ তো আর অমর নয়। তা মনখারাপ দূর করার জন্যে ছবিটা একবার দেখবে নাকিগজেস্বর যা একটা ঘাঘরা পরে নেচেছিল না এই ছবিতে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নেচেছিলেন সত্যবাবু এবং রবিবাবু। কোন সময়টা বল তোযখন প্যালাকে ওদের আড্ডায় ধরে নিয়ে গেল তখন। আর শুধু নাচ হয়, তার সঙ্গে একটা দারুণ গান - 'ঘচাং ফু, খাব তোকেঘচাং ফু, ঝাল নুন আদা দিয়ে রুটি দিয়ে সাপটে সুপটে খাব তোকে, ঘচাং ফু, খাঁটি তেলে ভেজে নেব মচমচে করে, মোরগ মোসল্লম করে খাব আজ আমি তোরে, গুলগুল্লা গুলগুল্লা.....’। গানটা কে গেয়েছিলেন বল তো, অংশুমান রায়। গানটা লিখেছিলেন শিবদাস বন্দোপাধ্যায় আর সুর দিয়েছিলেন অজয় দাশ। আরেকটা কথা জানো কিআমাদের যে কোনও দেশাত্মবোধক অনুষ্ঠানে মান্না দের গাওয়া একটা গান প্রায়ই গাওয়া হয়, ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো" হ্যাঁ, এটাও কিন্তু এই ছবিরই গান। তোমরা অনেকেই গানটা জান, হয়তো গুনগুন করে গাইতেও শুরু করেছ, এখন জেনে গেলে গানটার সুরকার গীতিকারের নামও। আর তারপর, সিনেমাটার রাতের দৃশ্যগুলো পুরো জমজমাট, যখন বাংলোয় ভূত এসে চারমূর্তিকে ভয় দেখাতে লাগল বা প্যালাকে খুঁজতে চারমূর্তির বনে জঙ্গলে ঘোরা, আউটডোর লোকেশন দেখার মতো। এছাড়া ছবির একটা দারুণ মজার দৃশ্য ক্যাবলার বাড়িতে টেনিদার খাওয়া। বা, পরীক্ষার হলে টেনিদা ও প্যালার কথোপকথন। তাহলে আর বেশি বলে কী হবে, ছবিটা বরং দেখেই নাও।
এরপরের ছবি যেটা বলব সেটা হল সত্যজিৎ রায়ের কাহিনি অবলম্বনে সন্দীপ রায়ের ছবি 'ফটিকচাঁদ' সন্দীপ বাবুর পরিচয় তো তোমরা জানোই, সত্যজিৎ বাবুর ছেলে। কী বলছএখনকার ফেলুদা ছবিগুলোর পরিচালক? ঠিক বলেছ। কিন্তু জানো কি, এটা সন্দীপ বাবুর প্রথম পরিচালনা করা ছবি। ১৯৮৩ সালে এই ছবিটি উনি বানিয়েছিলেন। কয়েকজন বদমাস মিলে একটি ছেলেকে অপহরণ করে, পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বদমাসদের কয়েকজন মারা যায়, দু’জন খালি বেঁচে যায়। আর ছেলেটার মাথায় চোট লেগে স্মৃতি হারিয়ে যায়। এবার সেই অবস্থায় ছেলেটির সঙ্গে দেখা হয় এক জাগলারের, যার নাম হারুনদা। এবার হারুনদা তাকে কীভাবে তার বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দিলনানা ঘটনা পেরিয়ে সেই নিয়েই গল্প। এই জাগলারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়, যিনি আবার ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে মন্দার বোসের রোল করেছিলেন। একটা টানটান চিত্রনাট্য এই ছবির সম্পদ। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। সংলাপও তাঁর। জানো কি, এই ছবির জন্য সত্যিকারের জাগলিং শিখেছিলেন কামুবাবু। ছবিটি সেই সময় সুপার ডুপার হিট হয়েছিল।
এবার আসি তৃতীয় ছবি ২০০৩-এ মুক্তি পাওয়া শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি, অভিজিৎ চৌধুরীর ছবি ‘পাতালঘরের’ কথায়। এই ছবি সম্পর্কে একটি কথা বলা যায়, ছবিটিতে কিন্তু মূল গল্পকে  অনেকাংশে পরিবর্তন করা হয়েছিল, এমনকি গল্পের প্রধান চরিত্র সনাতন বিশ্বাসের চরিত্রটিকেও রাখা হয়নি। গল্পটি প্রায় আমূল পরিবর্তন করা হয়েছিল বলা যায়। সত্যি কথা বলতে গেলে বইয়ে পড়া কাহিনির সঙ্গে মিলিয়ে ছবি দেখতে হলে পদে পদে হোঁচট খেতে হবে। তাহলে ছবিতে কী আছে? ছবিটি দেখতে হলে শীর্ষেন্দুবাবুর কাহিনীটি ভুলে গিয়ে ছবিটি দেখতে হবে। এবং তখন ছবিটি যথেষ্ট ভালো লাগবে। কারণ, টানটান চিত্রনাট্য, দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি, নজর কাড়া আউটডোর লোকেশন এবং মন মাতানো অভিনয়, এবং দেবজ্যোতি মিশ্রর সুরে কিছু ভালো গান। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মনু মুখোপাধ্যায়, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, খরাজ মুখার্জীরমাপ্রসাদ বণিক এরকম একাধিক নামীদামী শিল্পিমনুবাবুর লিপে একটি মজার গান আছে, 'তুমি কাশী যেতে পারো, যেতে পারো গয়া, পাবে না দ্বিতীয় এমন অপয়া' - কারণ, মনুবাবু অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অপয়া গোবিন্দ বিশ্বাসের চরিত্রে। এবং দেখার মতো জিনিস অন্য গ্রহের প্রাণী হিকের চরিত্রে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ মেকআপ।
তাহলে এক কাজ কর, আমি তোমাদের একটু প্রাথমিক ধারণা দিলাম, এবার তোমরা একটু সময় করে তিনটে ছবি দেখে নাও। তবে খবরদার, পড়াশোনার সময় বাঁচিয়ে কিন্তু। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা, সিনেমাকে সব সময় ছবি বলবে, বই একদম বলবে না। অনেকেরই দেখবে একটা স্বভাব আছে ‘অমুক বইটা দেখেছিস’ বা ‘সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা বইটা দেখলাম’ এরকম ধরনের কথা বলা। এটা ভুল। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় এটা শুনলে খুব বিরক্ত হতেন।
ভবিষ্যতে তোমাদের জন্যে আরও কিছু ছবির আলোচনা করার ইচ্ছে থাকল। ঠিক আছে, ছবি দ্যাখো এবং প্রচুর বাংলা বই পড়।
_____
ছবিঃ আন্তর্জাল

No comments:

Post a comment