অপরাজিত:: ফুটবলের ফিনিক্স - সপ্তর্ষি সেনগুপ্ত


ফুটবলের ফিনিক্স
সপ্তর্ষি সেনগুপ্ত

রূপকথায় বর্ণিত অপূর্ব সুন্দর ফিনিক্স পাখির কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। মৃত ফিনিক্সের ছাইভস্ম থেকে জন্ম নেয় সুন্দরতর নতুন ফিনিক্স। বাস্তবে এমন কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব না থাকলেও, ফুটবল বিশ্বে এমন একজন ফুটবলার ছিলেন , যার জীবনের গল্প কোনো অংশে ফিনিক্স পাখির রূপকথার থেকে কম নয়। প্রায় শেষ হয়ে আসা ফুটবল জীবন থেকে অভাবনীয়ভাবে ফিরে এসেছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। নির্বাসিত, কলঙ্কিত খলনায়ক থেকে হয়ে উঠেছিলেন এক রূপকথার মহানায়ক
১৯৫৬ সালে ইতালির প্রাতো শহরে জন্ম এই রূপকথার নায়কের। কিশোর বয়সেই ফুটবল প্রতিভায় তিনি নজর কাড়েন। প্রথম জীবনে খেলতেন রাইট উইঙ্গার হিসাবে। ১৯৭৩ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ইতালির প্রথম সারির ক্লাব জুভেন্টাসের সিনিয়র দলে খেলার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু বার বার চোট আঘাতে জর্জরিত হয়ে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫, তিন বছরে জুভেন্টাসের হয়ে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। এরপর অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাঁকে জুভেন্টাস থেকে তুলনামূলক ছোটো ক্লাব কোমোতে পাঠানো হয়। কোমো ক্লাবের হয়েই ইতালিয়ান প্রথম ডিভিশন লীগ ‘সিরি এ’-তে অভিষেক হয় তাঁর। কোমোর হয়ে ছয়টি ম্যাচ খেললেও, গোল করতে পারেননি একটিও। তাঁর খেলা মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারেনি কোমো কর্তাদের। তাই পরের মরসুমেই তাঁকে পাঠানো হয় দ্বিতীয় ডিভিশনের (‘সিরি বি’) ক্লাব ভিনসেঞ্জা-র হয়ে খেলার জন্য। এই ক্লাবের হয়ে ‘সিরি বি’-এর একটি খেলার আগে, দলের প্রধান সেন্টার ফরওয়ার্ড চোট পেলে, কোচ প্রথমবার তাঁর নিজস্ব পজিশন রাইট উইং-এর পরিবর্তে, সেন্টার ফরওয়ার্ড পজিশনে খেলান। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় এই একটি সিদ্ধান্তে। গোল করার যে সহজাত প্রবণতা এতদিন সুপ্ত ছিল তাঁর ভিতরে, সেটি যেন এতদিনে সুযোগ পায় নিজেকে মেলে ধরার। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সে বছরই ২১ গোল করে ‘সিরি বি’-এর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি, সঙ্গে সঙ্গে নিজের ক্লাবকে ‘সিরি বি’ চ্যাম্পিয়ন করে ‘সিরি এ’-তে উন্নীত করেন। পরের মরসুমেই, অর্থাৎ ১৯৭৭-৭৮ সালে, তিনি ২৪ গোল করে ‘সিরি এ’-র সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং নিজের ক্লাব ভিনসেঞ্জা-কে ‘সিরি এ’-তে দ্বিতীয় স্থানে তুলে আনেন। তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যের কারণেই ১৯৭৮ বিশ্বকাপ দলে তাঁকে সুযোগ দেন ইতালীয় কোচ এনজো বিয়েরজোত।
জীবনের প্রথম বিশ্বকাপে দেশবাসীকে হতাশ করেননি তিনি। প্রথম রাউন্ডের খেলায় ফ্রান্স ও হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে গোল করেন এবং তিনটি গোল করে সেই বিশ্বকাপে ইতালির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি সেই বিশ্বকাপের ফিফা ঘোষিত ‘অল ষ্টার’ দলেও সুযোগ পান এবং বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেরা ফুটবলারের পুরস্কার ‘সিলভার বল’ জেতেন। ইতালি সেই বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান পেলেও, তিনি নিজের দেশে ফিরে পান বীরের সম্মান। ইতালির নানা ক্লাব তাঁকে দলে পাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েকিন্তু ভিনসেঞ্জা মালিক সেই সময়ের রেকর্ড মূল্যে তাঁকে নিজেদের দলেই রেখে দেন। তিনি সে সময়ে বিশ্বের সবথেকে মূল্যবান ফুটবলার হিসাবে ভিনসেঞ্জা ক্লাবেই থেকে যান আরও একটি বছর। কিন্তু ১৯৭৮-৭৯ মরসুমে দুর্ভাগ্যবশত চোটের কবলে পড়েন তিনি, ভিনসেঞ্জাও ‘সিরি এ’-তে অবনমনের আওতায় পড়ে যায়। তিনি বাধ্য হয়ে আরেক ‘সিরি এ’ ক্লাব পেরুজিয়া-তে খেলার জন্য সই করেন
পেরুজিয়া-তে ১৯৭৯-৮০ মরসুমে ১৩ গোল করেন তিনি। কিন্তু এরপরেই তাঁর ফুটবলার জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। ১৯৮০ সালে ইতালি ফুটবলের কালো অধ্যায় হিসাবে উঠে আসে নানা গড়াপেটার অভিযোগ। এ সি মিলানের মতো ক্লাবকে চরম শাস্তি দেওয়া হয়। শাস্তির কবলে পড়েন অনেক ফুটবলারও। দুর্ভাগ্যবশত তিনিও দু’বছরের জন্য নির্বাসিত হন সবরকম ফুটবল থেকে। রাতারাতি মহানায়ক থেকে খলনায়ক হয়ে যান তিনি। দু’বছরের জন্য হারিয়ে যান ফুটবলপ্রেমীদের মন থেকে।
এই দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে দিন কাটিয়েছেন, ফুটবল বিশ্ব সেই খবর রাখেনি। তিনি আবার খবরে এলেন, যখন ১৯৮২ সালে, তাঁর নির্বাসন শেষ হবার পর পরই জুভেন্টাস ক্লাব তাঁকে তাদের দলে সামিল করে। দুই বছর প্রায় অজ্ঞাতবাসে থাকা এক কলঙ্কিত ফুটবলারকে দলে সামিল করার জন্য জুভেন্টাস ক্লাবকে সেই সময় সম্মুখীন হতে হয়েছে বিশেষজ্ঞ ও সমর্থকদের অনেক সমালোচনার। শোনা যায়, জুভেন্টাসের এই সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল তৎকালীন ইতালি জাতীয় দলের কোচ বিয়েরজোতের অঙ্গুলিনির্দেশ। সেই সমালোচনার চোরা স্রোত আগ্নেয়গিরি হয়ে ফেটে পড়ে, যখন জুভেন্টাসে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার পরেই বিয়েরজোত সাহেব তাঁকে ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপের ইতালি দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত মুণ্ডপাত হতে থাকল বিয়েরজোত সাহেবের। ফুটবলার হিসাবে তিনি যে খুব ভালো অবস্থায় নেই এবং তিনি বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা রাখেন না, সেটা প্রমাণ করার জন্য প্রায় সারা ইতালিবাসী সোচ্চার হয়ে উঠে। কিন্তু বিয়েরজোত ছিলেন অবিচল, তাই একদা মহানায়ক, সে সময় খলনায়ক হয়ে যাওয়া সেই ফুটবলারটিও ইতালি দলের সঙ্গে স্পেনগামী বিমানে নিজের জায়গা পেয়ে গেলেন।
সে বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম খেলা ছিল পোল্যান্ড-এর বিরুদ্ধে। বিয়েরজোত সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তাঁকে প্রথম একাদশে খেলালেন। বিগত আড়াই বছরে, যিনি ম্যাচ খেলেছেন সাকুল্যে তিনটি, তাঁকে ইতালির মতো দলের প্রথম একাদশে দেখে আবার সমালোচনার ঝড় উঠল সারা দেশ জুড়ে। খেলাটি গোলশূন্যভাবে শেষ হয়, আর তিনি সারা ম্যাচে ছিলেন চূড়ান্ত নিষ্প্রভ।
পরের ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল পেরু। এই ম্যাচটিও জিততে সক্ষম হল না ইতালি। খেলা শেষ হয় ১-১ গোলে অমমাংসিতভাবে। তিনি যথারীতি চূড়ান্ত নিষ্প্রভ। ৪৬ মিনিটে তাঁকে বদল করতে বাধ্য হন কোচ। দেশে সমালোচনার ঢেউ যেন সুনামি হয়ে আছড়ে পড়তে লাগল।
প্রথম রাউন্ডের শেষ ম্যাচ তুলনামূলক অনভিজ্ঞ ক্যামেরুনের বিরুদ্ধেও জয় অধরা থাকল। ১-১ গোলে খেলা শেষ হল। তিনি আবারও হতাশ করলেন চূড়ান্তভাবে। তিনি দলের প্রধান সেন্টার ফরওয়ার্ড হিসাবে খেলেও তিন ম্যাচে একটিও গোল করতে না পারায় এবং দল একটি ম্যাচেও না জিততে পারায় কোচ বিয়েরজোত ও তাঁর একান্ত আস্থাভাজন ফুটবলারটির বিরুদ্ধে তখন সমালোচনা রীতিমতো বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে।
একটি ম্যাচ না জিতলেও, তুলনামূলক ভালো গোল পার্থক্যের কারণে গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট পেল ইতালি। ইতালির সংবাদ মাধ্যমে তখন মুণ্ডপাত চলছে তাঁর। তিনি তখন জাতীয় খলনায়ক। ইতালির সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি তখন ‘ghost aimlessly wandering over the fieldকেন তরুণ প্রতিভা আলেক্সান্দ্র আলতোবেলি সুযোগ পাচ্ছেন না, সেই প্রশ্ন বার বার উঠে আসতে লাগলএমন পরিস্থিতিতেও নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল ইতালীয় কোচ দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রথম ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আবারও সেন্টার ফরওয়ার্ড পজিশনে মাঠে নামালেন সেই বিতর্কিত খলনায়ককে যথারীতি আবারও ব্যর্থ তিনি। কিন্তু ২-১ গোলে ইতালি আর্জেন্টিনাকে হারালে এবং আর্জেন্টিনার উঠতি প্রতিভা দিয়াগো ম্যারাডোনাকে বোতলবন্দি করে ইতালীয় ডিফেন্ডার ক্লাওদিও জেন্টিল নায়কের সম্মান পেলে, তাঁর ব্যর্থতা কিছুটা হলেও চাপা পড়ে যায়।
এর পরের খেলা ছিল বিশ্বকাপের ‘হট ফেভারিট’ ব্রাজিলের বিরুদ্ধে। ব্রাজিল দলে তখন দাপিয়ে খেলছেন জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও, জুনিয়র-রা। জিকো ইতিমধ্যেই চারটি গোল করে তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সোনার বুটের অন্যতম দাবিদার। সাম্বার তালে তালে হলুদ ঝড় তুলে বিপক্ষকে বিধ্বস্ত করে ব্রাজিল তখন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর। অন্যদিকে চার ম্যাচে মাত্র একটিতে জিতে ইতালির রীতিমতো কোণঠাসা অবস্থা। এই ম্যাচে ড্র করলেই ব্রাজিল পৌঁছে যাবে সেমিফাইনালে, সেখানে ইতালির চাই অবশ্যই জয়। ইতালির অতি বড়ো সমর্থকও সেদিন ইতালির জয় আশা করেননি, যেখানে দলের মূল সেন্টার ফরওয়ার্ড তখনও একটিও গোল করতে ব্যর্থ।
কিন্তু খেলা শুরু হতেই সমানে সমানে লড়াই শুরু হলখেলার তিন মিনিটে ইতালিয়ান মিডিও মার্কো তারদেলির মাইনাস পেনাল্টি বক্সে পেয়েও হাস্যকরভাবে সুযোগ নষ্ট করেন সেই খলনায়ক। দেশ জুড়ে মুণ্ডপাত হতে লাগল তাঁর। এমন গুরুত্বপূর্ণ খেলায় আলতোবেলি কেন তাঁর পরিবর্তে মাঠে নেই, এই প্রশ্ন তুলে দিলেন ধারাভাষ্যকাররাও। দুই মিনিট পরই, সেন্টার লাইনের ধারে রাইট উইং বরাবর বল পেলেন ইতালিয়ান মিডিও ব্রুনো কন্তি। হালকা ড্রিবল করে কিছুটা এগিয়ে তিনি প্রান্ত বদল করিয়ে ক্রস পাঠান লেফট উইঙ্গে আন্তোনিও ক্যাবরিনির উদ্দেশ্যে। ক্যাবরিনি সেই বল ভাসিয়ে দেন ব্রাজিল গোলমুখে। বল ব্রাজিল ডিফেন্ডার অস্কার ও লুইজিনহো এবং ইতালি স্ট্রাইকার গ্রাজিয়ানির মাথা টপকে যখন ভেসে যাচ্ছে মাঠের বাইরে, সেই মুহূর্তে হঠাৎই যেন মাটি ফুঁড়ে ওঠে এলেন তিনি। আর বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে দেখল, তাঁর দুরন্ত হেডে বল জড়িয়ে যাচ্ছে ব্রাজিলের গোলেসেই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ল দুরন্ত ব্রাজিল। আর সমালোচিত খলনায়ক থেকে সেই মুহূর্তেই যেন তাঁর ফুটবল জীবন ইউ টার্ন নিয়ে আবার ফিরে এল নায়কের কক্ষপথে। কিন্তু খেলার ১২ মিনিটেই সক্রেটিসের গোলে সমতা ফেরায় ব্রাজিল। খেলার ২৫ মিনিটে নিজেদের পেনাল্টি বক্সের সামনে ব্রাজিল ডিফেন্ডার সেরেজো একটি দায়সারা পাস দেন সতীর্থ জুনিয়রের উদ্দেশে, আর জুনিয়রকে ততোধিক দায়সারাভাবে বলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মাঝপথেই সেই পাস ‘ইন্টারসেপ্ট’ করে, দলের ও নিজের দ্বিতীয় গোল করে যান আবারও সেই তিনিই। এর পর মরিয়া ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণ আছড়ে পড়তে থাকে ইতালি রক্ষণে। ইতালি অধিনায়ক গোলকিপার দিনো জফ অতিমানব হয়ে দলের পতন রক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তারপরেও খেলার ৬৮ মিনিটে ফ্যালকাও-এর গোলে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। ড্র হলেই যেহেতু ব্রাজিল সেমিফাইনালের টিকিট পেয়ে যাবে, তাই সারা বিশ্ব আশা করেছিল এই পরিস্থিতিতে ব্রাজিল রক্ষণে মনোযোগ দেবে। কিন্তু বিশ্ববাসীকে ভুল প্রমাণ করে ব্রাজিল ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। খেলার ৭৪ মিনিটে একটি কর্নার পায় ইতালি আর ব্রুনো কন্তির নেওয়া সেই কর্নার থেকে ব্রাজিল গোলের দিকে নেওয়া তারদেলির গোলার মতো শট সামান্য ছোঁয়ায় দিক পরিবর্তন করে, নিজের হ্যাট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। সারা ইতালি যখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে, ডাগ আউটে কোচ বিয়েরজোত সাহেবের মুখে তখন পরিতৃপ্তির হাসি। ৩-২ গোলে অপরাজেয় ব্রাজিলকে হারিয়ে, সোনার বুটের দৌড় থেকে ব্রাজিলিয়ান জিকোকে ছিটকে দিয়ে, ইতালি সেই নায়কের কাঁধে ভর করে পৌঁছে গেল সেমিফাইনালে। এদিনই শুরু হল তাঁর স্বপ্নের দৌড়।
সেমিফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ পোল্যান্ড। পোলিশ স্ট্রাইকার বোনিয়েক চার গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে শীর্ষে। প্রথম রাউন্ডে এই দু’দলের খেলা গোলশূন্য ড্র হলেও, সেমিফাইনালে ২২ ও ৭৩ মিনিটে পর পর দুটি গোল করে ইতালিকে ফাইনালে তুললেন আমাদের সেই নায়ক। সোনার বুটের দৌড় থেকে ছিটকে গেলেন বোনিয়েক, আর ৫ গোল করে প্রবলভাবে দাবিদার হয়ে উঠলেন তিনি।
ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। সোনার বুটের দৌড়ে আমাদের নায়কের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন ৫ গোল করা জার্মান স্ট্রাইকার কার্ল হেইঞ্জ রুমানিগে। প্রথমার্ধ তুল্যমূল্য লড়াই হল দুই দলের মধ্যে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের ১২ মিনিটে ইতালি ডিফেন্ডার জেন্টিলের ভাসানো ক্রস জার্মান গোলমুখে ক্যাবরিনির নাগাল এড়িয়ে আমাদের নায়কের পায়ে পড়তেই, গোলমুখ খুলে গেল প্রথমবারের মতো। এরপর তারদেলি, আলতোবেলি আরও দুটি গোল করে ইতালির জয় সুনিশ্চিত করেন। খেলাশেষের কিছু আগে সান্ত্বনা গোল করেন জার্মান ব্রাইটনার। ৩-১ গোলে জিতে বিশ্বজয়ী হল আমাদের নায়কের দেশ আর তিনি হয়ে উঠলেন এক রূপকথার নায়ক। প্রায় শেষ হতে চলা ফুটবল জীবন থেকে যেন সেই ফিনিক্স পাখির মতো আরও উজ্জ্বল, আরও বর্ণময় হয়ে পুনর্জীবন পান তিনি। তিনি সেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসাবে সোনার বুট তো জিতেছিলেন, জিতেছিলেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের সোনার বল পুরস্কারও। তাঁর সেই স্বপ্নের পুনরুত্থান রূপকথার কাহিনির মতো আজও আলোচিত হয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে।
দেশের হয়ে মোট ৪৮টি ম্যাচ খেলে ২০টি গোল করেছিলেন তিনি। ছিলেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ইতালি দলেও, কিন্তু চোটের কারণে শুরুতেই ছিটকে যান তিনি। ১৯৮৭ সালে অবসর নেন সবরকম ফুটবল থেকে।
২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর দুরারোগ্য ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে, মাত্র ৬৪ বছর বয়সেই প্রয়াত হন ‘ফুটবলের ফিনিক্স পাখি’ সেই স্বপ্নের নায়ক, আমরা যাকে চিনি পাওলো রোসি নামে। আজও ফুটবলপ্রেমী মানুষ আলোচনা করেন তাঁর সেই স্বপ্নের প্রত্যাবর্তন আর বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে এখনও বলে থাকেন ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়!!!’
----------
ছবি - আন্তর্জাল

অপরাজিত:: অলিম্পিক মশাল - সায়ন তালুকদার


অলিম্পিক মশাল
সায়ন তালুকদার

পেকহ্যামের বেলেনডেন রোড দিয়ে ছুটছেন সুপারস্টার। গায়ে সাদা ট্র্যাক স্যুট। বুকের উপর লেখা রিলে নম্বর ০৬৩। কখনও ধীর গতিতে ছুটলেন, গতি আরও কমিয়ে খানিক হাঁটলেনও, তারপর ফের দৌড়োতে শুরু করলেন। ভক্তদের দেখে হাত নাড়লেন। প্রায় ৩০০ মিটার দৌড়োনোর পর, মশাল তুলে দিলেন পরের জনের হাতে। মিশে গেলেন উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড়ে। ছবি তুলতে দিলেন ইচ্ছেমতো। বললেন, “জীবনের সেরা ঘটনা। দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত।স্বীকার করলেন, “এই বয়সে এতটা দৌড়োনো খুব কষ্টকর। কিন্তু চারপাশ থেকে সবাই খুব উৎসাহ দিচ্ছিল। বিদেশের মাটিতে এমন ঘটনায় আমি সত্যিই বিস্মিত। অলিম্পিকের মশাল হাতে দৌড়োবো, কোনোদিন ভাবিনি।
২০১২ লন্ডন অলিম্পিক্সের মশাল দৌড়ে সামিল হয়ে এমনই অনুভূতি হয়েছিল শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চনের।

‘ম্যাজিক ল্যাম্প’-এর বন্ধুরা, সদ্য শেষ হল টোকিও অলিম্পিক ২০২০। পদক তালিকায় প্রথম পঞ্চাশে স্থান করে নিয়েছে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। সেই উদ্দেশ্যেই আজ অলিম্পিক মশালের প্রসঙ্গ উত্থাপন।
তোমাদের অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, কবে থেকে শুরু হল অলিম্পিকে এই মশাল জ্বালানোর রীতি? কোথায়ই বা এর সূত্রপাত?
ইতিহাস ও পুরাণের পাতায় চোখ রাখলে জানা যায়, পশ্চিম গ্রিসের অলিম্পিয়া নামক এক জায়গায়, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন অলিম্পিকের সূচনা হয়েছিল। সেখানেই ঘন্টাখানেকের একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো থেকে জ্বালানো হয় সেই অগ্নিশিখা, যা ক্রীড়ানুষ্ঠান শেষ হবার আগে পর্যন্ত কখনোই নেভে না। আগুন জ্বালানো হয় মাটিতে রাখা একটি অবতল আয়না থেকে। এতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে এমন তাপের সৃষ্টি করা হয় যা থেকে মশাল জ্বালানো যায়। এগারোজন মহিলার মধ্যে থেকে একজন শিখা প্রজ্জ্বলন করেন।
এরপর তা থেকে জ্বালানো হয় আরেকটি অলিম্পিক মশাল - যা তুলে দেওয়া হয় একজন ক্রীড়াবিদের হাতে। এ ছাড়াও তুলে দেওয়া হয় একটি জলপাই গাছের শাখা। আরেকজন উড়িয়ে দেন একটি সাদা পায়রা, যা শান্তির প্রতীক।
এই অলিম্পিয়াতেই ৭৭৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে শুরু হয়েছিল প্রাচীন যুগের অলিম্পিক - যা অনুষ্ঠিত হত প্রতি চার বছর অন্তর। সেখানে ছিল গ্রিক দেবতাদের রাজা জিউসের মন্দির এবং তার সম্মানেই অনুষ্ঠিত হত ক্রীড়ানুষ্ঠান। আজ সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

প্রাচীন অলিম্পিকে মশাল দৌড়ের প্রচলন থাকলেও, আধুনিক অলিম্পিকের শুরুতেই সেই সংস্কৃতি উধাও হয়ে যায়। ১৯২৮ সাল থেকে অলিম্পিক মশাল পুনরায় চালু হলেও, ছিল না মশাল দৌড়ের কোনো ব্যাপারই। এই মশাল দৌড় শুরু হয়েছিল নাৎসি জমানায়। উনিশশো ছত্রিশ সালে বার্লিন অলিম্পিকে নাৎসি জোসেফ গোয়েবলসের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় অলিম্পিকে মশাল দৌড়। গ্রিস থেকে মশাল বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে পৌঁছয় বার্লিনে। গ্রিস থেকে বার্লিন - দীর্ঘ তিন হাজার একশো সাতাশি কিলোমিটার পথ তিন হাজার তিনশো একত্রিশজন দৌড়বীরের হাত ধরে তা পৌঁছয় অলিম্পিকের মূল স্টেডিয়ামে। পরবর্তীতে অলিম্পিক মশাল দৌড় শুধুমাত্র স্থলপথে নয়, জলপথে এমনকি আকাশপথেও পৌঁছেছে বিভিন্ন দেশে। প্রথমবার ১৯৪৮ সালে অলিম্পিক মশালকে ইংলিশ চ্যানেল পার করাতে ব্যবহৃত হয়েছিল নৌকা। ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে আকাশপথে পাড়ি দিয়েছিল মশাল। এমনকি ১৯৭৬ সালে রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে অলিম্পিকের শিখার প্রেরণ করা হয়েছিল ও তা প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল।
১৯২৮ সালে আমস্টারডাম অলিম্পিকে চালু হয় অলিম্পিক মশাল। মজার ব্যাপার, মশালের ওজন ও দৈর্ঘ্য এক থাকলেও, বদলেছে মশালের উপকরণের তালিকা। ১৯৪৮-এ লন্ডন অলিম্পিকে সাতচল্লিশ সেন্টিমিটার লম্বা ও নশো ষাট গ্রাম ওজনের মশাল তৈরি হয়েছিল হিডুমিনিয়াম-অ্যালুমিনিয়ামের সংকর ধাতু দিয়ে। ১৯৫৬-তে মেলবোর্ন অলিম্পিকে সেই উপকরণ বদলে হয় ম্যাগনেশিয়াম-অ্যালুমিনিয়াম। এরপরও বদলেছে উপকরণ। এমনকি মশালের শিখাও তৈরি হয়েছে বিভিন্ন উপকরণে। কখনও ব্যবহৃত অলিভ অয়েল, কখনও বা প্রপিলিনের মতো তরল গ্যাস।
অলিম্পিকের সংখ্যা যত বেড়েছে, বেড়েছে পথ এবং একই সঙ্গে বেড়েছে মশালবাহকের সংখ্যাও। ২০০৪-এ মশাল দৌড় প্রথমবার বিশ্বের সব প্রান্তে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। আটাত্তর দিনে মশালের বিশ্ব ভ্রমণে আটাত্তর হাজার পথ মশাল অতিক্রম করে এগারো হাজার তিনশো মশাল বাহকের হাত ধরে।
তোমরা হয়তো অনেকেই জানো, অলিম্পিকের রেওয়াজ অনুযায়ী আয়োজক দেশের মূল স্টেডিয়ামে মশাল দৌড়ের শেষে অলিম্পিক কলড্রন বা বিশাল কড়াইয়ের মতো অলিম্পিক মশালের আধারে আগুন জ্বালান বিখ্যাত কোনো ক্রীড়াবিদ। যেমন - ১৯৫২ সালে মশালের শিখা জ্বালিয়েছিলেন পাভো নুরমি। ১৯৯২-এ প্লাতিনি, ১৯৯৬-এ মহম্মদ আলি।
বিভিন্ন দেশের মধ্যে কুটনৈতিক বিভিন্ন সংঘাত জারি থাকলেও অলিম্পিকের ময়দানে তারা একত্রিত হয়। অলিম্পিকের মশাল এই ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আলোকিত হয়, সমাপনী অনুষ্ঠানের আগে পর্যন্ত যে আগুন নেভে না, রয়ে যায় অনির্বাণ।
অলিম্পিকের খাতা খুলে বসলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারো ইতিহাসের ঘটনা। আবার কখনও সময় পেলে তোমাদের সঙ্গে সেই সব কথা ভাগ করে নেব’খন।
----------
ছবি - আন্তর্জাল

গোলটেবিল:: হরর লাইভ – মিলন গাঙ্গুলী :: আলোচনা: সুলগ্না ব্যানার্জ্জী


হরর লাইভ – মিলন গাঙ্গুলী
আলোচনা - সুলগ্না ব্যানার্জী

বইয়ের নাম: হরর লাইভ; লেখক: মিলন গাঙ্গুলী
প্রকাশক: অরণ্যমন প্রকাশনী; মূল্য: ১৪০ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা)

পাঁচটি হরর বড়ো গল্পে সুসজ্জিত এই বইটি যাঁরা ভয়ের গল্প পড়তে ভালোবাসেন তাঁদের সংগ্রহে থাকা অত্যাবশ্যকীয় বলেই এটি পড়ার পর মনে হয়। রিভিউ দিতে গেলে এ বইয়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে, তাই একটা ধারণা দিলাম।

১। রুমঝুমপুরের বাগানবাড়ি
বিদেশ থেকে দশ বছর পর গোলোকবিহারীর একমাত্র সন্তান ‘রঘু’ দেশে ফিরেছে। উদ্দেশ্য বাবার বানানো রুমঝুমপুরের সাধের বাগানবাড়ি, যেটি সম্পর্কে তার বাবার এক অজানা আতঙ্ক ছিল, সেটাকে হোটেল বানিয়ে বড়োসড়ো ব্যাবসা চালানো। এই বাগানবাড়ি হস্তগত করার জন্য অনেক কিছু করেছে সেতার অবর্তমানে বাগানবাড়ির দেখভালের দায়িত্ব ছিল এক বুড়ি পিসি আর ম্যানেজারের ওপর। বাগানবাড়িতে পৌঁছে সে বুঝল বাগানবাড়ি সম্পর্কে রটেছে অনেক কিছু। পারবে কি রঘু সব রটনাকে মিথ্যে প্রমাণ করে বাগানবাড়িকে হোটেল বানিয়ে ব্যাবসা শুরু করতে? নাকি তাকেও সম্মুখীন হতে হবে কোনো এক আতঙ্কের প্রহরের??

২। মদন তপাদারের পাপেট
বিখ্যাত ভেন্ট্রিলোকুইজম শিল্পী মদন তপাদারের পাপেট শো - এর জন্যই টিকে আছে বনমালী অপেরা হাউস। মদন তপাদার এবং তার কথা-বলা পুতুল ‘রাজা চৌধুরী’-র অন্ধভক্ত কমলাপুরের জমিদার বাড়ির বংশধর অনীক। তার একটাই শখ, বড়ো হয়ে সে মদন তপাদারের মতোই একজন বিখ্যাত ভেন্ট্রিলোকুইজম শিল্পীই হবে। কিন্তু সত্যিই কি একজন বিখ্যাত ভেন্ট্রিলোকুইজম শিল্পীই ছিলেন মদন তপাদার? সত্যিই কি তাঁর পাপেট ‘রাজা চৌধুরী’ কেবলমাত্র একটি পুতুলই ছিল? না আর কিছু বললে গল্পটির ভয়াবহতা ক্ষুণ্ণ হবে।

৩। খুনখারাপি
দূরদর্শনের জগতে ‘রাত বারোটা লাইভ’ বিখ্যাত একটি ভৌতিক অনুষ্ঠান হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়। আমরা সবাই জানি সুদক্ষ উপস্থাপনাই জনপ্রিয়তার মূল কারণ, তবুও অনুষ্ঠানের ডিরেক্টর আলতাফ চৌধুরী উপস্থাপক ‘জুলমত খান’-কে তার অহংকারের জন্য খুব একটা পছন্দ করেন না। অনুষ্ঠানের মূল বিষয়বস্তু বাংলাদেশের সেই সব ভৌতিক জায়গা থেকে সরাসরি লাইভ সম্প্রচার যে সব স্থানের রহস্য অমীমাংসিত।
শোনা যায় জয়ন্তপুরের দাপুটে জমিদার অম্বিকাচরণের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার বাড়িতে প্রবেশ করলে জীবদ্দশায় কেউ ফিরে আসতে পারেনি। সেবার অম্বিকাচরণের বাড়িকেই ফোকাস করবেন সিদ্ধান্ত নিলেন আলতাফ চৌধুরী। সব কিছু ঠিকঠাক হবার পর উপস্থাপক জুলমত তার সহকারী ক্যামেরাম্যান ‘জলিল’-কে নিয়ে প্রবেশ করল ছায়ামহলে। কী হল তারপর? সত্যিই কি ছায়ামহলে প্রবেশকারীরা প্রাণে বাঁচেন না? কিন্তু কেন? টান টান উত্তেজনায় ভরপুর এ গল্পটির ভয়াবহতা কলমে ব্যক্ত করা অসম্ভব।

৪। প্রেতচক্র
সুদখোর মহাজন ‘আইনুল হুজুর’-এর খুনের কিনারার দায়িত্ব পড়েছে দারোগা ‘ইমান আলী’ এবং তাঁর সহকারী ‘ভবানীবাবু’-র ওপর। এটাই তাঁদের প্রথম কেস। সন্দেহের তালিকায় আইনুলেরই চার প্রতিবেশী বন্ধু যারা কেউই আইনুলকে পছন্দ করত না। অনেক রকম কায়দাকানুন করেও যখন ইমান আলী ব্যর্থ, ঠিক তখনই ভবানীবাবু এক তান্ত্রিকের সন্ধান জানান যিনি প্ল্যানচেটের মাধ্যমে আইনুলের আত্মাকে ডেকে এনে খুনিকে ধরতে সক্ষম। পারবেন কি দারোগা ইমান আলী সফল হতে? শেষমেশ আইনুলের আসল খুনী ধরা পড়বে কি?

৫। সাক্ষী থাকে পুরোনো চাঁদ
মানুষের মন বড়ো বিচিত্র জিনিস। তার থেকেও কঠিন বিষয় অপরের মন বোঝা, তাই হয়তো আজও চিকিৎসা বিজ্ঞানে নানান ধরনের মানসিক রোগের সন্ধান দেরিতে পাওয়া যায়। ‘স্কিৎজোফ্রেনিয়া’ এমনই একটি মানসিক অসুখ যে রোগে আক্রান্ত রোগীর ব্যবহারে কোনোরকম অস্বাভাবিকতা নেই। এই গল্পটি এমনই এক রোগীকে নিয়ে। খুব সাধারণ হলেও এ গল্পটি বোঝার জন্য প্রবেশ করতে হবে গল্পের গভীরে আর বোঝার পর ঘিরে ধরবে নীরবতা।

লেখক ‘মিলন গাঙ্গুলী’-র কলমে সর্বদাই থাকে নতুনত্বের চমক। ‘হরর লাইভ’ বইয়ের গল্পগুলোও ব্যতিক্রমী নয়। ভয়ের গল্প পড়তে যাঁরা ভালোবাসেন, ছোটো হোক বা বড়ো, তাঁদের সকলের জন্যই এই সংকলনটি অবশ্যপাঠ্য।
----------

ম্যাজিক পেনসিলঃ ছোটোদের নিজস্ব বিভাগঃ শারদীয়া ২০২১

  
ম্যাজিক পেনসিল
ছোটোদের নিজস্ব বিভাগ

এবারের ম্যাজিক পেনসিল বিভাগ একেবারে জমজমাট গল্পে ও ছবিতে। ক্লাস থ্রি-র সোহিনী নন্দী এবারে পাঠিয়েছে দারুণ চারটে ছবি। নিমো (ভালো নাম ঐশিক) পাঠিয়েছে দুর্দান্ত একটা গল্প, উড়ুক্কু ড্রাগন নিয়ে, সঙ্গে মজাদার একটা ছবিও এঁকে পাঠিয়েছে সে। নিমোর গল্পটা অবশ্য ইংরেজিতে লেখা, তাই তার মা সেটা বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েছেন। আর মেঘ দেখা নিয়ে চমৎকার একটি লেখা পাঠিয়েছে ক্লাস এইটের কৌশানি দেব।
এসো এক এক করে দেখে নেওয়া যাক সব। নিচের লিংক তিনটেয় ক্লিক করলেই দেখা যাবে তিন খুদে ওস্তাদের কর্মকাণ্ড।



----------

ম্যাজিক পেনসিল: চারটি ছবি - সোহিনী নন্দী

ম্যাজিক পেনসিল
।। ছবি ।।
শিল্পী - সোহিনী নন্দী
ক্লাস থ্রি, নয়ডা

।। ১ ।।


।। ২ ।।


।। ৩ ।।


।। ৪ ।।


----------

ম্যাজিক পেনসিল: গল্প ও ছবি - ঐশিক (নিমো)

ম্যাজিক পেনসিল
।। গল্প ও ছবি ।।
ঐশিক (নিমো), বয়স - সাড়ে ছয়


The dragon who wanted spots
Author and illustrator: Nemo

Once upon a time there was a dragon named Donny. Donny flew up into the sky in Dragon land. But in fifteen minutes he flew away from the Dragon land. He flew up and down down down he saw two ladybugs. One lady bug’s name was Terry and the other was Jim.
Terry was twelve years old and Jim was eighteen years old. Donny the dragon said hi to Terry but before Donny could to say hi to Jim, two butterflies immediately approached. One was sixteen year old and her name was Tim. The other butterfly was twenty two years old. She loved to learn in college. Her name was Iris. Each of their wings was red with black polka dots. Only the dragon Donny was red without polka dots. So Donnie the dragon asked, “Wow! you have such beautiful black polka dots on your red wings. Will you please give some black polka dots on my red skin?” 
Then all of his friends said, “Sure, we will get some black paint and brush and dab black Polka dots on your red skin.” So they did that. Then Donny the dragon said, “Thanks friends”. He went back to Dragon land and showed all the dragons his black polka dots. Other dragons did not have any polka dots, so Donny said, “You too can have some designs on your skin like I do.”
(The End)
The moral is, you can have designs on your body.
 ----------
সেই ড্রাগনটার গপ্পো যে পোলকা ডট চেয়েছিল
গপ্পো লেখা ও আঁকা: ঐশিক (নিমো)
বয়স: সাড়ে ছয়
ভাবানুবাদ: সুস্মিতা

এক ছিল ড্রাগন, তার নাম ডনি। ডনি সারাদিন ড্রাগনল্যান্ডের আকাশে উড়ে বেড়াত। কিন্তু একদিন ডনি উড়তে গিয়ে ড্রাগনল্যান্ড থেকে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল। আকাশে উড়তে উড়তে অনেকটা নিচের দিকে চেয়ে দেখল দুখানা লেডিবাগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজনের নাম টেরি আর অন্যজন হল জিম। টেরি হল ছোটো আর জিম হল গিয়ে বড়ো। ডনি ড্রাগন টেরিকে হাইবলল কিন্তু জিমের সঙ্গে কথা বলার আগেই সকলে দেখল দুটো প্রজাপতি ওদের দিকেই উড়ে আসছে। একজনের নাম টিম আর অন্যজনের নাম আইরিশ। আইরিশ সবার চেয়ে বড়ো। আইরিশ আবার নাকি কলেজেও যায় পড়াশোনা করতে। নতুন নতুন জিনিস শিখতে জানতে সে খুব ভালোবাসে।
জনি দেখল দুজন লেডিবাগ, দুজন প্রজাপতি সকলেরই লাল রঙের ডানায় কালো রঙের গোল গোল পোলকা ডট আঁকা আছে। শুধুমাত্র ডনির নিজের লাল ডানাতেই কোনো পোলকা ডট নেই। সেই দেখে তো ডনির বেজায় মন খারাপ হল। সে তখন অন্যদের বলল, “ও মা! তোমাদের লাল ডানায় কেমন সুন্দর কালো পোলকা ডট আছে। আমাকেও তোমরা ওরকম পোলকা ডটের ব্যবস্থা করে দিতে পারো?”
ডনির কথা শুনে ওর সব বন্ধুরা বলল, “নিশ্চয়ই! আমরা এক্ষুনি গিয়ে কালো রঙ আর তুলি নিয়ে আসছি। তোমার লাল গায়ে দেখ না কেমন তুলি চুবিয়ে কালো বুটি করে দিই।
যেমনি কথা তেমনি কাজ।
ডনি ড্রাগন তো মহা খুশি হয়ে সক্কলকে ধন্যবাদ বন্ধুবলে উঠল। তারপর সে ফিরে গেল ড্রাগনল্যান্ডে। ড্রাগনল্যান্ডের অন্য সব ড্রাগনরা তো ডনির গায়ের কালো পোলকা ডট দেখে ভারি অবাক হল। তাদের গায়ে তো কোনো পোলকা ডট নেই। ডনি তখন তাদের বলল, “কুছ পরোয়া নেহি! তোমরাও চাইলে গায়ে আমার মতো নকশা করতেই পারো!
(সমাপ্ত)
মরাল অফ দ্য স্টোরি: চাইলেই তুমি বাপু গায়ে নকশা আঁকতেই পারো।
----------

ম্যাজিক পেনসিল: মেঘের নেশা - কৌশানি দেব

ম্যাজিক পেনসিল
মেঘের নেশা
কৌশানি দেব
বজবজ, ম্যানুয়েল গার্লস হাইস্কুল, অষ্টম শ্রেণি, বয়স ১৩

একেক জনের একেক রকম নেশা। কারোর বই পড়ার, কারোর গেম খেলার, কারোর আবার বেড়াতে যাওয়ার। তেমনি আমারও একটা নেশা আছে। মেঘ দেখার নেশালকডাউনে সেটা যেন আরও পেয়ে বসেছে
এই মেঘ দেখার নেশাটা আমার হয়েছে হাইস্কুলে ভরতি হওয়ার পর। মনে আছে, তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। একদিন ক্লাসে এলেন লতিকা ম্যামউনি আমাদের ভূগোল পড়ান। সেদিন পড়াতে গিয়ে উনি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। কথা বলছিলেন একেক জায়গার জলবায়ু, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন নিয়ে। এইসব বলতে বলতে হঠা করে ম্যাম বলে উঠলেন, “তোমরা সবাই প্রতিদিন অল্পক্ষণের জন্য হলেও আকাশ দেখবে। যেমন মন ভালো হয়ে যাবে তেমনি জানার আগ্রহটাও বাড়বে।”
সেদিন ম্যামের কথার সেরকম গুরুত্ব দিইনি। বরং মনে মনে বেশ হেসেইছিলাম। কিন্তু আকাশ-মেঘ যে কী সেটা প্রথম অনুভব করলাম লকডাউনের সময়। করোনার ভয়ে তো ঘরবন্দি। বেরোনোর অবকাশটুকুও নেই। তাই একটু অক্সিজেন পেতে প্রতিদিন বিকেল করে হাতে একটা গল্পের বই নিয়ে ছাদে হাঁটতে যেতাম। যখন দেখতাম আলো কমে আসছে তখন আবার নিচে নেমে আসতাম
এরকমই একদিন হাঁটছি, হঠা করে কী মনে করে একবার বইটা থেকে চোখ তুলে তাকালাম আকাশের দিকে। কালবোশেখির ঝড় আসবে আসবে করছে। কালো মেঘগুলো অদ্ভুভাবে ধেয়ে আসছে। আমি শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে আছি আকাশের দিকে মুখ করে। ঠিক তখনই মাথার মধ্যে প্রশ্নটা খেলে গেল। কালবোশেখির আগে মেঘের রং এরকম কালো হয় কেন? কই অন্য সময় তো হয় না। ব্যাপারটা কী? একটা বই থেকে পরে জানলাম যে মেঘের মধ্যে যে জলকণাগুলো থাকে সেগুলো সূর্যের মধ্যে থাকা আলোক রশ্মির যদি সাতটা রংকেই বিক্ষিপ্ত করে তখন ঐ মেঘের রং হয় সাদা এই মেঘ খুব হালকা যদি কোনো মেঘের মধ্যে জলকণাগুলো খুব ঘনভাবে অবস্থান করে তাহলে ওপরের দিক থেকে কিছু আলোকরশ্মি বিক্ষিপ্ত হলেও নিচের দিকে আলোর কোনো বিক্ষেপ ঘটে না বরং মেঘ সব আলো শোষণ করে নেয় ফলে ওর রং কালো দেখায় কালবৈশাখীর মেঘের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে
এরপর মেঘ সম্বন্ধে জানার আগ্রহটা যেন আরও বেড়ে গেল। প্রতিদিন বিকেলে হাঁ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। বিশেষত গোধূলির সময় আকাশের রূপই পালটে যায়। আর মেঘগুলো যেন হয়ে যায় আকাশের অলংকার। ওই সময়টা যেমন আকাশের রঙের পরিবর্তন হয়, তেমনই মেঘগুলোরও কিছু কিছু জায়গা কখন বেগুনি, কখনও কমলা কিংবা হালকা হলুদ হয়ে পড়ে। মেঘের কোথায় কতটা আলো কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে এগুলো দেখতে দেখতে আমার শেডিং সম্বন্ধে একটা ধারণা জন্মেছে যা আঁকাআঁকি করার সময় খুব কাজে দেয়।
অনলাইন ক্লাস করতে করতে আমিও নতুন ক্লাসে উঠে গেলাম। এরপর স্কুলের নতুন ভূগোল বইটা থেকে মেঘের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে জানতে পারলাম। সিরাস, অল্টোস্ট্রেটাস, স্ট্র্যাটোকিউমুলাস - আরও কত কী! এরপর মাথার ভূতটা আরও চেপে বসল। সকাল, বিকেল, দুপুর সবসময়ই ছাদে গিয়ে মেঘ দেখি। আর সেগুলোর নামসহ বৈশিষ্ট্য নিজের মনেই বলতে থাকি। এই তো ক’দিন আগেই দুপুরবেলায় পুরো আকাশটা স্তরে স্তরে বাম্পারের মতো মেঘে ঢাকা ছিল। ওই মেঘকে বলে স্ট্র্যাটোকিউমুলাস। অনেকে আবার Bumpy Cloud-ও বলে আমার সবথেকে ভালো লাগে আকাশটা যখন সিরোকিউমুলাস মেঘে ঢাকা থাকে এই মেঘ পেঁজা তুলোর মতো ম্যাকারেল মাছের পিঠের মতো বললে বুঝতে বোধহয় সব থেকে সুবিধে হবে
সেদিনই বাবা ছাদে টিনের শেড দেওয়ার কথা বলছিল তা শুনে আমার তো দারুণ আপত্তি জুড়ে দিলাম কান্নাকাটি কিছুতেই শেড দেওয়া যাবে না শেড দিলে তো আমি আর মেঘ দেখতে পারব না আমার এত আপত্তির পর বাবা কী আর শেড দিতে পারে?
আমাকে এক বন্ধু বলেছিল, “এই তুই এভাবে আকাশের মেঘ দেখে সময় নষ্ট করিস কেন?” আমি তাকে হেসে জবাব দিয়েছিলাম, “এইটার উত্তর পেতে হলে তোকেও আকাশের দিকে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হয় আমিও ওদের সঙ্গে ভাসছি অদ্ভুত সেই অনুভূতি বলে বোঝানো সম্ভব নয় মেঘগুলো অনেক সময় এমন আকার ধারণ করে যে তা দেখে মনে পড়ে যায় হাতি, বিড়াল, হাঁস ইত্যাদি নানা পশু-পাখির কথা কিছু কিছু মেঘ আবার এমনভাবে ছেয়ে থাকে, তাদের দেখেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গোয়ার সমুদ্র বা সিমলার পাহাড়ের কথা আবার কখনও এমন এমন জিনিসও কল্পনা করতে থাকি যার বাস্তব বলে কিছু নেই ওরা সবাই আমার কল্পনার জগতের বন্ধু আর ওদের দিকে চেয়েই আমি বুনে ফেলতে পারি একেকটা গল্প ঝড়বৃষ্টির ঠিক আগের আর পরের আকাশটা লক্ষ করবি একটু হলেও তফাত চোখে পড়বেই
তারপর দিন থেকে আমি ঐ বন্ধুকে প্রতিদিনই বিকেলবেলায় আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে দেখেছি ওরও আমার মতো মেঘ দেখার নেশা ধরে গেছে লতিকা ম্যাম আমাকে একবার বলেছিলেন, এসব দৃশ্য উপভোগ করার জন্য শুধু দরকার পড়ে ভালো পর্যবেক্ষণ শক্তির উনি আরও বলেছিলেন, পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সবকিছুর কারণ খোঁজার চেষ্টা করবে। যত প্রশ্ন করবে তত জানতে পারবে।
আমি লতিকা ম্যামের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব আমার মধ্যে এমন সুন্দর একটা নেশা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।
----------
ছবি - আন্তর্জাল